Sponsor

.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

Sunday, January 29, 2017

রবীন্দ্রনাথের ‘আমার জগৎ’ (দ্বিতীয় পর্ব)

।। রজত কান্তি দাস।।
(C)Image:ছবি
বীন্দ্রনাথের কবিমন ছিল এক হিসেবে দ্বিধাগ্রস্ত। একদিকে তাঁর বিজ্ঞানচর্চা ও অন্যদিকে উপনিষদীয় ভাবধারায় বিশ্বাস তাঁর দ্বিধাগ্রস্ত মনে দোলাচল ও সংঘাতের সৃষ্টি করে যা তাঁর মননকে উন্মেষের পথে নিয়ে গেছে বলে আমার বিশ্বাস। এই দোদুল্যমানতা ফুটে উঠেছে তাঁর আমার জগৎপ্রবন্ধে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাব্যিক ভাষায় ও প্রাঞ্জল ভঙ্গিতে যা লিখেছেন তা নিঃসন্দেহে ছিল গতি বিজ্ঞানের এক সমস্যা যা বহু শতাব্দী ধরেই নিউটনসহ সমস্ত প্রথম সারির বিজ্ঞানীদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। তবে বিশ্বনন্দিত এক কবি যখন বিজ্ঞানের কোন বিষয়কে তাঁর কাব্যের বিষয় করে তোলেন তখন তার সুষমা বেড়ে যায় বহুগুণ। এখানে রবীন্দ্রনাথের আমার জগৎ প্রবন্ধটি থেকে কিছুটা অংশ তুলে দিচ্ছি।
পৃথিবীর রাত্রিটি যেন তার এলোচুল,পিঠ ছাপিয়ে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত নেমে পড়েছে। কিন্তু সৌরজগৎলক্ষ্মীর শুভ্রললাটে একটি কৃষ্ণতিলও সে নয়। ওই তারাগুলির মধ্যে যে খুশি সেই শাড়ির একটি খুট দিয়ে এই কালিমার কণাটুকু মুছে নিলেও তার আঁচলে যেটুকু দাগ লাগবে তা অতি বড়ো নিন্দুকের চোখেও পড়বে না।
এ যেন আলোক মায়ের কোলের কালো শিশু সবে জন্ম নিয়েছে। লক্ষ লক্ষ তারা অনিমিষে তার ধরণী-দোলার শিয়রের কাছে দাঁড়িয়ে। তারা একটু নড়ে না পাছে এর ঘুম ভেঙ্গে যায়।
আমার বৈজ্ঞানিক বন্ধুর আর সইল না। তিনি বললেন, তুমি কোন সাবেক কালের ওয়েটিং রুমের আরাম কেদারায় পড়ে নিদ্রা দিচ্ছ ওদিকে বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানের রেলগাড়িটা যে বাঁশি বাজিয়ে ছুট দিয়েছে। তারাগুলো নড়ে না এটা তোমার কেমন কথা? একেবারে নিছক কবিত্ব।
আমার বলবার ইচ্ছা ছিল, তারাগুলো যে নড়ে এটা তোমার নিছক বৈজ্ঞানিকত্ব। কিন্তু সময় এমনি খারাপ ওটা জয়ধ্বনির মতোই শোনাবে।
আমার কবিত্বকলঙ্কটুকু স্বীকার করেই নেওয়া গেল। এই কবিত্বের কালিমা পৃথিবীর রাত্রিটুকুর মতো। এর শিয়রের কাছে বিজ্ঞানের জগজ্জয়ী আলো দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু সে এর গায়ে হাত তোলে না। স্নেহ করে বলে, আহা স্বপ্ন দেখুক। আমার কথাটা হচ্ছে এই যে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি রাতাগুলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। এর উপরে তো তর্ক চলে না।
বিজ্ঞান বলে তুমি অত্যন্ত বেশি দূরে আছ বলেই দেখছ তারাগুলো স্থির। কিন্তু এটা সত্য নয়।
আমি বলি, তুমি বেশি কাছে উঁকি মারছ বলেই বলছ ওরা চলছে। কিন্তু সে সত্যি নয়।
বিজ্ঞান চোখ পাকিয়ে বলে, সে কেমন কথা?
আমিও চোখ পাকিয়ে জবাব দেই, কাছের পক্ষ নিয়ে তুমি যদি দূরকে গালি দিতে পার তবে দূরের পক্ষ নিয়ে আমিই বা কাছকে গালি দেব না কেন?
বিজ্ঞান বলে, যখন দুই পক্ষ একেবারে উল্টো কথা বলে তখন ওদের মধ্যে এক পক্ষকেই মানতে হয়।
আমি বলি, তুমি তো তা মান না। পৃথিবীকে গোলাকার বলবার বেলায় তুমি অনায়াসে দুরের দোহাই পাড়। তখন বল, কাছে আছি বলেই পৃথিবীকে সমতল বলে ভ্রম হয়। তখন তোমার তর্ক এই যে কাছ থেকে কেবল অংশকে দেখা যায়, দূরে না দাঁড়ালে সমগ্রকে দেখা যায় না। তোমার এ কথাটায় সায় দিতে রাজি আছি। এইজন্যই তো আপনার সম্পর্কে মানুষের মিথ্যা অহংকার। কেননা আপনি অত্যন্ত কাছে। শাস্ত্রে তাই বলে আপনাকে যে লোক অন্যের মধ্যে দেখে সেই সত্যকে দেখে অর্থাৎ আপনার থেকে দুরে না গেলে আপনার গোলাকার বিশ্বরূপ দেখা যায় না।
দূরকে যদি এতই খাতির কর তবে কোন মুখে বলবে, তারাগুলো ছুটোছুটি করে মরছে? মধ্যাহ্নসূর্যকে চোখে দেখতে গেলে কালো কাচের মধ্য দিয়ে দেখতে হয়।বিশ্বলোকের জ্যোতির্ময় দুর্ধর্ষরূপকে আমরা সমগ্রভাবে দেখব বলেই পৃথিবী এই কালো রাত্রিটাকে আমাদের চোখের উপর ধরেছেন। তার মধ্যে দিয়ে কী দেখি? সমস্ত শান্ত, নীরব যে আমাদের হাউই, তুবড়ি, তারাবাজিগুলো তাদের মুখের সামনে উপহাস করে আসতে ভয় করে না।
আমরা যখন সমস্ত তারাকে পরস্পরের সঙ্গে সম্বন্ধযোগে মিলিয়ে দেখছি তখন দেখছি তারা অবিচলিত স্থির তখন তারা গজমুক্তার সাতনলী হার। জ্যোতির্বিদ্যা যখন এই সম্বন্ধসূত্রকে বিচ্ছিন্ন করে কোনও তারাকে দেখে তখন দেখতে পায় সে চলছে তখন হার-ছেঁড়া মুক্তা টলটল করে গড়িয়ে বেড়ায়।
এখন মুশকিল এই, বিশ্বাস করি কাকে? বিশ্বতারা অন্ধকার সাক্ষ্যমঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে যে সাক্ষ্য দিচ্ছে তার ভাষা নিতান্ত সরল একবার কেবল চোখ মেলে তার দিকে তাকালেই হয়, আর কিছুই করতে হয় না। আবার যখন দুই-একটা তারা তাদের বিশ্বাসন থেকে নিচে নেমে এসে গণিতশাস্ত্রের গুহার মধ্যে ঢুকে কানে কানে কী সব বলে যায় তখন দেখি সে আবার আরেক কথা। যারা স্বদলের সম্বন্ধ ছেড়ে এসে পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেটের প্রাইভেট কামরায় ঢুকে সমস্ত দলের একজোট সাক্ষ্যের বিরুদ্ধে গোপন সংবাদ ফাঁস করে দেবার ভান করে সেই সমস্ত অ্যাপ্রুভারদেরই যে পরম সত্যবাদী বলে গণ্য করতেই হবে এমন কথা নেই।
কিন্তু এই সমস্ত অ্যাপ্রুভাররা বিস্তারিত খবর দিয়ে থাকে। বিস্তারিত খবরের জোর বড়ো বেশি। সমস্ত পৃথিবী বলছে আমি গোলাকার, কিন্তু পায়ের তলার মাটি বলছে আমি সমতল। পায়ের তলার মাটির জোর বেশি, কেননা যেটুকু বলে একেবারে তন্ন তন্ন করে বলে। পায়ের তলার মাটির কাছ থেকে পাই তথ্য, অর্থাৎ তথাকার খবর, বিশ্বপৃথিবীর কাছ থেকে পাই সত্য, অর্থাৎ সমস্তটার খবর।
আমার কথাটা এই যে কোনোটাকেই উড়িয়ে দেওয়া চলে না। আমাদের যে দুটোই চাই। তথ্য না হলেও আমাদের কাজকর্ম বন্ধ, সত্য না হলেও আমাদের পরিত্রাণ নেই। নিকট এবং দূ, এই দুই নিয়েই আমাদের আমাদের যতকিছু কারবার। এমন অবস্থায় এদের কারও প্রতি যদি মিথ্যার কলঙ্ক আরোপ করি তবে সেটা আমাদের নিজের গায়েই লাগে।
অতএব যদি বলা যায়, আমার দূরের ক্ষেত্রে তারা স্থির আছে, আর আমার নিকটের ক্ষেত্রে তারা দৌঁড়চ্ছে তাতে দোষ কী? নিকটকে বাদ দিয়ে দূ, এবং দূরকে বাদ দিয়ে নিকট যে একটা ভয়ংকর কবন্ধ। দূর এবং নিকট এরা দুইজনে দুই বিভিন্ন তথ্যের মালিক কিন্তু এরা দুজনেই কি এক সত্যের অধীন নয়?
সেইজন্যেই উপনিষৎ বলেছেন - তদেজতি তন্নৈজতি তদ্দুরে তদ্বন্তিকে।
তিনি চলেন এবং তিনি চলেন না, তিনি দুরে এবং তিনি নিকটে এ দুইই এক সঙ্গে সত্য। অংশকেও মানি, সমস্তকেও মানি, কিন্তু সমগ্রবিহীন অংশ ঘোর অন্ধকার এবং অংশবিহীন সমগ্র আরও ঘোর অন্ধকার।
এখানে রবীন্দ্রনাথ কাব্যিক ভাষায় যে বিষয়ের উপস্থাপনা করেছেন তা ছিল গতিবিজ্ঞানের এক সমস্যা। পরবর্তী পর্বে এই নিয়ে আলোচনা করব।
(চলবে)

Post a Comment

আরো পড়তে পারেন

Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...