.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

মঙ্গলবার, ২৬ জুলাই, ২০১৬

প্রজাতির উৎস সন্ধানে (পঞ্চম পর্ব)


।। রজত কান্তি দাস।। 
ডারউইনের বৈচিত্র্যময় প্রাণিজগতের সন্ধান
(C)Imageঃছবি
উরোপের শীতল আবহাওয়ায় প্রাণিজগতের বৈচিত্র্য খুব একটা দেখা যায় না। বরং পৃথিবীর ক্রান্তিমণ্ডলীয় উষ্ণ তাপমাত্রায় জৈব বৈচিত্র্য খুব বেশি। ডারউইন তাঁর যাত্রাপথে এই ক্রান্তিমণ্ডলীয় ভূভাগে যে জৈববৈচিত্র দেখেছিলেন তা তাঁকে অভিভূত করে দিয়েছিল। ইংল্যান্ডে বা স্কটল্যান্ডে বসে যে বৈচিত্র্যের কথা তিনি ভাবতেও পারেন নি তাই দেখে আনন্দে অধীর হয়ে গিয়েছিলেন। যেখানেই গেছেন সেখান থেকে প্রচুর পরিমাণে জীবের দেহাবশেষ জীবাশ্ম সংগ্রহ করে তিনি তা অন্যান্য জাহাজযোগে ইংল্যান্ডে তাঁর বন্ধু হেন্সলোর কাছে পাঠিয়ে দিতেন। ক্যাপ্টেন ফিজরয়ের পক্ষে অবশ্য বোঝা দুঃসাধ্য ছিল ডারউইন কেন এইসব অপ্রয়োজনীয় আবর্জনা রাশি জড়ো করে জাহাজে স্তূপীকৃত করে রাখছেন। জীবাশ্মগুলির মধ্যে ছিল মূলত বিশাল দৈত্যাকৃতি প্রাণী আর্মাডিলোর বহিরাবরণ, শ্লথ নামক প্রাণী বিশেষ প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর বিশালাকায় দাঁত ইত্যাদি যা বিজ্ঞানের কাছে অজ্ঞাত ছিল। এছাড়াও ছিল সাপ, টিকটিকি, ব্যাঙ, কাঁকড়া, শুষ্ক উদ্ভিদ, মাছ, বীজ, গোবর পোকা বহু ধরণের প্রাণীর নমুনা। এক অদ্ভুত দর্শন ব্যাঙের তিনি মজা করে নাম দিয়েছিলেন diabolicus কারণ diabolic শব্দের অর্থ হলো পৈশাচিক। ব্যাঙটিকে দেখে তাঁর মনে হয়েছিল ইডেনের বাগানে কুমন্ত্রণা দিয়েছিল যে শয়তান তার চেহারা এরকমই হবে। এই বৈচিত্র্যময় প্রাণিজগতে তিনি দেখলেন কীভাবে বিভিন্ন প্রাণী অভিযোজনের (modification) মধ্য দিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে।
ডারউইনের বয়স যখন মাত্র বাইশ বছর অর্থাৎ অভিযানের এক বছরের মধ্যেই তিনি আবিষ্কার করে ফেললেন যে অভিযোজনের ফলে পেলিক্যান জাতীয় পাখি ডুব সাঁতারের উপযুক্ত হয়। দক্ষিণ আমেরিকায় তিনি দেখলেন অস্ট্রিচ জাতীয় রিয়া (Rhea) নৌকোর পালের মতো ডানা মেলে দৌড়য়। আবার এক প্রকারের হাঁস নৌকোর দাঁড়ের মতো ডানা দুদিকে ব্যবহার করে। তিনি দেখলেন দক্ষিণ আর্জেন্টিনার পাম্পাসে ঘাসের পর্যাপ্ত জোগানের ফলে দৈত্যকায় রিয়া পাখি, দক্ষিণ পাটাগোনিয়ার মরু অঞ্চলে ছোট প্রজাতিতে রূপ নিয়েছে। তিনি আরো দেখলেন মরু অঞ্চলের ব্যাঙ সাঁতার কাটা ভুলে গেছে এবং মানুষের সংস্পর্শে না থাকা কুকুর বিড়াল বৃহদাকার হিংস্র হয়ে উঠেছে। অথবা হয়ত এই দুটো প্রাণী এরকমই ছিল, এখন গৃহপালিত হয়ে বদলে গেছে। আমি খুব কম বিড়াল দেখেছি যে ইঁদুর ধরে খায়। বরং চুরি করে খাওয়ার ব্যাপারে বিড়ালের মতো প্রাণীর জুড়ি নেই।
ডারউইন তাঁর গভীর অনুসন্ধিৎসা প্রখর বুদ্ধিবলে বুঝতে পেরেছিলেন যে প্রাণীদেহে এই ধীর বদল ঘটে মূলত প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেবার তাগিদে। তখনও নতুন প্রজাতির উদ্ভব তার কারণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা তাঁর মাথা আসে নি।
 
গ্যালাপ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জে চার্লস ডারউইন
চার বছর ধরে অভিযানের পর ক্যাপ্টেন ফিজরয় কিছুটা অধৈর্য হয়ে পড়েছিলেন। অবশ্য অধৈর্য হওয়ারই কথা। কারণ বাইবেলে সপক্ষে তিনি কোন ভূতাত্ত্বিক তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন নি। এদিকে ডারউইনের মধ্যে যে নবচেতনার জন্ম নিয়েছিল তা নিঃসন্দেহে বাইবেলবিরোধী। ডারউইন যখন জাহাজে চাপেন তখন কিন্তু তিনি বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্বেই বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু একদিকে চার্লস লিয়েলের বই তাঁর মধ্যে এক নবচেতনার জন্ম দিয়েছিল এবং অন্যদিকে ভূতাত্ত্বিক তথ্য তাঁর মানসিকতাকে বাইবেল থেকে সরিয়ে এনে প্রকৃত বিজ্ঞানসাধকের স্তরে নিয়ে গিয়েছিল যেখানে কোন ধরণের পূর্বানুমান এই সাধনার ক্ষেত্রে অবাঞ্ছনীয় হিসেবে প্রতিভাত। তাই ফিজরয়ের সঙ্গে তাঁর বাক্যালাপ হতো খুবই কম তাছাড়া ফিজরয় ছিলেন দাসত্ব প্রথায় বিশ্বাসী যা ডারউইন একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না। এই নিয়ে ফিজরয়ের সঙ্গে তাঁর বচসাও হয়েছিল। পরে অবশ্য তিনি ফিজরয়কে তাঁর বক্তব্য যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পেরেছিলেন। সে যাই হোক মানসিক স্তরে ফিজরয়ের সঙ্গে তাঁর মেরুসাদৃশ্য ব্যবধান থাকায় তিনি একাকী হয়ে পড়েছিলেন। ডারউইনের এই একাকীত্বই তাঁকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষেত্রে সহায়তা করেছিল।
চার বছর পর এই অভিযানের শেষ লগ্নে ফিজরয় দক্ষিণ আমেরিকা থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে পাড়ি দেবার সিদ্ধান্ত নেন। ১৮৩৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ডারউইন বিকেলের দিকে দিগন্তের স্থলভাগে একটি ক্ষুদ্র বিন্দু দেখতে পান। এই দ্বীপটি ছিল গ্যালাপ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জের কোন একটি দ্বীপ, যেখানের প্রাণীসংগ্রহ তাঁকে ভবিষ্যতে নতুন প্রজাতির উৎপত্তি সম্পর্কে পথ দেখিয়েছিল। আফ্রিকার আটশো কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে তিনি এক অসীমকালের সন্ধান পেয়েছিলেন। এবারে দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর-পশ্চিমে আরেক দ্বীপপুঞ্জে তিনি তাঁর ক্রমবিকাশতত্ত্বের ভিত্তি খুঁজে পেলেন। মূলত ডারউইনের জন্যই এই গ্যালাপ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জ আজ সারা পৃথিবীর অভিযাত্রীদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে পড়েছে। বর্তমানে গ্যালাপ্যাগোসে নির্মিত চার্লস ডারউইন রিসার্চ সেন্টারে অভিযাত্রীদের ভিড় লেগেই থাকে সারা বছর।
গ্যালাপ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে বড় দ্বীপটির নাম ছিল আর্লবেমার্ল তবে বর্তমানে এই দ্বীপটির নাম পাল্টে হয়েছে ইসাবেলা স্পেনের রাণী ইসাবেলার নামেই এই দ্বীপটির বর্তমান নামকরণ। এই ইসাবেলা দ্বীপটির আয়তন হলো প্রায় ৪৬৪০ বর্গ কিলোমিটার। তবে গ্যালাপ্যাগোসে সবকটি দ্বীপের আয়তন হবে মোট আট হাজার বর্গ কিলোমিটারের মতো। সাঁও তিয়াগোর মতো এই দ্বীপগুলোও আসলে আগ্নেয়গিরির লাভা থেকেই সৃষ্ট।
গ্যালাপ্যাগোসের দ্বীপগুলোর উদ্ভিদের প্রায় চল্লিশ শতাংশই সম্পূর্ণ স্থানীয় যা অন্যত্র দেখা যায় না। পেয়ারা জাতীয় গাছের জঙ্গল, ক্যাকটাস, সেই সঙ্গে ঝোপঝাড়ের সমাবেশ ঘাসজমির বিস্তারে এখানকার প্রকৃতি অনেকটাই ভিন্ন। এই পরিবেশে প্রাণীগুলোর মধ্যে বৈচিত্র্য অতি সামান্য। তবে কম বৈচিত্র্যের মধ্যেও বেশকিছু অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করেছিলেন ডারউইন। যেমন দৈত্যকায় কচ্ছপ, বিরাট ইগুয়ানা যা এককালে স্থলচর ছিল এখানে এসে জলচর হয়েছে। স্প্যানিশ ভাষায় দৈত্যাকার কচ্ছপকে বলা হয় ‘Galapagos’ এবং এই নামেই দ্বীপগুলোর পরিচয়। একেকটা দ্বীপের কচ্ছপ একেক রকম এবং মজার কথা হলো সুকুমার রায়ের গোঁফ দিয়ে মানুষ চেনার মতো স্থানীয় লোকেরা কচ্ছপ দিয়েই দ্বীপগুলোকে শনাক্ত করতেন। যে দ্বীপগুলো মোটামোটি জলসিক্ত সেখানে ঝোপঝাড় খেয়ে কচ্ছপগুলো বেঁচেবর্তে আছে। কিন্তু যে শুকনো দ্বীপগুলোতে ঝোপঝাড় নেই সেখানে কচ্ছপগুলোর গলা লম্বা হয়ে গেছে যাতে ক্যাকটাস সহ অন্য গাছগুলোর পাতা খেয়ে বাঁচতে পারে। ব্রাজিলের ডুবুরি পাখি করমোরেন্ট যা দীর্ঘ ডানা মেলে উড়তে পারে, এখানে এসে উড়ানশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। গ্যালাপ্যাগোসে খাদ্য নিয়ে লড়াই নেই, তাছাড়া কোন প্রাণীই অন্যটির খাদ্য নয়, তাই এই শত্রুহীন পরিবেশে প্রাণীগুলো তাদের আত্মরক্ষার প্রত্যঙ্গগুলো হারিয়ে ফেলেছে।
গ্যালাপ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জ থেকে ডারউইন বিভিন্ন প্রজাতির নমুনা সংগ্রহ করে ইংল্যান্ডে নিয়ে যান। এই সংগ্রহগুলোর মধ্যে বিশেষত ফিঞ্চ পাখি (Finch), কিছু নকলনবিশ পাখি (Mocking Bird) বেশ কিছু দৈত্যকায় কচ্ছপ তাঁর নতুন প্রজাতির উদ্ভব’-এর সূত্র আবিষ্কারে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন