.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

রবিবার, ৩ জুলাই, ২০১৬

মানুষ বেশি বুদ্ধিমান না মুরগি?


(C)Imageঃছবি

।। রজত কান্তি দাস।। 
মানুষ বেশি বুদ্ধিমান না মুরগি? এই প্রশ্নটি শুনলে যে কেউ বলবে এটা আবার একটা প্রশ্ন হলো নাকি। মানুষ বেশি বুদ্ধিমান এটা সবাই জানে। তবে আমি আগেই বলেছি যে আমার মাথায় আজগুবি সব প্রশ্ন আসে যা সর্বসমক্ষে বলতে পারি না কারণ লোকে পাগল ভাববে। এখন দেখছি না বললেও লোকে পাগলই ভাবে। তাই ভাবছি আমার চিন্তার কথা বলেই ফেলি।
মনে করুন ভূমিষ্ঠ হবার পরই একটি মানব সন্তান ও ডিম থেকে সদ্য বেরোনো একটি মুরগির বাচ্চাকে যদি একটি নির্জন দ্বীপে ছেড়ে আসা যায় তাহলে এক মাস পরে গিয়ে দেখা যাবে যে মুরগির বাচ্চাটি দিব্যি খাবারদাবার কুঁড়িয়ে বেঁচে আছে। কিন্তু মানব সন্তান মরে পড়ে আছে। তাহলে একদিন বয়েসি মুরগির বাচ্চাকে যদি আমি বলি যে একদিন বয়েসি মানব সন্তানের চাইতে বেশি বুদ্ধিমান তাহলে কি ভুল বলা হবে?
এখন প্রশ্ন হলো যে যদি দুজনই বেঁচেবর্তে থাকে তাহলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানব সন্তানের জ্ঞান ও বুদ্ধির যে উন্মেষ ঘটবে তা মুরগির বাচ্চার হবে না। অর্থাৎ জ্ঞান দুই প্রকার, জন্মগত ও অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া। ইউরোপীয় দর্শনে এই প্রথমটিকে বলা হয় innate আর দ্বিতীয়টিকে বলা হয় empirical. এখন প্রশ্ন হলো যে জন্মগত কোন জ্ঞান কি প্রাণীদের মধ্যে থাকে। আমি বলব অবশ্যই থাকে। যেমন একটি মুরগির বাচ্চা ডিম ফুটে বেরিয়েই খাবারের সন্ধান করতে থাকে। আমরা যদি পাথরকুচির সঙ্গে কিছু চাল মিশিয়ে তাকে দিই তাহলে সে শুধু চালের মধ্যেই টোকা মারবে। পাথরকুচিকে ছোঁয়েও দেখবে না। অথচ কেউ কিন্তু তাকে শিখিয়ে দেয় নি কোনটা তার আহার আর কোনটা নয়। জন্মগত ভাবেই সে তা জানে। ঠিক জন্মের পর কোন মা যখন তার শিশুর মুখে স্তন গুঁজে দেন তখন দেখা যায় শিশু তা জানে কি করে এর থেকে দুধ বের করে খেতে হয়। এই ইনেট ও এম্পিরিক্যাল নলেজকে আমরা কম্পিউটারের ROM RAM -এর সঙ্গে তুলনা করতে পারি। ROM হলো ‘Read Only Memory’ যা কম্পিউটারের মধ্যেই থাকে । আমরা যখন কম্পিউটারকে চালু করি তখন স্ক্রিনের মধ্যে কিছু লেখা আসে যা আসে ROM থেকে। এই রোমের মধ্যে কিছু নির্দেশ থাকে হার্ড ডিস্ক থেকে কিছু ফাইল পড়ে কম্পিউটারকে যথাযথ ভাবে সেট করার। অন্য দিকে RAM হলো Random Access Memory অর্থাৎ হার্ড ডিস্ক অথবা কি-বোর্ড কিংবা অন্য কিছু থেকে তথ্য নিয়ে যে সব তথ্য কম্পিউটারের স্মৃতিতে ভরানো হয়, তাই। এই রোম ও র‍্যামকে বলা যেতে পারে ইনেট ও এম্পিরিক্যাল নলেজের সাদৃশ্য।
আমাদের বিজ্ঞান সম্মত মনোভাব থেকে হয়ত আমরা এই জন্মগত জ্ঞানকে বিশ্বাস করতে পারি না কারণ এটাকে ব্যাখ্যা কিছুটা কঠিন। কিন্তু এই ইনেট নলেজ তো আছে যা আমরা দেখতে পাই। তাই এর ব্যাখ্যাটা এরকম হতে পারে, আমাদের মস্তিষ্কে যে সব তথ্য থাকে যাকে আমরা স্মৃতি বলি তা হলো কিছু চৌম্বকীয় কণিকার বিশেষ বিন্যাস, ঠিক যেমন একটি ম্যাগন্যাটিক ডিস্কে কোন সিনেমা, গান কিংবা তথ্য থাকে। আমাদের মস্তিষ্কেও অনুরূপভাবে এই সব অভিজ্ঞতালব্ধ স্মৃতি চৌম্বকীয় কণিকার বিশেষ অ্যারেঞ্জমেন্টের মধ্যে জমা হয়ে থাকে। মাথায় আঘাত পেয়ে এই অ্যারেঞ্জমেন্ট যদি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে স্মৃতিলোপ হতে পারে। তাই জন্মগত জ্ঞানকে আমরা বলতে পারি যে জন্মগত ভাবেই এই চৌম্বকীয় কণিকার বিশেষ অ্যারেঞ্জমেন্ট যা আমরা জন্মসূত্রে লাভ করি। তাই জন্মগত জ্ঞান থাকাটা অবৈজ্ঞানিক নয়। এটা অনেকটা প্রি-রেকর্ডেড সিডির মতো।
আমার ভাবনাটা হলো পশুদের ইনেট নলেজ বেশি তাই আর কিছু না হোক জন্মের পর নিজের চেষ্টায় বেঁচে থাকতে পারে যা একটা বয়স পর্যন্ত মানুষ পারে না। আমার মেয়ের বয়েস যখন সাত-আট মাস তখনও সেপ্টিপিন ইত্যাদি মুখে ঢুকিয়ে দিত যা একদিনের মুরগির বাচ্চা করবে না কারণ সে জানে ওটা তার খাদ্য নয়। এই মানুষই বড় হয়ে মুরগির ফার্ম খুলতে পারে। কিন্তু মুরগির বুদ্ধিশুদ্ধি প্রায় এক জায়গাতেই থাকবে। অর্থাৎ মানুষের জন্মগত জ্ঞান কম কিন্তু অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যত দ্রুতগতিতে তার জ্ঞানবুদ্ধির বিকাশ ঘটে। কিন্তু পশুপাখিদের জন্মগত জ্ঞান বেশি থাকা স্বত্বেও অভিজ্ঞতা থেকে বেশি জ্ঞান লাভ করতে পারে না। তাই আমার থিওরি হলো, “The evolution of mind is basically a transition from innate knowledge to empirical knowledge” তবে এই থিওরিকে প্রমাণ করা এত সহজ নয়।




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন