.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

বৃহস্পতিবার, ৩১ মার্চ, ২০১৬

ডঃ হরিশংকর জলদাসের সাথে বরাকের 'জলপুত্র'দের মতবিনিময়



।।শৈলেন দাস।।
আসাম বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত এক সেমিনারে অংশগ্রহণ করতে গত ২৯মার্চ শিলচর এসেছিলেন বাংলাদেশের খ্যাতনামা উপন্যাসিক তথা গবেষক কৈবর্ত সুসন্তান ড: হরিশঙ্কর জলদাস। নিজের জাতি পরিচয়ে গর্বিত আপনজন বরাক উপত্যকায় এসেছেন শুনে ৩০মার্চ বুধবার সন্ধ্যায় 'কৈবর্ত উন্নয়ন মঞ্চ' এবং 'প্রতাপ' সাহিত্য গোষ্ঠীর কর্মকর্তারা একান্তে সাক্ষাৎ করেন তাঁর সাথে। বরাকের মাটিতে আপনজনদের কাছে পেয়ে আবেগে অভিভূত এই 'জলপুত্র' জানতে চান কেমন আছে এই উপত্যকার কৈবর্ত সমাজ? প্রায় এক ঘণ্টার আলাপচারিতায় উঠে আসে নানা প্রসঙ্গ। বরাক উপত্যকায় কৈবর্ত সমাজের অভ্যন্তরীণ রীতিনীতি, আচার অনুষ্ঠান পালন, সামজিক সংস্কার ইত্যাদির সাথে বাংলাদেশের কৈবর্ত সমাজের মিল কতটুকু বা ফারাকইবা কোন জায়গায়, এই বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা হয়। বরাক উপত্যকায় সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে কৈবর্ত সমাজ কতদূর এগিয়েছে, হাজার বছরের বঞ্চনার ইতিহাস কি এই উপত্যকাতেও তাড়া করে কৈবর্ত সমাজকে নাকি কোন প্রকার প্রতিকূলতা ছাড়াই নিজস্ব জৌলুস এর গুণে কৈবর্ত সন্তানরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে গৌরবান্বিত করতে পারছেন কৈবর্ত সমাজের সার্বিক পরিচয়? বরাক উপত্যকায় কৈবর্ত সমাজের সামগ্রিক উত্তরণে প্রতিবন্ধকতা কোথায়? নিজেদের পরবর্তী প্রজন্মকে শিক্ষার আলোকে আলোকিত করতে অভিভাবকদের আগ্রহ বেড়েছে কি? এছাড়াও ভৌগলিকভাবে কৈবর্ত সমাজের অবস্থান বরাকের কোন কোন এলাকাজুড়ে, তিনি জানতে চান সবিস্তারে। কথা প্রসঙ্গে আসে বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বক্তৃতা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি যেখানে কৈবর্ত সমাজ কিভাবে যুগের পর যুগ ধরে বঞ্চনা আর অবহেলা সয়ে আসছে তা খুলাখুলি বিশ্লেষণ করেন তিনি।
বরাক উপত্যকায় আলাদাভাবে কৈবর্ত সমাজের সাথে বৈষম্য হবার মত নজির খুব কম, যেটুকু নজরে আসে কখনো সখনো তা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি বর্ণবাদীদের সেই চিরাচরিত বদভ্যাস মাত্র। ব্যক্তি বিশেষে কোন কৈবর্ত সন্তান এগিয়ে যেতে চাইলে সাহায্যের জন্য অনেকেই এগিয়ে আসেন। তবে সামগ্রিকভাবে এই উপত্যকায় কৈবর্ত সমাজ নানান অপবাদের ভারবাহক। শিক্ষার আলোবঞ্চিত শ্রেণী যখন অনাকাঙ্ক্ষিত ভূল করে বসে তখন প্রচারের আলোকে অতিমাত্রায় আলোকিত হয়ে উঠে তা। তাছাড়া সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে তাদের যেসব অভ্যন্তরীণ রীতিনীতি সংশোধিত হয়নি তাই মুখরোচক খুশগল্প হয়ে উঠে অন্যদের কাছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কৈবর্ত সমাজকে আটকে রাখা হয়েছে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে। মাঝে মাঝে দুয়েকজন কৈবর্ত সন্তানের ভাগ্যে 'অঙ্গরাজ্য' যদিওবা জুটে সঠিক সময়ে অদৃশ্য হাতের ইশারায় তাদের রথচক্র মেদিনী গ্রাস করে নেয়। ভোট রাজনীতিতে প্রার্থীর সাথে কৈবর্ত শব্দ জুড়ে গেলে নিশ্চিতভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই সেই প্রার্থীর দশ শতাংশ ভোট মাইনাস। তাছাড়া বাংলাদেশের মত এই উপত্যকার শিক্ষিত কৈবর্ত শ্রেণীও বঞ্চনা আর অবহেলা থেকে সহজে মুক্তি লাভের জন্য নিজেদের পদবী বদল করে আড়ালে চলে যাচ্ছে ফলে বরাকে কৈবর্ত সমাজের সামগ্রিক পরিচিতি নেতিবাচক, এজন্য তারা ধিক্কারের অধিকারী।
'নদীভিত্তিক বাংলা উপন্যাস ও কৈবর্তজনজীবন' নিয়ে গবেষণা করা গবেষক উপন্যাসিক ডঃ হরিশংকর জলদাস সময়ের স্বল্পতার জন্য ঘুরে দেখতে পারেননি প্রান্তিক জনজীবনের বাসভূমি, মিশতে পারেননি তাঁর আপনজনদের সাথে। বঙ্গভবনের অদূরে 'উত্তর পতেংগা' গ্রামের মতই বরাক নদীর পারে করাতিগ্রাম, শিমূলতলা এবং কালিবাড়িচরের মত কৈবর্ত অধ্যূষিত এলাকা রয়েছে জেনে তিনি আক্ষেপ করেন সেবিষয় কেউ তাঁকে অবগত করাননি বলে। তাছাড়া প্রদীপের নীচে অন্ধকারের মত আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিমাংশ জুড়ে বিস্তীর্ণ চাতলা হাওর, যেখানে কৈবর্ত সমাজের উপস্থিতি বিশাল সংখ্যায়, যাবতীয় উন্নয়ন বঞ্চিত শুনে তিনি চমকে উঠেন। এশিয়া খ্যাত শনবিল সহ বরাকের বিভিন্ন হাওর অঞ্চলগুলিতে কৈবর্ত সমাজের সংখ্যাধিক্য এবং সংঘবদ্ধ অবস্থান জেনে তিনি আগ্রহ প্রকাশ করে বলেন ভবিষ্যতে সুযোগ হলে হাতে সময় নিয়ে এসে ঘুরে যাবেন এইসব হাওর এলাকা। তাঁর গবেষণা পত্রে স্থান পাবে এই উপত্যকার কৈবর্ত সম্প্রদায় ও তাদের জীবনকথা।
বরাক উপত্যকার কৈবর্ত যুবপ্রজন্মের প্রতিনিধিরা অভিমানের সুরে জানায় তাঁর মত ব্যক্তিত্ব বরাক উপত্যকায় এসেছেন অথচ এই উপত্যকার কৈবর্ত সমাজের সাথে যোগাযোগ করা হয়নি। আগামী দিনে তিনি যদি আবার আসেন অথবা বাংলাদেশের অন্যকোন 'জলপুত্র' এই উপত্যকায় আসতে চান তবে যেন তাদের জানিয়ে আসেন। বরাকের কৈবর্ত সম্প্রদায় নিজেদের মত করে আপ্যায়ন করবে তাঁদের, সুযোগ করে দেবে যাতে তাঁরা বরাকের হাওর অঞ্চলগুলি এবং শহরসংলগ্ন জলাভূমিগুলি ঘুরে দেখতে পারেন, মিশে যেতে পারেন নিজেদের আপনজনদের সাথে।
গবেষক উপন্যাসিক ড: হরিশঙ্কর জলদাসকে উত্তরীয় দিয়ে বরণ করে তাঁর হাতে 'প্রতাপ' সমাজ ও সাহিত্য বিষয়ক পত্রিকার দুটি সংখ্যা তুলে দেয় যথাক্রমে শিক্ষক শৈলেন দাস, আইনজীবী সুবীর চন্দ্র দাস এবং শিক্ষানবিশ জয়মনি দাস। উল্লেখ্য যে বিশিষ্ট সমাজকর্মী তথা আইনজীবী ইমাদ উদ্দিন বুলবুল নিজ উদ্যোগে কৈবর্ত প্রতিনিধি দলকে গেস্ট হাউসে ড: হরিশঙ্কর জলদাসের সাথে দেখা করার সুযোগ করে দেন এবং আলাপচারিতার প্রথমে তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন