“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

সোমবার, ২৬ মার্চ, ২০১২

আমার নীল উচ্চারণ


সাত ভাইয়ের চম্পা কোনদিন ফুল হতে পারেনি। আজন্ম শাপগ্রস্থ ফুলেদের দেখে অভিসম্পাত দিয়ে উজাড় করলো পৃথিবীর সব সুন্দর সৃষ্টিকে। কালো প্রজাপতিরা ছিল সাক্ষী। আমার আকাশেও তুমি এমনটাই। চম্পা ফুলের মতো আমার ভালোবাসার জগতে আনাগোনা তোমার।
অপূর্ব শরীরী গন্ধ ফরাসী পারফিউমকেও লজ্জা দেয়। আমি চোখ পেতে দেখি সাদা বোতলে ফরাসী তরলে দ্রবীভূত জীন মাথা ঠুকরে কাঁদছে।
যেমনটা মরে নদীর মিঠে পানি প্রতিদিন সমুদ্রের নোনা জলের গর্তে। সমুদ্রের কাছে দাড়িয়ে যে হুঙ্কার তুমি শোন তা সেই মিঠে জলের ভাষা আর নিজের শরীরকে ছাড়িয়ে নেয়ার গর্জন। মিল খায়না।
নোনতা শরীরের সাথে মিষ্টি ঘামের সুবাস।
জলের বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায় এক অনু অক্সিজেন আর দুই অনু হাইড্রোজেন। কিন্তু মিঠে আর নোনা ঘামের সমীকরণ কি?
প্রমের সমীকরণ কি? আমার ভালোবাসার সমীকরণ কি? মৃত্যুর সমীকরণ কি?
তুমি যদি জিজ্ঞেস করো কেন তোমায় ভালোবাসি আমি বলতে পারব না কোন কারণ।
তবে আমার ঘামের গন্ধ চিনে তুমি বলে দিতে পারবে আমার প্রেমের কথা।
প্রেমের রসায়নাগারে চম্পা ফুলের কাটাছেঁড়া করার কারণে এই সুযোগ তুমি পেলেও পেতে পারো। আমার আফটার শেভ লাগানো গালে একবার চুমু খেয়ে দেখো, লাভ তোমারই হবে। সাক্ষী করলেও করতে পারো আমার প্রিয় আফটার শেভকে। তোমার গন্ধ চেনে। তুমিও চেন তাঁকে আমার থেকে বেশী।

বেঠোফেনের সিম্ফনি আর আমার ঘামের গন্ধের কোন রাসায়নিক বিক্রিয়া সম্ভব নয়। স্বরলিপি তোমার যেমন জানা নেই সেই সঙ্গীতের, তেমনি আমার ঘামবিন্দুর সাথেও তোমার প্রেমের কোন কেমিস্ট্রি মিলবে না পৃথিবীর কোন রসায়নাগারে। তবে তোমার মনের অন্দরমহলে এই প্রেমের মূর্ছনা অবিরত চলছে। তুমি অভিশপ্ত হয়েই থেকে যেও। প্রেম থেকে যাক আমার কাছেই আফটার শেভ হয়ে বা কোন ফরাসী পারফিউম হয়ে বোতলবন্দী।

তোমার সুখ এতেই। আমার সুখ তোমার পাশে পাশে ঘুরে অথবা অভিশপ্ত চম্পা ফুলেদের দিকে তাকিয়ে।
আকাশবাতি হয়ে স্বরলিপিহীন সঙ্গীতের মূর্ছনা শেষে সমুদ্র সিম্ফনিতে ডুব দিয়ে তোমায় খুঁজব। তুমি শুধু দেখবে তাকিয়ে, আমি নীল রক্ত হয়ে অবগাহন করবো তোমার শরীর। বেঁচে থাক তোমার স্বপ্নসুখ, অসম্ভব সুন্দর কোন রাতপাখি হয়ে।
স্বাধীনতার সূর্য তোমার ভালোবাসার ঘরে উঁকি মেরেছে। দেখোতো, হাঁসফাঁস করছে কিনা, আজ সকালের আলো তোমার দুই বুকের সন্ধিতে! তোমার ঘরে তো তুমিই শ্বাস নিতে পারোনা।

হায়রে স্বাধীনতা। অবশ অলস একটা দিনযাপন, অন্যদিনের চেয়েও বেশী সতর্ক। চুন থেকে পান খসলেই টান পড়বে চুলের মুঠিতে। আমি চেয়েছিলাম তোমার বিনুনীতে গোঁজা শেষ রক্তকরবীর পাপড়ি। দাওনি, এখন নিজেই কুটিকুটি করে ছিড়ে ফেল পরাধীনতাকে উপহার দেবে বলে। এখন বোঝ ভালোবাসা কারে কয় সখী, যাতনা কাহারে কয়...।
তবে আমি বলি শুধু ভালবাসাবাসি, সে শুধুই যাতনাময় নয়তো।

আমার নীল উচ্চারন। এসো খেতে বসি এবার, পান্তার সাথে শুকনো লঙ্কা আর আম কুচি চটকে দাও আমায়। ঠাণ্ডা করি কলিজা।

এসো শেষ বিকেলের পড়ন্ত স্বাধীনতার সূর্যের সাথে মিতালি করে রাতের আকাশ দেখি। আমার চম্পা ফুলের ভালবাসায় তোমার দীর্ঘশ্বাস, ভালো থেকো।

শনিবার, ২৪ মার্চ, ২০১২

মেন ফেইস স্টিঙ্ক বাগ (Man face Stink Bug)




           ঘটনাটা ২০০৩-এর। তারিখ ১৫ই সেপ্টেম্বর। মানুষের মুখাবয়ব পিঠে থাকা অদ্ভুত দর্শন এক পোকার দেখা পাওয়া গেছিলো শিলচরের অদূরবর্তী পয়লাপুল নামক এক মফঃস্বল গঞ্জ শহরে। সুপরিচিত লেখক এবং সাহিত্যিক গনেশ দে মহাশয়ের বাড়িতে। সন্ধ্যার পর অন্ধকারে গায়ে এসে বসেছিল পোকাটা। হতচকিত হয়ে গা থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করেও কিচ্ছু লাভ হচ্ছিলো না। পরে বিজলি বাতির নীচে এসে আবিষ্কার হল অদ্ভুত দর্শন এই পোকাটি। লম্বায় ২.৮ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থে ১.৬ সেন্টিমিটারের এই পোকাটি অনেকটা গান্ধিপোকার মত হলেও তার কমলা রঙের পৃষ্ট দেশে কালো রঙ দিয়ে আঁকা রয়েছে অবিকল টুপি পরা এক মানুষের মুখাবয়ব। কৌতুহলী অনেক মানুষ এটা দেখার পর মন্তব্য করেছেন, এ ধরনের পোকা এ অঞ্চলে এর আগে আর দেখেন নি। ঘটনা চক্রে তার পরের দিন এক শিক্ষামূলক ভ্রমণে পয়লাপুলের পাশের অঞ্চল পরিদর্শনে গিয়েছিলাম কিছু ছাত্র নিয়ে। সঙ্গত কারণেই পোকার কেচ্ছাটা আমাদের কানে এসে পৌঁছে গেছিলো। ফেরার পথে পোকাটাকে সঙ্গে নিয়ে এলাম শিলচরে। এর পরেও দু-তিন দিন জীবিত ছিল পোকাটা। পরে মারা গেল। এর খ্যাদ্যাভ্যাস কি? কোন গাছের রস খায় কিছুই জানা ছিল না। তাই বাঁচানো গেল না বেচারাকে।
         ব্রিটিশ মিউজিয়াম অব নেচারেল হিসট্রি-র ওয়েব সাইট থেকে পোকাটাকে সনাক্ত করা হয়েছিলো। বৈজ্ঞানিক নাম , Catacanthus incarnates (Drury), ইংরাজি নাম, মেন ফেইস স্টিঙ্ক বাগ (Man face Stink Bug) । সন্ধিপদী জাতের এই প্রাণীটি হেমিপ্টেরা (Hemiptera) বর্গের অন্তর্গত। সাধারণতঃ মালয়েশিয়ার , পেরেখ, ট্যাপা হিলস (Perek, Tapah Hills)–এ এদের বাস। মুম্বাই থেকে প্রকাশিত বন্যপ্রাণী বিষয়ক বিখ্যাত ম্যাগাজিন, Sanctuary Asia-র ভলিউম সংখ্যা- XXV(4) আগস্ট, ২০০৫-এ এঁর বিবরণ সম্পূর্ণ প্রকাশিত হয়েছিলো।
          উত্তর পূর্বাঞ্চল এমনিতেই জৈববৈচিত্রে ভরপুর। জৈববৈচিত্রে নিয়ে যারা নাড়াচাড়া করছেন, তাঁদের কাছে খবরটা নিশ্চয়ই খানিকটা হলেও ভাববার খোরাক জোগাবে। খবরটা সাবেক পুরনো হলেও 'পুঞ্জমেঘে'র পাঠক কুলের কাছে আনকোরা নতুন। তাই তুলে ধরলাম। আগ্রহোদ্দীপক হবে এই আশায়...।

রবিবার, ১৮ মার্চ, ২০১২

সাপ্তাহিক ক্যুইজ - ঘোষণা

              সুশান্তদাকে ধন্যবাদ। ওঁর উৎসাহেই আমি এই নতুন সেকশনটা শুরু করছি। আজ থেকে প্রত্যেক রোববারে একটা সাপ্তাহিক ক্যুইজ আপলোড করা হবে। উত্তর দেওয়া যাবে সোমবার থেকে শনিবার পর্যন্ত। আর পরবর্তী রবিবারে সঠিক উত্তর এবং উত্তরদাতাদের নাম এখানে প্রকাশ করা হবে।
প্রথম প্রশ্নের সেট একটু পরেই আপলোড করছি।
             আশাকরি আপনাদের দিক থেকে ভালোই সাড়া পাওয়া যাবে। ধন্যবাদ!

'খৈরাকপা ইরেল'ঃ বরাক উপত্যকা-স্থিত ক্ষুদ্রতম নদী চর

            পৃথিবীর সবচাইতে ছোট নদী-দ্বীপ হচ্ছে ব্রহ্মপুত্রের বুকে অবস্থিত উমানন্দ। এই সত্যের ইতিহাস কে সম্ভবতঃ ম্লান করে দিতে চলেছে এক নতুন আবিষ্কার। আর সেটা হচ্ছে, বিশ্বের সবচাইতে ছোট নদী-দ্বীপ উমানন্দ নয়, সেটি আছে বরাকের বুকেই। কাছাড় জেলার পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত ফুলেরতল থেকে বরাকের উজানপথে মোটর- বোট চড়ে আনুমানিক এক ঘণ্টা এগোলেই পাওয়া যাবে নারায়ন ডহর (ডহর অর্থাৎ নদীর গভীর অঞ্চল)।
এই ডহরের অদূরেই রয়েছে ‘খৈরাকপা ইরেল’।
নদী চর উমানন্দএর এলাকা হল ২ লক্ষ ২১ হাজার ৩০০ বর্গ মিটার, বা ৭ লক্ষ ২৬ হাজার বর্গ ফুট; আর নারায়ন ডহরের এই নদী-দ্বীপ হল মাত্র ৭৬২ বর্গ মিটার বা ২৫০০ বর্গফুট । 
           মণিপুরি লোককথা অনুযায়ী অনেক কাল আগে খৈরাকপা নামের এক বীরপুরুষ প্রনয় সুত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন লাইমা নামক এক যুবতীর সঙ্গে। খৈরাকপা নিবেদিত প্রেম অগ্রাহ্য করেছিলেন লাইমা, এবং আত্মগোপনের উদ্দ্যেশে পালিয়ে এসেছিলেন এই নারায়ণ ডহরে। খৈরাকপা কিন্তু নাছোড়বান্দা। লাইমার পিছু পিছু ধাওয়া করে এসে পৌঁছালেন ওই একই জায়গায়। গত্যন্তর নেই লাইমার, প্রেমিক-কে গ্রহণ করার অভিপ্রায় নেই, অথচ অন্য কোনও বিকল্পও নেই। শেষমেশ রাগে- দুঃখে-জেদে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করলেন নারায়ণ ডহরের ওই জলেই। লাইমার নাম থেকেই নারায়ণ ডহরের মণিপুরি নাম ‘লাইমা-ইরেল’। আর প্রেয়সীর দুঃখে ওই নদী-চরেই বাকি জীবন সন্যাসীর মত কাটালেন খৈরাকপা। এ তো গেল এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। সেই থেকেই মাঘ মাসের (মনিপুরিতে ‘ওয়াকচিং’) নির্দিষ্ট এক রবিবার (প্রথম রবিবার-ই বিশেষতঃ) ওই খৈরাকপা ইরেল-এ দলবদ্ধ ভাবে মনিপুরি জনগোষ্ঠীর লোকেরা নৌকা যোগে ছুটে আসেন ওই নদী দ্বীপ নির্মিত শিব-মন্দিরে (মনিপুরিতে নংপক- নিথন- আপন –বা) তে পুজা দিতে।
            ক্ষুদ্রতম এই নদী দ্বীপের উপরিভাগের সমতলভূমি রয়েছে আনুমানিক ২৫০০ বর্গ ফুট, আর নীচের ভাগ, যেখানে জল ছুঁই-ছুঁই, সেখানে রয়েছে আনুমানিক ৬৪০০ বর্গফুট। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, এই নদী চরের উচ্চতা আগে আরও অনেক বেশী ছিল, কিন্তু, ১৯৬৯ সালের বন্যায় বেনোজলে ভেসে আসা এক প্রকাণ্ড উদ্ভিদখন্ড এই চরের উপরিভাগের অংশটুকু ভেঙ্গে নিয়ে যায়। নদী-দ্বীপের উপরিভাগের অংশে প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন হিসেবে একটা পুরনো লৌহস্থম্ভও রয়েছে। আসাম বিস্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য তথা ইতিহাসবিদ অধ্যাপক জয়ন্ত ভূষণ ভট্টাচার্যের কাছে এই নদী-চর সম্পর্কে আরও তথ্যাদি রয়েছে। প্রয়াত রাজমোহন নাথের ঐতিহাসিক রচনাতেও সম্ভবত এর উল্লেখ রয়েছে। এই নদী দ্বীপে বরাক উপত্যকার চারিত্রিক বৈশিষ্ট অনুযায়ী কিছু তৃণ-জাতীয় উদ্ভিদও রয়েছে, কিন্তু গুল্ম বা বৃক্ষ জাতীয় গাছপালা নেই।
         বর্তমানে পৃথিবীজুড়ে পরিবেশ ভ্রমন বা ইকো- টুঁরিজম বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করছে, এবং এ সবের সাথে তাল মিলিয়ে এ রাজ্যে তথা বরাক উপত্যকায়ও বেশ তোড়জোড় শুরু হয়েছে। কিন্তু এই নদী চরের উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যপারে সরকারি উদাসীনতা স্থানীয় তথা উপত্যকার বাসিন্দাদের মনে যথেষ্ট উদ্বেগের সঞ্চার করেছে। বিষয়টা আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত করাটা নিতান্ত জরুরি। আর তা করতে পারলেই পরিবেশ, ঐতিহাসিক তথা প্রত্নতাত্বিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ নারায়নডহরের এই ‘খৈরাকপা ইরেল’ দেশ-বিদেশের ভ্রমন পিপাসুদের ঢল বরাক উপত্যকায় এসে নামাতে পারে, এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। আর তার জন্য যেটা একান্ত প্রয়োজন, তা হল, রাজ্য তথা কেন্দ্রীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্তা-ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় সদর্থক পদক্ষেপ গ্রহণ। উপত্যকায় অবস্থিত এরকম গুরুত্বপূর্ণ স্থানের রক্ষণাবেক্ষণের লক্ষ্যে ব্যাপক গণসচেতনতা গড়ে তোলার আহবান জানিয়েছেন স্থানীয় মণিপুরি জনগোষ্ঠীর লোকেরা।
            এ দিকে বিশ্বের বৃহত্তম নদী-দ্বীপ ব্রহ্মপুত্রের মাজুলি। ক্ষুদ্রতম হিসেবে এযাবৎ গণ্য হত ব্রহ্মপুত্রেরই বুকে স্থিত উমানন্দ। এবার বিশ্বের ক্ষুদ্র তম নদী-দ্বীপ হিসেবে নারায়ন ডহরের 'খৈরাকপা ইরেল' স্বীকৃতি পায় কি না তা অঞ্চলের উদ্যোগ তথা সরকারি তৎপরতার উপরই নির্ভরশীল!!

শুক্রবার, ১৬ মার্চ, ২০১২

দীনেশ চন্দ্র সেনের একটি প্রবন্ধ ' বঙ্গ ভাষার উপর মুসলমানের প্রভাব' প্রসঙ্গে

               আমার কাছে দীনেশ চন্দ্র সেনের লেখা কোনো বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নেই। নেই কারণ, আমাদের পাঠ্যক্রমের ইতিহাসে জনপ্রিয় বই ছিল এবং আছে অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত। কিন্তু ভদ্রলোককে প্রথম পাঠের দিন থেকেই আমার কোনোদিনই ভালো লাগেনি। দুটো কারণে, এক ইনি পাঠ্যক্রমের চাহিদা অনুযায়ী তাঁর বইয়ের খুদে থেকে বিশাল , বিচিত্র সংস্করণ করতে দিতেন প্রকাশকদের। তার মানে বাজার বুঝতেন ভালো। দুই, নানা জায়গাতে তাঁর এমন কিছু মন্তব্য থাকত যাতে করে যেকোনো চিন্তাশীল মানুষের মনে হওয়া খুবই স্বাভাবিক যে ইনি খুব রক্ষণশীল ছিলেন। আমি ক্ষেত্র গুপ্তের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পড়েছি। ভিন্ন কিছু মনে হয় নি , শুধু এক বামপন্থী পোচ ছাড়া তাতে নতুন কিছু পাইনি। তাই বোধহয় কোনো এক সময় আমার নজরে পড়েন  সুকুমার সেন। এবং আমি তাঁর পুরো পাঁচ খন্ড এবং আলাদা করে ইসলামী বাংলা সাহিত্য কিনে সুখে ছিলাম। 
              আজ হঠাৎ করে হুমায়ুন আজাদের সম্পাদিত দুই খন্ডে 'বাংলা ভাষা' বইতে ( ২য় খন্ডে) দীনেশ চন্দ্র সেনের একটি প্রবন্ধ পড়লাম। পড়ে আমি খুব উত্তেজিত। আমার দীর্ঘদিনের একটি আবছা ধারণা আর বিশ্বাসের সমর্থণ যে ইনি বহু আগেই করে বসে আছেন জানতামই না যে! তাঁর প্রবন্ধটির নাম ' বঙ্গ ভাষার উপর মুসলমানের প্রভাব'। এটি শুরু হয়েছে এই বাক্যে "মুসলমান আগমনের পূর্বে বঙ্গ ভাষা কোনো কৃষক-রমণীর ন্যায় দীনহীন বেশে পল্লীকুটিরে বাস করিতেছিল" মাঝে লিখছেন, " ...হীরা কয়লার খনির মধ্যে থাকিয়া যেমন জহুরীর আগমনের প্রতীক্ষা করে, শুক্তির ভিতর মুক্তা লুকাইয়া থাকিয়া যেরূপ ডুবারীর অপেক্ষা করিয়া থাকে, বঙ্গভাষা তেমনই কোনো শুভদিন, শুভক্ষণের জন্য প্রতীক্ষা করিতেছিল। মুসলমান বিজয় বাঙ্গালা ভাষার সেই শুভদিন, শুভক্ষণের সুযোগ আনয়ন করিল।" দীর্ঘ প্রবন্ধ। প্রচুর তথ্য, এবং গল্প। অন্যথা আমি পুরো লেখাটাই ব্লগে তুলে দিতাম। একেবারে  শেষে লিখছেন, "একবার ধানকাটার পর বঙ্গদেশ -বিশেষ পূর্ববঙ্গ ঘুরিয়া আসুন দেখিবেন, মুসলমান কৃষকেরা দল বাঁধিয়া কত প্রকার গান গাহিয়া এদেশকে আনন্দ বিতরণ করিতেছে। কত তরজা বাউলের দেহতত্ব বিষয়ক গান, কত মাঝির ভাটিয়ালি গান , কত রূপ-কথা ও মনোহর কেচ্ছা ও গাজির গান তাহারা বাঙ্গালা দেশকে শুনাইয়া জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের সহায়তা করিতেছে। হিন্দুরা এ বিষয়ে কোনোক্রমেই মুসলমানের সমকক্ষ নহে। দুচারিজন শিক্ষিত লোক লইয়া এদেশ নহে। দু'চারিজন উপন্যাস পড়ূয়ার হাতে বঙ্গদেশটি নহে। বঙ্গদেশ বলিতে যে সপ্তকোটি লোক বোঝায় তাহার শতকরা ৯০ জনের বেশী আধুনিক শিক্ষার কোনো ধার ধারে না। এই সুবৃহৎ জনসাধারণের শিক্ষা মুসলমান কৃষকেরা তাহাদের ক্ষমতা অনুসারে দিতেছে , সে ক্ষমতাও বড় সাধারণ নহে। যাহারা পদ্মাবতের ন্যায় এরূপ পাণ্ডিত্য পূর্ণ কাব্য বুঝিতে পারে, দেহতত্ব বিষয়ক অতি সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক তত্ব আয়ত্ব করিতে পারে, তাহারা কি 'মূর্খ' অভিধান পাইবার যোগ্য? এই বিপুল জনসাধারণের ভাষা বাঙ্গালা, মুসলমানগণ এখনো এই ভাষার উপর পল্লিগ্রামে আধিপত্য বিস্তার করিয়া আছেন।"--এর পর আমার দীনেশ সেনের ইতিহাস বইখানা সংগ্রহের আগ্রহ বেড়ে গেল। কেন না বাড়বে, বলতে পারেন?

বৃহস্পতিবার, ১৫ মার্চ, ২০১২

কবি ফৈজুল্লার সত্যপীরের পাঁচালির বন্দনাংশ


সত্যপীরের সিন্নি বা সত্যনারায়ণ সেবা-র পরম্পরা আমাদের প্রাচীন বৈচিত্রময় সংস্কৃতির ঐক্যের নিদর্শন। যে রীতি আছে তো এখনো, কিন্তু তার ইতিহাসকে ভুলে থাকতে এবং অন্তসলিলা প্রীতির ঐতিহ্যকে কোথাও যেন আমাদের ভুলিয়েই দেয়া হয়েছিল। উত্তর বাংলার কৃষ্ণহরি দাস বলে এক কবি ছিলেন সত্যপীরের পাঁচালি লেখক। তাঁর দুই পংক্তি এমন,
“ তাহেদ মামুদ গুরু শমস-নন্দন
তাহার সেবক হয়ে কৃষ্ণহরি গান।”
মনে কি হয় না, প্রাকৃতজনের ধর্ম জানতনা কোনো ভেদ করতে? কোথাওতো গড়ে উঠছিল বাংলার নিজস্ব ধর্ম, যাকে মাথা তুলতে দেয়া হয় নি কেবল আধুনিক যুগে, তাঁর জায়গা জূড়েছে সাম্প্রদায়িক-রাজনৈতিক  ধর্ম? সত্যপীরেরপাঁচালির জনপ্রিয় লেখক দক্ষিণ রাঢ়ের কবি ফৈজুল্লা। তাঁর কাব্য শুরু হচ্ছে এরকমঃ

সেলাম  করিব আগে পীর নিরঞ্জন
মহাম্মদ মস্তফা বন্দো আর পঞ্জাতন।
সের আলি ফতেমা বন্দো একিদা করিয়া
হাচেন হোছেন পেয়দা হৈল যাহার লাগিয়া।
রছুলের চারি ইয়ার বন্দো শত শত
চারি দহ ইমামের নাম লব কত।
এবরাহি খলিলের পায়ে করি নিবেদন
বেটার করবানি দল দীনের কারণ।
করবানি করিয়া দিল এসমাল করিয়া
সেই হৈতে নিকে বিভা হইল দুনিয়া।
আম্বিয়ার হাসিল বন্দো পালআন দুই জনে
এসমাইল গাজি পীর কামাএর কুনি
বড়-খান মুরিদ মিঞা করিল আপনি।
পাঁড়ুয়ার সাফি-খাঁয়ে করি নিবেদন
অবশেষে বন্দিব সত্যপীরের চরণ।
সম্বল জাহানে বন্দিব পীর আছে যত
এক লাখ আশি হাজার পীরের নাম লব কত।
সম্বল পীরিনী বন্দো বিবিগণ যত
বিবি ফতেমার কদমে বন্দিব শত শত।
হিন্দুর ঠাকুরগণে করি প্রণিপাত
খানাকুলের বন্দিব ঠাকুর গোপীনাথ।
নামেতে বন্দিয়া গাইব ধর্ম নিরঞ্জন
যার ধবল খাট ধবল পাট ধবল সিংহাসন।
যমুনার তটে বন্দো রাস বৃন্দাবন
কৃষ্ণ-বলরাম বন্দো শ্রীনন্দের নন্দন।
নবদ্বীপে ঠাকুর বন্দো চৈতন্য-গোসাঞি
শচীর উদরে জন্ম বৈষ্ণব –গোষাঞি।
কামারহাটির পঞ্চাননে কতি নিবেদন
দশরথের পুত্র বন্দো শ্রীরামলক্ষণ।
লক্ষী সরস্বতী বন্দো গঙ্গা-ভাগীরথী
সীতা ঠাকুরাণী বন্দো শচী ঠাকুরাণী
যর গর্ভে গোঁরাচাঁদ জন্মিল আপনি।
শুনহ ভকত লোক হএ-একচিত
সত্যপীর সাহেব সভার করে হিত।
তুমি ব্রহ্মা তুমি বিষ্ণু তুমি নারায়ণ
শুন গাজি আপনি আসরে দেহ মন।
ভকত না একের তরে মোকেদ হইয়া
আসিয়া দেখহ পীর আসরে বসিয়া।
ছাড় গাজি মক্কার স্থান আসরে দেহ মন
গাইল ফৈজল্যা কবি সত্য-পদে মন।

                                                  (c) ছবি

ন্যাড়া পুজার রাতে



হোলির রং মেখে আছে সারা শহর, পূর্ণিমার প্রহর শেষে ন্যাড়া পুজার সন্ধ্যায়, প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে, নামহীন শিশুর দল।
পরের সারিতে তাঁদের মায়েরা
বুকের কাপড় সরে গেছে ইচ্ছেকৃত

এবার পর্দা উঠবে শেক্সপিয়র সরণীর,

ন্যাড়া পুজার পর আগুন লাগবে শরীরে, সাঙ্গ হলে নারায়ন শীলার প্রদক্ষিণ
পতিতার শরীর এভাবেই পোড়ে রাতভর।
কে জানে পাঞ্চালি কতবার পুড়েছিল!

বসন্ত ছায়া ঘনিয়ে এসেছে এই মহল্লায়, একে একে পান্ডবপুত্রেরা সব জুতো
খুলে ঢুকবে এবার ঘরে।

জ্বলছে ন্যাড়া ঠাকুরের খড়ের শরীর
ঘুরছে পৃথিবী, ঘুরছি আমি, ঘুরছে ন্যাড়া ঠাকুরের শরীর রাতের আকাশে

ঘুরছে সভ্যতা এভাবেই গত তিনশ বছর ধরে এক পতিতাপল্লীতে
পৃথিবীর সবচেয়ে সভ্য শহর কলকাতায়।