.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

বৃহস্পতিবার, ২৮ জুলাই, ২০১৬

প্রজাতির উৎস সন্ধানে (নবম পর্ব)


।। রজতকান্তি দাস।।
বিবর্তনের ধারায় মানুষের উদ্ভব
       মানুষ যে বিবর্তনের ধারাতেই পৃথিবীতে এসেছে এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না চার্লস ডারউইনের। প্রশ্নটা ছিল গোটা প্রাণিজগতই তো লতায় পাতায় আমাদের আত্মীয়। তবে বিবর্তন যে সরল রেখায় ঘটে নি এটাও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। এক কোষী প্রাণী থেকে বিভিন্ন শাখাপ্রশাখার মধ্য দিয়ে গোটা প্রাণিজগতের সৃষ্টি। তাই এখানে সবার সঙ্গে আত্মীয়তা সত্ত্বেও কিছু প্রজাতি যেমন নিকট আত্মীয় আবার কিছু প্রজাতির সঙ্গে আত্মীয়তা লতাপাতায়। যেমনটা মানব সমাজে হয়ে থাকে তেমনি প্রায় ৩৫০ কোটি বছরের ব্যবধানে এমন হয়েছে যে কিছু আত্মীয়কে আর আত্মীয় বলে পরিচয় দিতেই লজ্জা করে। তবে এদের মধ্যে নিকট আত্মীয়দের খুঁজে দেখতে গেলে খুব বড় মাপের চশমার প্রয়োজন হয় না। বিশেষ করে যেখানে স্তন্যপায়ীদের সঙ্গে আমাদের মিল এতো বেশি। ওদের শিশুরা যেমন স্তন্যপান করে তেমনি আমাদের শিশুরাও করে। ওদের গায়েও আমাদের মতো লোম আছে। বানর, শিম্পাঞ্জি, গরিলা কিংবা ওরাংওটাং-এর হাবভাবের সঙ্গে আমাদের হাবভাবের প্রচুর মিল। আমরা অন্যান্য প্রাণীদের তুলনায় এদের মনের কথা বেশি বুঝতে পারি। ওরাংওটাং-এর মস্তিষ্কের সঙ্গে মানুষের মস্তিষ্কের মিল প্রায় খাঁজে খাঁজে। মানুষের জন্য প্রস্তুত অনেক ঔষধ ওদের শরীরে কাজ করে অনুরূপভাবে। এই প্রাণীগুলোর সঙ্গে যখন মানুষের এতটাই মিল তাই এটাই স্বাভাবিকভাবে চিন্তায় আসে যে মানুষের উদ্ভব ঘটেছে এই সব প্রাণী থেকেই।

          ডারউইনের জীবদ্দশায় মানুষ ও বানর জাতীয় প্রজাতির অন্তর্বর্তীকালীন প্রজাতির জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয় নি। তাই এই যোগসূত্র বের করে ডারউইনকে বিবর্তনের ধারা প্রমাণ করতে গিয়ে অন্য পন্থা অবলম্বন করতে হয়েছিল। তিনি নানা ধরণের তথ্য সংগ্রহ করে ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ করলেন তাঁর বিখ্যাত বই ‘The Descent of Man, and Selection in Relation to Sex’তার পরের বছরই তিনি প্রকাশ করলেন আরেকটি বই, ‘The Expression of the Emotions in Man and Animals’ এই দুটি বই প্রকাশ করে ডারউইন তাঁর অসমাপ্ত কাজকে সম্পূর্ণ করলেন।

