.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

মঙ্গলবার, ১৭ মে, ২০১৬

বরাক, তোমাকে



























।। শিবানী দে।।

রাক, তোমার সঙ্গে প্রথম দেখা সেই কতকাল আগে।
মা পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল তোমার সাথে ।
দ্যাখ, দ্যাখ, বরাকনদী পার  হচ্ছি বদরপুর ঘাটে”-----
চেয়ে দেখি লোহার রেলিং পেরোচ্ছে ছুটে,
নিচে তুমি বয়ে যাচ্ছ  শান্ত নিবিড় স্রোতে
সন্ধ্যার নীলাভ লাল  আভা মাখা মায়াবী সংরাগে ।
মায়ের  মুখের  মৃদু হাসি
মিশে গেছে  নদীর  বুকের আলোর সোহাগে ।

বরাক, তোমার সঙ্গে আমার নাড়ির বাঁধন-সূত্র
সেই মায়ের করানো পরিচয় ,
সে কি কখনো আর ছিন্ন হয়  ?
 চোখে লেগে আছে  সে মুগ্ধ দেখা তখন অবধি ।
আরো তো দেখেছি কত নদী,
 ব্রহ্মপুত্র, গোদাবরী, কাবেরী, কৃষ্ণা  গঙ্গা যমুনা----
বরাক, তোমার মত আর  দেখলাম  না ।
দুধারের পাড় উঁচু হতে হতে মিশে যায়  সবুজে,
সবুজ ঘনসবুজ ঘননীল হয়ে মিলায় নীলের মাঝে,
এপারে পাঁচগ্রামের পাহাড়, ওপারে জয়ন্তিয়া,
 ধ্যানমগ্ন সিদ্ধেশ্বর মাঝখানে ।
অস্তের দিকে মুখ করে চলে যায় কালো ছবির খেয়া
গান ভেসে আসে ভাটিয়ালির তানে ।

কোন দূর নাগাপাহাড়ের অন্তর থেকে কলস্বনা বালা,
মণিপুর মিজোরামের কিশোরী চঞ্চলা ,
এ বাঁকে রোদে ঝলমলিয়ে খিলখিলানো সুখ,
ও বাঁকে বৃষ্টির ওড়নায়  ঢাকো মুখ ।
ওপারে যদি শান্তি নিরিবিলি সুপুরি-কলা বনে
এপারে ক্ষেতে তৃপ্তির হাওয়া ঢেউ খেলে যায় ধানে।
এবাঁক থেকে ও বাঁকে  লুকোচুরি খেলতে খেলতে,
কত নদীকিশোরীর সঙ্গে মিলতে মিলতে,
ভরেছ নিজেকে যৌবনে,
চলেছ ভালবাসা ছড়িয়ে দিতে দিতে 
সীমান্ত তোমায় ধরে রাখতে পারেনি বন্ধনে ।

বরাক, তোমার পারে পারে নানা জনজাতির বাস,
কৌলীন্যের কল্কে তাদের দেয়নি ইতিহাস,
তোমার পারে লেখা হয়নি কোনও  বেদ, বেদান্ত, রামায়ণ,
লড়া হয়নি কোনও  কারবালার রণ ।
কিন্তু  মাতৃভাষা কেড়েনেওয়া অত্যাচারের প্রতিবাদে
মন্দ্রিত  হয়েছিল তোমার  আকাশ বাতাস ।
তোমার নরম  রূপের ভেতরেও লুকিয়ে আছে আগুন,
জগৎ পেয়েছিল তার  তীব্র আভাস ।
এগারো শহীদের রক্ত মিশে গিয়েছিল তোমার উপত্যকায়,
তোমার জলে জননীদের অশ্রুতর্পণ, হায় ।
আজও সেই প্রতিবাদীরা  উপেক্ষিত সাজানো ইতিহাসের ছিন্নপত্রে,
অচিহ্নিত সেই স্থান ভূগোলের খেয়ালি  মানচিত্রে ।
তোমার নাম নেই সাঙ্ঘাতিক কোন ইতিহাস ভূগোলের পাতায়,
থারমোপলি, হলদিঘাট, শরাইঘাটের তালিকায়,
তাদের আগুন থেকে তোমার আগুন নয় ঊন প্রতিভাস ।
তবুও হায়, তোমার অকুলীন ইতিহাস !

বরাক, সেই আগুন কি নিভে গেছে ?
তোমার বন্যার পলির নিচে, কচুরিপানার পাঁকের তলায়
তার পরিণতি জীবাশ্মের প্রায় ?
শহীদের রক্ত তোমাকে আরো দুবার দিয়ে গেছে নাড়া,
তবু আজ তোমার মুখের বুলি ভেসেছে আবিলতায় ।
ভেঙ্গে দিচ্ছে মেরুদণ্ড কত ছলে, কত অত্যাচার।
তুমি কি মেনে গেছ হার ?
নাহলে আজ রাস্তার মোড়ে, কার্যালয়ে, স্টেশনে,
অন্যভাষার আবর্জনা বিজ্ঞাপনে, শিশুদের বইয়ের পাতায়,
বিকানো আত্মসম্মানের প্রতিবাদের নেই কোনো দায় ।

হার মেনোনা, বরাক, তুমি হার মেনোনামিনতি করি,
অশ্রু জমাট বেঁধে হোক হীরকের তরবারি।
তোমার দীর্ঘশ্বাস আগুন-গিরির মত যেন  লাভা গলায়,
উৎসর্গিত প্রাণের লড়াই  বৃথা না যায় ।
তোমার মত বহমান আবহমান কালের মাতৃভাষা,
তারি কল্লোলে বাজুক আমাদের গর্ব-আশা ।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন