.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

শনিবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০১৫

আহোম সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা স্বর্গদেউ স্যু-কা-ফা


।। আশু পাল।।

        

      
   চীনের ইউনান প্রদেশে মেকং নদীর তীরে ম্যুং-হি-ম্যুং-হামনামে একটি অঞ্চল রয়েছে। কোন কোন ঐতিহাসিক একে ম্যুং-রি ম্যুং-রামনামেও অভিহিত করেছেন। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ইউনান, গুয়াং-জি, গুয়াং-ডুং, লাওস এবং ভিয়েতনামের উত্তরাঞ্চল এবং মায়ানমারের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল তাই (টাই) উপজাতির বিভিন্ন গোষ্ঠী। ছিল অনেকগুলো ছোট ছোট রাজ্য, এবং স্বাভাবিক ভাবেই তাদের মধ্যে খুব একটা সদ্ভাব ছিল না। প্রায়শই যুদ্ধ-বিগ্রহ লেগে থাকতো। এদেরই একটি ছিল বেশ কিছুটা শক্তিশালী। নাম ছিল ম্যুং-মাও। এই একই নামে এখনও ইউনান প্রদেশে একটি বেশ বড় এলাকা রয়েছে। ম্যুং-মাওয়ের শাসকেরা সৈন্যবলে মায়ানমারের অনেকখানি দখল করে নিজেদের রাজ্যভুক্ত করেছিলেন। ম্যুং-রি ম্যুং-রাম রাজ্যের এক রাজপুত্র ছিলেন চাও চাংয়েউ। তিনি অজানা কোন এক কারণে নিজ রাজ্য ত্যাগ করে ম্যুং-মাও রাজ্যে চলে আসেন। ম্যুং-মাওয়ের তৎকালীন রাজা পামেউপুং সাদরে চাংয়েউ-কে রাজবাড়িতে আশ্রয় দিয়ে তার সাথে নিজের বোনের বিয়ে দেন। ১১৯৭ সালে তাদের এক পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে। তিনিই স্যু-কা-ফা। 
         
         পামেউপুং ছিলেন অপুত্রক। তাই ভাগ্‌নে স্যু-কা-ফাকেই মনে মনে তার উত্তরসূরি ধরে নিয়ে রাজকার্য পরিচালনার শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেন। কিন্তু শেষ বয়সে পামেউপুঙের এক পুত্রের (স্যু-খ্যান-ফা) জন্ম হয়। বুদ্ধিমান স্যু-কা-ফা বুঝতে পারেন, তার আর ম্যুং-মাওয়ের রাজা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই ১২১৫ সালে, ১৮ বছর বয়সে, প্রবীণদের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি নতুন রাজ্যের খোঁজে পশ্চিম দিকে রওয়ানা দেন। অনেকের কাছেই তিনি শুনেছিলেন, দয় কাও রং (বর্তমান পাটকাই পর্বতশ্রেণী, যা ভারত ও মায়ানমারের সীমানা নির্ধারণ করে)পর্বতের পশ্চিম দিকে প্রচুর উর্বর সমতলভূমি রয়েছে, এবং ভাল ফসলও হয় সেখানে। টাই ভাষায় এই জায়গাকে বলা হতো ম্যুং-পা-কাম (ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা)। তার সঙ্গে পরামর্শদাতা, যোদ্ধা, কৃষক, কামার-কুমোর, চিকিৎসক, পুরোহিত ইত্যাদি পেশার লোকজনের সাথে সাধারণ নরনারী মিলিয়ে প্রায় নহাজার লোক এসেছিল। এই প্রব্রজন সময়কালে বিভিন্ন জায়গায় তিন মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় তারা অস্থায়ী ভাবে বসবাস করেন। প্রায় ১৩ বছরের যাত্রা শেষ করে ১২২৮ সালে সপারিষদ স্যু-কা-ফা পাটকাই ডিঙিয়ে ব্রহ্মপুত্রের সমতলে উপস্থিত হন।  
    

     সেই সময়েই নাগা, কাছাড়ি, মরাণ, ভূঞা, কামতাপুরী, চুটিয়া প্রভৃতি উপজাতীয় রাজারা ছোট ছোট রাজ্য শাসন করতেন। দূরদর্শী স্যু-কা-ফা নাগা ছাড়া অন্যদের সঙ্গে কোন রকম ঝামেলায় না গিয়ে বছর বছর বন্যার জলে ডোবা পতিত জমিগুলিতে গ্রাম পত্তন করতে শুরু করেন। একেকটি গ্রামে একেকজন অনুগামীকে দায়িত্ব দিয়ে তিনি বুড়ি দিহিং, দিসাং, দিখৌ প্রভৃতি নদীর অববাহিকা অঞ্চলে ঘোরাঘুরি করতে করতে বুড়ি দিহিং ও ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গমে হাবুং নামের গ্রাম প্রতিষ্ঠা করে, সেখানেই প্রথম অস্থায়ী রাজধানী স্থাপন করেন। কিন্তু বন্যার তাণ্ডব আর ব্রহ্মপুত্রের পাড় ভাঙনের ফলে অল্পদিনেই তিনি হাবুং ত্যাগ করতে বাধ্য হন। ব্রহ্মপুত্রের আরেক উপনদী দিখৌ নদীর উজানে গিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে চরাইদেউ সমতলভূমির হদিশ পান, এবং সেখানে রাজধানী স্থাপন করেন। সেটা ছিল ১২৫৩ সাল। ততদিনে বিভিন্ন গ্রামে তার অধীনস্থ রাজপুরুষেরা দায়িত্ব নিয়ে গ্রাম শাসন শুরু করে দিয়েছে। তা ছাড়া তার নিজেরও বয়স হয়েছে। তাই নতুন কোন বড় সিদ্ধান্ত না নিয়ে চরাইদেউ রাজবাড়িতে থেকেই তিনি নবপ্রতিষ্ঠিত রাজ্যকে শক্তিশালী করার কাজে মনোনিবেশ করেন। ১৬ বছর রাজত্ব করার পর একাত্তর বছর বয়সে স্যু-কা-ফা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার প্রতিষ্ঠিত এই রাজ্যের পরবর্তী রাজারা বিভিন্ন সময় রাজধানী গড়গাঁও (শিমূলগুড়ি-নাজিরা), রংপুর (শিবসাগর), যোরহাটে স্থানান্তর করে ১৮২৬ সাল পর্যন্ত আসাম শাসন করেন। সে বছরই আসাম ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।

        ২ ডিসেম্বর ছিল স্বর্গদেউ (মহারাজ) স্যু-কা-ফার জন্মদিন। আজকের দিনটি স্যু-কা-ফা দিবস বা আসাম দিবসহিসেবে এ রাজ্যে পালিত হয়। আসামের বহু জায়গায় রয়েছে তার বিভিন্ন কল্পিত ভঙ্গিমার প্রতিমূর্তি। আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর মুর্তিটি রয়েছে ডিব্রুগড়ের শহরতলি বরবরুয়া-র স্যু-কা-ফা ভবনের সামনে। আজ সেটাই আপনাদের জন্য তুলে দিলাম।





একটি মন্তব্য পোস্ট করুন