.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

মঙ্গলবার, ২৬ জুলাই, ২০১৬

প্রজাতির উৎস সন্ধানে (চতুর্থ পর্ব)


।। রজত কান্তি দাস।।

(C)Iamge:ছবি

ডারউইনের সমুদ্রযাত্রা ও পৃথিবীর প্রাচীনত্বের সন্ধান
HMS Beagle নামের জাহাজটির বর্ণনা দেবার পরিসর এখানে নেই। তবে সংক্ষেপে বলতে গেলে বিগলের অর্থ হলো এক ধরণের ছোটখাটো শিকারি কুকুর। দু-তলা জাহাজটি শিকারি কুকুরের মতোই দুর্গম অজানা লক্ষ্যের পথে বেরিয়ে পড়েছিল। জাহাজটিতে একটি বড়সড় লাইব্রেরি ছিল। তবে ডারউইন নিজেও বেশ কিছু বই সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। এই বইগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল চার্লস লিয়েলের ভূবিদ্যার মূলতত্ত্ববইটির প্রথম খণ্ড। দ্বিতীয় খণ্ড তখনও বেরোয়নি। ডারউইনের বন্ধু প্রাচীনপন্থী হেন্সলো এই বইটি ডারউইনের হাতে দিয়ে বলেছিলেন তিনিও যেন এই বইটি ভাল করে পড়েন এবং এর কোন বক্তব্যকে যেন বিশ্বাস না করেন। বইটি দেবার আসল কারণ ছিল হেন্সলো চেয়েছিলেন ডারউইন যেন ভূতাত্ত্বিক তথ্য সংগ্রহ করে বইটির বক্তব্যকে খারিজ করে দেন। হেন্সলো যা চেয়েছিলেন বাস্তবে তার উল্টোটাই হয়েছিল।
বিবর্তনবাদের আবিষ্কার করতে গেলে প্রথমে দুটো জিনিসের প্রয়োজন ছিল। এক হলো ছহাজার বছরের সীমিত সময়ের ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে এক অনন্ত সময়ের ধারণা করা যা বাইবেল বিরোধী। এছাড়া বাইবেলের প্রলয়বাদকে খারিজ করে দেওয়া যা হলো ঈশ্বর কিছুদিন পরপর সমগ্র প্রাণিজগতসহ সবকিছুকে ধ্বংস করে দিয়ে আবার নতুন করে সবকিছু সৃষ্টি করেন। এই ধারণা নিয়ে কোটি কোটি বছর ধরে চলতে থাকা অবিরাম বিবর্তনের জন্ম দেওয়া যায় না। আজ আমরা জানি যে এই পৃথিবীর জন্ম হয়েছিল প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে এবং পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টিকারী DNA (Dioxyribo Nucleic Acid) সৃষ্টি হয়েছিল আনুমানিক ৩৫০ কোটি বছর আগে। কিন্তু ঐ সময়ে এতটা সময়ের ধারণা করা সম্ভব না হলেও এটা কল্পনা করা জরুরি ছিল যে বহু প্রাচীনকাল থেকে ক্রমান্বয়ে চলতে থাকা পরিবর্তনের ফলে এই পৃথিবীর ভূস্তর ও প্রাণিজগতের উদ্ভব ঘটেছে। এই প্রাচীনত্ব ছাড়াও প্রলয়বাদকে খারিজ করে দিয়ে শান্তভাবে ক্রমবিকাশের ধারণা করাটাও জরুরি ছিল। লিয়েল তাঁর বইয়ে ঠিক এই ধারণাই দিয়েছিলেন, সেই সঙ্গে এর সপক্ষে যথেষ্ট প্রমাণও দাখিল করেছিলেন। ডারউইন তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, লিয়েলের ভূবিদ্যার মূলতত্ত্ববইটি পড়লে যেন মনের সুরটি বদলে যায় এবং সেই সঙ্গে দৃষ্টি বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়। তাই লিয়েল যা লিখেন নি তাও তিনি দেখতে পেয়েছিলেন লিয়েলের চোখ দিয়েই। লিয়েল তাঁকে এমন এক দৃষ্টিপ্রদান করেছিলেন যা তার পরবর্তী জীবনের সমগ্র ভাবধারাকেই পাল্টে দিয়েছিল। অভিযান শেষ করে দেশে ফিরে আসার পর ডারউইনের সঙ্গে চার্লস লিয়েলের প্রগাড় বন্ধুত্ব হয়ে যায় কারণ দুজনের মন ছিল একই সুরে বাঁধা।
সমুদ্র পরিক্রমায় বেরিয়ে প্রথমদিকে সামুদ্রিক তাণ্ডব ঝড়ে পড়েছিল পড়েছিল বিগল জাহাজ। তবে ফিজরয়ের জাহাজি অভিজ্ঞতায় সে যাত্রা রক্ষা পেয়েছিলেন সবাই। তারপর মোটামোটি সাবলীলভাবেই এগিয়েছিল জাহাজটি। প্রথমে অ্যাজোরেস দ্বীপ দেখার পর আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিমে প্রায় মধ্য আটলান্টিকের একটি নগণ্য দ্বীপ পর্যবেক্ষণ করার পরই ডারউইনের এক বিশাল অনুভূতি হয়। যাকে অনায়াসেই বলা যেতে পারে তাঁর জীবনের সন্ধিক্ষণ। এই দ্বিতীয় দ্বীপটি ছিল সাঁউতিয়াগো যা কেপভার্দে দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত। এই দ্বীপটির দিকে যখন জাহাজটি এগিয়ে যাচ্ছিল তখন ডারউইন জাহাজ থেকেই জলের উপর মাথা তুলে দাঁড়ানো দ্বীপটিতে জল থেকে প্রায় পঁয়তাল্লিশ ফুট উঁচুতে একটি সাদা ফিতের মতো রেখা দেখতে পান। ডারউইনের কৌতূহল হলো এই সাদা রঙের ফিতের মতো ভূস্তরের রহস্য জানতে। আগের ভূতাত্ত্বিক জ্ঞান ও বুদ্ধিদীপ্ত মনন থেকে তাঁর বুঝতে কষ্ট হয় নি যে এই সাদা রঙের চুনা পাথরের স্তরের উপাদান হলো কম্বোজ (Mollusk) জাতীয় সামুদ্রিক প্রাণীর পরিত্যক্ত প্রস্তরীভূত বহির্কঙ্কাল বা খোলস যা বহুকাল ধরে সমুদ্রে জমা হয়েছিল। পরে লাভাস্রোতের বিস্তার খোলসের স্তরকে চুনপোড়া কঠিন পাথরে পরিণত করে। তিনি সমীক্ষা করে দেখলেন যে এই দ্বীপটি মূলত গঠিত হয়েছে সমুদ্রের তলদেশে আগ্নেয়গিরির লাভার উচ্ছ্বাসের ফলে। ধীরে ধীরে ভূকম্পের ফলে পাহাড়টি মাথা চাড়া দিয়ে জলের উপরে উঠে দ্বীপের সৃষ্টি করেছে।
ডারউইন বুঝতে পারলেন যে লাভার উচ্ছ্বাস, দ্বীপডুবি, উত্তোলন ও সেই সঙ্গে সামুদ্রিক প্রাণীর বদল হওয়া মাত্র ছহাজার বছরে সম্ভব নয়। গোটা ব্যাপারটা খুব খুব প্রাচীনকাল থেকেই ধীর লয়ে ও অবিচলভাবে ঘটেছে যে ভাবে লিয়েল লিখেছেন তাঁর বইয়ে। পরে অন্যত্র ভূসমীক্ষার ফলে তিনি মহাকাল সম্পর্কে নিঃসংশয় হয়েছিলেন। এই মহাকালের সন্ধান ও ধীর গতিতে অবিচলভাবে চলতে থাকা এক পৃথিবীর ধারণাই তাঁর ক্রমবিকাশতত্ত্বের আবিষ্কারে সহায়ক ভূমিকা নিয়েছিল। তবে নতুন প্রজাতি উদ্ভবের আবিষ্কারের জন্য তখনও অনেকটা পথ পরিক্রমণ করা বাকি ছিল তাঁর।

ডারউইনের দক্ষিণ আমেরিকায় প্রবালদ্বীপ পর্যবেক্ষণ
দক্ষিণ আমেরিকায় পৌঁছানোর পর সেখানকার বিশাল ও বিস্তৃত ভূখণ্ড দেখে ডারউইন অবাক হয়ে যান। একই ধরণের ভূখণ্ডের এত বিশাল বিস্তার একজন ইংল্যান্ডবাসীকে অভিভূত করারই কথা। কারণ ইংল্যান্ডে এ জিনিস দেখা যায় না। একই ভূস্তরের পাঁচশো থেকে ছশো মাইলের বিস্তার। কোনরূপ বদলের চিহ্ন নেই। ডারউইন চিলি থেকে পেরু পর্যন্ত বিস্তৃত অ্যান্ডেজ পর্বতমালার সমীক্ষা করেন। এই সমীক্ষা করে তিনি বুঝতে পারলেন যে বহুকালব্যাপী ধিকিধিকি লাভার উচ্ছ্বাসের ফলেই এই পাহাড়শ্রেণীর সৃষ্টি হয়েছে। এত বিশাল ভূখণ্ডের সমীক্ষা করতে গিয়ে তিনি সেই সময়ের নিরিখে মোটের উপর সঠিক ধারণাই করেছিলেন। কারণ তখনও আধুনিক প্লেট টেকটনিক্সের প্রক্রিয়া আবিষ্কৃত হয় নি।
এরপর বিগল জাহাজটি যখন প্রশান্ত মহাসাগরে পাড়ি দিচ্ছিল তখন ডারউইন টাহিটি দ্বীপের কাছে সমতল পাহাড়বিহীন গোল চাকার বেড়ের মতো ছোট ছোট দ্বীপ দেখতে পান। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এগুলো হচ্ছে প্রবাল দ্বীপ। এছাড়া তিনি ভারত মহাসাগরের কোকস ও রিইউনিয়াম দ্বীপ দুটিতেও গিয়েছিলেন যেগুলো প্রবালদ্বীপ। ডারউইন বুঝতে পেরেছিলেন এই দ্বীপগুলো অসংখ্য ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রবাল ও অন্যান্য সামুদ্রিক জীবের পাথুরে কঙ্কালের ধ্বংসাবশেষ থেকে সৃষ্টি হয়েছে বহুকালব্যাপী সময়ে। প্রবাল কীটের সূর্যের আলো ও তাপের প্রয়োজন হয় তাই প্রাণীগুলি গভীর জলে থাকতে না পেরে অগভীর সমুদ্রতটে আশ্রয় নেয়। এই সব দ্বীপ কোন কারণে জলের তলায় ডুবে যাওয়ার কারণে উপরের স্তরে প্রবালের স্তর জমতে থাকে। পরে ভূকম্পনের ফলে ধীরে ধীরে সমুদ্রের উপর মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। এই প্রবালের স্তর যে কতটা গভীর ডারউইন তা আন্দাজ করতে পারেন নি।
ডারউইনের খুব ইচ্ছে ছিল কোন এক ধনকুবের যদি এ ধরণের প্রবাল দ্বীপে ড্রিলিং করে এর ভিত্তি প্রস্তর শনাক্ত করেন তাহলে বিজ্ঞানের খুব উপকার হয়। এ রকম ধনকুবেরের সন্ধান পাওয়া যায়নি বটে তবে তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পর ১৯৫২ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র সরকার হাইড্রোজেন বোমা পরীক্ষার জন্য এরকমই একটি প্রবাল দ্বীপের ভূস্তর সমীক্ষার জন্য ড্রিলিং করে। এই দ্বীপটি ছিল প্রশান্ত মহাসাগরেরে এনিয়েটক দ্বীপ যা হলো এক ধরণের অটল। এই ড্রিলিং-এ দেখা যায় প্রবালের স্তর চার হাজার ফুট পর্যন্ত গভীর। প্রায় ছয় কোটি বছরে এই প্রবালের স্তর জমা হয়েছে। ডারউইনের পক্ষে এতটা গভীরতা আন্দাজ করা সম্ভব ছিল না।
চার্লস লিয়েল তাঁর বইয়ে এই কথাটি বলেছিলেন যে মানুষসহ সমগ্র প্রাণিজগৎ ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ড যদি মাত্র ছয় দিনে সৃষ্টি হয়ে থাকে তাহলে পৃথিবীর প্রাচীন ভূস্তরের মধ্যে মনুষ্যসৃষ্ট কোন উপাদান পাওয়া যায় না কেন। ডারউইনও একটা কথা বুঝতে পেরেছিলেন যে শুরু থেকেই এই ভূপৃষ্ঠে মানুষের অস্তিত্ব ছিল না। একটা সময়ের পরই মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে। তবে প্রাণিদেহের অভিযোজনের কথা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যখন তিনি বৈচিত্র্যময় প্রাণিজগতের সন্ধান পান।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন