“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

সোমবার, ১১ জানুয়ারি, ২০১৬

ফোরাম ফর সোশ্যাল হারমনির বুলেটিন – ৩ (খসড়া)



মাহমদপুর-জয়কৃষ্ণপুর জিপিতে ফোরাম ফর সোশ্যাল হারমনি’র সমীক্ষক দলের বৈঠক
একটি অসম্পূর্ণ প্রতিবেদন


           

৯ জানুয়ারি, ২০১৬ বেলা ৩ টায় ফোরাম ফর সোশ্যাল হারমনি’র সমীক্ষক দল হাইলাকান্দি জেলার লালা শহর থেকে ৫/৬ কিঃমিঃ দূরে মাহমদপুর-জয়কৃষ্ণপুর জিপি’তে পৌঁছয়, লালা ও কাটলিছড়ার মধ্যবর্তী অঞ্চলে এই জিপি অবস্থিত। দুর্ভাগ্যক্রমে আবহাওয়া ছিল প্রতিকূল। এই শীতের মরসুমেও মতবিনিময় সভার আগে ও পরে অঝোরে বৃষ্টি হয়, এমনকি সেখান থেকে শিলচরে ফেরার প্রায় ৫০ কিঃমিঃ পথ পাড়ি দিতে শিলাবৃষ্টির তোপে খানিকক্ষণ নিরাপদ আশ্রয়ে টিমের গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখতে হয়। দু-পাশে চা-বাগান ও গ্রামগুলিকে রেখে নব্য সেজে ওঠা কুচকুচে কালো পি-ডবলিউ-ডি রাস্তাকে বৃষ্টির জল ধুয়েমুছে সাফ করে আমাদের মত যাত্রীদেরকে যখন আবাহন করছিল, আমাদের নাগরিক মনকে যখন করে তুলছিল রোমান্টিক, ঠিক তখনই হয়ত রাস্তার পাশে খড়কুটোর ঘরে কোন এক চা-শ্রমিক মা তার কালো শিশুটিকে ছাদের ফোটা দিয়ে আসা বৃষ্টির জলের ও কিনকিনে ঠাণ্ডার মারণ ছোবল থেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে। সে যাই হোক, ভূমিকা বাদ দিয়ে এবার মোদ্দা কথায় আসা যাক।
     
         
  মতবিনিময় সভার স্থান যদিও ছিল মাহমদপুর-জয়কৃষ্ণপুর জিপি, কিন্তু সভায় আসলে উপস্থিত হোন আশপাশের অনেকগুলি জিপি ও দূরবর্তী স্থানের কিছু প্রতিনিধিরা। এরকম সভায় কোন একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল সম্পর্কে গ্রহণযোগ্য বিশদ তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন, বিশেষকরে প্রতিকূল আবহাওয়ার জন্য ফোরামের টিম যখন গ্রামের অভ্যন্তরে ঘুরে বেড়াতে অক্ষম হয়। স্বাভাবিকভাবেই এই জিপি’র তথ্য ছাড়াও আশপাশের অনেক ঘটনার কথা উঠে আসে এই আলাপচারিতায়। এই আলোচনা থেকে সমীক্ষক দলের মনে হয় যে হাইলাকান্দি জেলার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যা গোটা জেলার জনমানসেই শুধু প্রভাব ফেলেনি আর্থিক-সামাজিক বিন্যাসেও প্রভাব ফেলেছে এরকম ঘটনা, সামগ্রিক জনবিন্যাস, অভ্যন্তরীণ আর্থিক-সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে এক বিশদ প্রতিবেদন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তাই এই আলোচনা থেকে যেসব আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক তথ্য উঠে এসেছে সেগুলি আরও গভীরে যাচাই না করে তাৎক্ষণিক একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করা থেকে আপাতত: বিরত থাকাই শ্রেয় বিবেচিত হয়। এই দিক থেকে এদিনের আলোচনার এক বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে, কারণ এই আলোচনা ফোরাম টিমকে হাইলাকান্দি জেলার সামাজিক-রাজনীতিকে আরও গভীরে যাচাই করতে আগ্রহান্বিত করে তুলেছে।
          তবে সেদিনের আলোচনার বিশদ তথ্য এখানে তুলে না ধরলেও, কিছু সাধারণ তথ্য এখানে তুলে ধরছি। ১৯৭৯-৮০ সালে কাটলিছড়া এলাকায় এক ভয়াবহ দাঙ্গার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। আব্দুল মালিক লস্কর এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করলে কাটলিছড়া এলাকার অধীর নাথ জানান, সে সময় লবণ-কেরোসিনের খুব সংকট দেখা দেয়। সেই লবণ-কেরোসিনের বণ্টনকে কেন্দ্র করে সমবায় সমিতির তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রয়াত ইউনিস খান চৌধুরীকে অপমানিত করার মত কোন এক ঘটনা ঘটে। প্রয়াত চৌধুরী ছিলেন সে এলাকার সর্বজনশ্রদ্ধেয় প্রভাবশালী ব্যক্তি। এই ঘটনার প্রতিবাদে ১৯৭৯ সালের সম্ভবত জুন-জুলাই মাসে তাঁর সমর্থনে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের এক ঐক্যবদ্ধ মিছিল বেরোয়। এই সময় জনৈক বিভূতি দেবের বাড়িতে কেউ বা কারা কিছু ইট-পাটকেল ছোড়ে, ইউনুস খান এই ঘটনার প্রতিবাদও করেন। কিন্তু মিছিল যখন কাটলিছড়া বাগান-থানা হয়ে ফিরে গিয়ে কাটাখাল নদী পার হয় তখনই সাম্প্রদায়িক রূপ পরিগ্রহ করে, কেন-কীভাবে তা আরও বিশদভাবে জানা প্রয়োজন। আব্দুল মালিক লস্কর ও অধীর নাথ জানান যে এই দাঙ্গায় ময়না মোক্তারের দুই ছেলে সপু ও তপুকে হত্যা করা হয়। ইউনুস খানের মত ময়না মোক্তারও ছিলেন এই এলাকার মুসলিম জমিদার (আনুমানিক ৭০০/৮০০ বিঘা জমির মালিক) ও প্রভাব প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি এবং সেই সুবাদে তার ছেলেদেরও ছিল এলাকায় দাপট। সপু-তপু দুই ভাইয়ের হত্যা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে, কারুর মতে তাদেরকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, আবার পুলিশের গুলিতে তারা নিহত হোন বলে ভিন্ন মতও রয়েছে। তবে সেই ঘটনায় দীননাথপুর চা-বাগানের ৩ জন মুসলিম শ্রমিক পুলিশের গুলিতেই নিহত হয়েছেন বলে জানান অধীর নাথ। এই দাঙ্গার নির্ভরযোগ্য বিশদ তথ্য সংগ্রহ করা এবং দাঙ্গার পেছনে অন্তর্নিহিত আর্থ-সামাজিক কারণসমূহ বিশ্লেষণ করা জরুরি। তবে এই দাঙ্গার পর কাটলিছড়া বাজারে মুসলিম ব্যবসায়ী যারা ব্যবসা করতেন তাদের প্রায় সবাই ধীরে ধীরে সরে আসেন এবং সাহাবাদ ও লালা এলাকায় চলে আসেন। সাহাবাদ বাজার সেই সময়েই গড়ে ওঠে। আব্দুল মালিক লস্কর বলেন যে কাটলিছড়া বাজার মসজিদে আজান দিতে দেওয়া হয় না, হিফজুর রহমান এই তথ্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করেন, আবার সালা উদ্দিনের মতে সেখানে মুসলাম না থাকায় সম্ভবত আজান দেওয়া হয় না। যে জিপিতে সভা বসেছিল সেই জিপিতে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের লোক বাস করলেও সেই দাঙ্গার কোন প্রভাব এই এলাকায় পড়েনি। তার কারণ জানতে চাইলে আব্দুল মালিক লস্কর জানান যে এই এলাকায় সবাই স্থানীয় এবং মুসলিম, এসসি, অবিসি সম্প্রদায়ের লোক। সালা উদ্দিন, রেকিব উদ্দিন, সাজ্জাদ আলি লস্কর বলেন যে এই এলাকায় হিন্দু-মুসলমানে সামাজিক মেলামেশার পরিবেশ ও সম্প্রীতি রয়েছে এবং কোনধরনের সাম্প্রদায়িক ঘটনার নজির নেই, তবে অতীতে টান্টুর মোকামকে কেন্দ্র করেই হোক বা সাধারণভাবে এ অঞ্চলে যৌথ সামাজিক আনন্দ উৎসবের যেসব অনুষ্ঠান ছিল তা এখন আর অবশিষ্ট নেই, দৈনন্দিন মেলামেশা মূলত বাজার ও পারিবারিক অনুষ্ঠানকেন্দ্রীক।
     
      
   বিভিন্ন কথোপকথন থেকে সমীক্ষক দলের ধারণা জন্মে যে এই দাঙ্গার পেছনে রয়েছে ধর্ম-বর্ণ-জমিকে কেন্দ্র করে উৎপাদন সম্পর্ক এবং সর্বোপরি তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান থেকে আসা উচ্চবর্ণ হিন্দু পরিবারদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াসের সাথে স্থানীয় প্রতিষ্ঠিত মুসলিম পরিবারদের সংঘাতের এক জটিল আর্থিক-সামাজিক-রাজনৈতিক সংমিশ্রণের পরিণতি। এটা ফোরাম টিমের শুধু ধারণাই, এনিয়ে আরও গভীরে পর্যালোচনা করা জরুরি। পর্যালোচনা করা জরুরি ১৯৯০ সালের হাইলাকান্দি দাঙ্গার ঘটনা নিয়েও। সত্তরোর্ধ সাজ্জাদ আলি লস্কর বলেন একষট্টির ভাষা আন্দোলনের সময় অসমীয়া ভাষার দাবিতে তাঁরা মিছিল করেছেন, কিন্তু পরবর্তীতে বুঝতে পারেন যে তিনি তো অসমীয়া ভাষা এক লাইনও বলতে পারেন না। সুতরাং সে সময়কার ঘটনাবলীও নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে দেখা জরুরি। এই কাজগুলি করা অত্যন্ত জরুরি এই কারণেই যে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই জেলা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ভ্রান্ত ধারণা মধ্যবিত্ত শিক্ষিত মননে বিরাজ করছে এবং হাইলাকান্দি জেলায় হিন্দু-মুসলিম বিভাজনকে সুদৃঢ় করতে উগ্র-সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী অতি-সক্রিয় রয়েছে।
      
   
  এই জিপি সম্পর্কে কিছু তথ্য সংগ্রহ করা গেছে উপস্থিতিদের বয়ান থেকে। তবে ভাল করে যাচাই না করে সবগুলি তথ্য এখানে উপস্থাপন করা থেকে বিরত থাকা গেল। শুধুমাত্র গুটিকয় তথ্য এখানে তুলে ধরা হচ্ছে। জবরুল ইসলাম জানান যে এই জিপি-তে আনুমানিক ৬/৭ হাজার ভোটারের মধ্যে পাঁচশত থেকে এক হাজার হিন্দু ভোটার রয়েছে। জমির মালিকানা রয়েছে ৭০% মানুষের। গড়ে ১ থেকে ২ বিঘার জমি মালিকানা। ৩%-এর ৫ বিঘার উপর জমি রয়েছে, আনুমানিক ১০ টি পরিবারের রয়েছে ১০ বিঘার উপর জমি। সবাই পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি চাষ করেন। এই ৭০%-এর মধ্যে ১৫%-এর ক্ষুদ্র ব্যবসায় আছে ও দুইজন জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া ৫% লোক ৩য়-৪র্থ শ্রেণি ও শিক্ষকতার (অধিকাংশ প্রাইমারী স্কুলের) চাকরীর সাথে যুক্ত। বাকী ৩০% লোক বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরোপুরি দিনমজুর। চাষের জমি দুই ফসলি, অসংখ্য ফিসারি রয়েছে এ অঞ্চলে। জমি না থাকায় এ অঞ্চলের মৎস্যজীবী মাইমাল সম্প্রদায়ের মানুষ মৎস্য চাষের সাথে যুক্ত থাকলেও ফিসারির মালিকানা প্রায় নেই। এলাকায় একটি ক্যানেল ইরিগেশনের ব্যবস্থা থাকলেও তা অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে। অথচ কাটাখাল নদী থেকে বা টিউবওয়েলের মাধ্যমে ইরিগেশনের ব্যবস্থা করলে চাষবাস ও ফিসারির প্রভূত উন্নতি হতে পারত। পাশের নিজবার্ণারপুর-সর্বানন্দপুর জিপিতে তারা-পাম্পগুলি অকেজো হয়ে পরে থাকায় ভীষণ পানীয় জলের সংকট এবং এই জিপি’র বহু এলাকা বিদ্যুৎ সংযোগহীন।
উপরোক্ত তথ্যগুলিকে আরও গভীরে যাচাই করার মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রস্তুত করার ইচ্ছা নিয়ে ফোরামের সমীক্ষক দল শিলচর ফিরে আসে।

শনিবার, ৯ জানুয়ারি, ২০১৬

সুরমা গাঙর পানি - ভাটি পর্ব ১৮

(দেশভাগ এবং পরের দশকের কাছাড় সিলেটের প্রেক্ষাপটে রণবীর পুরকায়স্থের এই উপন্যাস ছেপে বের করেছে দিন হলো। ভালো লাগা এই  উপন্যাস পুরোটা টাইপ করে তুলে আমার প্রিয় কথা শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। আশা করছি আপনাদের সবার এটি পড়তে ভালো লাগবে। সম্পূর্ণ উপন্যাসের সংলাপ ভাগটি সিলেটিতে -সে সম্ভবত এই উপন্যাসের সবচাইতে আকর্ষণীয় দিক। আপনাদের পড়বার সুবিধে করে দিতে, ঈশানে এই উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে আসছে। আজ তার অষ্টাদশ  অধ্যায় ---সুব্রতা মজুমদার।)   
 আঠারো
  বৈতল কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেয় তাড়া আবার । বলে,
--- চলো ।
--- কই চলো ।
--- আমারে ইন্ডিয়াত দিয়া আও ।
--- কই যাইতায় ইন্ডিয়াত ?
--- আছে, যাইমু । আমার মামা আছইন জালেঙ্গাত । আখড়া করছইন । আমারে আদর করিয়া ডাকইন, দুর্গা মাইকি জয় ।
--- হি তো বুঝলাম । অখন আর জয় দিবা নি ।
--- দিবা দিবা, তাইন এক আচানকি মানুষ । নিজর খানি না থাকলেও ভাগনিরে খাওয়াইবা ।
--- আর জামাইরে ?
--- বিয়া অইলে তো জামাই । বৈষ্ণবী সাজিয়া যাইমু । রসকলি আকমু ।
--- আর আমি । আমি কিতা পুলিশর হাতো ধরা খাইতাম নি আবার ।
--- কেনে । তুমিও অই যাইবায় গোসাই । নাম লই লাও একটা ।
--- আমার নাম নেওন লাগত নায় । যে নাম আছে হউ নামেউ অইব । আমি বৈতল, বৈতলের লগে গোসাই লাগাই দিও লাগব । দাশ লাগাইদিও লাগব, পাটনি লাগাই দিও লাগব, কৈবর্ত লাগাই দিও লাগব, মিয়া লাগাইদিও লাগব । তুমারর ই আচার্য উর্চায শর্মা উর্মা লাগত নায় ।
--- আমারে বিয়া করলে তো লাগানি লাগব ।
--- কেনে আমি কুনু বেটি নি । তুমি লেখবায় পাটনি । দুর্গা পাটনি লেখতে পারলে বিয়া করবায়, নাইলে না । আইচ্ছা নায় দাশ লেখিও । তুমার কিচ্চু করন লাগত নায় । আমারেও বিয়া করন লাগত নায় । তুমি তুমার বাব্‌নি অউ থাকিও গো মাই, অখন চলো দিয়া আই বৈষ্ণবীরে মামার বাড়ি । জয় দুর্গা মাইকি ।
   বৈতল হাত ধরে দুর্গাবতীর । কলাগাছের ভোরা বানিয়ে ভাসিয়ে দেয় সুরমার জলে । ভেসে যায় দুজনে । কুশিয়ারা পেরিয়ে মনে হয় নিশ্চিন্ত । বরাক বেয়ে বেয়ে তারাপুর, শিলচর । ওখানেও দুর্যোগ । দুর্যোগের পাইক পেয়াদা একা আসে না । একের পর এক দুর্ভোগ কাটিয়ে বৈতল বোষ্টুমীকে নিয়ে পৌঁছে যায় মেহেরপুর । পুনর্বাসন দপ্তরের বদান্যতায় ডামধাড়ার এক ঘরের মালিক হতে না হতেই দুর্গাবতী অসুস্থ । ধুমজ্বর আর পেটখারাপ, বারবার পায়খানা । বৈতল উতলা হয়, একে ওকে বলে, ডিসপেনসারির লবণজল আর শিবাজল বড়ি খেয়ে কমে না । কেউ বলে হোমিওপ্যাথি করতে, বীরেশ ভট্টাচার্য ধন্বন্তরির এক পুরিয়ায় ঠিক হয়ে যাবে । কেউ বলে, এলোপ্যাথি, বিভট । একজন এসে বলে,
--- আমি শৈলেন কবিরাজ । দেখি কই তুমার পরিবার ।
    কবিরাজের বড়িতে সুস্থ হয় দুর্গাবতী । কাচকলা দিয়ে চেঙ মাছের ঝোল খেয়ে চনমনে দুর্গাবতী মনে মনে প্রণাম করে কাকাবাবুকে । দুর্গাবতী কাকাবাবু ডাকলেও বৈতল ডাকতে পারেনি । বৈতল ডাকে কবিরাজ মশয় । দাম ছাড়া ঔষদের সুফলে প্রতিদান দিতে চায় বৈতল । ভিষগশাস্ত্রীর চাই ঔষধের উপকরণ, তাই বৈতল জঙ্গল থেকে পাতালতা যোগাড় করে দেয় কবিরাজকে । একবার এমনিতে দেয়, বারবার দেয় না, দাম চেয়ে রাখে । বৈতল এরকমই ।
     বৈতল জানে জালেঙ্গার গল্প ঢপ । মামা থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু দুর্গাবতী বোষ্টুমি হতে ওখানে যাবে না । ভেসেই যখন পড়েছে কলাগাছের ভোরায় আর ছাড়বে না সিতপুরুষ বৈতলকে । মেহেরপুর ক্যাম্প একাকী অসুস্থ যুবতিকে ছেড়ে যায়নি বৈতল । তারও আর খুনের আসামী হয়ে জেলে যাওয়া হয় না । থেকেই যায় বিদেশ ইন্ডিয়ার যুবতিমায়ায় মুগ্ধ হয়ে । তবু মাছের ঝোলে সুস্থ হওয়া রোগিণীর মতামতটাও তো জরুরি । গম্ভীর মুখে বিদায় নিতে যায় । বলে,
--- অখন যাই ।
--- কই যাইতায় ।
--- কেনে বইয়াখাউরি । অখন থাকোইখানো, তার পরে নায় যাইও মামার আখড়াত ।
--- অ, আখড়াত যাওয়ার লাগিনি ক্যাম্পো আইলাম । কিচ্ছু বুঝো নানি ? খালি গাট্টামি । যাও গিয়া, অখন পাকিস্তানর জেলো পচিয়া মরো ।
--- আমারে কে ধরত ? কেউ দেখছে নি ? বৈতলরে ধরা অতো সস্তা নায় ।
  দুর্গাবতী বৈতলের হঠাৎ গভীর হওয়া কালো চোখে তাকায় করুণ দৃষ্টিতে । বলে,
--- যাইতায় গিয়া । আমি অসতী এর লাগি । বইয়াখাউরির মাইনষে আমারে ভালা রাখছে না । একলা পুড়ি কেমনে ভালা থাকত ভাবছনি একবার ।
--- ছিছি, ইতা কিতা কও । বৈতল ইলাখান নায় । তুমি কই আর আমি কই কও ? তুমি বাবনর পুড়ি আর আমি কৈবর্ত পাটনি । তুমি ধলা আমি কালা । কুনু মিল নাই ।
--- কিওর মিল নাই কও । আমি তসলার কালি মাখিয়া বই থাকমুনে । তে অইবনি ? আর বাবন ? তুমিও একটা বাবনাকি নাম নেও গি না, কিতা অইব ।
--- পারতাম নায়, একদিন কইছি নানি । আমি বৈতল বৈতল অউ থাকমু । বৈতল বৈতল তিন বৈতল ।
--- ইতা অইত নায় । বৈতল কুনু নাম নায় । ইতা গাইল ।
--- অউক গাইল । আমার নাম অউ গাইল ।
--- আমি সবরে কই দিছি আমরা বাবন । কাকাবাবুরেও কইছি আমি দুর্গাবতী শর্মা । তুমারে ও জামাই কইছি । অখন কিতা অইব ?
--- এ রাম, আমিতো ক্যাম্পো নাম লেখাইছি বৈতল দাস পাটনি ।
--- ইতায় কিচ্ছু অইত নায়, হরিদারে কইলেউ বদলাই দিব । তুমি আমার লাগি একটু করতায় পারো নানি ?
--- পারি । দেশ অউ ছাড়িয়া আইছি । তখন এক নামর লাগি নি আটকি যাইমু । কও কিতা নাম রাখতায় ?
--- আমি কেনে, তুমি কও ?
--- আমি তো এক নাম অউ জানি ।
--- বৈতল নানি । ই তুমার ডাক নাম থাকউক, ছাড়িও না । ভালা নাম বানাও ।
--- আরে নারে বাবা । আমি আমার গুরুর নামে ভালা নাম বানাইছি ।
--- কী নাম ?
--- সৃষ্টিধর উঝা ।
--- উঝা উঝা নায় । আমি নু কই লাইছি, আমার শর্মা ।
--- বুঝলাম তো, শর্মা বাবন হকল তো ছায়াত থাকইন, ভালা খাইন । আমার লাখান রইদে পানিয়ে ঘুরইন নি, হিদলপুড়া খাইন নি । তুমি তো ধলা, আমারে দেখলেউ ধরি লাইব । আমি ইতা পারতাম নায়, হাচা কথা কই দেও হক্কলরে ।
--- আমি তো লগ্‌গুনও আনাই রাখছি তুমার লাগি । অখন যদি উল্টা কথা কই কিতা ভাববা কাকাবাবুয়ে ? ভাববা ইতা ঠগ । অখন একতা তখন একতা মাতে ।
--- অয় বাঙালও ভাবতা পারইন । বউত বাঙালেও রিফুজি সাজিয়া হিন্দু নাম লেখাইছে । এগু হারিছ আলিয়ে হরিশ্চন্দ্র লেখাইছিল, ধরা পড়িয়া অলা মাইর খাইল । বাজারি কিল খাইয়া ভাগল বেরেঙ্গাত । ঠিক আছে তুমি অউ জিতলায়, আমি শর্মা অই গেলাম, যাও । কুল মান সব গেল এক বাবনি বেটির লাগি ।
   মেহেরপুর ক্যাম্পের যুবক কর্মচারি হরিদাস শুক্লবৈদ্যকে দিয়েই বৈতলের নামকরণ হয় নতুন করে । দুর্গাবতীর চোখের ভাষায় হরিদা সৃষ্টিধর শর্মা নামের নতুন রিফ্যুজি পরিবারকে নথিভুক্ত করে । বৈতলদাস পাটনির পরিবারের নামও থাকে যথারীতি । ডোল বরাদ্দ হয় দুই নামেই, দুই পরিবারে । হরিদাস কর্মচারী ও দুর্গাবতীর মধ্যে অর্থকরী সমঝোতা হয় । কয়েক মাসের মধ্যে শিলচর থেকে পরিদর্শক এসে নাম ডাকতেই ধরা পড়ার উপক্রম । কিন্তু কিছুই হয় না, হরিদাসের চোখের ইশারায় বৈতল দুনামেই থেকে যায় উদ্বাস্তু শিবিরে । এরকম আরো অনেক নামই তো নেই । রিফ্যুজি অফিসারদের সঙ্গে আসে জননেতা । খাদির পাঞ্জাবি আর ধুতি পরা বাবু । কংগ্রেস পার্টির । পুজোর সময় জানিগঞ্জের ব্যবসায়ীরা নতুন কাপড় নিয়ে আসে । শীতের কম্বল । তবে শিবিরের ভিতর হরিদার কথাই শেষ কথা । কাউকে ঢুকতে দেওয়া বের করে দেওয়ার একমাত্র কর্তা । অনেকের আত্মীয় স্বজনও আসে, থাকে । প্রথম প্রথম তো ডোলের পরিমাণ বেশিই ছিল । এক হপ্তায় পরিবার প্রতি নগদ কুড়ি টাকা কম কথা নয় । চাল ডাল তেল নুনও অনেক, অনেকেরই গরিব আত্মীয়স্বজন এসে ভাগ নিয়েছে । খাতায় লেখা অনেক পরিবারের নিজের বাড়ি আছে তারাপুর শিলকুড়ি শিববাড়ি রোডে, ওরাও আসে । সে এক মোচ্ছব । এর মধ্যেই বৈতলকে নিয়ে ক্যাম্পের ভিতর শুরু হয় আতান্তর । বৈতল কিছুতেই হরি শুক্লবৈদ্যর বশ্যতা মানবে না । আর বৈতলও নজরানা না দিয়ে দুই দুগুনে চার জনের রেশন ও ভাতা ওঠাবে । দুর্গাবতীর এসব লড়াই ঝগড়া ভাল লাগে না । বৈতলকে বলে,
--- দিলাও না বেটারে যেতা চায় । হে তুমার লাগি করছে ।
--- করছে, তো করছে । হে আমার মুখ দেখিয়া করছে নি, ভাবছে পাইব । পেট মুটা অইব । অখন বুঝ বেটা ধুড়া সাপর লাখান বেঙ গিলি লাইচছ তর থাকি গাট্টা । না পাররে বার করতে না পাররে গিলতে ।
--- যদি কই দেয়, জানাই দেয় ।
--- জানাইত নায়, চাইট দিলে হেউ মরব ।
--- মানুষ খারাপ নায় হরিদা । আমারে দিদি ডাকে ।
--- কেনে তুমারে দিদি ডাকত । হে কুনু তুমার ছুট নি । বুড়া বেটা । হুনো, ইতারে আমি চিনি লাইদিলেউ ঘাড়ো উঠব । আমি গাইল্লাই, এর লাগি আমারে ডরায় ।
--- খেদাই দিবনে দেখবায় কুনদিন ।
--- খেদাইত উ আমি চাই, ইনো কুনু হারা জীবন থাকমু নি ।
--- কই যাইবায় ।
--- অ, ইতা হুনছ নানি । রিফুজি হকল আবার যাইব গিয়া পাকিস্তানো ।
--- আর আমরা ।
--- আমরাও রিফুজি, যাওন লাগব ।
--- কই যাইতাম । কুন মুখে যাইতাম । কে আছে আমরার ।
--- আমি বেটা ফাসির আসামি । দুইমুখো করাতর মাঝখানো আছি । রামে মারলেও মারতা করিম চাচায় মারলেও মারতা । আমি কুনু আর যাইমু নি বইয়াখাউরি । তুমারে দিয়া আইমুনে বডার পার করি ।
--- অ, নিজর কথা ভাবলায় খালি । আমারে বাঘর মুখো দিয়া আইবায় আবার । বেটাইন্ত হকল নি অলা স্বার্থপর ।
--- ইতা কইও না । আমি স্বার্থপর নায়, আর হিপারোও সব বাঘ ভাল্লুক নায় । অখন ইতা অইল কির্তনর মাইর । না পাইয়া পাইছে ধন, বাপেপুতে কির্তন । পাকিস্তান পাইয়া ছলি গেছে । ইতা ঠাণ্ডা অই যাইব । করিমচাচা যদি বাচি থাকইন দেখবায়নে তুমার লাগি করবা । আমরার তো মন্ত্রী ও আছইন করাচিত একজন, যোগেন মণ্ডলরে একবার দেখছিলাম হবিগঞ্জো । বেটা খুব সাউকাড় ।
--- হে তো ছুনছি কৈবর্ত না মাইমল, কিতা কিজানি । হে বিয়া করব নি বাবনর পুড়িরে । করলে তো ভালা আছিল মন্ত্রীর বৌ হই গেলাম নে আর তুমারে বান্দিয়া নেওয়াইলাম নে পাকিস্তানো । বেটা ডরালুকর পাদ্রাপুক !
--- রিষ চড়াইও না কইলাম । বৈতলে কেউরে ডরায় না ।
চলবে

 < ভাটি পর্ব ১৭ পড়ুন                                                    ভাটি পর্ব ১৯ পড়ুন >

বুধবার, ৬ জানুয়ারি, ২০১৬

কুয়াশাকণা

চিরশ্রী দেবনাথ 
 
(C) সময়ের কন্ঠস্বর
সময়ের কণ্ঠস্বর
সময়ের কণ্ঠস্বর





















গুচ্ছ কবিতা
....................
এক
যখন আমলকী বনের অম্লতায়,
উষ্ণ শুধু উষ্ণ হয় জমাট শিশির,
তখন বুঝে নিও,
মাঝে মাঝে ক্ষত গুলো
বেয়াড়া রকমের ভালো হয়,
রসেবসে ভরা শীতে  তারা ভীষণ মেদুর....


দুই
হাটে বিকিকিনি নেই,
ছেঁড়া রোদ্দুর গায়ে মেখে নিঃসাড়,
মন্ত্রজল তো আমার কাছে,
উপেক্ষা ভাঁপের মত, তুমি কিন্তু উষ্ণ হচ্ছো ক্রমশ..


তিন
এ শীতে  রঙজোৎস্নায় ভিজে ভিজে মাটি,
আমিই  সব ধূসরতা গিলছি আকণ্ঠ,
সব ছাপিয়ে আমার গ্লাসে ভরন্ত সময়,বেহায়া সুখ..
চার
শীতের রাতের পায়ে পায়ে অন্ধ মশাল ...
ধোঁয়ায় ঢেকে  দিয়ে যায় চোখ।
পলকে রেখে যায় তোমাকেই,
কেন কেটে যায় না অসুস্থ সকাল,দিন আর রাত,
দোয়ানিয়া পাহাড়ের শ্রান্তি ভেসে আসে....
হলুদ ফসলছাড়া মাঠ তবু যেন
রেখে যায় সব শস্য আমারই আঁচলে......
পাঁচ
বর্ণচোরা শীত, লাজুক বড়ো
ধোঁয়ায় ঢেকে রাখে শুকনো ঠোঁট
পাছে কুয়াশা ধুয়ে দিয়ে যায় চুমুর দাগ
হোক ধুলোমাখা, আশ্লেষে এখনো হিমঝড়....

ধোঁয়া অবয়ব

চিরশ্রী দেবনাথ
.......................
(C)Image:ছবি















গাঙে গাঙে কে জল ভরে দিয়ে যায়,
বাউল হয়ে থাক সে , ভাসতে চায় যে।
এ মন ভাসন্ত নয়  .....ভূগর্ভের মতো,
নরম স্নিগ্ধ লাভা জমে জমে
নিবেদিত অন্ধকারে ঢাকা,
তীব্র আকর্ষণে আকাশের শেষ নক্ষত্রটিকেও তার চাই,

খটখটে নদীতীরে একতারা একলা গান গায়,
সুরে বেসুরে ভেসে আসা সব কথা তুলে রাখি,
আগুনবরন  শীতে সেইসব  শব্দেরা,
নেশাহীন, বাস্তব হয়ে ঘুরে বেড়ায় আমার চারপাশে ...
মহুয়ারাত আমার নয়,
লবঙ্গঝাঁঝ আমায় দিয়ে যায়  মশলাসুগন্ধ,
সব ধোঁয়া অবয়ব হবে,
একটু না হয় অপেক্ষা করি ......

মঙ্গলবার, ৫ জানুয়ারি, ২০১৬

নিভৃতের ঈশ্বরী



।। দেবলীনা সেনগুপ্ত।।


 
(C)Image:ছবি

















জ্যোৎস্না রাতে
সবাই যখন গিয়েছিল বনে,
আমি যাইনি।
আমি তখন বনজ্যোৎস্না মেখে
আদিম ঈশ্বরীর মত
চাঁদের ঝরে পড়া আলোয়
নিভৃতের স্নান সেরেছিলাম।
কোমল বল্কলের নিবিড় গল্পে
তৃণলতার বুননকাজ
নির্দিষ্ট করেছিল আমার রূপসাজ।
অনাদি প্রকৃতির নিবিড় রহস্যের ঢেউ
কতবার...কতবার খেলা করেছিল
আমার খোলা চুলে।
আর তারপর,
প্রথম সূর্যাগ্নির দিকে চোখ মেলে
আমার প্রত্যয়ী ঠোঁট
উচ্চারণ করেছিল সেই তীব্র শব্দ স্রোত
যার অভিঘাতে
সমস্ত নির্দেশিত পথ
চিনে নিয়েছিল নতুন গন্তব্য
উন্মুখ গতিতে
বাতাসও কেঁপেছিল অশ্রুতপূর্ব ঘোষণায়-
সমস্ত উৎসব আজ সেখানেই
ঈশ্বরীর সাজে যেখানে গান গায়
এক নির্বিকার মানবীহৃদয়।