.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

সোমবার, ২১ মার্চ, ২০১৬

ঐতিহাসিক ভুলঃ হিন্দুত্ববাদী এবং সাম্যবাদীরা


বাংলা অনুবাদঃ মৃন্ময় দেব।
 সৌজন্যঃ অসমিয়া ফেসবুক গ্রুপ 'মুক্তচিন্তা'

 (লেখাটি আংশিক ভাবে শেয়ার করা যাবে না, শেয়ার করতে হলে পুরোটাই লেখকের নাম সহ শেয়ার করতে হবে।–লেখক।)

        
(C)Imageঃছবি
    ১
৯২০ দশকের আশে পাশে হিন্দুত্ববাদী ও সাম্যবাদী
এই দুই মতাদর্শ ভারতবর্ষে সাংগঠনিক রূপ পরিগ্রহ করতে আরম্ভ করে। একদিকে গড়ে উঠছিল কমিউনিস্ট পার্টি, হিন্দুস্তান সোসিয়েলিস্ট রিপাব্লিকান অ্যাসোসিয়েশন, ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পিজেন্টস পার্টির মত দলগুলো, আর অন্যদিকে হিন্দু মহাসভা, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ ইত্যাদি সংগঠনসমূহ।
আজ প্রায় নয় দশক পার হওয়ার পর হিন্দুত্ববাদীরা দেশ শাসন করছে। অপর দিকে সাম্যবাদী দল সমূহ দেশের কতকগুলো বিশেষ অঞ্চল তথা গণ-আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বিপ্লব দূর অস্ত, ভারতীয় সাম্যবাদীরা আজ অব্দি কেন্দ্রে একটি কল্যাণকামী সরকার গঠন করতেও সক্ষম হয়নি। এই অক্ষমতার অন্তর্নিহিত কারণগুলো পর্যালোচনা করে দেখা প্রয়োজন বইকি!  একটা কথা অবশ্য মনে রাখা দরকার যে, কোনো একটি সংগঠন ক্ষমতা দখলে সমর্থ হলেই সংগঠনটির মতাদর্শের শুদ্ধতা সাব্যস্ত হয় না। দৃষ্টান্তস্বরূপ, আজ মধ্য প্রাচ্যের এক বিরাট অংশ আইসিস, আল নুসরা, বোকো হারাম ইত্যাদি দক্ষিণপন্থী-ইসলামিক-মৌলবাদী   শক্তির হাতে রয়েছে। এই যুক্তিতে এরকম শক্তিগুলোকে শুদ্ধ ও সঠিক বিবেচনা করার কারণ নেই। মধ্য-প্রাচ্যে গণতন্ত্র আজ পরাজিত যদিও সেখানে গণতান্ত্রিক প্রমূল্যকে নাকচ করে দেওয়া নিশ্চয় সম্ভব নয়। সামাজিক সত্য বৈজ্ঞানিক সত্যের মত নয় যে একসময়  নিজেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আত্মপ্রকাশ করবে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর স্বার্থের প্রশ্নও। সে যা হোক, হিন্দুত্ববাদীদের জয় এবং সাম্যবাদীদের পরাজয় আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়। [ এ বিষয়েও নিশ্চয় আলোচনা হওয়া উচিত, এবং  হচ্ছেও ]আমরা বরং সাম্যবাদী এবং হিন্দুত্ববাদীদের কতকগুলো ঐতিহাসিক ভুল সম্পর্কে আলোচনা করার চেষ্টা করব, যে ভুলগুলো  নিয়ে আজও আলোচনা হয়ে থাকে। ভূমিকা অহেতুক দীর্ঘায়িত না করে বরং মূল বিষয়ে আসা যাক।
১) পাকিস্তান ও ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র প্রসঙ্গ: পাকিস্তানের দাবির মূলে এই ধারণাটি বর্তমান ছিল যে ভারতের হিন্দু ও মুসলমান এই দুটো সম্প্রদায় আসলে দুটো ভিন্ন ভিন্ন জাতি (nation) গঠন করেছে। মজার ব্যাপার যে, হিন্দু মহাসভা এবং মুসলিম লীগ  উভয়েই নীতিগত ভাবে এই কথা মেনে নেয়। হিন্দুত্ববাদীরা আজও ধর্মভিত্তিক জাতির বিষয়টিকে মান্যতা দেয়। এক্ষেত্রে তারা আজকাল কেবল হিন্দু ধর্মের পরিবর্তে হিন্দু সংস্কৃতি কথাটা ব্যবহার করে। যা হোক, হিন্দু মহাসভা এবং মুসলিম লীগের মধ্যে পার্থক্যটা এই ছিল যে মুসলিম লীগ তাদের জাতির স্বায়ত্ত্বতা দাবি করেছিল, আর হিন্দুত্ববাদীরা ভারতে হিন্দু জাতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে মুসলিম জাতিকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করার পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল। কিন্তু হিন্দু এবং মুসলমান-এই দুটো যে দুটো আলাদা  জাতি- সে বিষয়ে উভয়ের মনে বিশেষ কোনো মতভেদ ছিল না। মতভেদ ছিল কেবল এই নিয়ে যে দুটি জাতির অস্তিত্বের বিষয়টি কী উপায়ে মীমাংসা করা হবে?
এসবের বিপরীতে, সংস্কৃতির বিপরীতে কমিউনিস্টরা সর্বদাই আর্থিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ভারতীয় রাষ্ট্র গঠনের পোষকতা করে  এসেছে। এক্ষেত্রে পথ-প্রদর্শকের ভূমিকায় ছিলেন ১৯ শতকের কিছু ভারতীয় বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবী-যারা ব্রিটিশ শাসনের ঔপনিবেশিক-আর্থিক শোষণের দিকটি প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছিলেন কীভাবে ভারতের সম্পদরাশি লুণ্ঠন করে ব্রিটেনের  উদ্যোগীকরণের জন্য কাজে লাগানো হচ্ছিল (drain of wealth), কীভাবে কৃষিক্ষেত্রে অত্যধিক খাজনার ফলে জনগণের নাভিশ্বাস উঠছিল সে বিষয়ে তাঁরা বিস্তৃত লিখে গেছেন। রমেশ চন্দ্র দত্ত, দাদাভাই নৌরজী প্রভৃতি বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরাই আর্থিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তিটি নির্মাণ করেছিলেন যার খানিকটা সংশোধন করে কমিউনিস্টরাও পরবর্তীতে গ্রহণ করেছিল।
কিন্তু চল্লিশ দশকের আশে পাশে কতকগুলো জটিলতার সৃষ্টি হল। চল্লিশের প্রথম ভাগে মুসলিম লীগ তাদের লক্ষ্য হিসেবে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি পেশ করল। কংগ্রেস দলের প্রতি আনুগত্য থাকা মুসলমানের সংখ্যা যথেষ্ট হ্রাস পেল। লক্ষণীয় যে ১৯৪৭ সালের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জিন্না তাঁর কল্পনায় অধিষ্ঠিত পাকিস্তান নামক দেশটির কোনও মানচিত্র হাজির করতেও সক্ষম হতে পারেন নি। Ayesha Jalal দের মত কিছু সংখ্যক উদারপন্থী ইতিহাসবিদদের মতে জিন্না আসলে স্বাধীন ভারতবর্ষে হিন্দু এবং মুসলমানের সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের (proportional representation) দাবি জানিয়েছিলেন। [ প্রসঙ্গ গ্রন্থ: ‘The Sole Spokesman: Jinnah and the Movement for Pakistan’ by Ayesha Jalal, Oxford University Press, 1994]পাকিস্তানের দাবি আসলে জিন্নার জন্য এক বাগাড়াম্বরসর্বস্ব দাবি (rhetorical demand) ছিল যার মাধ্যমে তিনি কংগ্রেসকে কোণঠাসা করে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে মুসলমানের জন্য সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব আদায় করার চেষ্টা করেছিলেন। কংগ্রেস বরাবর এক শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার-অর্থাৎ  কেন্দ্রিকৃত ভারতের কল্পনা করেছে, অন্যদিকে জিন্না কল্পনা করেছিলেন আমেরিকা সদৃশ এক ফেডারেল ধাঁচের ভারতবর্ষের- যেখানে ফেডারেল প্রদেশ সমূহের হাতে যথেষ্ট ক্ষমতা বর্তাবে। অর্থাৎ, বঙ্গ, পাঞ্জাব প্রভৃতি অঞ্চলে মুসলমানের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে মুসলমানের স্বার্থ রক্ষিত হবে। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দুটি প্রদেশের অস্তিত্বের ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে হিন্দুরা মুসলমানের ওপর অত্যাচার চালাতে পারবে না। সে যাই হোক, এই পর্যায়ে কমিউনিস্ট নেতৃত্ব একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। কমিউনিস্ট নেতা পি সি যোশীর ভাষায় বিশ এবং ত্রিশের দশকে হিন্দু জনগণকে গান্ধীজী যেভাবে স্বাধীনতার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন, আজ জিন্নার অধীনে মুসলমান জনগণও একই ভাবে স্বাধীনতার জন্য জেগে উঠেছে। কাজেই মুসলিম লীগকেও আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের অংশীদার হিসেবে স্বীকার করে নিতে হবে।
চল্লিশের সময়কার কমিউনিস্ট পার্টির ডকুমেন্টগুলো পড়লে বার বার একটি বক্তব্য নজরে আসে-ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে  কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের মধ্যে একটা সমঝোতা হওয়া উচিত এবং সত্বর দেশের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে আমাদের ফ্যাসিবাদ বিরোধী যুক্তফ্রন্টে সামিল হওয়া আবশ্যক। ১৯৪৫-৪৭ সময়সীমায় কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন কৃষক এবং শ্রমিক আন্দোলন গুলো পুনরায় সক্রিয় হয়ে পড়ে। ভারতীয় নাবিকদের বিদ্রোহের ক্ষেত্রেও কমিউনিস্টরাই প্রধান ভূমিকা পালন করে। কংগ্রেস, লীগ এবং কমিউনিস্টদের লাল পতাকা নাবিকরা উত্তোলন করে। কমিউনিস্টরা বারংবার বলেছে-দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে লীগ এবং কংগ্রেসকে বোঝাপড়ায় আসা উচিত। ব্রিটিশের ভারত ত্যাগ করার ক্ষেত্রে ১৯৪৫-৪৭ সময়সীমার কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন আন্দোলনেরও বিশেষ ভূমিকা ছিল। [প্রসঙ্গ গ্রন্থ: “Modern India” by Sumit Sarkar, Oxford University Press]
অর্থাৎ, শর্তসাপেক্ষ ভাবে কমিউনিস্টরা মুসলিম লীগের ন্যায্যতা স্বীকার করে নেয়। অবশ্য মনে রাখা দরকার, পাকিস্তান যে একটি পৃথক  দেশ হবে সেটা ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। স্বয়ং জিন্নাও পাকিস্তানের একটি আলাদা মানচিত্র জনগণের সামনে পেশ করতে পারেন নি। ভারত বিভাজনের সময় লক্ষ লক্ষ লোক নিহত ও গৃহহারা হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল: শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ভারত এবং পাকিস্তানের ভৌগোলিক সীমা কী হবে - কিংবা দুটো আলাদা দেশ হবে না একটা দেশ হবে - সে সম্পর্কে সবার - এমন কি কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের নেতৃত্বও - নিশ্চিত ছিল না।  হঠাৎ আসা বিভাজনের করাল গ্রাস সব কিছু তছনছ করে দিয়ে  যায়।
যাই হোক না কেন, ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর কমিউনিস্ট পার্টি এই ভুলের সমালোচনা করল। সংখ্যালঘু মুসলমানদের জন্য কিছু বিশেষ রক্ষাকবচ দাবি করার প্রশ্নে আপত্তি থাকার কথা নয়, কিন্তু তাই বলে মুসলমানরা এক জাতি - এক নেশন - গঠন করেছেবলাটা মারাত্মক কথা। চল্লিশের দশকের বিভিন্ন দাঙ্গার সময় পাকিস্তানের দাবির ফলে চরম সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছিল। এইক্ষেত্রে মুসলমানদের জন্য আলাদা কিছু সাংবিধানিক রক্ষাকবচ দাবি করে পাকিস্তানের মত সাম্প্রদায়িক দাবির মোকাবিলা সফল ভাবে করতে না পারাটা কমিউনিস্ট আন্দোলনের জন্য এক বিরাট ব্যর্থতা ছিল।
অবশ্য কমিউনিস্টদের এই বিচ্যুতি ছিল সাময়িক বিচ্যুতি। কয়েক বছরের মধ্যেই তারা আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নিজস্ব লাইন ঠিক করে  নিয়েছিল। তার বিপরীতে হিন্দু মহাসভা, আর এস এস প্রভৃতি আজও ধর্মভিত্তিক জাতির ধারণাটিতে বিশ্বাস করে। স্বাধীনতার প্রাক্কালে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে লীগের সঙ্গে সঙ্গে হিন্দুত্ববাদীদেরও সমান ভূমিকা ছিল।
২) ভারত বিভাজনের কোনও বিকল্প ছিল কি? জিন্না কথিত দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকার তথা শক্তিশালী আঞ্চলিক সরকারের ফেডারেল ধাঁচার দৌলতে দেশটিকে বিভাজনের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভবপর ছিল কি? ‘ধর্মভিত্তিক জাতির ধারণাটির সমালোচনা করেও সংখ্যালঘুদের জন্য সাংবিধানিক রক্ষাকবচের দাবি রক্ষা করা কি সম্ভব ছিল? এই প্রশ্নগুলো আজও ইতিহাসবিদদের ব্যতিব্যস্ত  করে।  [ অসমীয়া হিসাবে মাঝে মধ্যে ভাবি-দুর্বল কেন্দ্র ও শক্তিশালী আঞ্চলিক সরকার যদি হত তাহলে কেন্দ্র অসমকে সৎ-মায়ের চোখে দেখছে’-এই জাতীয় ধারণারও অবসান ঘটত !! ] 
সাম্যবাদীদের শর্তসাপেক্ষে মুসলিম লীগকে সমর্থনের প্রসঙ্গটির উল্লেখ করে হিন্দুত্ববাদীরা এমন এক চিত্র নির্মাণের চেষ্টা করে যেন  তা কমিউনিস্টদের কোনও ষড়যন্ত্র ছিল। কমিউনিস্টরা ভুল করেছিল তা ঠিক। কিন্তু লীগের প্রতি কমিউনিস্টদের সমর্থন কখনোই শর্তহীন ছিল না। বরং কমিউনিস্টরা কংগ্রেসের মতই লীগকে এক জাতীয় শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল, উভয় পক্ষকে সমঝোতায় আসার জন্য আহবান জানিয়েছিল। কিন্তু একটি পৃথক পাকিস্তানের জন্য কমিউনিস্টরা কখনো রাস্তায় বেরোয়নি, আন্দোলন করেনি।
অথচ এর বিপরীতে হিন্দু মহাসভার মত সংগঠন সমূহের ভূমিকা কী ছিল? ১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনের প্রাক-মুহূর্তে,  প্রাদেশিক সরকারগুলো থেকে কংগ্রেসের পদত্যাগের সময়, তারা মুসলিম লীগের সঙ্গে একত্রে বঙ্গ, নর্থ ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রদেশ এবং সিন্ধ প্রদেশে সরকার গঠন করেছিল। কমিউনিস্টদের লীগ-প্রীতির কথা হিন্দুত্ববাদীরা বলতে ভোলে না, অথচ তারা লীগের সঙ্গে মিলে রাজভোগ করেছিল। কমিউনিস্টরা অন্তত লীগের প্রতি সমর্থনের বিনিময়ে কোনও বৈষয়িক সুবিধা লাভ করেনি, আশাও করেনি।
১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলন: কংগ্রেসের বিরুদ্ধে কমিউনিস্টদের একটা পুরোনো অভিযোগ ছিল যে, কংগ্রেস কোনও একটা আন্দোলন আরম্ভ করে মাঝপথে আন্দোলন বন্ধ করে দেয়। কখনো হিংসা প্রয়োগের অজুহাতে (চৌরি চৌরা প্রসঙ্গ), কখনোবা সরকারি প্রতিশ্রুতি লাভের পর (আইন অমান্য আন্দোলন প্রসঙ্গ) আন্দোলন স্থগিত করা হয়। কংগ্রেসের বিপরীতে কমিউনিস্টারা স্বাধীনতা লাভ না করা পর্যন্ত লাগাতার আন্দোলন করার পক্ষে ছিল। অথচ ১৯৪২ সালে সত্যি সত্যি সেই সুযোগ যখন হাতের কাছে  এলো তখন কমিউনিস্টদের স্থিতি ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। এর কারণ বুঝতে হলে খানিকটা পিছিয়ে যেতে হবে।
১৯১৩ সাল: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক-মুহূর্তলেলিন, রোজা লুক্সেমবার্গ-এর মত কমিউনিস্ট নেতারা ঘোষণা করলেন যে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধ কারো কল্যাণ সাধন করতে পারে না। কাজেই সকল দেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর উচিত নিজ নিজ দেশের সরকার গুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। অবশ্য ইউরোপের বেশির ভাগ সাম্যবাদী দল লেলিন-রোজাদের কথা শোনেনি। ফলে বিশ্বযুদ্ধে এক দেশের কৃষক সৈন্য অন্য দেশের কৃষক সৈন্যের রক্তে হাত লাল করল। যুদ্ধ-বিরোধী, শান্তিকামী আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলন ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে পড়ে। উন্মাদ জাতীয়তাবাদ আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ববোধের স্থান দখল করে নেয়।
বাম আন্দোলনের এই দশার প্রতি লক্ষ্য রেখে রুশ বিপ্লবের পর বলশেভিকরা সিদ্ধান্ত নেয় যে এখন থেকে ভ্রাতৃত্ববোধের খাতিরে বিশ্বের সমস্ত কমিউনিস্ট পার্টিগুলো যাতে দৃঢ় সাংগঠনিক ভিত্তিতে সমবেত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে তেমন একটি মঞ্চ গঠন করা উচিত। কমিনটার্ন নামের এই মঞ্চটির সিদ্ধান্তসমূহ সব কটি কমিউনিস্ট দলের উপর বাধ্যতামূলক ভাবে প্রযোজ্য হল। সে কারণেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিপরীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পৃথিবীর সমুদয় কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর উপর কমিনটার্নের সিদ্ধান্ত সর্বোপরি লাগু হল
কিন্তু প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে চরিত্রগত ভিন্নতা ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধ। এতে কোনো পক্ষকে ভালো কিংবা মন্দ বলার স্থল ছিল না। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল ফ্যাসিবাদ এবং মানব সভ্যতার মধ্যেকার যুদ্ধ। সে সভ্যতা বুর্জোয়া হবে-না সমাজবাদী হবে- সে প্রশ্ন ছিল গৌণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বহু পূর্বে ১৯৩৪ সাল থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর বিভিন্ন পুঁজিবাদী দেশকে জার্মান ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক মৈত্রী জোট গঠনের জন্য আহবান জানিয়ে আসছিল। জওহরলাল নেহরুর মত দূরদর্শী নেতার নেতৃত্বে সোভিয়েত ফ্যাসিবাদ বিরোধী লীগ গঠন করেছিল। কিন্তু সোভিয়েতের সমস্ত আহবান অরণ্য রোদনে পরিণত হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কুঁজো হয়ে পড়া ব্রিটেন এবং ফ্রান্স কোনোভাবেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল না। হয়ত তারা এরকমও ভেবেছিল যে হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করলে ফ্যাসিবাদ এবং কমিউনিজম-এই দুই শত্রুর কবল থেকে তারা নিস্তার পাবে। সেজন্যই হিটলারকে নিরন্তর তোষামোদ করা হয়েছে, একটার পর একটা দেশে অভিযান চালানো সত্ত্বেও তারা নীরব থেকেছে।
অবশেষে অবস্থা সঙ্গিন দেখে স্তালিন স্বয়ং হিটলারের সঙ্গে এক সন্ধিপত্রে সাক্ষর করেন। ১৯৩৯ সালের আগস্ট মাসে স্বাক্ষরিত হওয়া মলটভ-বিবেনট্রপ সন্ধি অনুসারে জার্মানি এবং রাশিয়া একে অপরকে আক্রমণ না করার ক্ষেত্রে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। অবশ্য স্তালিন-হিটলার উভয়েই জানতেন যে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। সে কারণেই সন্ধি পর্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্রুত গতিতে যুদ্ধ-প্রস্তুতি চালিয়ে যায়। হাজার হাজার ট্যাঙ্ক নির্মাণ করা হয়, অস্ত্রশস্ত্রের ভাণ্ডার গড়ে তোলা হয়, এরোপ্লেন নির্মাণ করা হয়। পরবর্তী কালে স্তালিনগ্রাদে জার্মানির বিরুদ্ধে বিজয় হাসিল করার জন্য এই সন্ধি-পর্ব যে বিশেষ ভাবে জরুরি ছিল সেটা প্রমাণিত হয়।
সন্ধির দুবছর পর ১৯৪১ সালের জুন মাসে জার্মানি রাশিয়া আক্রমণ করে। তারপরই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এক নতুন মাত্রা অর্জন করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন,আমেরিকা প্রভৃতি দেশের মধ্যে অবশেষে ফ্যাসিবাদ বিরোধী এক মিত্রজোট গঠিত হয়।
ভারতীয় কমিউনিস্টরা এই সমগ্র সময় জুড়ে ফ্যাসিবাদের বিপদ সম্পর্কে তুমুল অভিযান চালিয়েছিল। এক্ষেত্রে তাদের বিশেষ বন্ধু ছিলেন নেহরু। দেখতে গেলে কমিউনিস্টরাই হিটলার সম্পর্কে ভারতীয় জনগণকে সচেতন করে তোলে। কিন্তু এর পর ভারতীয় কমিউনিস্টরা বিশ্ব ইতিহাসের এক কুটিল পাক চক্রে জড়িয়ে পড়ে।
১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হয়। অথচ ফ্যাসিবাদ বিরোধী মিত্রশক্তির যুদ্ধ তখন তুঙ্গে অবস্থান করছে। এই পর্বে অন্য একটি উপাদান যুক্ত হয়: সে হচ্ছে জাপান, হিটলারের বন্ধু জাপান। Indivar Kamtekar নামের একজন অ-মার্ক্সবাদী ইতিহাসবিদ ‘Shiver of 1942’ শীর্ষক এক সাম্প্রতিক প্রবন্ধে দেখিয়েছেন যে ১৯৪২-এর কালসীমা বস্তুত ভারত ছাড়ো আন্দোলনের আবেগের বিপরীতে ভীষণ জাপান-ভীতির কাল ছিল। ভারত ছাড়ো আন্দোলন খুব তাড়াতাড়ি ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। ভয়ার্ত ব্রিটিশ সরকার পূর্বের বিপরীতে এবার প্রথমেই সব কংগ্রেসি নেতাকে বন্দি করে বসে। আন্দোলন হয়ে পড়ে দিশাহারা। ফলে হিংসার বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত ঘটনা এই সময়ে সব চেয়ে বেশি ঘটতে দেখা যায়। সেই অনুসারে সরকারি দমনও ছিল অতি ভয়ানক রকমের। কয়েক মাসের মধ্যেই ভারত ছাড়ো আন্দোলনের যবনিকাপাত হয়।
এর বিপরীতে ১৯৪২এর পরবর্তী সময়কাল ছিল প্রচণ্ড জাপান-ভীতির সময়। জাপান কখন ভারত আক্রমণ করে, তার কোনও ঠিক  নেই। কলকাতার ভদ্রলোকেরা বলতে শুরু করে: আমরা প্রথমে বাঁ-দিক থেকে ডান দিকে লিখতে শিখেছি, মুসলমান আসার পর ডান দিক থেকে বাঁয়ে লিখতে শিখলাম। এখন [জাপানী এলে] উপর থেকে নিচের দিকে লিখতে শিখতে হবে।জাপানীর ভয়ে কলকাতা সহ  অন্যান্য শহর থেকে মানুষ দ্রুত পালাতে আরম্ভ করে। ইতিমধ্যেই জাপানীদের দখল করা রেঙ্গুন, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি অঞ্চল থেকে হাজার হাজার ভারতীয় কলকাতায় এসে উপস্থিত হয়। তাদের মুখ থেকে স্থানীয় মানুষেরা জাপানীদের অপরাজেয়তা বিষয়ে ভীষণ গুজব-রটনা শুনতে পায়। মানুষের বিশ্বাস জন্মায় যে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইতিমধ্যে পতন ঘটেছে।   
কিছু মজার ঘটনাও ঘটেছিল। বিভিন্ন চিড়িয়াখানার বাঘ, ভালুক প্রভৃতি হিংস্র জন্তুগুলোকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছিল, কেননা জাপানী বোমা চিড়িয়াখানায় পড়লে বাঘ-ভালুক মুক্ত হয়ে শহরে আতঙ্ক সৃষ্টি করার সম্ভাবনা ছিল। এমনকি মাদ্রাজ, বোম্বের মত শহরগুলোতেও জাপানী ভীতি বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। শ্রমিকরা ফ্যাক্টরির কাজ ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাচ্ছিল, দিল্লীর জিমখানা ক্লাবের সদস্যরা আধা মস্করা-আধা গম্ভীর ভাবে সাব্যস্ত করছিল আমাদের এখুনি জাপানী শিখে ফেলাটা ভাল হবে কি? জাপানীরা ইতিমধ্যেই বঙ্গ সাগরে ১০০টিরও বেশি ছোটখাটো ব্রিটিশ জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছিল। ভারতীয় অফিসারদের ভয় ছিল-জাপানীরা  কোনোভাবে স্থল পথের পরিবর্তে জলপথে এগিয়ে এলে ব্রিটিশ ভারতের পরাজয় নিশ্চিত কেননা ওই সময় ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জাহাজগুলো পূর্ব আফ্রিকার কাছাকাছি অঞ্চলে ব্যস্ত ছিল।
...
ভারতের প্রতিবেশী দেশ চীনের বহুলাংশ ইতিমধ্যেই- ১৯৩০এর দশক থেকেই- জাপান অধিকার করে রেখেছিল। লক্ষ লক্ষ চীনা  মানুষ জাপানীদের হাতে মৃত্যুবরণ করেছিল। বিচার করতে গেলে ব্রিটিশদের থেকেও হাজারগুণ ভয়ানক ছিল জাপানীরা। ব্রিটিশরা  অন্তত এক  উদারবাদী সংসদীয় পরম্পরায় বিশ্বাস করত। সেই গুণে ১৯০৯ সাল থেকেই নির্বাচনের মাধ্যমে ভারতীয় প্রতিনিধি চয়ন  করার  প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত হয়েছিল। তার বিপরীতে জাপানী সৈন্যবাদ ছিল এক চরম প্রতিক্রিয়াশীল তথা আগ্রাসী শাসনতন্ত্র। ব্রিটিশ অধিকৃ ভারত এবং জাপান অধিকৃত চীনের তুলনা করলেই দুয়ের পার্থক্য বোঝা যায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, জাপানের দখল করা অঞ্চলসমূহে কমিউনিস্টরাই কিন্তু  প্রতিরোধ সংগ্রামে অগ্রভাগ নিয়েছিল। ১৯৪৯ সালের চীন বিপ্লবের সাফল্যের অন্যতম কারণ ছিল জাপান-বিরোধী সংগ্রামে চীনা কমিউনিস্টদের ভূমিকা। ঠিক সেভাবেই, জাপানীদের বিরোধিতা করেই বার্মা, ইন্দোনেশিয়া, জাভা, ফিলিপাইন্স ইত্যাদি বিভিন্ন অঞ্চলে কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। ১৯৪২ সালে জাপানের ভারত-জয়ের সম্ভাবনা যথেষ্ট ছিল। জাপানীরা জয়ী হলে হয়ত কমিউনিস্টরাই জাপান-বিরোধী সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতেন। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে জাপানীরা পরাজিত হয় এবং কমিউনিস্টরা ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করার জন্য দেশ জুড়ে নিন্দিত হয়। ১৯৪৩ সালে কমিনটার্ন ভেঙ্গে দেওয়া হয়। তারপর থেকেই কোনও আন্তর্জাতিক মঞ্চের দ্বারা বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনগুলোকে প্রত্যক্ষ নির্দেশ দেয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ  হয়। এই নীতি গ্রহণ করা হয় যে কোনও একটি দেশের পার্টি কী ধরনের রণনীতি পালন করবে তা সে দেশের কমিউনিস্ট নেতৃত্ব নিজেই স্থির করবে।
...
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আত্মসমালোচনা করে এই কথাই বলল যে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় তাদের নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া উচিত হয়নি। এই বিষয়ে আমাদেরও নিজস্ব কিছু মন্তব্য আছে, তবে তার আগে হিন্দুত্ববাদীরা বিশ্বযুদ্ধের সময় কী ভূমিকা নিয়েছিল দেখা যাক। হিন্দু মহাসভার মত সংগঠন ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করে ব্রিটিশ সরকারের সমর্থনে দাঁড়ালো। সরকার যুক্তি দিল-এই সময় যতটা সম্ভব হিন্দুদের সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া প্রয়োজন যাতে পরবর্তীতে মুসলমানের সাথে ভাল করে যুদ্ধ করা যায়। একই সময়ে তারা আবার ক্ষমতার লোভে তিনটি প্রদেশে-বঙ্গ, সিন্ধ এবং উত্তর পশ্চিম ফ্রন্টিয়ার প্রদেশে মুসলিম লীগের সঙ্গে মিলে সরকারও গঠন করল।
ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিগুলো ১৯৪২এর সময় কালে নিজেদের ভূমিকার সমালোচনা করে এসেছে, কিন্তু হিন্দুত্ববাদীরা ১৯৪২এ নিজেদের ভূমিকা বিষয়ে কোনো সমালোচনা করার কথা আজ পর্যন্ত আমাদের কর্ণগোচর হয়নি। তারা বরং এই কথাটা চেপে রাখতেই  সচেষ্ট। ১৯৪২ সালে হিন্দুত্ববাদী ও সাম্যবাদী-উভয় মতাদর্শের মানুষেরা ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগদান করেনি। কিন্তু উভয়ের উদ্দেশ্য ভিন্ন ভিন্ন ছিল। কার উদ্দেশ্য মহান ছিল-পাঠক নিজেই তা বিচার করবেন।
ব্যক্তিগত ভাবে আমাদের মনে হয় ১৯৪২ সালে জাপান জয়ী হবে কি হবে না সে বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অবস্থা কোনও পক্ষেরই ছিল না। ইতিমধ্যেই পূর্ব এশিয়ার সমস্ত অঞ্চল জাপান দখল করে নিয়েছিল। অন্যদিকে ব্রিটেনকে বাদ দিয়ে সমগ্র ইউরোপ হিটলারের দখলে ছিল। সে হিসেবে বিচার করলে এমন ধারণা হয় যে ওই সময় ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ঘোষণা এক ভুল ঘোষণা  ছিল। কমিউনিস্টদের পার্টি লাইন কোনো সোভিয়েত রাশিয়ার দালালি করার জন্য নির্মিত হয়নি, প্রকৃতার্থে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করে তাদের লোকসানই বেশি হয়েছিল। কিন্তু যখন বিশ্বে আপনার সম্মুখে ফ্যাসিবাদ বনাম মানব সভ্যতাএই দ্বি-চয়ন সৃষ্টি হয়েছিল সেক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকারের সাথে সহযোগিতা করাটাই উত্তম ছিল। আজ বহু বছর অতিক্রম করে এসে কমিউনিস্টদের সমালোচনা করা সহজ, কিন্তু সেই সময়ের পরিস্থিতির কথা মাথায় রাখলে আপনিও হয়ত এই ধরনের সিদ্ধান্তই গ্রহণ করতেন।
একটা কথা ঠিক যে কমিউনিস্টরা কোন সংকীর্ণ অর্থে জাতীয়তাবাদী নয়। তাদের দৃষ্টি সব সময় বিশ্ব-প্রেক্ষাপটে নিবদ্ধ থাকে। কখনো তাদের ভুল হতেই পারে, হয়েছেও। কিন্তু তাদের সিদ্ধান্তের মূলে থাকা নীতিগুলোকে আমাদের সম্মান জানাতেই হবে। মনে রাখা ভালো, বিশ্বকে ফ্যাসিবাদ-মুক্ত করার ক্ষেত্রে নির্ণায়ক ভূমিকা কিন্তু স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধই নিয়েছিল। ফ্যসীবাদীদের বিরুদ্ধে গোটা বিশ্বে কমিউনিস্টরাই সংগ্রাম গড়ে তুলেছিল। সমগ্র পূর্ব ইউরোপ, অ্যালবেনিয়া, য়ুগোস্লাভিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া প্রভৃতি দেশে কমিউনিস্ট  বিজয়ের অন্তরালে জার্মানি-জাপান বিরোধী কমিউনিস্ট প্রতিরোধ সংগ্রামের ভূমিকাই ছিল। ইতালি, ফ্রান্স, গ্রীস ইত্যাদি দেশে জার্মানির বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করার সুনামের দরুন কমিউনিস্ট দলগুলো ব্যাপক গণভিত্তি থাকা দলে পরিণত হয়েছিল। পূর্ব এশিয়ার  বিভিন্ন দেশে-বার্মা, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া প্রভৃতিতে কমিউনিস্ট দল সংগঠনের অগ্নি-ভিত তৈরি হয়েছিল জাপান বিরোধী সংগ্রামের মাধ্যমেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতের উদ্যোগীকরণের প্রয়োজনে পুঁজি এবং যন্ত্রপাতি সস্তায় যোগান দিয়েছিল সোভিয়েত  ইউনিয়ন-ই। কমিউনিস্টদের বিভিন্ন কারণবশত সমালোচনা করা যায় নিশ্চয়, কিন্তু তাই বলে তাদের দেশ-বিরোধী আখ্যা দেওয়া হাস্যকর বইকি!         

  

                   




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন