“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

শনিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৯

ভালোবাসী

।। অভীককুমার দে।।

বাসা বাসা চেনে
পাখি ডাকে
ভোর হয়

পাখি ভোর বাসা
আশা এক
ভালো হবে সবকিছু।

বাসায় আলো ঢোকে
চোখে পড়ে
রোদ মাখি,
গায়ে রঙ
হাসে কাঁদে

দিন গড়িয়ে রাত,
পরিবর্তন !

ভালোবাসবো বলেই
ভালোর ভেতর
বাসা খুঁজি।

প্রতিদিন
পূর্ণিমার উত্তাপ কমে,
গভীর রাত
শিশির পড়ে
শিউলি ঝরে
বুক পেতে মাটি,

ভালোবাসি বলেই
বাসার ভেতর ভালো
থাকি।

চোখ খোলো জুঁই
বাসায় যদি আশার আলো
ভোর হবে, হবেই
একদিন...

ভালো হবে
বাসা হবে,
ভালোবাসীর ভালোবাসা হবে।

হারাধন বৈরাগী

।। অভীককুমার দে।।

বন্ধু আমার রাতের তারা
স্বপ্নে ভরা ঘুম,
দিনে আলো চিনলো কারা
মনের ভেতর জুম।

বন্ধু আমার বনের কথা
সবুজ গাছের ছায়া,
পাহাড় শরীর নীরব ব্যথা
চোখের ঘরে মায়া।

বন্ধুমুখে কাঞ্চন আলো
জম্পুই ভালোবাসে
মাটির ভাষা বুঝেন ভালো
শব্দসুখে ভাসে।

বৈরাগী মন এলোমেলো
বড়োই আপনজন
কি পেয়েছি কি বা গেল
বন্ধু হারাধন।

নদীকূলের মানুষ

।। অভীককুমার দে।।

কবির কাছে নদী আছে
কাছে টানে,
কাছে যাই, ছুঁয়ে দেখি নদীকূলের মানুষ।

এখানেই থাকেন কবি সাচীরাম মাণিক
অভাবের সীমানা কাঁটাতার বুকে
গরীবের আমাজনের কাছে ফেনী
বুকে ভিন্ন দেশের জলকথা...

কথাজল হয়ে বয়ে যায়,
আশেপাশে হাঁটে কূল,
দুকূলের বনে মেরুকুম;
এখান থেকেই বলতে পারেন--
'আগুনটা উসকে দাও'।

আমি উপকূলের চাষি
বৃষ্টিজলে গা ভিজিয়ে পরাজয় চেয়েছি জয়ের কাছে।

পুতুলমানুষ

।। অভীককুমার দে।।


ধর্ষকের সীমানা থেকে মনোমণ্ডপ বেশি দূরে নয়,
তবু উৎসব জুড়ে পোশাক পরা পুতুল !

স্বচ্ছতার অভিযান শেষে অভিজাত রাস্তা
শকুন্তলা নগর,
খোলা আকাশ মায়াকান্না জানে
না বলেই মুখে কষ্টের কালো মেঘ, বৃষ্টি হচ্ছে খুব,
মানুষের চোখে চোখ রেখে দুর্গার শিশুটি দেখছে--
নতুন পোশাকের ভেতর পুতুলমানুষ।

সেজেগুজে ভিন্ন কাঠামো সব
মণ্ডপের আলোয় প্রতিমা মুখ দেখে হাসছে,
শিশুটিও মুখ বাড়িয়ে মুখ দেখছে অনেক
কেঁদে উঠছে বুক
প্রতিমার মুখ ধর্ষিতা মায়ের মতোই দেখতে !

অনতিদূরে

।। অভীককুমার দে।।

এখানকার আলো বাতাসে একমাত্র কৃত্রিম উপাদান রাজনীতি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় একে অন্যকে নিচে ফেলছে। আসলে টেনে নিচে নামানোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ।

নষ্ট পরিবেশ পরিবেশন করছে নষ্ট রাজা। নীতির উপর অনবরত পর্যবেক্ষণ আর পরীক্ষণ। অস্বাভাবিক বিবর্তন ঘটছে মানুষের।

পরিবেশ বদলে যাচ্ছে প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে ! এই অভিযোজিত মানুষের মন ও শারীরিক গতিবিধি মানেই নিয়ন্ত্রণহীনতা, ভোগবাদে ভুগছে।

আশ্চর্যজনক রূপান্তর মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনে। স্নায়বিক সংঘর্ষের পর প্রতিক্রিয়াশীল আসছে প্রজাতিকে 'মানুষ' বলা যাবে না অথবা বদলে দিতে হবে 'মানুষ' শব্দের সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য।

অনতিদূরে আধুনিকতার চুড়ান্ত সময়। অসামাজিক ও বিশৃঙ্খল অবস্থা বন্য আদিমতায় জেগে উঠবে। সেদিন ফুল শিশু গান আনন্দের বদলে আতঙ্ক বহন করবে। কেননা,
ফুল দেখে নিশ্চিত হওয়া যাবে, কাছেই কারো লাশ,
শিশুর কান্না বলে দেবে, আরেকটি পশু সংগ্রামী হলো,
গান শুনেই শিখে নে'য়া যাবে, চিতা থেকে শুরু।

আনন্দ সংবাদ, আনন্দ সংবাদ

।। অভীককুমার দে।।

একটি সম্পূর্ণ অসামাজিক ঘটনা অবলম্বনে কিছুদিনের মধ্যেই কুনাগরিক মঞ্চে মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে ধারাবাহিক নাটক, 'বিচার'।

চোখ খোলা রাখুন, দেখবেন--

ধৃতরাষ্ট্রীয় কানা বসে আছেন বিচারকের গদিতে।

ভালো মানুষের মুখোশ পড়ে পঞ্চনৈবেদ্যের পান্ডা। এই রাজনৈতিক জুয়ারিগুলো জুয়া ও সম্পদের নেশায় দিশেহারা। নাগরিক থেকে নিজের বৌ, কাউকে বাজারু করতে দ্বিধা থাকবে না এদের।

কুরবে গা ভাসিয়ে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার মতো সাহসী দেখবেন যাদের, তাদের মধ্যে দূর্যোধন যিনি বংশের টাকা গিলে নিজের অস্তিত্বই ভুলে যাবেন।

দুঃশাসনের আলাদা কোনও চরিত্র থাকবে না। কেননা, দুঃশাসনের ভেতরেই অন্তর্নিহিত থাকবেন দুঃশাসন।

দ্বাপর যুগের কৃষ্ণ ত্রেতায় এফিডেভিট করে জন্মালেন বলেই কলির মঞ্চে মায়া হয়ে বিরাজ করবেন মোবাইল ইন্টারনেট এবং আড্ডায়।

মঞ্চে অগণিত দ্রৌপদী লাশে পরিণত হবে। ওদের রক্তাক্ত শরীর ও লাশ ঘিরে ন্যক্কারজনক বিচার হবে।

'বিচার'-'বিচার'-'বিচার'
অবহেলায় বিবস্ত্র নারী ও নির্যাতন দেখার সুবর্ণ সুযোগ হাত ছাড়া না করে নির্লজ্জের মতো লক্ষ্য রাখুন কুনাগরিক মঞ্চের দিকে।

চুপ কেন !

।। অভীককুমার দে।।

মা মেয়ে বোন
ওরে কথা শোন
কোথায় যাবি ! দুর্গার রূপ ধর তবে;

অসময়ে রথ
অসুরের পথ
রাস্তায়, নিরাপদ কে কোথায় কবে ?

রক্তের নদী বয়,
কত আর প্রাণে সয় ?
ব্যথা, রাস্তার কাঁধে কার লাশ ?

ওদের মেয়ে নেই ?
ওদের বোন নেই ?
কাদের মা নেই !
চুপ কেন সব ! রাজনীতি চাষ ?

জলমাঠের খামারবাড়ি

।। অভীককুমার দে।।

আমরা যখন পৌঁছলাম, মেলাঘরের আকাশে কালো মেঘ জটলা পাকিয়েও জল ধরে রাখতে পারছিল না। বিচ্ছিন্নভাবে দুএক ফোঁটা ঝরে পড়তেই সম্মিলিত মেঘ কেমন খেঁকিয়ে উঠলো। অবস্থা বেগতিক দেখে বিজনদা, মানে কবি বিজন বোস বাংলাদেশের বন্ধু আল মাদানী আর আমাকে বললেন, 'আর একটুও দেরি করা ঠিক হবে না, চলো'। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি অটোরিক্সায় চেপে বসলাম। গাড়ি চলছে রুদ্রসাগরের দিকে।

শেষ বোটটি তখনও ঘাটেই ছিল। তাড়াহুড়ো করে টিকিট নিয়ে আমরা তিন জন চড়ে বসলাম বোটে। বসতে না বসতেই ঘাট ছেড়ে বেরিয়ে পড়লো। মনে হলো, আমাদের জন্যই বুঝি অপেক্ষা। প্রকৃতিগত সম্পর্ক ও টান আমাদের আসার খবর এই ভ্রমণের সাথে যুক্ত সবকিছুকেই জানিয়ে দিয়েছে বোধহয়। রুদ্রসাগরের বুক চিরে দ্রুত ছুটে চলছি। সামনেই নীরমহল। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। বড় হচ্ছে। কাছে আসছি। কাছে টানছে। কেন জানি, জলসীমানা শেষ হতেই চায় না। বিভূতিভূষণের পাহাড় যেন জলের রূপ ধরে কাছে দূরের খেলা খেলছে। দেখছি, বাঁদিকের জলসীমা হয়ে দলবদ্ধ বৃষ্টি ধেয়ে আসছে আমাদের দিকে। ডানদিকে নীরবতা। আমাদের বোট তখন রুদ্রসাগরের মাঝামাঝি, মেঘেদের ভিড় ঠেলে একটুকরো আলো নীরমহলের মুখে যৌবনের রঙ ঢেলে দিয়েছে।

সশব্দে এগিয়ে যাচ্ছিল বোট। ঢেউয়ের পর ঢেউ মহলকে অগ্রিম জানিয়ে দিচ্ছিল আমাদের খবর। খবর দিয়েই ফিরে আসছে আবার। এই ঢেউগুলো সুশিক্ষিত প্রহরীর মতোই লুকিয়ে ছিল রুদ্রসাগরের জলে। এক অসাধারণ অভ্যন্তরীণ চলন জানে ঢেউ। বোট যখন প্রায় কাছাকাছি, ঢেউয়ের ভেতর ঢুকে পড়ছিল ফিরতি ঢেউ।

মহলের ঘাটে পা রাখার আগেই বৃষ্টিদল হুড়মুড় করে ঝাঁপিয়ে পড়েছে বোটের ছাদে। একপ্রকার হুড়াহুড়ি করে একবোট ভ্রমণ পিপাসু মানুষ ঢুকে পড়লাম অন্দরমহলে। ভেতর সব মানুষ জটলা পাকিয়ে বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করলেও, আমরা তিনজন বৃষ্টি ভিজেই ছাদের গম্বুজে পৌঁছে গেলাম। এখান থেকে রুদ্রসাগরকে উন্মুক্ত মাঠের মতোই দেখাচ্ছিল। মেঘেরা ভিনদেশী চাষী, বৃষ্টিবীজ ছড়িয়ে দিচ্ছে অনবরত। বৃষ্টি শেষে বীজতলার মতোই সেজে উঠেছে জলমাঠ। লাঙলের দাগ যেন জেগে আছে রুদ্রসাগরের বুকে। আমরা তিনজন ভীষণ খোশমেজাজেই তখন। খুব বৃষ্টি হচ্ছিল বলে আর কেউ উপরে ওঠেনি। জলের মাঝখানে এই মহল চাষীদের খামারবাড়ির মতোই লাগছে। মনেহয়, জলমাঠের ফসল পাকলে এখানেই তুলবে। ছাদের গম্বুজের ভেতর থেকে চারদিক দেখতে দেখতে ছবি তোলার ঋতু লেগেছে সবার। ছবি উঠতে ওঠাতেই বদলে যাচ্ছিল আকাশের ছবি। আমরা যখন নেমে আসছি, তখন আর বৃষ্টি নেই বললেই চলে। ক্লান্ত আকাশের ঘাম শিশিরের মতোই ঝরছে।

একজন চা বিক্রেতা ডেকে বললেন, 'চা খাইবেন ?' বৃষ্টিতে ভিজে একটু ঠান্ডাও লাগছিল। পাশে বসে চা খেতে খেতে গল্প জমে উঠলো। তেমন তাড়াও নেই। কথায় কথায় জানতে পারলাম, তিনি অঞ্জন বর্মন। বয়স আটচল্লিশ। একটিমাত্র ছেলে। দশম শ্রেণীতে পড়ে। প্রায় চার বছর মহলের ভেতর চা বিক্রি করছেন। খুব চেনা মানুষের মতো ডেকে চা খাইয়ে সংসার চালাচ্ছেন। কত বৃষ্টিভেজা মানুষের গায়ে উত্তাপ ছড়িয়ে দিয়েছেন, তা নীরমহল জানে। ওনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যখন মহল ছেড়ে বেরিয়েছি, তখন আকাশের কাছে মেঘ আছে, যদিও কালো বুক সাদা হয়ে গেছে। পাখিরা বাসায় ফিরছে। আমরাও বোটে উঠলাম। বোট ছেড়ে দিতেই এক অপরিচিতা কন্ঠে শোনা গেল, 'চিকন গোয়ালিনী, রসের বিনোদিনী... '