“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০
সুপ্রদীপ দত্তরায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সুপ্রদীপ দত্তরায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ৩ নভেম্বর, ২০১৯

ভোলে বাবা কি চেলা


ভোলে বাবা কি চেলা হমলোগ
শিবজী মহারাজ কি জয়
গর্বসে কহো হাম হিন্দু হ্যায় সব
ঝান্ডা উঁচা লেহরায়।
জয় বলো ভোলে নাথ কি জয়
কি বলো ভৃঙ্গী ভাইয়া জয়
কি বলো নন্দী ভাইয়া কি জয়।।

যানজটেতে ক্লান্ত শহর
ছড়িয়ে ছিটিয়ে কুষ্ট দাগ
মিছিল চলুক সদর্পেতে
আনন্দ হোক একশ ভাগ ।
একটি মূর্তি তিনটে ট্রাক
সবার আগে দশটি ঢাক
একটিতে মা যেমন তেমন
নেই যে উলু নেইকো শাঁখ।
মাঝের ট্রাকে জেনারেটর
শেষের ট্রাকেই আসল খেল্।
ডিজের আওয়াজ ঘূর্ণি আলোয়
একটু গো মা  হুইস্কি গেল্ ।
দাঁড়িয়ে পড়ুক গাড়ির সারি
যতই উঠুক বিরক্তি রাগ
মিছিল চলুক বীরদর্পে
আনন্দ হোক একশ ভাগ ।

এমব্যুলেন্সটা ভীষণ বোকা
ওটার এত তাড়া কিসের ?
দেখছে বাপু আসছে মিছিল
তবুও আবার ঘ্যানোর ঘ্যার।
একটুখানি সবুর করো
মিছিল তো আর থামছে না,
কষ্টেতে প্রাণ ওষ্ঠে এলেও
পেশেন্ট তো আর মরছে না ।
কি বলছিস আওয়াজ কম ?
বুকের ব্যেমো ? এইতো দম !
আনন্দে যে খরচ অনেক
জোরসে বল্ , ভোলে ব্যোম।
চলছে মিছিল গায়ের জোরে
রাস্তা জুড়ে সদর্পেতে
গিন্নী বাবু সামলে দাঁড়াও
জ্বলবে কাপড় পটকাতে ।
এই যে শালা একটু দাঁড়া
রাস্তা কি তোর বাপের বে
মিছলটাই যে আগে যাবে
সাধ্যি থাকে বাগরা দে।
মিছিল আমার মিছিল তোমার
মিছিল ঘিরেই ব্যস্ততা
মিছিল হচ্ছে স্ট্যাটাস সিম্বল
অর্থবলের সুস্থতা।
নাচরে বাবু নাচ্ সুশীলা
নাচছে বৌদি আর মাসীমা
দুপাশ জুড়ে হাভাগা সব
গিলছে দেহ, তুলছে দোলা ।
গায়ে গায়ে রগরবাজী
নেশার সাথে অনুরাগ
মিছিল চলুক বীরদর্পে
আনন্দ হোক একশ ভাগ ।
জয় বলো ভোলে নাথ কি জয়
কি বলো ভৃঙ্গী ভাইয়া জয়
কি বলো নন্দী ভাইয়া কি জয়।।

###

বন্ধ কর বন্ধ কর, বন্ধ কর সব।
ধর্ম নিয়ে আদিখ্যেতা মিথ্যে প্রহসন,
আর কত ? ছেলেখেলা ?
বিকৃতি আর বেলাল্লাপনা ?
বন্ধ কর, আর কত ?
টাকার জোরে দাদাগিরি --
বিশাল বিশাল বাজেট নিয়ে
পুজোর ছলে পুতুল খেলা ?
আসল পুজোয় যৎসামান্য
ডেকোরেশন -- আলোর মেলা
আর কত ?
কোথায় লিখা শাস্ত্রমতে
এমনতর মিছিল  ?
বিকট শব্দে হিন্দি গান
আলোর সাথে অঙ্গভঙ্গি
মদের স্রোতে কৃষ্টি ভাষাণ ?
আর কত ?
পথঘাট সব বন্ধ করে
সহস্রকে বিপাক ঠেলে
কিসের জৌলুস ?
এমব্যুলেন্স যে দাঁড়িয়ে যায় !
একটা যদি মৃত্যু হয়, একটা যদি মানুষ  ?
কে নেবে তার দায়ভারটি ?
প্রশাসন ? ডাক্তার  ?
নাকি উন্মাদের‌ই দল ?
উত্তরটা কে দেবে তার ?
একটা কিছু বল্ ।
আর কত ? বন্ধ হোক।
বন্ধ হোক এই বিকৃতি সব,
আওয়াজ তোল।
লজ্জা হয়, নুইয়ে আসে মাথা,
যখন কেউ আঙ্গুল তুলে বলে,
এই তাহলে, প্রাচীনতম ধর্ম ?
এই তাহলে ? লজ্জা হয়।

এ লজ্জা আমার একার নয় ।
আমায় যারা ঘিরে আছেন, গোটা সম্প্রদায় ।
এই লজ্জা সনাতনী গোটা ধর্মটার
যত পূর্বপুরুষ আর বুদ্ধিজীবী জন
এই লজ্জা ওদের‌ও।
আমার ,আপনার, আমাদের সবার।
তাই বন্ধ হোক মিছিলবাজি-- অবিলম্বে,
বন্ধ হোক অনাসৃষ্টি, অন্যায় অনাচার।

সোমবার, ২৪ জুন, ২০১৯

সেইবেলা


আমার সেইবেলাটাই বেশ ছিল
পাশে আমার বাবা ছিলেন,
হাতখানা তার ধরা ছিল
পথে অনেক কাঁকড় ছিল
তবুও মনে সাহস ছিল,
বাবা আমার পাশে আছেন
এই একটা ভরসা ছিল
আমার সেইবেলাটাই বেশ ছিল।

মোড়ের মুখে স্কুল ছিল
স্কুলগুলোতে প্রাণ ছিল
দিদিমণির শাসন ছিল
ভীষণ রকম ভয় ছিল
একটানা এক টান ছিল,
আঁচল ভরা স্নেহ ছিল
শাসন শেষে বুকে টানা---
মায়ের গায়ের ঘ্রাণ ছিল।
দুদিন যদি যেতাম না কেউ
বাড়ি এসে খোঁজ নিতেন,
কি এমন সে কাজ ছিল ?
আমার সেই বেলাটাই বেশ ছিল।

আমার যারা বন্ধু ছিল
লালজামা আর নীল জামা-
ভীষণ মিষ্টি, পুতুল যেন
আমার সাথে ভাব ছিল
কথা যে খুব হতো তা নয়
তবুও ভীষণ ভাব ছিল।
টিফিন কৌটায় যা খুশী থাক
আমার তাতে ভাগ ছিল,
আমায় খাইয়ে তবেই তাদের
টিফিন খাওয়া স্টার্ট ছিল।
আমার সেইবেলাটাই বেশ ছিল।

মামার বাড়ি বাগান বাড়ি
শহর থেকে অনেক দুর,
ধানের গোলা, গোয়াল ঘর
ময়না টিয়ার মিষ্টি সুর।
গাড়ি ঘোড়ার চল ছিল না
পায়ে হাঁঁটাই মূল ছিল
পূজোর সময় নাচঘরেতে
যাত্রাগানেের চল ছিল।
অনেক অনেক আগের কথা
পূজোয় আমরা মামার বাড়ি
পাশের গায়ে যাত্রা দেখবো
তাই চেপেছি ঘোড়ার গাড়ি।
দাদু যাবেন দিদিমা আর
রাঙ্গামাসী, মিষ্টিমা
সহিসচাচা, বাবুর্চি ভাই
আমি বাবা সঙ্গে মা।
ছুটছে গাড়ি টগবগিয়ে
ঘোড়ার মাথায় টর্চ ছিল
ঝিঝি পোকা অন্ধকারে
ভয়ে ভয়েই ডাকছিল।
হঠাৎ গাড়ি থমকে দাঁড়ায়
আর এগুনো যাচ্ছে না,
সহিস বলে ফিসফিসিয়ে
সামনে দেখুন নড়ছে না।
কাঁপছে দাদু, কাঁপছে দিদা
কাঁঁপছে সহিস বাবুর্চি
আমার তখন বয়স কত
এই সবেতে চার ছুঁয়েছি।
বিশাল শরীর চকচকে গা
ভোরাকাটা দাগ ছিল
মায়ের কাছে শুনেছিলাম
রয়েল বেঙ্গল বাঘ ছিল।
দুপাশ ঘেরা চায়ের বাগান
জনবসতির চিহ্ন নাই
টুস করে যে পালিয়ে যাবো
কাঁপছে যে পা, শক্তি নাই।
দাদু বললেন সবাই চুপ
একটি আওয়াজ‌ও তুলবে না
একটুখানি কেউ নড়েছো
একটি লোক‌ও বাঁচবো না।
দাঁঁড়িয়ে আছি শক্ত কাঠ
নড়বো যে তার উপায় নেই
প্রাণ নিয়ে যে ফিরবো বাড়ি
সেই আশাতে ভরসা নেই।
সময়--পিঠে সময় চড়ে
সময় বুড়ি এগিয়ে যায়,
কাঁপছে সবাই থরথরিয়ে
এই বুঝি বাঘ হাড় চিবায়।
দাঁড়িয়ে আছি নড়ছি না
বাগবাবাজী সরছে না
হঠাৎ বাঘের দয়া হলো
পলক খুলেই দেখছি না।
দাদু বললেন জোর বেঁচেছি
এমন কম্ম আর হবে না
কিছু একটা ঘটে গেলে
মুখ দেখানো আর যাবে না।
সহিস বললে ওকথা নয়
মৃত্যুটাতো লিখাই ছিল
বরাত জোড়ে এই শিশুটি ---
শিশু যীশুই বাঁচিয়ে দিল।
ঘোড়ার গাড়ি, বাঘের ভয়
তবুও মনে সুখ ছিল
মন্দলোকে যে যাই বলুক
সেইবেলাটাই বেশ ছিল।

আমি যখন স্কুলে পড়ি
আমার বন্ধু তিনকড়ি
গরীব ছেলে ভীষণ শান্ত
পাশের পাড়ায় ঘর ছিল,
সাত চড়েতেও রা করে না,
এমনটি তার ভাব ছিল।
আমি বসতাম প্রথম সারি
ওটাই আমার পছন্দ খুব,
সে বসতো পেছন সারি
আমার ছিল তাতেই ক্ষোভ ।
কোনদিন সে পাশে বসেনি,
পড়াশুনায় খুব সাধারণ
কিছু বললে হাসতো শুধু
বলতো আমার হবেখন।
সেবার আমার অসুখ হলো,
ভীষণ জ্বর ,গায়ে ফোড়া
সবাই বললে সাবধান সব
ও কিছু নয়, মায়ের দয়া।
যত আমার বন্ধু ছিল
কোথায় যেন হারিয়ে গেল
তিনকড়িটাই স্কুল পালিয়ে
আমার পাশে বসেছিল।
সবার কত নিষেধ ছিল
মায়ের নিষেধ বাবার নিষেধ
ওদের বাড়ি রাগারাগি
তারপরেতেও তিন তিনটে দিন
আমার কাছেই এসেছিল।
চতুর্থ দিন খবর পেলাম
মায়ের দয়ায় সেও কাবু
বদ্যি, পথ্যি টুটকা--শক্তি
যম মানুষে লড়েছিল।
ভীষণভাবে কাবু হয়েও
এই যাত্রায় সে বেঁচেছিল।
যেদিন আমি সুস্থ হলাম
প্রথম ওদের বাড়ি গেলাম
আমায় পেয়ে সেকি খুশী
আনন্দেতে হাসছিল।
শুধু আমার চোখে জল‌ই জল
সে যে একটি চোখেই দেখছিল।
আমার সেই বেলাটাই..........।

মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০১৯

আমি


কয়েকটা দিন থেকে ভাবছি --
একটা প্রশ্ন -- আমি কে?  কি পরিচয়?
ভাবনাটা অদ্ভুত বটে, তবে অবান্তর নয় ।
মনে সংশয় , নিরন্তর চাপা জিজ্ঞাসা,
কে আমি ? আমি কে হ‌ই।
জানার সেই চেষ্টা থেকেই 
যত সমস্যার শুরু ।
আমার যিনি গুরু, বললেন, বল তুই কে ?
বিনম্রে বলি, "আমি অমুকের ছেলে
ক্ষত্রিয় সন্তান ।" "সেতো এজন্মের সন্ধান ---। "
আমি থমকে দাঁড়াই, এজন্ম মানে ?
আরো জন্ম আছে তবে অন্য কোনখানে?
এক জন্মেতে এত জ্বালা ,
তায় জন্ম জন্মান্তরের পালা ----,
হে গুরু, একি শুভঙ্করী ধাঁধা
নাকি নতুন প্রহসন। যদি সত্যি হয়,
আমি তবে কে ? কি পরিচয় ?
কখন সৃষ্টি আমার? কিসে হবে লয় ?
এ জন্ম আমার আজ কত জন্মের ফল ?
কত জন্ম আরো যেন বাকি পড়ে রয় ।
আয়নাতে দাঁড়িয়ে দেখি নিজের সত্বাকে
কখনো খুঁজিনি যে, এভাবে নিজেকে
চুলচেরা কখনো করিনি বিচার ।
আমার মধ্যে যত ভাল মন্দ সব
সেতো অপরের মুখে নেওয়া
মিষ্টি বা ঝাল ।
বারবার ফিরে ফিরে তাকাই নিজেই নিজেতে।
যতদুর দৃষ্টি যায়, শুধু অন্ধকার,
আমার ভেতরে কে সে কুৎসিত, কদাকার।

সোমবার, ১৭ জুন, ২০১৯

দিদির দেশে


হচ্ছেটা কি
দিদির দেশে
আন্দোলন
আর হুড়ুস্থুল,
স্টেথো গলায়
ডাক্তারেরা
বেজায় পাকায়
গন্ডগোল।
যখন তখন
বন্ধ কাজ
গেটের কাছে
আন্দোলন,
মিটিং মিছিল
স্লোগান যেন
দিদির জন্যে
সুদর্শন।
বামঘেষা সব
কার্যকলাপ
কাজের কাজ
করছে না,
কেউ যদি এক
ছুঁয়ে দিল
ব্যস তবে আর
পারছে না।
রাজ্য জুড়ে
কোটি লোক,
কজন আছেন
ডাক্তার হে ।
কজন তাদের
মার খেয়েছে
হিসেবখানা
বুঝিয়ে দে।
তোরা ছাড়া
চলবে না তাই
ফন্দি ফিকির
বেশ এটেছিস।
লোকগুলো নয়
দিদির ঘাড়টা
নুইয়ে দিবি
পণ করেছিস।
দিদির সঙ্গে
পাঙ্গা নিস না,
দিদি ভীষণ
রাগ করে,
দিদির দেশে
দিদিই শেষ
আর বাকি সব
পোঁ ধরে।
রাস্তা ঘাটে
একসিডেন্ট
রোজ‌ইতো হয়
নয় কি বল ?
এই ঘটনাও
একসিডেন্ট
এই কথাটা
মেনে চল।
একটা দুটো
মারামারি
কোথায় কখন
হচ্ছে না।
তাই বলে দেশ
বন্ধ হবে,
এই ব্যাপারটি
মানছি না।
মারলো যারা
ভাবিস কি রে
সবাই ওরা
সুস্থ লোক,
দিদির মত
ওরাওতো সব
বদরাগী আর
চন্ডাশোক।
দিদি তো দেখ
মেয়ে মানুষ
কখন কি সব
বলে ফেলে,
তারপরে দেখ্
বুড়ি হয়েছে
মেজাজটাকেই
গুলিয়ে ফেলে।
ঘটলো যা তা
নিন্দনীয়,
একেবার‌ই
কাম্য নয়।
তাই বলে সব
ফাঁকি দিবি
এইটা কোন
কথা হয়।
এখন যারা
হাসপাতালে
ওদের কথা
ভাববি না ?
তোদের পক্ষে
ওরাও আছে
তাইতো কিছু
বলছে না।
দিদির কথায়
রাগ করিস না,
মাথার কি আর
ঠিক আছে ?
আরশি ভাাঙ্গছে
কুরশি ডাঙ্গছে
দল ভাঙ্গবে
চান্স আছে।
দিদির উপর
রাগ করিস না,
সময়টা তার
পক্ষে নয়,
এখন সে আর
আগের মত
পুরোপুরি
সুস্থ নয়।

বুধবার, ৫ জুন, ২০১৯

দিদি

জানিস বল্টু, দিদিটা না
কেমন যেন পাল্টে গেছে
ভালো করে কথা বলে না,
খাওয়া দাওয়ায় নিয়ম নীতি নেই
অফিস আদালতে যায় না ,
ঘরে থাকে বসে, বাসন ধোয়
কাপড় কাচে আর ঘরদোর মোছে ।
দিদিটা না, দিনে দিনে
সত্যি বদলে গেছে ।

গ্রীষ্মকালে শহর জুড়ে
যখন গরম  ভীষণ পড়ে,
দিদি তখন শিকল টেনে
জানালা বন্ধ রাখে।
ভিতর থেকে আইবলেতে
চোখে চোখ রেখে দেখে
কখন গরম গেটটি খুলে
ভিতর বাড়িতে ঢোকে ।
বৃষ্টি এলে আবার দিদি,
অমনি পাল্টে যায় ।
ছাদে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি ভিজে
সঙ্গ দিতে চায় ।
গাছকে বলে, দেখ তাকিয়ে
আমিও আছি সঙ্গে
ফুলকে বলে , আনন্দ কর
আমিও তোদের সঙ্গে
পাখিকে বলে তোদের কিরে
বদমাস সব বৃষ্টির চতুরঙ্গে।

শীতের সকালে দিদি অন্য ,
কুঁয়াশাতে পথ খুঁজে খুঁজে ফিরে
কুজ্ঝটিকারা তখনও ঘুমায়
ঘাসফুলেদের ভিড়ে।

দিদিকে জানিস বুঝতে পারি না ;
এই যে যেমন যখন তখন,
যেখানে সেখানে যা মনে তাই বকে,
নিজেই নিজের ছবি আঁকে আর
অবাক চোখে দেখে।
হঠাৎই আবার সব কিছু ছেড়ে
দিদি, কবিতা লিখছে বসে ।
ভাবখানা যেন কবিতাই লিখবে
বাকি সব কিছু মিছে।
বইয়ের পর বই লিখছে,
পাতার পর পাতা,
সাতাশিখানা বই লেখা
চারটিখানি কথা।

এমনিতে দেখ্ , গানের গলা ,
দিদি গান  কত ভালবাসে।
যেখানে যত শিল্পীরা সব
বাড়ি ছুটে ছুটে আসে ।
জলসাতে যায়, বক্তৃতা দেয়
হোক ভুলভাল গাঁজাখুরি,
কারো ঘরে গিয়ে পাত পেড়ে বসে
ভীমরুলে সুড়সুড়ি ।
আসলে জানিস, মনটা দিদির
সত্যি খুব ভালো ।
মেয়েদের জন্যে অনেক করেছে ।
স্কুলে যাবার সাইকেল দিয়েছে,
বিয়ের জন্যে টাকা দিয়েছে
হোক সামান্য, সেও মন্দের ভালো ।
কিন্তু জানিস মাঝে মাঝেই
দিদির কি যেন কি হয়।
দিল্লী নিয়ে চেষ্টা হয়েছে
সাধু সন্ন্যাসীতে ভয়।
যখন দিদি রেগে যায় না
মেজাজটা পঞ্চমে বয়, 
ঔষধ তার মোক্ষম সে এক
বল রামচন্দ্রের জয়।
দিদি তখন শান্ত হবেই
গরাদ ঘরে গল্প হবেই
খাতিরদারি হতেই পারে
সেতো দিদিগিরিরই জয় ।

রবিবার, ২৮ এপ্রিল, ২০১৯

ছায়া

।। সুপ্রদীপ দত্তরায়।।

(C)Image:ছবি

মস্ত শরীরে একটা অসহ্য যন্ত্রণা, একসাথে অনেকগুলো যন্ত্রে সমস্যা ।ডাক্তারদের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম । হাসপাতালে বাস্তবিকই এখন পৌষ মাস চলছে। পাশে হাতখানা হাতের উপর রেখে মীরা চুপচাপ । পাশেই বসা কিন্তু অনেক দুরে । দুর বলতে অনেক দুরে, সহস্র যোজন কিংবা তারও বেশি , সে এক অন্য জগত। চাইলেই দুটো মন একসাথে পৌছাতে পারে না সেখানে । কোথাও না কোথাও একটা ফারাক থেকে যায় । এই একটা জায়গাতে সুবীরের বিজ্ঞান এখনো কোনও ব্যাখ্যা দিতে পারেনি ।
মীরার জন্যে মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হয় , জীবনে সুখ জিনিসটা ওর জীবনে প্রসাদের মত কণামাত্রই থেকে গেল । অথচ যে রূপ আর গুণ নিয়ে সে পৃথিবীতে এসেছিল তাতে তার মত মেয়ের রাণীর মত জীবন হওয়ার  কথা । আবারও প্রশ্ন, সব রাণীরা কি সুখী হয় ? সুখ তবে কি?  ভালবাসা বস্তুটি সুবীরের ঠিক মাথায় ঢোকে না, চোখে দেখা যায় না যে। সুবীরের এযাবৎ পড়াশুনাতে ভালবাসা, প্রেম এসবের বৈজ্ঞানিক কোন ব্যাখ্যা নেই। ওসব কবিদের কল্পনাতে সম্ভব । ওদের সাহিত্যে আকাশের সীমা থাকে, মনের থাকে জানালা,  ফাগুনে পলাশে নাকি আগুন লাগে , স্মৃতি নাকি মমি হয় মনের পিরামিডে।  সুবীরের আর ভাবতে ভালো লাগছে না। মাথাটা তে অসহ্য যন্ত্রণা । তবু মীরার জন্য দুঃখ হয়। চুলে তার হেমন্তের ছোঁয়া, চামড়াতে সেই টানটান ভাব আর নেই। তবু তারই মধ্যে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য, চোখ ফেরানো যায় না । সুবীরের তাকাতে খুব কষ্ট হচ্ছে । চোখে আলো সহ্য হচ্ছেে না। ঘরের আলোটা কমানো , তবু চোখ খুলতে কষ্ট হচ্ছে । আজকাল সব কিছু ঝাপসা লাগে । মুখ দেখে কাউকে চিনতে পারা যায় না । এই মুহূর্তে সুবীরের মনে হলো একটা ছায়া এসে ঘরে ঢুকছে। কপালে একটা সূক্ষ্ম ভাঁজ দেখা দিয়ে আবারও মিলিয়ে গেছে । না: মনে করতে পারছে না লোকটাকে। ছায়ার কথা মনে আসতেই ছোটবেলার কথাগুলো হঠাৎই মনে হলো । একটা সময়ে সুবীর ছায়াকে খুব ভয় পেত । আশ্চর্যের কিছু ব্যাপার নয়, ওই বয়সে অনেকেই ভয় পেত ছায়াকে। অনেক বয়েস অবধি বাথরুমে একাএকা যেতে ভয় পেত সে । মনে হতো এই বুঝি ওর কিছু একটা হয়ে যাবে । মা বলতেন, " বোকা ছেলে, ছায়াকে বুঝি ভয় করতে হয়?  ওতো তোর বন্ধু । তোকে জন্মের সময়ে যখন প্রথম কোলে তুলে নিই, তখন তোর খেলার সাথী হিসেবে ওকেও আমি তুলে এনেছিলাম । সেই থেকেই তো সে তোর সাথে আছে।
--- " কিন্তু ওতো সবসময়ে আমার সাথে থাকে না মা --।"
--- " কে বললে সে কথা ? ও সবসময়ই তোর সঙ্গে আছে । যখন তুই ঘুমিয়ে থাকিস তখনও সে জেগে থেকে তোকে পাহারা দেয় । আগামী দিনেও দেবে । যতদিন তুই এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকবি ঠিক ততদিন ।"
-- "কিন্তু মা ও যে আমার সাথে একটিবারও কথা বলে না ।"
--" বলবে না, কক্ষনো বলবে না , আমি ওকে বারণ করে দিয়েছি ; কারণ পৃথিবীতে  যত ঝগড়া তার অধিকাংশই জেনে রাখিস কথার ভুল বোঝাবুঝিতে সৃষ্টি ।"
মায়ের কথাগুলোতে কেমন যেন সম্মোহনী থাকে , তর্ক করা যায় না, কিন্তু ---।
সুবীর একবার বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল । রাশভারী এই লোকটার অনেক কথাই সুবীর বুঝতে পারে না । দুয়েক বার ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করার পর খবরের কাগজ থেকে মুখ তুলে বলেছিলেন, " ও কিচ্ছু না, ওতে ভয় করার কিছু নেই ।"
-- "কিন্তু বাবা, আমি যে ওকে দেখতে পাই, আমার ভীষণ ভয় হয়। "
উনি পত্রিকাটি ভাঁজ করে কিছুক্ষণ মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর বললেন, " এই যে ছায়া তুমি দেখতে পাচ্ছো, আসলে ওটা তুমিই । 
বাবার কথাগুলো বড় অদ্ভুত, বোঝা যায় না ।
একটু থেমে তিনি আবার  বললেন --- "এ বড় কঠিন বিষয়, এই যে ছায়া তুমি দেখতে পাচ্ছো , সে তুমি আছো বলেই তার অস্তিত্ব । আরো গভীরে গিয়ে যদি দেখতে যাও , তবে বলবো এই ছায়াটাই আসলে তুমি আর যে তুমি আমার সাথে কথা বলছো সে তোমার অহং । যখন তোমার স্বার্থ সিদ্ধি হয়, তোমার অহং তখন পরিতৃপ্তি লাভ করে, তুমি খুশি  হও, আবার যখন তোমার স্বার্থবুদ্ধিতে সংঘাত লাগে তোমার অহং রুষ্ট  হয়, তুমি খুব  কষ্ট পাও। তোমার মন খারাপ হয়। এই যে তুমি ভয় পাচ্ছো, সে তোমার অহং এর নিরাপত্তার অভাব বোধ । যতক্ষণ তোমার মধ্যে তোমার অহং বেঁচে থাকবে ততদিন তোমার মুক্তি নেই। আর তোমার মুক্তি নেই মানেই হচ্ছে তোমার ছায়ার মুক্তি নেই । শাস্ত্র পড়লে সব জানতে পারবে ।"
বাবা প্রাচীনপন্থী সংস্কৃতে পণ্ডিত, বিজ্ঞানের সব যুক্তি মেনে নিতে পারেন না । রাগ করতেন,  বলতেন, " তোদের বিজ্ঞান তো সেদিনকার ছোকরা । শাস্ত্র যদি তোদের জ্ঞান চক্ষু খুলে না দিত, তবে তোদের বিজ্ঞানকে আজও আঁতুড়ঘরে হাত পা ছুঁড়তে হতো।"
বাবা মায়ের কথা মনে আসতেই অনেক অনেক ছবি একে একে ভেসে আসতে লাগলো। সুবীর অনুভব করতে পারছে, ঘরে একটা একটা করে অনেকগুলো ছায়ার ধীরে ধীরে ভিড় জমে গেছে । মুখগুলো খুব চেনা চেনা লাগছে । সুবীরের ভাবতে কষ্ট হচ্ছে, তবু কেন যেন  চিনতে কষ্ট হচ্ছে না। ভিড় থেকে একটা আটপৌরে শাড়ী পরা মহিলা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন । এই ছায়াটা সুবীরের খুব পরিচিত । চোখে দুটো অভিমানে ছলছল করে উঠলো । উনি এগিয়ে এলেন । ডান হাতটা আলতো করে সুবীরের কপালে ছোঁয়াতেই মনে হলো , যেন সমস্ত যন্ত্রণা উনি তার হাতের মধ্য দিয়ে শুষে নিচ্ছেন। সুবীর অস্পষ্ট শব্দে বললে, " এতদিনে তোমার সময় হলো মা ? আমার যে ভীষণ কষ্ট ---।" ওনার চোখে অপার শান্তি । যেন সমস্ত কষ্ট মুছে নিতেই উনি এসেছেন। সুবীরের দুচোখে না চাইতেই জলের ফোঁটা । এক পলকের জন্যে মীরার জন্য মনটা কেমন করে উঠলো । ওর অবর্তমানে মীরার কি হবে ?  ওকে যদি সঙ্গে রাখা যেত । সুবীর শরীরের সমস্ত শক্তি ঢেলে দিয়ে মীরার হাতটাকে শক্ত করে ধরার চেষ্টা কবলো।  সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে নার্সটা খুব যত্ন করে মুখ থেকে অক্সিজেন মাস্কটা খুলে নিচ্ছে । এখন যে শরীরে আর কোন কষ্ট নেই। সুবীর নিজের ছায়াটাকে খোঁজার চেষ্টা নিল , কিন্তু নেই। তবে কি - ?   যা হোক হবে,  সুবীর আর ভাবতে চায় না ।........

শুক্রবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৯

আকাশ

।। সুপ্রদীপ দত্তরায়।।









কাশের ঠিকানাটি শুধু অশ্বত্থ জানে
সে কখন আসে কখন যায়
কখন কোথায় ঘুরে বেড়ায়
শুধুমাত্র অশ্বত্থই খবর রাখে।
এই যে মেঘ , ভালোবেসে গা জড়িয়ে আছে ,
কানে কানে কখন কি ভালবাসার পাঠ দিচ্ছে,
অশ্বত্থ চোখ বুজে সব বলে দিতে পারে ,
এমনই তাদের সম্পর্ক।
ছোটবেলা থেকেই তার আকাশের সাথে
প্রকাশহীন নিবিড় বন্ধুত্ব ।
মাঝে মাঝে তার রাগ হয় , বিরক্তি লাগে,
এত কিসের খুনসুটি ? বেলেল্লাপনা
প্রকাশ্যে লোমশ বুকে নির্লজ্জতায় মুখ ঘষা,
এতো সুস্থ নয়, ছিন্নমতী, চঞ্চলতা ।
আকাশ তখনও নির্বিকার
স্নিগ্ধ হাসি ঠোঁটে , চোখে তার বিস্ময় অপার ।
মেঘ যখন রেগে যায়,
প্রচন্ড আক্রোশে সমস্ত সুন্দরকে ধংস করতে উদ্যত,
অশ্বত্থ ভয়ে ভয়ে ইষ্ট স্মরণ করে --
আকাশ তখন শান্ত, শীতল ;
অবাক হয়ে মেঘকে দেখে আর ভাবে
এত রূপ মেঘ কোথায় লুকিয়ে রাখে।
আর ঠিক এই কারণেই আকাশকে ঘিরে
অশ্বত্থের মনে এক বিশাল দুর্বলতা ।
পৃথিবীর মানুষগুলোও আকাশের মত --
ভীষণ নরম, তুলতুলে, আবার বজ্রের মত কঠিন
সকল পরিস্থিতিতে পঞ্চমে সুর।
পার্থক্য শুধু একটিই
আকাশের মত বিশাল মনটা কারো নেই, আর -- ?
আর, মানুষগুলো কেমন যেন বীর্যহীণ,
শত আঘাতেও প্রতিবাদ করতে জানে না ,
সংকটের ত্রিসন্ধ্যায় ওরা সুখের স্বপ্ন দেখে হায়।

বুধবার, ৩ এপ্রিল, ২০১৯

পুলওয়ামা

।। সুপ্রদীপ দত্তরায় ।।









কটা ভয়ঙ্কর সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে 
অদ্ভুত উৎকট পরিস্থিতি ,
আনাচে কানাচে উৎকণ্ঠা আর শঙ্কা 
দেশপ্রেমে এখন শুধুই জোয়ার, 
বিপন্ন একাত্মবোধ, জাতীয় সংহতি ।
মনে ভয়, হয়তো আবারো হয়, 
জাতি দাঙ্গা --
চুরাশি দৌরাত্ম্য  দুর তো নয়।
পথে ঘাটে, নির্জনে, এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে
পৈশাচিক আক্রোশ, সে ভয়ঙ্কর দেশপ্রেম ---
আমার সত্যিই ভীষণ ভয়।
পুলওয়ামা পরবর্তী যা ঘটেছে দেশে , 
কাশ্মীর চাই, কাশ্মীরী নয় --
এ কোন অন্যায় আবেদন ?
জাতি বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা , দেশপ্রেম তো নয় ।
শহীদের কফিন ঘিরে ভোটের রাজনীতি 
মনের ঈশান কোনে পুঞ্জীভূত মেঘ
সত্য বলার স্বাধীনতাকে টুঁটি চেপে ধরা ?
প্রচারের আলোতে খোঁজে আত্মতৃপ্তির আশ
হে ঈশ্বর,  ওদের মূর্খের স্বর্গে বাস  
এদেশ এখন কোন অশিক্ষিত বন্যদের নয় ।
পুলওয়ামাতে যা ঘটে গেল সেদিন --
তার জন্যে হোক  প্রতিবাদ,  তীব্র তিরস্কার ।
যত রক্ত ঝরিয়েছে সেনা, অতর্কিতে 
কুচক্রীর আত্মঘাতী হামলায়, 
হৃদয়ের প্রতিটি কোষ, শুধু আমি নই
আসমুদ্র হিমাচল কেঁদেছে যন্ত্রণায় ।
ঘন আর্তনাদ আর বোবা আক্রোশে।
কোনও হিন্দু কিংবা মুসলমান নয়--,
নয় কোনও শিখ, পার্সি কিংবা পাঠান , 
কেঁদেছে প্রতিটি ভারতীয় অন্তর
ভারত মায়ের ওরা সাচ্চা সন্তান ।
এসো, হে বন্ধু, হে উদ্দীপ্ত ভারতবাসী 
এই দুর্দিনে, হাতে রাখি হাত ,
ঊর্ধ্বে উঠে সব - ধর্ম, বর্ণ, জাত
এসো বাঙালি, গুজরাটি , কিন্নরী  কাশ্মীরী
এসো খোলা দিল উড়িয়া তামিল
এসো সংহত হই, সংযত হই
সংহতির শপথ নিলাম এবার
এদেশ আমার, এদেশ তোমার ,
শুভবুদ্ধি থাকা সকল ভারতবাসীর
যোগ্য জবাবে গর্জে উঠুক সুতীব্র প্রতিরোধ 


চিরকূট

।। সুপ্রদীপ দত্তরায় ।।


(C)Image:ছবি







প্রথমে একটা বোমা
সবে সকালবেলা চায়ের টেবিলে বসেছে সে
সামনে চায়ের পেয়ালা, হাতে খবরের কাগজ, 
ঠোঁট আর বাদামী অমৃতে এখনও বিস্তর ফারাক ।
তখনই আরো একটা ।
ততক্ষণে একজোড়া ঠোঁট 
নিমেষে শুষে নিয়েছে একচুমুক তিক্ততা ।
সার্জিক্যাল এট্যাকে সে যথারীতি হতবাক।
তারপর ?
তারপর,  ক্রমাগত বর্ষণ, একটানা একুশ মিনিট ।
যখন থামলো, তখন সব শেষ, 
বাইরে বারুদের পোড়া গন্ধ, 
ভেতরে বিষাক্ত ঝাঁঝ ।
জানতেও পারলে না, তোমাদের সৃজনশীল ভূমিকায়
প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে ঘরে ঘরে কত হিরোশীমা, নাগাশাকি , 
তোমাদেরই অজান্তে ।

মঙ্গলবার, ২ এপ্রিল, ২০১৯

কঙ্কনা

।। সুপ্রদীপ দত্তরায়।।

(C)Image:ছবি







ঙ্কনা, আজ  আর অঙ্ক না ,
বুকে ডম্বরু, পার্সে ঠনঠনা ।
তবু প্রেম করি, চলো প্রেম করি
ফোনে কল করি, মনে ফুলকলি ,
এসো চুলবুলি, এই মন খেলায় ।
এই দুপুরবেলায় , চল কাঁঠালতলায়
সেথায় উদার গলায় , আমি কোকিলকে ডেকে
শুধু বলবো --,
কী ????
ভালবাসা পুঁথি পড়ে হয় না ,
ভালবাসা পুঁথি ঘেঁটে  হয় না ,
ভালবাসা পুঁথি মেনে  হয় না।।
চৈতি আকাশ, মনে উদাস বাতাস
ক্ষণে খুনসুটি আর  ক্ষণে দীর্ঘ যে শ্বাস
এত তৃষ্ণা ঠোঁটে, ঠোঁটের কোলাজ ফোটে
তোমার আস্কারাতে , আমার শাসন টুটে
ঘামে ভেজা বুকে, শত পদ্ম ফোটে
আমি কানে কানে তোমার মুখটা টেনে শুধু বলবো -,
কি ??
ভালবাসা পুঁথি পড়ে  হয় না ,
ভালবাসা পুঁথি ঘেঁটে  হয় না ,
ভালবাসা পুঁথি মেনে  হয় না।।
কঙ্কনা, না না অঙ্ক না,
এতো তাড়া কিসে, হাতে শঙ্খ না,
চলো প্রেম করি, ফোনে কল করি
প্রেমে ডুব মারি, বুকে কোৎ মারি
রাগে, অনুরাগে, যেন মন ভরে না ।
বিয়ে করবোও না, ঘানি টানবোও না,
ধরা দেবও না শুধু ওই ছাদনাতলায়।
বিয়ে বিগড়ে যখন যায়, ঘরে শান্তি যে হারায়
মনের এই আশঙ্কায়, নেড়া আমি শুধু বলবো --,
কি ???
ভালবাসা পুঁথি পড়ে  হয় না ,
ভালবাসা পুঁথি ঘেঁটে  হয় না ,
ভালবাসা পুঁথি মেনে  হয় না ।।

সোমবার, ১ এপ্রিল, ২০১৯

তর্পণ


।। সুপ্রদীপ দত্তরায় ।।

ছেলেটি সত্যি  অভাগা । গান কবিতা নাটক নিয়ে থাকতো, পাগল ছেলে ,  শেখার ছিল প্রচণ্ড আগ্রহ । অনুষ্ঠান করতে খুব ভালবাসতো সে। এই নিয়েই তার যত বায়নাক্কা। কোন অহংকার ছিল না, মিশতে পারতো সবার সাথে সহজে ভাবে। বয়স কত হতে পারে?  ৪০-৪২  ঘরে মিষ্টি একটা বৌ আর ফুটফুটে একটা ছোট্ট পরী । জীবনের যে সময়টা ছেলে মেয়েরা বাবা মায়ের আস্কারাতে  হৈ হৈ করে বেড়ায় সেই সময়েতে সে তার ক্যান্সার রোগাক্রান্ত মাকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। অভ্যস্ত হাতে মায়ের শুশ্রূষা । বাবা বামপন্থী কর্মী তাই স্বভাবতই অভাবের সংসার । ছেলেটি মাকে নিয়ে ব্যস্ত ।ঔষধ হাসপাতাল আর শুশ্রূষা । একদিন অনেক রোগ ভোগের পর মা মারা গেলেন,তখনই বাবা ব্রেইন স্ট্রোকে শয্যাশায়ী । তারপর আবার যুদ্ধ । একসময়ে বাবাও মারা গেলেন । ততদিনে সে ঋণগ্রস্ত । ঘরে একটা বৌ এসেছে,এসেছে একটা মিষ্টি পরী । চিকিৎসার খরচ চালাতে চালাতে পৈতৃক ব্যবসা লাটে উঠেছে ।শেষমেশ একসময়ে বন্ধ। প্রচণ্ড আর্থিক অনটন। খুব পরিশ্রম করতে পারতো,রেডিওতে ডিউটি, পত্রিকা অফিসে কাজ -- সংসারে দুবেলা ভাতের ব্যবস্থা তো করতে হবে । তারই ফাঁকে ফাঁকে কবিতা গানের অনুষ্ঠান । মাঝে মাঝে খুব ক্লান্ত লাগতো ওকে । তবু উৎসাহে কোন ভাটা নেই। এরই ফাঁকে ভাগ্যক্রমে সেইলস্  একটা কাজ জুটলো । এবারে বুঝি ঠাকুর মুখ তুলে তাকিয়েছেন। তখনই আবার  ধরা পড়লো বৌটিরও সেই একই রোগ,প্রাথমিক পর্যায়ে । মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত । ডাক্তার বলেছেন প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তর চেন্নাই এই চেক আপ। বার তিনেক গিয়েও ছিল। সামর্থ্য কোথায় ?  ডাক্তার বললেন যখন গৌহাটি আসব ওখানে দেখিও । একটা সুরাহা হলো। এবারে অসুস্থ হলো সে নিজে ।বসন্ত । খুব বাজে ভাবে অসুস্থ ।প্রচণ্ড জ্বর,কয়েকদিন ধরে খাওয়া দাওয়া বন্ধ।সেই রাত্রে ও সে প্রচণ্ড অসুস্থ ছিল । ডাক্তারের কাছেও গিয়েছিল, ডাক্তার চেম্বারে ছিলেন না ।যখন এলেন তখন ওর যাবার মত শক্তি নেই।রাতে অনেক বারই বমি হবার পরে অচেতন হয়ে শুয়েছিল। বৌ অনেক রাত অবধি শুশ্রূষা করে ঘুমিয়ে আছে ভেবে যখন অন্য ঘরে শুতে গেল,তখনই দুর্ঘটনাটি ঘটে । মশারি সে কোনকালেই গুঁজত না। ঘরে মশার উৎপাতে কয়েল জ্বালানো ছিল। কখন অসাবধানে মশারি ঝুলে কয়েলে লাগে কেউ বলতে পারে না । বাকিটা সবাই জানেন । ডাক্তাররা বলছেন কার্ডিয়াক এরেস্ট। পরিবার বলছে হয়তো সে আগেই মারা গেছে নইলে বাঁচার জন্য শেষ চেষ্টা একটা অবশ্যই নিত। পত্রিকা বলছে অন্য কিছু। সার কথা মিহিরেশ আর আমাদের মধ্যে নেই।
আজকাল যারা ওর বাড়িতে যাচ্ছেন,ওর ফুটফুটে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নেন নি এমন ব্যক্তি বোধহয় খুব কম। ডাকলেই ছুটে চলে আসে কোলে । গলায় ধরে শরীরের সাথে সাপটে থাকে। বুকটা জুড়িয়ে যায়। স্বামী হারিয়ে ওর সদ্য বিধবা বৌটি যখন কেঁদে কেঁদে স্মৃতিচারণ করে তখন ছোট্ট শিশুটি মাকে আদর করে চোখ মুছিয়ে দেয় । বলে ,"কেঁদো না মা, কেঁদো না, কাঁদতে নেই যে ।"