রবিবার, ১৯ মে, ২০১৩
লহ প্রণাম
।।পিংকি পুরকায়স্থ চন্দ্রানী।।
স্থান
Silchar, Assam, India
ক-ত-কা-শ-বী-সু-কু-স-হী-চ-সু
বরাকের মাটিতে বাঙালির বুকেতে
রাখিল সকলে প্রাণের বদলে
বাংলা ভাষা'কে।
শেখাল বাংলার নব প্রজন্মকে-
হারানো গৌরব ফিরিয়ে পেতে
নিজের অধিকার ছিনিয়ে নিতে।
জাগাল মনে- "নিজত্ব, স্বতন্ত্র ও নিজস্ব"
এই ভাবনাগুলিকে।
প্রথিত হোক সবার হৃদয়ের মাঝে
প্রত্যাশা এই নব প্রজন্মের কাছে
চিনে যেন নেয় জেনে যেন নেয়
"ক-ত-কা-শ-বী-সু-কু-স-হী-চ-সু"-কে
স্থান
Silchar, Assam, India
শনিবার, ১৮ মে, ২০১৩
মাতৃভাষার মৃত্যু ও অন্যান্য
।।দেবব্রত আচার্য।।

পাঠক, ভাবুন আপনার মাতৃভাষা এমন একটি ভাষা যা একমাত্র আপনিই জানেন। এই বিশাল বিশ্বে আর কেউ নেই যিনি আপনার ভাষা বলতে বা বুঝতে পারেন। আপনার মৃত্যুর সাথে সাথে হাজার বছরের পুরোন পিতৃপুরুষের ভাষার ও মৃত্যু ঘটবে। এই ভাবনাটা ভয়ঙ্কর। এই সেদিন আন্দামানের আকা বো ( Aka Bo ) নামক একটি ভাষার শেষ কথোপকথনকারী মারা গেলেন। কী ভীষণ রকমের কষ্ট বুকে নিয়ে উনি এই পৃথিবী থেকে চলে গেছেন তা ভাববার মতো মানসিক শক্তি আমার এই মুহূর্তে নেই। জীবিত থাকা অবস্থায় এই ভিডিওটি ধারণ করা হয়। দেখুনঃ
আপনি যখন এই লেখাটি পড়তে পারছেন তখন ধরে নিচ্ছি আপনি একজন বাঙালী । আপনি সেই সৌভাগ্যবানদের একজন যাদের ভাষাটি এই মূহূর্তে হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই। আপনি এই লেখাটি পড়ার সময় প্রতি চৌদ্দ দিনে একটি করে ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে সময়ের অতলে। সে সব মৃত ভাষা গুলোর স্থান হচ্ছে ধুলি ধূসর কোন এক সংগ্রহশালা। ১৯৯২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক ভাষা পণ্ডিত আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, একুশ শতকের মধ্যেই পৃথিবী থেকে ৯০ শতাংশ ভাষা চিরতরে বিলুপ্ত হবে। ইউনেস্কোর মতে পৃথিবীতে প্রায় ৬০০০ ভাষা হারিয়ে যাওয়ার বিপদে রয়েছে। এই মূহূর্তে আপনার ভাষাটি যদিও হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই তার মানে এই নয় যে তা হারিয়ে যেতে পারে না। পরাক্রমশালী আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের ভাষা মেসোডোনিয়াতে কথা বলেন এখন খুব অল্প সংখ্যক মানুষ। পৃথিবীর প্রধানতম ধর্ম প্রণেতা যীশু যে-ভাষায় কথা বলতেন সেই ভূমধ্যসাগরীয় আরামাইক ভাষা ও প্রায় বিলুপ্তির পথে । এরকম অনেক উল্লেখযোগ্য ভাষাই আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।
ভাষা কি ও পৃথিবীতে কতটি ভাষা আছে?
ভাষা একটি সচল ও ক্রম পরিবর্তনশীল সত্ত্বা যা দিয়ে মানুষ শব্দ, চিহ্ন কিংবা শারিরিক অভিব্যক্তির সাহায্যে একে অন্যের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে । ভাষার এই সচলতা ও ক্রম পরিবর্তনশীল চরিত্রের জন্য এর সঠিক সংখ্যা নিরূপণ কঠিন কাজ। অনুমান করা হয় যে খ্রীষ্টপূর্ব ৮০০০ শতকে পৃথিবীতে প্রায় ২০০০০ সচল ভাষা ছিল। ভাষা পণ্ডিতদের মতে সেই সংখ্যা কমে বর্তমানে সচল ভাষা রয়েছে মাত্র ৬৫০০ । এই ভাষা গুলোর রয়েছে এক বা একাধিক মাতৃ ভাষাভাষী বক্তা (native speaker) । তাদের প্রথম ভাষা (first language ) হিসেবে এটি জন্মসূত্রে প্রাপ্ত।
কেন ভাষা হারিয়ে যায়?
বিভিন্ন কারণে ভাষা হারিয়ে যেতে পারে। একটি অন্যতম কারণ নগরায়ণ ( urbanisation ) । আজকের এই বিশ্বায়নের যুগে অর্থনৈতিক কারণে প্রব্রজনের ফলে বিভিন্ন সম্প্রদায় এক সাথে বাস করতে বাধ্য হচ্ছে। একটি কুকি ভাষাভাষী পরিবার এবং একটি চাকমা পরিবার যদি গৌহাটিতে অভিবাসী হয় তবে তারা হয়ত একে অন্যের সাথে সেখান কার কাজের ভাষা অসমিয়া বা হিন্দি তে কথা বলবে। সেই কুকি-চাকমা পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্ম হয়তো মা-বাবার কাছ থেকে একটু আধটু মাতৃভাষা শিখবে, কিন্তু তৃতীয় প্রজন্মে এসে সেই প্রাসঙ্গিকতাও হারাবে। মানুষ কেন নগরমুখী হয় তা নিয়ে অন্য সময় আলোচনা করা যাবে। এই নগরায়ণ খুব দ্রত পরিবর্তন করে দিচ্ছে আমাদের ভাষিক ল্যান্ডস্কেপ।
নগরায়ণ থেকেও বিপদজনক কারণটি হল রাষ্ট্র নিজে। ছোট ছোট জাতি সত্তা গুলো বার বার রাষ্ট্রের কাছে হারিয়েছে তার ভাষা ও সংস্কৃতি। এই সত্তা গুলোকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়া হয় রাষ্ট্রের সাথে একাত্ম ( assimilate ) করতে । অস্ট্রেলিয়ার 'হারিয়ে যাওয়া প্রজন্ম' ( Stolen Generation ) এর কথা আমরা সবাই জানি। কিভাবে মায়ের কোল থেকে জোরপূর্বক আদিবাসী ( aboriginal) ছেলে মেয়েদের নিয়ে গিয়ে বদলে দেয়া হত তাদের ভাষা সংস্কৃতি তা আজো অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে পরিগণিত হয়। ঠিক তেমনি ১৯৬১ সালে ভারতের আসাম সরকার, আসামের সংস্কৃতি ও ভাষিক বৈচিত্র্য কে নষ্ট করে দিতে প্রচেষ্টা চালিয়ে ছিল। যার প্রতিবাদে ১৯ মে এগারো জন শহিদ হয়েছিলেন আসামের শিলচরে। ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি যুগে যুগে বিভিন্ন ভাবে ভাষিক সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতিকে দমন করার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে সচেতন ভাবে। উপনিবেশিক শক্তির যাঁতাকলে পরে ও হারিয়ে গেছে অনেক ভাষা-সংস্কৃতি । আমাদের এই বৈচিত্র্য পৃথিবী ক্রমেই একমাত্রিক হয়ে ওঠার চেষ্টায় ব্রতী। সংস্কৃতি ও ভাষিক বৈচিত্র্য ( cultural and linguistic diversity ) হারিয়ে দেশে দেশে তৈরী করা হচ্ছে হ্যারি পটার প্রজন্ম। এ প্রজন্ম না পারছে চিনে নিতে নিজের সংস্কৃতি, না পারছে অন্য সংস্কৃতি কে শ্রদ্ধা করতে। ভুলতে বসেছে যে নিজে কে জানার মাঝেই লুকিয়ে আছে অন্যকে জানার ও সম্মান করার চাবিকাঠি।
এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে ইন্টারনেটে ইংরেজী ভাষার আধিপত্য অন্যান্য ভাষার প্রচার ও প্রসারকে হুমকির মুখে ফেলেছে। কিছু কিছু ভাষার মিডিয়া মনোপলি অপেক্ষাকৃত ছোট ভাষাগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষা শেখার ক্ষেত্রে বিপরীত ভূমিকা পালন করছে। শিশুরা ভিন্ন ভাষায় চলচ্চিত্র, কার্টুন যাই দেখুক না কেন, সে ভাষা ক্রমে তার মস্তিষ্কে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে । তারা ক্রমে শিখে ফেলে সেই ভাষা এবং এক সময় সেই ভাষা ব্যবহারও করে। আর এভাবে ব্যবহার করতে করতে এক সময় ভুলে যায় পিতৃপুরুষের ভাষা। দূর্বল হয়ে পড়ে পারিবারিক যোগসূত্র (লিঙ্ক) । তৃতীয় প্রজন্ম ( নাতি) বুঝতে পারে না প্রথম প্রজন্মের ( দাদু ) ভাষা। যদিও বা যোগসূত্রটুকু থাকে তাও হয়ে পড়ে ভীষণ রকম নড়বড়ে।
ভাষা হারিয়ে গেলে কি হয়?
সংস্কৃতি ( culture ) বলতে আমরা বুঝি আমাদের সামগ্রিক জীবন যাপন প্রক্রিয়া যা হাজার হাজার বছরের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় পিতৃপুরুষের হাত ধরে আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে । বিভিন্ন সম্প্রদায়ের এই জীবনযাপন প্রক্রিয়া আলাদা। আর সেই আলাদা বিশ্বাস,মুল্যবোধ ও জীবনযাপন প্রক্রিয়া দিয়েই চেনা যায় তাদের আলাদা করে । মূলত সেটাই তাদের পরিচয় হয়ে দাড়াঁয় ( ethnic identity )। সেই পরিচয়ের মৌলিক একটা উপাদান হলো ভাষা। সংস্কৃতি প্রকাশের আধার এটি। আমাদের বিশ্বাস,মূল্যবোধ ও জীবন যাপন প্রক্রিয়া এর দ্বারা প্রবাহিত হয় এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে। আমাদের সামগ্রিক পরিচয় ও সংহতির ধারক ও বাহক ভাষা। আমরা যেহেতু সেই সমগ্রের অংশ তাই ভাষা আমাদের আত্ম পরিচয়ের অংশও বটে। ভাষার মৃত্যু মানে সেই সংস্কৃতি ও পরিচয়ের মৃত্যু।
আসুন নিজ নিজ মাতৃভাষা কে তার উপযুক্ত সম্মান দেই। নিজের সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের মৃত্যুকে প্রতিরোধ করি।
স্থান
Sydney NSW, Australia
শুক্রবার, ১৭ মে, ২০১৩
বরাকের ভাষা সংগ্রাম - একটি বামপন্থী মূল্যায়নের সন্ধানে
।। শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার।।
বরাক উপত্যকার ভাষা সংগ্রাম নিয়ে যতটা আবেগের প্রকাশ, তার তুলনায় বস্তুনিষ্ঠ
আলোচনা বা রাজনৈতিক মূল্যায়ন খুবই কম। ভাষা সংগ্রামের প্রথম ঢেউ আছড়ে পড়ে ষাটের শুরুতে,
কিন্তু এ নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ লেখালেখি হতে হতে প্রায় দু’টি দশক কেটে গেছে। তাও সেই অর্থে
গবেষণাধর্মী পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন এখনও হয় নি। প্রথম পর্বে যে সমস্ত লেখালেখি হয়েছে,
তার বেশিরভাগটাই স্মৃতিকথা। এই স্মৃতিকথা নিয়েও নানা মুনির নানা মত। কেউ বলেন, এতে
বিভিন্ন ব্যক্তির তরফে অতিকথন রয়েছে, কেউ বলেন এতে ইতিহাস বিকৃত হয়েছে। কেউ বলেন, এই
স্মৃতিকথাগুলিতে অনেক সত্য অনুল্লেখিত রয়ে গেছে। পরবর্তীতে অবশ্য কিছু কিছু গবেষণাধর্মী
লেখার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন অনেকে। সম্প্রতি দুয়েকজন বিচ্ছিন্নভাবে বিধিসম্মত গবেষণাও
করেছেন বা করছেন এই ঐতিহাসিক সংগ্রাম নিয়ে। কিন্তু এই সংগ্রামের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক
তাৎপর্যের নিরিখে এই উদ্যোগগুলিকে খুবই প্রাথমিক স্তরের, যদিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ,
মনে হবে।
যে সামান্য লেখালেখিকে নির্ভর করে বরাকের ভাষা সংগ্রাম
নিয়ে চর্চা হয়, সেই লেখালেখিগুলিও ভীষণ রকমের আঞ্চলিক দৃষ্টিকোণের দ্বারা আক্রান্ত।
আসাম রাজ্যের রাজনীতি বা সামাজিক সাংস্কৃতিক বাস্তবতার নিরিখে বরাকের ভাষা সংগ্রামের
মূল্যায়ন করার কোনও উদ্যোগ এখনও পরিলক্ষিত হয় নি। এই কথাটি দু’দিক থেকেই সত্য। বরাক
উপত্যকায় যেমন এই সংগ্রামের ইতিহাসকে রাজ্যগত দৃষ্টি থেকে পর্যালোচনা করা হয় নি, ঠিক
তেমনি অবশিষ্ট আসামেও বুদ্ধিজীবী মহলে বা রাজনৈতিক স্তরে বরাকের ভাষা সংগ্রাম নিয়ে
কোনও গভীর অনুসন্ধান করেন নি কেউ। অন্তত তেমন কোনও আলোচনা এখনও সাধারণ্যে প্রকাশিত
হয় নি। অবশিষ্ট আসামের উদার মনোভাবে ভিন্নভাষাগোষ্ঠীর বিদ্বৎসমাজের কাছে বরাকের ভাষা
সংগ্রাম একটি পৃথকত্বমুখী রাজনৈতিক ঘটনা ছাড়া আর কিছু নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের কাছে
এটি একটি বাঙালি উগ্রতার বহিঃপ্রকাশ। এই সমস্যা অবশ্য শুধু বরাকের ভাষা সংগ্রাম নিয়েই
নয়। বরাক ও অবশিষ্ট আসামের মধ্যে অন্যান্য বিষয় নিয়েও তেমন কোনও প্রাতিষ্ঠানিক বা সামাজিক
সংলাপ আমরা খুব একটা দেখি নি। এক অলিখিত বিভাজন যেন কাজ করে মানসিকতার স্তরে। লেবাননের
ক্ষেত্রে আমরা যেমন জেনেছি যে সেখানে সরকারি বৈধতা নিয়েই দেশের ভেতর খ্রিস্টান ও মুসলিমদের
আলাদা অঞ্চল। দুই অঞ্চলের মাঝে অনেক ক্ষেত্রেই কাঁটাতারও রয়েছে। বরাক ও বহির্বরাক নিয়ে
সরকারিভাবে কোনো সীমান্ত বিভাজন না থাকলেও দু’টি অঞ্চলেই মানসিকতার স্তরে এক জল বিভাজন
রেখা রয়েছে। অথচ বহুভাষিক বহুসাংস্কৃতিক বহুজাতিক আসাম রাজ্যে এক মৈত্রী ও পারস্পরিক
সহযোগিতার সমাজ গড়ে তুলতে এই রাজ্যের বহুমুখী বৈচিত্রের তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চর্চা
অত্যন্ত জরুরি। বামপন্থী আন্দোলনের জন্যে বলা বাহুল্য, এই চর্চা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামী ঐক্য গড়ে তুলতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিভিন্ন অংশের শ্রমজীবী
মানুষের সামাজিক ঐক্য। সামাজিকস্তরে যে সংলাপ বিভিন্ন অংশের মধ্যে চলতে থাকলে শ্রমজীবী
মানুষের মধ্যে সংগ্রামী ঐক্যের পাশাপাশি সামাজিক মিলন ঘটে, সেই সংলাপের স্বার্থেই বামপন্থীদের তরফে বরাকের ভাষা সংগ্রাম ও রাজ্যের
বিভিন্ন অংশের নানা ভাষা জাতিগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়ের সংগ্রামের গভীর পর্যালোচনার প্রয়োজন
রয়েছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, এ ক্ষেত্রে এখনও কোনও উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয় নি কোত্থাও।
বরাকের ভাষা সংগ্রাম যদিও
১৯৬০ সালের রাজ্যভাষা আইনের প্রতিক্রিয়ায় জন্ম নিয়েছিল, তবু এর প্রেক্ষাপটটি যুক্ত
হয়ে আছে এই অঞ্চলের ইতিহাসের সাথে। আরো স্পষ্ট করে বললে, ইতিহাসের নানা পর্যায়ে এই
অঞ্চলের ভূগোলের ভাঙা-গড়ার সাথে সম্পৃত্ত হয়ে আছে বরাকের ভাষা সংগ্রামের প্রশ্নটি।
আবার, পণ্ডিতদের কাছে সমস্যাটা আসামের পরিচয় নিয়েও। আসাম কি বহুজাতিগোষ্ঠী অধ্যুষিত একটি
বহুভাষিক রাজ্য, নাকি আসাম মূলত একটি একভাষী রাজ্য? অসমীয়াভাষী ছাড়া অন্য ভাষাগোষ্ঠীর
মানুষ বা আরও পরিষ্কারভাবে বলতে গেলে বাঙালিরা কি এখানে নিতান্তই বহিরাগত এবং ফলে উটকো,
নাকি শতাধিক বছর পাশাপাশি বাস করার ফলে এখানকার স্থানীয় মানুষদেরই একজন হয়ে গেছেন?
আসামের ভাষা ও জাতি সমস্যা নিয়ে পণ্ডিত গবেষকরা এ পর্যন্ত যে প্রতিবেদনগুলি তৈরি করেছেন,
তার বেশিরভাগই রাজ্যের মূল সমস্যার খণ্ডিত চিত্র তুলে ধরেছে। আগেই বলেছি. বরাক উপত্যকার
ভাষা সংগ্রাম নিয়ে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার তাত্ত্বিকেরা প্রায় নীরব। দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদী পণ্ডিতেরা বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনকে পৃথকত্ববাদী প্রবণতা হিসাবেই দেখেছেন। তাদের
কাছে, একষট্টি, বাহাত্তর, ছিয়াশির ভাষা আন্দোলন আসামের মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার
প্রবণতার প্রকাশ ছাড়া কিছু নয়। অন্যদিকে, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বামপন্থী বুদ্ধিজীবী
এবং রাজনৈতিক কর্মীরা, যারা সংকটের দিনে ভাষিক সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়িয়ে নিগৃহীত হয়েছেন
নানা সময়ে, তারাও বরাক উপত্যকার ভাষা সংগ্রাম বা আসামের রাজনীতিতে এই সংগ্রামের তাৎপর্য
তাৎপর্য সম্পর্কে খুব একটা অবহিত নন। বরাক উপত্যকায় সাধারণভাবে ভাষা সংগ্রামকে দেখা
হয়ে থাকে শুধুমাত্র বাঙালিত্বের ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে। প্রকৃতপক্ষে, এই আন্দোলন বঙ্গভাষী
মানুষের প্রধান অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বে গড়ে উঠলেও এর তাৎপর্য ছিল অনেক গভীর ও বিস্তৃত।
শুধুমাত্র বাঙালিত্বের গণ্ডিতে একে দেখলে ঐতিহাসিক
ভুল হবে। প্রকৃতপক্ষে, বহুভাষিক আসামের স্বাধীনতা উত্তর রাজনীতির প্রধান দ্বন্দ্বটিই
এখানে প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে। একদিকে আসামের শাসকশ্রেণি চেয়েছে রাজ্যের বহুভাষিক চরিত্রকে
অস্বীকার করতে, আর অন্যদিকে বরাক উপত্যকার ভাষা সংগ্রামসহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের
ছোট ছোট জাতিগোষ্ঠীগুলির সংগ্রামগুলি মূলগতভাবে চেয়েছে আসামের বহুভাষিক, অসংখ্য ছোট
বড় জাতিগোষ্ঠীগত পরিচয়কে (multilingual and multi-ethnic) প্রতিষ্ঠিত করতে। গত পঞ্চাশ
বছরের আসামের রাজনীতি ঘুরপাক খাচ্ছে এই কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্বের আবর্তে। ১৯৬০ সালে সরকারি
ভাষা আইনের মাধ্যমে আসামের সরকারি ভাষা হিসাবে যখন একমাত্র অসমীয়া ভাষাকেই চাপিয়ে দেবার
প্রচেষ্টা হচ্ছিল, তখন প্রতিবাদ ধ্বণিত হয়েছিল শুধু বাঙালি নয়, সমস্ত অনসমীয়া ভাষাগোষ্ঠীগুলির
তরফ থেকে। এই প্রতিবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রে অবশ্যই ছিলেন বরাক উপত্যকার বঙ্গভাষী সমাজ,
তবে বিভাজন ছিল অসমীয়া ও অনসমীয়ার, শুধু বাঙালি অসমীয়ার নয়। ১৯ শে মে শিলচর রেল স্টেশনে
গুলিতে এগারো জন বাঙালি যুবক যুবতী প্রাণ দিলে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শিলং শহরে
হাজার হাজার খাসি সম্প্রদায়ের মানুষ মৌন মিছিলে শামিল হয়েছিলেন। এর আগে পরে বিভিন্ন
অনসমীয়া গোষ্ঠীর মানুষ আসামের সরকারি ভাষা আইন সম্পর্কে রাজ্য সরকারের উগ্র জাতীয়তাবাদী
মনোভাবের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করলেও ঐতিহাসিক নানা কারণে এই আন্দোলন পরবর্তীতে বরাক
উপত্যকার সংগ্রাম হিসাবেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকল। আসামের শাসক শ্রেণিও চেয়েছিল গোটা বিষয়টিকে
অসমীয়া বাঙালি বা আরো স্পষ্টভাবে বলতে গেলে অসমীয়া ও বরাক উপত্যকার বাঙালির বিরোধ হিসাবে
উপস্থিত করে অন্য ভাষাগোষ্ঠীর মানুষকে কিংবা অসমীয়া সমাজের গণতান্ত্রিক অংশকে এই সংগ্রাম
থেকে দূরে সরিয়ে দিতে। অন্যদিকে দূরদর্শিতার অভাবে বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনও আসামের
বহুত্বের সংগ্রাম না হয়ে বরাকের বাঙালির লড়াই হিসাবে প্রতিপন্ন হল।
বরাকের ভাষা সংগ্রামকে আরো গভীরভাবে বুঝতে হলে একটুখানি পেছনের দিকে তাকাতে
হবে। উনবিংশ শতকে প্রশাসনিক প্রয়োজনে ব্রিটিশ শাসনাধীন আসামকে যুক্ত করা হয়েছিল বঙ্গদেশের
সাথে। ১৮৩৪ সাল থেকে বাংলা ভাষাকে আসামে শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে চালু করা হয়। সারা রাজ্য
জুড়ে গড়ে উঠল অসংখ্য বাংলা মাধ্যম বিদ্যালয়। ঔপনিবেশিক প্রশাসনে করণিক ইত্যাদি চাকরিতে যোগ দিতে বাংলাদেশ থেকে দলে দলে ইংরাজি
শিক্ষিত বাঙালিরা এসে হাজির হলেন আসামের নানাপ্রান্তে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল সদ্যজাত অসমীয়া
মধ্যবিত্ত শ্রেণির মনে। একদিকে সরকারি কাজ ও শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলা,
অন্যদিকে করণিকের চাকরিতে হাজার হাজার বঙ্গভাষী মানুষের নিয়োগ, তারা ভাবলেন এই বঙ্গীকরণের
মধ্যদিয়ে হারিয়ে যাবে তাদের মাতৃভাষা অসমীয়া ও তাদের নিজস্ব কৃষ্টি সংস্কৃতি। তীব্র
প্রতিবাদের মুখে ১৮৭৪ সালে বাংলা ভাষা প্রত্যাহৃত হল। কিন্তু আতঙ্ক রয়েই গেল। নিজেদের
ভাষা সংস্কৃতি গ্রাস হয়ে যাওয়ার ভয় থেকেই জন্ম নিল মধ্যবিত্ত সমাজে বাঙালি-বিদ্বেষ।
পরবর্তীতে বাংলা থেকে আলাদা করে আসামকে পৃথক রাজ্য হিসাবে গঠন করা হলে আসামের রাজস্ব
ঘাটতি পূরণ করা জন্যে ব্রিটিশ প্রশাসন যে দু’টি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তাও রাজ্যে বাঙালি-বিদ্বেষের
আবহে আরো নেতিবাচক ভূমিকা পাল করে। প্রথমত, রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে বঙ্গদেশের দু’টি রাজস্ব
উদ্বৃত্ত অঞ্চল, সিলেট জেলা ও রংপুর জেলার গোয়ালপাড়া মহকুমাকে আসামের সাথে জুড়ে দেওয়া
হয়। দ্বিতীয়ত, যেহেতু আসামের স্থানীয় মানুষ জলাজমিতে চাষ করতে জানতেন না, আর অন্যদিকে
পূর্ব বাংলায় জমির ক্ষুধায় দুর্ভিক্ষপীড়িত কৃষক সমাজ অস্থির হয়ে ছিল, তাই রাজ্যের খাদ্য
উৎপাদনে নতুন জোয়ার আনার জন্য ব্রিটিশ প্রশাসন পূর্ব বাংলা থেকে ভূমিহীন কৃষকদের এনে
বসতি দিল আসামে। আসামের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পালে নতুন বাতাস লাগার আশায় প্রথম অবস্থায়
অসমীয়া মধ্যবিত্ত সমাজের পুরোধারা ব্রিটিশ প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগতই জানিয়েছিলেন।
আসামের খাদ্য উৎপাদন বেড়ে গেল দ্রুত গতিতে। শূণ্য থেকে শুরু করে ১৯১৯-২০ সালের মধ্যে
আসামের ১,০৬,০০০ একর জমি পাটচাষের আওতায় চলে এল। কিন্তু এর অনুষঙ্গে পূর্ববঙ্গ থেকে
আসা ভূমিহীন কৃষকের জনসংখ্যাও বাড়তে লাগল পাল্লা দিয়ে। ১৯০৪-১১ সময়সীমায় পূর্ববঙ্গীয়
কৃষকের সংখ্যা ছিল ৫৪,০০০। ১৯২১-৩১ সময়সীমায় তা দাঁড়াল ৫,৭৫,০০০ এ। অর্থনৈতিক সচ্ছলতার
আনন্দ মুছে গেলে অসমীয়া মধ্যশ্রেণির মন থেকে। গ্রাস করল নিজদেশে পরবাসী হবার আতঙ্ক।
প্রশাসনে বাঙালিদের আধিপত্য খর্ব করা, পূর্ববঙ্গ থেকে কৃষকদের জনস্রোতকে নিয়ন্ত্রণ
করার জোরালো দাবি উঠল। অসমীয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণির নানা সংগঠন দাবি তুলল নানা ধরনের
- সবগুলিরই সাধারণ উদ্দেশ্য বাঙালিদের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করার মধ্য দিয়ে অসমীয়া ভাষা,
সংস্কৃতি রক্ষা করা। ১৯২০ সালে চালু হল ‘কুখ্যাত লাইন প্রথা’। আসামের মূলভূমিতে বহিরাগত
বাঙালি কৃষকদের বাধ্য করা হল চর এলাকার বসতি স্থাপন করতে। চর এলাকার বাইরে তাদের বসতি
স্থাপন নিষিদ্ধ হল। যাদের হাড়ভাঙা শ্রমে আসামের বন্ধ্যা মাটির বুক চিরে সোনার ফসল ফলল,
তাদের ঠেলে দেওয়া হল নদীর চরে। নদীচরের ভাঙা-গড়ার মতই অনিশ্চিত হয়ে পড়ল লক্ষ লক্ষ মানুষের
জীবন। পৃথিবীর ইতিহাসে বর্ণবিদ্বেষী শাসনে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্ল্যাক টাউনশিপের ঘেটো
ছাড়া এমন দৃষ্টান্ত আর কোথাও নেই। দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে আসামের পার্থক্য এটাই - দক্ষিণ
আফ্রিকার ঘেটো আন্তর্জাতিক ভাবেই বর্ণবিদ্বেষ নামে নিন্দিত ও ঘৃণিত। আসামের লাইন প্রথাকে
এখনও বহু প্রগতিশীলেরা অভিহিত করেন অসমীয়া ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষার ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসাবে।
আসামের প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব অম্বিকাগিরি রায় চৌধুরীও ছিলেন এই কুখ্যাত লাইন প্রথার
উগ্র সমর্থক। স্বাধীনতার সময় গণভোটের মধ্যদিয়ে আসামের রাজস্ব সমৃদ্ধ জেলা সিলেট পূর্ব
পাকিস্তানে চলে গেলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন অসমীয়া জাতীয়তাবাদী নেতারা। এই ঘটনায়
তারা বিজয়ের অনুভূতি পেলেন।
১৯৪৭ এর স্বাধীনতা সারা দেশে সাধারণ মানুষের মনে ব্রিটিশের অধীনতা থেকে
মুক্তির স্বাদ এনে দিলেও আসামের অসমীয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণির রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে
তা এনে দিয়েছিল বাড়তি আরেকটি মুক্তির স্বাদ। সেটা ছিল রাজ্যের রাজনীতিতে বঙ্গভাষীদের
প্রভাব থেকে মুক্তির আনন্দ। পত্র পত্রিকার সম্পাদকীয় নিবন্ধ, জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের
ভাষণ, এমন কি আসাম বিধানসভায় রাজ্যপালের ভাষণ - সবকিছুতেই ব্রিটিশের অধীনতা থেকে মুক্তির
পাশাপাশি বাঙালিদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়ার আনন্দ।
১৯৪৭ এর ২০ জুলাই আসামের প্রধান সংবাদপত্র ‘দ্য আসাম ট্রিবিউন’ লিখল, “ চিরজাগ্রত থাকার মূল্যেই মুক্তির স্বাদ পাওয়া যায়। সাংস্কৃতিক, নৃতাত্ত্বিক
এবং ভাষিক - সমস্ত বিচারে আসামের প্রত্যেক অনসমীয়া মানুষ বিদেশি। ...... ১৮২৬ সালে
ব্রিটিশ অধিগ্রহণের পর যারা ব্যবসায়িক বা অন্যকাজে আসামে এসেছে, তারা সকলেই বহিরাগত।
এই বহিরাগতরা আগামী দিনের স্বাধীন আসামে কোনও বস্তুনিষ্ঠ ভূমিকা পালন করবে এমন আশা
করার কোনও কারণ নেই।”
প্রায় একই সময়ে আসামের মুখ্যমন্ত্রী গোপীনাথ বরদলৈ এক জনসমাবেশে বলেন
- নিঃসন্দেহে আসাম অসমীয়াভাষীদের রাজ্য। ১৯৪৭ সালের ৫ নভেম্বর আসাম বিধানসভার অধিবেশনে
রাজ্যপাল স্যার আকবর হায়দরী বলেন,“ আসামের স্থানীয় মানুষরাই এখন নিজেদের রাজ্যের প্রভু।.... এখন তারা অসমীয়া
ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশ ও প্রসার সহ তাদের সতীর্থ ট্রাইবেল জনগণের ভাষা ও সংস্কৃতির
বিকাশের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে। বাঙালিরা চাইলেও এখন আর আসামের পাহাড় ও সমতলের
মানুষের ওপর কিছু চাপাতে পারবে না, কারণ এখন তারা ক্ষমতাহীন। বাঙালিদের সম্পর্কে এমন
ধারণার ভিত্তি যে ভয়, সেই ভয়ের এখন আর কোনও কারণ নেই। যতক্ষণ না এই বহিরাগতরা আমাদের
প্রতি বশ্যতা প্রকাশ করছে ততক্ষণ এঁদের বিরুদ্ধে সমস্ত শক্তি নিয়ে দাঁড়াতে, আমি আপনাদের
প্রতি আবেদন জানাচ্ছি।” বিরিঞ্চি কুমার বরুয়ার মত ব্যক্তিত্বও মত দিলেন, “আসামের সমস্ত
অনসমীয়া মানুষকে বিদেশি বিবেচনা করা হোক। তাঁর মতে, নিজেদের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি পরিত্যাগ
করে অনসমীয়ারা যদি একমাত্র অসমীয়া ভাষা, সংস্কৃতিকে গ্রহণ করেন, তবেই তারা আসামে বসবাস
করার অধিকার পেতে পারেন।” এই তথাকথিত বিদেশিদের অসমীয়াকরণই হয়ে দাঁড়াল এর পরবর্তী দশকগুলির
আসামের শাসকশ্রেণির সাংস্কৃতিক-রাজনীতির প্রধান নীতি। এর সূত্র ধরেই আসামের জনবিন্যাস
নিজেদের স্বার্থে পরিবর্তিত করার জন্য আদম শুমারিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হয়ে দাঁড়াল
আসামের শাসকশ্রেণির প্রধান রণকৌশল। আসামের জনসংখ্যার ভাষিক বিন্যাসে রাতারাতি ঘটে গেল
প্রায় ‘অলৌকিক’ পরিবর্তন। ‘অলৌকিক’ শব্দটি ব্যবহৃত হল, কারণ সমাজ বিজ্ঞানীরা একে ‘ডেমোগ্রাফিক
মিরাকল’-ই বলেছেন। ১৯৩১ এর আদম শুমারিতে আসামে অসমীয়াভাষীর অনুপাত যেখানে ছিল ৩১.৪%,
মাত্র কুড়ি বছরের ব্যবধানে ১৯৫১ সালে তা বেড়ে দাঁড়াল ৫৬.৭% এ। পূর্ববঙ্গাগত বাঙালি
মুসলমান কৃষকরা যারা আসামকে শস্যশ্যামলা করেছে, তারা রাতারাতি নিজেদের মাতৃভাষা বাংলা
ত্যাগ করে নিজেদের অসমীয়াভাষী হিসাবে পরিচয় দিতে বাধ্য হল। বলা বাহুল্য, এটি কোনও ঐতিহাসিক
প্রক্রিয়ায় ঘটা সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের স্বাভাবিক দৃষ্টান্ত নয়। বিশুদ্ধ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের
মাধ্যমে একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভাষা, সংস্কৃতির অধিকার হরণ করে নেওয়ার জঘন্যতম
উদাহরণ। এই দরিদ্র বাঙালি মুসলমান জনগোষ্ঠীর সংখ্যালঘুত্ব নিয়ে এমনভাবে ষড়যন্ত্র সাজানো
হয়েছিল যে, তখন এর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া কোনও গত্যন্তর ছিল না। ভাষিক আগ্রাসনের
এই অভূতপূর্ব নজিরকেই আসামের অসমীয়া শাসকশ্রেণি অভিহিত করেছে ‘সাংস্কৃতিক সমন্বয়’ হিসাবে।
আসামবাসী অন্যান্য অনসমীয়া সমাজকেও তারা আহ্বান জানিয়েছে এই পথে হাঁটতে। আশ্চর্যের
বিষয়, সারা পৃথিবীতে ‘সাংস্কৃতিক সমন্বয়’ বললে দ্বিমুখী সাংস্কৃতিক প্রবাহ বোঝালেও
আসামের শাসকশ্রেণির ক্ষেত্রে এই শব্দের অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকেই
ব্যাখ্যা করা হয়ে আসছে ‘সাংস্কৃতিক সমন্বয়’ হিসাবে। এখানে ‘সমন্বয়’ একটি একমুখী আগ্রাসী
প্রবাহ।
এবার ফিরে আসা যাক গোড়ার কথায়। ভাষা রাজনীতির এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে
বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনকে মূল্যায়ণ করা হবে কোন্ নিরিখে? বাংলাদেশে যে ভাবে ‘একুশের
চেতনা’ কথাটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত, একইভাবে সাম্প্রতিক সময়ে বরাক উপত্যকায় ভাষা সংগ্রাম
থেকে জন্ম নেওয়া চেতনাকে বলা হচ্ছে ‘উনিশের চেতনা’। তবে ‘উনিশের চেতনা’কে এখনও আসামের
ভাষা রাজনীতির ইতিহাসের আলোয় সংজ্ঞায়িত করার কাজটি এখনও অপূর্ণ। দায়সারাভাবে উচ্চারিত
হওয়া এই শব্দটিই যে ভাষার রাজনীতির আবর্তে জর্জরিত আসামে ভাষিক ঐক্যের নতুন পথ দেখাতে
পারে সে সম্পর্কে ভাবার সময় এসেছে। স্বাধীনতার পর থেকেই বহুভাষিক আসামে শাসক শ্রেণি
ছলে বলে প্রচেষ্টা চালিয়েছে আসামকে একভাষী হিসেবে একীকরণ করার। এর উত্তরে ষাট, সত্তর
বা আশির দশকের বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনের মূল অভিমুখই ছিল আসামের বহুভাষিক সত্তাকে
তুলে ধরার। ফলেই ‘উনিশের চেতনা’ প্রকৃতপক্ষে বহুত্বের চেতনাই। উনিশের চেতনা একটি বহুভাষিক
সামাজিক পরিসরের শরিক সমস্ত ভাষাগোষ্ঠীর নিজের ভাষা চর্চার চেতনা।
১৯৬১ সালের ১৯ মে, ১৯৭২
সালের ১৬ আগস্ট, ১৯৮৬ সালের ২১ জুলাই, ১৯৯৬ সালের ১৬ মার্চ সেই সংগ্রামের নানা রক্তাক্ত
দিনের নাম। বহমান সেই ভাষা আন্দোলনের কেন্দ্রীয় শহীদ দিবস ১৯ মে। একুশ যদি ধর্মভিত্তিক
জাতিতত্ত্বের প্রত্যাখান হয়, তবে উনিশ আসামের বহুভাষিক বহুসাংস্কৃতিক পরিসরে শাসকশ্রেণির
উগ্র জাতীয়তাবাদী ভাষানীতির বিরুদ্ধে বহুভাষিকতার নীতির, প্রত্যেকটি ভাষাগোষ্ঠীর মাতৃভাষার
অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্য নাম।
বরাকের ভাষাসংগ্রাম সহ
রাজ্যের ভাষা ও সংস্কৃতির নানা বিষয় নিয়ে বামপন্থী মহলে এখনও কোনও পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা
হয়ে ওঠে নি। কোনও কোনও বামপন্থী দল কখনো রাজ্যের স্বার্থ রক্ষার নামে এক ধরনের উগ্র
জাতীয়তাবাদী অবস্থান গ্রহণ করেছেন বিভিন্ন সময়ে। কোনও কোনও বামপন্থী দলের মূল্যায়নে
আমরা দেখেছি, এক ধরনের সংখ্যালঘুবাদের ঝোঁক। তা ছাড়া, আসামের দু’টি প্রধান ভৌগোলিক
অঞ্চলের মানুষের সামাজিক সাংস্কৃতিক নানা প্রশ্ন নিয়ে দু’টি অংশের সমাজ-সংস্কৃতিকর্মীদের
স্তরেও এখনও মতবিনিময়ের অভিপ্রায় নিয়ে কোনও আলোচনা চক্র বা সংলাপের উদ্যোগ গ্রহণও হয়
নি। দু’টি অঞ্চলের ইতিহাস সংস্কৃতি নিয়েও রয়েছে এক সীমাহীন পারস্পরিক অজ্ঞতা। ফলেই
বিভ্রান্তি সৃষ্টির সব উপাদানই বিরাজমান। ১৯৫১
সালের আদমশুমারিকে কেন্দ্র করে যে ভাষিক আগ্রাসনের ঘটনা ঘটে, সেই অধ্যায় নিয়েও দুঃখের
বিষয় বরাক উপত্যকা এবং অবশিষ্ট আসামের বামপন্থী মহলে কোনও সর্বসম্মত দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে
ওঠে নি। কোনও কোনও বামপন্থী লেখকের কলমেও অভিবাসী বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা হরণের
সরকারি কর্মসূচিটিকে প্রশংসিত করার দৃষ্টান্ত দেখা গেছে সম্প্রতি কালে। কেউ কেউ আসামের
সমাজ ও রাজনীতিতে একটি বিশেষ ভাষা ও সংস্কৃতির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠাকে একটি প্রগতিশীল
পদক্ষেপ হিসেবে দেখতে চান।
বর্তমান নিবন্ধেও নানা
অপূর্ণতা থাকতেই পারে। কিন্তু আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বরাকের ভাষা সংগ্রাম সহ আসামের
ভাষা সংস্কৃতিগত সমস্যার নানা প্রশ্ন নিয়ে এক বামপন্থী পর্যালোচনার। একটি সর্ববাদী
সম্মত বামপন্থী ভাষ্যই আগামী দিনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে শক্তিশালী করতে পারে। অন্যথায়,
আমাদের সমস্ত অগ্রগতি থমকে যাবে বারবার ভাষাসংস্কৃতির নানা চোরাবালিতে।
বিষয়-আশয়
প্রবন্ধ,
ভাষা দিবস,
শুভপ্রসাদ নন্দিমজুমদার
বুধবার, ১৫ মে, ২০১৩
কুয়াশালিপি
(সঞ্জয় চক্রবর্তীর এই কবিতাটি পড়তে পেলাম ব্যাতিক্রম কাগজের শারদ সংখ্যা, ২০১২তে। ভালো লাগল, তুলে দিলাম.)
গৃহ হইতে
বাহির হইয়া যে যাত্রার
আরম্ভ
গন্তব্যহীন পথে, কিছুদূর চলিয়া গৃহে
ফিরিবার
পথটি আর খুঁজিয়া পাই নাকো।
কী করিয়া
ফিরি গৃহে, যেখানে আসিয়া দাঁড়াইলাম
সেই ভূমিশয্যাই
মোর নবগৃহ হউক তবে।
একদিন
বের হলাম ঘর হরতে বাহির।
যে পথ
আশৈশব ছিল না আমার
যে পথ
ছিল অযুত ভয়ের গেরস্থালি, সেই পথে।
এ আমারই
দেশ তো, ফুরিয়ে যাওয়ার মাটি আমারই?
এই
অরণ্যানী , পাহাড় শ্রেণি, বিস্তির্ণ খেত, সবুজের
ফোলা
ফোলা আদর, মানুষের জলচাহনি, বসতবাড়ি,
গান ,
ফসল , নদীর ভাটিয়ালি, আমারই তো নির্ভয়ের?
আমার পৃথিবীর
পথে পথে কার্তিকে হেমন্তে
আমি
শুনিয়াছি বাতাসে চা-গাছের মর্মর
নক্ষত্রের
রাতে পাহাড়ের কোলে ঘুমায়ে পড়িব একদিন
লোহিতের
জল এসে গান হয়ে ধুয়ে দেবে চোখ
যাইব
এখন, অঘ্রানের ঘ্রাণে, আসিব আবার ফিরে
নীল
পাহাড়ের দেশে, লাল নদীটির তীরে।
পেরিয়ে
যাই জাগিরোড , শুঁটকির গন্ধ অবিকল সিলেটের
শ্রীহট্টের
খোঁজ কেন অবিরাম, অপার বাংলায়?
এ
বাংলাতো শ্রীহট্টীয় নয় শুধু যাপনের রাজছত্রে
ঢাকার
রক্তের সঙ্গে বার্তালাপ সেরে নেয় ময়মন সিংহের ঘাম।
সোনাকুচি
ছাড়িয়ে ঐ যে জীর্ণ গ্রামটি দাঁড়িয়ে নিপাট, সহজ সরল
তার যে অবোধ
বালক, রুগ্ন বালিকা, শীর্ণ চাবিটি
তারা এই
পৃথিবীর কোন ভাষায় চোখের জলকে প্রবাহিত করে না।
ঘামের
কোন বর্ণমালা নেই দেশে দেশে একই লিপি তার,
নোনতাশোনিতশ্রম।
নৈঃশব্দ্যেই
প্রেম আসে বক্ষমাঝে
হেমন্তের
অরণ্যে অনন্ত নক্ষত্রবীথি তুমি
বন্দি
জেগে থাকে শহরে মিথ্যাচারে
কৃষ্ণচূড়ায়
ফোটেনা ফুল, স্খলিত পদ্মের মতো রাত
চারদিকে
খুলে গেছে দ্বার, ধর্ম আর নেই
স্পর্শ করিনি
তো চাঁদের করতল স্বচ্ছন্দ গানে
যেতে
পারি, যে কোন দিকে, চলে যাই দুর্বোধ্য স্বর্গের টানে
বুড়াপাহাড়ের
দিকে যাব, সে কী অশনি প্রেতটিলা কোনও
যেখানে
যুবকেরা টুপটাপ হারায়, হারায় রূপকথার গল্পগাছায়
পুর্বপুরুষেরা
এদিক মাড়ইয় নি কখনো, তাঁদের ছিল
নিজ
স্ববৃত্তে দিনযাপন, খুবই সংকোচের, দ্বিধার , ভয়ের,
শুধু
এদিকে কেন, কোনদিকেই তাঁরা মাড়াননি
ভীতেমাটির
বহির্ব্লয়ে যে নক্ষত্রগণ্ডিটি
তার
বাইরেই ছিল তাহাদের আঁধারের সংকেত
আনন্দজোছনা
যত, সবই ওই বলয়ে।
ভাণ্ড
খুলে দ্যাখ,
কী কান্ড
জগৎভূমে
চক্ষু
মেলে দ্যাখ
মুণ্ড
খাস না
কাঁচা
কাঁচাই
ধড়টি রাখ
তুলে
হৃদ ভেসে
যায় লোহিত জলে
দণ্ড
দিতে যাই ভুলে
এই যে
অগ্নিধারা লুপ্ত
তাকে
নিশিঘুম দাও
দাও জল
মাটি প্রণয়
আগুনকে নিওনা
শিরে
গোঁসাই,
নদে চিৎ হয়ে ভাসো
ছিদ্রহীন
জ্যান্ত শরীরে।
দিন
পাল্টায়, বাবা মারা যান, বড়পিসি থেকে ছোটপিসিও
সব ছড়ানো
নদী এখন গল্পগুজব করে একতি বইয়ের অন্দরে
সকল
অশ্রু আর রক্তকাহিনি পার করে চলে এলাম কোহরা
এই যে
কুয়াশা, জড়ায় , সে কোন বিহ্বল আকাশ থেকে?
আমাদেরই
আকাশ সে তো জটিলাবর্তে ছিল কি ছিল না
ছিলা ধরে
মারো টান আনন্দযজ্ঞ টান টান।
এই সহজ
সরল অরণ্যে কুয়াশালিপি লিখে ফ্যালে
জগতানন্দ
কাব্যের সকল অধ্যায়
ঠোঁটের
পাশের তিলটি কি গয়না হতে পারে?
হতে হতে
তার নামকরণটি একটি গভীর শ্বাস
শ্বাসের
সেই তরঙ্গ জীবনমুখী বেশ কয়েকফোটা।
দিক
নির্ণয়ে তার প্রেমিক বহুল প্রেমিকা বটে
তবে এখন
বর্ষণ নয়, নয় তার দণ্ডপ্রহার
জ্যোস্নার
ফোঁটা ফোঁটা কাম-আঙ্গিকে
এক নেশার
জল রাত্রিব্যাপী, শরীরের লণ্ঠন
জ্বালিয়ে
আনন্দ আকাশে এক সশব্দ কামড়।
খুব আদরে
সোহাগে শঙ্খ বাজে সুকল্যাণ
অতঃপর
গ্লাসের টুংটাং, রামপাখিটি তরলে ডুবিয়ে
চুমুকের
এক শব্দময় কামড়,
প্রত্যাখ্যান
নয়, সবই গ্রহণ এই তারামণ্ডলে
বিছানায়
সবুজ ঘাস, নরম,
শঙ্খ
লাগে রাত্রভর।
ভয় নেই আর,বালক
দুরু
দুরু বক্ষে আর
দাঁড়ানো
নেই কোন বৃক্ষের আড়ালে
যাও
তোমারই দেশ
যেখানে
খুশি।
মিছিল ও ছায়া
।। লক্ষ্মণ কুমার ঘটক।।
লোকটি প্রতিদিন চা বানায়
কথা বলে
মাঝে মাঝে মিছিলে যায়।
মিছিলে অন্যদের মতো সেও
শ্লোগানে গলা তুলে
ছোপ ছোপ নীল দাগানো সার্ট যখন
শরীরের লেপ্টে যায়,
তখন সে ছায়া খোঁজে।
মাঠ জুড়ে ছায়ার আকাল;
সে হাঁটতে থাকে
মাঠ পেরোয়।
গাছের ছায়াকে
সে জড়িয়ে ধরে
ভাবে, মানুষ তো নিজেই গাছ হতে পারে;
পারে ছায়া দিতে।
ছায়া পেলেই মানুষ
নিজেকে ছাপিয়ে
অন্যের কথাও ভাবে,
তখনই সে চা খায়
মিছিলেও যায়।
মাউস
।।লক্ষ্মণ কুমার ঘটক।।
মাউসের তারটা দেখা যাচ্ছিলো শুধু
বাকিটা ব্যারিকেডের অন্তরালে।
অনেক হিজিবিজি কেটে
মানুষগুলোকে আড়াল করি।
আমিও আড়াল চাই
হাঁটা, দৌড়, কসরতের কাহিনী
সব আড়ালের জন্যই।
মাউস স্পর্শ করি,
মনে মনে বলি,
তোর আড়াল তো আমি।
সে বলে, চাই না তোমার আড়াল হতে
এক মুঠো সোহাগের জন্যই তো বেঁচে থাকা,
আড়াল আমাকে ব্যাভিচারি করেছে।
আমি আড়াল চাই না
তোমাকে তো নয়ই।
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)




