“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২০

করোনার আরো এক দিক

।। অভিজিৎ দাস।।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশিত তথ্য অনুসারে প্রত্যেক বছর আট লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকে আত্মহত্যার মাধ্যমে । যার অধিকাংশই উপযুক্ত চিকিৎসা ও সামাজিক সহায়তার মাধ্যমে রোধ করা সম্ভবপর ছিল । প্রতি চল্লিশ সেকেন্ডে সে সকল মানুষ আত্মহত্যা করছেন তাদেরকেও বাঁচানো সম্ভব ।

শিশু ও তরুণদের যে সমস্ত কারণে মৃত্যু হয়ে থাকে তার মধ্যে দ্বিতীয় প্রধান কারণ হচ্ছে তাদের আত্মঘাতী হওয়া । আর আত্মহত্যার মুখ্য কারণ হচ্ছে মানসিক অসুস্থতা ।
যে মারাত্মক মানসিক অসুস্থতাটি বেশি দেখা যায় সেটি হচ্ছে, ডিপ্রেশন । বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ২৭ কোটি মানুষ ডিপ্রেশনের শিকার । ২৭ কোটি মানুষ । ডিপ্রেশন ছোঁয়াচে নয় বলেই শুধু মহামারীর তকমা পায়নি হয়ত ।

ডিপ্রেশন যে একটা মারাত্মক ব্যাধি - এ বিষয়ে সচেতনতা রয়েছে আমাদের দেশের খুব কম সংখ্যক মানুষেরই । ডিপ্রেশন বলতে এরা বোঝেন মন খারাপ । এমনকি নামজাদা কবিরাও নিজের কবিতার পঙক্তিতে লেখেন, "ডিপ্রেশনের বাংলা জানি মনখারাপ" । আর এমন অনেকই আছেন যারা জানেন ডিপ্রেশন ঠিক কতটা মারাত্মক ও দুঃসহ, তবু বলেন, ওসব কিস্যু না । এটা করলে সেরে যাবে, ওটা করলেই সেরে যাবে । সত্যি বুঝিনা নিজের অনভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে এইসব টক্সিক কথা না ঝাড়লে যে কি এমন মহাভারত অসুদ্ধ হয় । এইকরম কথা যে অসুস্থতাটা আরও বাড়িয়ে দেয় সেটা এরা কিছুতেই বোঝেনা ।

মোট আত্মহত্যার ৭৬ % হয়ে থাকে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে । ভারতবর্ষ এর আদর্শ উদাহরণ । আমাদের দেশে এক লক্ষ পঁয়ত্রিশ হাজার মানুষ প্রতি বছর আত্মহত্যা করেন, অর্থাৎ মোট সংখ্যার ১৭ শতাংশই ভারতে । এর একটা বড় অংশ সেইসব মহিলারা যারা পারিবারিক হিংসার শিকার । সেইসব কৃষকরাও আছেন যারা রাষ্ট্রের অবহেলার ফলে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন ।

কিন্তু এছাড়াও একটা বড় অংশের মানুষ রয়েছেন যারা নানান মানসিক ব্যাধিতে ভোগেন, অবশেষে শেষ পরিণতি হিসেবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পরেন, কিন্তু চিকিৎসার পথে যান না । আসলে অনেকেই বুঝতে পারেননা যে তিনি কোন মানসিক ব্যাধিতে ভুগছেন । আর নিজে বুঝলেও কাছের মানুষদের অবহেলার কারণে সেই অসুস্থতা আর কোনদিনই সারে না । ফুরিয়ে যায় জীবন । উচ্চআয়ের দেশগুলোতে বেশি, ফলে আত্মহত্যার হার কম । তাছাড়া প্রাণঘাতী কীটনাশক নিষিদ্ধ করার ফলেও অনেকটা ফারাক এসেছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারনা ।

তাই আসুন এবার জেনে নিই ডিপ্রেশন নামের মানসিক ব্যাধিটির কিছু লক্ষণ ও প্রতিকার । তার আগে বলে রাখি, কারো ডিপ্রেশন কিনা তা ব্লগপোস্ট পড়ে নির্ণয় করা সম্ভব নয় । নির্ণয় একমাত্র মেন্টাল হেলথ প্রফেশনালরাই করতে পারেন, উপযুক্ত পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে । বা আমি যা বলতে চলেছি সেগুলোই যে ডিপ্রেশনের একমাত্র লক্ষণ ও প্রতিকার তা একদমই নয় । শুধু একটা প্রাথমিক ধারনা হিসেবেই জানবেন । বাকিটা সাইকিয়াত্রিস্ট বা সাইকলজিস্টরাই বলতে পারেন ।

১। অবিরত দুঃখের অনুভূতি, দুশ্চিন্তা, সবকিছুই অর্থহীন মনে হওয়া ।

২। আশাহীন হয়ে যাওয়া । ডিপ্রেশন গ্রস্ত ব্যাক্তিরা কিছুতেই কোন আশা খুঁজে পাননা ।

৩। একটা অপরাধবোধ কাজ করে, নিজেকে মূল্যহীন অথবা অসহায় ভাবতে শুরু করেন ডিপ্রেশনের রোগীরা ।

৪। একসময় যা ভাল লাগতো তাও আর ভাল লাগেনা ।

৫। মনোযোগ কমে যায়, স্মৃতিশক্তিও । সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন ।

৬। ঘুম হয় কমে যাবে, নাহয় বেড়ে যাবে ।

৭। মেজাজ চিরচিরে হয়ে যায় ।

আট । সব থেকে মারাত্মক লক্ষণ হচ্ছে আত্মহত্যার ভাবনা মাথায় আসবে, আত্মনিধনের চেষ্টাও করতে পারেন ।

এগুলো হচ্ছে ডিপ্রেশন নামক দানবীয় অসুখের লক্ষণ । এবার প্রশ্ন হচ্ছে কেন হয় ? ডিপ্রেশনের একটা নির্দিষ্ট কারণ নির্ণয় করা সম্ভব নয় । অনেকসময় অনেকগুলো কারণের জটিল সমন্বয়েও ডিপ্রেশন হয়ে থাকে ।
পরিজনদের সহায়তা ও সঠিক চিকিৎসাই ডিপ্রেশন থেকে রেহাই পাবার উপায় ।

আপনি যদি আপনার কাছের কোন মানুষের মধ্যে এরূপ আচরণ দেখেন, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের সাহায্য নেবেন । নিজে নিজে থেরাপি দেয়ার চেষ্টা করবেন না, কখনো বলবেন না, ও কিচ্ছু নয়, ডিপ্রেশন কোন রোগই নয়, এটা করলে সেরে যাবে, ওটা করলে সেরে যাবে... প্লিজ এরকম ওস্তাদি করার অর্থ হচ্ছে তাকে মৃত্যুর দিকে আরও একটু স্বেচ্ছায় ঠেলে দেয়া ।

করোনা মহামারী রুখতে ভারতবর্ষ ও সারা বিশ্ব জুড়েই যে লকডাউনের পথ বেছে নেয়া হয়েছে তার ফলে করোনাকে অনেকটা রুখা গেলেও অর্থনৈতিক মন্দা আসবেই । এমনিতেই ভারত বর্ষের অধিকাংশ মানুষের আয় দশ হাজারের কম, ফলে এই অর্থনৈতিক মন্দা জনজীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে চলেছে । মানসিক অসুস্থদের আরও অসুস্থ হয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, হতে পারে করোনা সংক্রমণের চেয়ে করোনা কর্তৃক সৃষ্ট মানসিক চাপই অধিক মানুষের মৃত্যুর কারণ হবে । জর্মনির হেশেঁ প্রদেশের অর্থমন্ত্রী টমাস শেফার গত ২৮ মার্চ ২০২০ খ্রিস্টাব্দে আত্মহত্যা করেন করোনা সংক্রমণের ফলে হওয়া অর্থনৈতিক বিদ্ধস্ততার রূপ দেখে হতাশ হয়ে ।

অর্থনৈতিক মন্দার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা বছর পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে । ফলে মাতাপিতারা নিজের সন্তানদের পাশে থাকবেন । বিচলিত হতে দেবেননা । মানসিক অসুস্থতাকে উপেক্ষা না করে আর দশটা অসুখের মতই প্রতিরোধ করুন ও অন্যদের করতে সাহায্য করুন ।

কোন মন্তব্য নেই: