.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

রবিবার, ২৪ জুলাই, ২০১৬

প্রজাতির উৎস সন্ধানে (দ্বিতীয় পর্ব)


।। রজত কান্তি দাস।।
(c)Image:ছবি
ই বিবর্তনবাদের আবিষ্কারের পেছনে ছিল বহু বিজ্ঞানীর অবদান। তাই প্রথমে সেই সময়ের কথা বলতে চাই যখনও ধর্মীয় বাতাবরণ থেকে বেরিয়ে সত্যের পথ ছিল দুর্গম। এখানে তিনজন বিজ্ঞানীর উল্লেখ করব যারা হলেন রবার্ট হুক, জেমস হাটন ও চার্লস লিয়েল।

রবার্ট হুকের জীবাশ্মতত্ত্ব 
নিকোলাস স্টেনো ও রবার্ট হুক (১৬৩৫-১৭০৩) দুজনেই ছিলেন সমসাময়িক। রবার্ট হুক ছিলেন মূলত একজন পদার্থ বিজ্ঞানী, যদিও তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। ১৬৬০ সালে ইউরোপে যে রয়েল সোসাইটির বিজ্ঞান অকাদেমি পত্তন হয় সেখানে তিনি গবেষণাগারের কার্যাধ্যক্ষ পদে নিয়োজিত হন। তিন বছর পরই তিনি সোসাইটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং এই তিন বছরেই তাঁর বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়।
হুকের মতে উচ্চতম পাহাড়চূড়া থেকে গভীরতম খনি পর্যন্ত সর্বত্র জীবাশ্মের উপস্থিতিতে এটাই প্রমাণিত হয় যে স্থলভাগ ও সমুদ্রতলের আলোড়নের ফলেই পর্বতমালা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। এই ব্যাপারটা বাইবেলে বর্ণিত নোয়ার প্লাবনকে সমর্থন করে না। তবে রবার্ট হুকের মাথায় কিন্তু বাইবেলীয় হাজার বছরের ধারণাই ছিল। কিন্তু দু-আড়াই হাজার ফুট পাহাড়শ্রেণীর উদ্ভব হতে গেলে কোটি কোটি বছরের প্রয়োজন। তাই ছহাজার বছরের ভূকম্পের ফলে এত উচ্চ পাহাড়শ্রেণীর সৃষ্টি কী করে হলো তা নিয়ে হুক বিশাল ধন্দের মধ্যে পড়ে যান। হয়ত বা তিনিও এক মহাকালের সন্ধান পেয়েছিলেন কিন্তু চার্চের ভয়ে তা প্রকাশ করেন নি। এই ছহাজার বছরের মধ্যে প্রায় দু হাজার বছরের ইতিহাস তখন জানা ছিল। এই সময়ের মধ্যে এতটা বিধ্বংসী ভূমিকম্প তো হয় নি। তাই ছহাজার বছরের মধ্যে হাতে যেটুকু সময় তিনি পেয়েছিলেন যার ইতিহাস অজানা ছিল, সেই সময়ের মধ্যেই ক্রমাগত অতি ঘন ঘন বিধ্বংসী ভূকম্পের আমদানি করতে হয়েছিল তাঁকে। তবে রবার্ট হুক তাঁর বইয়ে বহু ধরণের জীবাশ্মের ছবি দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে এই এই জীবাশ্মগুলো যে সব প্রাণীর তা হয়ত এখন আর ভূপৃষ্ঠে নেই তবে পুরাকালে অবশ্যই ছিল। তিনি তাঁর বইয়ে প্রাচীনকালের বিরাটকার হাতি মতো দেখতে ম্যাস্টডনের অতিকায় দাঁত ও অদ্ভুতদর্শন সামুদ্রিক জীবাশ্মের উল্লেখ করেছিলেন। নিকোলাস স্টেনো ও রবার্ট হুক তাঁদের অজ্ঞাতসারেই ক্রমবিকাশতত্ত্বের যে বীজ রোপণ করেছিলেন তাই পরবর্তীকালে চার্লস লিয়েল ও চার্লস ডারউইনের হাত ধরে বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়।
জেমস হাটনের মহাকালের সন্ধান
আধুনিক ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানে নিকোলাস স্টেনো যেখানে থেমে যান, শতাধিক বছর পর জেমস হাটন (১৭২৬-১৭৯৭) সেখান থেকেই ভূতত্ত্ব বিষয়ে তাঁর গবেষণা শুরু করেন যা ফুলে ফেঁপে আজকের ভূ-বিজ্ঞানে পরিণত হয়েছে। হাটনই সম্ভবত প্রথম বাইবেলীয় ধারার সম্পূর্ণ বিরোধিতা করতে সাহস করেছিলেন কারণ এর আগে পর্যন্ত কেউই এতোটা প্রত্যয়ের সঙ্গে মহাকালের খোঁজ দিতে পারেন নি।
স্কটল্যান্ডের রাজধানী এডিনবারার বুদ্ধিজীবী মহলে এক স্বর্ণযুগের সূচনা হয়েছিল যখন রবার্ট বার্নস, ওয়াল্টার স্কট, ডেভিড হিউম, অ্যাডাম স্মিথ, জেমস ওয়াটের মতো দিকপালরা তাঁদের প্রতিভার আলোকে ইউরোপকে আলোকিত করে রেখেছিলেন। সেই সময়ই এডিনবারায় জেমস হাটনের জন্ম। এই এডিনবারায়ই পরবর্তীকালে চার্লস লিয়েলের জন্ম হয়েছিল যিনি ক্রমবিকাশতত্ত্বের ভিত রচনা করেন।
জেমস হাটন এক বন্ধুর সঙ্গে মিলে ভুষা থেকে নিশাদল (sal ammoniac) আবিষ্কার এবং এই বস্তুর ব্যবসা করে বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হন। সেই সঙ্গে তিনি শখের ভূবিদ্যায়ও মেতে উঠেন। তিনি তাঁর ভূতত্ত্ব গবেষণার মধ্য দিয়ে এক অসীম কালের সন্ধান দিতে পেরেছিলেন যা ঐ সময়ে গির্জা আধিকারিকরা মেনে নিতে পারেন নি। হাটনের মতে তিনি সময়ের শুরু দেখতে পাচ্ছেন না, এমন কি শেষও দেখতে পাচ্ছেন না। এই পৃথিবী সুদূর অতীতকাল থেকে চলে আসছে এবং আবহমান কাল ধরে চলতে থাকবে।
১৭৯৭ সালে হাটনের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তাঁর বন্ধু জন প্লেফার সরল ও যুক্তিনির্ভর ভাবে এবং খুব সন্দর্পনে বাইবেলীয় বিতর্ক এড়িয়ে হাটনের পৃথিবীতত্ত্বের চিত্রযোগে ব্যাখ্যাপ্রকাশ করেন। ১৮০২ সালে প্রকাশিত এই বইটির মাধ্যমেই ভূতাত্ত্বিকরা হাটনের ভূতাত্ত্বিক গতি বিজ্ঞান সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন। জেমস হাটন সার্বিকভাবে বাইবেলীয় বিশ্বাস থেকে মানুষকে বের করে আনতে পারেন নি। তাই তাঁর মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে তিনি হারিয়ে যেতে লাগলেন। তবে এই হাটনকে প্রায় কবর থেকে তুলে এনে জনসমক্ষে দাঁড় করিয়ে দিলেন আরেক স্কট যার নাম চার্লস লিয়েল। আগামী পর্বে চার্লস লিয়েলকে নিয়ে লিখব।