            বিবর্তনের ধারায় মানুষ যে তার নিকটতম প্রজাতি থেকে বহুদূর এগিয়ে গেছে এতে কোন সন্দেহ নেই। আর এখানেই গোল বেঁধেছিল ডারউইনবাদকে নিয়ে। প্রশ্ন উঠেছে ‘Missing Link’ নিয়ে। কারণ মানুষ ও বানর প্রজাতির মধ্যে মধ্যবর্তী স্তর যেন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ মানুষের উদ্ভব যে বিবর্তনের ধারাতেই হয়েছে এ ব্যাপারে ডারউইন ছিলেন নিশ্চিত। যেহেতু তখনও এই মধ্যবর্তী স্তরগুলোর জীবাশ্ম পাওয়া যায় নি তাই এই যোগসূত্র বের করতে তিনি অবশিষ্ট অঙ্গের (Vestigal Organ) আশ্রয় নিলেন। যেমন আমাদের শরীরে অনেকগুলো অবশিষ্ট অঙ্গ আছে যেগুলো আমাদের আর কোন কাজে লাগে না। এই অঙ্গগুলো হলো আমাদের আগের প্রজাতির কাছ থেকে পাওয়া। আসলে বিবর্তন ঘটে অত্যন্ত ধীর লয়ে এবং লক্ষ লক্ষ বছরে একেকটি অঙ্গ যেমন জন্ম লাভ করে তেমনি বহু প্রজন্ম ধরে নতুন প্রজাতির শরীরে অবশিষ্ট অঙ্গ হিসেবে থেকেও যায়। যেমন আমাদের পাকস্থলীর Appendix যা বর্তমানে আর কোন কাজে আসে না। এই appendix কথাটা অর্থই হলো পরিশিষ্ট বা অবশিষ্ট। আমাদের শরীর থেকে এটাকে বাদ দিয়ে দিলেও কোন সমস্যা নেই। এরকম আরো বহু প্রত্যঙ্গ আছে আমাদের দেহে যা প্রমাণ করে যে আমরা বিবর্তনের ধারাতেই এই পৃথিবীতে এসেছি। যেমন মেরুদণ্ডের নীচে টেল বোন অথবা coccyx bone যা আসলে ল্যাজ। ছোট হতে হতে সামান্য ঝুলে আছে এখনও। অনেকের এই ল্যাজে ব্যথাও হয় যাকে বলে coccygitis অথবা coccydynia তখন অপারেশন করে এটিকে শরীর থেকে বাদ দিতে হয়। আমাদের গায়ের লোম, ঘ্রাণশক্তি, টনসিল, সাইনাস ইত্যাদি অনেক প্রত্যঙ্গ আমাদের শরীরে আছে যা বেঁচে থাকার জন্য আজ আর কোন কাজে আসে না। এই প্রত্যঙ্গগুলো আমরা পেয়েছি আমাদের আগের প্রজাতির কাছ থেকে। সময়ের ধারায় একদিন এগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এই অকেজো অঙ্গগুলোই বিবর্তনের ধারাকে প্রমাণ করে। প্রমাণ করে আমরা কোন বিশেষ প্রজাতি হয়ে আসিনি এই ধরাধামে। বিবর্তনের ধারায় অন্যান্য প্রাণীকুল যেভাবে এসেছে এই বসুন্ধরায়, আমরাও সেভাবেই এসেছি।

              আমাদের মধ্যে যারা মানুষের অবতারত্বে বিশ্বাস করেন তাদের পক্ষে বিজ্ঞানের এই সত্যকে মেনে নেওয়া সহজ নয়। মানুষের সঙ্গে এই পৃথিবীতে বসবাসকারী তার নিকটতম প্রজাতির ব্যবধান এতটাই হয়ে গেছে যে এটা মানতে কারো কারো পক্ষে কষ্ট হতে পারে যে আমরা আসলে একই ধরণের বস্তু শুধু গুণমানে কিছুটা ভিন্ন। যেমন কুয়াশা ও হিমবাহকে দেখলে বোঝা যায় না যে দুটোই আসলে একই বস্তু দ্বারা সৃষ্ট।
             বানর জাতীয় প্রজাতি ও মানুষের অন্তর্বর্তী স্তরগুলোর জীবাশ্ম এখন পাওয়া গেলেও ডারউইনের জীবদ্দশায় তা পাওয়া যায় নি। তাছাড়া ইউরোপে যে সমস্ত জীবাশ্ম পাওয়া গিয়েছিল সেগুলো ততটা স্পষ্ট নয়। তাই এই বিচ্ছিন্ন যোগসূত্র বা মিসিং লিঙ্ক নিয়ে ইউরোপীয়রা উত্যক্ত করত ডারউইনকে। অবশ্য উত্যক্ত করারই কথা, কারণ বিজ্ঞান যদি প্রমাণ দিতে না পারে তাহলে তা ধোপে টেকে না। বিজ্ঞান কোন ধর্মগ্রন্থ নয় যে যা লেখা আছে সব ঠিক বলে শুধুমাত্র প্রচারের জোরে চালাতে হবে। কোন কোন ক্ষেত্রে যে মানল না তার গর্দান নিতে হবে। বিজ্ঞান হলো সভ্যতার মাপকাঠি যা মানুষের অগ্রগামীতাকে নির্দেশ করে। মানুষ হিসেবে আমাদের শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার এই বিজ্ঞানের দায়িত্বও তাই অনেক বেশি। যাই হোক ডারউইনের জীবদ্দশায় না হলেও পরবর্তীকালে এই মধ্যবর্তী স্তরগুলো জীবাশ্ম পাওয়া গেল আফ্রিকা ও পূর্ব এশিয়ায়। মানুষের প্রাচীনতম জীবাশ্ম যা পাওয়া গেছে তা প্রায় ১ কোটি ৮৪ লক্ষ থেকে ২ কোটি ৪0 লক্ষ বছর অতীতের। এই যুগের নাম দেওয়া হয় মাইওসিন যুগ। এর আগে ছিল অলিগোসিন যুগ। এই মাইওসিন যুগেই মানুষের আদিমতম প্রজাতি শিবাপিথেকাস (Sivapithecus) ও রামাপিথেকাস (Ramapithecus)- এর সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলো মানুষের দেওয়া নাম, এর সঙ্গে শিব ও রামের কোন সম্পর্ক নেই। আসলে গ্রিক ভাষায় Pithecus শব্দের অর্থ হলো Ape অর্থাৎ ল্যাজবিহীন বানর জাতীয় প্রাণী। এই দুটি প্রজাতিই এখন বিলুপ্ত, তবে এদের মধ্য থেকে শিম্পাঞ্জি ও গরিলার উদ্ভব হয়েছিল আনুমানিক ষাট লক্ষ থেকে এক কোটি বছর আগে। এই পিথেকাসরা ছিল হোমিনয়েড গোত্রের আদি রূপ। পরবর্তীকালে মাইওসিন যুগের শেষের দিকে অস্ট্রেলোপিথেকাস (Australopithecus) গণ বা Genus –এর উদ্ভব হয়। এই গোত্রের জীবাশ্ম যেহেতু শুধুমাত্র আফ্রিকাতেই পাওয়া গেছে তাই ওরকম নাম দেওয়া হয়েছে। কারণ Austral শব্দের অর্থ হলো দক্ষিণ। যেমন দক্ষিণের মহাদেশ হলো ‘Australia’

           দক্ষিণ আফ্রিকা, কেনিয়া ও তানজানিয়ায় আরো কিছু গণের সন্ধান পাওয়া গেছে। এদেরই কোন একটি থেকে Homo জাতীয় গণের উদ্ভব। যা প্রথমে Homo Habilis-এ রূপ নিয়েছে। এই ধারায় বিবর্তিত হতে হতে আজকের বুদ্ধিমানের মানুষের উদ্ভব হয়েছে যাদের বলা হয় Homo Sapiens Sapiens পৃথিবীর সমস্ত মানুষই এই একই প্রজাতি। অন্যান্য প্রাণীকুলের অনেকগুলো করে প্রজাতি থাকলেও মানুষের অন্যান্য প্রজাতিগুলি বিলুপ্ত হতে হতে এই একটি মাত্র প্রজাতি রয়ে গেছে এই বিশ্বজুড়ে। অর্থাৎ জগৎ জুড়িয়া এক জাতি আছে সে জাতির নাম মানুষ জাতি। যারা মিসিং লিঙ্ক নিয়ে এখনও ভাবেন তাদের জ্ঞাতার্থে এটুকু বলতে পারি যে আজ আর বিজ্ঞানীমহলে মিসিং লিঙ্ক নিয়ে কোন ভাবনা নেই কারণ মধ্যবর্তী স্তরগুলোর সন্ধান পাওয়া গেছে। আমি এখানে যা বললাম তা যথেষ্ট নয় কারণ এই মধ্যবর্তী স্তর নিয়ে বিস্তর তথ্য পাওয়া গেছে যা নিয়ে আলোচনা করার মতো পরিসর এখানে নেই এবং আমার সেই ক্ষমতাও নেই। তবে বানর প্রজাতি থেকে শাখা-প্রশাখায় মানুষের উদ্ভব ঘটলেও অতীতের সব প্রজাতিই এই ধরাধাম থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় নি। তবে তাদের সংখ্যা যে ভাবে কমছে তাতে মানুষের সহযোগিতা ছাড়া বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। এদের বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব বর্তমানে আমাদেরই উপর ন্যস্ত। অন্যথা অতীতের অসংখ্য প্রজাতির মতো এদেরও বিলুপ্তি ঘটে যেতে পারে।




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন