“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

শনিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১৯

গল্পের যাত্রী

।। অভীককুমার দে।।


(C)Image:ছবি










ফুটপাতে ঘুমাতে এসে দেখলাম, আমি
রাতের কোলে মাথা রাখতেই শহর কেমন মায়াবী !

দুপাশেই পাথর, জেগে আছে কুকুর,
সংস্কৃতির জামা খুলে রেখেছে নির্জন রাস্তা
মাঝে জাতীয় সড়কে আমদানি করা শীত
আমি শরীর ছুঁয়ে মানুষ খুঁজি একা।

ঘুমের নৌকায় গল্পের যাত্রী
স্বপ্ন দেখি, আসলে কেউ ভিটেহারা নয়,
হারিয়ে যাচ্ছে মানুষ।

জলোচ্ছ্বাস

।। অভীককুমার দে।।


(C)Imageঃছবি










নদীটির কাছে গেলে বুঝতে পারি
মাটি কামড়ে পড়ে থাকাই সার,
পাতা ডুবিয়ে পাড়ের গাছ...
কেঁপে ওঠে নদী, বেঁকে যায়।

নদীর নিজস্ব গতি নেই !
মাটির জরিপ,
বিবেচনার পথ উঁচু থেকে নিচু...
একদিকে উজান, প্রকৃত সুখ,
অন্যদিকে সমাবেশের জল, হৈচৈ,
পাশে পরাধীনতার দেয়াল জেগে
মাঝে জন্মের ধারাবাহিক-- মৃত্যু।

নদীর বাঁকা শরীর দেখে ফুঁসে ওঠে ঋতু
সুতরাং অনিবার্য জলোচ্ছ্বাস।

জীবন ও জয়

।। অভীককুমার দে।।


(C)Image:ছবি


জয়, জন্মের পর প্রতিটি জন্মদিন অনেকটা দেশরাই পাড়ার গাছতলায় বুড়ো দোকানদারের চায়ের মতো। পুরনো কৌটার চিনি, দুধ, চা পাতা মিশে পুরনো কেটলিতেই সেদ্ধ হয়, অথচ হুঁকো টানতে আসে লোক।

এক পেয়ালা দিনটি মনে করিয়ে দেবে সময় পুড়ে সবুজ পথে রঙিন হয় মন এবং বেলা হেঁটে যায় সান্ধ্য প্রদীপের দিকে।

প্রতিটি রাত এলে বোঝা যায়, প্রদীপ বলে কিছু নেই। জড়িয়ে থাকা অন্ধকার ঠেলতে ঠেকাতে অস্তিত্বহীন জীবন, পড়ে থাকে আপেক্ষিক আলোর স্মৃতি।

স্মৃতিগুলো কেটলির বিক্রি না হওয়া ঠান্ডা চায়ের মতো। দোকানের বাইরে ঢেলে ফেলে দেওয়া চা, স্তূপের ভেতর পথ খুঁজে নেয় প্রতিদিন ! তবুও পরদিন জ্বলে ওঠে চুলা।

আমি মনে করি, জয়ের কোনও জন্মদিন পালন করা ঠিক নয়। জন্ম যদি কোনও অশরীর থেকে শরীর, যদি ছোট থেকে বড় আবার বড় থেকে ছোট'র দিকে এবং পুনরায় অশরীরের পথে হাঁটে, তবে জয় কোনও জয় নয়।

জয় আমার নিরিবিলি ভেতরের তুফান। ঝিরঝির বৃষ্টি হলেই মনে হয়, এই বুঝি দেখা হবার কথা। সামনে বহুদূর, সবুজের দিকে পথ ঘুরে যাবে। দ্বিচক্র চালে কাকতালীয় বৃষ্টি ধুয়ে নিয়ে যায় পথের ধুলো।

সঙ্গম

।। অভীককুমার দে।।

ছয় পাড় থেকে চেয়ে আছে চোখ,
দেও মনু একাকার হলো বলে
ধারাজলে আকাশের আলো
সাঁতার কাটে, রঙিন মেঘ অথবা দূরদেশী পাখি
ছায়া রেখে যায় বুকে।

দুদিকের দুটি নদী এক হয়ে একদিকে
ভেতর জলে অন্য কোনও ধারাপাত
বয়ে যায় নদী
বাঁকে বাঁকে জীবনের খোঁজ।

মায়ের সোনা বাছুর

।। অভীককুমার দে।।

গরু পালন করছি ঘরে
ঘর নিজের করে নিয়েছে গরু।

আমার ঘরের গাভী মা হয়েছে, দেখি
দামড়ারাও মায়ের মতই চেয়ে...
যদিও সব মা গরু নয়।
সব গরু মা হতে পারে না,
দুধ খাওয়াতে পারে না বলে
কিছু গরু হালের কাছে বন্ধক রাখে ঘাড়।

গাভী দুধ দেয়
সোনা ফলে
সোনা বাছুর মায়ের, অথচ
দামড়া মনে করে দুধের ভেতর সোনা;
অতঃপর খুঁড়তে থাকে মাটি।

রবিবার, ৩ নভেম্বর, ২০১৯

ভোলে বাবা কি চেলা


ভোলে বাবা কি চেলা হমলোগ
শিবজী মহারাজ কি জয়
গর্বসে কহো হাম হিন্দু হ্যায় সব
ঝান্ডা উঁচা লেহরায়।
জয় বলো ভোলে নাথ কি জয়
কি বলো ভৃঙ্গী ভাইয়া জয়
কি বলো নন্দী ভাইয়া কি জয়।।

যানজটেতে ক্লান্ত শহর
ছড়িয়ে ছিটিয়ে কুষ্ট দাগ
মিছিল চলুক সদর্পেতে
আনন্দ হোক একশ ভাগ ।
একটি মূর্তি তিনটে ট্রাক
সবার আগে দশটি ঢাক
একটিতে মা যেমন তেমন
নেই যে উলু নেইকো শাঁখ।
মাঝের ট্রাকে জেনারেটর
শেষের ট্রাকেই আসল খেল্।
ডিজের আওয়াজ ঘূর্ণি আলোয়
একটু গো মা  হুইস্কি গেল্ ।
দাঁড়িয়ে পড়ুক গাড়ির সারি
যতই উঠুক বিরক্তি রাগ
মিছিল চলুক বীরদর্পে
আনন্দ হোক একশ ভাগ ।

এমব্যুলেন্সটা ভীষণ বোকা
ওটার এত তাড়া কিসের ?
দেখছে বাপু আসছে মিছিল
তবুও আবার ঘ্যানোর ঘ্যার।
একটুখানি সবুর করো
মিছিল তো আর থামছে না,
কষ্টেতে প্রাণ ওষ্ঠে এলেও
পেশেন্ট তো আর মরছে না ।
কি বলছিস আওয়াজ কম ?
বুকের ব্যেমো ? এইতো দম !
আনন্দে যে খরচ অনেক
জোরসে বল্ , ভোলে ব্যোম।
চলছে মিছিল গায়ের জোরে
রাস্তা জুড়ে সদর্পেতে
গিন্নী বাবু সামলে দাঁড়াও
জ্বলবে কাপড় পটকাতে ।
এই যে শালা একটু দাঁড়া
রাস্তা কি তোর বাপের বে
মিছলটাই যে আগে যাবে
সাধ্যি থাকে বাগরা দে।
মিছিল আমার মিছিল তোমার
মিছিল ঘিরেই ব্যস্ততা
মিছিল হচ্ছে স্ট্যাটাস সিম্বল
অর্থবলের সুস্থতা।
নাচরে বাবু নাচ্ সুশীলা
নাচছে বৌদি আর মাসীমা
দুপাশ জুড়ে হাভাগা সব
গিলছে দেহ, তুলছে দোলা ।
গায়ে গায়ে রগরবাজী
নেশার সাথে অনুরাগ
মিছিল চলুক বীরদর্পে
আনন্দ হোক একশ ভাগ ।
জয় বলো ভোলে নাথ কি জয়
কি বলো ভৃঙ্গী ভাইয়া জয়
কি বলো নন্দী ভাইয়া কি জয়।।

###

বন্ধ কর বন্ধ কর, বন্ধ কর সব।
ধর্ম নিয়ে আদিখ্যেতা মিথ্যে প্রহসন,
আর কত ? ছেলেখেলা ?
বিকৃতি আর বেলাল্লাপনা ?
বন্ধ কর, আর কত ?
টাকার জোরে দাদাগিরি --
বিশাল বিশাল বাজেট নিয়ে
পুজোর ছলে পুতুল খেলা ?
আসল পুজোয় যৎসামান্য
ডেকোরেশন -- আলোর মেলা
আর কত ?
কোথায় লিখা শাস্ত্রমতে
এমনতর মিছিল  ?
বিকট শব্দে হিন্দি গান
আলোর সাথে অঙ্গভঙ্গি
মদের স্রোতে কৃষ্টি ভাষাণ ?
আর কত ?
পথঘাট সব বন্ধ করে
সহস্রকে বিপাক ঠেলে
কিসের জৌলুস ?
এমব্যুলেন্স যে দাঁড়িয়ে যায় !
একটা যদি মৃত্যু হয়, একটা যদি মানুষ  ?
কে নেবে তার দায়ভারটি ?
প্রশাসন ? ডাক্তার  ?
নাকি উন্মাদের‌ই দল ?
উত্তরটা কে দেবে তার ?
একটা কিছু বল্ ।
আর কত ? বন্ধ হোক।
বন্ধ হোক এই বিকৃতি সব,
আওয়াজ তোল।
লজ্জা হয়, নুইয়ে আসে মাথা,
যখন কেউ আঙ্গুল তুলে বলে,
এই তাহলে, প্রাচীনতম ধর্ম ?
এই তাহলে ? লজ্জা হয়।

এ লজ্জা আমার একার নয় ।
আমায় যারা ঘিরে আছেন, গোটা সম্প্রদায় ।
এই লজ্জা সনাতনী গোটা ধর্মটার
যত পূর্বপুরুষ আর বুদ্ধিজীবী জন
এই লজ্জা ওদের‌ও।
আমার ,আপনার, আমাদের সবার।
তাই বন্ধ হোক মিছিলবাজি-- অবিলম্বে,
বন্ধ হোক অনাসৃষ্টি, অন্যায় অনাচার।

শুক্রবার, ১ নভেম্বর, ২০১৯

যেহেতু আপনি পর্দার আড়ালে

।। অভীককুমার দে।।

সবার যেমন, আপনারও আছে দুটি চোখ।
চোখে কালো চশমা !
যাবতীয় ব্যক্তিসুখ, নিজের মতোই
আত্মকেন্দ্রিক হতে পেরেছেন নির্দ্বিধায়;
অথচ কেউ বন্ধক দিচ্ছে জীবন !

যদিও জীবন মরণ কিছুই বোঝে না চশমা
অনিয়মের ছবিও ঢেলে দেয় চোখে,
যেহেতু আপনি পর্দার আড়ালে
না দেখার ভান করা শিখে নিয়েছেন সহজেই।

কোথাও এক পশলা বৃষ্টির ঝমঝম, তবু
ভেতর জ্বলছে কেন ?
পোড়া ছাই ধুয়ে একটি নদী দুভাগ হচ্ছে
ভাসিয়ে নেবে মানবতার মরা লাশ।

হয়তো দুচোখ ঝাপসা এখন,
নিস্প্রভ আলোর কাছে মাথা নত হলে
মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে অন্ধকার,
সবার যেমন, আপনারও আছে দুটি চোখ, দেখবেন--
অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে আলো।

সময় পেলে

।। অভীককুমার দে।।

একবার জিজ্ঞেস করবেন মহোদয়
কেমন আছি
কেমন আছে মানুষ
মানুষের জন্য...

জানি, আপনারা ব্যস্ত
ভীষণ ব্যস্ত করে রেখেছি আপনাদের
পরিযায়ীদের ভিড় ঠেলে আকাশ খোঁজেন
দুমুঠো ভাত মুখে তুলে দেবেন বলে

যদিও আপনারা বেরিয়ে যেতে পারেন আকাশ ফুঁড়ে
শূন্যতায় ভরে ওঠে আমাদের আকাশ।

এমন আহ্নিক গতির মাঝেই আমাদের চোখের জল
পঞ্চবার্ষিকী জমির আলে,
কান্নায় ভেঙে পড়ি,
শিশিরের মতোই গোছানো ভাষণ শুনি নীরবে।

সময় পেলে একবার দেখে নেবেন চোখ
মানুষের জন্য।

কেমন আছে মানুষ ?