“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

বুধবার, ১৩ মে, ২০১৫

সুরমা গাঙর পানি --ভাটি পর্ব ৫

(দেশভাগ এবং পরের দশকের কাছাড় সিলেটের প্রেক্ষাপটে রণবীর পুরকায়স্থের এই উপন্যাস ছেপে বের করেছে দিন হলো। ভালো লাগা এই উপন্যাস পুরোটা টাইপ করে তুলে আমার প্রিয় কথা শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। আশা করছি আপনাদের সবার এটি পড়তে ভালো লাগবে। সম্পূর্ণ উপন্যাসের সংলাপ ভাগটি সিলেটিতে -সে সম্ভবত এই উপন্যাসের সবচাইতে আকর্ষণীয় দিক। আপনাদের পড়বার সুবিধে করে দিতে, ঈশানে এই উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে আসছে। আজ তার পঞ্চম  অধ্যায় ---সুব্রতা মজুমদার।)


  

           বাবুদের ভাষায় সিলেটকে শ্রীহট্ট বলতে পারে না বৈতল । জোড়া জোড়া অক্ষর দিয়ে বানানো শব্দ যেন কিছুতেই হাটেমাঠে জলের আঁশটে গন্ধে মানানসই হয় না । তবে হ্যাঁ সিলেট বড় সুন্দর । সুরমা নদীর চান্নিঘাটও দেখতে বড় মনোরম । ঘাট থেকে উঠেই সোজাসোজির পথের উপর এক মস্ত ঘড়ি , বলে আলি আমজদর ঘড়ি । সিলেটের সুন্দর চান্নিঘাটর সিঁড়ি আর আলি আমজদর ঘড়ি । দুটোই বৈতলের কাছে নতুন , এত মনোরম নদীর বাঁধানো সিঁড়ি দেখেনি , আর ঘড়িতো দেখেইনি জীবনে । নদীর উপর ধনুকের মতো একটা লোহার পুল এর ওপারে ইস্টিশন । কিনপুল পেরিয়ে এপারে পড়লেই বন্দরবাজার জিন্দাবাজার আর কালীঘাটে শুধু মানুষের ভিড় , দোকানপাটের হল্লা । শহরে নাকি গাড়ি ঘোড়া প্রচুর থাকে , সিলেটে গাড়ি খুব কম , ঘোড়ার গাড়িতে সুন্দর সুন্দর মানুষ যায় , সালু কাপড়ের ঝাঁঝরঘেরা গাড়িতে যায় বড় বাড়ির বৌঝিরা । সাইকেল চড়ে মানুষ , কিনপুলের উপর পিলপিলিয়ে সাইকেল চলে । সাইকেল দেখে লোভী বৈতলের লোভ হয় একটা হাতিয়ে নেওয়ার । সিলেটের ছোট ছোট গলি মহল্লাগুলি ঘুরে বেড়াতে সাইকেল খুব কাজের জিনিস । তবু এমনি হেঁটে হেঁটে সব রাস্তায় ঘুরেছে বৈতল । সিলেটের পাড়াগুলিও তাদের গ্রামের মতো , বইয়াখাউরিতে কোনও পাকা সড়ক নেই, সিলেটের পথগুলি সব ছবির মতো । নদীর পারে চালিবন্দর শেখঘাট থেকে দরগা মহল্লা । শাহজালালের দরগায় গিয়ে বৈতল মায়ের জন্য নতুন করে দোয়া প্রার্থনা করে । আগের বার মৌলভীবাজার থেকে পানি  পড়া নিয়ে বলেছিল শাহী ইন্দারার জল । মসজিদ দেখে তো বৈ তল অবাক , এত বড় দরগা সে দেখেনি জীবনে । কী বিশাল ডেকচি , ডেকচিতে বিরিয়ানি বানায় । বিশাল বিশাল সব গজার মাছকে ছোলা খাওয়ায় , পিরের কাছে মিনতি করে দোয়া কর দাতা , আমার মারে বালা করি দেও । বাসুদেব বাড়ির প্রাঙ্গণে হরিবোলের সংকীর্তনে মেতে ওঠে । জলে ঘেরা ভাটির দেশের বৈতল প্রাণভরে দেখে সিলেটের গলি । মাছুদিঘীরপার তোপখানা কাজির বাজার কাষ্টঘর জামতলা আর অনেক দূরের শুঁটকির বাজার মাছিমপুর । মাছিমপুরের বেপারিদের সঙ্গে দরদাম করে , জেনে যায় পাইকারদের লাভ । এবার বাপের সঙ্গে ভাড় করে নিয়ে আসবে সোজা মাছিমপুর । হেঁটেও আসতে পারে , মাছিমপুর বাজার লাগোয়া সুরমানদীর ঘাটও আছে । নৌকো করেও আসা যায় । বৈতলের মাথায় অন্যচিন্তা , সাইকেল করেও তো আসতে পারে , দুচাকার সাইকেলে অনেক মাল উঠানো যাবে । তিন চাকার এক আচানকি সাইকেলও আছে সিলেট শহরে , সওয়ারি টানে । মেয়ে বিবিদের নিলে ঘোড়ার গাড়ির মতো শাড়ি কাপড়ের ঝাঁঝর বেঁধে দেয় , বলে রিক্সা । রিক্সা অনেক বড় , নিয়ে যাওয়া যাবে না বইয়াখাউরি । কিন্তু সাইকেল একটা চাই তার , বায়স্কোপ একটাও দেখবে । একটা টিংটিঙে লোক টিনের চোঙ মুখে লাগিয়ে তুফান মেল তুফান মেল হেঁকে যাচ্ছে , তার পিছনে আর একটা লোক বাঁশের চাটাইএ সাঁটা এক কাগজ বাঁশে বেঁধে নগর সংকীর্তনের মতো ঘুরছে , কাগজের ছবিটা চেনে , কাননবালার , তুফান মেল সিনেমা । টকি হাউসে দেখানো হচ্ছে । টকি হাউসে এসে কেন যে মনটা দোটানায় পড়ে । বাপের ধাত পেয়েছে বৈতল , একসঙ্গে অনেক কাজ করা পছন্দ করে না বাপ । বলে, দুই নাও চড়ে , উফিনত অইয়া মরে । কোথাও একটা হারামজাদাও জুড়ে দেয় বাপ । এখানে এই সিলেটের বিদেশে বৈতল বায়স্কোপ দেখা বাতিল করে , হলের সামনে হাম্বার সাইকেলটাই দেখে । লুলা বলেছিল সিলেটের পথে ঘাটে পয়সা , কই কোথাও ছড়ানো কিছু পায় নি বৈতল । সাইকেলটাই একমাত্র রয়েছে অনেকক্ষণ মালিকহীন । যেই ভাবনা সেই কাজ । সাইকেলের চাকায় যে তালা লাগানো থাকে জানে না বৈতল । তালা ভাঙলেও চড়ে যে পালাবে সে উপায় নেই , চালাতেও তো জানে না । পুলিশই ধরে সরাসরি । পেটি কেসএ চালান হয় বৈতল । পুলিশ নাম বলতে বলে , বৈতল বলে লুলা দাস , গ্রাম মিরাশী, পরগনা খিত্তা । সব উল্টোপাল্টা বলার বুদ্ধি তার আছে । নাম লেখে না , টিপসই করে । ছেড়ে দেয় জজ , দুদিনের হাজতবাস তো হয়েই গেছে । জজের পেশকার ছাড়ে না , নিয়ে আসে বাড়ি । বিনা পয়সার বেগার শ্রমিক ।

      বৈতল দাড়িয়াপাড়ার পেশকার বাড়ি থেকে সোনার মাকড়ি নিয়ে পালায় সাতদিনের মাথায় । পেশকার কামিনী দাম-এর মেয়ের কানে জ্বলজ্বল করে সোনার গয়না । বইয়াখাউরির তুলসীতলায় সন্ধ্যাবেলা বাতি জ্বালে বৈতলের মা । মাটির প্রদীপে আলোকিত মায়ের মুখখানা বড় সুন্দর দেখে বৈতল । বাবুর বাড়ির মেয়েটির মুখখানিও বড় মিষ্টি , ফর্সা । নাম বুড়ি ।

পাশের বাড়ির শ্যামলা মেয়ের নাম হাসি । কপাল দোষে বৈতল বুড়ির বাড়ি গরুরাখালি করে । ভুলের প্রায়শ্চিত্ত । সারাদিন গরুর পিছনে ঘুরে পুকুরে পড়ে সন্ধ্যেবেলা । আর পলায়নের ফন্দিফিকির আঁটে । পালিয়ে গেলে একটা দুঃখ থাকবে বৈতলের , বুড়িকে আর দেখতে পাবে না সকাল সন্ধ্যা । পুকুর পারে খেজুর আর আমলকি গাছের নিচে জলে ভাসতে ভাসতে পরনের গামছা দিয়ে ছোট ছোট মাছও ধরে দেয় প্রতিদিন । বলে একদিন বড়মাছও ধরে দেবে, ঘাঘট । পেশকার হাসে, বৈতল বুঝে বিদ্রূপের হাসি । এইটুকুনি ছেলের কর্ম নয় । বৈতল জানে একপাল রিটা আছে পুকুরের মাঝখানে । হাসলে পরে আর তুলবে না মাছ । ডুব দিয়ে মনকে শান্ত রাখে বৈতল । ডুব থেকে উঠে শোনে বুড়ি আর হাসির খিলখিল । রোজ আসে এই সময় । বুড়ি বন্ধুটিকে নিয়ে বাড়ি যায় না । শানে বসে হাসে , আর আমলকি কুড়িয়ে খায় । আজলায় জল তুলে মুখে দেয় । একজনের খাওয়া ফল অন্যজন খায় । বৈতল ওদের অকারণ কথা, হাসি শুনে উদাস হয় । লুলার কথা মনে পড়ে । হিংসে হয় , মনে মনে বলে, তারও বন্ধু আছে । কালো মেয়ে হাসি অনেক গল্প জানে । বলে,

--- ছাতক থাকি দেখা যায় এক পাহাড় । পাহাড়ের নাম সেরা । সাহেবে কয় চেরা ।

--- ছি ছি কিতা কছবে ছেরা নি ।

--- না বে, চেরা , চেরাপুঞ্জি । দুনিয়াত সব থাকি বেশি বৃষ্টি অয় । অউ পুঞ্জির এক রাজা আইছিল ছিলট । চান্নিঘাটর সিড়িত বইয়া খুব অ্যাওলা খাইত বেটায় আর ঘাট তানি পানিও খাইত । খাইয়া কয় অলা মিঠা । আবার খায় অ্যাওলা , আবার খায় পানি । পুঞ্জিত তো অ্যাওলাও নাই পানিও নাই । বন্দরবাজার থাকি তিনশ পঁয়ষট্টিটা পিতলর কলসি বানাইয়া মিঠা পানি লই গেল বেটায় পুঞ্জিত । আবার আইব কইছে এক বছর পরে । অলা আড়ুয়া ।

--- অউ নি তর গপ । ইতা হুনছি । অখন গান শুনাইলা একটা ।

    পেশকারের মেয়ের গানের গলাও মিষ্টি । হাসির অনুরোধে গায় কানন বালার গান , আমি বনফুল গো । দুই বন্ধুর জলসায় বৈতল খাপটি মেরে শোনে শুকসারির গান ,

--- বৃন্দাবন বিলাসিনী রাই আমাদের রাই আমাদের ।

কালো মেয়ে হাসি একটু ছটফটে । শুকশারি শেষ হতেই ধরে অন্য গান ।

---পুবেতে বন্দনা রে পুবে ভানু করিয়া রে

   পশ্চিমে বন্দনা রে- মক্কা মদিনা রে

    ইশ্‌ কী মশারে বুড়ি তোর পুকইরো ।

--- ভালাউ অইছে তরে কামড়াইছে । অখন ইতা মক্কা মদিনা গাওয়ার সময় নি ।

 মক্কা মদিনা হউক নবদ্বীপ বৃন্দাবন হউক কেউ মাঝপথে গান থামিয়ে দিলে রাগ হয় বৈতলের । পুকুরের জলে লুকিয়ে না থেকে এবার সেও ধরে গান,

 --- হাওরর মাঝে আকালুকি বন্দিরে

       মাছের মাঝে রউ আর চিতল রে

       মই এক অধম রে নাই কুনু গেয়ান রে

       কী শুনাইমু আমি মুখমতি রে

       তে যদি দয়া করি রে আউলা ঝাউলা কথা রে

  দুই সখীকে অবাক হওয়ার সময় না দিয়েই পনের বছরের বৈতল মান্যগন্য বড় মানুষের মতো বলে,

--- তিন হাঞ্জার সময় তোমরা পুকইরো বই রইছ কেনে । মশায় ধরত কেনে, বাঘেও ধরত পারে । ভূতে ধরলে আমি কিন্তু ভাগমু ।

ধলা বুড়ি বৈতল থেকে বড় না হলেও পাকামির ভাব আছে নামের মতো । বলে,

--- তোরেও তো ধরতে পারে ।

বৈতল বলে,

--- আমারে ধরত নায় । আমি মাছুয়া । মাইমল ।

--- মাইমল । তুই বাঙাল নি ।

--- না, আমি পাটনি । পাটনি আর মাইমল একতাউ । গরিবর ইন্দু বাঙাল নাই ।

--- তেউ । মাইমল পাটনি অইলে কিতা ।

--- মাইমলরে ভূতে ধরে, মশায় ধরে না ।

--- ধুর বেটা পগা ।

--- পগা কইলায় নি আমারে । তে হুন এক পরস্তাব । এক বিটলা বুড়ায় কইছলা ।

--- কিতা  কইছলা ।

--- জালুয়া হকলে তো রাইত জাগিয়া মাছ ধরইন । আর উঙ্গাইন । মাছর মুড়ি চাবাইয়া খাওয়ার সময় মনো করোনি মাইমলর কষ্ট । বানে পানিয়ে মশার কামড়ে তারা তুমরার পাতো গজ পেটি আর মুড়ি উঠাই দেয় । তারার কষ্ট কেউ হুনে না । তারা একজনরে একবার পাঠাইলা মা মনসার কাছে । হে কইল গিয়া আইরে , হুনো বেটি , তুমি অইলায় মহেশ্বরর বেটি, তুমার আর কিতা । তুমি আমরারে দেখতায় পারো না । তুমি আমরার আসল মা নায় , তুমারে চন্দ্রধরে বাউ হাতে ফুল দেয় , চেঙ মুড়ি কানি কয় , ঠিক অউ । বিষরিয়ে তো হক্কলতা বুঝইন , কইলা , কিতা অইছে ক । হে কইল, আমরা রাইত জাগিয়া মাছ ধরি আর আমরার খালি ঘুম পায় , মাছ না ধরলে খাইতাম কিতা, খাওয়াইতাম কিতা তুমার বাবু হকলরে । পারলে আমরার ঘুম কমাই দেও । আমরার লগে থাকি থাকি মা বেটিও পেরত অই গেছিল , বগলো কমরো মাটি , কাম নাইতে খালি ঘষে । ঘষি ঘষি সোনার অঙ্গর জিলকানি বার করে । মার আতো আছিল তখন কমরর মাটি এক চিমটা । মাইমলর আতো দিলা , কইলা , যা রে পুত গাইল্লাইছ না, ঘুম কমব । অউ থাকি মশার জন্ম , এক চিমটা কালা মাটি আরি । তার পরে আর কিতা, পাটনির গাত তো মশা বইবউ । কও ?

 বুড়ির বন্ধু হাসি খুব খুশি হয় । বলে,

--- বাক্কাউতো কিচ্চা কয়, পুয়া ইগু কিগুরে ।

--- তুমি আমারে চিন না, আমি তুমারে চিনি ।

--- কচাইন আমি কে ।

--- তুমি আমারে দেখি হাস নি ।

--- না, আমি হাসি না ।

--- অউত্ত তোমার নাম ।

--- ধুর বৈতল । ইগু কিগু কছ্‌না বুড়ি ।

--- গাইল্লায় লায়নি ।

   বৈতল সচেতন হয় । তার নাম রহস্য নিয়ে মজা করা যাবে না । সে এখানে লুলা , লুলা দাস । আর তখনই পেশকার বাড়ির বুড়ি আলদের লেজ মাড়িয়ে দেয় । বন্ধু হাসিনাকে বলে,

--- কেনে দেখছচ নানি । ইগু চুর । অখন আমরার চাকর ।

    তখনই বুড়ির কানের  মাকড়ি দুটোর সোনারঙে আগুন ধরে । কেউটের বিষ নামিয়ে আনে বৈতল জিভে । বলে,

--- চুর কারে কছ । চাকর কারে কছ । চাকর তো তোর বাপ, হাকিমর গোলামি করে, আবার বড় বড় মাত । তোর কিতা বেটি অত ফুটানি ।

    সোনারবরণী মেয়ের দুই কান ছিঁড়ে মাকড়ি নিয়ে ভাগে বৈতল । সিবিল হাসপাতালের পাঁচিল টপকে দৌড় । দে দৌড় । দৌড়ে গিয়ে ঝপাং চাননি ঘাটের সুরমা নদীতে ।

চলবে
< ভাটি পর্ব ৪ পড়ুন                                                  ভাটি পর্ব ৬ পড়ুন >


ব্যতিক্রমী অপেক্ষা

||শমীক চৌধুরী ||















ব্যতিক্রমী কলসি ফুটো হলে
ছড়িয়ে পড়ে অন্যধারা চারপাশে |
ফুটপাতে জমাট বাধে চাপ চাপ।
নির্বাক ,বিমূঢ় প্রতক্ষদর্শী সব
সংবিত ফিরে পেলে করে রব ।


আরেক জীবন বিঘ্নিত হয়।
আর -
তার সাথে আরো অনেক জীবন।
ব্যতিক্রমী ধারা থেমে থাকে না ,
যা আজকের মত স্তব্ধ হলো; তার কোলাহল
ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে , দূরে দূরান্তে।
তরঙ্গ হয়ে ফিরে আসার অপেক্ষায় -

কুশিয়ারার ধারে


 
(C)Image:ছবি

















।। শিবানী দে।।
মেঘ-চূড়ো নীল পাহাড়েরা ঘিরে রাখে
সেই এক অতি মনোরম স্থান,
ঘুম ভাঙ্গে ভোরে আজানের সুরে
  সাঁঝবেলা কীর্তনগান ।

সুন্দরী কুশিয়ারা মন্থরে বয়ে যায়,
লঙ্গাই ধলাই  মধুরার তাড়া,
তারি পারে পারে সুপারি বনের ধারে
খড়ে ছাওয়া ঘর মধু-ঝরা ।

গাছ-গাছালির ফাঁক দিয়ে
সূর্য উঠছে ছায়া আলপনা এঁকে ,
সন্ধ্যা আকাশে লক্ষ তারার বাতি,
জোনাকি আলোয় পথিকেরা পথ দেখে ।

টিলার কোলেতে ধানখেত পাশে
আনমনে বসে দুই পা ছড়ায়ে
রাখাল বাজায় বাঁশরিতে সুর,
ভোলা গরু আনে ফিরায়ে ।

ফাল্গুনে ডাকে কোকিল বউ-কথা-কও,
গ্রীষ্ম সাজায় ডালি ফুলে ও ফলে,
বর্ষায় দ্বীপ জেগে থাকে টিলাগুলো,
কাঁঠাল-বোঝাই নৌকো চলছে বিলে ।

শরতে শিশির সকাল সন্ধ্যাবেলা
টুপটাপ ঝরে টিনের চালের পরে,
শিউলি গন্ধে দিগন্ত মাতোয়ারা,
পেঁচার পৃষ্ঠে লক্ষ্মী নামছে ঘরে।

বাঁকে গাঁথা দুই সোনালি ধানের ভার
ঝন ঝন বাজে, আলপথে চলে চাষি,
নবান্ন হবে আজকে অথবা কাল,
ঢেকির শব্দে মিশে যায় কলহাসি ।


স্বপ্ন আমার তেমনি মিলিয়ে গেল
ভোরের কুয়াশা যেমন মিলায়ে যায়,
অনেক বছর কেটে গেল তার, তবু
কুশিয়ারা বয়ে চলে সকাল ও সন্ধ্যায় ।


(কবিতাটি করিমগঞ্জের নববার্তাপ্রসঙ্গ পত্রিকাতে বছর তিনেক আগে প্রকাশিত হয়েছিল)


মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০১৫

বসন্তরাগ


 ।। দেবলীনা সেনগুপ্ত।।

(C)Image:ছবি













মার প্রতিটি বসন্ত
আমি তোমাকে দিলাম
সেইসব বসন্ত
যা ফুল না ফুটিয়েও আসে
নুড়িপথ ধরে
উপল সমারোহে
বালিয়াড়ি অসুখ সারিয়ে
অসহ্য সুখ আনে চোরাস্রোতে,
জ্যোৎস্না স্নান সেরে
সোনা রূপো গুঁড়ো হয়ে
ঝরে পড়ে বিরল শস্যক্ষেতে
দ্বিধাহীন বোনে স্বপ্নবীজ
হৃদয় পুড়িয়ে তবু হৃদয় সজীব।
সেইসব বসন্ত
 যা অকাল ও অনাদৃত
তোমাকে দিলাম-
নিঃশর্ত নিষ্ঠায়
তবু অবাধ্য ঈর্ষায়
শুধু তোমাকেই দিলাম

ক্রসিং ব্রীজেসঃ এক সৎ , অভিসন্ধিহীন যাত্রা


     ৩ মে, ২০১৫ যুগশঙ্খ, রবিবারের বৈঠকে লেখকের নাম ছাড়া প্রকাশিত
।। মৃন্ময় দেব ।।
   

দিল্লি বিধানসভার নির্বাচনের ঠিক প্রাক-মুহূর্তে ভাজপা’র ভিশন ডকুমেন্টে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রসঙ্গে Immigrants from north-east শব্দ-বন্ধের ব্যবহার নিয়ে হাওয়া বেশ গরম হয়েছে। ভারতবর্ষের মূল ভূখণ্ডের প্রেক্ষিতে  উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অবস্থান তথা এখানকার মানুষের পরিচয় নিয়ে নানান প্রশ্ন ও সংশয় মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশও  ঘটেছে স্বাভাবিক কারণেই। অনেক অবাঞ্ছিত প্রশ্নচিহ্ন অঙ্কিত হয়েছে ভাবুক মনের আনাচে-কানাচে। এসব সবারই জানা, নতুন করে বলার নয়। তবু এখানে এ প্রসঙ্গের অবতারণার এক ভিন্ন তাৎপর্য রয়েছে।
          না, কোনও রাজনৈতিক নিবন্ধের প্রস্তাবনা হিসাবে উপরের কথাগুলো বলা হয়নি। কথাগুলো  মনে এসেছে ২০১৩ সালে রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অরুণাচল প্রদেশের  Sange Dorjee Thongdok  নির্মিত  Crossing Bridges সিনেমাটি দেখতে দেখতে। এই অসাধারণ সিনেমাটি যারা দেখেছেন তারা অবশ্যই আমার সাথে একমত হবেন যে আত্মপরিচয় সংক্রান্ত অনিবার্য এবং জরুরি কিছু প্রশ্ন ও প্রসঙ্গ ফিল্মটির অস্থি-মজ্জায় জড়িয়ে আছে। অথচ এই ভিন্ন গোত্রের অসামান্য ফিল্মটির বিষয়ে অনেকেই জানেন না, এমনকি সিনেমা-প্রেমীদের অনেকেও! এ নিয়ে আমাদের এই অঞ্চলেও তেমন আলোচনা লক্ষ্য করা যায়নি সেভাবে। এটা শুধু দুর্ভাগ্যের নয়, লজ্জারও। উত্তর-পূর্বাঞ্চল প্রসঙ্গে মূল ভূখণ্ডের অধিবাসীদের বিরুদ্ধে যে অবহেলা-উদাসীনতার অভিযোগ নিয়ে আমরা সতত সোচ্চার, সেই আমরাই কি যথেষ্ট মনোযোগ সহকারে ফিরে তাকাই আমাদের ঐতিহ্য ও ঐশ্বর্যের প্রতি ? দর্শকের উদ্দেশ্যে এই জরুরি এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিতেও ইতস্তত করেন না ফিল্মের পরিচালক।    
            আমাদের সিনেমা দেখার এ পর্যন্ত অর্জিত যাবতীয় অভিজ্ঞতা মুখ থুবড়ে পড়ে Crossing Bridges  দেখতে গিয়ে। কীরকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছি তার সামান্যতম পূর্বানুমান দীক্ষিত দর্শকের পক্ষেও অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। না, এর নেপথ্যে নেই নির্মিতির কোনো কেতাদুরস্ত কায়দা, কিংবা দর্শককে বোকা বানানোর ফিল্মি চাতুরি। নেই নাটকীয় উপাদান, রোমাঞ্চকর কোনো  উন্মোচনও নেই। তবু, দেখতে দেখতে অরুণাচল প্রদেশের অনুপম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ডুবে যাওয়ার সাথে সাথে হারিয়ে যেতে হয়  সহজ সরল জীবনযাত্রার গহনে। এক অভূতপূর্ব প্রশান্তি সিনেমাটির অনন্য সম্পদ। ফিল্মের কাহিনি বলতে মহানগরের এক কর্মচ্যুত যুবকের ঘরে ফেরা ও শেকড় খুঁজে পাওয়ার মর্মস্পর্শী মানবিক বিবরণ। যাত্রা বলাই সঙ্গত, নিজস্ব শেকড়ের দিকে এক অভিসন্ধিহীন যাত্রা। আর সে যাত্রার অনুষঙ্গে  Crossing Bridges  নামকরণও এক ভিন্ন মাত্রা অর্জন করে। 
            ওয়েব ডিজাইনার তাসি (Tashi) এক বছর যাবৎ মুম্বাইতে বেকারজীবন কাটানোর পর অনন্যোপায় হয়েই গ্রামে ফিরে আসে,  যে গ্রামের সঙ্গে তার সংযোগ ছিন্ন হয়েছে বছর আটেক। গ্রামের মন্থর জীবন পদ্ধতিতে অসহায় বোধ করে তাসি, যদিও তার পরিবারের সবার ইচ্ছে সে গ্রামেই থাকুক, খামারের দেখাশোনা করুক। তাসি অপেক্ষা করে আইনজীবী বন্ধু অমিতের ফোনের, যে তাকে নতুন কর্ম সংস্থানের সুসংবাদ জানাবে। গ্রামে মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। কেবল বিশেষ এক স্থানে, পাহাড় চুড়োয় বৌদ্ধ মঠের কাছে তা পাওয়া যায়। মুম্বাই মহানগরের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামটির প্রান্তিক অবস্থান এতেই প্রতিষ্ঠা পায়। তাসি স্বভাবত হাঁপিয়ে ওঠে,  সময়  কাটানোর জন্য একটা ব্যাটারি চালিত টেলিভিশন (যেহেতু গ্রামে ইলেক্ট্রিসিটি থাকে দু’দফায় মাত্র ঘণ্টা দুয়েক) কিনে নিয়ে আসে বন্ধুর সহায়তায়। তাসির বাবা শুরুতে বিরক্তি প্রকাশ করলেও ক্রমে টিভির নেশা তাকেই পেয়ে বসে। এ নিয়ে মৃদু কৌতুকও উপভোগ্য। 
           এরই মধ্যে তাসি, গ্রামের স্কুলে পরিবর্ত-শিক্ষক হিসেবে যোগ দেয়, কিছুদিনের জন্য। শিশুদের কারো  কারো সরল প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে  হিমসিম খায়, প্রশ্ন জাগে নিজের মনেও। সহকর্মী মেয়েটির (অনিলা) সাথে হৃদ্যতা বাড়ে। জানা যায়, মুম্বাইতে  চাকরি হারানোর সূত্রে তাসি তার প্রেমিকাকেও খুইয়েছে। মহানগরে সবকিছু খুইয়ে ফিরে আসা তাসি একটু একটু করে ক্রমশ গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে একাত্ম হতে থাকে। ল্যাপটপে চ্যাপলিনের সিনেমা দেখিয়ে স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের বড় আপনার জন হয়ে ওঠে সে। অন্যতর অর্থ খুঁজে পেতে শুরু করে জীবনের। প্রায় অলক্ষ্যে, গোপনে এই অন্তর্বিপ্লব ঘটতে  থাকে। যেন, বদলটা হয় অন্ধকারে। একদিন অনিলাও চলে যায় অন্যত্র, কিন্তু তাসির অন্তরে অন্য আলো জ্বেলে দিয়ে যায়। পাহাড়ি নদীর উপর গাছের গুঁড়ি ফেলে তৈরি ব্রিজ অন্যের হাত ধরে পার হতো অনভ্যস্ত তাসি, অথচ সেই  ব্রিজের উপর দিয়েই এখন সে স্বচ্ছন্দে ও অনায়াসে নদী পার হয় । গ্রামের মানুষ ও পরিবেশের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন সংযুক্তি ঘটে তার, খুঁজে পায় অস্তিত্বের শিকড়, আত্ম-আবিষ্কারের অনুষঙ্গ । অমিতের কাছ  থেকে সুসংবাদ ও ডাক এলেও তাই আর সাড়া দিতে পারে না তাসি, মহানগরের  মায়াবী হাতছানি (গ্রামের মানুষের লৌকিক বিশ্বাস অনুসারেই যেন) এখন আর প্রলুব্ধ করে না তাকে। সে খুঁজে পেয়েছে তার হারানো স্বদেশ, স্বভূমি। 
            ফিল্ম শুরু হয় দারুণ এক লঙ শট দিয়ে। একটি নিঃসঙ্গ ব্রিজের দৃশ্য। মুহূর্ত কয়েক পরেই, ব্রিজের ওপারে পাহাড়ের গা  ঘেঁষে, অসামান্য এক নিসর্গ দৃশ্যের ভেতর অনুপ্রবিষ্ট পরিবহন নিগমের রঙচটা বাসটিকে ধীর গতিতে এগিয়ে আসতে দেখা যায়।  বাসের জানলায় তাসির মুখ। শুরুতেই একটা মুড তৈরি করে দেন পরিচালক, অবলীলায় ১০২ মিনিটের যাত্রার সঙ্গী করে নেন দর্শককে। সাত আট বছর আগে ছেড়ে যাওয়া নিস্তরঙ্গ নিষ্কলুষ গ্রামটিতে তাসি প্রবেশ করে পর্যটকের মতন। ক্যামেরা স্থির ও ঋজু ভঙ্গিতে ধরে গ্রামের প্রায় স্থবির জীবনযাত্রাকে। মায়ের দেওয়া চা বিস্বাদ লাগে তাসি-র, গ্রামের জীবন ও সংস্কৃতি অচেনা মনে হয়। স্মৃতিভ্রষ্ট সে, স্বর্গচ্যুত। (দর্শকের আশা আকাঙ্ক্ষায় জল ঢেলে দিয়েই) পর্দায় এর অতিরিক্ত ও ‘দারুণ’ কিছু ঘটে না। কোনো উত্তেজক মুহূর্ত, কোনো নাটকীয়তা খুঁজে পাবেন না দর্শক। গ্রামের মানুষগুলোর ঘটনা বিহীন একঘেয়ে জীবনযাত্রার টুকরো-টাকরা ছবি, লৌকিক বিশ্বাস, সংস্কার-কুসংস্কারের  পাশাপাশি এক চিলতে অস্ফুট প্রেম, ইত্যাদি উপাদান সম্বল করেই তাসির রূপান্তরের ইতিবৃত্ত বিবৃত হয় সহজ সাদামাটা ভাষায়। ভঙ্গি দিয়ে ভোলানোর বিন্দুমাত্র প্রয়াস নেই, এমনই সরাসরি, সোজা-সাপটা ন্যারেশন। তা সত্ত্বেও পরের দৃশ্যটি সম্পর্কে অগ্রিম অনুমান একেবারেই অসম্ভব। পরিচালকের স্বকীয়তা এখানেই।  
             অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফি এ ছবির সম্পদ। এই কৃতিত্বের দাবিদার অবশ্যই পূজা গুপ্তে। Canon 5D ক্যামেরায় শ্যুট করা এ  ছবি। সংলাপ ভৌমিকের সম্পাদনা যথাযথ। অরুণাচলের মন মাতানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। প্রকৃতি এ ছবিতে পটভূমি মাত্র নয়, জীবন্ত চরিত্র হয়ে উঠেছে যেন। ১০২ মিনিট দৈর্ঘ্যের এ ছবি ভীষণ স্বল্প-বাক, নৈসর্গিক প্রশান্তি খর্ব হয় তেমন মুখরতা সচেতন ভাবেই বর্জিত। খুব ছোট অথচ অর্থবহ সব সংলাপ। অরুণাচলের আঞ্চলিক ডায়লেক্টে (Shertukpen) তৈরি প্রথম ফিচার ফিল্ম এটি। একেবারেই স্বল্প বাজেটের। যতটা জানা গেছে, দায়বদ্ধতা থেকেই আর্থিক দায়ও বহন করেছেন দর্জির পরিবার। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অভিনেতার বদলে না-অভিনেতাদের দ্বারাই রূপায়িত হয়েছে অধিকাংশ চরিত্র।             
             আমি স্থির নিশ্চিত, ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে এই অব্দি যারা পাঠ করেছেন তারা নির্ঘাৎ ভাবছেন যে এর মধ্যে এমন ‘আহা মরি’ কী-ই বা আছে। না, কাহিনির যে প্লট উপরে বর্ণিত হয়েছে তার চিত্রায়নেও, সিনেমায়, আপনারা খুঁজে পাবেন না কোনো পরিচিত ফর্মুলা, অথবা কোনো ধ্রুপদী উৎকর্ষের নিদর্শন। কোন নাটকীয় মুহূর্ত, মেলোড্রামা, আবেগের উচ্ছল ক্ষণ, কিংবা তাক লাগিয়ে দেবার মতো বিচ্ছিন্ন কোন অসাধারণ শট অথবা কম্পোজিশন।  কিন্তু পেয়ে যাবেন অপলক তাকিয়ে দেখার অমল অবকাশ। নিতান্ত সহজ ও সরল, অথচ সাবলীল এক ফিল্মি ভাষায় জটিল জীবনের জলছবি এঁকে যান Dorjee , SRFTI (Satyajit Ray Film Institute), Kolkata প্রত্যাগত এই তরুণটি ! সমগ্র ছবিটি জুড়ে থাকে অনুভবী ক্যামেরার মরমি পরশ। রাতের কলি যেমন অজানিতে ভোরের ফুল হয়ে ফোটে, আর আমরা বিস্ফারিত চোখে চেয়ে দেখি, এও ঠিক সেরকম। আমাদের দৃষ্টির সামনে অথচ আমাদের অজানিতেই, যেন এক সামুদ্রিক সমগ্রতা নিয়ে, এক প্রাণময় প্রশান্তি নিয়ে পরতে পরতে উন্মোচিত হতে থাকে অপাপবিদ্ধ প্রকৃতি ও জীবন। হতবাক করে দেয়   দর্শককে। এ কেবল মুগ্ধ ও মোহিত হওয়া নয়, তারও অতিরিক্ত কিছু, অন্যতর কিছু। এক অনন্য অভিজ্ঞতা। পাঠক, মার্জনা করবেন, সে অভিজ্ঞতার শাব্দিক অনুবাদ বর্তমান কলমচির সাধ্যাতীত। তবু, নিবন্ধ রচনার এই ব্যর্থ প্রয়াসের পেছনে যুক্তি শুধু এই যে,  ঘটনাচক্রে ঘরের পাশে ধানের শীষে যে শিশির বিন্দু দেখেছি তার সংবাদ সংবেদনশীল হৃদয়ের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তার অতিরিক্ত কিছু নয় !   


রবিবার, ১০ মে, ২০১৫

জিজ্ঞাসা ...

রাইত থাকতেই আরম্ভ হইছে
মাইকে মাইকে গান আর কতা
বিরাম নাই ... কী গো বাবু
আইজও কিতা পন্‌র আগষ্ট?
পঁচিশে বৈশাখের সকালে
আমার মুড়ি-মাসির জিজ্ঞাসা
বললাম - না গো মাসি
আইজ পন্‌র আগষ্ট না, তবে
হেইডার বাপ - কাকার মতো ...

শনিবার, ৯ মে, ২০১৫

উনিশের স্বপ্ন (গল্প না হলেও, প্রবন্ধ নয়)


।। অরূপ বৈশ্য ।।
            
        
(C)Image:ছবি
   
উনিশের স্বপ্ন
(গল্প না হলেও, প্রবন্ধ নয়)
অরূপ বৈশ্য
আমি এই কাহিনীর নায়ক। কিন্তু চারপাশের লোকরা তা মানতে রাজি নয়। কাছের ও দূরের কোন জনপদের মানুষই এই নায়ককে চেনে না। আমি কিংবা আমি নয় এ দুয়ের দ্বন্দ্ব সমাধান করার দায় আমার নেই। আমাকে জীবনের পথ চলতে হয়, তাই এগিয়ে যাই। লোকে কী বলে তা জানার আগ্রহ আমার নেই। তথাপি আমি জানি যে লোকে আমাকে এক অদ্ভুত প্রকৃতির মানুষ বলেই জানে। এই জানা পীড়াদায়ক বটে, কিন্তু তা আমাকে বদলে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরির জন্য যথেষ্ট নয়। যথারীতি দিনের কাজকর্ম সেরে একরাশ বিরক্তি নিয়ে বাড়ি ফিরি। সন্ধ্যের দিকে যখন নিজের ইচ্ছেমত ঘুরে বেড়ানোর জন্য বেড়িয়ে পড়ি, তখন সব অবসাদ কেটে যায়। সারা দিনের সবার হুকুম তামিল করার বিনিময়ে আদায় হয় জীবনের বিলাসী স্বাচ্ছন্দ্য। জীবনের এই ছন্দে বৈপরীত্য মাথা চাড়া দেয় না, এক অদৃশ্য শক্তি তাকে চেপে রাখে । একমাত্রিকতার ভারে ন্যুব্জ মন খোলা আকাশের সন্ধানে প্রবৃত্ত হয় না। এই কাহিনীর নায়ক সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়ে, এজন্যই কী লোকে আমার এই আমিকে চেনে না?

আগামীকাল ধর্মঘট, আজ সন্ধ্যে থেকেই ফুরফুরে মেজাজ। বিদেশে নাকি সপ্তাহের শেষ দু’দিন কাউকে কাজের কথা বলা যায় না, এই দু’দিন সবাই স্বাধীন। আমিও স্বাধীনতার স্বাদ ভোগ করার আয়েশে নিদ্রা যাই। ভোর হতেই বেরিয়ে পড়ি। হাটতে হাটতে চলে যাই শিলচর রেলস্টেশনের দিকে। এতো লোক সমাগম দেখে চমকে উঠি। বিকট আওয়াজ শুনে বুক ধড়ফড় করে উঠে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, দম বন্ধ হয়ে আসে। আমার হাত বা দিকে হেলে পড়ে। এক মোলায়েম মেয়েলি হাত আমার হাতকে চেপে ধরে। আমাকে নীচের দিকে টানতে থাকে, কাতর আর্তি শুনতে পাই। গোঙানির আওয়াজে ভয় পেয়ে এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নেই। সামনের দিকে দৌড়োতে থাকি। হঠাৎ আমাকে পাঁজাকোলে করে নিয়ে কে যেন হাওয়ায় ভাসতে থাকে। আমি কিছু বোঝার আগেই মেশিনের আওয়াজে কথা বলতে শুরু করে। সে যখন বলে আমিই নাকি কাজের লোক, আমি আহ্লাদিত হই। সেই সব অর্বাচীন, প্রগতি-বিরোধীদের অসংখ্য ভিড় ঠেলে আমি যখন প্রাণপণে পালানোর চেষ্টা করছিলাম, তখনই নাকি সে বুঝে যায় আমিই যোগ্য ব্যক্তি। ওর কথার দিকে আমার বিশেষ মনোযোগ ছিল না। ওর দৌলতে উড়তে পেরে আমার বেশ ভাল লাগছিল। আমরা উড়েই চলেছি। সূর্য অস্তমিত, আঁধার নেমে আসে।

নদীর গা ঘেঁষে সরু রাস্তা। ধু ধু মাঠ, ঝাড়-জঙ্গল, পাহাড়, শেয়াল-কুকুরের নিরবিচ্ছিন্ন ডাক সব মিলিয়ে নিসর্গ-প্রকৃতির এক রহস্যময় আবেশ। অজস্র জোনাকি ও মাঝেমাঝে প্রদীপের আলোয় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঁশ-বেতের দোচালা ঘরগুলো দেখা যাচ্ছে। পথচারীরা এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে, কোথাও গুটিকয় গ্রামবাসী এক জায়গায় জড়ো হয়ে বসে আছে। পাহাড়ের গা ঘেঁসে এই বাসিন্দারাও যেন প্রকৃতিরই অঙ্গ। রোমান্টিক আবেশে সেখানে নেমে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকি। যতই লাফিয়ে পড়ার চেষ্টা করি, শক্তপোক্ত দুটো হাত আমাকে আরও জোরে চেপে ধরে। আমি হাঁপিয়ে উঠি, দম বন্ধ হয়ে আসে, পুনরায় শক্তি সঞ্চয়ের জন্য গা এলিয়ে দেই। হঠাৎ আলোর রোশনাই দেখে চমকে উঠি। নীচে তাকাতেই মন আবার সজীব হয়ে উঠে। প্রশস্ত ঝাঁ চকচকে পথ, ব্যস্তসমস্ত পথচারী এদিক ওদিক ছুটোছুটি করছে। সাঁ সাঁ শব্দে ছুটে চলছে রকমারি যান। বিভিন্ন ডিজাইনের সারি সারি গাড়ির শব্দ প্রশস্ত পথের দুদিকে বিশাল বিশাল অট্টালিকার গায়ে আছড়ে পড়া প্রতিধ্বনিত মূর্ছনা। অত্যাধুনিক শপিং মল, ডিস্কো থেক, বার ক্লাব থেকে দলে দলে মানুষ বেরিয়ে আসছে। রকমারি পোষাকে সজ্জিত ছেলে-মেয়েদের চেহারায় আমোদ-স্ফুর্তির লক্ষণ স্পষ্ট। এখানে আধুনিক সভ্যতা প্রকৃতিকে বাধ্য করেছে দূরে সরে যেতে। আমার অবসাদ কেটে যায়, মনে হয় একটু আগে ফেলে আসা প্রকৃতির নিস্তরঙ্গ জীবন থেকে এ ঢের ভাল। আমাকে বোধহয় এখানেই নামিয়ে দেবে, এই আশা নিয়ে নিশ্চিন্তে গা এলিয়ে দিই। কিন্তু একি, আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে সে এগিয়েই চলেছে। কোথায় যাওয়া হচ্ছে? কোনও উত্তর আসে না। একটা গোপন কথা জানানো হয়নি। আমার একটা অসুখ আছে, মানসিক অসুখ। কোথা থেকে হঠাৎ করে চেতনার এক লহর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে, যন্ত্রণা অনুভূত হয়। ভেসে বেড়াতে বেড়াতে সেই অসুখ আবার আমাকে গ্রাস করে। প্রকৃতির আদিম রোমান্টিকতা ও সভ্যতার আধুনিক ভোগবিলাসের হাতছানি কোনকিছুই আমাকে স্বস্তি দেয় না। চাওয়া পাওয়ার এক অজানা রহস্য মনকে ভারাক্রান্ত করে তুলে। এ কোন চেতনা যা আমার এই অসুখের কারণ?  কিছু কথা আছে যা মানুষ তার আপনজন, এমনকি সে তার নিজেকেও বলতে পারে না। আমার অসুখের পেছনের এই রহস্যের কথা কাউকে বলা যায় না, আমার আমাকেও না। কিন্তু আমার মানসিক যন্ত্রণা যে বেড়েই চলেছে। এই লোকটি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?

অবশেষে লোকটি আমাকে এই পৃথিবী থেকে অনেক দূরে এক অজানা অচেনা পরিবেশে নিয়ে যায়। সম্ভবত কোন ভিন গ্রহে। এখানে সবাই মানুষের মত দেখতে, কিন্তু আচার আচরণ রহস্যময়। সবার মাথায় টুপির মত কি যেন রয়েছে, সেই টুপির চারদিক থেকে আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে। আমাকেও সেরকম একটা টুপি পড়িয়ে দেওয়া হয়। কেউ কোনো কথা বলে না, কিন্তু তাদের নিজ নিজ কাজ করে যায়। মনে হয় যেন একে অপরের সাথে বার্তা বিনিময় করছে, এক নির্দেশাত্মক বার্তায় সবাই কাজ করে চলে। এমনকি জীবনধারণের জন্য যার যতটুকু প্রয়োজনীয় তা এক অলঙ্ঘ্য ও পূর্বনির্ধারিত নির্দেশে ব্যবস্থা হয়ে যায়। যে লোকটি আমাকে নিয়ে এসেছে সবাই যেন জেনে গেছে আমি তার অতিথি। লোকটি আমাকে এক বিশাল প্রাসাদোপম অট্টালিকায় নিয়ে যায়। সে রাজ-সিংহাসনের মত সুসজ্জিত একটি চেয়ারে বসে পড়ে। সেখানে বসার সাথে সাথেই প্রাসাদের বিভিন্ন প্রান্তে ছোট ছোট যন্ত্রে একেকটি দল কাজ করতে শুরু করে। কে কী কাজ করবে তার নির্দেশ কোত্থেকে আসে তা ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। কিন্তু সম্পূর্ণ শৃঙ্খলায় কাজগুলি পরিচালিত হয়। এসব দেখতে দেখতে আমার বিরক্তি লাগে। দীর্ঘ যাত্রায় ক্লান্ত শ্রান্ত আমি ক্ষুধার্ত বোধ করি। আমার এই অনুভূতির সাথে সাথেই আমার সামনে সুস্বাদু খাবারের রকমারি সামগ্রী ও বিশ্রামের জন্য উৎকৃষ্ট আরাম-কেদারা হাজির হয়ে যায়। বিশ্রাম নেওয়ার সময় যারা কাজ করছে তাদেরও খেতে দেখি, কিন্তু তাদের খাবার আমার তুলনায় অত্যন্ত নিম্নমানের। আমি যার অতিথি তার মর্যাদা অনুসারেই আমার জন্য এই ব্যবস্থা। আরাম কেদারায় শুয়ে আছি, হঠাৎ দেখি কর্মরত একটি লোক কাঁপতে কাঁপতে মাটীতে শুয়ে পড়ে। আমি ওকে সাহায্য করার জন্য যাওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও আরাম-কেদারা থেকে উঠতে পারি না। কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই মিলে ওকে একটি কোণে নিয়ে যায় এবং সেখানে ওকে নামিয়ে রাখার সাথে সাথেই ওই লোকটি হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। সবাই আবার যে যার কাজে ফিরে আসে। এখানে সবাই একে অপরের প্রয়োজনীয় কথা বুঝতে পারে, কিন্তু আমাদের পৃথিবীর হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, ঈর্ষা-বিদ্বেষ, সংঘাত-সংঘর্ষ ইত্যাদি সব কিছু এখানে অপ্রয়োজনীয়, অপাংক্তেয়। সবাই এখানে শান্তিতে বাস করে, সবার কথা পূর্বনির্ধারিত ও সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করাই আছে। তাই সবাই সবার কথা বুঝতে পারে। কিন্তু নির্ধারিত সূচী মেনে অত্যন্ত শৃঙ্খলা মেনেই সবাইকে চলতে হয়। আমার আরাম-কেদারা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় ও আমাকে উঠে দাঁড়াতে বাধ্য করে। অবশ্য ততক্ষণে আমার ক্লান্তি ঘুচে গেছে, বাইরে বেড়ানোর ইচ্ছে হয়। কোন নির্দেশ ছাড়াই কিছু করার একটাই পরিসর সম্ভবত এখানে রয়েছে, ইচ্ছেমত ঘুরে বেড়ানোর। একে অভ্যাসে পরিচালিত হওয়ার ক্ষমতা বা স্বাধীনতাও বলতে পারেন।

আমি মাথার টুপিটা খুলে রেখে বাইরে বেরিয়ে পড়ি। এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতেই একজন বৃদ্ধার দেখা মেলে, তিনি যেন আমাকে কিছু বলতে চান। তাঁর ভাষা আমি বুঝতে পারি না, কিন্তু কেউ কিছু বলার চেষ্টা করছে তাতেই যেন আমি কিছুটা স্বস্তি বোধ করি। বৃদ্ধা কী বলতে চাইছেন তা যে আমি বুঝতে পারছি না সেটা অনুমান করে আরেকজন বৃদ্ধকে তিনি ডেকে আনেন। বৃদ্ধ আমাকে জানান তিনি পৃথিবীর ভাষা বুঝতে পারেন, বৃদ্ধার সাথে কথোপকথনে তিনি তাঁর স্ত্রীর প্রতি ভালবাসার জন্য দোভাষীর কর্তব্য পালন করবেন। এখানে এসে এই প্রথম ভালবাসার কথা শুনে আমার কথা বলার উৎসাহ বেড়ে যায়। বৃদ্ধার কাছ থেকে জানতে পারি যে আমি যার অতিথি সে তাঁর সন্তান। কিন্তু সে তার মা ও বাবাকে আর চিনতে পারে না। প্রযুক্তির ভাষাই এখানে একমাত্র ভাষা। তাই বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা পুরোনো জমানার লোক হিসেবে এখানে অপাঙক্তেয়। বৃদ্ধা বলে চলেন, আগে এরকম ছিল না, সবাই সবার সুখ দুঃখে সাথী হওয়ার রীতি ছিল, কলহ-বিবাদ-ঈর্ষা-দ্বেষ এসব যে ছিল না তা নয়। বিভিন্ন গোষ্ঠীর লোকেরা তাদের নিজেদের ভাষায় কথা বলত, কিন্তু অন্যদের সাথে কথা বলার এক সাধারণ ভাষাও ছিল। এখন আর এসব কিছুই নেই, তার প্রয়োজনও নেই। এক কঠোর নিয়মে সব বাঁধা। একদল লোক কাজ করে চলে, কিছু লোক বসে খায়। কিন্তু কারুর বিরুদ্ধে কারুর কোন ক্ষোভ নেই। কিন্তু আমরা যারা পুরোনো প্রজন্মের লোক তাদের জন্য এ এক দমবন্ধকর পরিবেশ। আমাদের কেউ অবজ্ঞা করে না, বেঁচে থাকার জন্য আমাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী আমরা যথারীতি পেয়ে যাই। কিন্তু নিজ সন্তান, আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশীদের আচরণ আমাদের পীড়া দেয়। এই নিষ্ঠুর পরিবেশে বেঁচে থাকার আর কোন আগ্রহ অনুভব করি না। কথা বলতে বলতে বৃদ্ধা ডুকরে কেঁদে উঠেন। আমার অসুখ আবার চাগার দিয়ে উঠে।

 হঠাৎ মাথায় এক বুদ্ধি খেলে। পৃথিবীর বাসিন্দা হিসেবে বাস্তব অভিজ্ঞতা জাত এই বুদ্ধি। আমি বৃদ্ধাকে বলি, আপনারা গোপনে নিভৃতে কেন দিনের পর দিন কেঁদে চলেছেন। আপনাদের মর্মবেদনা প্রকাশ করতে সব বৃদ্ধ-বৃদ্ধা মিলে সর্বসমক্ষে কাঁদুন। তাতে কী হবে? বৃদ্ধা জানতে চান। করে দেখুন না কী হয় আমার এই প্রস্তাবে বৃদ্ধা রাজী হয়ে যান। বৃদ্ধ-বৃদ্ধা বেড়িয়ে পড়েন সবাইকে জড়ো করতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই মিলে চলে আসেন সেই প্রাসাদোপম অট্টালিকায়। সবাই একযোগে কান্না জুড়ে দেন। কর্মরত লোকগুলি কাজ বন্ধ করে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। খানিক পরই তাদের শরীর জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে কাঁপতে থাকে মাথা থেকে একে একে টুপি খসে পড়ে। সবাই দৌড়ে এসে সমবেত বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সহ একে অপরকে আলিঙ্গন করতে আরম্ভ করে।

এদিকে সিংহাসনে বসে থাকা সেই লোকটি, আমি যার অতিথি, জোরে জোরে হাত-পা ছুড়তে থাকে। তার দুচোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে। হঠাৎ দৌড়ে এসে আমাকে জাপটে ধরে, যেন পিষে মেরে ফেলবে। আমাকে ঠেলতে ঠেলতে গ্রহের সীমানায় নিয়ে যায়, সজোরে ধাক্কা মেরে শূন্যে ফেলে দেয়। মৃত্যুর গহ্বরের দিকে ধাবমান আমি জেগে উঠে তড়াক করে বিছানায় বসে পড়ি। ঘামে ভেজা বিছানার চাদর দুমরে মোচড়ে এককোণে সরে গেছে। হতবিহ্বল আমার সম্বিত ফিরে আসে পাশের রাস্তা থেকে ভেসে আসা ‘মাতৃভাষা জিন্দাবাদ’ ধ্বনির সমবেত আওয়াজে। তারাপুর রেলস্টেশন চত্বরে যে মেয়েটির হাত ছেড়ে দিয়ে আমি পালিয়ে গিয়েছিলাম, তার চেহারা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠে। আমি তার কাছে অপরাধী হয়ে রইলাম, আত্মহননই কি এই অপরাধের শাস্তি?  না, এই শাস্তি থেকে আমি এখন মুক্ত। জীবনের চেয়ে জীবনের রহস্য জানাই যে বেশী গুরুত্বপূর্ণ এই বোধ আমাকে স্বস্তি দেয়। সমবেত আওয়াজ কোন দিক থেকে আসছে তা ঠাহর করে সেদিকে এগিয়ে চলি। আমার আমিকে খোঁজার এ যাত্রার এখানেই সাময়িক বিরতি।                    

রবীন্দ্রনাথকে

"দূরে কোন শয্যায় একা কোন ছেলে
বংশীর ধ্বনি শুনি ভাবে চোখ মেলে,
যেন কোন যাত্রী সে রাত্রি অগাধ,
জ্যোৎস্না- সমুদ্রের তরী যেন চাঁদ"----


যখন ছিলাম মেয়েবেলার মেয়ে,
নিজেকে যোনি ওঁ জরায়ুর সমষ্টি বলে জানতে পারিনি,
ওই ছেলেটার জায়গায় নিজেকে বসিয়ে,
কোন এক অগাধ রাতে
জ্যোৎস্না- সমুদ্র আকাশে চাঁদের নৌকো বেয়ে
মেঘেদের ঘাট ছুঁয়ে ছুঁয়ে
বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে হত, জানেন আপনি ,রবীন্দ্রনাথ?
কখনো বা মনে হত, চাঁপার রেণু গায়ে মাখি,
বাজাই রাখালের সঙ্গে বেণু বনে বনে ঘুরে ।
সবাই বলল, আপনি ছেলেদের কথা লিখেছেন,  কোন মেয়ের কথা নয়।
মেয়েদের হতে নেই চঞ্চল, সুদূরের পিয়াসী,
হিসেবের, মাপের, বাঁধা গন্ডীর বাইরে বেরিয়ে পড়ার ইচ্ছে করতে নেই
আগলভাঙ্গা বাঁধন হারা নির্ঝরের মতো ।
শিষ্যা আর সহচরীর বেশি কিছু হতে নেই----
কিন্তু মর্ষকামীদের ভিড়ে অর্জুনই বা কোথায় কেউ তা বলল না ।

লক্ষ্মী বা উর্বশী কোনোটাই যে  মেয়ে হতে চায়না,
যে সন্ধ্যায় গৃহদীপ  জ্বালেনা,
মনভোলানো সজ্জায় মোহিনী হতে চায় না,
কিন্তু ছাদে উঠে দেখে তারারা কিভাবে আকাশে দীপ জ্বালায়,
দেখে রকেট ছুটেছে উল্কার মতো,
হয়তো নিজেই ছুটে নিরুদ্দেশে মহাকাশযানে,
কখনো বা ভস্মীভূত হয়ে  ছড়িয়ে পড়ে ব্রহ্মাণ্ডের কোণে কোণে,
কখনো বা বিজয়িনী হয়ে মাটিতে  নেমে আসে,
তেমন মেয়ে কি এসেছিল আপনার কল্পনায় ?