চার্লস লিয়েলের অবিচলবাদ খারিজ করে দেয় বাইবেলের প্রলয়বাদকে
যে বছর জেমস হাটনের মৃত্যু সেই বছরই চার্লস লিয়েলের জন্ম। মানব সভ্যতায় এধরণের রিলে রেসের ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। গ্যালিলিওর মৃত্যু ও নিউটনের জন্ম একই বছরে হয়েছিল।
বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্বের কথা আগেই বলা হয়েছে। তবে বাইবেলের আরেকটি ব্যাপার ক্রমবিকাশতত্ত্ব আবিষ্কারের পথে বাধাস্বরূপ ছিল। যা হলো প্রলয়বাদ অথবা catastrophism. এই প্রলয়বাদ হলো এই যে ঈশ্বর মাঝে মাঝে ভূপৃষ্ঠে মহাপ্রলয় সৃষ্টি করে সংঘটিত করে প্রাণিজগৎ সহ সমস্ত কিছুর ধ্বংস করেন। যেমন মহা প্লাবন কিংবা এক রাতের ভূমিকম্পে পাহাড়শ্রেণীর সৃষ্টি ইত্যাদি। এই ধারণাগুলো ক্রমবিকাশতত্ত্বের পরিপন্থী হলেও তৎকালীন ইউরোপীয় মানসিকতায় সমাজের সর্বস্তরে তা প্রোথিত হয়েছিল। সাধারণ লোকের কথা না হয় বাদই দিলাম, এমন কি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিপত্তিশালী অধ্যাপক ও ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রধান উইলিয়াম বাকল্যান্ডও এই একই ধারণা পোষণ করতেন। তাই ক্রমবিকাশের ধারণা ইউরোপীয় ভূখণ্ডে হয়ত বা সম্ভব হতো না যদি না চার্লস লিয়েল তাঁর বইয়ে শান্ত, স্থির ও খুব ধীরে পরিবর্তনশীল এক পৃথিবীর ধারণা নিয়ে না আসতেন। লিয়েলের এই ধারণাকে আমরা বলতে পারি অবিচলবাদযা প্রলয়বাদকে খারিজ করে দিয়েছিল।
             ১৮৩০ সালের জানুয়ারিতে চার্লস লিয়েলের যে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়, তখনকার প্রথা অনুযায়ী তার দীর্ঘ নামটি ছিল ‘Principles of Geology, being an attempt to explain the former changes of the Earth’s surface by reference to causes now in operation (ভূবিদ্যার মূলতত্ত্ব, পৃথিবীর পূর্বকালের পরিবর্তন সমূহের আজিকার সক্রিয় কারণের প্রেক্ষিতে ব্যাখ্যার প্রচেষ্টা) সংক্ষেপে Principles of Geology বা ভূবিদ্যার মূলতত্ত্ব। এই বইটি যে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা ও জনরোষ অর্জন করেছিল এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। লিয়েলের বইটির দ্বিতীয় খণ্ড ১৮৩২ জানুয়ারি মাসে, এই একই বছরে প্রথম খণ্ডের পরিমার্জিত সংস্করণ জুন মাসে এবং ১৮৩৩ সালে তৃতীয় খণ্ডের প্রকাশ করেন। এই বইটি যে গির্জা আধিকারিকদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল তার প্রমাণ ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। এই বইটি মূলত জনরোষের কারণেই ডারউইনের হাতে এসেছিল যা তার জীবনে সন্ধিক্ষণ এনে দিয়েছিল। এই বইটির উপরই ভিত্তি করে ডারউইন তাঁর বিবর্তনবাদকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
হাটনের পৃথিবী তত্ত্বের সঙ্গে চার্লস লিয়েলের ভূবিদ্যার মূলতত্ত্বের প্রতিপাদ্য বিষয়ের তফাতটা এই ছিল যে হাটন তাঁর বইয়ে জৈবিক জগতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছিলেন যা লিয়েল করেন নি। এর প্রধান কারণ ছিল ফরাসী বিপ্লব পরবর্তী সময়ে স্মিথ, সাঁকিলায়ের, লামার্ক, কুঁভিয়ে প্রমুখ বিজ্ঞানীরা জীবজগতকে নিয়ে যে সব কাজ করেছিলেন, হাটন তা দেখে যেতে পারেন নি। এছাড়া লিয়েল এক অবিচল পৃথিবীর কথা শুনিয়েছিলেন যা হাটনের মধ্যে ছিল না। লিয়েল তাঁর বইয়ের প্রথম খণ্ডেই লিখেছিলেন পুরাকালে জৈবিক ও অজৈবিক জগতের যা কিছু পরিবর্তন হয়েছিল তা সমস্তই বাধাহীন, ক্রমান্বয়ে সংঘটিত, প্রাকৃতিক ঘটনাবলীর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং আজকের নিয়মের মতোই চালিত হচ্ছে। বিজ্ঞানের নিয়ম কখনই স্থির করা যাবে না যতক্ষণ এই মূল প্রশ্নটির বিষয়ে এক স্থির ধারণা তৈরি হবে না।
লিয়েলের সমালোচনা প্রসঙ্গে ট্রিনিটি কলেজের অধ্যাপক উইলিয়াম হেভেল uniformitarianism শব্দটি ব্যবহার করেন যাকে আমরা বাংলায় বলতে পারি অবিচলবাদলিয়েল তাঁর অবিচলবাদের সূত্রেই তখনকার বাইবেলীয় ভূতত্ত্ব ও জীবতত্ত্বের অধিকাংশকে খারিজ করে দেন। সেই সময়ের বাঘা বাঘা পণ্ডিতরাও এটা অস্বীকার করতে পারেন নি যে পৃথিবীতে যে পলির স্তর জমা আছে তাতে মানুষ বা মানুষের সৃষ্ট কোন উপাদান যেহেতু পাওয়া যায় নি তাই বাইবেলীয় মহাপ্লাবন আদৌ ঘটেছিল কি না তা নিয়ে সন্দেহ দেখা যায়। এভাবেই চার্লস লিয়েল মহাকালসহ এক শান্ত ও ক্রমবিকাশশীল পৃথিবীর ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগী হয়ে পড়েন। এই লিয়েলের হাত ধরেই চার্লস ডারউইন তাঁর বিবর্তনবাদ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হোন।





একটি মন্তব্য পোস্ট করুন