.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

মঙ্গলবার, ২২ মার্চ, ২০১৬

তিন রক্তকমল অগ্নিকন্যা

।। সুনীতি দেবনাথ ।।

 
(C)Image:ছবি























ঠিক এইখানে একটুও এদিক সেদিক নয়
ওরা সেই পার্বতী কন্যারা পথ রুখেছিল
এখানে ঠিক এখানেই রক্ত ঝরেছিল। 
রুখাশুখা মাটি শত জিহ্বায় শুষেছিল
ওদের তিনটি দেহে বুলেট বিঁধেছিল
ওদের রিয়া পাছড়া ফুটো হয়ে বিঁধেছিল
ওরা আর কোনদিন উঠে দাঁড়ালো না
লাশ হলো শুধু তিন পাহাড়ি আগুন
ফুলের মতন সুগন্ধা রৌদ্রস্নাত শরীর
মুহূর্তেই মাটির শরীরে শুয়ে পড়েছিল। 
হায়! আর কোনদিন ওদের চোখ খুলেনি,
তৃষ্ণা মেটালো মাটি তিন পার্বতী কন্যার রক্তে।
ওখানে রাত নেমেছিল ভয়ঙ্কর নিঝুম নিঝুম
মরদেরা ঘরে ফিরেছিল সংসারের অটুট টানে।
সবই তো ঠিকঠাক ছিলো কি যে হয়ে গেল
ওদের রাজা কুটুম রাজাতাই বিশ্বাস ছিল অটুট।
রাজার জীবন ওদের প্রিয় তাই বিশ্বস্ত সেনাবাহিনী
ওদের নিয়ে গড়েন রাজা, সারা রাজ্যের বিশ্বস্ত প্রজা
ছিলো ওরা দেববর্মারা চিরটা কাল ব্যাপী।
হায়! রাজা মরে গেলেন, নাবালক যুবরাজ!
ব্রিটিশ সরকার রিজেন্সি কাউন্সিল গড়ে
রাণীমা আর বাঙালি বাবুকে দিলেন দায়িত্বে!
ধিকিধিকি আগুন জ্বললো পাহাড়ি বনে ও মনে!
এতো বিশ্বাস এতো শ্রদ্ধা হারালো পথ অরণ্য আঁধারে,
এক আতঙ্ক কালো কালো বিষাদে ছেয়ে গেলো।
তার সাথে পেটে জ্বলন্ত ক্ষুধার আগুন দিল বিশ্ব যুদ্ধ
দুর্ভিক্ষে জরোজরো পাহাড়ি জনেরা বুকে জমে বিদ্রোহ!
গোলাঘাঁটি হলো বধ্যভূমি ক্ষুধার্ত নিরীহ দেববর্মার
আগুন দাউদাউ জ্বললো, এলো তিতুনের দিন
বেগার খাটার দিন হায়! শিশু বৃদ্ধ নারী বাদে
সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত বিনা মজুরির কঠোর দিন
হায়েনার বিকট হাঁ- এর মত ক্ষুধার্ত. বীভৎস দিন!
মিলিটারি- পুলিশী নির্মম অত্যাচারের নিকষ কালো দিন,
তিতুনের দিন এলো তিতুনের দিনরোদনের দিন!
বিক্ষুব্ধ প্রতিবাদ হলো গেরিলার প্রতিরোধ সংগ্রাম!
সেই ভয়ানক দিনে বিপর্যস্ত আবহে আদিম মানুষেরা
আত্মরক্ষার খাতিরে হাতে তুলেছিলো অস্ত্র আর
নারীরাও তাদের শিখেছিল সম্মুখ সংগ্রামের পদ্ধতি।
সেদিন খোয়াই পদ্মবিলের নারীবাহিনী পথ অবরোধে নামে
তিনটি নারী নাতো তিনটি প্রজ্বলিত দীপ্ত মশাল
ওরা বাহিনীর অগ্রভাগে জ্বলন্ত আগুন যেন
পথ রুদ্ধ করে দাঁড়ালো সশস্ত্র মিলিটারি-পুলিশ বাহিনীর।
ওরা আসছে খোয়াই সদর থেকে সদলে আক্রমণে
আদিবাসী মরদদের টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাবে কাজে
প্রমিলাবাহিনী সামনে খাড়া অটল প্রতিজ্ঞার মত
ঝাঁকে ঝাঁকে বর্ষিত হলো গুলি একটি নারীও টলেনি
সম্মুখবর্তিনী তিনটি দেহ লুটিয়ে পড়লো নিমিষে।
ছত্রভঙ্গ হলো বাহিনী ঝাঁক ঝাঁক বিষাক্ত তীর
প্রতিবাদে গেরিলারা ছুঁড়েছিলো তবুও হায়
রক্ত স্রোতে ভাসমান তিনটি রক্তপদ্ম দেহ তুলে নিল,
সেই নিষ্ঠুর নরপশুরা ত্বরিতে চলে গেল খোয়াই সদরে।
না কোনদিনও আর কুমারী মধুতী রূপশ্রীর মরদেহ
স্বজনেরা পায়নি দেখতে, পারেনি চোখের জলে
মুছাতে রক্তাক্ত প্রিয় দেহগুলি এমনি নিষ্ঠুর ওরা।
ত্রিপুরার গণবিদ্রোহের প্রথম তিন অগ্নিকন্যা
শহীদ হয়েছিল ভুলেনি ত্রিপুরার জনগণ ভুলবে না।
-- -- --
কাজরী,
১৬ মার্চ, ২০১৬
© সুনীতি দেবনাথ



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন