“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

সোমবার, ২ অক্টোবর, ২০১৭

ঠাকুমা হারিয়ে গেছেন


।। রণবীর পুরকায়স্থ।।

( ভালো লাগা গল্প  টাইপ করে তুলে দিলাম ---   +Subrata Mazumdar )


করিমগঞ্জ শহরের সীমা ছাড়িয়ে লঙ্গাই পুল পেরিয়ে ওপারে পৌঁছতেই পরিচিত দৃশ্য। নদীর পারে সারে সারে বেগুনের গাছ, গাছ দেখতে তেমন সুদৃশ নয় কিছু কিন্তু তেল চকচকে নাদুশ নুদুশ গোলগাল গুণময়কে দেখেই তার মনে পড়ে যায় বন্ধুবর প্রমেশ আচার্যির কথা। একই ব্যাঙ্কে চাকরির সুবাদে বন্ধুত্ব, প্রমেশের বাড়ি করিমগঞ্জ আর তার শিলচর, পোস্টিং এ প্রমেশ মহকুমা শহর হাইলাকান্দি আর তার মোহনপুর গ্রামে। প্রমেশেরও ভাড়াবাড়ি রাঙাউটি রোডে, সোমবার বিকেলে বন্ধুর বাড়িতে থাকে তার রাত্রিবাসের নিমন্ত্রণ।  এমনই এক শীতের সোমে প্রমেশ বলে,
     --- আপনার লাগি আইজ একটা  কড়াই কিনলাম দেখইন?
       এটা আবার কী , হাতের পাঞ্জার সাইজে লোহার কড়াই  । বলে,
     --- এতো ছোটো ?  
     --এক এক পিস ভাজমু আর তুলমু। আইজ খালি গরমভাত বেগুনভাজা ঘি আর কালালঙ্কা।
        প্রমেশ নিজে রান্না করে পারিপাটি। সে রাতেই সদ্য যুবক বিশ্বজিৎ প্রথম দেখে বিখ্যাত লঙ্গাই বেগুন, কাছাড়ে বলে থালবেগুন, পারফেক্ট গোল। এখনও লেগে আছে জিভে বেগুনের মাপে কড়াইএর  ভাজা বার্তাকু। খাওয়ার পর বন্ধুকে বলেছিল তার ঠাকুমার বাপের বাড়িও লঙ্গাই নদীর পারে দণ্ডকলস গ্রামে, গেছে অনেকবার কিন্তু এমন খাবার খায়নি কখনও। প্রমেশ বলেছিল,ও এপারের, অপারের দণ্ডকলসও ঘুরিয়ে আনবে একদিন। হয়নি, একবছরের মধ্যে গৌহাটিতে বাংলা পড়ানোর চাকরি পেয়ে চলে যায় সে। পরের শীতে আর বড়বেলার দণ্ডকলস দেখা হয় নি।এখন তো সে আসামের বিখ্যাত অধ্যাপক, শীতকালে সাহিত্যবাসরে বক্তৃতা দিয়ে বেড়ায় নিয়মিত। অবসরের পর দশবছর হয়ে গেল, এখন যাওয়া কমিয়ে দিয়েছে শারীরিক কারণে। লঙ্গাই উপত্যকা সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতি জগন্ময় গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তার সহপাঠী হওয়ায় আর  না করেনি। সময়ও অনুকূল ৭ ও ৮ জানুয়ারি ২০১৭, শীতকাল। আমন্ত্রণ পত্রে তার নামই প্রথম,  প্রধান অতিথি অধ্যাপক বিশ্বজিৎ দেব।
        তবে একা বেরিয়ে ভালই করেছে প্রফেসর দেব। বিষয়টা বেশ গোপনীয় ও একান্ত থাকুক এরকম ভাবনাও ছিল তার। তবু বন্ধু জগন্ময়কে বলেছিল সঙ্গে যেতে। জানা  কথা, সে যাবে না।কারণ উৎসব-শেষে সম্মেলন সভাপতির অনেক কাজ থাকে টুকিটাকি। তার উপর জগন্ময় করিমগঞ্জ জেলার সম্মানিত অধ্যাপকও বটে,তার সঙ্গে হাউরি ঘুরায় আপত্তিও থাকতে পারে । জাগন্ময় দত্ত বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ ও লোকসাহিত্যের গবেষক ও বিশেষজ্ঞ। বেশ অনেকগুলি পুরস্কারও পেয়েছে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে। দিল্লি থেকেও পাবে একটা এরকম আভাস দিয়েছে গতকাল । তার লোকগবেষণার বিশেষ অবদান হল রামায়ণের সীতাকে অনার্য কন্যা প্রমাণিত করা। আসাম সরকারের রাষ্ট্রীয় সম্মান ও পেনশন প্রাপ্ত অধ্যাপক হওয়ার কারণে বিতর্কিত রাজনৈতিক বিষয় থেকে দূরে থাকে। অসমীয়া উগ্র জাতীয়তাবাদী আস্ফালন ও দক্ষিণ আসামের বাংলা অধ্যুষিত তিন জেলাকেও অসমিয়াকরণের প্রচেষ্টায় যখন উত্তাল করিমগঞ্জ কাছাড় হাইলাকান্দি, তখন জগন্ময় থেকেছে দূরে, মিটিং মিছিল দুএকটায় গেলেও  সম্প্রীতির বার্তাই দিয়েছে। বাংলাভাষার অধ্যাপকের যে ভাষাপ্রীতি নেই সে কথাও কেউ বলতে পারবে না। সর্বজনমান্য  ব্যক্তিত্বের সদাহাস্যময় উপস্থিতি সবাই কামনা করে। তবে জগন্ময়ের একটা প্রতিবাদী চরিত্রও আছে ছাত্রাবস্থা থেকেই। অসমিয়া বাংলা দুই ভাষাতেই দক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংস্থার নির্বাচনী ভাষণ লিখে দিতে ডাক পড়ত তার। এখনও পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক নেতা নেতৃরা ভাষণ লিখিয়ে নেয় জগন্ময় স্যারের  কাছ থেকে। অসমিয়া করণের প্রতিবাদে বাঙালির অস্তিত্ব-সংকট নিয়ে অসাধারণ গল্প লিখেছে সুবন্ধু ছদ্মনামে। অধ্যাপক দেব গৌহাটি থাকে বলে কাছাড় করিমগঞ্জের বাঙালির সমস্যা ভিন্ন দৃষ্টিকোণে বিচার করে, অন্য আবেগের চোখে দেখে বৃহত্তম সংখ্যালঘু ভাষাগোষ্ঠীর হয়রানি, সমাধানেও সমঝোতার ভারসাম্যকে গুরুত্ব দেয়। আবেগটা প্রকট হয়ে প্রকাশিত হয় না। এ নিয়ে দুই নদী উপত্যকায় ভুলবুঝাবুঝি থাকলেও অধ্যাপক নিজস্ব পরিচয়ে ভাস্বর হয়ে আছে। তাকে নিয়ে বাঙালি এবং অসমিয়ার মধ্যে একটা অবিশ্বাসের সন্দেহ যেমন আছে, আবার  উত্তেজনা প্রশমনে স্থানীয় টিভি চ্যানেলে তার সুচিন্তিত বাইটগুলিও  খুব কার্যকরী । প্রবল সংখ্যাগুরুর উগ্র জাতীয়তাবাদী চাপে সে দুরকম ভাবে নিজেকে দেখে, এক বেঁচে থাকার তাগিদে অসমিয়া বিরোধিতা করে না। তাই, করিমগঞ্জ কাছাড় হাইলাকান্দির কোনও নাগরিক কনভেনশনে তার ডাক পড়ে না।এখানকার নাগরিকরা নিজেরা সুরক্ষিত বলে সবসময় যুক্তিপূর্ণ কথাও বলে না, সংখ্যার ক্ষমতায় কুকথাও বলে দুই উপত্যকার যুযুধান ভাষাগোষ্ঠী।     তাকে রাখঢাক রাখতে হয় প্রাণের দায়ে , প্রফেসর দেব যখন বলবে তখন উলুবাড়িতে তার অরক্ষিত বাড়িটার কথাও ভাবতে হয়। ঠাকুমার নামের বাড়িটার প্রতিবেশী বেশির ভাগই অসমিয়া, আর্যবিদ্যাপীঠে চাকরি করতে করতে পেয়ে যায় প্লটের জমি, এলাকার নামও হয় প্রফেসর পাড়া।  আসামের অসমিয়ারা মানুষ বড় ভাল, বন্ধুও ভাল। সংখ্যাগুরুরা একামানুষ ভালই হয়, দলবদ্ধ হলে যুক্তিহীন হয়, দাঙ্গাবাজ হয়।  অসমিয়ার বিরাজ কলিতার মতো বন্ধু না থাকলে অভিজাত এলাকায় বাড়ি হতো না তার। বাড়ির নাম রাখা নিয়েও আনেকেই  তির্যক মন্তব্য করতে ছাড়ে নি। মাকে ছেড়ে কেন ঠাকুমার নামে বাড়ি। অধ্যাপক দেব  কখনও অজুহাত দেয় নি,  তাই কেউ জানে না যে  তাঁর মা-ই তাকে বলে গেছেন বাড়ি করলে যেন ঠাকুমার নামে রাখা হয় নাম। এই মহীয়সী নারী তাঁর ত্যাগের কোনও স্বীকৃতি দাবী দাবি করেন নি কোনকালে । এক বাস্তুহারা পরিবারে যখন রোজগারের কোন উৎস নেই কোথাও, তাঁর পিতাও স্বদেশে শিক্ষকতার অস্থায়ী চাকরি ছেড়ে চলে আসেন এদেশে, অর্দ্ধাহার থেকে অনাহার ছাড়া কোন পথ খোলা ছিল না তাদের।তখন অধ্যাপক দেবের পিতামহী  বৃদ্ধ বয়সে গৃহ পরিচারিকার কাজ নিয়ে আহার যুগিয়েছেন পরিবারে,পুত্রবধূকে ঘরের বাইরে যেতে দেন নি। সেই ‘হিরণ্ময়ী’ বাড়ি এখন গৌহাটির সারস্বত সাধনার পীঠস্থান হয়ে উঠেছে। অধ্যাপকের একমাত্র পুত্র বিশু ছেলেবেলায়  হিরণ্ময়ী শব্দের অর্থ জানতে চেয়েছিল পিতার কাছে। তিনি বুঝিয়ে বলেছেন, ‘সোনার মতো উজ্জ্বল কিংবা সোনার বরণ’। দুটোই ছিলেন তাঁর ঠাকুমা, ছিলেন দীর্ঘাঙ্গী উন্নতনাসা, বঙ্গদেশে এমন রূপ দুর্লভ। ছেলে প্রশ্ন করেছে,
      --আর তোমার মা ?
     সে বলেছে,
    --মা ছিলেন আগুণ রঙা রূপসী। মায়ের চুল হাঁটুর নিচে নেমে যেত, এত দীর্ঘ।
    ছেলের প্রশ্ন,
    --তবে কেন হিরণ্ময়ী ?
     ছেলেকে খুলে বলেছে সত্যকথা। তাঁর মায়ের সত্যবন্ধন। ছেলে তাও ছাড়ে নি, বলেছে,
     --- আর আমার মা?
     --- তোমার মা সবার সেরা। সবার মাই সেরা। আমার মা শিখিয়েছে আমার ঠাকুমার কথা।
     সুখ দুঃখের সংসারে রাগারাগিও হত, রাগ হলেই ঠাকুমা  ঘটি হাতে চলে যেত দণ্ডকলস গ্রামে। ঠাকুমার বাপের বাড়ি। নাতিকে নিত সঙ্গে। ভোলার নয়। লঙ্গাই নদীর পুল পেরিয়ে বিশ্বনাথের হাত ছেড়ে দিতেন ঠাকুমা, সেই ছাড়া পাওয়ার যে কী মজা। করিমগঞ্জ স্টেশন থেকে হাত ধরে টেনে নিয়ে আসতেন পিতামহী।কী যন্ত্রণার বন্দিত্ব। ওপারে পৌঁছে খুশি  বিশ্বনাথের। কারণ বেশির ভাগ সময়ই শীতকালে রাগ হত ঠাকুমার। তখন যে বাপের বাড়ির গ্রামে নতুন ফসল উঠত। নিজের ভাই কেউ থাকে না গ্রামে, খুড়তুতো ভাইরা দিদিকে কী মান্য করত। বিশ্বনাথও সারাদিন ঘুরে বেড়াত গ্রামে,এটিলা থেকে ও টিলা। ধানের খেতে একাএকা দৌড়নোয় ছিল মজা, কান এদিক ওদিক করে বাতাসের সাঁ সাঁ শব্দ নিয়ে খেলা। আর এক আনন্দ ছিল ঠাকুমার মলিদা দাঁত দিয়ে কুটকুট করে কাটা, বাচ্চা ছেলেকে কাশ্মীরি চাদরে ঢেকে পেছনে গিঁট দেওয়া তার মোটেই পছন্দ ছিল না, তাই দাঁত দিয়ে চাদর কেটে আকাশের দিকে তুলে দেখত কেমন ফুটো। ঠাকুমাও ধরতে পারেনি, বলেছে পোকায় কেটেছে। ঠাকুমার উপর কম অন্যায় করেনি ছোট বিশ্বনাথ। সেবার তার প্রবেশিকা পরীক্ষাই দেওয়া হত না তেমন অবস্থা। বিশ্বনাথ ঠাকুমাকে বলছে,
     ---কী হবে গো ঠাকুমা ? পরীক্ষায় বসতে পারব তো?  
 ঠাকুমা মুচকি মুচকি হাসত আর নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকত। তার ছিকির ভাণ্ডারে যে  আছে যথেষ্ট সম্পদ।  খুলে দেখে সব শূন্য। তাতে কী হয়েছে রয়েছে অন্য ভাণ্ডার। ইঁদুর যাতে বিছানাপত্র না কাটতে পারে তাই  লেপ কাঁথা শুকিয়ে বস্তা বা কাপড়ের পুটলি করে শীতকালের জন্য ঘরের মাড়ইলে ঝুলিয়ে রাখা হয় দড়ি বেঁধে, দড়িতে একটা উল্টো নারকেল মালা অর্ধেক ঝুলিয়ে দেওয়া হয় এক গিট্ট দিয়ে, ইঁদুর আর নামতে পারে না। সেই নারকেল মালায়ও ঠাকুমা লুকিয়ে রাখত সিকি আধুলি। বিশ্বনাথ তো  সব সাবাড় করেছে। ঠাকুমার উজ্জ্বল মুখ অন্ধকার হয়ে যেত, ঠাকুমা বুঝত সব কার কীর্তি। জানত, কিন্তু বকত না। তাও দমে নি, উত্তরপুরুষের শিক্ষার জন্য তখন বাবুর বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছে পনের টাকা,পরীক্ষার ফিস দেওয়া হয়, সেই টাকা আর ফেরত দিতে পারে নি ঠাকুমা । পরীক্ষার পরই তো বিছানায়। তার বাবা ঠাকুমার দেওয়া নামটা পর্যন্ত বদলে দিল ফর্ম ফিলাপের দিন। লিখে এল বিশ্বজিৎ।
        বাবুদের মস্ত বড় বাড়ি, কী বিশাল। শহর শিলচরে টিনের চালের একতলা বাড়িই বেশি কয়েকটা মাত্র কাঠের দোতলা আর উত্তরপ্রদেশ আগত ভূস্বামীদের প্রাসাদোপম  দোতলা বাড়ি, বাড়ির সামনে সিংহদুয়ার। শহরের প্রখ্যাত আইনজীবী আর স্বাধীনতা সংগ্রামী চন্দ দের সাদা দালান, দীঘির পারে  নসিবালি হাকিমের দীর্ঘ বাড়ি,নদীর পারের বি সি গুপ্তর বাড়ি, রহমান মঞ্জিল,জানিগঞ্জে ভুঁইয়াদের ব্যবসাবাড়ি বা গদি,  পদ্মবিলে আর এক বৈশ্যপ্রধান রজনী সাহার ভদ্রাসন, নাজির পট্টির পপুলার হোটেল,বরদা দাশ বরদা পালের প্রাসাদ,গাভরু মিয়ার বাড়ি, তারাপুরের দেববাড়ি ঐতিহ্যে প্রধান। দেশভাগের পর স্টিমার কোম্পানির চলাচল কমতে কমতে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এক জাহাজ মালিক ঝাঁপিয়ে পড়লেন চাপাতার ব্যবসায়ে, বাড়ি তৈরি করলেন বহুতল চকমিলান। ঠাকুমা নাতিকে  বাড়ির ভিতর দেখাতে নিয়ে যেতো কিন্তু দারোয়ান ঢুকতে দিত না , ঠাকুমাকে যেতে দেবে, বিশ্বনাথকে নয়। বিশ্বনাথ তাতেই আপ্লুত, কী লম্বারে বাবা, লোহার গরাদে দেওয়া ফটক, ফটকের ভিতর ছবির মতো কালো আঁকাবাঁকা পথ, পথের পাশে ফুলের গাছ, বিশ্বনাথ ভাবত ঐ বাড়িতেই তো রাজকন্যা থাকে। ঠাকুমা বলত রাজপুত্রের কথা, তার দুরন্তপনার কথা। একটা মস্তবড় রেডিও ভেঙে তার কী কান্না। সে পড়ে নরসিং ইস্কুলে, তার মতো একটা ছেলেকে দেখেছে গাড়ি করে স্কুলে যেতে খাকি প্যান্ট আর সাদা শার্ট পড়ে। তারই  বয়সী । ঠাকুমা তো ঐ নাদুশ নুদুশ ছেলেটাকে দেখিয়ে বলল, ওর নাকি খুব দুঃখ, কোন বন্ধু নেই, একা একা বাড়িতে থাকে  সব বড়দের সঙ্গে, গাড়ি করে স্কুলে যায় ফিরে এসে পড়াশুনা করে, মাস্টার এসে পড়িয়ে যায়। আর বাড়িতে সব ভাঙচুর করে। ঠাকুমা ছেলেটিকে খুব ভালবাসে, রেডিও ভাঙার পর বাবাও বকলেন মাও বকলেন মারলেন। ছোটবাবুর সেদিন কি কান্না। পরদিন সকালেও কাঁদছে। ঠাকুমা প্রশ্ন করেছিল,
      --কাঁদছ কেন ঠাকুর।
      ছোট ঠাকুর বলে,
      --রেডিও ভাঙ্গায় কী আমার কষ্ট হয় নি দাদি, মা বাবা এত বকল বলে আমার দুঃখ বেড়ে গেল। দুঃখ হলে আমি কাঁদি।
       এসব আদিখ্যেতা, ছেলেটা মোটেই ভাল না, বিশ্বনাথের ঠাকুমাকে কেন দাদি বলবে, ওরা কী হিন্দুস্থানি। ঠাকুমাকে বলেছে বিশ্বনাথ,
        --ওতো মান্তু, আমার সঙ্গে খেলে। একদম খেলতে পারে না, নদীর পারে আমরা রোজ খেলি শ্যাম বেটে।
       --- কী খেলা?
      --- নন্দাই খেলি, ফুটবল হাডুডুডু ক্রিকেট খেলি। ওর গায়ে একদম শক্তি নেই।
    মান্তু সরকারি স্কুলে পড়ে। প্রবেশিকার পর আর দেখে নি তাকে। সেও আর মাঠে যায় না, তখন তিন তিনটে টুইশনি করত। গোপালগঞ্জে এক ব্যবসায়ীর মেয়েকে পড়াত দশ টাকায়, সে কি আর জানত মেয়েটির দাদু ইংরেজির শিক্ষক , এম এ এন ইউ আর ই র উচ্চারণ বলে দিল মেনার, উনি শুদ্ধ করে দেওয়ায় মরমে মরে যাওয়ার অবস্থা, এর পর আর ভুল হয় নি। যদিও সেই মাস্টার মশাই সারদা স্টোর্সে আর একটা ট্যুইশনি যোগাড় করে দেন। পাঁচ টাকায় পড়াতো পাশের বাড়ির আবুকে। তার ভাল লাগত প্রতিবেশীর মেয়েকে। তার ফ্রকের বুকে টান পড়ায় রোমাঞ্চ হয়েছিল সেই বয়সে। ঠাকুমার শরীরে তখন জল হয়ে গেছে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে তার সঙ্গে কথা বলে আবোল তাবোল আর কাঁদে। এটা ওটা খাওয়ার ফরমাশ করে। কায়স্থ বাড়ি সাত্ত্বিক বিধবা, মাছ মাংস পেঁয়াজ রসুনের ধারে কাছে নেই। তবে ঠাকুমার নেশা একটা ছিল, তামাক খেত লুকিয়ে, নারকেলের নাইড়চা হুঁকোয় মুখ লাগিয়ে নীরবে টানত। শেষ দিকে তাও বন্ধ হয়ে যায়, তামাক কেনার পয়সা নেই। বাবা মায়ের  সোনা বিক্রি করে ব্যবসা শুরু করে, তখন নতুন বেরিয়েছে স্লাইস ব্রেড করিমগঞ্জে, মেশিনে বানায় বনিক মার্কা আর কাঠের ডাইসে কাটা হয় ভোলা বেকারি। বাবা দুই কোম্পানির এজেন্সি নেয় হাইলাকান্দিতে। প্রথম প্রথম খুব বিক্রি হয়েছে , রেলে করে ট্রাঙ্ক ভর্তি ব্রেড আসত। বিক্রি কমে গেল, মহামায়া হোটেলের বিল মেটাতে সব টাকা শেষ, কপর্দকশূন্য হয়ে ধার কর্জের বোঝা নিয়ে  বাবা আবার ফিরে এলো। তখন শিলচরের মানুষ খুব সিগরেট খেত, রাস্তার পাশে আধখাওয়া সিগারেটের টুকরোয় ভরে থাকত, সেইসব টুকরো জমিয়ে তামাক বানিয়ে দিত ঠাকুমাকে। শেষ দিকে মাথাটাও গেছিল ঠাকুমার। কাউকে চিনত না। মৃত্যু পর্যন্ত  বিশ্বনাথের নামটা ছিল জপমালা। ঠাকুমার দেওয়া অনেক নাম ছিল অধ্যাপক দেবের। ঠাকুমা অতি আদরে ডাকত ভুতু। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ছড়ায় গাইত গান, ভুতু রাজা রাজারে, ভুতু একদিন রাজা অইব, আমার অইব কিতা। ভুতুর ঠাকুমা একদিন বলল পিঁয়াজি খাবে পুজন সিঙের দোকানের। দোকান মানে চম্পা পাটোয়ার মদের দোকানের সামনে পথের উপর কুপি লম্ফর ভাজাভুজির উনুন। মা শুনে মাথা নেড়েছিল জোরে ,
      --না না।
      বিশ্বনাথ  কিন্তু মানে নি ,  কিনে এনে মুখে দিয়েছে  ঠাকুমার, থু থু করে ফেলে দিয়েছে। ইচার চপ খেতে চেয়েছে, খাইয়েছে, কিন্তু মুখে দাওয়ার আগেই থু থু। ডাক্তার দেখাতে পারে নি, এখনকার দিন হলে বলত  সোডিয়াম বেড়েছে, নুন খাওয়াত। বাড়ির সামনে ফটোগ্রাফার রাজকুমারদার বাড়ি, ওর বাড়ির বাগানে নিয়ে গেছে  ফোলা শরীরের ঠাকুমাকে। কি সুন্দর লাগছিল ধবধবে পিতামহীকে। ঠাকুমাকে চেয়ারে বসিয়ে পায়ের নিচে বসেছিল বিশ্বনাথ। ঠাকুমা ধীরে ধীরে কথা বলাও বন্ধ করে দেয়। বিশ্বনাথ হতভম্ব হয়ে ঠাকুমার মুখে তাকিয়ে থাকত। মা অতিকষ্টে দুমুঠো খাওয়ানোর চেষ্টা করত। মা বলেছে ঠাকুমা বড় লোক বাড়ির মেয়ে ছিল, দণ্ডকলস গ্রামের এজমালি বাড়িটাও মস্তো বড়। সম্পন্ন ভূস্বামী। শুধু নাতির মুখ চেয়ে বাবুদের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ নিয়েছিল। কাউকে জানতে দেয় নি কিছু,  ভোরের বেলা চান সেরে চলে যেত, যখন ফিরত শাদা শাড়ির আঁচল চাপা কত রকমারি খাবার। একদিন তো এক মিল্কেন ভর্তি ঘুলাইয়া কাঁঠালের কোয়া নিয়ে এলো। বাবুর বাড়ির উচ্ছিষ্টেই কী মহাভোজ হত নাতি বিশ্বনাথের। নাতির গায়ে কাটা ফুটলে ঠাকুমা উঃ করে উঠত। একবার ওদের বাড়ির উল্টোপাড়া খাসিয়াপট্টির নীলুর সঙ্গে বেধড়ক মারামারি, রাস্তার ওপার থেকে নীলু ছুঁড়ল পাথর, বিশ্বনাথের নাক ফেটে গিয়ে রক্তারক্তি কাণ্ড। এখনও আছে দাগ, ঐ কাটমার্কই ওর পরিচয় এখন। খাতায় পত্রে পরিচিতি  চিহ্ন। ছোট একটা নুড়ির বদলে এক আধলা ইট ছুঁড়ে মারল ঠাকুমা। নীলুরও মাথা ফাটল। তারপরও কি শান্তি মানে, নাতিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদল সারারাত। সে রাতেই বিশ্বনাথ প্রতিজ্ঞা করেছিল, বড় হয়ে যখন সে অনেক টাকা রোজগার করবে ঠাকুমাকে একটা মস্ত বড় ফস্‌সি হুক্কা কিনে দেবে সঙ্গে এক পোয়া খাম্বিরা তামাকও কিনে দেবে সেন্ট্রাল রোড থেকে। বিশ্বনাথের তো এখন অনেক টাকা। ঠাকুমা যেমন বলত ভুতু রাজা রাজারে। রাজা হলে ঠাকুমাকে সিভিল হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেবে ভেবেছিল। টিউশনির কুড়ি টাকাও সময়মতো পায় নি তখন । তাগদা দিয়ে টাকা এনে মাকে দিয়ে বলেছিল ঠাকুমা যা  খেতে ভালবাসে রেঁধে দিতে । ফটো উঠানোর দুদিন পর ঠাকুমা মরে যায়। শুনেও যায় নি, তার প্রাণের পুত্তলির প্রথম পাশের খবর।
        ছোটবেলা এত ধুলো উড়ত না, বাতাস ছিল নির্মল। চোখ জ্বালা করে অধ্যাপকের। পথ ভুল হয়ে যায়। তখন তো এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে ঘুরে ছোটদাদুর বাড়ি পৌঁছে যেত ঠাকুমা নাতি। এত এত পাকা বাড়ি ছিল না দণ্ডকলস গ্রামে । ঢিবির মতো টিলা পেরিয়ে এঁকেবেঁকে যাওয়া। বাংলার অধ্যাপক অনেকক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরে নিজের মনেই বলে, ‘পথিক তুমি পথ হারাইয়াছ’। হারানোর তো কিছুই নেই, কোন সম্পদ নিয়েই সে  আসে নি গ্রামে। স্মৃতির কোন অভিজ্ঞান নেই তার কাছে, কোন নাম জানা নেই, ছোটদাদুর কী নাম তাও জানে না। এখানে অনেক কাকা পিসি ভাই বোন বিশ্বনাথের।  বাজারের পথটা তো মনে আছে তার, টিলার নিচে আনারসের ক্ষেত ছিল একটা উপর থেকে নিচে। রিক্সার ভ্যাঁ ভো শুনে খুশি মনে রিক্সাওলাকে কিছু না বলে উঠে বসে। এ কেমন দণ্ডকলস গ্রাম,  নির্ঘাত ভুল হয়েছে, দণ্ডকলস  গ্রামে কোন কালে রিক্সা চলার কথা নয়। এ হয়তো অন্য গ্রাম, অনেক ভাগ থাকে গ্রামের, দণ্ডকলস পার্ট ওয়ান পার্ট  টু থ্রি । পথভোলা পথিকের এখন একমাত্র উপায়  যেখান থেকে এসেছিল সেখানে ফিরে যাওয়া, করিমগঞ্জ শহরে আবার। রিক্সাওলাকে বলে
        --যতীন্দ্র নাগের বাড়ি চেনো ?
       রিক্সাওলা বলল,
         --চিনি।
         বা এ চমৎকার কী করে হয়, তার ছোটদাদুর নামটা কী করে হঠাৎ মনে পড়ল। যাক তাহলে ঠাকুমার পিতৃকুলের কেউ না কেউ চিনবে তাকে তার বাবাকে নয় ঠাকুমাকে। গ্রামের ভিতর সরুপথ দিয়ে এগিয়ে যায় রিক্সা, লঙ্গাই নদীও মাঝেমাঝে উঁকি দেয় কিন্তু কিছুতেই আর গন্তব্যে পৌঁছয় না। অধ্যাপক দেব এবার বিরক্ত হয়ে রিক্সা চালককে বলেন,
       --আর কতদূর হে ?  
       রিক্সাওলা এবার ফিরে তাকায়।  বলে,
       --- কই যাইতা কইলা না তো?
        --- এ্যাঁ। বললাম যে।
        --- কিতা কইলা?
       --- যতি নাগের বাড়ি।
       --- না, ই নাম তো শুনছি না। খাড়াইন অউ সামনেউ নেনা মিয়ার ফার্মেসি। তাইন হক্কলরে চিনঅইন। যাইন, জিগাইলাইন।
        অধ্যাপকের পরিবারও তেমন বড় নয়। ঠাকুমারও এক সন্তান এক নাতি এক পন্তি। পন্তির নাম বিশু, বিশ্বরাজ দেব। সে অধ্যাপক হয় নি, বিদেশি ব্যাঙ্কের ম্যানেজার হয়ে গৌহাটিতে আছে, মাঝে মধ্যে বিদেশ ঘুরে আসে আর মাকে ভয় দেখায় বিদেশেই সেটল করবে। অধ্যাপকের ভীতু ঘরকুনো ছেলের শুধু বড় বড় কথা। তার মা তাকে পরিবারের বন্ধনে জড়িয়ে রাখে। ঠাকুমার কথাও বলে, বিশু নাকি দেখতে অবিকল ঠাকুমার মতো হয়েছে। ছেলে আফসোস করে,  
 ---ধুর দেখলামই না তোমার দিদিশাশুড়িকে।
      মা বলে,
  ---আমিই কী দেখেছি, আমি শুনেছি আমার শাশুড়ির কাছ থেকে, আর তোর বাবা তো পারলে একটা মন্দির বানিয়ে দেয় ঠাকুমার নামে।
     --- হ্যাঁ, বাড়িটার নামও তো স্যারের ঠাকুমার নামে। হিরণ্ময়ী নামটা কিন্তু সুন্দর, যাই বল।
এমন সব মাতাপুত্র কথার মাঝখানে ঢুকে যান প্রফেসর দেব। ছেলেকে বলেন,
---স্যার কী, শুনি ? বাপের সঙ্গে  ফাজলামো । ছবি দেখবি ?
বলে তার ছবির ভাণ্ডার খুলে বের করে বিবর্ণ এক উজ্জ্বল মুখ। ছেলে ‘ওয়াও’বলে খুশি হয়। বিশ্বজিৎ দেব ছেলেকে বলে,
---আমার নাম ছিল বিশ্বনাথ। ঠাকুমা যতদিন বেঁচে ছিল ওই নামেই ডাকত।
ছেলে বলে,
--- নামটা মোটেই ভাল না, ছবিটা খুব সুন্দর।
মঙ্গলেরও খুব পছন্দ হয় ছবিটা, সে ছবিটা নিয়ে নেয়। বলে পোস্টার বানাবে, ঘরের জায়গাও ঠিক করে। ড্রয়িং রুমের একটি দেওয়াল ঢাকা ছবি করিয়ে আনে চিত্রকর নীলম বরুয়ার শৈল্পিক  নবীনতায়। বিশুর বান্ধবী দোপাটির  ডাকনাম মঙ্গল, মঙ্গলবারে জন্ম বলে। অধ্যাপক পুত্রের সবই ভাল, কিন্তু বিয়ের কথা বললে কিছুতেই হ্যাঁও করে না, না ও না। এদিকে আবার মেয়ে বন্ধু অনেক। বেশির ভাগ গুজরাটি মাড়োয়াড়ি পাঞ্জাবি মাদ্রাজি। মঙ্গল  কম বয়সে পাঞ্জাবি ছেলেকে বিয়ে করে এখন একা। এ নিয়ে ওর কোন দুঃখ কষ্ট নেই, বিশু বলে বিন্দাস আছে বুলবুল ভাজার দোকান নিয়ে। বুলবুল ভাজা মানে ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন বিজনেস আর বাংলা নিয়ে আদিখ্যেতা। মানে, গৌহাটিতে বাংলা পাবলিকেশনেরও মালিক দোপাটি সেন। সেই কারণেই হয়তো অধ্যাপক বন্ধুপিতারও বিশেষ প্রিয়ভাজন। লিটারেচারের ছাত্রী, ইংরেজি এম এ, নিজের কোম্পানির এম ডি। দুই বন্ধুতে ইংরেজিতে খই ফোটায়। কিন্তু দিনশেষে সেই বাঙালিই, সিলেটিতে কথা বলে, শাক সুক্তো ইলিশমাছ আর সিদলভর্তার ভক্ত। ব্যোমকেশ ফেলুদা যেমন শীর্ষেন্দু সুনীল আর  জীবনানন্দের কবিতাও  পড়ে। অধ্যাপক তার গ্রন্থাগার থেকে বই দেয়। অগোছাল বই সাজিয়েও রাখে মেয়েটি। বিশু তো বই পত্তরের ধার ধারে না, বলে ওসব শেষ করেছি সিক্সথ সেমিস্টারে, আর নয়। এখন আইফোন জিন্দাবাদ। গুগোল শর্মার মতো বিদ্যার জেটপ্লেন থাকতে আর বিশ্বজিৎ দেব এর মতো ডুবোজাহাজে কী কাজ। বিশুর এসব তাচ্ছিল্য কথায় খুব ভয় ধরে অধ্যাপকের। বয়স যত বাড়ছে ততই অসহায় লাগছে, বিশুটা যদি কোন মাড়োয়ারি মাদ্রাজি বিয়ে করে, ওরা তো আবার নিরামিষ খায়। তাই বাড়িতে ফতোয়া দিয়ে রাখে ঘন ঘন। বলে বিয়ে করতে হবে বাঙালি। ব্রাহ্মণ বৈদ্য নমশূদ্র হলেও চলবে মুসলমানেও আপত্তি নেই, কিন্তু বাঙালি চাই। শিবুর কথা যে ভাবেন নি তাও নয়, কিন্তু পুতুল পুতুল মেয়েটার অতীত, ডিভোর্সি মেয়েকে পুত্রবধূ করার ভাবনায় মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ বাঁধা দেয়। তবে মেয়েটার সৃষ্টিশীল মনটাকে তার পছন্দ হয়, ঠাকুমার ছবিটার  প্রাণ প্রতিষ্ঠায় তো তার একার কৃতিত্ব, বৈঠকখানার ঘরটাকে এক অনন্য বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল করেছে। এর মধ্যেই একদিন বিশু বিশ্বজিৎ দেব ও তার স্ত্রীকে জানায় শিবানীর বাবা আসবেন অদের বাড়িতে। দুজনেরই প্রশ্ন করে একসাথে,  
---কেন ?
   ---কেন আবার কী? বিখ্যাত বাঙালি অধ্যাপককে দেখবেন শখ হয়েছে বড়লোকের। দুখানা চা বাগানের মালিক বলে কথা।
  ---সে তো ঠিকই আছে, আসতেই পারেন। চেনা নেই জানা নেই।
আনন্দও হয় এই ভেবে তাহলে অধ্যাপনা করে জীবনে সামান্য খ্যাতির অধিকারী তো হয়েছে সে , ঠাকুমার ছবির দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে একাএকা কথা বলে বিশ্বনাথ,
---রাজা নাহলেও রাজার মতো হয়েছি ঠাকুমা।
মনোতোষ সেন মানুষটিও তো মন্দ নয়। দেখে খুব পরিচিত মনে হল অধ্যাপক দেব এর। হয়তো কিছু মানুষ থাকেন যাদের দেখলেই চেনা লাগে। যেমন লেগেছিল মঙ্গলকে। ঠাকুমার ছবিটা অনেক সময় নিয়ে দেখলেন সেন সারথবাহ,বাংলা কবিতায় বনিক সাউকারদের এনামেই ডাকা হত, অধ্যাপক গর্বভরে বলে,
---আমার ঠাকুমা, আপনার মেয়ে উদ্ধার করেছে পুরনো ছবির বাক্স থেকে।
লোকটা কেমন যেন আনমনা হয়ে রইলেন। বললেন,
---আপন ঠাকুমা ?
জবাব শুনে বললেন
---ও আই সি।
সেন মহাশয়ের যাওয়ার আগের শেষ সংলাপ।
        চা বাগান মালিক মনোতোষ সেনের নাটকীয় চলে যাওয়া কারো ভাল লাগে নি। মঙ্গলের  সঙ্গে বিশুর সম্পর্ক আছে কী নেই বুঝা যায় না। বিশু তার মাকে বলে,
       --বিয়ে করব চেন্নাইর মেয়ে গৌতমী রঙ্গরাজনকে।
       মানে আফটারএফেক্ট, মঙ্গলপিতার নিষ্ক্রমণের অনেক কিছু ঘটে গেছে। অধ্যাপক বিশ্বজিৎ দেব বুঝতে পারে ঠাকুমার ছবি নিয়েই ঘটে গেছে মঙ্গল আর বিশুর  বিচ্ছেদ। ঠাকুমার বিশ্বনাথ  তারপর ছেলের কাছে খুলে বলে  তার গর্বের দিনগুলির কথা, ঠাকুমার গৃহপরিচারিকা হয়ে পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়ার কথা। অধ্যাপক নিজের আত্মপরিচয় ছেলের কাছে মেলে ধরতে বিন্দুমাত্র গ্লানিবোধ করে নি। বলেছে আজকের গৌহাটির বাঙালি বুদ্ধিজীবীর প্রবেশিকা পরীক্ষার ফিস দেওয়াই হত না মহীয়সী ঠাকুমা না থাকলে। বিশু তার প্রপিতামহীর ছবির সামনে জোড়হাতে দাঁড়িয়ে বলে, 
     --- কোন বাড়িতে কাজ করত তোমার ঠাকুমা? সেন বাড়িতে না?
     --- হ্যাঁ।
        অধ্যাপকের আর  বুঝতে বাকি থাকে না মনোতোষ সেনকে কেন এত চেনাচেনা লাগছিল।তার মানে মান্তুই মনোতোষ সেন । নড়ে চড়ে বসে অধ্যাপক দেব, মঙ্গলকে ফোন করে বলে,
     ---তোর মঙ্গল নামটা খুব মিষ্টি।
      ---খুব খারাপ কাকু ? ছেলের নাম?
    --– না রে সত্যি ভাল,অন্য রকম। আয় না বাড়িতে ।
       মেয়ে না করে দেয়। বলে,
       -- আসব না। তোমার ছেলে খুব টেঁটিয়া।
        --- কেন?
       --- তোমার ছেলে বলেছে মাইফুট। আমার নীল রক্তের বাপ বলেছে বিয়ে দেবে না।
        --- মানে?
        --- সে আছে,  গৌতমীর কাছ থেকে জেনে নিও, ওরা তো শুনেছি রেজিস্ট্রি করে ফেলেছে।
        --- তাই?
         --- তোমার ছেলেকে চেনো না, সব ঢপ। আমাকে চাপে রাখছে।
         --- গুড।এখন  আমিও যদি মাথা নুইয়ে একটা ঢপ দিই।
         --- তুমি মাথা নোয়াবে? বস বি দেব ? ইন নো কেস কাকু ।
         --- আরে তা নয়,  আমার ঠাকুমা তো আর  আসল ঠাকুমা নয়। আমাদের বাড়িতে কাজ করত। করতে করতে ভালবাসে আমায়।
        মঙ্গল হাসতে হাসতে  বলে,
      --- আমার বাপ বিজনেসম্যান, ধরে ফেলবে।
       --- তা হলে? এতদিন তো আমার ঠাকুমা ছিল একটা সাদা কালো ছবির ভিতর। তুইই হিরণ্ময়ীর ছবিতে রঙ লাগিয়েছিস। এখন সমাধানও তুই করবি গৌতমী রঙ্গরাজন।
        ওরা কত কী জানে, জীবনকে জটিল হতে দেয় না। লঙ্গাই রোডে রিক্সায় বসে অধ্যাপক ভাবে কে ঠিক, জটিল পূর্বপ্রজন্ম না বিন্দাস যুগের কুশীলব। অকারণে ফোন বের করেও আবার পকেটে ঢুকিয়ে রাখে। কাকে ফোন করবে, কেউ তো নেই কোথাও, যে হিন্ট দিতে পারবে, ক্লু ধরিয়ে দেবে। প্রত্নখননের হদিশ কে দেবে,বলবে  দণ্ডকলস  গ্রামের কোথায় জন্ম হয়েছিল বিশ্বনাথের ঠাকুমার। নাগ বাড়িটি ঠিক কোথায়। অধ্যাপক মানুষটি যে পথ হারাইয়াছে, কে করবে তার মার্গদর্শন। ঠাকুমার জন্ম ভিটেয় মাথা নুইয়ে যে ক্ষমা চাইতে হবে তাকে। সন্তানের জন্য যে সে শিকড় বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি নিয়েছিল। নেনা মিয়া মানুষটি যেমন হবে ভেবেছিল বিশ্বজিত দেব তেমন নয়, দাঁড়ি তকির গ্রাম্য মানুষ নয়, সুপুরুষ শহুরে প্রৌঢ়, তার থেকে ছোটো। বলেন,
     --- আপনে বুলে নাগবাড়িত যাইতা, তে কোন নাগ, এক আসলা রসেন্দ্র নাগ হউ পূবর টিল্লাত, তারা তো নাই, গেছইনগি শিবরগুল।
    --- না না, আমার ঠাকুমা। এখানেই জন্ম, আমি অনেকবার এসেছি এখানে , এক দৌড়ে পৌঁছে গেছি  ছোটদাদুর বাড়ি। আমার ঠাকুমার নাম হিরণ্ময়ী নাগ,  হিরণ্ময়ী দেব।
    --- অয় হিরণ্ময়ী আছলা, না আইজ্ঞা ই নাম হুনছি না। আর একটু চিন দেইন, কেউর নাম কইন জিতা মাইনষর।
     --- জ্যান্ত মানুষ কেউ নেই।
      --- তে অতদিন আইলা না কেনে?
      --- জীবন যুদ্ধ।
      --- বুঝলাম অখন ই  মাটি খুঁজিয়া কিতা করতা?
      --- কী যে বলেন , মাটিতেই তো  শেকড়। শেকড় হারালে  কী থাকল ?
       --- অখন নু কইলা ঠাকুমার কথা।
        নেনা মিয়া রসিক মানুষ,  বুঝে গেছে অধ্যাপক মানুষটা প্রকৃতিস্থ নয়, তাই কৌতুকে মাতে। ঠিক তখনই অধ্যাপকের মোবাইল বাজে। মুখ উজ্জ্বল হয়, দোপাটির ফোন,
       --- কাকু ছবি দেখলাম কাগজে, বক্তৃতা দিচ্ছ। তুমি এখন আসামে?
     --- হ্যাঁ। জগন্ময় আমার বন্ধু,  অনুরোধ করল, তাই চলে এলাম, কোন কাগজে বেরিয়েছে? নববার্তা?
     --- তুমি এখনও আছ করিমগঞ্জ।
     --- না আমি দণ্ডকলশ  গ্রামে, আমার ঠাকুমার বাড়ি খুঁজতে এসেছিলাম, খুঁজে পাচ্ছি না?
     --- ঠাকুমাকে হারিয়ে ফেলেছ?
     --- হ্যাঁ অনেকটা তাই দাঁড়ায় ।  ঠাকুমা হারিয়ে গেছেন ।
        ফোন তখনও শেষ হয়নি,  নেনা মিয়া বলে,
      --- কে কইছে ঠাকুমা হারাই গেছইন?
       --- আমার পুত্রবধূ।
       মিছে কথা বলল কী। মিছে হবে কেন, অধ্যাপক  জানে তাঁর গোঁয়ার ছেলেও তাঁরই মতো, যতই ঠাট্টা তামাশা করুক , সে তাঁর হিরণ্ময়ী বাড়ির ঐতিহ্যকে মান্য করে। আর বিয়ে করলেও  সে দোজকন্যা দোপাটিকেই করবে। মঙ্গল জানে গৌতমী রঙ্গরাজন নামটাও একটা ঢপ। ওষুধের দোকানের মালিক নেনা মিয়া বুঝতে পারে লোকটা ভবঘুরে নয়, একজন বিখ্যাত লোক। কৌতুকের অবস্থান পালটে  অধ্যাপকের সম্মানে বেরিয়ে আসে দোকান ছেড়ে।  বলে,                              
       --- কই দেইন স্যার তানে।  ইতা মিছা কথা, কেউর ঠাকুমা হারায় না। আমি বার করি দিমু আপনার ঠাকুমা।

        অধ্যাপক বিশ্বজিৎ দেব কী জানি কী বুঝে, মঙ্গলকে কিছু না বলে কেটে দেয় ফোন, নেনা মিয়ার চোখে তাকিয়ে থাকে ভাবলেশহীন।


*****

 
   
        


    


স্যুকির নোবেল কাড়তে হবে



 ।। এম রিয়াজুল আজহার লস্কর ।।

(C)Image:ছবি















জ্বলছে মায়ান হিংসার আগুন রক্তের এলো বন্যা।
ভাসছে লাশে সাগর নদী ধর্ষিতা বোন কন্যা। ।
স্যুকির নোবেল কাড়তে হবে হিংসার তুমি রানি !
তোমার দেশে পাইনা কোনো মানবতার বাণী !!
নিঃস্ব হলো রোহিঙ্গারা ভাসছে কেঁদে জলে !

ভাবছি স্যুকি ! তোমায় মানুষ ‘মানুষ’ কেনো বলে !!

©
( হাইলাকান্দি / আসাম )
০২/১০/২০১৭

যুদ্ধারম্ভ


।। 
শিবানী ভট্টাচার্য দে   ।।

     
       সারাদিন লিপিকার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে যাচ্ছে । একটা পুলক ভরা অনুভূতি, অথচ একটা ব্যথার অসহ্য মোচড় । পনেরো বছরের বিবাহিত জীবন এবং দু বছরের প্রাক-বিবাহ প্রেমের জীবনে তার কখনো এমন অভিজ্ঞতা হয়নি । লিপিকা কি আবার নূতন করে প্রেমে পড়ল !
সপ্তাহখানেক আগে লিপিকা ও প্রশান্তের ঝগড়া হয়েছিল । দাম্পত্যকলহ নতুন কিছু নয়, মাঝে মাঝেই হয়, আবার মিটেও যায় । সাধারণ বিবাহিত দম্পতিদের থেকে ওরা আলাদা কিছু নয় । তবে এবারের ব্যাপারটা বেশ সাংঘাতিক ।
বিছানায় শুলেই বউয়ের শরীর চটকানো প্রশান্তের অভ্যাস । ঘুম ভাঙলে ভোরবেলাও বাদ যায় না । প্রশান্তের ধারণা, সঙ্গিনীর প্রতি প্রেম নিবেদনের এটাই মোক্ষম উপায় । এটা স্বামীর অধিকারও । স্বামীর সব ত্রুটি বিচ্যুতি এই শারীরিক আদরেই মাফ হয়ে যায় । লিপিকা ও প্রশান্তের পনের বছরের বিবাহিত জীবনে সন্তানের জন্ম উপলক্ষে মাসখানেক ও অফিসের কার্য উপলক্ষে কালে ভদ্রে বাড়িতে দু এক দিনের বাধ্যতামূলক অনুপস্থিতি ব্যতিরেকে প্রশান্ত নিয়মিত এই কাজ করে আসছে ।
বিবাহিত জীবনের প্রথমদিকে লিপিকা স্বামীর আদরটুকু উপভোগই করত । এখন অভ্যস্ত জীবনে ওর শারীরিক ক্ষুধা অনেকটা স্তিমিত, মধ্যবয়স্কসুলভ মেয়েলি শারীরিক রোগবালাই ও দেখা দিচ্ছে, সাংসারিক কাজের জন্য শারীরিক পরিশ্রম, নানা রকম দায়িত্বের জন্য মানসিক চাপ সবই বেড়েছে । এখন বিছানাতে পড়লে শরীর বিশ্রাম চায় । প্রশান্ত সারাদিন অফিসে থাকে। যখন ঘরে ফেরে, তখন  সে ঘরের কোন সমস্যা কিংবা রোগ ব্যামোর কথা শুনতে চায় না । লিপিকাও তাকে যথাসম্ভব সমস্যা থেকে আড়াল করে রাখে । তাই প্রশান্তের কাছে ঘর মানে শুধু আরাম ও সুখ, আর স্ত্রী সেই সুখ ও আরামের জোগানদার । মাঝবয়সে এসে লিপিকা দেখে সে আর আগের মত সেই ভূমিকা পালন করতে পারছে না । তাই সে প্রশান্তকে সংযত হতে বলে, কিন্তু মাঝবয়সি প্রশান্তের কাছে সংযম মানে পৌরুষের অবমাননা এবং স্বামীর অধিকারের খর্বীকরন ।
আমার বউ, আমি যখন ইচ্ছে, যেমন খুশি আদর করব, এতে কার কী ? প্রথম প্রথম এভাবেই স্বামী হিসাবে নিজের প্রেমের অধিকার ফলাতে চেষ্টা করে ।
তা তো বুঝলাম, কিন্তু শরীরটা তো আর সব সময় ওই জন্য তৈরি থাকে না । বৌ তো তোমারই থাকবে, কোথাও চলে যাচ্ছে না । একটু রয়ে সয়ে করো না । লিপিকা অবুঝ স্বামীকে বোঝায় । বয়স ও তো হচ্ছে ।
সেই জন্যই তো বলি, হেসে নাও দুদিন বৈ তো নয় । আভি তো ম্যায় জোয়ান হুঁ ।
তুমি চাইলেই তো সব দিন তোমার সঙ্গে ওইরকম সঙ্গত দিতে পারি না ।
তা হলে কে চাইলে দিতে পারো ?
মোক্ষম প্রশ্নে লিপিকার মুখ বন্ধ হয়ে যায় । প্রশান্ত লিপিকাকে জব্দ করে ওর মুখের দিকে তাকায় । আজকাল তার মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, লিপিকা কি তাকে আর চাইছে না ? শ্যামবর্ণ মাঝারি গড়ন  সাধারণ চেহারার পুরুষ প্রশান্ত দীর্ঘাঙ্গী সুন্দরী স্ত্রীর জন্য কখনো গর্বিত, কখনো হীনমন্যতায় ভোগে । সম্পূর্ণ অধিকার হওয়া সত্ত্বেও অণুমাত্র প্রতিবন্ধকতায় রাজ্যপাট বেদখল হবার ভয় তার মনে চাড়া দিয়ে ওঠে । তার অনেক অফিস-কলিগ মাঝে মাঝেই পরকীয়ার গল্প করে, একঘেয়েমির হাত থেকে মুক্তি পেতে অন্য নারীর সঙ্গ খোঁজে । সেই নারী ও হয়তো অন্য কারো বউ, অথবা স্বাধীন মেয়ে । লিপিকার ওকে প্রত্যাখ্যান করার পেছনেও সে রকম কোনো কারণ নেই তো ? সে তো সারাদিন বাড়ি থাকেনা, লিপিকা একাই থাকে । তাই বউ যেদিন বারণ করে, প্রশান্ত সেদিন যেন আরো উত্তাল হয়ে ওঠে  ।
একমাত্র কন্যাসন্তান প্রাচীকে লিপিকা পাঁচবছর বয়সেই আলাদা বিছানা এবং দশ বছর বয়সে শোবার ঘর আলাদা করে দিয়েছে । মেয়ে মাঝেমাঝে ভয় পার, তাই লিপিকা নিরাপদ সময়ে বেডরুমের দরজা ভেজিয়ে রাখে ।
ক’দিন ধরেই লিপিকার শরীর তেমন ভাল যাচ্ছিল না, ক্লান্তিবোধ হচ্ছিল, ভোরবেলা একটা তন্দ্রাচ্ছন্ন অবসাদ কাটিয়ে সজাগ হতে সময় লাগছিল । সেদিনও তার ব্যতিক্রম ছিল না । রাতে শুতে যাবার সময়ে প্রশান্তকে বলেছিল, আজ আর ডিস্টার্ব করো না, একটু ভাল করে ঘুমোতে চাই ।
প্রশান্ত অভিমানাহত গলায় বলল, আজকাল আমার আদর তোমার ডিস্টার্ব মনে হয় ?
তা নয়, লিপিকা বলল, ক’দিন ধরেই বেশ টায়ার্ড লাগছে । ঘুমটা হচ্ছে না ঠিকমত । তাই বলছি আজকে ওসব থাক ।
শরীর খারাপ লাগলে ডাক্তার দেখাও না কেন ?
ভাল করে বিশ্রাম নিলে হয়তো শরীর ঠিক হয়ে যাবে । যদি না হয় তাহলে তো ডাক্তারের কাছে যেতেই   হবে । ডাক্তারের কাছে যেতে সময় ও তো চাই ।
চলে যেও কালই । আমার কথা ও একটু ভাববে তো ।
লিপিকা একটু মনঃক্ষুণ্ণ হয় । ওর শরীরখারাপের কথায় প্রশান্ত নিজের অসুবিধেটুকুর কথাই ভাবল ।
প্রশান্ত পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল । প্রাচীর পরীক্ষা অদূরেই, তাই সে খানিকটা রাত জেগে পড়াশুনো করে । মেয়ে যদি কোনো কারণে ডাকে, তাই লিপিকা দরজা ভেজিয়ে নিশ্চিন্তমনে শুয়ে পড়ল । ভোরবেলা আধোঘুমের মধ্যে সে টের পাচ্ছিল প্রশান্ত তার রাতপোশাক আলগা করছে । কিন্তু তন্দ্রাজড়িত অবসন্ন শরীরে প্রশান্তকে বাধা দেবার কিংবা তার আহ্বানে সাড়া দেবার সামর্থ্য কোনোটাই তার ছিলনা । বরং সে আবার ঘুমিয়ে পড়েছিল ।
হঠাৎ খুট করে আওয়াজ হতেই লিপিকার ঘুম ভেঙ্গে গেল । ধড়মড়িয়ে চোখ খুলে দেখে, সর্বনাশ । খোলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে প্রাচী । লিপিকার অবস্থা ? নাইটি প্রায় কোমর অবধি তোলা, প্রশান্তের ভাঁজকরা হাঁটু তার উরুমূলে, নাইটির বোতামও খোলা, প্রশান্তের হাত ওর বুকের উপর । মুহূর্তের মধ্যে লিপিকা নিজেকে সামলে নিল ঠিকই, কিন্তু মনে দুশ্চিন্তা রয়ে গেল, মেয়ে দেখেছে কিছু ? যদিও জানালার পর্দা টাঙ্গানো, ফুলছাপ মশারি খাটানো, মেয়ে দৃষ্টিতে একটু খাটো, ও ঘুমচোখ, তাই স্পষ্ট কিছু হয়তো দেখেনি---- এই যা ভরসা । নিজেকে সামলে উঠে ওর দিকে তাকাতেই প্রাচী আঙ্গুল দিয়ে ঘড়ির দিকে দেখাল---ছ’টা পনের বাজে ।
লিপিকা তড়িঘড়ি সামলে উঠে টয়লেটে ঢুকে চোখেমুখে জল দিয়ে বেরিয়ে এল । মেয়ের মুখের দিকে তাকাল-----না, কোনো অস্বাভাবিকতা ফুটে ওঠেনি ওর নিষ্পাপ মুখে । নিজের কাজ করছিল আপন মনে । তারপর স্নান করতে বাথরুমে ঢুকে গান করছিল রোজ যেমন করে । লিপিকা আশ্বস্ত হল---হয়তো তেমন কিছু দেখেনি, হয়তো কিছু বুঝতে পারে নি । কিন্তু ওর প্রচণ্ড রাগ উঠছিল প্রশান্তের উপর ----সে এত দায়িত্বজ্ঞানহীন কেন? কেন নিজের শারীরিক চাহিদাকে এতটুকু সংযত করতে পারে না  যার জন্য লিপিকাকে এরকম বিব্রত অবস্থায় পড়তে হল ? রাগে, হতাশায় লিপিকার মনে হয়, সে যদি কোন কারণ-বশত পাশে শুয়ে মরেও থাকে, তাহলেও সেই মরা শরীরের সঙ্গে যৌন খেলায় মগ্ন থেকে প্রশান্ত টেরটিও পাবে না যে সে মরে গেছে ।
বেশি ভাবনার অবকাশ নেই এখন । মনকে কোনও রকমে শান্ত করে লিপিকা । আটটায় প্রাচীর স্কুল, বেরোবে সোয়া-সাতটায় । তার ব্রেকফাস্টের জন্য দুধ টোস্ট, দুপুরের টিফিন সব রেডি করতে হবে । তারপর প্রশান্ত বেরোবে সাড়ে আটটায়, তার খাবার তৈরি করতে হবে । ঘরের বাকি কাজ শেষ করে স্নান করে দুটোয় প্রাচীকে আনতে যেতে হবে । প্রশান্ত বাইক বের করল প্রাচীকে বাসে পৌছে দেবার জন্যে, ওর স্কুল গাড়ি ধরতে বেশ খানিকটা রাস্তা এগিয়ে যেতে হয় ।বিকেলের দিকে বাস থেকে নামলে লিপিকা তাকে বাড়ি নিয়ে আসে। সব কাজ স্বাভাবিক ছন্দে চলতে লাগল।
রাতে শোবার সময় প্রশান্ত বলল, দরজা আটকে দিই,  তুমি তো যে রকম করে আজ ঘুমচ্ছিলে ।
লিপিকা এবার রাগে ফেটে পড়ল । কোনোরকমে গলাটাকে খাটো করলেও সারাদিনের চেপে রাখা ক্ষোভ ও ক্রোধ উগরে উঠল ।
আমি নিজে থেকে করেছিলাম ? তোমার জন্যই তো এরকম হল । কতদিন বলেছি, মেয়ে বড় হচ্ছে, এখন নিজেকে একটু সামলাও । তোমার কোনো আগড় নেই । কালকে শোবার সময়ই বলে দিয়েছিলাম যে আমাকে ডিস্টার্ব কোরও না । তাও তুমি ভোরবেলা আমাকে এই রকম করে বিব্রত করলে । শরীর ভাল না থাকলেও তোমার শরীরের খিদে আমাকে যখন তখন মিটাতেই হবে ! আমাকে লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে ফেললেও তোমার কিছু এসে যায় না । দায়িত্বজ্ঞান, কাণ্ডজ্ঞান এই আধবুড়ো বয়সেও তোমার হল না । তুমি ভীষণ স্বার্থপর ।
প্রশান্তের হাত ঠেলে দিয়ে ডবল বেডে যতদূর সম্ভব মাঝখানে ফাঁক রেখে লিপিকা পেছন ফিরে শুয়ে পড়ল ।সে রাতে দুজনেরই ভাল করে ঘুম হল না । নিশ্চিন্তে ঘুমোনোর জন্য প্রতিবাদ করে উল্টে মাথা গরম করে লিপিকা আজ ঘুমোতে পারল না । প্রশান্ত ঘুমোতে পারল না স্ত্রীর প্রত্যাখ্যানের গ্লানি ও অভ্যাসের জবরদস্তি বদলের ফলে ।
প্রথম দু-তিনদিন তো লিপিকার প্রশান্তের মুখ দেখতেও ইচ্ছে করেনি । খুব প্রয়োজন হলে দু- একটা কথা, বেশিরভাগই ভাববাচ্যে ।দুতিন দিন পর দুজনেই একে অন্যের নজর এড়িয়ে আড়চোখে তাকায়, কিন্তু কথা বলেনা । শোবার পর লিপিকার অবশ্য কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুম এসে যায়, প্রশান্ত ও এপাশ ওপাশ করতে করতে কোনো একসময় ঘুমিয়ে পড়ে --- সবই অভ্যাসের ফল । শোবার সময় লিপিকা বুঝতে পারে প্রশান্ত ওর কাছে আসার জন্য উন্মুখ । তার নিজের ও প্রশান্তের দিকে সরবার ইচ্ছে করে না যে তা নয়, কিন্তু সে নিজেকে শক্তভাবে দমন করে বিছানার ফাঁকটুকু বজায় রাখে । প্রশান্তকে সে এতদিনে ভালই চেনে । একবার প্রশ্রয় দিলেই মাথায় চড়ে বসবে । লিপিকাকে এরকম বিষম অবস্থায় ফেলে তার মনে তো কোন অনুতাপ নেইই, উলটে নিজের কাজের দায়ভার ওরই উপর চাপিয়েছে । স্ত্রীর শরীরকে ভোগ করার অধিকার সে পুরোমাত্রায় নেবে, কিন্তু তাকে অসম্ভ্রম থেকে রক্ষা করতে দায়িত্ব নেবার কোনো মানসিকতা তার নেই । তাই জেনেবুঝেই লিপিকা প্রশান্তকে কষ্ট দেয়, তার মনে হয় প্রশান্তের শিক্ষা হওয়াই উচিত, তাতে যদি সে অন্যের অনুভূতি বুঝতে পারে ।
আট দিন কেটে গেল এভাবেই । তার পরের রাতে শোবার সময় প্রশান্ত লিপিকার হাত ধরল । মুখে কিছু না বললেও সেই ছোঁয়ায় ছিল মার্জনা ভিক্ষার অনুরোধ । লিপিকা আর হাত সরিয়ে দিতে পারল না । বাধা না পেয়ে প্রশান্ত স্ত্রীকে বুকের উপর টেনে নিল । লিপিকাও সমস্ত সংযম উড়িয়ে দিয়ে স্বামীকে জড়িয়ে ধরল । আর প্রশান্তের সমস্ত পৌরুষের বাঁধ ভেঙ্গে চোখ গলে ধারা নামল, লিপিকার সমস্ত রাগ, সমস্ত অভিমান সেই ধারায় ভেসে গেল । এত অসহায়, লিপিকার উপর, তার শরীরের উপর এত নির্ভরশীল---- প্রায় শিশুর মত । লিপিকার শরীরের গন্ধ ওকে এখনো উতলা করে, স্পর্শে পাগল করে । প্রিয়তমকে ব্যথা দেবার অনুতাপে লিপিকার বুক মোচড়ে উঠল । আলিঙ্গনে, চুম্বনে সব দুঃখ, সব চোখের জল  মুছিয়ে নিজেকে নিঃশেষে সঁপে দিতে দিতে লিপিকার ফুলশয্যার রাতের কথা মনে পড়ছিল । দুজনে দুজনের স্পর্শের নিবিড়তা উপভোগ করতে করতে কখন গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে গেল ।
সকালবেলা নিয়মমাফিক জীবনযাপন শুরু হয়ে গেল । প্রাচী স্কুলে, প্রশান্ত অফিসে গিয়েছে ; দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে থাকলেও আগের রাতের আবেশ লিপিকাকে যেন জড়িয়ে রেখেছিল । বারে বারেই প্রশান্তের কামনাকাতর মুখখানি মনে পড়ে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠছিল ।পূর্বরাগের পর্বেও লিপিকা প্রশান্তের কথা এত ভাবে নি, স্পর্শের পুলক শরীরে এত দীর্ঘায়িত হয় নি । সে কি আবার নতুন করে প্রেমে পড়ল ! সারাক্ষণ তার শুধুই মনে পড়ছিল, কখন সে আবার প্রশান্তকে দেখবে, তাকে নিবিড় করে পাবে ।
সন্ধ্যাবেলা প্রশান্ত যথাসময়ে কাজ সেরে ঘরে ফিরল । চা-টা খেয়ে বিশ্রাম নিয়ে মেয়ের সঙ্গে কথা  বলল, স্ত্রীর সঙ্গে ও অল্পস্বল্প ।  লিপিকা অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছিল শয়নের নিভৃত সময়টুকুর জন্য । ওরা সাধারণত রাত এগারোটার আগে শুতে যায় না । প্রাচী রাত দশটা অবধি পড়ে, পড়াশুনো শেষ হলে বাবা-মায়ের সঙ্গে সারাদিনের জমানো গল্প করে । তারপর সবাই টিভি দেখতে দেখতে একসঙ্গে খায় । সকালবেলার কিছুটা প্রস্তুতি সেরে শুতে শুতে রাত এগারোটা হয়েই যায় । আজকে ঘড়িটা যেন এগারোটা বাজতেও দেরি করছে । তবে লিপিকা লক্ষ্য করছিল, সবকিছুর মধ্যেও প্রশান্ত যেন কিছুটা নিরুত্তাপ । সেটা কি কালকে রাতে নিজেকে বেশি প্রকাশ করে ফেলায় ?
প্রতীক্ষিত সময় এল । অধীর আগ্রহে লিপিকা আজ শয্যায় কোন ফাঁক না রেখেই প্রশান্তের পাশে শুল । লিপিকাই আজ প্রশান্তের হাতে হাত রাখল । পরিবর্তে হাতে একটু চাপের বেশি আর কোনো সাড়া প্রশান্তের দিক থেকে পাওয়া গেল না । লিপিকাই নিজের থেকে দু একটা কথা বলল, প্রশান্তও দুএকবার জবাব দিল, নিতান্তই মামুলি দায়সারা । ধীরে ধীরে তার কথা ঘুমজড়ানো হয়ে গেল, শ্বাসপ্রশ্বাস দীর্ঘতর, একসময় ওপাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল ।
লিপিকা বুঝতে পারল প্রশান্তের অনেক দিনের  চাহিদার কালকেই পরিসমাপ্তি ঘটেছে । তার ওই চোখের জলের মধ্যে লিপিকার শরীরের স্পর্শ-গন্ধের জন্য কোন আকুলতা ছিল না । ছিল শুধু নিজের উদ্গত কামপ্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করতে না পারার হতাশা ও খেদ । লিপিকার আত্মসমর্পণের সঙ্গে সঙ্গেই তা মিটে গেছে । অধিকার কায়েম হয়ে গেছে, এর মধ্যে ওর জন্য প্রশান্তের শরীরী-অশরীরী কোনোরকম প্রেমের কোনো স্থান নেই।  বরং এই প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে আহত পৌরুষের প্রতিশোধ নেবার পালা শুরু হল ।
লিপিকা আর ভাবল না । অনেক রাত  হয়েছে, ভোরবেলা উঠতে হবে । দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল ।
                                                     ~~~


বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা

 
         'বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা' এই শিরোনামে একটি দু'দিনের আলোচনা চক্র  হয়েছিল ২৫ এবং ২৬ শে নভেম্বর, ২০১৬ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ড০ কে পি বসু মেমোরিয়েল হলে।   স্কুল অফ ল্যাংগয়েজেস এন্ড লিঙ্গুইস্টিকস, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়-এর সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি আয়োগের অর্থানুকূল্যে সরসুনা কলেজের উদ্যোগ  অনুষ্ঠিত  এই সেমিনারে যে  প্রবন্ধগুলো পড়া হয় তার  নির্বাচিত সংকলন এই বই। সম্পাদনা করেছেন সরসুনা কলেজের বাংলার অধ্যাপক তন্ময় বীর এবং এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক অতনু সাহা।  এই আলোচনা চক্রে  উপস্থিত থেকে ঈশানের পুঞ্জমেঘের অন্যতম সঞ্চালক সুশান্ত করও একটি নিবন্ধ পাঠ করেন। ভারতে  বাংলা এবং ভাষাতে সম্ভবত এরকম প্রথম প্রয়াস এবং প্রথম বই। যদিও সেই আলোচনা চক্রে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।  ফলে পূর্বোত্তর ভারতে প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন যারা তাদের কাছেও এটি গুরুত্বপূর্ণ বই। তাছাড়া যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এহেন উদ্যোগের শুরু থেকে ঈশান সহযোগী। বইটি পাঠ সুবিধে করে দিতে আমরা ঈশানের পুঞ্জমেঘেও তুলে দিলাম। প্রায় ১৮০ পৃষ্ঠার বইটিতে উনিশটি প্রবন্ধ রয়েছে।
                 আপনি কম্পিউটারের পুরো পর্দা জুড়ে পড়তে পারেন। নামিয়ে নিয়ে অবসরে পড়তে পারেন। আপনার শুধু দরকার পড়তে পারে এডোব ফ্লাস প্লেয়ারের, সেটি এখান থেকে নামিয়ে নিন ( ম্যাক-কাফে সিকিউরিটি সফটোয়ার এড়িয়ে যাবেন)।
                     আর মোবাইলে পড়লে ব্লগার এবং স্ক্রাইবড নামিয়ে নিলে সুবিধে।

'প্রতাপ' এর পূজা সংখ্যা প্রকাশিত

।। শৈলেন দাস।।                                                          
প্রকাশিত হল সমাজ ও সাহিত্য বিষয়ক ছোট-কাগজ 'প্রতাপ' এর পূজা সংখ্যা ১৪২৪। শৈলেন দাসের সম্পাদনায় শিলচর মালিনী বিল থেকে প্রকাশিত ছোট-কাগজটির উন্মোচন উপলক্ষে গত ২৭শে সেপ্টেম্বর মহাসপ্তমীর দিন সকাল ১১টায় চাতলা হাওরের অন্তর্গত বাঘমারা গ্রামের সার্বজনীন দুর্গা পূজা মণ্ডপে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রায় পঞ্চাশ জন সাহিত্যানুরাগী মানুষের উপস্থিতিতে বরাক উপত্যকা কৈবর্ত সমাজ উন্নয়ন পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি সুবোধ দাস, প্রাক্তন শিক্ষক গো-পেশ রঞ্জন দাস, রেবতী মোহন দাস, সমাজকর্মী কানু চক্রবর্তী, কৃতি শিক্ষক ললিত মোহন দাস, কালিপদ দাস সম্মিলিতভাবে 'প্রতাপ' এর আবরণ  উন্মোচন করেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে সমবেত কণ্ঠে উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন করেন মুন দাস, সুদীপা দাস, যূথিকা দাস ও ঋতিকা দাস। স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন সানি ভট্টাচার্য, সুশীল চন্দ্র দাস, শৈলেন দাস, জয়মনি দাস, রাকেশ দাস ও রাজু দাস। একক নৃত্য পরিবেশন করেন কাকলি দাস।  সভায় উপস্থিত সবাই 'প্রতাপ' এর ভূয়সী প্রশংসা করেন ও আগামী দিনে বৃহৎ পরিসরে প্রকাশিত করার জন্য সম্পাদককে উৎসাহিত করে সবরকমের সহযোগিতা করার কথা বলেন। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সম্পাদক শৈলেন দাস।                                                  

রবিবার, ১ অক্টোবর, ২০১৭

ভেঙ্গে যায় বিশ্বাসের ডানা

।। শিবানী ভট্টাচার্য দে।।















অস্ত্রহাতে দেবীর প্রতিমা মন্দিরে মন্দিরে
স্তোত্রে তেজস্বিনী
যুদ্ধরতা অসুরমর্দিনী
জলে ভেসে যায় চারদিন পুজো পরে
রংচটকানো, উদোম, বিক্ষত শরীর।
প্রতীতি এমন-----
আকাশের দিকে তোলা হতাশ নয়ন
কোনো গণধর্ষিতা যুবতীর,
অথবা সুপ্রজা দুঃসহবোঝা বয়স্কা জননীর,
দরিয়ায় ভেসে যাওয়া শরণার্থী কচিমুখটির।
অর্থহীন প্রলাপের বাক্যস্রোত ঠেকে
মন্ত্রের বিন্যাস।
পুরানো বিশ্বাস
বহুদিন উড়ে যেত স্নিগ্ধনীল শরত আকাশে
কোনো এক মহাজননীর বরাভয় হাতের উদ্দেশে।
আজ মনে ভয় ছায়
কোথায় প্রার্থনা যাবে, হায়
শরণীয়া জননীও বড় অশরণা---
ভেঙ্গে যায় বিশ্বাসের ডানা ।