.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

মঙ্গলবার, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

রবীন্দ্রনাথের ‘আমার জগৎ’ (তৃতীয় পর্ব)

 ।। রজতকান্তি দাস।।

(C)Image:ছবি
মি আগের পর্বে লিখেছিলাম রবীন্দ্রনাথ তাঁর আমার জগৎপ্রবন্ধে গতির যে ব্যাপারটা তাঁর কাব্যিক ভাষায় উপস্থাপনা করেছেন তা ছিল গতি-বিজ্ঞানের সবচাইতে সমস্যার বিষয় যা তখনকার প্রথম সারির বিজ্ঞানীদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। এখানে তাই নিয়েই আলোচনা করব।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রবন্ধে যা বলতে চেয়েছেন তা হলো যে কোন জিনিসের গতি নির্ভর করে তার নিরীক্ষণস্থলের উপর। নিরীক্ষণস্থলকে বাদ দিলে কোন জিনিসের গতি বের করা সম্ভব নয়। রবীন্দ্রনাথের মতে কোন একটি মাত্র নির্দিষ্ট নিরীক্ষণস্থলই সত্য বলে ধরে নিলে তা ভুল হবে কারণ সমস্ত নিরীক্ষণস্থলই সমান ভাবে সত্য। তাই একই বস্তু একজনের কাছে স্থির ও আরেকজনের কাছে গতিশীল হতেই পারে এবং দুটোই সমান ভাবে সত্য। মনে রাখতে হবে আইনস্টাইনেরও এই একই মত। অর্থাৎ নিউটনের absolute frame of reference- এর ধারণাকে আইনস্টাইন খারিজ করে দিয়েছিলেন। এই যে কোন বস্তুর গতিবেগ একেক জায়গা থেকে একেক রকমের মনে হয় তা নিউটনসহ সমস্ত প্রথম সারির বিজ্ঞানীদেরই চিন্তার কারণ হয়েছিল। এই গতি নিয়ে আপেক্ষিকতার ধারণা শুরু হয়েছিল কোপার্নিকাসের সময় থেকেই। এই আপেক্ষিকতার উপর ভিত্তি করেই কোপার্নিকাস প্রমাণ করেছিলেন পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে। কিন্তু যে সমস্যা দেখা দিয়েছিল তা হলো যে সবধরনের নিরীক্ষণস্থলকে বাদ দিয়ে কোন বস্তুর গতিবেগকে বের করা যায় কিভাবে তা এক বিশেষ সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নিউটন শেষ পর্যন্ত এর কোন সমাধান দিতে পারেন নি। তাই তিনি জানান যে বস্তুর গতি হলো আপেক্ষিক এবং নিরীক্ষণস্থল নির্ভর। তবে কোন একটি নিরীক্ষণস্থল আছে যা এযাবৎ আবিষ্কার হয় নি তবে সেই সবকিছু থেকে প্রভাবমুক্ত কোন এক absolute নিরীক্ষণস্থল নিশ্চয়ই আছে যা থেকে কোন কিছুর সঠিক গতি নির্ধারণ করা সম্ভব। আইনস্টাইন এই ধারণাকে খারিজ করে দিয়ে জানান যে সমস্ত নিরীক্ষণস্থলই সমানভাবে গ্রাহ্য। এখানে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আইনস্টাইনের মিল আমরা পাই এবং উভয়ের ধারণাই নিউটন বিরোধী । আইনস্টাইন নিউটনের আপেক্ষিকতার ধারণাকে খারিজ করে দিয়ে জানান যে গতি মোটেই আপেক্ষিক নয়। তাই তিনি এক অনাপেক্ষিক সত্যকে আবিষ্কার করেন যা সম্পূর্ণভাবে যে কোন নিরীক্ষণস্থল দ্বারাই প্রভাবিত নয়। এই অনাপেক্ষিক সত্য হলো আলোর গতি যাকে আমরা এক ধরণের মহাজাগতিক ধ্রুবক হিসেবে মেনে নিতে পারি। তাই এই মহাজাগতিক ধ্রুবককে একটি পরিমাপক হিসেবে ধরে নিলে কোন জিনিসের গতিবেগ অনাপেক্ষিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব যেখানে কোন absolute frame of reference থাকে না। রবীন্দ্রনাথেরও এই ধারণা ছিল যে সব ধরণের নিরীক্ষণস্থলই সমান ভাবে গ্রাহ্য এবং তা আইনস্টাইনের গতি বিজ্ঞানের সঙ্গে মিলে গেলেও এই ধারণাটি তিনি পেয়েছিলেন উপনিষদীয় ভাবধারা থেকেই। তবে রবীন্দ্রনাথের ভাবধারার সঙ্গে আইনস্টাইনের ধ্যানধারনার মধ্যে অন্য এক জায়গায় অমিলও ছিল। এই প্রসঙ্গে পরে আসব।

আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতাতত্ত্ব ১৯০৫ সালে প্রকাশিত হলেও ১৯১৪ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন আমার জগৎপ্রবন্ধটি লেখেন তখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীমহলে আইনস্টাইনের কোন পরিচিতি ঘটেনি। তখনও পর্যন্ত পৃথিবীর অনেক মহান বিজ্ঞানীরাও নিউটনীয় আপেক্ষিকতাবাদেই বিশ্বাস করতেন। অথচ দেখা যাচ্ছে যে রবীন্দ্রনাথ এই আপেক্ষিকতাকে মেনে নিলেও একটি সত্যকে তিনি উদ্ঘাটন করে ফেলেছেন যে সমস্ত নিরীক্ষণস্থলই সমানভাবে গ্রাহ্য এবং বিশেষ নিরীক্ষণস্থল বলে কিছুই নেই। তখনকার সময়ের চিন্তাভাবনার দিক থেকে এক আইনস্টাইনকে বাদ দিলে রবীন্দ্রনাথের চিন্তাজগত যে অন্তত এই ব্যাপারে অন্যান্য বিজ্ঞানীদের চাইতে উন্নতমানের ছিল তা নির্দ্বিধায় বলা যে যেতে পারে। তাছাড়া নিউটনের মনে এই অ্যবসলিউট ফ্রেম অব রেফারেন্সের ধারণা এসেছিল ঈশ্বরবিশ্বাস থেকে। রবীন্দ্রনাথ তার প্রবন্ধে অন্তত ঐশ্বরীয় ভাবধারাকে কোথাও নিয়ে আসেন নি। তবে রবীন্দ্রনাথের ভাবধারার সঙ্গে আইনস্টাইনের ভাবধারার মিল থাকলেও সবচেয়ে বড় যে অমিল ছিল তা হলো এই আপেক্ষিকতার মায়াজাল তাঁর বিশ্বাসকে subjectivity-র দিকে ঠেলে দিয়েছিল যেখানে আইনস্টাইনের ধ্যান ধারণা ছিল objective বরং এই বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বই আইনস্টাইনকে এতটাই অবজেক্টিভিটির প্রতি বিশ্বাস স্থাপনে সহায়ক হয়েছিল যে শেষ পর্যন্ত তিনি কোয়ান্টাম থিওরিকে সাব্জেক্টিভিটি ভেবে তার বিরোধিতা করেন।

আসলে স্পেস ও সময় সম্পর্কে চিরাচরিত ধ্যানধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েই আইনস্টাইন এই আপেক্ষিকতার রহস্যকে উদ্ঘাটন করেন। লেখক রোনাল্ড ডব্লিউ ক্লার্ক লিখেছেন যে আইনস্টাইন স্পেস ও সময় সম্পর্কে মানুষের চিরাচরিত ধারণাকে আমূলভাবে পাল্টে দিয়েই পদার্থজগতের এমন এক নক্সা তৈরি করেন যা বাদ দিয়ে জড়বিজ্ঞানের শিক্ষা হয়ে পড়ল ব্যাকরণ বাদ দিয়ে ভাষা শিক্ষার মতো। কথাটা ঠিক তবে ১৯১৪ সালে ভারতে বসে রবীন্দ্রনাথের পক্ষে এই তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব ছিল না। এছাড়া ১৯১৯ সালের আগে ইউরোপের মাটিতেই আইনস্টাইনকে খুব কম লোকই চিনত। তবে কবির সত্যনিষ্ঠা আমাকে আপ্লুত করেছে কারণ যে কবি ভাষা ও ভাবের জগতে বিভোর হয়ে থাকেন তাঁর মন যে বিজ্ঞানজগতের নিত্যনতুন আবিষ্কার সম্পর্কেও সদাজাগ্রত থাকত তা বর্তমান প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। আমি দুনিয়ার কিছুই জানি না কিছুই বুঝিনা শুধু ভাবের ঘোরে থাকিএই ধরণের কবি তিনি ছিলেন না। এর থেকে যদি আধুনিক কবিরা কিছুটা শিক্ষা নেন তাহলে কবিতার জগতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। একথা রবীন্দ্রনাথই লিখে গেছেন যে প্রসঙ্গে পরে আসব। এখানে শুধু একটা কথার উল্লেখ না করে পারছি না যে কবি যখন ১৯২১ সালে লন্ডনে যান তখন খবর পেয়ে তিনি লন্ডন মিউজিয়ামে গিয়েছিলেন ১৯১৯ সালে সূর্যগ্রহণের সময়ে তোলা সেই ফটোগ্রাফটি দেখার জন্যে যা আইনস্টাইনের তত্ত্বকে পরীক্ষামূলক ভাবে প্রমাণ করেছিল। সম্ভবত তখন থেকেই কবির মন আইনস্টাইনের সঙ্গে দেখা করার জন্য উদগ্রীব হয়েছিল। সে সুযোগ ঘটেছিল ১৯৩০ সালে। (চলবে)




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন