“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১২

মেক্সিকোয় গডজিলা


















ন দিয়ে শোনো আমার সোনামনিঃ 
মেক্সিকো সিটিতে তখন বোমা পড়ছে
কিন্তু সেটা কেউই খেয়াল করছিলো না।
বিষ বয়ে নিয়ে যাওয়া বাতাস 
ছড়িয়ে যাচ্ছিল সব রাস্তায় আর খোলা জানালায়।
তুমি তখন সবে মাত্তর খাবার শেষ করে
টিভিতে কার্টুন দেখছিলে।
পাশের বেডরুমে বই পড়তে পড়তে
হঠাৎ খেয়াল হল এই রে,আমরা মারা যাচ্ছি
গা গুলানো বমি ভাব আর মাথা ঘোরা সত্ত্বেও
নিজেকে টেনে হিঁচড়ে রান্নাঘরে নিয়ে গেলাম
দেখলাম তুমি শুয়ে আছো মেঝেয়
একে অন্যকে জড়িয়ে ধরলাম আমরা।
জানতে চাইলে তুমি কী ঘটছে
বললাম না যে মরণের অনুষ্ঠানে শামিল হতে যাচ্ছি
তা পাল্টে বললাম আমরা বেড়াতে যাচ্ছি।
একসঙ্গে,আরেকটিবার,ভয় পেওনা সোনামণি।
সব থেমে যাবার পর,মরণ আমাদের চোখ বুঁজিয়ে দিতে পারেনি।
আমরা কিএকহপ্তা বা বছর পরে তুমি জানতে চাইলে,
পিঁপড়েমৌমাছি নয়তো ভুল সংখ্যা
কদাকার এই সম্ভাবনার সেদ্ধ ঝোলে?
আমরা মানব সম্প্রদায়,খোকা আমার,প্রায় পাখীই যেন,
সার্বজনিক নায়ক এবং অন্ধিসন্ধি।
 
                            **************

( এক চরম ভবঘুরে কবি ছিলেন চিলির রোবার্তো বোলানো। বেসামাল। উদ্দাম জীবন কাটিয়েছেন। পরে একসময় জীবনে থিতু হন। ওর একটা কবিতা ইংরিজি-স্প্যানিশ থেকে অনুবাদের দুঃসাহস করলাম। জানিনা আপনাদের কেমন লাগবে। খানিকটা ভাবানুবাদ আর বাকিটা গুগল ট্রান্সলেট দিয়ে স্প্যানিশ বোঝার চেষ্টা। ফাঁকিবাজিটা স্বীকার করলাম। আর হ্যাঁ, উপরের ইলাস্ট্রেশনটা আমার। দুতিনটে ফটো এদিক-সেদিক থেকে জুটিয়ে ফটোমাস্তানি করেছি। ছবির কবিতাটা আসল স্প্যানিশে )

রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১২

হেমাঙ্গ বিশ্বাস স্মরণে

                                                 অরূপ বৈশ্য

(বরাক কণ্ঠের জন্য)
হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সৃষ্টি আমাদেরকে একটা উত্তাল সময়কে স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু সেই সময়ের আবেগ কী এখনো আমাদের মনকে নাড়া দেয়? আবেগ কাল-নির্ভর, আবার কাল নিরন্তর প্রবহমান। তাহলে একই আবেগ কী বারবার ফিরে ফিরে আসে? তাই যদি সত্যি হয়, তাহলে কালের আমরা পর্বভাগ করব কী করে, প্রতিটি সময়ের পরিধিকে আমরা আলাদা করে চিনব কী করে? অথচ হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মত সংগঠক-শিল্পী উত্থানোন্মুখ সমাজ-পরিবর্তনকামী শ্রেণির অফুরন্ত গতিশীলতায় সৃষ্ট প্রাণশক্তিকেই ধারণ করেছেন তাঁর সৃষ্টিশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। তাঁর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সূচনা সেই সময়ে যখন ভারতীয় বুর্জোয়া শ্রেণির প্রগতিশীল ভূমিকা নিঃশেষিত হয়ে প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকা প্রাধান্যের জায়গায়, যখন এই শ্রেণিটির দেশীয় গ্রামীণ সামন্তশ্রেণির সাথে গাঁটছাড়া বেঁধে তাদের উপনিবেশিক প্রভুদের সাথে আপস রফা চূড়ান্ত, যখন চূড়ান্ত স্বাধীনতা অর্জনের জন্য চিনে শ্রমিক-কৃষকের নেতৃত্বাধীন নতুন শক্তি উদিত, যখন একের পর এক কৃষক বিদ্রোহে ভারতের মাটিতে পোঁতা লাল-পতাকা আকাশে উড্ডীন।

                 সেই সময়ের সৃষ্ট এবং সেই সময়কে বদলে দেওয়ার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত একজন শিল্পী কালজয়ী হয়ে যাওয়ার নিদর্শন হচ্ছেন আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় হেমাঙ্গ বিশ্বাস। কিন্তু আমাদেরই এই সুরমা-বরাক উপত্যকার সন্তান শহিদ মাধব নাথের স্মৃতিতে গাওয়া হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান ‘আমরা তো ভুলি নাই শহিদ, সেকথা কি ভুলা যায়......” কি সত্যিই আমাদের এখনও আবেগতাড়িত করে? করে না, করার কথা নয় – কারুর কাছে এটা স্মৃতিমেদুরতা – কাররু কাছে বিশেষ করে নব্য প্রজন্মের কাছে যোগসূত্রহীন। সেজন্যই সম্ভবত আমাদের এই সুরমা-বরাক অঞ্চলের একজন মহান সংগ্রামী শিল্পীর জন্মশতবর্ষেও আমরা বেশ নির্লিপ্ত। এঅঞ্চলের বোদ্ধারা তাদের ঘরের এই মহান মানুষকে নিয়েও যে বিশেষ কোন চর্চা করার, তার জীবন ও সৃষ্টির ডকুমেন্টশন করার ব্যপারে কোন উৎসাহ দেখান না, তার রহস্য লুকিয়ে রয়েছে সম্ভবত শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গীর মধ্যে। হেমাঙ্গ বিশ্বাস যে আবেগকে সাধারণীকৃত ও আধুনিক প্রগতিশীল মননে পরিশীলিত করতে পেরেছিলেন তা আজকের এই পরজীবী মনস্কতায় আচ্ছন্ন মধ্যশ্রেণির সাথে যোগসূত্র স্থাপনের আবেগ নয়, এটা এমন এক আবেগ যা জাগ্রত লোকায়ত আবেগকে সাধারণীকৃত করে এবং আধুনিক সমাজ দেখতে আগ্রহী মধ্যবিত্ত মনকেও তার গণ্ডির মধ্যে আকৃষ্ট করে নিতে সক্ষম হয়। তাই এই আবেগ ফিরে ফিরে ভেসে আসে প্রবহমান কালের স্রোতকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে এবং মানুষ এই আবেগ-স্নাত হয় যখন তার মনে জয়ের আকাঙ্খা, পরিবর্তনের আকাঙ্খা, নতুনের আকাঙ্খা সঞ্চারিত হয়। পরাজয়ের গ্লানি ও সামগ্রিক হতাশার বাতাবরণেও কালজয়ী আবেগ মানুষের মন জয় করে নিতে পারে, কিন্তু সে এক ভিন্ন ধরনের আবেগ, এক ভিন্ন শ্রেণির – ভিন্ন পরিস্থিতির আবেগ যেখানে আলস্য - কর্মবিমুখতা – অসন্তুষ্টি আধুনিক বুর্জোয়া মনকে গ্রাস করে নেয়। কিন্তু যে পরিস্থিতিতে মানুষ আত্মসন্তুষ্ট, ন্যায়-অন্যায় ভেদ ভুলে সাফল্য – আয়েস – স্থবিরতাকেই জীবনের লক্ষ্য হিসেবে জ্ঞান করতে শিখে সেই বাস্তব পরিস্থিতিতে কালজয়ী সৃষ্টির আবেগ চোরাস্রোতে বয়ে চলে, মানুষের আবেগে ধরা দেয় না। কালকে আমরা যদি এরকম বাস্তব পরিস্থিতির গুণাবলি দিয়ে ভাগ করি তাহলে কালজয়ী সৃষ্টি আমরা তাকেই বলতে পারি যা সময়ের এক বিশেষ মূহূর্তে নতুন রূপে নতুন বার্তা নিয়ে ফিরে ফিরে আসে।

                 যারা শ্রমিক-শ্রেণির নেতৃত্বাধীন এক নতুন সভ্যতা গড়ার কল্পনা করেন, তারা রাষ্ট্র-উৎপাদন পদ্ধতি-বিনিময় মূল্যকে যেমনি অন্য বিকল্প দিয়ে প্রতিস্থাপিত করার রূপরেখা তৈরি করার কথা ভাবেন, ঠিক তেমনি সভ্যতার অবিভাজ্য অঙ্গ কলা-সংস্কৃতি চর্চার বিকল্প রূপরেখা তৈরির দায়ও তাদের উপর বর্তায়। তাদের কাছে হেমাঙ্গ বিশ্বাস চর্চা ভীষণ জরুরি বিশেষ কর সেই যুগ-সময়ের সন্ধিক্ষণে যখন জয়ের আকাঙ্খা, পরিবর্তনের আকাঙ্খা, নতুনের আকাঙ্খা সঞ্চারিত করার সামাজিক শক্তির আবারও ঘুম থেকে জেগে ওঠার বার্তা আকাশে-বাতাসে ভেসে বেরায়। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মত সংগঠক-শিল্পীর সৃষ্টি আবার ফিরে আসবে, কিন্তু সচেতনভাবে ফিরিয়ে আনতে হবে নতুন রূপে, নতুন উপলব্ধিতে, নতুন সভ্যতার প্রয়োজনে। সেজন্যই হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে চর্চা এতো জরুরি। এই পরিপ্রেক্ষিতে সলিল চৌধুরী-হেমাঙ্গ বিশ্বাস বিতর্ক নিয়ে কিছু কথা বলা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

               হেমাঙ্গ বিশ্বাসের জন্ম শতবর্ষে তারা মিউজিক চ্যানেলে আজ সকালের আমন্ত্রণের অতিথি শিল্পী শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদারের অনুষ্ঠানে শুভেন্দু মাইতী বলেন, হেমাঙ্গ বিশ্বাস যে অহং-বর্জিত একজন বড়মাপের মানুষ তার প্রমাণ মেলে সলিল চৌধুরীর সংস্কৃতি-সংক্রান্ত মতকে মেনে নেওয়ার মধ্য দিয়ে। দুটি ভিন্ন মতের বিতর্কে অন্যের মতের সাথে একমত হয়ে গেলে নিজের মত ত্যাগ করে তার মান্যতা দেওয়ার মধ্যে নিশ্চয়ই নিরহংকারী ব্যক্তিত্বের পরিচয় পাওয়া যায়, কিন্তু হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মতো সাধারণ মানুষের কাছের শিল্পীর এই তথ্য থেকে তাঁর নিরহংকারী ব্যক্তিত্বের পরিচয় পাওয়া খুব জরুরি বিষয় নয়, যা আমাদের কাছে জানা বেশি জরুরি তা হল সেই বিতর্কের মোদ্দা কথা এবং সলিল চৌধুরীর মতকে মেনে নেওয়ার সঠিকতার বিষয়। এই বিতর্কের কোন লিখিত ডকুমেণ্ট পাঠের সুযোগ না হওয়া সত্বেও, বিভিন্ন আলোচনা থেকে এই বিতর্কের সারকথা বিধৃত করা যায়। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মত ছিল এই যে লোকায়ত জীবন থেকে রূপ-বিষয়কে নিয়ে গান রচনা করে লোকায়ত মানুষকে ভবিষ্যত সমাজের জন্য লড়াইয়ে উদ্দীপ্ত করা, অন্যদিকে সলিল চৌধুরীর মত ছিল আধুনিক সমাজ গড়ার লক্ষ্যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আধুনিক বিষয়কে নতুন রচনায় লোকায়েতের সাথে সমন্বিত করতে হবে।

এক সঠিক মত থেকে শুরু করে বিতর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে সলিল চোধুরীর মতকে গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে হেমাঙ্গ বিশ্বাস নতুন সমাজ গড়ার প্রাণশক্তি স্তিমিত হয় আসার সেই সময়ের অন্তর্বস্তুকে মেনে নিয়েছেন। সেজন্যই হেমাঙ্গ বিশ্বাসরা আসামের সমাজ জীবনে অন্তর্নিহিত উগ্রজাতিয়তাবাদী মূল্যবোধ ও উত্থানোন্মুখ উগ্রজাতিয়তাবাদকে যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করতে পারেননি এবং সেই শক্তির কাছে প্রগতিশীল শক্তির পরাজয়কে অসহায়ের মত মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন। এই বাস্তবস্তাকে এবার খানিকটা ব্যাখ্যা করা যাক।

              
               যখন কোন সমাজ আন্দোলিত হয় - যখন সমাজের প্রগতিশীল শ্রেণি-বর্ণ তাদের পুরোনো অবস্থা পরিবর্তনে সচল হয়ে উঠে, তখন পুরোনো-প্রতিক্রিয়াশীল ও নতুন-প্রগতিশীল মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির সংঘাত সমাজের অভ্যন্তরেই চলমান সংগ্রামের রূপে দেখা দেয়। এই সংঘাতে নতুনের বিজয় ঘটবে কিনা বা যদি বিজয় ঘটে তাহলে পরিবর্তিত সমাজের সংস্কৃতি চর্চার রূপ কী হবে বা হওয়া উচিত তা কিন্তু নির্ধারিত হবে সেই সমাজের অভ্যন্তরেই এবং তা বহন করবে সেই গণ-সমাজই।     শিল্পসংস্কৃতি-সংগঠক এবং শিল্পের স্রষ্টাও কিন্তু এই জেগে ওঠা সমাজেরই অঙ্গ। সুতরাং শিল্পীর সৃষ্টি মানুষের অবচেতনে থাকা নতুনের বার্তাকে বহন করবে গণ-সমাজের সচেতন হয়ে ওঠার সংগ্রামী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। এ এক বিচিত্র পথে বহুমুখী আন্তঃক্রিয়া যেখানে বিভিন্ন মত-পথ শুধু নয়, পুরোনোকে ভাঙার রস আস্বাদনে উত্থিত বিভিন্ন শ্রেণি-বর্ণের মূল্যবোধেরও এক অন্ত ও আন্তঃক্রিয়া। সুতরাং প্রগতিশীল শিল্পী যদি আধুনিক বা নতুন অন্তর্বস্তু সংগ্রামের স্থান-কালের সীমার বাইরে থেকে বহন করে এনে লোকায়ত চর্চার সাথে জুড়ে দিতে চান তাহলে তা আপাত আধুনিক মনে হতে পারে, কিন্তু গণ-সমাজ তাদের সংগ্রামের বর্ষাফলক যার দিকে তাক করার কথা তাকে চিনতে ভুল করবে এবং ফলে এই সংগ্রামের মধ্য থেকে সৃষ্ট শিল্প-রচনাকেও তার জীবনের অঙ্গ করে নিতে বিফল হবে।

           আসামের উদাহরণ এব্যাপারে আমাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিতে পারে। আসামে কৃষক অভ্যুত্থানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে চীনের শ্রমিক-কৃষকের লড়াই থেকে, আমেরিকার শ্রমিকদের লড়াই থেকে দিন-বদলের কথা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সংযোজিত করা হল, কিন্তু আসামের এই সংগ্রামী কৃষকদের অবচেতনে থাকা উগ্রজাতিয়তাবাদ বিরোধিতাকে (লোকায়ত স্তরে থাকা উগ্রজাতিয়তাবাদী আবছা রূপের বিরোধিতা) কোন ভাষা দেওয়ার প্রচেষ্টা হল না, আমেরিকার গণসঙ্গীত ‘নিগারদের’ চিনল – কিন্তু এখানে চা-শ্রমিক ঝাড়খণ্ডী-আদিবাসীদের জীবন সংগ্রাম নিয়ে তেমন কোন রচনা হল না এবং ফলে গণ-সমাজকে তাদের সংগ্রামের সমস্ত অন্তর্বস্তুকে জলাঞ্জলি দিয়ে আশ্রয় নিতে হয় উগ্রজাতিয়তাবাদী শিবিরের কাছেই ।

             হেমাঙ্গ বিশ্বাসই তখনকার সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব যিনি সঠিক পথটি চিনতে পেরেছিলেন, কিন্তু এই পথে আরও বহুদূর অগ্রসর হয়ে সঠিক চিন্তাকে সম্প্রসারিত ও সার-সংকলিত করার বিপরীতে তখনকার সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মূল ধারার চিন্তায় প্রভাবিত হয়ে গিয়েছিলেন। সে সময়ের সংগ্রামী উত্তাপ এবং চোখের সামনে থাকা মডেলকে অনুসরণ করার আবহ সম্ভবত বিকল্প চিন্তার পথ রুদ্ধ করে দাঁড়িয়েছিল। এই রুদ্ধদ্বার আমাদের সামনে আজ নেই, অথচ শীতের ভোরে সংগ্রামের উত্তাপ নেওয়ার সূর্য বহুদূরে উঁকিঝুঁকি মারছে, তাই এখনই সময় নতুন করে – নতুন ভাবে দিন-বদলের গান বাঁধার উদ্যোগ নেওয়ার এবং সেই কাজটি সবচে ভাল হতে পারে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কর্মকাণ্ডের চর্চার মধ্য দিয়েই। 


১) হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কিছু গানের সংযোগ-1।
২) হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কিছু গানের সংযোগ-2।

শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১২

প্রেমভিক্ষা




ভালোই  যদি না বাসিতে হায় কখনো  
কেন ধরেছিলে সেদিন হাতে হাত বলো 
ভালবাসা যদি মরীচিকা ছিলো তবে 
কেন সেদিন আগলে দাড়ালে মোর পথ বলো ।।

ঘৃণা ভরে দিলে অন্তরে আজ ভালোবাসি বলে 
আমি যে নই গো তোমার সেই স্বপ্নকন্যে 
প্রীতিমূর্তি রূপে যে নারী এসেছিলো সেদিন 
বাদল মেঘে ভেসেছিল ওই আকাশ নবীন ...

নিথর হয়ে পড়ে রইলো আমার স্বপন 
কেটেছিলো সেদিন মিথ্যা প্রেমঘোর যেমন 
চিরতরে দূরে চলে যেতে সময় এলো চলে 
অশ্রু হয়ে ঝরবো এবার তোমার নয়ন হতে---

দেখব আজ কে প্রিয়জন মুছাবে সে অশ্রু 
মনে পর্বে একদিন ভিখারী সে এসেছিল এক 
তোমার দুয়ারে নিতে প্রেমের ভিক্ষা --
আজ দেখো মিশে আছে সে তোমার চরণ ধুলায় 
নীরব প্রাণ এক --একমুঠো প্রেমভিক্ষার আশায় ।।

                                               ..........অরুণিমা 

বুধবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০১২

কৃষ্ণ পক্ষ

















টানবি আবার
হুজুগ ভরে বৃন্দাবনের অস্তাচলে 
একলা রাখাল 
কৃষ্ণচূড়ার নির্জনতা  রক্ষা করে ...

হিসেব কত গোলমেলিয়ে 
শ্যাওলা জমা একটা বাঁসি 
জটলা করে যোগ বিয়োগে 
স্পর্শকাতর ঠোট পিয়াসী 

আমরা সবাই চশমা চোখে
খুজছি যখন প্রেমের চিঠি 
একলা রাখাল হেঁসে বলে ,
"রাষ্ট্রবাদী পাবলিসিটি "....

ঝুলবে কবে ফাঁসির কাঠে 
ওপারের কোন দ্বন্দ্বপ্রেমী 
আমরা সবাই চা মুড়িতে 
খুশির আমেজ অস্তগামী 

চিঠি একটা গেল পাওয়া 
অনেক করে ঘাটাঘাটি 
রাখাল বলে ,"ওটা দেশের 
peace policy র খসড়াপাতি।"

বারোর হুজুগ এবং আমাদের ‘বারোমাস্যা’

(সৌ) মেঘ অদিতি
 বছর দুই আগে একটা হলিউড ছবি বাজারে চালাতে গিয়ে গোটা দুনিয়া জুড়ে জানিয়ে দেয়া হলো যে দুনিয়াটা আর থাকবে না ডিসেম্বর বারোর পর। এমনিতে যে মায়া সভ্যতার উত্তরসুরী লাল-ভারতীয়দের আমরা মার্কিনিদের দেখা দেখি মানুষ বলে ভাবতে শিখিনি হঠাৎ তাদের পুরোনো ধাঁচের জ্যামিতি আর জ্যোতির্বিদ্যার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা উপচে পড়ল যেন। কেন, না হলিউডে টাকার গাছের কারবার করেন  যারা সেই  সাহেবেরা আমাদের বলেছেন সে কথা। আমাদের বিশ্বাস না হয়ে যায় কোথায়! সাহেবদের কথা বেদের বাক্য। সাহেব না বললে আমরা রবীন্দ্রনাথ- বিবেকানন্দকেও জাতে তুলিনি। তাদের  অমান্যি করলে পাপ হয়। কলেজে অধ্যাপকেরা যখন ছাত্রদের জানিয়েছেন এসব মিথ্যাচার—--ছাত্র নাক কুঁচকে তার বন্ধুদের জানিয়ে দিয়েছে, স্যর বড্ড সেকেলে মানুষ। ‘বিজ্ঞানী’রাও বলছে দুনিয়া ধ্বসে যাবে ! স্যর মানেনই না। আজ সেই মৃত্যু ভয় উবে গেছে। যারা সেই ভয় জাগিয়েছিল তারা সব চুপ মেরে গেছে । এখন তারা বিয়ে আর ভ্রমণের বাজার গরম করেছে নতুন হুজুগে। সেই হুজুগ বারোর হুজুগ। এমন দিনটি বুঝি আর আসবেই না। আপনি যদি জিজ্ঞেস করেন, শেষ বারোর আগেতো একখানা বিশ( ২০) আছে রে বাবা! বাজার জানিয়ে দেবে আপনার কণ্ঠে বিষ। মানুষের ভালো কিছুই দেখেন না। সত্যিই বিষ! এই বারোতো আর আসবে না। কিন্তু আমাদের বারো? বলছি দাঁড়ান। তাকে ছেয়ে ফেলা হয়েছে, ঢেকে ফেলা হয়েছে...একটুতো পশ্চিমী মেঘের বিষ সরাতেই হবে।  

                              তস্মিন্নদ্রোকতিচিদবলাবিপ্রযুক্ত স কামী
                              নীত্বামাসাঙ্কবলয়ম্ভশরিরক্ত প্রকোষ্ঠঃ
                              আষাঢ়স্যপ্রথমদিবসে মেঘমাশিলষ্ট সানু
                             বপ্রক্রীড়া পরিণতগজপ্রেক্ষণীয়ম দদর্শ।।

                মেঘদূতের একেবারে শুরুর দিকের দ্বিতীয় স্তবক এটি। স্ত্রী বিরহে কামনা তাড়িত যক্ষ ঐ পর্বতে মাস কয় কাটিয়ে দিল। আষাঢ়ের প্রথম দিনেই পাহাড়ের চূড়োতে ঝুকে পড়া মেঘকে ও যখন, দেখল মনে হলো যেন প্রেমোন্মত্ত হাতি শূঁড়ে তার প্রেয়সীর গা ধাক্কা দিচ্ছে।
           মোটামোটি অনুবাদটা এমনি। আষাড়-শ্রাবণের কাব্য এটি। স্মরণ করুন এর দুই ভাগের নাম পূর্বমেঘ এবং উত্তর মেঘ। অনেকে তাই বলেন একে ‘বর্ষাকাব্য।’ তার মানে পুরো এক ঋতুর কথা। ঋতুর কথাতে পরিপূর্ণ কালিদাস এবং সংস্কৃতের কাব্য যত। ঋতু কিম্বা প্রকৃতি নইলে যেন অলঙ্করণ পূর্ণ হতো না তখনকার কাব্যকথার।  তাই কালিদাসের একটি পুরো কাব্যের নামই হলো ‘ঋতু সংহার’। কোন কাহিনি নেই। আছে বিরহী পুরুষের চোখে নারী আর প্রকৃতির বিচিত্র সব রূপ বর্ণনা আর আছে অবশ্যই বিরহের কথা। এখানে সবটার পরিচয় দেয়া স্বস্তিকর হবে না, আমাদের আধুনিক রুচিবোধে আটকাতে পারে। কিন্তু এখন যখন এই বারোর হুজুগে মেতেছে বিশ্ব তখনকার ঋতু হেমন্ত বলে আমরা হেমন্তের কথা বলতে গিয়ে লেখা প্রথম স্তবকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারি নির্বিরোধ।
                                  নবপ্রবালোদ্গমসস্যরম্যঃ
                                 প্রফুল্ললোধ্রঃ পরিপক্বশালিঃ
                                বিলীনপদ্মঃ প্রপতত্তুষারো।
                                হেমন্তকালঃ সমুপাগতঃ প্রিয়ে।।

হেমন্ত এসেছে প্রিয়ে। নতুন পাতা দিয়েছে দেখা, শষ্যেরা  উঠেছে  সেজে। লোধফুল ফুটেছে দেখো,শালিধান পেকেছে মাঠে, নিস্প্রভ হয়েছে পদ্ম আর তাতে ঝরছে তুষার।
                কিন্তু ঋতুতো ছয়ের হিসেব। আমাদের কাজ বারোকে নিয়ে।  চান্দ্রপঞ্জিকাতে বারোমাস থাকলেও সে নিয়ে তত মাথাব্যথা ছিল বলে মনে হয় না  তখনকার কবিদের। মেঘদূতের 'আষাঢ়স্যপ্রথমদিবসে'র মতো নজির বেশি মেলে না তেমন। প্রেম আর প্রকৃতিকে মেলাতে পারলেই কাজ চলে যেতো তখন। তাই মেঘদূতের আগে পরে, দূত কাব্যের এক জনপ্রিয় ধারা ছিল, যেমন পবনদূত, পদাঙ্কদূত, হংসদূত, ভ্রমরদূত, বাতদূত, কোকিলদূত ইত্যাদি নামে একগাদা কাব্য থাকলেও বারোমাস্যা জাতীয় কিছু নেই। হয়তো কবিরা রাজসভার কবি ছিলেন বলেই এক একটা মাস যে সময়ের হিসেবে অনেক সে যন্ত্রণা তাদের পোহাতে হয় নি।
         যারা রাজসভার কবি ছিলেন না তারাও মাসটাস নিয়ে তেমন মাথা ঘামাতেন বলে মনে হয় না। হাজার বছর আগে বাংলা যখন ভাষা হিসেবে দাঁড়াচ্ছে তখন কিছু কিছু বাঙালি কবি অবহট্টে কিছু কবিতা লিখেছিলেন।   এই যেমনঃ সো মঝু কন্তা/ দূর দিগন্তা/ পাউস আএ / চেলু দুলায়ে। এর বাংলাটা মোটা মোটি এরকম। প্রিয়তম দূর দেশে/ দিগন্ত পার/ ওড়না ওড়ালো এসে মেঘ বরষার। কিম্বা ধরুনঃ গজ্জই মেহ কি অম্বর সামর/ ফুল্লই ণীপ কি বুল্লই ভামর/ এক্কল জীঅ পরাহিণ অস্মহ/কীলউ পাউস কীলউ বম্মহ।। এর বাংলাটা কাব্য অনুবাদে  মোটামোটি এরকমঃ মেঘে ডাকছে কি?  আকাশ কি হয়েছে  কালো?  কদম ফুটেছে কি?    ভোমরা কি গাইছে ভালো? পরের অধীন আমার এই একলা জীবন,/  নাচুক বর্ষা, নাচুক নাহয় মত্ত মদন।
             ঠিক ওই সময়েই বাংলাতে খনার বচন বেশ জনপ্রিয় হচ্ছিল। ইনি যে কবেকার মহিলা, কেউ ভালো জানেন না। সিংহলের মেয়ে বলে বলেন অনেকে। অনেকে বলেন চব্বিশ পরগনার বারাসতের দেউলিয়া গ্রামে তাঁর জন্ম।  ওড়িয়া ঐতিহ্যে খনার নাম লীলাবতী।  কেউ কেউ অতি উৎসাহে একে কালিদাসের কালের রাজা বিক্রমাদিত্যে নবরত্নদের একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী বরাহের ছেলে মিহিরের বৌ ভাবেন। বিপরীত পক্ষ বলেন সেরকম হলে তাঁর উল্লেখ কালিদাসেও থাকত, আর বাংলা ওড়িষার বাইরেও তাঁর পুরনো প্রভাব পাওয়া যেত। তাই খনার বচন আসলে বাংলার কৃষকদের সন্মিলিত এক আবিষ্ক্রিয়ার নাম। সে যাই হোক,  খনার জনপ্রিয়তা এখনো বাংলার গ্রামে গঞ্জে এতো প্রবল যে সেকালের ভাষাতে তাঁর বচন পাবার উপায় নেই। তাঁর বচনে একেবারেই অকাব্যিক বৈষয়িক দরকারে বারোমাস মেলে। এই যেমনঃ  দাতার নারিকেল, বখিলের বাঁশ/কমে না বাড়ে বারো মাস। কিম্বা ধরুনঃ  বারো মাসে বারো ফল/না খেলে যায় রসাতল।মাসগুলোর উল্লেখ বা ইঙ্গিত পাবেনঃ এই যেমনঃ গাছে গাছে আগুন জ্বলে/বৃষ্টি হবে খনায় বলে। কিম্বাঃ চৈত্রেতে খর খর।/বৈশাখেতে ঝড় পাথর।।/জ্যেষ্ঠেতে তার ফুটে।/তবে জানবে বর্ষা বটে। কিম্বাঃ আষাঢ়ে পনের শ্রাবণে পুরো/ধান লাগাও যত পারো। কিম্বাঃ  তিন শাওনে পান/এক আশ্বিনে ধান। কিম্বা ধরুনঃ  পটল বুনলে ফাগুনে/ফলন বাড়ে দ্বিগুণে। কিম্বাঃ  ফাগুনে আগুন, চৈতে মাটি/বাঁশ বলে শীঘ্র উঠি।       ( সৌজন্যঃ somewhereinblog)
            আমাদের চাষাভূষাদের আধুনিক মধ্যবিত্তরা মুর্খ  ভাবেন। কিন্তু ওমন সুন্দর অলঙ্কার এবং নিখুৎ ছন্দজ্ঞান বহু বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকেও দুর্লভ। এমন নয় যে যারা এই বচনের স্রষ্টা তারা সবাই নিরক্ষর, স্বাক্ষরও ছিলেন অনেকে। কিন্তু এগুলো তৈরি হয়েছে কিন্তু মুখে মুখে। লেখা হয়েছে পরে। মনে হয় না বটতলার পঞ্জিকা চালু হবার আগে।
              এরমক প্রায় প্রতিটি মাসের কথা খনাতে পাবেন।  এ বোধ করি এর জন্যেও যে তাঁর বচন স্পষ্টতই কৃষক জনতার জন্যে আর তাঁরা বাংলার চর্চা করতেন। যারা সংস্কৃতের চর্চা করতেন তাঁরা কৃষি কাজ করতেন না সরাসরি। এই খনা, প্রাকৃতপৈঙ্গল এবং আমাদের বিখ্যাত চর্যাগীতিকোষ  প্রায় একই সময়ের রচনা। এগুলো  বা পরবর্তী কালেও কৃত্তিবাসী রামায়ণ বা পদ্মাবতী কাব্যের মতো কিছু রচনা বাদ দিলে  প্রায় কোনটাই রাজসভার কাব্য নয়। এগুলোতে চিত্রিত চরিত্রদের কেউ কেউ রাজপরিবারের বলে বর্ণিত হলেও কৃষিজীবনের সঙ্গে এদের দূরত্ব খুবই কম। এরা নিতান্তই স্থানীয় দেওয়ান যাদের রাজা বলা হতো তেমন কিছু  হয়ে থাকবেন।  অন্যথা সতীনের ষড়যন্ত্রে খুল্লনা ছাগল চরাতে যাবেন কেন, কিম্বা মৃত স্বামী নিয়ে বেহুলা কলার ভাসানেই ভাসবেন কেন। আর ব্যাধ কালকেতু পরে এতো সহজে গুজরাট নগরের রাজা হবেন  কী করে? পূর্ববঙ্গ গীতিকার রাজাতে আর প্রজাতে এই প্রভেদবিহীনতা অনেক বেশি স্পষ্ট। সম্ভবত তাই, ঐ দূতকাব্যের মতো ‘বারোবাস্যা’ বলে বাংলাতে এক কাব্যধারাই গড়ে উঠেছিল। কখনোবা কবিরা এগুলো বড় আখ্যান কাব্যেই জুড়ে দিতেন। তাতেই কবিকঙ্কনের চণ্ডীর ফুল্ল্রার বারোমাস্যা আমাদের খুব পরিচিত। সতীন ভয় দূর করতে ফুল্লরা ইনিয়ে বিনিয়ে তাঁর বারোমাসের বড় দুঃখের কথা বর্ণনা করছে চণ্ডীর কাছে । হয়েছিল এই, সারা দিনমান ঘুরে শিকার টিকার না পেয়ে কালকেতু ব্যাধ এক সাপকেই পথে পেয়ে ধরে আনে। ফুল্লরাকে ঘরে না পেয়ে সেই সাপকে রেখে  বেরিয়ে যায়। হাটে গিয়ে তাকে পেয়ে  সেই সাপের কথা জানায়। ফেরার পথে এবাড়ি ওবাড়ি থেকে খুদ লবন কিছু ধার করে নিয়ে যেতে বলে। সেই সাপ ততক্ষণে ষোড়শি সুন্দরী সেজে বসে আছে। শুধুই কি তাই ! বিশ্বকর্মাকে ডেকে এনে সেই সাজের ষোল কলা পুরো করে রাখা হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই বাড়ি ফিরে এই মেয়েকে দেখে ফুল্লরার মাথাতে আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। খিদে তৃষ্ণা সব ছুটে পালায়।  কে সে মেয়ে,  কোত্থেকে এসছে ইত্যা্দি হাজারো প্রশ্ন আর বাড়ি ফিরে যাবার অনুরোধে জেরাবার করে। সে চাপে  হার না মেনে মেয়ে বলে কিনা’ মোরে এতো জিজ্ঞাসায় তোর কিবা কাজ।/ থাকিব দু’জনে যদি না বাসহ লাজ।”। তখন  ওকে ভয় দেখাতে  ফুল্লরা ‘বারোমাস্যার’ ফন্দি ধরেঃ
                            পাশের বসিয়া রামা কহে দুঃখবানী।
                            ভাঙ্গা কুড়্যা ঘরখানি পত্রের ছাওনী।।
                            ভেরেণ্ডার খাম তার আছে মধ্য ঘরে।
                            প্রথম বৈশাখ মাসে নিত্য ভাঙ্গে ঝড়ে।।
                           অনল সমান পোড়ে খরতর রবির কিরণ।
                            শিরে দিতে নাহি আঁটে খুঞার বসন।
                            বৈশাখ হৈল আগো মোরে বড় বিষ।
                            মাংস নাহী খায় সর্বলোকে নিরামিষ।।
                           পাপিষ্ঠ জ্যৈষ্ঠ মাস প্রচণ্ড তপন।
                           খরতর পোড়ে অঙ্গ রবির কিরণ।।
                           পসরা এড়িয়া জল খাত্যে যাত্যে নারি।
                           দেখিতে দেখিতে চিলে লয় আধা সারি।।
                           পাপিষ্ঠ জ্যৈষ্ঠ মাস পাপিষ্ঠ জ্যৈষ্ঠ মাস।
                             বেঙচের ফল খায়্যা করি উপবাস।
এমনি করে করে ফুল্লরা যখন এসে চৈত্রে পৌঁছোয় শুনে মনে হবে গোটা বছর সে না খেয়েই থাকে। শুধু কি তাই?
                           সহজে শীতল ঋতু ফাগুন যে মাসে।
                          পোড়ায়ে রমণিগণ বসন্ত বাতাসে।।
                          মধুমাসে মলয় মারুত বহে মন্দ।
                          মালতীর মধুকর দিয়ে মকরন্দ।।
                          বনিতা-পুরুষ যত পীড়য়ে মদনে।
                           ফুল্লরার অঙ্গ পুড়ে উদর দহনে।।
                           দারুণ দৈব দোষে গো দারুণ দৈব দোষে।।
                           একত্র শয়নে স্বামী যেন ষোল ক্রোশে...

             এর পর অন্তত ফুল্লরা আশা করতেই পারত বেহায়া মেয়ে তার বাড়ি ছেড়ে উঠে চলে যাবে। বলে কিনা, “আজি হইতে মোর ধনে আছে তোর অংশ।” বেচারি ফুল্লরা আর করে কী? চোখের জলে কাজল গলিয়ে মুখ কালো করতে করতে হাটে গেল স্বামীকে ধরে একটা বোঝাপড়া করে নিতে।   সেই বোঝাপড়ার পরিণাম কী হয়েছিল আপনারা জানেন, কালকেতু রাজা হয়েছিল, আর ফুল্লরা রাণি।
            তেমনি একখানা কাব্য আছে ‘দেওয়ানা মদিনা’ । পূর্ববঙ্গগীতিকাতে সংকলিত হয়েছিল। দীনেশ চন্দ্র সেনের মতে এই গীতিকাগুলোই আসলে বাংলা সাহিত্যের প্রধান স্রোত। এগুলোতে ধর্ম কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই নয়। দেব মহীমাতে ভাগ্যের ফের পাল্টায় না চরিত্রগুলোর ।  ভাতৃপ্রেমের টানে আলালের ভাই  দুলাল যখন ছেলে সুরুজ  সহ স্ত্রী মদিনাকে ফেলে রেখে যায় বৌ একদিন কেঁদে কেঁদে স্মৃতিচারণ করেঃ
                                    লক্ষী না আগন মাস বাওয়ার ধান মারি।
                                    খসম মোর আনে ধান আমি ধান লাড়ি।।
                                    দুইজনে বইসা শেষে ধানে দেই উনা।
                                    টাইল ভইরা রাখি ধান করি বেচাকিনা।।
                                    হায়রে পরানের খসম এমন করিয়া।
                                  কোন পরানে রইলা তুমি আমারে ছাড়িয়া।।
            খ্যাতনামা কাব্যগুলো যখন গতানুগতিকতার অনুসরণ করে বৈশাখ মাসে বারোমাস্যার শুরু করত, ‘দেওয়ানা মদীনা’র কবি সেখানে অনেক বেশি বাস্তবোচিত বলে দীনেশ সেন প্রশংসা করেছিলেন। অগ্রহায়ণে নবান্ন। সুতরাং বিরহিনীর সেই দিনগুলোর কথাই আগে মনে পড়েছে।
        এখন অঘ্রান মাস। বাংলা সন মাসের কথা আমরা প্রায় ভুলতেই বসেছি। অথচ যদি তা না করতাম তবে বর্ষোৎযাপন  করতে গিয়ে আমাদের নিজের গোলাভরা  এই ‘বারোমাস্যা’ গীতের সোনার ধান তথা পরম্পরার থেকে মণিরত্ন তুলে আনবার কথা আমাদের মনে থাকত।বারো বারো বারোর ( ১২-১২-১২) বাজারের তৈরি হুজুগে মাততাম না আমরা।  সেগুলোকে ভুলে থাকা সত্যি আমাদের কঠিন হতো।  হয়তো, আমরা নিজেরাই সেগুলোর একালের সংস্করণে মন দিতাম। শুধু কি বাংলাতে? অভিভক্ত বাংলাদেশের অন্যান্য ভাষাগুষ্ঠী যেমন চাকমা, হাজং, ত্রিপুরি, রাজবংশীদের মধ্যেও এই পরম্পরা সমানে জনপ্রিয় ছিল। খুঁজতে গেলে হয়তো দেখা যাবে ওই সব কোন জনগোষ্ঠী থেকেই এই বারোমাস্যার এই রীতি বাংলাগানে সাহিত্যে এসে ঢুকেছিল। এই যেমন একটি হাজং গানঃ
                          সাধুরে, পৌষ মাসনি সাধুরে ময় পুজি অধিকারী।
                          ভাতার ভুকতি করে যারা ভাগ্যবতী নারী।।
                          ভাতার ধন, ভাতার মন, ভাতার সকল সার।
                          ভাতার বিনে নাইরে গতি এ ভব সংসার।।
                          সাধুরে সিয়ুমাস ফলে সাধুরে মোলা ইয়ুমাস ফলে।
                           কান্দে গাবুর কইন্যা হাত দে কপালে।।
                            সাধুরে- পৌষ মাসেগো সাধু পুজি অধিকারী।
                          পতিভক্তি করে যারা ভাগ্যবতী নারী।।
                           পতিধন, পতিধন, পতি সকল সার ।
                            পতি বিনে নাইরে গতি এ ভব সংসারে।। (সৌজন্যঃ shapludu)
           শুনে কি মনে হয় যে এ কোনো একক বিরহিণী সতীর কান্না! মনেকি হয় না,  কোনো এক দূর অতীতের দিকে ক্রমেই পশ্চাদধাবমান আমাদের ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি , তার হয়তো নাম ‘বাংলা’, আমাদেরই মতো বিশ্বাসঘাতক উত্তরপুরুষদের ডেকে ডেকে আকুতি করছে, ফিরে দাঁড়াতে। রবীন্দ্রগীতে যেমন ছিল ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে, আয় রে চলে,   আ য় আ য় আয় ।/ডালা যে তার ভরেছে আজ পাকা ফসলে,   মরি   হায়   হায়   হায়…কোন সে নাটকে জুড়েছিলেন  গানটা মনে করুন। রক্তকরবী।  আর আমরা শুনেও না শোনার ভান করে কোন এক হঠাৎ নবাব আলালের জালের  জড়াচ্ছি এর নাম দিয়েছি ‘প্রগতি’ , নাম দিয়েছি ‘আধুনিকতাবাদ’।







মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১২

মা























 ত সুন্দর এত অপরূপ 
এত নির্মল ,বিশাল তোমার অরূপ রূপ ,
নবজীবনে নব দূর্গা তুমি --
হে নারী ,তোমার স্বরূপ কে  চেনো  ,
তুমি জাগো !!

হে প্রলয়ঙ্করী ,হে মমতা সুন্দরী 
ছড়াক বিশ্বে তোমার মধুর অমৃত বাণী ;
এসো  হে দূর্গা ,এসো  হে কালী 
হে লক্ষ্মীরূপা ,সুষমা মুরতি --
হে নারী তুমি জাগো !!


জাগো হে মাতৃস্বরুপা                                                            
জাগো হে নবনন্দনা ,
বন্দনে ভরুক তোমার চিত্ত 
অনুভব করুক এ বিশ্ব তোমার স্বত্ব 
হে নারী তোমার স্বরূপ কে চেনো ,
জাগো,তুমি জাগো !!

এসো হে এবার, জাগো দুর্গারূপে 
বিশ্ব কর ভয়শূন্য 
উচ্চতর পথে চলো ,মুক্ত করো 
শিকলে জড়ানো তোমার স্বত্ব 
জাগো নারী, জাগো তুমি জাগো--
মুক্ত কর, ছিন্ন কর--
অসহায়তা পরাধীনতার শিকল পরা 'তোমাকে --
পরো এবার মুক্তির বসন, চল এগিয়ে চল--
জাগো হে নারী, নিজেকে চেনো--
হাতে যে সময় শেষ হয়ে এলো !!!! 

                                               ........ অরুণিমা 
আত্মহত্যার দায়ে হত্যার রায় দিলেন মহামান্য আদালত...
প্রহসনের ঢেউ নার্ভাস হয়ে ফিরে গেল ভাটায়...
সমাজবিদেরা বললেন' উচিত শিক্ষা হয়েছে'
ধর্মের জেহাদ নেস্তনাবুদ হল ইস্তেমালে ,ইন্তেকালে...
প্রান হানির জবাব বদলাল একবিংশ এক্তিয়ার..
 

গোলাপ ও অন্যান্য চরিত্র

(C) Image: ছবি -Fabiana Cunha





















নিতান্তই প্রেম কিংবা অন্য কোনো সুপ্ত রোগ
হটাত খামচে দিল বলে ...
বৃদ্ধ হতে বাধ সাধলো বহুকাল পুরনো গোলাপ
ভোর রাতে একদল আত্মঘাতী কবিতা 
ফিসফিসে ঘোষণা করলো
 হিরোসিমা ....

তখন  
আমার সমস্ত পাজর নিংড়ে 
একফোটা বৃষ্টির চুমু 
দধীচির ঈর্ষা জাগালো ..

অবারিত সুশ্রী তোমার অবয়বে .. 
আমার কুচকে যাওয়া চামড়ায় ছোঁয়া 
দখিনের জানলা জড়ানো বটগাছের কোনো এক 
বিক্ষিপ্ত আগাছার সামিল ..

শোনা গেল কবিতার মৌনতা 
মাপা যায় ডেসিবেল এ ..
আর আমার পাজর নিংড়ানো 
ফোটা কয়  বৃষ্টির চুমু 
মিশে গেল দধীচির দেহে।

ডাক  দিয়ে বিদ্যুত শুধু 
রাত রাত রাতের আলোচনা 

পাজরটা ডাক দেয় আমায় 
 গোলাপের হোক হিরোসিমা।