“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

সোমবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৩

থিয়েটারে রাজনীতি--- রাজনীতিতে থিয়েটার এক বিচিত্র অনুধাবন

 ।।জয়শ্রী ভূষণ।।

( লেখাটি আগরতলা থেকে প্রকাশিত 'অভিনয় ত্রিপুরা'র শারদ সংখ্যা, ২০১৩তে প্রকাশিত)
        
    
 রাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনীতি, সমাজনীতি, দুর্নীতি, সংস্কৃতি, শান্তি, সম্প্রীতি, সংহতি,রীতিনীতি ইত্যাদি... ইত্যাদি... যদিও এগুলোকে শুধুমাত্র এক একটি শব্দ রূপে আমরা দেখছি ও পড়ছি, তবে এরা কি শুধুই এক একটি শব্দ না এই এক একটি শব্দ এক বিশাল গভীরতর প্রশস্ত কুয়ার মত, যার উপরটুকু আমরা দেখতে পাই শব্দ রূপে, কিন্তু এর বিস্তার ও সীমার পরিধি আমাদের কারোই জানা নেই, বা জানার চেষ্টা সচরাচর করা হয় না। এদের মিলন যে মাটির পরতে পরতের প্র্ত্যেক স্তরের সাথে এবং সর্বশেষে অবগাহন হয় যেখানে ধরিত্রীর সৃষ্টি ও সমুদ্রের শুরু, এবং সেই সমুদ্রের স্পর্শে মিলে মিশে আরও কত কত যে রংবদল তা নিয়ে আমরা সাধারান মানুষ কখনও ভাবিনা । কিন্তু আমি ভাবছি ... কদিন ধরেই “রাজনীতি” শব্দটি নিয়ে ভাবছি, চেষ্টা করছি মনে করতে, আমি কি এই শব্দটিকে চিনি, শুনেছি অনেক... কিন্তু আমি কতটুকু জানি... “রাজনীতি” কে। ভেবে ভেবে যা বুঝলাম তাতে আমার আক্কেল গুড়ুম । আমি তো কিছুই জানি না আসলে “রাজনীতি” কি ? আমার আশেপাশের যারা তথাকথিত রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞ তাদের ধ্যান ধারণা ও জীবন যাপনের পদ্ধতি ...মনে মনে পড়ার চেষ্টা করে ... “রাজনীতি” কে বোঝার চেষ্টা ... আমার সমস্ত ভাবনা... ,আরও গুবলেট হয়ে গেল । কি আর করি শেষমেশ ...ধ্যাৎতেরিকা... বলে কিছুদিনের জন্যে আমার এই অসফল বোঝার প্রয়াসে কমা দিলাম। তবুও যেন.... আমার ভাবনাগুলি কিন্তু ...ভাবের আকাশে সাঁতার কাটছে আমি বুঝতে পারছিলাম, আমি না চাইলেও আমার ভাবনা গুলি আমার মনের আকাশে ধোঁয়ার মত হারিয়ে যেতে যেতেও কোথায় যেন একটু সময়ের জন্য থেমে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, আর আমিও আমার অজান্তে সেইসব ভাবনার ধোঁয়াকে হঠাৎ যেন দূরে সবুজ পাহাড়ের গায়ে নীল আকাশের গায়ে গা ঘেষে ঘন ধবধবে সাদা মেঘের মত দেখতে পাচ্ছিলাম স্পষ্ট । এই যে পাওয়া ও না পাওয়ার দ্বন্দ্ব... , বোঝা ও বুঝতে না পারার কষ্ট ...... থেকে বেরিয়ে হঠাৎ করে পেয়ে যাওয়ার আনন্দ সত্যি রোমাঞ্চকর...অন্তত আমার কাছে, এ পাওয়া বড় পাওয়া... বিশাল প্রাপ্তি...অনেকটা হারিয়ে যাওয়া নিজেকে খুঁজে পাওয়ার মত।
            সত্যি বলছি, একদম সোজা সাপটা ভাষায় অকপটে প্রথমেই স্বীকার করে নিচ্ছি রাজনীতি মানে তথাকথিত সবাই রাজনীতি বলতে যা বোঝায়... তারপর লাল সবুজ গেরুয়া নিয়ে সবার বিশ্লেষণ আমি এখনও সঠিক ভাবে মগজধঃকরণ করতে পারি না,তবুও কেন তাহলে এ বিষয়ে লিখতে বসলাম, তার উত্তরের দেখা হয়ত আমি আমার এই লেখার অন্ত পথেই পাব সেই সাহস নিয়েই আমার উপস্থিতি আপনাদের মাঝে এখানে একজন সাধারন মানুষ হিসেবে। প্রথমেই যেদিন “রাজনীতি” বিষয়টি নিয়ে ভাবলাম, আমার সেই মুহূর্তের প্রতিক্রিয়া স্বরূপ যে ছবিটি আমার মনের পর্দায় ভেসে উঠল, বলতে পারেন আমার মনের থিয়েটারের পর্দা সরে যাওয়ার পর পরই যে দৃশ্য ভেসে উঠল...... “সংসদ ভবনে সংসদ চলাকালীন সময়ে কিছু রাজনৈতিক নেতা যারা নাকি এই সমাজের হর্তা কর্তা বিধাতা ও আমাদের সবার ত্রাতা , কয়েকটি কেদারা মানে চেয়ার মাথার উপর উঠিয়ে ভীষণ বেগে বিপক্ষের দিকে ছুড়োছুড়ি করছেন, আর আমরা কোটি কোটি আম জনতা, টেলিভিশনের পর্দায় সেই থিয়েটারের সরাসরি সম্প্রচারন উপভোগ করছিলাম...”। আসলে এই যে দৃশ্যটি যখন আমি একদিন সত্যি সত্যি টেলিভিশনের পর্দায় প্রত্যক্ষ্য করেছিলাম, সেদিন আমি একেবারে বলতে পারেন “থ” বনে গেছিলাম, আমি ভাবতে পারছিলাম না যে এরা কিভাবে দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকতে পারে, এদের তো নিদেন পক্ষে সাধারনজ্ঞানটুকুও নেই। যাহোক আমি পরমুহূর্তেই যারপরনাই খুশী হয়ে আমার মনের থিয়েটারের পর্দা বন্ধ করে দিলাম, আর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ভাবলাম, যাক্, এযাত্রা আর চিন্তা নেই, এই বিষয়ে আমি অনেক কিছুই লিখতে পারব, কারণ রাজনীতি মানেই তো থিয়েটার আর থিয়েটার মানেই তো রাজনীতি, তাই আমিও খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলাম, ভাবলাম এত বিশাল ব্যাপ্তি বিষয়টির, এতগুলি খবরের চ্যানেল চলছে... শুধুমাত্র “রাজনীতি” উপর নির্ভর করে, ওরা এত এত অনুষ্ঠান, সরাসরি অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা করছে, কত কত রমরমা, মুখরোচক খবরের খনি হচ্ছে খবরের চ্যানেল গুলি, বলতে গেলে এই সব চ্যানেল গুলোই তো মূর্তিমান “থিয়েটারে রাজনীতি রাজনীতিতে থিয়েটারের” সত্যতা প্রতিষ্ঠাতা, একদম আমাদের অন্দরমহলতক সব পৌঁছে দিচ্ছে, কজন আর থিয়েটারে গিয়ে রাজনীতির পাঠ পড়েন, সবাই টেলিভিশনের পর্দার সামনে বসেই নিজেদের Ph.D. থিসিস করে নেন। এরই মধ্যে আমার মাথার ভেতরে অনবরত মনের থিয়েটারের পর্দা খুলছে, আর আমি দেখছি আবার বন্ধ হচ্ছে আবার খুলছে আবার দেখছি ...এই প্রক্রিয়াটি বেশ কিছুদিন ধরেই আমার মধ্যে চলছে, মানে আমি উঠতে বসতে একটু অবসর পেলেই মনে মনে থিয়েটারে রাজনীতি ও রাজনীতিতে থিয়েটার... দুটোই আমার আমির সাথে নিজেই নিজের মধ্যে উপভোগ করছিলাম।
          ...প্রথম দৃশ্য... “সোনিয়া গান্ধী পতাকা দুলিয়ে অনেকগুলি ট্রাক ভর্তি ত্রান সামগ্রী পাঠাচ্ছেন উত্তরাঞ্চলের দুর্গতদের জন্য, ...দেখেই কেমন যেন বোকা বোকা লাগছিল হাসব কি না তাই ভাবছিলাম,...দ্বিতীয় দৃশ্যটি ছিল যেখানে গিয়ে ট্রাকগুলো দাড়িয়ে ছিল মানে ওখান থেকে আর রাস্তা নেই যাওয়া যাবে না, প্রতিবেদক ট্রাক চালকদের সাথে কথা বললেন, ওরা বলল ওদের কাছে কোন নির্দেশ নেই এখন ওরা কি করবে ... ট্রাকের ভেতরের সামগ্রীর কি হবে, আর দুদিন দাড়িয়ে থাকলে সব সামগ্রী পচে গলে নষ্ট হয়ে যাবে, ...না হেসে আর পারলাম না,... দারুণ ব্যাপার লাগছিল আমার...সোনিয়াজী পতাকা দুলিয়ে ওদের কে বিদেয় করার আগে খোঁজ নিতে ভুলে গেছেন ওদিকের রাস্তা ঘাট সমস্ত ভেঙ্গে গেছে, যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল তাই সবাই আটকে আছেন, হাজার হাজার মানুষ ও সাথে সমস্ত পশু ও গবাদির শবের গণ সৎকারের চিন্তা করছে সেনা জওয়ানরা, উনি শুধু পতাকা দুলিয়ে দিলেন আর ক্যামেরা বন্দি করে খবরের চ্যানেলে খবর পাচার ব্যস..., তারপরে আবার রাজনৈতিক ভাবে এদেশের আপামর জনগণের জন্য মাথা বেঁধে কোমর কষে লেগে গেলেন কি করে সব রাজ্যে কংগ্রেস নামক রাজনৈতিক সংগঠনটির সদস্য সদস্যাদের রাজনৈতিক পাঠ দিতে যাতে ওরাও উনার মত শুধু পতাকা দুলানোটুকুও অন্তত ভালো ভাবে শিখে নেয়। উনি হচ্ছেন “হাই কমান্ড” ..উনার হ্যাঁ ও নার উপর ভারতবর্ষের রাজনীতি হেলদোল চলছে ও চলবে..
          .দ্বিতীয় দৃশ্য ...এদিকে দুই নেতা বিমানবন্দরে হাতাহাতিতে ব্যস্ত কে আগে যাবেন বিমানে ...গিয়ে পৌঁছে জানান দিতে হবে যে উনারা কে কার আগে উত্তরাঞ্চলের দুর্গতদের পাশে দাড়িয়ে ছিলেন, ওখানে যেসব ভাগ্যবান-দুর্গতরা বিমানে চড়ে নিজেদের ঘর বাড়ি ও গন্তব্য স্থলে পৌঁছনোর জন্য অপেক্ষারত...ওরাও নিরুপায় হয়ে রাজনীতিতে থিয়েটার দেখে তারপর বিমানে চড়ার সুযোগ পেলেন। কম ভাগ্যের ব্যাপার নয় বলুন, এ রকম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময়ের তথাকথিত “রাজনীতি” র সুবাদে, এই দুর্দিনেও এরকম সরাসরি থিয়েটার উপভোগ করা যাচ্ছে। কিছুদিন আগেও পশ্চিমবঙ্গে তোলপাড় চলছিল, না কি হয়েছে, “পরিবর্তন চাই”... দিদির দৌলতে আমরা অনেক নতুন ধরণের সংলাপ যা নাকি বিগত সরকার আমাদের শোনাতে পারেনি, আমরা অহরহ শুনছি, আনন্দ পাচ্ছি, ও সেই সাথে পরিবর্তনের আবর্তে ঢুকছি। সম্প্রতি আবার “মোদী” নামক অধিনায়কের চয়ন হল, খুব সামনেই রাজনীতির ফাইনাল ম্যাচ, ভারতীয় জনতা পার্টি নামক রাজনৈতিক দলের বদৌলতে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে উথাল পাথাল হয়ে গেল, রাজা বদল, সাথে সাথে পালাও বদল মানে রাজার সাথে সাথে, সংলাপ ও রাজনীতির থিয়েটার বিষয় ও অনেকটাই বদলে যায়, কি দারুন ভাবুন তো! এরকম যে হাজার হাজার বিষয়, অনেক ব্যক্তিত্ব, এতসব তো আমি লিখে শেষ করতে পারব না, কাজেই এখানেই ক্ষান্ত দিচ্ছি।
          ইস্ যাঃ.. আর একজন আমার খুব প্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব... উনার কথাটা এখানে না লিখলে ঠিক জমবে না, আমাদের সবার প্রিয় লালুজি, যখনই টেলিভিশনের পর্দায় উনাকে দেখি কথা বলছেন , আমি সঙ্গে সঙ্গে “স্ট্যাচু” হয়ে যাই ও খুব মন দিয়ে উনার কথা শুনি, বিশেষ করে সংসদ চলাকালীন সময়ে আমি খুব চেষ্টা করি লালুজির বক্তব্য শুনতে, অনেকটা রম্য রচনার মত মনে হয়, হিহিহি করে একটু হাসার সুযোগ পাই আমি। এই যে উপরে এত সময় “রাজনীতিতে থিয়েটার” নিয়ে হাহা ও হিহি করলাম, তাতে কিন্তু “ হাহা-হিহি” ছাড়া সদর্থক কিছুই পেলাম না । আমরা বোকার মত ভারতীয় “রাজনীতির থিয়েটারে” শুধু মাত্র নীরব দর্শক... যেসব দর্শকদের সমস্যা ও সমাধান, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয় নিয়ে ওরা ওদের থিয়েটারের সংলাপ ও বিষয় হিসেবেও ভাবে না, কিন্তু আমরা প্রতিবার, গাঁটের পয়সা দিয়ে, আমাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পারিশ্রমিক দিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক থিয়েটারের দলগুলিকে বিভিন্ন রংগের জামা পরিয়ে আইপিএল এর মত ম্যাচ দেখি, ম্যাচ ফিক্সিং করি, তারপর আবার পরবর্তী ফাইনাল ম্যাচের জন্য অপেক্ষা করি। উপরোক্ত ভাবনাগুলো যখন আমার মনকে কালো ধোঁয়ার মত ছেয়ে ফেলেছে, তখন আমি কোনোমতে মুখে হাত দিয়ে দম বন্ধ করে আবার আমার মনকে খোলা আকাশের নীচে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে এলাম আর প্রান ভরে শ্বাস নিলাম। আমাকে আবার বোঝাতে শুরু করলাম, এ কি ভাবছি আমি, এত শুধু পরনিন্দা আর পরচর্চা হয়ে যাচ্ছে, কোন ভালো কথা আমি নিজেকে পর্যন্ত শোনাতে পারছি না, এ কোন রাজনীতি, এ কোন থিয়েটার, না না এসব তো আমি ভাবতে চাই না, আমি আপনাদের সাথেও ভাগ করতে চাই না, মনটা আবার একটু খারাপ হয়ে গেল, তাহলে মনে হচ্ছে সত্যি আসলে “রাজনীতি” মানেটা কি এখনও বোধহয় আমার বোধগম্য হল না। আবার ভাবতে শুরু করলাম, এবার একটু নিরাশ হয়েই ভাবছি। তখনই হঠাৎ মনে পড়ল, শব্দটি বোধহয় “রাষ্ট্রবিজ্ঞান” বা “পৌরবিজ্ঞান” । আমি তখন সবে অষ্টম শ্রেণীতে উঠেছি। অঙ্ক, বিজ্ঞান, ইংরেজি ও বাংলা সাহিত্যে প্রতি আমার অনুরাগ ছোটবেলা থেকেই, কিন্তু অষ্টম শ্রেণীতে একটু বাড়তি বিষয় নির্বাচন করতে হত আমাদের, তো আমি ভাবছিলাম কোন বিষয়টি পছন্দ করবো। ১৯৮২ সাল, বৈশাখ মাসের একদিন ভোরবেলা ঘুম ভাঙ্গল কান্না আর হইচই শুনে, কে কাঁদছে, কি হয়েছে জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে বিছানা থেকে উঠে চোখ খুলেই জানালার পর্দা উঠিয়ে উঁকি দিয়ে ছোট্ট মেয়েটি দেখতে পেল... বাড়ির সামনে ট্রাক দাড়িয়ে আছে...আর ট্রাকটির মধ্যে মনে হচ্ছে ওর বিছানার মতই ধবধবে সাদা চাদর দিয়ে কাউকে ঢাকা দিয়ে রাখা । কৌতূহল আরও বাড়ল, কী যেন একটা অজানা ভয়ে মনটা কেঁপে উঠল, ছোট্ট মেয়েটি আর কিছু না বুঝুক এটুকু আঁচ করতে পারল একটা কিছু হয়েছে তাই, বুড়ি, কুট্টি,ঝুট্টি,সুমু, শঙ্কু আর শম্ভুদা অমন করে চীৎকার করে কাঁদছে। আরে ওই তো বাপি আর বড় পিসী মিলে ট্রাকে উঠে গেল...তারপর সবাই মিলে ট্রাক থেকে সেই ধবধবে সাদা চাদরে ঢাকা সেই বস্তুটি নামিয়ে উঠোনে তুলসী তলায় রেখে দিল। এবার আর কৌতূহল সম্বরণ না করতে পেরে একছুটে উঠোনে গিয়ে মেয়েটি যেই না সাদা চাদর সরিয়েছে, দেখতে পেল...আরে এত জেঠু ঘুমিয়ে আছে, কি করে এত সকালে জেঠু আগরতলা থেকে করিমগঞ্জের বাড়ীতে, আর তাও কেন উঠোনে এভাবে ঘুমিয়ে আছে, ওঠে না কেন, হঠাৎ করে কোথা থেকে মা এসে টেনে নিয়ে কানে কানে বলল, তুমি দুষ্টুমি করবে না, জেঠু মারা গেছে, তুমি পা ছুঁয়ে বসে থাকো, ছোট্ট মেয়েটি মনে মনে ভাবল দাঁত না মেজেই বসব, আশে পাশে ততক্ষণ পাড়া প্রতিবেশীরা সবাই ভিড় করেছে...তাই আর রা না কেড়ে চুপটি করে বসে রইল ...... এই প্রথম মুখোমুখি মৃত্যুর সাথে আমার পরিচয় কিন্তু খুব ভালভাবে তখনও মৃত্যুকে চিনতে পারিনি ।
         তারপর ১৯৮৬ সাল ১৭ই এপ্রিল, বাসন্তী পূজার মহাষ্টমীর সন্ধ্যা আরতি চলছে, ঢাক বাজছে, কাঁসর বাজছে, পয়লা বৈশাখের ঠিক দুদিন পরেই... বাপির আকস্মিক মৃত্যু... ...আমাকে মৃত্যুর আসল কদর্য রূপ চিনিয়ে দিল...... । মৃত্যু নামক ঝড়ে আমার ছোটবেলা উধাও হল ...তারপর থেকেই মাও যেন কেমন বদলে গেল...আগের মত মারে না, বকাঝকা ও করে না। মা যে এখন চাকরীর জন্য দরখাস্ত করছে......এ অফিস...সে অফিস ছুটোছুটি করছে... ডি সি র অফিস, ডি আই অফিসে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ হাঁটাহাঁটি করতে করতে ক্লান্ত বিধ্বস্ত আমার মা...না মার কোন চাকুরী হল না, একান্নবর্তী পরিবারে বসবাস করার দরুন থাকা খাওয়ার কষ্ট সেরকম হল না, পড়াশোনাও চালিয়ে গেলাম ...সাদামাটা ভাবে। অনেকবার ভেবেছি কি করলে আমাদের আর্থিক সমস্যার সমাধান হবে, আমি তখনও ছোট, মায়ের চাকুরীই সব সমস্যার সমাধান, কিন্তু কে দেবে...অনেকটা সিনেমার গল্প বলে মনে হলেও নাবালিকা অপক্ক কিশোরী মনের আবেগে আমি তখনকার প্রধানমন্ত্রীকে আমার মাকে একটি চাকুরী পাওয়ার জন্য আবেদন করে চিঠি লিখব বলে মনস্থির করলাম, কারণ আমার তখনকার সেই পারিপার্শ্বিক ব্যবস্থা, আমার মায়ের অসহায় অবস্থায় একমাত্র অভিভাবক হিসেবে অবুঝ ও অজান্ত মনেও রাষ্ট্র ব্যবস্থার উপরই নির্ভর করেছিলাম। কিন্তু তখন আমি এতটাই ছোট যে চিঠি খানি পর্যন্ত ভালো করে লিখে উঠতে পারিনি, সেইদিন গুলোতেই বোধহয় মনে হয় আমার আবোধমনে প্রথম রাজনীতির সাথে পরিচয়। সেই কবেকার মনের কথা মনেই রয়ে যেত যদি না আজ আপনাদের সাথে ভাগ না করতাম।       
          সময় গতির ঢেউ এ দিন গড়িয়ে গেল আর সেই মনের কোনের চাপা আবেগই হয়ত অষ্টম শ্রেণীতে “সিভিক্স” অর্থাৎ “পৌরবিজ্ঞান” নামক বিষয়টির প্রতি আমাকে আকৃষ্ট করে ছিল, যা হোক কিছু দিন পড়ার পর আমি ওই বিষয়টির মাথামুণ্ডু কিছুই আমার মগজে প্রবেশ না করাতে পেরে ষাণ্মাসিক পরীক্ষার ঠিক একমাস আগেই “সিভিক্স” এর বদলে সংস্কৃত নিয়ে নিলাম ও বাংলা ও ইংরেজির মত আমি সংস্কৃতকেও খুব ভালোবেসে ফেললাম । তাই “রাজনীতির পাঠ” আর আমার হয়ে উঠেনি। আরও পড়াশোনা করার অদম্য ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও, পারিবারিক কারণেই আর্থিক অনটনের জন্য আর কেন্দ্রীয় সরকারী চাকুরী পেয়ে যাওয়ায়, মায়ের ইচ্ছানুসারে “হাতের লক্ষ্মী পায়ে না ঠেলে” কলেজের পাট শেষ করতে করতেই সরকারী চাকুরীজীবী হয়ে গেলাম। আমার বিভাগে যোগদানের প্রথম দিন থেকেই দুয়েকজন বরিষ্ঠ সহকর্মীরা আমায় সব ব্যাপারে খুব সাহায্য করেছেন, প্রায় তিনমাস ভিনরাজ্যে চাকুরিগত প্রশিক্ষণে ছিলাম, সেখানেও আমাকে পারিবারিক কারনে একাই যাওয়া আসা করতে হয়েছে, উনারা সব সময় আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছেন, এবং স্বাভাবিক ভাবেই উনারা আমার আস্থাভাজন হয়ে উঠেন ও আমিও উনাদের উপর কিছুটা নির্ভরশীল হয়ে পরি। উনাদের পরামর্শ মতই আমি আমার বিভাগেই বিএমএস নামক এক ইউনিয়ন এর সদস্য পদের জন্য সমস্ত কাগজপত্রে সই করি কিন্তু তা আমি বিভাগে যোগদানের প্রায় ৪/৫ মাস পরে জানতে পারি । কারণ আমাদের বিভাগের ট্রেড ইউনিয়ন পদ্ধতি ও ওদের কর্মকাণ্ডের কোন জ্ঞান আমার ছিল না। পরবর্তী সময়ে শিলচর শাখায় যোগদানের পর জানতে পারি এই বিভাগে তিনটি ইউনিয়ন আছে, বিএমেস, এনএফপিই ও এফএনপিও । ওদের মধ্যে নীতিগত কোন তফাত আছে বলে আজ অব্দি আমার বোধগম্য হয়নি। তাই আমিও কোন দলে আছি তা নিয়ে কখনও মাথা ঘামাইনি। আসল কাজের সময় কাছাড় ডিভিশনের তিনটি ইউনিয়নই প্রকৃতপক্ষে নিষ্ক্রিয়। কাজেই এই তিনের কোন ভেদাভেদ আমি বুঝতে পারিনি বা বলতে পারেন এখানেও আমার রাজনৈতিক অনভিজ্ঞতাই দায়ী। ঠিক রাজনৈতিক নেতাদের মত আমাদের বিভাগের বেশীরভাগ ইউনিয়ন নেতাদেরও কাণ্ড কারখানা দেখে ও কথাবার্তা শুনে আমার তো প্রথমে চোখ চড়ক গাছে, তারপর দিনে দিনে রাগে গা রিরি করতে শুরু করল, মানে বুঝতে পারতাম, সহ্য শক্তি কমে আসছে। পরিবারের কেউ কোন দিন কোন কিছুতে বাধা না দিলেও ছোটবেলা থেকেই খুব রক্ষণশীল ভাবেই বড় হয়েছি, কিন্তু চিন্তাধারায় কোন রক্ষণশীলতা পরিবার থেকে পাইনি, কথাবার্তা অমায়িক ভাবে বলা, পোশাক-আশাক, চলা-ফেরা, সব কিছুতে আমার মায়ের শিক্ষার আঁচ পেতাম। মা বলতেন “কয় জন বড় না সয় জন বড়” । ছোটবেলা অন্যদের ঝগড়া শুনলে বা দেখলে আমি ভয়ে চিল চীৎকার করতাম। সেই আমির স্বভাব একটু একটু করে বদলাতে শুরু করল। অফিসে ৮ ঘণ্টার জায়গায় ৯/১০ ঘণ্টা কাজ করতে হত, আমি কথা কম বলতাম, তাই হয়ত ভাবত কিছু বোঝে না, আমি দেখতাম, অনেকে আড্ডা মারছে, ঘুরছে, পান খাচ্ছে, বড় বড় কথা বলছে, ফোনে অনবরত কথা বলে যাচ্ছে, কিন্ত প্রশাসনিক স্তরের কারও কিছু যায় আসে না, যে কাজ করে না তার জন্য কোন কাজ না করলেও কোন সমস্যা নেই ,কারণ ওদের মতে ও তো কাজ করে না ওকে বাদ দাও, যে করছে তাকে আরও চাপ দাও ,করে নিতে পারলে আরও দায়িত্ব বাড়িয়ে দাও, আর যারা করছে না ওদের জন্য শুধু মাস শেষে মাইনেটুকু দিয়ে দাও। এক দেড় বছর এগুলো দেখে দেখে আমার মাথা খারাপ হবার জোগাড়, ইতিমধ্যেই আমি স্পন্ডেলাইটিস নামক রোগের কব্জায় চলে এলাম। এরই মধ্যে একদিন অফিসে কাজের ফাঁকে একটু দুপুরের টিফিন খেয়ে একটু শ্বাস নিচ্ছিলাম, আর মনে মনে ভাবছিলাম যে কি পাপ করেছিলাম, যে আমাকে সরকারী চাকুরে হতে হল, মনে মনে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সবার শ্রাদ্ধ করছিলাম, এত কষ্ট করে পড়াশোনা করে কিছুই যে আমার মাথায় মঠ উঠাতে পারল না কেন,... সেই সব হাবিজাবি ভাবছিলাম ..... আমার সমস্ত স্বপ্ন আস্তে আস্তে ভেঙ্গে চুরমার, ইচ্ছে ছিল পড়ব আর শুধুই পড়ব...কোনদিন থামব না, সেই আমাকে মাঝ রাস্তায় থেমে পড়তে হল, ভীষণ নিরাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম, মনের গতি তো ...এক এক সেকেন্ডেই আমার মনের সৌরমণ্ডলে পাই পাই করে ঘুরছিল, ঠিক সেসময়ই আমাদের বিভাগের এনএফপিই-র (National Federation of Employees Union)একজন নেতা যিনি সারাদিন পান চিবোন, নিজের চেয়ারে থাকেন না, আর আমাদের বিভাগের নিম্নস্তরের কর্মচারীরা কোন দরকারে অনুনয় বিনয় করতে আসলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেন, উনি আবার সবজান্তা, লাল মানে বামপন্থি ইউনিয়ের নেতা হিসেবে নিজেকে ও লাল রঙেই project করেন , সব দেখে শুনে এতদিনে আমার যা উপলব্ধি...যে মাসের শেষে বিনা কাজে মাইনে গুনা আর উস্তাদি করার জন্যই উনার নেতা রূপে আত্মপ্রকাশ...যা হোক আমাকে দেখেই ভাল মন্দ জিজ্ঞেস করতে করতে কথায় কথায় বললেন উনি এখন সিনেমা গিয়ে কি একটা নাচে গানে ভরপুর সিনেমার নাম বললেন ঠিক মনে আসছে না এখন, সেটি দেখতে যাচ্ছেন, আমি দেখেছি কি না জানতে চাইলেন। শুনেই ঝাঁ করে মাথায় মনে হল রক্ত চড়ে গেল, জিজ্ঞেস করলুম,----“মম্মো” , “একদিন আচানক” , “মেঘে ঢাকা তারা” , “The Birds,” “The Roots”, “War and Peace”, “Mirracle Still Happens” ......দেখেছেন ? আমি আপনার মত অফিস ফাঁকি দিয়ে সিনেমা দেখি না, আর কোথায় আপনি মশাই সবার থেকে বেশী কাজ করবেন না সারাদিন খালি এদিক ওদিক করেন...আপনার থেকে আমরা ছোটরা শিখব না আপনি শিখবেন কোনটা......একটু মুচকি হেসেই কথাগুলো বলছিলাম,...উনি প্রথমে হাঁ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে কথা গুলি শুনলেন তারপর বললেন ...তোমাকে তো দেখলে বোঝা যায় না তুমি তো অন্যরকম...আমি বললাম হ্যাঁ আমি আমার মতন...এই বলে নিজের জায়গায় গিয়ে আবার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলুম। কথাগুলি বলে মনে হচ্ছিল মনের আগুনের জ্বালায় কিছুটা জল ঢেলেছি, অনেকটা স্বস্তি পাচ্ছিলাম….. একেই বোধহয় বলে “Outburst” ... “মনের সুপ্ত আগ্নেয়গিরির লাভাক্ষরন...” । এই যে এই মুহূর্তের আবোলতাবোল কাগুজে কচকচানিও কোথাও যেন তথাকথিত রাজনীতির থিয়েটারের এক একটি দৃশ্যের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে তাই না। আমি আবার সেই “রাজনীতি” নামক শব্দের ঘোলা থকথকে ঘন কাঁদা মেশানো বেনো জলের তোড়ে আমার ভাবনার স্রোত থেকে উৎপাটিত হয়ে যাচ্ছি যেন। কিন্তু আসলে কি রাজনীতি মানেই “নোংরা নীতি” ...রাজনীতি মানেই কি “অরাজকতা”, ...রাজনীতি মানেই কি “দুর্নীতি”...... রাজনীতি মানেই কি “তেলা মাথায় তেল দেওয়া”... রাজনীতি মানেই কি “মোসাহেবি” ...... রাজনীতি মানেই কি “গুন্ডারাজ”... রাজনীতি মানেই কি “ডাল মে কুছ কালা হ্যায় ”...... রাজনীতি মানে কি “শুধুই দলাদলি-দলবাজি” ... রাজনীতি মানেই কি “স্বজন পোষণ”...... রাজনীতি মানেই কি “ আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ”...... রাজনীতি মানেই কি “ সাধারনের নাগালের বাইরে সবকিছু”...... রাজনীতি মানেই কি “শুধুই অনিয়ম”... “রাজনীতি মানেই কি “শুধু কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি একে অপরের প্রতি...”...রাজনীতি মানেই কি “ নাক সিটকানো -ভুরু কুঁচকানো”...রাজনীতি মানেই কি আমাদের জন্য শুধুই “থিয়েটার” আর আমরা শুধু ক্ষণিকের দর্শক...”।
        না না আমি এভাবে ভাবতে আর পারছি না, মন সায় দিচ্ছে না, মাথাটা যেন ঝিমঝিম করছে, আমি বোধহয় আবার দ্বিধাগ্রস্ত –confused হয়ে যাচ্ছি। আমাকে আবার একটু সময়ের জন্য থামতে হবে, প্রান ভরে শ্বাস নিয়ে আমার ভাবনার গতি পথ বদলাতে হবে। উপরোক্ত কথাগুলি আপনাদের মূল বিষয় থেকে আলাদা মনে হলেও হতে পারে কিন্তু আজকে যখন “থিয়েটারে রাজনীতি ও রাজনীতিতে থিয়েটার” নিয়ে আমার সাথে আমার আলাপচারিতা ও অনুসন্ধান আপনাদের সাথে সরাসরি ভাগ করে নিচ্ছি ......তখন কখনও যেন মনে হচ্ছে... আমি ও বিশেষ করে আমার মন হচ্ছে নদীর পারের জলের মত..অনবরত দুলছে ....এই মনে হচ্ছে পার ছুঁয়ে ফেলেছি আবার পরক্ষনেই মনে হচ্ছে আমার মন আবার মাঝ নদীতে...... কখন যে কোন বিষয় কোথা থেকে এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে... কি যেন এক অদৃশ্য সূক্ষ্ম সুতোয় জুড়ে আছে আমার আশপাশ চতুর্দিক। সব কিছু মিলেমিশেই আমি আর এই আমিরও পরিবর্তন হচ্ছে অনবরত যা কেউ বুঝতে পারি না... বিজ্ঞানের ভাষায়—“ Nothing is constant in this world”…এই জগত পরিবর্তনশীল......আর আমরা সবাই যেহেতু এই জগতের জাগতিক বস্তু......আমাদেরও পরিবর্তন চলছে...তাই আমরা সবাই আমাদের জন্ম, মৃত্যু, বেড়ে উঠার আবর্তে জড়িয়ে আছি...। কিছুদিন পরেই বিকেলে আমার অফিসের রুমে আমার সাথে দেখা করতে কয়েকজন ভদ্রলোককে নিয়ে উপরোক্ত নেতা সহকর্মী উপস্থিত হলেন...আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন ওদের সাথে......। বললেন ...উনারা একজন অন্যরকম মেয়ের সন্ধান করছেন যে ওদের সাথে কাজ করতে পারবে। সেই শুরু, আমি আস্তে আস্তে এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে প্রবেশ করলাম, বলতে পারেন উনারা এসে আমাকে সেই পথ দেখিয়ে দিলেন...। অনেকের সাথে পরিচয় হল.............. সবার সাথে নানা থিয়েটার কেন্দ্রিক কাজে জড়িয়ে পরলুম, ......বিশেষ করে রাহুল দাসগুপ্তের অভিভাবকতায় ......ভারতীয় গণনাট্য সংঘের শিলচর শাখার সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গেলাম। এদের মাঝে এসে আমি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম,.......ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সংস্পর্শ আরও পরিবর্তন আনল আমার মধ্যে ..আমার নাগরিক সচেতনতা বোধের পরিধি,.........নিজেকে প্রকাশ করার বিধি ...সামাজিক দায়বদ্ধতা, আমার ভালো লাগা - খারাপ লাগা, নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করা ও সাংগঠনিক পরিচালনামূলক কাঠামো... ইত্যাদি নানা বিষয়ের অ আ ক খ শিখতে শুরু করলাম। আমি আমার পরিবার ও অফিসের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন শহরে অজানা ও অচেনা মানুষের মাঝে এক নতুন আমিকে খুঁজে পেলাম। বিভিন্ন ধরণের নাটকের চরিত্রে অভিনয় করতে শুরু করলাম, সাথে গান , কবিতায় , লেখায় বিভন্ন সমাজ সচেতনতা প্রক্রিয়ার ক্রিয়া বিক্রিয়ায় এক অন্য আমিকে পেলাম, সেই আমি আর আগের মত নিরাশ হয় না, নিজেকে একা অসহায় ভাবে না, অনেক বেশী সাবলীল, সাহসী, উদ্দীপ্ত, ও আশার-প্রত্যাশার স্বপ্নের বেড়াজালের প্রায়শই বিচরণ করে.....এই যে পরিবর্তন......আমার মধ্যে...যে কোন পরিস্থিতিতে নিজেকে যুঝার জন্য প্রস্তুত করার জন্য এন্টিবায়োটিকের মত কাজ করেছে, আমার চারপাশের “থিয়েটারে রাজনীতি” ...... যেখানে আমি পাঠ পেয়েছি সাধারণ মানুষের রাজনৈতিকসত্বাবোধের......এই মানসিক পরিবর্তন এক দিনে হয় না, তার জন্য দায়ী পারিবারিক পরিমণ্ডল......গুনগত শিক্ষা..... পারিপার্শ্বিক আবর্ত ....আর জরুরী ... “Sense of Displacement.” মাত্র ২/৩ মাস আগে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সফররত সময়ে শিলচরের নাট্যবোদ্ধাদের সাথে আড্ডায় এক সন্ধ্যায় বিখ্যাত নাট্যকার, নাট্যপরিচালক, চিত্র পরিচালক ও আরও অনেক গুণাবলী সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব শ্রীমহেশ দাত্তানির কথা শুনছিলাম......বিভিন্ন কথা প্রসঙ্গে উনি বলছিলেন......... “ a sense of displacement is very necessary for some creative and positive thinking and that sense of displacement from his mother Language....his home town...and many more things gave him that power to outburst causing outbreaking of Theatre activities.” কথাগুলি শুনে আমার ভীষণ ভাল লেগেছিল, মনে হয়েছিল বোধহয় আমরা এক পথেরই পথিক।
       আসলে থিয়েটার কী ও কেন করি সেই প্রসঙ্গে আমি বলেছিলাম, যে যদিও থিয়েটার একধরনের বিনোদন মূলক অনুষ্ঠান তবুও আমরা এ অঞ্চলের বেশীরভাগ নাট্যদল ও নাট্যকর্মীরা এই অঞ্চলের পিছিয়ে পড়তে পড়তে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থার উত্তরণের পথে একটু আশার আলো দেখাতে প্রদীপের ভূমিকা গ্রহণ করে থাকি। তাতে যা মনোরঞ্জন হয় বাকিটুকু হচ্ছে আমাদের প্রতিবাদ , প্রতিরোধ ও আমাদের বিরোধের ভাষা আমাদের থিয়েটার। ইতিমধ্যে আমি আঁচ করতে পারলাম , অনেকেই আমাকে বামপন্থী, বলে শুধু ভাবা নয় সরাসরি অনেক প্রশ্নও করতে শুরু করে দিল। কিন্তু আসলে তো আমার কাছে ডান ও বাম বলে কোনদিনও রাজনৈতিক ভাবে কোন কিছুই সেভাবে গুরুত্ব পায়নি। তাই অনেকের এই ধরণের উক্তি গুলো আমার কাছে কিছুটা উটকো মনে হত এবং আমিও যারপরনাই বিরক্ত হতাম। আমি ভাবতাম আমি নাটক করছি , আলোচনা সভায় যোগদান করছি, যে সব অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করছি, তাতে আবার সিপিএম, বিজেপি, কংগ্রেস কি? একদিন রবিবারের সকালবেলা... টিং টং...টিং টং...ফ্ল্যাটের দরজার কলিংবেল বেজে উঠল, খুলে দিতেই দেখলাম পাশের ফ্ল্যাটের দাদা, ভেতরে এসে বসতে বসতেই বললেন... “ কিতা ,...তুমরা তো পারলায় না... কুনু কামের না তুমরা...” ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না কি বলতে চাইছেন, আমি প্রশ্ন বোধক চিহ্ন মুখে নিয়ে ভেতরে গিয়ে আমার পতি দেবকে বললাম দাদা এসেছে...ও সঙ্গে সঙ্গে ড্রয়িং রুমে চলে এল...শিলচরে এলে রবিবারে মাঝেমধ্যে ওরা আড্ডা দেয়, ...আমার কোন প্রতিক্রিয়া না পেয়ে বোধহয় ...একটু পরে উনি আবার বললেন... “ কিতা ...পারলায় না তো ইবারও... কুনুবার পারতায় না....আমরার তো ১৫ এর মধ্যে ১৩ জনেই পাই লাইল”...... যেই ১৫ ও ১৩ সংখ্যাটি শুনলাম, বুঝেগেলাম শুনি আসামের নির্বাচনী ফলাফলের কথা বলছেন, গত নির্বাচনে আসামের মুখ্য মন্ত্রী তরুণ গগৈ বলেছিলেন যদি কাছাড় উনাকে ১৫ জনই বিজয়ী বিধায়ক দিতে পারে উনি কাছাড়কে হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ দেবেন। গতবার ১৫ টি আসনের মধ্যে ১৩ টি কংগ্রেস জিতেছিল, সেবার ভোটের আগে শুধু ভোটের আগে বললে ভুল হবে প্রকৃত পক্ষে সারা বৎসরই আমরা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এই অঞ্চলের বঞ্চনা, যন্ত্রণা, ভাষা আগ্রাসন, এই অঞ্চলের প্রতি উদাসীনতার কথা, অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া মূল্য, অচল যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্রডগেজ, মহাসড়ক ইত্যাদি নানা সামাজিক উন্নয়ন মূলক কাজের জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করা হয় এবং আমি এই সব কাজে যতটুকু সম্ভব সক্রিয় ভাবে যোগদান করি। তো যেহেতু আমি এই সব কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকি তাই উনি ধরে নিয়েছেন আমি এখন সিপিএম এর মানুষ। কথাটা শুনেই কেন জানি না সেদিন খুব চটে গেলুম। চটে গেলাম বললেও ভুল হবে আসলে ক্ষেপে গেলুম। আসলে তো আমি কখনও নিজেকে বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী বলে ভাবিনি, আমার অভিব্যক্তি সম্পূর্ণ আমার নিজস্ব ছিল , স্বতন্ত্র ছিল, হ্যাঁ হতে পারে আমার চিন্তা ধারার সাথে উনি বাম রাজনীতির মিল খুঁজে পাচ্ছিলেন। বললুম ৫০ বৎসর ধরেই তো কংগ্রেসের শাসন চলছে, এখনও কিছু হল না , এবারও তাই হবে “ঘোড়ার ডিম” । এবং সত্যি আজও এক টাকার প্যাকেজ আসেনি, তাতে কোন অসুবিধা নেই , পরবর্তী নির্বাচনেও ওরাও গরিষ্ঠতা পাবে নিশ্চিত। আসলে আমি তখনও জানি না যে আমার কথাবার্তা কিছুটা হলেও বামঘেষা, যাহোক খুব ঝাড়লাম উনাকে আমাকে কথার বর্ষণ ধারায় , নানা কথা বলে একেবারে প্রায় উত্তেজিত হয়ে পড়লুম আর কি? কিন্তু আমি একটা জিনিস স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম আমাদের সমস্ত কার্যকলাপকে এমন কি আমাদের থিয়েটারের বিষয় বস্তু , চরিত্রের বিশ্লেষণকে অনেকেই বাম নীতির ছোঁয়া বলে মনে করতে শুরু করলেন।
           গভীর ভাবে ভাবতে শুরু করলাম, তাহলে কি যা কিছু চিন্তা ধারা, কার্যকলাপ, যা সবার সুবিধার জন্য, জনগনের জন্য, যে সব মানুষ শুধু মাত্র নিজের পরিবারের গণ্ডির বাইরে বেড়িয়ে পাড়া প্রতিবেশী, শহর ও সমাজের বৃহত্তর অংশের কথা ভাবে, নিজের পরিবারের অংশ বলে মনে করে ওরাই বামপন্থী, ওটাই কি তাহলে বাম মানসিকতা, যে একের মধ্যে নয় রৌদ্রের ছটার মত সবাই কে সমান উত্তাপের অনুররণ করাতে চায়। তখন থেকেই খুঁজছি আর খুঁজছি, ...... নিজেকে বোঝাতে পারছি না “রাজনীতি” র অর্থ ...... তাহলে কি “রাজনীতি” মানে “রাজার নীতি”, রাজা একটি রাজ্যের সর্বোচ্চ পদ, রাজার নেতৃত্বে রাজ্যের প্রজাদের সুখ সমৃদ্ধির জন্য যে রীতি নীতি নির্ধারণ করা হয় তাই কি রাজনীতি ? যে নীতি সবচেয়ে উৎকৃষ্ট যে নীতি দেশের জনসাধারণের জন্য, একটি রাষ্ট্রকে সুষ্ঠু ভাবে পরিচালনার জন্য ব্যবহার হয় তাই কি রাজনীতি ? তাহলে কি রাজার মত “ রাজনীতি” হচ্ছে একটি সমাজের, একটি দেশের , যে কোন একটি শাসন ব্যবস্থার জন্য প্রণীত সর্বোচ্চ নীতি যা দেশের ও জনগণের উন্নয়নের জন্য ব্যবহার হয়। তাহলে আমার সংজ্ঞায় “রাজনীতি” কি দাঁড়ালো? মনে হচ্ছে চলতে চলতে আমি কোন এক মোড়ে পৌঁছে গেছি, যেখানে একটু একটু আমার স্বল্পজ্ঞানে কোথাও রাজনীতির অস্পষ্ট আদল কি দেখা যাচ্ছে, মনে হচ্ছে বোধহয়, আরও একটু মনোযোগ দিয়ে দেখি হ্যাঁ , সত্যি তো আমি কিছুটা হলেও দেখতে পাচ্ছি কি আসল “রাজনীতি” র ছবি ? কিন্তু এখন তো সেই রাজতন্ত্র নেই, তাই রাজনীতির সংজ্ঞা ও কি বদলে গেছে। এখন কি আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে ? না কি আসলে আমাদের এখন কোন রাজাই নেই , নেই কোন নীতি ও ... তাই বোধহয় বদলে গেছে আজকের পরিপ্রেক্ষিতে “রাজনীতি”র সংজ্ঞা ও । আজ রাজনীতি পরিণত হয়েছে, প্রহসনে, নিকৃষ্ট নীতিতে যে নীতি শুধুই স্বেচ্ছানীতি-স্বার্থ নীতির কথা বলে, যে নীতি শুধুই দ্বন্দ্ব – আর বিভেদের কথা বলে।
         বেশ কয়েক বছর আগে, ভারতীয় গণনাট্য সংঘ শিলচর শাখার উদ্যোগে , “জনম –( জন নাট্য মঞ্চ) নাট্য দল শিলচর এসে পৌঁছুল, কয়েকদিন ধরে সমস্ত শিলচর সহ বরাক উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে ওদের নাটকগুলি পরিবেশন করলেন। বিভিন্ন নাট্য বোদ্ধা ও এই অঞ্চলের সাধারন জনতা তাদের পরিবেশনা শুধু মাত্র উপভোগ করলেন বললে ভুল হবে, একাত্ম হয়ে গেলাম। আমিও সেই প্রথম ওই ধরণের অভিনয় ও নাটক ও পথ নাটক দেখতে পেলাম, অনেক কিছু শিখতে পেলাম। ওরা যা বিশ্বাস করে, যে অবস্থায় দেশের ৮০ শতাংশ জনগণ দিন কাটাচ্ছে, তাঁদের রাজনৈতিক শিক্ষা ও অধিকারবোধ জাগ্রত করার এক সফল প্রয়াস বলে মনে হল। ওরা সরাসরি দেশের আর্ত সামাজিক ব্যবস্থা, ও তার জন্য দায়ী রাজনীতি ও রাজনৈতিক দল গুলোকে বেছে নিয়েছিল, এবং সেই সাথে ওরা স্বীকার করে নিয়েছে ওটাই ওদের আজীবন ব্রত, ওদের নাটক কথা বলে বাম রাজনৈতিক দলগুলির পক্ষে এবং তাতে কোন ইনিয়ে বিনিয়ে বলার পদ্ধতি ওদের ছিল না । ওরা সরাসরি বলেছিল, আমরা বাম রাজনৈতিক দলগুলির জন্য কাজ করি, নির্বাচনের আগে ওদের নাটকের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচার অভিযানে ওরা অংশ গ্রহণ করেন। প্রয়াত সফদর হাসমীর পত্নী মলয়শ্রী হাসমী ও সুধন্য দেশপাণ্ডের নেতৃতে , নিউজিল্যান্ডের একজন অভিনেতা ও আরও কয়েকজন এর অভিনয়ে এবং ওদের যেখানে সেখানে রাস্তায় ঘাটে মোড়ে বাজারে ওদের বিন্দাস পরিবেশনা, সত্যি যাদের নাগরিক সচেতনতা, অধিকার বোধের পাঠের নুন্যতম যে শিক্ষা জরুরী , তার কিরন ছিটিয়ে দিয়েছিল। “জনম” এর সংস্পর্শ আমাকে কিছুটা হলেও “ থিয়েটারে রাজনীতি” র আভার ছোঁয়া দিয়েছিল। খুব বুদ্ধিমত্তার সাথে মেকআপ ছাড়া, কোন নির্দিষ্ট মঞ্চ ছাড়া সাধারনের মাঝখানে শুধু মাত্র বাচন ভঙ্গি, ও বিষয় বস্তুর গভীরতায় ছোঁয়া ওদের নাটকে পেয়েছিলাম, উনারা বলছিলেন “ হাম নাটক করতে দর্শককে লিয়ে দর্শক কে বিচ মে...উনতক পহুচনা হামারা কাম হ্যায় ”। ২০১২ এর অগাস্টে হঠাৎ একদিন ফেসবুকে দেখলাম ধর্মনগরে নাটকের কর্মশালা হচ্ছে, নাটকের কর্মশালা শুনলেই আমার কি রকম জানি একটা তীব্র ইচ্ছে হয়... মনে হয় ইসস...আমিও যদি যেতে পারতাম, যদিও সময় ও সুযোগে হয়ে উঠে না। সেদিন ও ইচ্ছে হল।
          আমার চোখ পড়ল শিলচর এর স্বনামধন্য নাট্যকর্মী সুব্রত ভট্টাচার্য ও ধর্মনগরের মণিদীপ দাস এর কথোকপন এর উপর । মণিদীপ দাস লিখেছে বরাকের নাট্য কর্মীদেরও সাথে নিয়ে ওরা কর্মশালায় কাজ করতে চাইছে। ফোন নাম্বার দেওয়া ছিল যোগাযোগের জন্য। আমি মণিদীপ এর সাথে কথা বললাম, ভীষণ ভাবে আমন্ত্রণ জানালো ,খুশী হল বলল দিদি চলে এসো তোমার ভালো লাগবে। আমাকে প্রবীর গুহের ফেসবুকের ঠিকানায় বিস্তারিত সব জেনে নিতে বলল। কর্মশালায় যোগদানের যোগ্যতা ছিল নাট্যকর্মী হলে খুব ভালো অথবা ১৮ বছরের উপর বয়স হতে হবে। আমি যেখানে যাই সেখানে আমার একমাত্র ছেলেকে সাথে নিয়ে যাই বিশেষ করে নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আমি ওকে আমার সাথে জড়িয়ে রাখি। কিন্তু মণিদীপের সাথে কথা বলে বুঝলাম আমার ছেলেকে সাথে নিয়ে কর্মশালায় যোগদান করা যাবে না। মনটা একটু খারাপ হয়ে গেলো। মনে হল এবার ও বোধহয় আমার যাওয়া হল না। তবুও আমি ফেসবুকে প্রবীর গুহের নাট্য কর্মকাণ্ডের খোঁজখবর নিতে শুরু করলাম। দেখলাম উনি Alternate Living Theatre এর Director. মনে হল অন্যরকম কিছু। আর অন্যরকম কিছু হলেই আমার উচাটন আরও বেড়ে যায়। যাহোক শেষমেশ ভেবে দেখলাম, অনেক ঝামেলা, ছেলের Half Yearly Exam. , Office, তার মধ্যে শিলচর থেকে ধর্মনগরে গিয়ে ১০/১২ দিন থাকা আমার জন্য অসুবিধাজনক হয়ে যাবে। মন বেজার করেই মনকে বোঝালাম যে এবার ও আমার যাওয়া হচ্ছে না। আমিও চুপচাপ আবার নিজের মন কে বুঝিয়ে Busy হয়ে গেলাম জীবনের আবর্তে। কর্মশালা শুরু হয়েছিল ৩০ শে আগস্ট থেকে,২৭ শে আগস্ট আমাকে মণিদীপ ফোন করলো , আমি বললাম না আমি আসছি না ছেলেকে একা রেখে আসতে পারবো না । মণিদীপ বলল না দিদি চলে আসুন ছেলেকে নিয়েই আসুন কোন অসুবিধা হবে না। মনের ভেতরের চাপা ইচ্ছেটা আবার লাফিয়ে উঠল, আমার ছেলে আমার সামনে বসে ছিল, আমার সাথে যেতে পারবে শুনেই খুব খুশী হয়ে বলল হ্যাঁ মাম্মা, তুমি চিন্তা করো না, আমি পড়বো এসে পরীক্ষা দেব। যেমনি কথা তেমনি কাজ, তারপর কোনোমতে দুজনে সব কিছু সামলে, অফিস, ছেলের স্কুল সব ফেলে ধর্মনগরের জন্য রওয়ানা দিলুম ২৯ শে আগস্ট বাসে চড়ে, পৌঁছুতে পৌঁছুতে প্রায় ৪টা বাজল। যে বন্ধুর বাড়িতে উঠেছিলাম, সেখানে গিয়েই ব্যাগ-ট্যাগ রেখেই আমরা দুজনে বেরিয়ে পরলুম BBI স্কুলে , বিকেল ৫টায় শুরু হওয়ার কথা ছিল, আমরা ৫ মিনিট আগেই হাজির হলাম, কাউকেই তেমন করে চিনি না, অনেকেই উপস্থিত ছিলেন, এরই মধ্যে স্যার শ্রী প্রবীর গুহ এলেন, সাথে মণিদীপ ও এলো। এরপরই শুরু হল L.E.Society ও নাট্যমঞ্চের যৌথ উদ্যোগে সঙ্গীত নাটক একাডেমীর সহায়তায় উদ্বোধনি অনুষ্ঠান, প্রদীপ প্রজ্জলন করলেন ত্রিপুরা বিধানসভার প্রাক্তন অধ্যক্ষ, শিক্ষাবিদ অমরেন্দ্র শর্মা। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নাট্যকর্মী দেবব্রত চৌধুরী , নাট্যকার হৃষীকেশ নাথ এবং কলকাতা থেকে আগত “অলটারনেটিভ লিভিং থিয়েটার” নাট্য দলের নির্দেশক ও এই কর্মশালার মুখ্য প্রশিক্ষক আন্তর্জাতিক নাট্য ব্যক্তিত্ব শ্রী প্রবীর গুহ । অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন রঞ্জিত পুরকায়স্থ। স্বাগত ভাষন রাখেন নাট্যকর্মশালার আহ্বায়ক তথা নাট্য মঞ্চের সম্পাদক মণিদীপ দাস। খুব সংক্ষেপে সবাই বক্তব্য রাখলেন। সব শেষে প্রশিক্ষক শ্রী প্রবীর গুহ তাঁর বক্তৃতায় “জননাট্যের খোঁজে” শীর্ষকের ব্যাখ্যা করলেন। উনি বললেন নাটক মানেই শুধু অভিনয় নয়, নাটক মানে শুধু ভালো মঞ্চ নয়, নাটক মানে Voice for voiceless. আমার খুব ভালো লাগছিল উনার কথা শুনতে। মনে হচ্ছিল আরে...আমার ভাবনা অনেকটা মিলে যাচ্ছে তো! আরও বললেন আমরা নাটকের দর্শক তৈরি করতে পারছি না কারণ নাট্যকর্মীরা দর্শকদের কাছে পৌঁছুতে পারছিনা, তাঁর মতে দর্শকরা যদি নাটক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন , নাটক দেখতে না চান, নাট্য কর্মীদের নাটক নিয়ে দর্শকদের কাছে পৌঁছে যেতে হবে। আর সে জন্যেই পথে ঘাটে, স্কুল কলেজে, অফিস প্রাঙ্গণে সাধারন মানুষের কাছে পৌছার মত প্রতিটি জায়গায় নাটক করতে হবে। দর্শক তৈরি করাটাও নাট্য কর্মীদেরই দায়িত্ব আর সেই দায়িত্ব আমাদের নিতে হবে। মূলত উনার নাট্য জীবনের গুরু বাদল সরকার। তবে উনার কিছু স্বতন্ত্র ধারা গত ৪০ বছর ধরে নাট্য চর্চার মাধ্যমে তৈরি করেছেন, আর তাই তিনি তাঁর দলের নাম রেখেছেন “অলটারনেটিভ লিভিং থিয়েটার” । বললেন আজীবন থিয়েটার করে যাবেন সেই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তা পালন করছেন। খুব সাধারন পরিবেশে বড় হয়েছেন, বুঝতে পারলাম তিনি মাটিতেই আছেন, তাই মাটির মানুষ , গ্রামের মানুষ, আদিবাসী, লোক সংস্কৃতি এসব নিয়ে কাজ করছেন এবং সেই কাজের জন্য একটি ধারা ও শৈলী তৈরি করে মানুষ গড়ার মানুষ হওয়ার মানসিকতার বীজ বপন করছেন। আমার মনে হল ভাগ্যিস এসেছিলাম, না হলে তো খুব miss করতাম। খুব সুন্দর করে বললেন আমরা বিদেশী culture adopt করছি, আর উনি বিভিন্ন দেশে গিয়ে বিদেশীদের ভারতীয় নাট্য ধারার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন ও কর্মশালা করছেন। আমাদের কর্মশালা শেষ করেই ১৩ই সেপ্টেম্বর জাপান যাচ্ছেন আরও একটি কর্মশালায় প্রশিক্ষন দিতে। আরও বললেন আমরা যখন নাটক করি, দর্শকদের involve করতে পারি না, তাই নাটকের চরিত্র যে রূপায়িত করছে তার সাজসজ্জা, অভিনয় , আলো মঞ্চ ইত্যাদি নিয়েই দর্শকরা বেশী ভাবে। নাটকের বিষয় বস্তু নিয়ে কিন্তু সেভাবে কেউ কথা বলে না ভাবে না বা বেশীদিন সেই ভাবনা দর্শকদের মনকে দোলায় না। আমাকে খুব ছুঁয়ে গেলো কথাটা। কারণ আমিও উনার সাথে সমভাবাপন্ন । তাই নাট্যকার বা নাট্যকর্মী হিসেবে আমাদের সেই দায়িত্ব নিতে হবে সমাজের যে ব্যবস্থা, সমস্যা, রাজনীতি, সমাজনীতি কুপ্রথা সেগুলো কে অপসারণের জন্য সমাজের সবাই কে ভাবাতে হবে। আর একটা খুব সুন্দর কথা বললেন শুনে খুব ভালো লাগলো, বললেন আজকাল বিশাল budget এর নাটক হচ্ছে, খুব সম্প্রতি নাকি NSD এক কোটি টাকার budget এর নাটক উপস্থাপন করেছে। বিশাল দামি দামি মঞ্চ, মঞ্চে গাড়ী, এমনকি বাইক ও আসতে পারছে। সেইটার বিপরীতে তিনি যা বললেন আমার দারুণ লাগলো, বললেন ওরা এক কোটি টাকা খরচ করছে, আমি এক টাকা দিয়ে করবো। দুর্দান্ত মনে হোল আমার শুনে। এই challenge গুলো জীবনে না থাকলে বোধহয় অন্যরকম কিছু করে উঠা যায় না। তাই উনাকে আমার সত্যি অর্থে একজন বড় মাপের মানুষ, দৃপ্ত ব্যক্তিত্ব ও একজন বলিষ্ঠ নাট্য যোদ্ধা বলে মনে হল। আর মনে হল আমার আসাও সার্থক হল অবশ্যই। কিছুক্ষণের মধ্যেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হল। ঠিক হল পরের দিন মানে ৩০ শে সেপ্টেম্বর সকাল ৭-৩০ থেকে ৯-৩০ ও বিকেলে আবার শুরু হবে ৫-৩০ থেকে ৭-৩০। প্রতিবেলায় ৪ জনের rotationwise বিভিন্ন group করে দেওয়া হল যারা এসে room সাফ করবে, গুছিয়ে নেবে, সাজিয়ে রাখবে artistic way তে। শুধু একটা নিয়ম মেয়েরা ঝারু দেবে না, খাবার serve করা, ইত্যাদি করবে না, ওগুলো সব ছেলেরা করবে, মেয়েরা সব সময় এই কাজগুলি ঘরে করে, তাই এই দায়িত্ব ছেলেদের দেওয়া হল। আমার ছেলে যদিও ৮ বছরের তবুও স্যার বললেন, তুমি তোমার ছেলেকে ও নিয়ে এসো। ও খুব খুশী মার সাথে নাটকের workshop করবে। পরের দিন মানে যেদিন workshop শুরু হল, ১১/১২ থেকে শুরু করে below ১৮ বছরের বয়সের প্রশিক্ষণার্থী ছাড়াও ৩৫/৪০ বছরের আরও প্রশিক্ষণার্থী ছিলেন। উনি বললেন খুব POSITIVE কথা। বললেন যে কেউ , যার সদিচ্ছা আছে, আশা আকাঙ্খা আছে, নিজের কষ্ট ব্যথা বেদনার কথা বলতে চায় নিজের মত সশক্ত ভাবে বিশ্বাস করে, সেই থিয়েটার করতে পারে। আরও বললেন থিয়েটার মানেই অবিকল যে চরিত্রটি অভিনয় করছে তার নকল করতে হবে তা নয়, নতুন নতুন experiment আমরা করতে পারি। যা ইচ্ছে তাই তবে হ্যাঁ, তাতে জীবনের কথা,বাঁচার কথা, আশার কথা, আমাদের সমস্যার কথা, দুর্বলদের যন্ত্রণার কথা থাকতে হবে, তবেই আমরা থিয়েটার নিয়ে মানুষের - দর্শকদের মনকে ছুঁতে পারব। আর বললেন এখানে আমরা যা করবো সব “আমি” না “আমরা” করবো ।আমি তো মনে মনে শিহরিত হয়ে উঠছিলাম, আর ভাবছিলাম, আমার মত ভাবনা সেই বিশেষ ব্যক্তি ও ভাবেন সেই ভাবনায় পথ চলছেন বিগত ৪০ বছর ধরে, আমার মনে হল তাহলে আমিও তো সেই পথেই চলছি , সত্যি বলছি, আমার আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে গেলো। আমার মত চলার , বলার , ভাবার ইচ্ছে আরও বলিষ্ঠ হল। আরও কিছু নিয়ম ছিল , নাটক করতে হলে ও নাটককে গুরুত্ব দিতে হবে, যারা দিতে পারবে ওরাই workshop attend করতে পারবে, এই যে নিয়মানুবর্তিতা, দৃঢ়তার পাঠ , খুব জরুরী কিন্ত । Priority টা আমাদের বুঝতে হবে, সেই বোধ টা উনি আমার মনে হয় অনেকের ভেতরে জাগাতে পেরেছেন। জোর দিলেন দৈহিক অঙ্গ সঞ্চালন, ভঙ্গি , দেহ ভাষা ও বলা যেতে পারে, যা আমাদের কথা না বলেও অনেক কিছু বোঝাতে পারে। একদম প্রথম দিন উনি শুরু করলেন হাল্কা free hand exercise দিয়ে। ৩৪ জন সবাই মিলে গোল হয়ে দাঁড়ালাম। গোল হয়ে দাঁড়ানোর কারণটা শুনে তো আমার দারুণ লাগল। গোল হয়ে দাঁড়ালে সবাই সবাইকে দেখতে পাবে। তিনটি কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ বললেন, সব সময় চোখে চোখ রেখে কথা বলতে, টানটান সোজা হয়ে দাঁড়াতে আর হাত দুটিকে এমন ভাবে রাখতে হবে ভাবতে হবে আমাদের হাত নেই, ওই প্রথম প্রথম যে জড়তা থাকে নাটকের সময় সেটা ভাঙ্গার জন্যেই হাত কোথায় রাখবো পা কোথায় রাখবো সেটাকে মাথায় রেখেই এই নিয়মগুলি আমাদের workshop এ চালু করে দিলেন। ভুলবশত যেই হাত পেছনে নিচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে তার অদ্ভুত শাস্তি, হয় বাঁদরের মত নাচতে হবে, ডিগবাজি দিতে হবে, ছেলেদের নেচে দেখাতে হবে, যে গাইতে জানে না তাকেই গাইতে হবে, মানে এক কথায় শাস্তি গুলো এত মজার যে স্যারের হয়ে একে অন্যের ভুলটা ধরিয়ে দিচ্ছিল, কারণ শাস্তি পেলেই তো সবাই হিহিহি করে হেসে লুটোপুটি। আমার বেশ ভালো লাগলো কি সুন্দর করে স্যার জীবনে এগিয়ে চলার ভাবনা গুলো ও আস্তে আস্তে এই ভাবে নাটক নাটক খেলার মাধ্যমে মনের মধ্যে গেঁথে চলেছেন। তিনি প্রথমেই বলেছিলেন, নাটকে বেশী কথা বলা ভালো লাগে না, তাই কথা কম ,দেহ ভাষা বেশী ব্যবহার করতে হবে, আর অনবরত আমরা নতুন নতুন ভাবনায় আমাদের সমস্যা, আমাদের কষ্ট, আমাদের আনন্দ, আমাদের আশা, উৎসাহ গুলো কে তুলে ধরবো, আর দর্শকদের ভালো লাগবেই, আর আমাদের কাজের প্রথম দর্শক তো আমরাই। আর ও একটি খুব আমার মনের আমার বিশ্বাসের কথা যা আমি মনে প্রানে শুধু বিশ্বাস করি নয়, মেনে চলি ও যে আমি একজন পরিপূর্ণ মানুষ। উনি ও সেই কথাটি শুধু বললেন নয় প্রতিষ্ঠা করলেন, ছোট বড় সবাই যার যার মত সমভাবে ব্যক্ত করবে, ভাবের আদান প্রদান করবে এবং workshop এ প্রতিদিন সমস্ত activities এ actively involve হতে হবে এবং হলও তাই। বিভিন্ন বয়সের ৩৪ জন মিলে মিশে “আমরা” হয়ে কি করে যে ১০ দিন কেটে গেলো খেলতে খেলতে আর সবাই যে কত কিছু শিখেনিলাম তা ওখানে না গেলে বোধহয় জানতে পারতাম না। শুরু হয়ে ছিল free hand exercise দিয়ে। সেই শরীরী ভঙ্গি গুলো কে রোজ রোজ একটু একটু করে ভাবনার তুলি দিয়ে কথা সুর উচ্ছলতার রঙ দিয়ে কিভাবে সাজাতে হ্য় মাত্র ১০ দিনে তাই তিনি করে দেখালেন, শেখালেন সবাইকে। আমার সাথে একদিন workshop এর পর discussion বসেছিলেন, অনেক কথা শুনলেন, বোঝালেন , বললেন, guide করলেন। এই যে ব্যাপারটা উনি যে অন্যের মনের ভাবনাকে পড়তে পারেন , English-এ বোধহয় একেই বলে “CLAIR VOYANCE” …..এই অতিরিক্ত ভাবনা গুলোই উনাকে একজন বিশাল ব্যক্তিত্বতে পরিণত করেছে এবং আমি খেয়াল করেছি, উনি প্রথম দিন থেকেই যাদেরকে selectively point out করেছেন, শেষের দিকে কিন্তু ওরাই সবার থেকে ভালো করেছে, এবং ওরা অদূর ভবিষ্যতে কাজ করে যেতে পারবে এবং এই যে মানুষকে মানুষ গড়ার, সমাজকে সবার বাসযোগ্য করে তোলার জন্য জহুরির মত মানুষদেরকে কাজ করে তোলবার জন্য খেলার মাধ্যমে নাটকের মাধ্যমে গড়ে তোলার পদ্ধতি বা formula মাঝে মাঝে ঠাট্টা করে বলতেন এগুলো হচ্ছে, Probilogy…. আমার কাছে দারুণ রোমাঞ্চকর মনে হয়েছে । উনার উপর উনারই এক ছাত্র “ দামাল” নামে একটি documentary তৈরি করেছে, আমায় বললেন তুমি দেখ, পড়ে অবশ্য সবাই কে একদিন কর্মশালায় দেখানো হয়েছিল, আমি “দামাল” দেখে চোখের জল আটকাতে পারিনি, স্যারকে বললাম, কি করে এরকম হল স্যার, আপনি যা বলছেন এখানে ওগুলো তো সব আমারও কথা। আমি সত্যি খুব imotional হয়ে পড়েছিলাম সেদিন , তবে একই সাথে আমার মনে হয়েছিল আমার ভাবনা, আমার চলার পথে , আমার আগে আগে আরও আরও অনেক আছে, আর এই সত্যটি আমাকে আরও বেশী আমার মত করে বাঁচার সাহস দিয়েছে, আমি উপলব্ধি করেছি, আমি একা নই। মনে হয়েছিল, আমাদের নাটকে , আমাদের গানে, আমাদের চলাফেরায় আমাদের রাজনৈতিক চেতনা থাকা চাই। সব কিছুতেই রাজনীতি আছে, এবং থিয়েটার করতে হলেও তার একটা রাজনৈতিক দৃষ্টি ভঙ্গি থাকবেই এবং থাকা উচিত। প্রবীর গুহের নাট্য কর্মশালায় মূলত প্রথম আমার উপলব্ধি হল যে সমস্ত নাট্য কর্মীর “থিয়েটারে রাজনীতি” র জ্ঞান জরুরী এবং এই জ্ঞানই আস্তে আস্তে বিন্দু থেকে সিন্ধুর মত আমাদের মত সাধারনের মগজে “রাজনীতি” র এক স্বচ্ছ অবয়বের ছবি ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হবে এবং এই “থিয়েটারে রাজনীতি” র পাঠের জন্য জরুরী নিয়মিত এই ধরণের নাট্য কর্মশালা , তাতে বিভিন্ন নাট্য শৈলী ধারার সাথে যেভাবে আমাদের পরিচয় হয় একই সাথে আমাদের রাজনৈতিকবোধের বীজ অঙ্কুরিত হয়। ভাল-মন্দ, ডান-বামের জানার পরিধির ব্যাপ্তি ঘটে। এই প্রকারের “থিয়েটারে রাজনীতি” ই কিন্তু “রাজনীতির থিয়েটারকে” বহুলাংশে প্রভাবিত করে ও সমাজ সংস্কারে এক অনবদ্য ভূমিকা নিতে পারে। কোন কথা না বলে তাৎক্ষণিক একটি নাটকের ঘটনার মুহূর্ত তৈরি করা এবং তাতে কোন সামাজিক পারিপার্শ্বিক বা মানসিক সমস্যা ও তার দূরীকরণ কি ভাবে দেখানো যায় , শুধু মাত্র মাথা থেকে পা পর্যন্ত isolated movement দিয়ে কিভাবে মানুষের বিভিন্ন characteristics গুলো কে বর্ণনা করা যায়, এই যে শিক্ষা গুলো সত্যি অভূতপূর্ব। ৩৪ জন আমরা যারা কর্মশালায় ছিলাম , ছোট বড় সবাইকে একদম সরবতের মতন মিশিয়ে দিতেন। বাচ্চারা একসাথে দাঁড়াবে না, মেয়েরা একসাথে দাঁড়াবে না, বলতেন এখানে ছেলে মেয়ে বাচ্চা বলে কিছু নেই, সবাই সমান , খেলতে খেলতে শেখাতে শেখাতে হঠাৎ করে ৫/৬ দল বানিয়ে দিতেন আর সময় খুব বেশী হলে ৫/১০ মিনিট , ওই সময়ের মধ্যেই একেকদিন সুর, কথা, কোন বিষয়বস্তুকে কি ভাবে উপস্থাপন করতে হবে সেই কাজ গুলো করাতেন। সব থেকে মজার ব্যাপার হল কার দলে কে আছে সব লটারি। কিছুই করার নেই কারণ স্যার ও ওভাবেই দল গড়ছেন। আমার ভীষণ ভালো লেগেছিল ছোট্টরা ও পিচ্চিরা সবাই সত্যি কিন্তু বড়দের থেকেও অনেক গভীর ভাবে ভাবতে ,গড়তে ও করতে জানে। সব দল ওদের performance দেখাবে আর দর্শক ছিলাম অন্য সব দলগুলো। সবাই তক্ষুনি সবার ভালো লাগা, খারাপ লাগা , কেন, কি করে সব এক এক করে বলছে, আর মজা লাগত যে ছোটরাও কিন্ত কোন অংশে কম নেই। এই যে ছোট বড় মাঝারি মননের সবাইকে একসাথে balance করে তার পর এধরনের কর্মশালা এত উদ্যম উৎফুল্লতা, সত্যি বলতে আমরা সবাই সত্যি অর্থে “আমরা” হয়ে পড়েছিলাম। সব শেষে উনি যা করলেন তা হলও এতদিন সবাই যে যা করেছে, কেউ খুব ভালো দেহ ভাষা প্রদর্শন ও বর্ণনা দিয়েছে, কেউ বা হয়তো খুব ভালো সুর করেছে, খুব ভালো লিখেছে, হঠাৎ করে বলতেন ,যাও তোমরা সব জুড়ে দাও কিন্তু ভালো লাগতে হবে, আবার শুরু হল সেই দেহ ভাষা,সুর, কথা, নাটকের মুহূর্ত কে মালার মত গেঁথে আর একটি নতুন মালা গাঁথার খেলা। এই করতে করতেই উনি শিখিয়ে দিলেন কি করে আলাপ থিয়েটার, nonsenseথিয়েটার করতে হয়। সবাই একাত্ম না হলে কিন্তু কিছু সৃষ্টি করা যায় না, সত্যি আমরা একে অপরের সাথে মিলেমিশে নতুনের সৃষ্টির আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে থাকতাম। এই করেই চোখের নিমেষে ১০ দিন শেষ হয়ে গেল। সমাপ্তি অনুষ্ঠানের জন্য উনি বললেন আমি কিছুই করব না বলব না, সব তোমাদের করতে হবে, যদি পার তবেই কর, আমি তোমাদের সাথে আছি। শেষ পর্যন্ত তাই হলও আমরা সবাই মিলেই সমাপ্তি অনুষ্ঠানটি চিন্তা ভাবনা করে, পরিচালনা , সঞ্চালনা, অভিনয়, কথা, গান, সবই হল স্যার এঁর অভিভাবকতার আড়ালে , এবং দুর্দান্ত হয়েছিল এত কম সময়ে এই রকম অন্য ধরণের অনুষ্ঠান সত্যি মনোগ্রাহী হয়েছে এবং দর্শকরাও সমভাবে আমাদের সাথে involved হয়ে গেছিল। এই ১০ দিনে দেখলাম ও বুঝলাম স্যারের অনেক অনুগামী যারা এই ধরণের “থিয়েটারে রাজনীতি” র বোধ নিয়ে রতন থিয়াম, সুধন্য দেশপাণ্ডে ও আরও আরও অনেক বিখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্বের সাথে কাজ করছে, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে নাট্য কর্মশালার আয়োজন করছে, এবং অনাম্নি ভাবে প্রচার বিমুখ হয়ে বিভিন্ন আদিবাসী ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই ধরণের থিয়েটারের অনুষ্ঠান করছে, আস্তে আস্তে মানুষকে মানসিকভাবে, রাজনৈতিক ভাবে সজাগ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। জেনে খুব ভাল লাগলো আসলে “থিয়েটারে রাজনীতি” র প্রভাব কত বিস্তীর্ণ কণ্টক পথে গভীর জঙ্গলের আদিবাসীরাও ওদের মাদল ওদের গানের আমেজে মিলিয়ে মিশিয়ে সবার সাথে পায়ে পায়ে মিলিয়ে দুলে দুলে আনন্দে নাচতে নাচতে একটু একটু করে শিখছে আর সেই সাথে আমরা যারা কংক্রিটের জঙ্গলে বাস করি আমাদের চার দেওয়াল আর বোকাবাক্সের মধ্যে আমাদের পৃথিবী আবদ্ধ, ওদের কাছে গিয়ে প্রকৃতির নির্মল সহজ-সরল থিয়েটারের আনন্দ নিচ্ছি, এই যে দেওয়া আর নেওয়ার আর এক নামই থিয়েটারে রাজনীতি।
                
           সনটা ২০১০ হবে, এপ্রিল মাস, আন্দামান-নিকবোর দ্বীপের পোর্টব্লেয়ারের মাটীতে পা দিয়েই একটু FRESH হয়ে চলে গেলাম সোজা সেলুলার জেলে। সমস্ত গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল, আমাদের আজকের এই স্বাধীন দেশ, চতুর্দিকে কেলেঙ্কারি আর কেলেঙ্কারি,দুর্নীতি, গরীব আরও গরীব, ধনী আরও ধনী, হিন্দু মুসলমান নামক হাতিয়ার ব্যবহার করে শতশত হাজার , হাজার শিশু – মহিলা গ্রাম শহর ধ্বংস , রাজনৈতিক দলগুলির প্রকাশ্যে কোন্দল,এর জন্যেই কি ওখানে এই দেশের শতশত শহীদেরা অমানুষিক পাশবিক অত্যাচার হাসিমুখে বরণ করে আত্ম বলিদান করেছিলেন । শুধু ১৫ই আগস্টে ও ২৬ এ জানুয়ারিতে কিছু দেশাত্মবোধক গান বাজিয়ে আবার সবাই যে যার মত ব্যস্ত অরাজনৈতিক কর্মে । ভীষণ খারাপ লাগছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার আগের পরিস্থিতির সাথে আমাদের দেশের এখনকার পরিস্থিতির তুলনা করে, কালাপানির সমুদ্রের ঢেউ এর দোলায় মনটা সত্যি হুহু করে উঠলো। রাগে মনে মনে বলে উঠলুম সমস্ত রাজনৈতিক তথাকথিত নেতাদের রাজনীতিতে প্রবেশের আগে অন্তত তিনদিন এই জেলে ঐসব কুঠুরিতে কাটানো উচিত, সেই কষ্ট সেই যন্ত্রণার কণা বিন্দু যদি ওরা অনুভব করতে পারেন , “রাজনীতিতে থিয়েটার” এর দৃশ্যাবলীর কিছুটা হলেও পরিবর্তন ঘটবে। কারণ রাজনৈতিক নেতারাও তো আমাদের দেশের এক একজন বেতনভুগি কর্মচারী, তাহলে কেন আমাদের গণতন্ত্রে একটি বিশেষ পদ্ধতি, বিশেষ শিক্ষার মাধ্যম থাকবে না, শুধু ক্ষমতার লোভ ও যথেচ্ছাচারিতার আঁচড় যাতে রাজনীতির রাজে ও নীতিতে কোন ছায়া ফেলতে না পারে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রাজনীতির থেকে মুখ ফিরিয়ে না নেয় তার জন্য কি প্রয়াস চলছে ? এখানেই “থিয়েটারে রাজনীতি” দৃশ্যপট শুরু এবং সমাজের বিভিন্ন নাট্য কর্মী , নাট্য দল প্রতিনিয়ত নিজের গাঁটের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মত একের পর এক দৃশ্যপটের সূচনা, অনুশীলন ও পরিবেশন করে যাচ্ছেন। এই প্রয়াসের এক জ্বলন্ত উদাহরণ লক্ষ্মণ ঘটক বাবু , উনার “অভিনয় ত্রিপুরা” যিনি আমার মত গবেটকে দিয়েও “থিয়েটারে রাজনীতি ও রাজনীতিতে থিয়েটারে” লিখিয়ে নিলেন, হয়ত সুদূর ভবিষ্যতে আমি সত্যি সত্যি “রাজনীতি” র অভিধানিক ও সাংবিধানিক গূঢ় অর্থ বুঝতে পারব, বা বোঝার সেই পথে প্রথম চলতে শুরু করলাম।
              গত ১৫ই মে, “১৯শে র মহাপথচলা” শীর্ষক মহামিছিলের শেষে শিলচর ভাষা শহীদ ষ্টেশনে দাড়িয়ে সন্ধ্যে বেলা, “দলছুটের” পথ নাটক দেখছিলাম,নাটকটি এ অঞ্চলের মুখ থুবড়ে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার দৃশ্যায়ন করছিল,হঠাৎ ই দেখলাম ওপাশ থেকে চার্বাক স্যার , আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের Masscom Deptt এর প্রফেসর, বললেন কি খবর আপনার “ভালো লাগা ও ভালো থাকা” লেখাটা পড়লুম, ভালো লিখেছেন, ঘটক বাবু তো আপনাকে লেখক বানিয়ে ফেললেন, দুজনেই হেসে উঠলুম। লেখা ভালো হয়েছে শুনে সত্যি যতটা অবাক হয়েছি ততটাই ভালো লেগেছে, কথায় কথায় বললুম এবারের বিষয় ““থিয়েটারে রাজনীতি ও রাজনীতিতে থিয়েটার” তা কি যে লিখব বুঝতে পারছি না কারণ রাজনীতি তো সেরকম বুঝি না, আবার হেসে উঠলেন বললেন বলেন কি আপনি “আই.পি. টি .এ.” করেন রাজনীতি বোঝেন না । তারপর বললেন, আপনি শুধু আপনার ভাবনাটুকু লিখে ফেলুন তা হলেই হবে। আমি এখানে শুধু আমার ভাবনাটুকুই লিখলাম, হয়ত তা ““থিয়েটারে রাজনীতি ও রাজনীতিতে থিয়েটারে” র পার ছুঁতেও পারে নি। কিন্তু আমি একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে , আমি যদি আমার বোধকে একটি সরল রেখার সাথে তুলনা করি তা হলে দেখতে পাই ...... সেই রেখায় দুটো অন্ত আছে, একটা ডান ও আর একটি বাম......দুটো ধরণ আছে ভালো ও মন্দ কিন্তু দুটোই একই সাথে এক সরলরেখায়। আমার বোধের গতি ও দিশা বামের দিকে অন্যদের হয়ত ডানের দিকে , সেই দিক পরিবর্তন ও গতির চলাচল বদলের জন্য নাট্যকর্মীরা, সমাজসেবীরা, NGOs.ও আরও বিভিন্ন সংস্থা “থিয়েটারে রাজনীতি ও রাজনীতিতে থিয়েটারে”র সার্বিক উন্নতির জন্য প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে.........আর এই প্রয়াসই হয়তো ভারতীয় রাজনীতির সরল রেখায় .........কংগ্রেস, বিজেপী, সিপিএম, জেডিঊ , অগপ, তৃণমূল ......ইত্যাদি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলির সহাবস্থান , নীতিগত ডান ও বামের দিকে চলাচল, আমাদের বিচিত্র ভারতবর্ষে হিন্দু মুসলমান, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ , জৈন ইত্যাদি বিভিন্ন ধর্মের বর্ণের মানুষের সুযোগ্য বাসভূমি রূপে পরিণত করতে সহায়ক হবে।

              ফিরে এসেই আমার একটি অনুষ্ঠান ছিল তাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম, ২রা Oct’12 দুটো নাটক হয়েছে । তার মধ্যে একটি ছোটদের নাটক ছিল। ১০ জন ছোট শিশু যাদের বয়স ৫ থেকে ৯ বছরের ভেতর, আমার ছেলে এবং আমি মিলে ৪ দিনে একটি ছোটদের নাটক ১০ জনে মিলে বসে, আলোচনা করে, without any script, music আমরা নাটকটি মঞ্চস্থ করি, সবাই মানে ১০ জন শিশু থেকে শুরু করে দর্শকরা সবাই খুব উপভোগ করেছে , কারন সেই নাটক শিশুদের মননের রাজনৈতিক নীতিবোধের উষ্ণ আঁচ দর্শক পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পেরেছিল। থিয়েটার আমাদের সমাজ দর্পণ , আমাদের নিজেদের ছবি , আমাদের পাওয়া ও না পাওয়ার ব্যথা ও আনন্দের বহিঃপ্রকাশের মঞ্চ বা স্থান যাই বলুন, আমদের প্রশ্ন ও উত্তরের একটি খোলা বই, এবং সেই থিয়েটারে ......রাজনীতির ভিটে বহু পুরনো ও চিরস্থায়ী, আমরা কি ভাবে সেই রাজনীতির সাথে নিজেদের সখ্যতা গড়ে নেব ও সেই সখ্যতা আমাদের দর্শকদের মনেও সঞ্চারণ করবো তা নির্দিষ্ট হবে আমরা যারা নাট্য কর্মী, আমরা যারা নাট্য দলগুলি নিয়ে থিয়েটার করি আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান কি ও আমাদের রাজনীতির মতাগত দর্শন কি তার উপর। রাজনীতি রান্নাঘর থেকে শুরু করে অফিস আদালত স্কুল কলেজ পাড়া প্রতিবেশী সর্বত্র বিদ্যমান, রাজনীতি ছাড়া কিছুই চলতে পারে না, কারণ সব কিছুর জন্যই যে নীতিগত আদর্শ দরকার, কাজেই রাজনীতি সবকিছুরই , আবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আর যেহেতু আমাদের থিয়েটার বা মঞ্চে সমাজের বিভিন্ন বিষয়, সমস্যা, বার্তা, স্বপ্ন, আদির পুনর্জন্মস্থল, “থিয়েটারে রাজনীতি” আমাদের সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। নাট্য কর্মী, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষ ও আমাদের সবার দায়িত্ব আমরা আমাদের মঞ্চ-থিয়েটার এবং সমাজ থিয়েটারে সক্রিয় ভাবে রাজনৈতিকবোধের প্রকাশ করা । আমাদের সমাজ ও দৈনন্দিন জীবনে আমাদের সমাজ থিয়েটারে আমরা অহরহ জান্তে অজান্তে কোথাও বাধ্য হয়ে, কোথাও স্বেচ্ছায় অভিনয় করে যাচ্ছি বা করতে হচ্ছে, এবং এই সমাজ থিয়েটারের রাজনীতিতে “রাজনীতি" শব্দটিকে সদর্থক ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে নাট্য কর্মীদের বিভিন্ন থিয়েটারের দর্শন ও কলাকৌশল অনুসারে বিনোদনের আস্তরণের মোড়কে শিক্ষা ও সমাজনীতি, নাগরিক চেতনা ও অধিকার বোধ, শোষণ ও দমনের বিরুদ্ধাচরণ, অহিংসনীতি পরায়ণতা, উগ্র জাতীয়তাবাদের পথ পরিত্যাগ , ইত্যাদি নানাবিধ বিষয়ের সংমিশ্রণের আকারে “রাজনীতি”র বোধের উন্মেষ ঘটাতে হবে, তবে তা একদিনে তো হবে না, কারণ তা একটি on going chain process । তবে সেই সাথে আরও একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, “ রাজনীতি” র রাজ ও নীতি দুটোই কিন্তু সরাসরি রাজনৈতিক নেতাদের ও নেতৃত্বের উপর নির্ভরশীল। কবে কোন রাম রাজ্য ছিল, কবে কোথাকার শুদ্ধধন ছিলেন, তখনকার রাজনীতি, কবেকার আকবর ও তার সভার নবরত্ন, কবেকার কৃষ্ণচন্দ্র ও গোপাল, বীরবলদের কাহিনী ও চিত্রনাট্য আমাদেরকে যে আভাস দেয়, যে রাজ্যের রাজা যত ভাল, রাজতন্ত্র সুষ্ঠু ভাবে পরিচালিত হয়, সেই রাজ্যে রাজনীতির থিয়েটারে রাজতন্ত্রের সাথে সমাজতন্ত্রের বিভেদ কম থাকে, প্রজারা ভাল থাকবে, রাজ্যে শিক্ষা, সংস্কৃতির পরিবেশ সৃষ্টি হবে, সেই সব রাজ্যে বা রাষ্ট্রে থিয়েটারে রাজনীতির মান অনেক উন্নত হয়। কিন্তু এখন তো সেই রাজতন্ত্রের জমানা শেষ, আগে রাজপরিবারের ভাবি রাজা ও রাজকুমারদের বিশেষ ভাবে রাজতন্ত্রের ভার গ্রহণ করার জন্য ছোটবেলা থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হত, মানসিক ভাবে তৈরি করা হত। আজকাল তো এসবের কোন বালাই নেই, এলেবেলে দুধভাত হলেই রাজনীতি তে হাতে খড়ী , তারপরেই তো সমাজের খুঁটি, আর কিছু জানার দরকার নেই। এক নিমেষে রাজনৈতিক দল গড়ে, ভোটে জিতে মন্ত্রী হয়ে কেল্লা ফতে আর কি। দেশ, জনগণ , সব গোল্লায় যাক। এদের আর কি দোষ, এদের বোধের দায়রায় এরা সবাই “সুবিধাবাদী পার্টি” র সদস্য এবং গণতন্ত্র নামক থিয়েটারে ওরা রাজনীতির রাজ কে বিদেয় করে “দুর্নীতি” আমদানি ও রপ্তানি করছে। যে দেশে জওয়ানরা, সেনা বাহিনী, সীমা সুরক্ষা বল, সমস্ত ছোট ও আধিকারিকের পদের জন্য UPSC, SSC, TET, SLAT, NET, AIEEE, JET,এরকম হাজার ধরনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়, পিয়নের চাকুরী থেকে শুরু করে শিক্ষকের নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু বাধ্যতামূলক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে ওদের চয়ন হয়, সেইখানে, সেনা , শিক্ষা, মেধা, অর্থনীতি, সমাজনীতি , ইত্যাদি ইত্যাদি যারা পরিচালনা করবেন , ওদের না কোন শিক্ষাগত যোগ্যতার দরকার, না তাঁদের ACCOUNTABILITY OR EFFICIENCY নামক কোন ভয় আছে। খুবই আশ্চর্যের যদিও, হয়তো আপনারা আমার লেখা পরে ভাবছেন আমার কি উদ্ভট ভাবনা ।
 
     

রবিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৩

বিচিত্র এই দেশ


।। ড. কফিল আহমেদ চৌধুরী।।  














চাকা ঘুরছে

টাকা পড়ছে,

চাষি ফাঁসিতে ঝুলছে

এদিকে রাজনেতার আঙ্গুল ফুলছে,

সরকার ধুঁকছে

পুঁজিবাদের সীমা ফুঁসছে

কালোবাজারিরা হাসছে;

পেঁয়াজ কাঁদাচ্ছে

আলু লাফাচ্ছে

তো লবন উধাও হচ্ছে।

সহায় সম্বলহীন সদা মলিন

রিক্তরা ক্রমশ হচ্ছে বিলীন।

আসছে সেই দিন

চা ও হবে চিনি বিহীন,

রসনার ব্যঞ্জন --

ছড়াবে সর্বত্র রোদন।

কী বিচিত্র এই দেশ

লাঞ্ছনার নেই শেষ।

বুধবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৩

বরাক উপত্যকায় কৈবর্ত সমাজের আর্থ-সামাজিক অবস্থান


                                    ।। শৈলেন দাস।।

কৈবর্ত সমাজের প্রধান গুণ হল তাদের সংঘবদ্ধ অবস্থান। তারা যেখানেই যায় দলবদ্ধভাবে বসবাস করে- অন্যদের থেকে একটু তফাত বজায় রেখে। তারা সাধারণত: সহজ-সরল জীবন যাপনে অভ্যস্থ। জলাভূমিবা হাওর অঞ্চলগুলিই বসবাসের জন্য তাদের অধিক পছন্দ। তারা কৃষিকাজ এবং মৎস্যচাষে পারদর্শী। কোন একটি অঞ্চলে বসতি স্থাপনের সময় তারা যথেষ্ট পরিমাণ কৃষি জমির দখলনেয় বা খরিদ করে এবং মাছ চাষের জন্যও উপযুক্ত জলাশয় খুঁজে নেয় বা তৈরী করে। ফলে তারা নিজেদের পরিবারের ভরণপোষণ করতে পারে সহজেই। কৃষিকাজের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তারা বিভিন্ন ধরণের গৃহপালিত পশু-পাখি প্রতিপালন করেও আর্থিকভাবে লাভবান হয়। গ্রাম প্রতি কয়েকটি পরিবার এমনও পাওয়া যায় যাদের আর্থিক অবস্থা যথেষ্ট মজবুত এবং বিষয় সম্পত্তির পরিমান শহুরে উচ্চপদস্থ চাকুরিয়ান বা ধনী বনিকের চেয়েও বেশীই হবে বৈকি কম নয়। কিন্তু সামগ্রিক চিত্র বড়ই ব্যঞ্জণাদায়ক। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং নানান প্রাকৃতিক প্রদূষণের ফলে প্রতিনিয়ত কমে যাচ্ছে ফসলের উৎপাদন এবং মৎস্য চাষেও ঘটছে ব্যাঘাত। এহেন পরিস্থিতিতে দিনে দিনে গ্রামীণ কৈবর্তদের ভাঁড়ার ক্রমশ: শূন্য হয়ে পড়ছে। গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার মত প্রায় প্রতি বছরই বন্যার জলে ডুবে যাচ্ছে কৃষিজমি, ভেঙ্গে যাচ্ছে জলাশয়ের বাঁধ। বাধ্য হয়ে জীবিকার সন্ধানে তারা শহরাভিমুখে রওয়ানা হচ্ছে নিজেদের ভিটে মাটি ফেলে– ধরে রাখতে পারছেনা নিজেদের স্বাভিমান। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সর্বসান্ত হয়ে বেশির ভাগ কৈবর্তই আশ্রয় নিচ্ছে শহরতলীর নীচু, পরিত্যক্ত এলাকাগুলিতে। স্ত্রী-পুত্র-কন্যার মুখে দুবেলা দুমুঠো অন্ন তুলে দিতে তারা হন্যে হয়ে ঘুরছে কাজের সন্ধানে। যেহেতু কৃষি কাজ এবং মৎষ্য চাষের উপর নির্ভরশীল কৈবর্ত সমাজের তরুণ প্রজন্ম কারিগরি বিদ্যা অর্জন করেনি এবং অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেনি তাই বাঁচার তাগিদে তারা প্রবৃত হয়েছে এমন সবকাজ করতে যা শহুরে বাবুদের কাছে ছোটকাজ বলে পরিগণিত। ফলস্বরূপ আর্থ-সমাজিক ক্ষেত্রে কয়েক ধাপ পিছিয়ে পড়েছে এই সমাজ। অন্যান্যদের কাছে আজ তারা ব্রাত্য,অবহেলিত কখনো বা করুণার পাত্র। যে কৈবর্ত বছরে শতাধিক মণ ধান ঘরে তুলত, যার বাড়ির পুকুরে লক্ষাধিক টাকার মাছ চাষ হত, যার সন্তানদের দুবেলা দুধ-ভাত না হলে চলত না, অবস্থার দুর্বিপাকে আজ তারা এক কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি।
                সামগ্রিকভাবে কৈবর্ত সমাজ পিছিয়ে পড়ার প্রধান কারণ হল তাদের বাসভূমির ভৌগোলিক অবস্থান। হাওর বা জলাভূমি কেন্দ্রিক গ্রামগুলিতে কৈবর্তরা কৃষিকাজ, মাছ চাষ এবং গবাদি পশু প্রতিপালন করে নিজেদের জীবিকা অর্জনে সক্ষম হলেও অপর্যাপ্ত যোগাযোগ এবং পরিবহণ ব্যবস্থার দরুণ শহর তাদের কাছে দূরের দেশ। তাই কৃষিজাত সামগ্রী সরাসরি নিজেরা বাজারে বিক্রি করে দু-পয়সা বাড়তি আয় করা তাদের কাছে কষ্টকর যাত্রা। তাছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য,বিশুদ্ধ পানীয় জল এবং ইলেকট্রিসিটির জাদুকাঠির ছোঁয়া থেকেও বঞ্চিত কৈবর্ত সমাজ বছরের পর বছর প্রাকৃতিক নানা ঘাত প্রতিঘাত সয়ে সয়ে ক্লান্ত হয়ে আটকে পড়েছে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে। বুঝতেই পারছেনা যে তারা ক্রমশ: পিছিয়ে পড়ছে অন্যদের থেকে। তাদের চিন্তাভাবনায় লাগেনি আধুনিকতার ছোঁয়া। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে, সবার সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার দৌড় থেকে বিরত থেকে অন্যদের কাছে যথাযত মর্যাদা পাচ্ছেনা এই সমাজ।
         তবে কি বাসভূমির ভৌগোলিক অবস্থনের জন্যই বর্তমানে কৈবর্ত সমাজের এই আর্থ-সামাজিক অবনমন? উত্তর হল- না। কৈবর্ত সমাজের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হল রাজনীতি। গণতন্ত্রে গুণের চেয়ে সংখ্যার প্রাধান্যই বেশি এবং বরাক উপত্যকার দুটি লোকসভা সমষ্টিতে কৈবর্ত সমাজের ভোটারসংখ্যা নেহাত কম নয়। করিমগঞ্জে তো কী-ফ্যাক্টর। তাছাড়া শিলচর, আলগাপুর, কাঠিগড়া, রাতাবাড়ি প্রমুখবিধানসভা সমষ্টিগুলির প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ে কৈবর্ত ভোটারদের একটা প্রভাব থেকেই যায়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এমন একটিসমাজের গুরুত্ব বা মর্যাদা দল মত নির্বিশেষে সবার কাছে অপরিসীম হওয়ার কথা। সেইঅনুযায়ী এই সমাজের সার্বিক উন্নয়ণ হওয়াও ছিল বাঞ্চনীয়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভাব প্রতিপত্তি যথেষ্ট থাকার কথা এই সমাজের। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুচতুর শাসক শ্রেণী সুশিক্ষিত, মেধাবী এবং সুযোগ্য কৈবর্তদের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে উঠেআসার পথকে দুর্গম করে তুলেছে। অনেক ক্ষেত্রে তো চক্রান্ত করে গোড়াতেই নষ্ট করে দিয়েছে কৈবর্ত সমাজের তরুণ প্রতিভাকে। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দি পেরিয়েও ‘সেই ট্রেডিশন সমানে চলেছে’। কৈবর্ত জাতি কখন বুঝবে এইকথা?
             কেউ হয়ত যুক্তি দেখাতেই পারেন সাংসদ বা বিধায়কও তো অনেকেই হয়েছেন এই সমাজ থেকে, তাছাড়া জেলাপরিষদ সদস্য, পঞ্চায়েত প্রতিনিধি বা পৌর সদস্যও তো হয়েছেন অনেক কৈবর্ত। তাদের অনুরোধ করব ভেবে দেখতে নিজের সমাজের জন্য কাজ করতে কতটুকু স্বাধীন ছিল তারা। বলিষ্ট রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বহীন সমাজ স্বার্থপর ভারতবর্ষে এগিয়ে যাবে কি করে? সাধারণ কোঠায় রাজনীতির কথা বাদ দিলেও অনুসূচিত জাতি পরিষদ এবং অনুসূচিত জাতিপর্ষদেও কৈবর্ত প্রতিনিধিত্ব হতাশাজনক এবং ধিক্কারযোগ্য। পরিসংখ্যান অনুযায়ী যারা সংখ্যাধিক্য তাদের মাত্র দুই বা তিনবারই সুযোগ দেওয়া হয়েছে অনুসূচিত জাতি পর্ষদের চেয়ারম্যান হওয়ার। অনুসূচিত জাতি পরিষদের জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত কোন কৈবর্তের সৌভাগ্য হয়নি এই সংস্থাটির সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক হওয়ার। বিচিত্র এই দেশ বিচিত্র তার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা! রাষ্ট্রক্ষমতা যেহেতু তাদের অনূকূলে নয় তাই সমগ্র দেশে গ্রামীণ বৈদ্যুতিকরণ প্রকল্প শুরু হলেও কৈবর্ত সমাজ অধ্যূষিত বরাকের অঞ্চলগুলি সুর্যাস্তের সাথে সাথে টুপ করে অন্ধকারে ডুবে যায়। স্বাস্থ্য এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে এমনভাবে পঙ্গু করে রাখা হয়েছেযে সাধারণ রোগে ভোগলেও সদর হাসপাতালে পৌঁছতে পৌঁছতে এই এলাকাগুলির মানুষকে ‘যমের দোয়ার’ দেখতে হয়। বিশুদ্ধপানীয় জল এই এলাকাগুলিতে সরবরাহ করা হয় ‘অকাল বৃষ্টি’র ন্যায়। তবে বঞ্চনারএই সাতকাহনের দায় কৈবর্তদের নিজেদেরও কিছুটা বহন করতে হবে। প্রচলিত ধ্যান-ধারণা বদলে এবং আবেগিক রাজনীতি পরিহার করে দলব্ধভাবে বসবাস করার মত সম্মিলিতভাবে কেবল একটি রাজনৈতিক দলকে সমর্থন দিয়ে সেই দলের আস্থা অর্জন করলে মন থেকে না চাইলেও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণে হলেও কোন কোন নেতা বা নেত্রী প্রতিনিয়ত ব্রতী হবে কৈবর্ত সমাজের সার্বিক মঙ্গলকামনায়। উন্নয়ণের স্বার্থে সুযোগ্য ব্যক্তিত্বের পাশে একজোট হয়ে দাঁড়ালে কৈবর্তজাতির নরকযন্ত্রণা ভোগ কিছু লাঘব হওয়ারই কথা। তবে এক্ষেত্রে কৈবর্ত সমাজকে পা ফেলতে হবে সতর্কতার সাথে, কারো একনিষ্ট সমর্থক হলেও যেন  ক্রীড়নক না হয় গোটা সমাজ। সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনা করে চলতে হবে, বুঝতে হবে কার কৈবর্ত প্রীতি লোক দেখানো এবং কার নীতিই কৈবর্তদের মঙ্গল কামনা করা।
              একক সমাজ হিসাবে কৈবর্ত সমাজের সংঘবদ্ধঅবস্থান এবং সামাজিক সংকটের মূহূর্তে একজোট হয়ে লড়াই করার মানসিকতায় অনেকেই বিরক্ত এবং ঈর্শান্বিত। তাই কলে-কৌশলে তাদের দৃঢ় এবং মজবুত মেরুদণ্ডকে দুর্বল করে দিতে শাসক শ্রেণীকে প্রভাবিত করে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে এই সমাজ অধ্যূষিত এলাকাগুলিকে। বরাক উপত্যকার কৈবর্ত সমাজ অধ্যূষিত এলাকাগুলি যেমন- কাঠিগড়া, চাতলা, বক্রিহাওর, শনবিল, পুটিছড়া, মালিনীবিল, তপোবননগর, রংপুর, তাপাং, কালিবাড়িচর প্রভৃতিকে শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে রাখা হয়েছে অমানবিকভাবে। অধিকাংশ এলাকাতেই নেই প্রাথমিক বিদ্যালয়। কোন কোন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে দু-একটি বিদ্যালয় থাকলেও সে সবের হাল হকিকত খোঁজ করার মানসিকতা নেই কোনসরকারি কর্মকর্তার। কোন অজ্ঞাত কারণে এই এলাকাগুলিতে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়নি অথচ সমগ্র আসামে শিক্ষাক্ষেত্রে চলছে আমূল সংস্কার। তাছাড়া ভঙ্গুর যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অপ্রতুল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রজন্মেরপর প্রজন্ম কৈবর্ত সমাজ বঞ্চিত হয়ে আছে উচ্চশিক্ষা লাভ থেকে। ফলস্বরূপ সরকারি চাকুরিয়ানের সংখ্যা অতি নগণ্য এই সমাজে। তাই বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প বা সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তি থেকে তারা বঞ্চিত। তবে আশার কথা কৈবর্ত সমাজের একাংশ যুবক-যুবতি পারিপারিক আর্থিক সচ্ছলতার কারণে এবং কয়েকজন গরীব তরুণ-তরুণী লড়াইয়ে টিকে থাকার অদম্য আত্মবিশ্বাসে যাবতীয় বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে চলেছে। আসাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ন্যাশনাল ইনষ্টিটিউট অফ্ টেকনোলজির শিলচর কেন্দ্রে প্রভাষক হিসাবে মর্যাদা সহকারে দায়িত্ব পালন করছে কয়েকজন কৈবর্ত গুণীজন। ডজনখানেক কৈবর্ত সন্তান বরাক উপত্যকার বার সংস্থাগুলিতে সুনামের সাথে আইন ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ ডিগ্রীধারী ডাক্তার, পদস্থ সরকারি আমলা, কলেজ শিক্ষকও রয়েছেন যাদের শিরায় কৈবর্ত রক্ত বহমান। প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় গুলিতেও কৈবর্ত সন্তানরা আদর্শ শিক্ষকরূপে পাঠদান করে গড়ে তুলছে দেশের নতুন প্রজন্মকে। সাহিত্য, সঙ্গীত এবং সংস্কৃতি চর্চায়ও ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ ঘটছে কৈবর্ত সমাজের তরুণ প্রতিভাদের। এই পরিসংখ্যান ক্রমশ: বেড়েই চলছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক তথ্য হল উচ্চশিক্ষা লাভ করে এই সমাজের যারাই অগ্রসর হয়েছে তাদের অধিকাংশই সরে গেছে বৃহত্তর কৈবর্ত সমাজকে ছেড়ে। বাঁচার তাগিদেই হোক আর আত্মগ্লানিতেই হোক কৈবর্ত মায়ের আঁচল ধরে হাঁটতে আজ তারা কুণ্ঠিত, লজ্জিত। গর্ব করার মত উপকরণ সমৃদ্ধ হয়েও কৈবর্ত সমাজ আজ নিদারুণ গ্লানিতে ভোগছে। কৈবর্ত মায়েরা তাই নীরবে চোখের জল ফেলে, সন্ধ্যা হলে পথের ধারে দাঁড়িয়ে ডাকে- ‘আয় খোকা আয়, ফিরেআয়’।

মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর, ২০১৩

বিষয় ‘সাহিত্য’

                                   ।। সপ্তর্ষি বিশ্বাস।।

প্রথম পর্ব

১।

     
      আ
সল কথাটি এই, যে, শিল্পের কাছ থেকে, সাহিত্যের কাছ থেকে কে ঠিক কী চাইছে। শিল্পের অন্য বিভাগের কথা আপাততঃ তুলছিনা। আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখছি সাহিত্যক্ষেত্রেই। যদিও সময়ের হাত ধরে কিছু গ্রন্থ যুগে যুগে পাঠকের হাতে এসে পড়ে 'ক্লাসিক' বলে তবু তার থেকেও বিশেষ পাঠকজন তার বিশেষ চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে নির্মাণ করে তার নিজস্ব পাঠের, ক্লাসিকের নির্জন দ্বীপ।
           সাহিত্যের কাছে আমার চাওয়ার প্রথম নির্ণায়ক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপরে ক্লাস নাইন-টেন্‌ থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত হয়ে বঙ্কিম, মধুসূদন দত্ত ছুঁয়ে বিদেশী সাহিত্য। প্রথমে রাশিয়া – বাংলা অনুবাদে গোগোল, চেকভ্‌, দস্তয়েভস্কি, টলস্টয়। সহজ ইংরেজিতে শেক্সপীয়ার। সঙ্গে আনন্দমেলা, শুকতারা, কিশোর ভারতী ...
       প্রথমবার যখন 'পথের পাঁচালী' পড়েছিলাম, ক্লাস সিক্সে, এক গরমের ছুটিতে – সেই অনুভুতি মনে পড়ে আজো। মনে পড়ে একটা আনন্দ অথচ চোখে জল। মনে পড়ে পড়তে পড়তে বই বন্ধ করে দূর আকাশের দিকে চেয়ে থাকা। যেন অন্য একটি পৃথিবীতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলা ... আরেকটু পরের বয়সে পড়লাম 'দৃষ্টিপ্রদীপ'। হ্যাঁ, সেই পাঠ মর্মে জাগালো প্রথম সেই প্রশ্ন – মৃত্যু কী? 'দৃষ্টিপ্রদীপ' এর নায়ক 'জিতু' যা দেখতে পায় তা’ কী? মৃত্যুর পরে কী হয়? আছে কি অন্য কোনো পৃথিবী? আত্মা? – রবীন্দ্রনাথের গানে হারিয়ে যাওয়ার গহনেও ক্রমে টের পেলাম, আপনাতে, ঐ একই প্রশ্ন – তার উত্তরের ইঙ্গিত, উত্তরের দিকে অভিযান ...

              হ্যাঁ, আজো সাহিত্যে মূলতঃ তা’ই খুঁজি। লেখকের ভঙ্গী, কেতা – সমস্তকে ছাপিয়ে আমি অনুভব করতে চাই – জন্ম আর মৃত্যুর ‘ইন্টিগ্রেল ক্যাল্‌কুলাস’ এর হাতির শুঁড়ের দুদিকে ঠিক কী বসিয়ে রেখেছেন লেখক? আর তার মধ্যকার অনন্তে তিনি গড়ে নিয়েছেন ঠিক কেমন পৃথিবী ? সাহিত্যের কাছে যে পৃথিবী আমি চাই তার বর্ণন, পরে, পেয়েছিলাম জীবনানন্দে যেখানে তিনি বলছেনঃ ‘পৃথিবীর সমস্ত জল ছেড়ে দিয়ে যদি এক নতুন জলের কল্পনা যায় কিংবা পৃথিবীর সমস্ত দীপ ছেড়ে দিয়ে এক নতুন প্রদীপের কল্পনা করা যায় – তাহলে পৃথিবীর এই দিন, রাত্রি, মানুষ ও তার আকাঙ্খা এবং সৃষ্টির সমস্ত ধূলো সমস্ত কঙ্কাল ও সমস্ত নক্ষত্রকে ছেড়ে দিয়ে এক নতুন ব্যবহারের কল্পনা করা যেতে পারে যা কাব্য’ – আমি বলবো তা’ই শিল্প। তা’ই সাহিত্য। বিভূতিভূষণের ‘অপু’র যে পৃথিবী তা এমনি, যেমন রবীন্দ্রনাথের 'গোরা’র বা সুচরিতার, বঙ্কিমের ‘কুন্দ’র , যেমন প্রথম পর্বের শ্রীকান্তর, যেমন লেভিনের, প্রিন্স্‌ মিশকিনের, কার্মাজোভ ভ্রাতাদের... কিন্তু ঐ পৃথিবীযে তাঁরা নির্মাণ করছেন তা কোনোখানে টের পাওয়া যায়না বলেই সেই পৃথিবী যুগে যুগে গ্রাস করে ফেলে পাঠকমানস। পাঠকের অনুভব হয় যে ঐ পৃথিবী তার নিজের চারিধারের পৃথিবীর মতোই – হয়ে ওঠা। টলস্টয় what is art এ’র এক জায়গায় তিনি লিখেছেনঃ  The fourth method (সাহিত্য ‘নির্মাণ’ এর) is that of interesting (that is, absorbing the mind) in connection with works of art. The interest may lie in an intricate plot a method till quite recently much employed in English novels and French plays, but now going out of fashion and being replaced by realism, that is, by detailed description of some historic period or some branch of contemporary life. For example, in a novel interest may consist in a description of Egyptian or Roman life, the life of miners, or that of the clerks in a large shop. The reader becomes interested, and mistakes this interest for an  artistic impression. The interest may also depend on the very method of expression; a kind of interest that has now come much into use. Both verse and prose, as well as pictures, plays, and music, are constructed so that they must be guessed like riddles, and this process of guessing, again, affords pleasure and gives a semblance of the feeling received from art.
         
         সমস্ত দেশের সাহিত্যে, বিশেষ করে বাংলায় ঐ ‘আমদানীকৃত' বাস্তবতা ‘সাহিত্য’ এই ছদ্মবেশে ঢুকে পড়েছে অনেকদিন। ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’ আর অমিয় ভূষণের 'গড় শ্রীখন্ড' তাদের অনেক ভালো element সত্ত্বেও শেষ বিচারে ঐ পর্যায়ের যেখানে সাহিত্য থেকে ভঙ্গীই প্রধান। যখনি এদের নিয়ে দাঁড় করানো যায় ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘ইছামতী’ বা ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র কিনারে তখনি টের পাওয়া যায় তাদের রূপের অসত্যতা। কিন্তু আবার ঐ লেখাগুলিকেই গৌরকিশোরের 'প্রেম নেই' বা সমরেশের ‘গঙ্গা’র পাশাপাশি দাঁড় করালে মনেহয় যেন তারা ঝুটা মুক্তা নয়!
            প্রকৃত প্রস্তাবে সাহিত্য যেহেতু জীবনবোধেরি সন্ততি তাই যাঁর মর্মে জীবনপ্রশ্ন করতে পারে যতো গভীর ক্ষত তার সাহিত্য ততো বেশী অনায়াসে গড়ে নিতে পারে তার আপন গ্রহটি। এই হেতুই যতো নিকটবর্তী সময়ের দিকে নজর যায় দেখা যায় কোনো লেখকের একটি রচনা প্রায় ক্লাসিক হয়ে উঠলেও অন্য লেখা স্রেফ অপাঠ্য। প্রেমাঙ্কুর আতর্থী যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। 'মহাস্থবির জাতক' ভিন্ন তাঁর অন্য কোনো রচনা স্রেফ কালি কলম আর সময়ের অপচয়। সময় যতো বেশি জটিল দেহ পরিগ্রহ করেছে ঐ সব লেখকেরা ততোই হারিয়ে ফেলেছেন পথ। তাঁদের জীবনবোধের অসারতার ছায়া ফুটে উঠেছে তাঁদের সাহিত্যে। ফলতঃ পরিকল্পনা করে ক্লাসিক লিখতে গিয়ে আসলে যা লিখেছেন তা ব্যর্থ ডকুমেন্টারি। ( আবার প্রকৃত প্রতিভার হাতে পরলে ডকুমেন্টারিও যে গড়ে নিতে পারে অপর পৃথিবী তারও ঢের প্রমাণ রয়ে গেছে। অবধূতের ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ বা প্রবোধ কুমার সান্যালের 'মহাপ্রস্থানের পথে'র কথা মনে আসছে এই মাত্র।)। যাঁরা হারাননি তাঁদের রচনায় আছে ঐ নদী যা 'পৃথিবীর সমস্ত জল ছেড়ে দিয়ে যদি এক নতুন জলের কল্পনা' ... আর ঐ সমস্ত রচনাতে কোনো না কোনো ভাবে লেখক রেখে গিয়েছেন তাঁর নিজস্ব অনুভবে প্রতিফলিত জন্ম-মৃত্যুর রহস্য।
          ঐ নদী যা 'পৃথিবীর সমস্ত জল ছেড়ে দিয়ে যদি এক নতুন জলের কল্পনা' তারি সন্ধান আমার পাঠ। তারি উপস্থিতিকে টের পাওয়ার মর্মে আমার কোনো লেখকের, কোনো লেখার প্রতি মুগ্ধতা। তাঁর ‘সচেতন’ চিন্তাকে আমি চাইনা তাঁর গল্পে, কবিতায়, উপন্যাসে। সেসবের জন্যে তাঁর কাছে যদি যাই ও তাহলেও দেখবো তা তাঁর রচনায়, জীবনান্দের ভাষায়, ‘অর্ধনারীশ্বর' এর মতো এসেছে কি’না। যদি আসে তবে তিনি তত্ত্বকথা বল্লেও তা সাহিত্য, তথ্য শোনালেও তা সাহিত্য আর তা যদি নাহয় তাহলে সেগুলি নেহাৎই 'তিস্তা পারের বৃত্তান্ত' – ভঙ্গীর কারিগরি আর তথ্য ও তত্ত্ব পরিবেশনের মাধ্যমে পাঠককে সহজে মাতাল করার প্রচেষ্টা।
১১/১১/২০১৩

২।
         
   চিত্রকলা, সাহিত্য, সঙ্গীত, চলচ্চিত্র সমস্তই মূলতঃ কোনো না কোনো ভাবে রূপেরি সৃজন। তথাপি  মাধ্যমের ভিন্নতার জন্য একই রূপের প্রকাশভঙ্গী প্রতিটি মাধ্যমে ভিন্ন। এতদ্বতিত রূপের মাত্রাও ভিন্ন।  কবি আলোক সরকার একবার বলেছিলেন সমস্ত শিল্পই মূলতঃ নির্মাণ। সচেতন নির্মাণ। কিন্তু সফল শিল্প তা’ই যার শরীরে নির্মাণের ‘দাগ’ গুলিকে আর চেনা যায়না আলাদা করে। - আমার বোধ বুদ্ধিতে এ’ই আসল সংজ্ঞা। রূপের।
            অপু’র পৃথিবী নির্মাণ করেছেন বিভূতিভূষণ। অবশ্যই তা সচেতন ভাবে। কিন্তু উপন্যাস শরীর থেকে তাঁর গাঁইতি, হাতুড়ির দাগ এমন ভাবে মুছে দিয়েছেন যে পাঠকের অনুভব হয় এ যেন দৈবাদিষ্ট রচনা। বিভুতির এই শান্ত পরিবেশের পাশাপাশি যদি দস্তয়ভস্কির ব্রাদার্স্‌ কার্মাজভ্‌’কে নেওয়া যায় – যেখানে প্রতিটি মুহুর্ত্ত উত্তেজনায়, দার্শনিক তর্কে টান্‌টান্‌, যেখানে প্রতিটি চরিত্র কোনো না কোনোভাবে স্নায়ু রোগী, যেখানে উপন্যাসের দিগন্ত আরো বিস্তৃত – সেখানেও তাঁর নির্মাণের গাঁইতি, হাতুড়ির দাগ যায়না চিনে নেওয়া। এবার যদি আদ্যন্ত মেধা নির্মিত উপন্যাস – কামু’র 'প্লেগ্‌'কে নিয়ে ভাবা যায় তাহলেও দেখা যাবে ঐ একই ব্যাপার। নির্মাণের সীজার চিহ্ন নেই। রচনার উদ্দেশ্য ঘোষিত নয়। নিটোল শিশুটি। যেমন রবীন্দ্রনাথের 'ঘরে বাইরে', 'গোরা' বা 'যোগাযোগ'। বঙ্কিমের 'বিষবৃক্ষ', 'কৃষ্ণকান্তের উইল'।
             সময়ের আরো বিস্তীর্ণ পটভূমি, আরো বেশি চরিত্র নিয়ে যে উপন্যাস 'ওয়ার এন্ড্‌ পিস্‌' – যাতে টলস্টয়ের নিজস্ব দর্শনের বহু বীজই নিহিত সেখানেও একই ঘটনা। প্রসাধন অবশ্যই আছে। কিন্তু পাখিটির চেয়ে খাঁচাটি বড় করে চোখে পড়েনা। আঁচলের ভাঁজে স্তনের রেখা দেখা যায় ঠিক কিন্তু তার জন্যে বার বার নির্লজ্জের মতো আঁচল খসাতে হয়না। জয়েসের উইলিসিস্‌ যেমন – যে একবার পেয়ে গেছে ঐ রচনায় প্রবেশের পথ সে ঐ পথে – ডাবলীনের রাস্তায় রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে নিজের অজান্তেই চলে এসেছে নিজের ছোট্ট মফস্বলে – নিজের পাপ-তাপে নির্মিত নিজস্ব পৃথিবীতে। যেমন ঘটে কমলকুমারের সফল উপন্যাস গুলিতে। তাঁর ভাষার অদ্ভুত বুনন সত্ত্বেও 'অন্তর্জলী যাত্রা' বা 'পিঞ্জরে বসিয়া শুক'কে মনেহয় না ‘নির্মিত’। মনে হয়না এর আবডালে লেখকের কিছু 'বক্তব্য' আছে। 'অভিসন্ধি' আছে। - অথচ 'বক্তব্য'  আর 'অভিসন্ধি' আছে। থাকে। থাকতে বাধ্য। প্রতিটি সফল রচনায় থাকে। থাকবে। কিন্তু তা বেরিয়ে পরবেনা । টের পাওয়া যাবেনা যে লেখক এবার বলতে চলেছেন একটি সময়ের 'ইতিহাস'। তিনি থামবেন না, নিরস্ত হবেন না সেই  'ইতিহাস'টুকু – আর ঐ  'ইতিহাস' নিয়ে তাঁর 'তত্ত্ব' টুকু না জানান দিয়ে – যেমন ইলিয়াসের 'খোয়াবনামা', যেমন গৌরকিশোরের 'প্রেম নেই', যেমন অমিয় ভূষণের 'গড় শ্রীখন্ড'। - হ্যাঁ, লেখক হিসেবে গৌরকিশোর আখতারুজ্জামান থেকে নিম্ন স্তরের বলে তাঁর রচনার বেহায়াপনা পাঠককে বেশি বিরক্ত করে। তবে আখতারুজ্জামান, মূলতঃ উপন্যাসটির শেষের দিকে এসে, কাহন কে লম্বা করেন তাঁর 'ইতিহাস' বলার 'দায়িত্ববোধ' থেকে যেটা অমিয়ভূষণে আসে নানা রকম কসরত্‌ দেখানোর মাধ্যমে। - ওই কাহ্নেই রূপের দেবী তাঁদের প্রতি বিরূপ।

               পাশাপাশি আবু ইস্‌হাকের 'সূর্য দীঘল বাড়ি'কে আনলে ব্যাপারটা বোঝা যায় আরো গভীর ভাবে। দুইটি বালক-বালিকা, যেন অন্য আবহের অপু-দুর্গা হয়ে টেনে নেয় পাঠককে। ঐ স্রোতে আপনি  ভেসে আসে হিন্দুস্থান-পাকিস্তান’এর  'ইতিহাস'এর ছায়া। আবার তা ভেসেও যায় স্রোতে। আসে সামন্ত ব্যবস্থার, মুসলমান সমাজ ও বিবাহ ব্যবস্থার অন্ধকার দিক গুলো। অবলীলায়। তা’ও আবার ভেসে যায় ঐ “অন্য নদীর অন্য জল”এর টানে। - অর্থাৎ নির্মাণের সীজারের দাগ উল্কি হয়ে বসেনা উপন্যাস শরীরে।    খুব সূক্ষ্মভাবে হলেও 'লাল সালু' বা 'কাঁদো নদী কাঁদো'তে এক সময় টের পাওয়া যায় লেখকের 'বক্তব্য'। আর তাই শেষ বিচারে আমার মন তাকে বলতে পারেনা ক্লাসিক্‌ বলে। পাশাপাশি 'তিতাস একটি নদীর নাম' অনেক বিস্তৃত পটভূমি নিয়ে, বহু বহু চক্রবাল ছুঁয়ে বয়ে যায় অবলীলায়। ঠিক যেমন বিমল মিত্রের 'বেগম মেরী বিশ্বাস'। লেখক বলেন গল্প। বাঁকে বাঁকে ইতিহাস ফেলে ছায়া। দুয়ের লাঠালাঠি বাধেনা কোথাও। আবার প্রমথনাথ বিশীর 'কেরী সাহেবের মুন্সী'র প্রথম পংক্তি থেকে টের পাওয়া যায় যে লেখক সাড়ম্বরে সভা ডেকে শোনাতে যাচ্ছেন  'ইতিহাস'।

          'রূপ' –এ’ই। নির্মাতার ছেনি-হাতুড়ির দাগ, সীজারের দাগ থাকবেনা উপন্যাস শরীরে আবার সুনীল গাঙ্গুলির মতো কাঠামোর কাছা খুলে যাবেনা যখন তখন। 'রূপ' এর দিক থেকে আরেকজনের নাম না বলে পারছিনা। তিনি প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়। যাঁরা তাঁর 'রত্নদ্বীপ' অন্ততঃ পড়েছেন তাঁরা টের পেয়ে থাকবেন গল্প বলার মুন্সীয়ানা সেখানে কি জটিল-সুন্দর।
৩।
        
     এই রূপটি একটা সময় পর্যন্ত বাংলা ভাষার  'মুখ্য' লেখকের সবারি রচনায় ছিল উপস্থিত। মানিক এবং তার পরের সময় থেকেই দেখি অনটন। মানিকের রচনাপথ ক্রমে কম্পিত। অন্য কেউও আর এসে দাঁড়াচ্ছেন না বিভূতি , তারাশংকর বা সতীনাথ ভাদুড়ি’র মতো বিরাট স্কন্ধ নিয়ে। আরম্ভ হয়েছে বুদ্ধদেব বসু’র বুঝে না বুঝে পশ্চিমকে অনুকরণের যুগ। এর মধ্যেও শিবরাম চক্রবর্তী’র মতো প্রতিভা, এক দুইজন জ্বলে যাচ্ছেন। কিন্তু পারিপার্শ্বিকের ডামাডোলে মধ্য গগনে আলো ছড়াতে দেওয়া হচ্ছেনা তাঁদের। 'মিহি ও মোটা'য় মিলিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন প্রেমেন মিত্তির। - হায়, তথাকথিত 'সিরিয়াস' লেখালেখির দিকে না গিয়ে প্রেমেন মিত্তির যদি তাঁর অলৌকিক গল্পগুলি, মামাবাবু, ঘনাদা – এগুলোই শুধু লিখে যেতেন তাহলে বাংলার পাঠক টের বেশী উপকৃত হতো তাঁর দ্বারা!
            বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস শোনাতে বা বিশ্লেষণ করতে বসিনি আজ। তাই সাল ধরে ধরে হোঁচট খেয়ে পথ হাঁটার মানে নেই। যে প্রসঙ্গে বলছিলাম সেখানেই ফিরে আসি। ফিরে আসি রূপহীন বাংলা সাহিত্যের কথায়। ফিরে আসি বুদ্ধদেবের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আমরা যা যা হারালাম সেই কাহনে। - প্রথমেই মনে আসছে তাঁর কথা যাঁর হাত থেকে আমরা পেয়েছিলাম ‘কত অজানারে’, ‘চৌরঙ্গী’, ‘এপার বাংলা ওপার বাংলা’র মতো রচনা সেই ‘শংকর’ এর কথায়। - শংকরের উল্লিখিত রচনাগুলি রূপের দিক থেকে প্রায় ক্লাসিক। কিন্তু শংকরের যা ছিলনা তা সেই অন্তর্দৃষ্টি যা থাকলে চোখের পর্দায় উদ্ভাসিত হয় অন্য চক্রবাল – যা উন্মোচিত হয়েছিল অপু’র, জিতু’র, জাঁ ক্রিস্তফের ও তাদের শ্রষ্টাদের চোখে, যা পাঠককে ফিরে ফিরে ভাবতে বাধ্য করে – এই ব্রহ্মান্ডের কোনো নিশ্চিত অভিপ্রায় রয়েছে কি’না এই কথা, কে আমি, কি আমি, কেন আমি – এই কথা... অর্থাৎ আমাদের নগণ্য যাপনকে ছুটিয়ে দেয় মহাজীবনের চক্রবালের দিকে... এই অন্তর্দৃষ্টি ছিলনা বলেই শংকরের উল্লিখিত রচনা গুলিও ক্লাসিক হতে হতেও ‘ভালো উপন্যাস’ হয়েই রয়ে গেলো। পরেও আর তেমন কিছু হলোনা তাঁর লেখনী থেকে।

          ঐ না-হওয়ার বৃত্তান্তই, এর পরে প্রায় সর্বত্র। বুদ্ধি দিয়ে, নানা তত্ত্ব পাঠ করে, সেইসব তত্ত্বকে হজম না করতে পেরে তা উগ্‌ড়ে দিতে লাগলেন একদল লোক। গৌরকিশোর ঘোষ যাঁদের অগ্রগণ্য। ‘অন্ত্যজ’দের গপ্পো বলার নামে পর্ণগ্রাফিতে লাগলেন আরেকদল। অনবদ্য ভাষা ও নির্মাণ কুশলতা সত্ত্বেও সমরেশ বসু’র মতন লেখকওযে অন্তিমে ঐ পথই নিয়েছিলেন তার হেতু যুগধর্ম’কে অস্বীকার করতে না পারা – যে না পারার মর্মে নিজস্ব বিশ্বাসের ভিত্তিহীনতা। - ক্রমে যা দাঁড়ালো তা এই, যে, ‘প্রিয় উপন্যাস’ যদিবা খুঁজে নিতে সক্ষম হয়েছেন প্রকৃত পাঠকজন কিন্তু একজন  'প্রিয় ঔপন্যাসিক' আর পাওয়াই গেলোনা।
           অথচ অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে', 'অলৌকিক জলযান' – এমন কি 'ঈশ্বরের বাগান' হেন অনবদ্য লেখাও কিন্তু হয়েছে। আবার তার পরেই সেই লেখকের হাতেই এমন কিছু লিখিত হয়েছে যে পাঠক চমকে উঠেছে। হ্যাঁ, এখানেও তর-তম’র প্রশ্ন আসে। যেমন অতীন বন্দ্যোপাধায়ের 'খারাপ লেখা' যতোটা খারাপ তার চেয়ে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'মাঝারি লেখা' অনেক বেশি খারাপ। অথচ শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ই কিন্তু লিখেছিলেন 'শাহজাদা দারাশুকো' বা 'কুবেরের বিষয় আশয়'...
     কিছু ঔপন্যাসিক অকম্পিত যাত্রায় লিখে গিয়েছেন মাঝারি মানের লেখা। যেমন রমাপদ চৌধুরি। তাঁর সমস্ত লেখাই বহুদূর  'ভালো' কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনোখানে তা ব্যর্থ হয়ে গেছে লেখার গহনের উদ্দেশ্যটির প্রকটতায় ( যেমনঃ খারিজ, লজ্জা, দাগ – ইত্যাদি) আর কিছু নির্মাণ কুশলতার অভাবে ( 'দ্বীপের নাম টিয়া রঙ', 'বন পলাশীর পদাবলী' – ইত্যাদি)। অর্থাৎ অন্তিমে অকম্পিত যাত্রায় সফল নন কেউ। - সেই অর্থে যাঁরা 'অফ্‌বীট্‌'-'প্যারালাল' – যেমন অমিয়ভূষণ, তাঁদের ব্যর্থতার কথা আগেই বলেছি।
          এই সমস্ত গোলমালের মধ্যেও যে দুইজন মানুষের রচনার কাছে অদ্যাপি বসতে হয় স্থির হয়ে তাঁরা – বিমল কর আর শীর্ষেন্দু।  এঁরা দুজনের সিংহভাগ রচনার শরীরেই নির্মাণের সীজার চিহ্ন নেই। দুই রকমের দুই চক্রবাল পায় হয়ে তাঁরা দেখান দুই মহানীলাকাশ। - হ্যাঁ, শীর্ষেন্দু’র রচনায় সফলভাবে মিশে থাকা তাঁর নিজস্ব দর্শনের সঙ্গে সর্বদা একমত হওয়া যায়না। তার প্রয়োজনও নেই – ঠিক যেমন রুশ বিপ্লবকে সমর্থন করা সত্ত্বেও ডুবে যাওয়া যায়, ডুবে যেতে হয় পাস্তেরনাকের 'জিভাগো’তে। -বিমল কর আর শীর্ষেন্দু’র ক্ষেত্রে  পথ যে অকম্পিত থেকে যায়, তাঁদের সিংহভাগ রচনাই যে ছুঁয়ে থাকে ক্লাসিক-শরীর তার হেতু নিহিত তাঁদের জীবনে। যাপনে। তাঁদের জীবনের মর্মে এক রকমের অধ্যাত্ম  ( ‘ধর্মীয়’ নয় কিন্তু, অন্ততঃ বিমল কর’ এর ক্ষেত্রে) কেন্দ্র রয়ে যায় শেষ অবধি যে অধ্যাত্ম কেন্দ্র হারানো বিষয়ে ও শিল্পে তার ছায়াপাত নিয়ে অদ্যাপি চলছে আলোচনা ...
          মনে আসছে ঐ অধ্যাত্ম-কেন্দ্রটি, ইউরোপের, বিষয়ে ভিক্টর উগো’র ‘ক্রমওয়েল’ নাটকের ভূমিকা যা ক্রমে হয়ে পরেছিল ফরাসী রোমান্টিকদের ইস্তেহার। ঐ অধ্যাত্ম সময়ের সূচনা বিষয়ে উগো লিখেছেনঃ ‘...the age of the epic draws near its end. Like the society that it represents, this form of poetry wears itself out revolving upon itself. Rome reproduces Greece, Virgil copies Homer, and, as if to make a becoming end, epic poetry expires in the last parturition.
It was time. Another era is about to begin, for the world and for poetry.
A spiritual religion, supplanting the material and external paganism, makes its way to the heart of the ancient society, kills it, and deposits, in that corpse of a decrepit civilization, the germ of modern civilization. This religion is complete, because it is true; between its dogma and its cult, it embraces a deep-rooted moral. and first of all, as a fundamental truth, it teaches man that he has two lives to live, one ephemeral, the other immortal; one on earth, the other in heaven. It shows him that he, like his destiny, is twofold: that there is in him an animal and an intellect, a body and a soul; in a word, that he is the point of intersection, the common link of the two chains of beings which embrace all creation--of the chain of material beings and the chain of incorporeal beings; the first starting from the rock to arrive at man, the second starting from man to end at God.
        A portion of these truths had perhaps been suspected by certain wise men of ancient times, but their full, broad, luminous revelation dates from the Gospels. The pagan schools walked in darkness, feeling their way, clinging to falsehoods as well as to truths in their haphazard journeying. Some of their philosophers occasionally cast upon certain subjects feeble gleams which illuminated but one side and made the darkness of the other side more profound. Hence all the phantoms created by ancient philosophy. None but divine wisdom was capable of substituting an even and all-embracing light for all those flickering rays of human wisdom. Pythagoras, Epicurus, Socrates, Plato, are torches: Christ is the glorious light of day.
        আর এই অধ্যাত্ম কেন্দ্রটি হারানোর পরের কথা বলে টলস্টয় তাঁর 'হোয়াট্‌ ইস্‌ আর্ট' এঃ
     The religious perception of our time, in its widest and most practical application, is the consciousness that our well being, both material and spiritual, individual and collective, temporal and eternal, lies in the growth of brotherhood among men in their loving harmony with one another.
        This perception is not only expressed by Christ and all the best men of past ages, it is not only repeated in the most varied forms and from most diverse sides by the best men      of our times, but it already serves as a clue to all the complex labour of humanity, consisting, as this labour does, on the one hand in the destruction of physical and moral obstacles to the union of men, and on the other hand in establishing the principles common to all men which can and should unite them in one universal brotherhood. And it is on the basis of this perception that we should appraise all the phenomena of our life, and among the rest our art also; choosing from all its realms and highly prizing and encouraging whatever transmits feelings flowing from this religious perception, rejecting whatever is contrary to it, and not attributing to the rest of art an importance not properly belonging to it.
            The chief mistake made by people of the upper classes at the time of the so-called Renaissance, a mistake we still perpetuate, was not that they ceased to value and to attach importance to religious art (people of that period could not attach importance to it because, like our own upper classes, they could not believe in what the majority considered to be religion), but their mistake was that they set up in place of religious art which was lacking, an insignificant art which aimed only at giving pleasure, that is, they began to choose, to value, and to encourage, in place of religious art, something which in any case did not deserve such esteem and encouragement.
      বাঙালির জীবন থেকে ঐ অধ্যাত্মকেন্দ্রটি মুছে গেছে, ক্রমে, দীর্ঘদিনের পরাধীনতায় । অতঃপর খন্ডিত 'স্বাধীনতা' ও তজ্জনিত ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গায়। স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের উপর পশ্চিম পাকিস্তানের আগ্রাসনে। অন্তিমে বুঝে না বুঝে 'আধুনিক' ও 'কমিউনিষ্ট' সাজবার ভ্রমে। জীবনের কেন্দ্র থেকে অভিকেন্দ্রিক টান ( সামন্ত তান্ত্রিকও বটে) হঠাৎই ছিঁড়ে গেছে দেশভাগে অথচ কোনো নতুন কেন্দ্র সামাজিক নিয়মেই গড়ে ওঠেনি। সঙ্গে এসেছে “প্রগতি” নামক ভুয়ো শব্দ তার সমস্ত কালোজাদুকে সঙ্গে নিয়ে। সুতরাং ঐ সময়ের সন্ততি যেসমস্ত লেখকেরা তার সিংহভাগই আশ্রয় নিয়েছে যে শিবির সামনে পেয়েছে তাতেই। আর ঐ 'আশ্রয়' নেওয়ার মূল্যে যে ঠিক কি তারা হারিয়েছে তা কমলকুমার মজুমদার হেন এক আধজন ব্যতীত কেউ টের পায়নি। আমি আশ্চর্য হয়ে ভাবি যে সুনীল কমলকুমারের সমস্ত বই’য়ে ‘আনন্দ বাজারী' ভূমিকা লেখে সে, কমলকুমারের এতো কাছাকাছি এসেও কি করে আমরন এই সব লিখে গেলো? – উওরও অবশ্য পাওয়া যায় তার কমলকুমারকে নিয়ে লেখা গুলি নেড়ে চেড়ে দেখলেই। এরা মূলতঃ কমলকুমারের বাইরের চমকদারী দিকটাতেই আকৃষ্ট হয়েছিল। কিন্তু ঐ সময়ে বসে কেন কমলকুমার প্রাক্‌ -রামমোহন সময়কে নিলেন তাঁর এক প্রধান উপন্যাসের পটভূমি করে, কি বার্তা তিনি তাতে পাঠালেন – এইসব ভেবে দেখবার গভীরতা সুনীলদের ছিলনা। ফলতঃ কৃত্তিবাস থেকেই জন্মালো রনজিত দাশেদের ভ্রূন যারা ‘আধুনিক’ না হলে নস্যও নেবেন না স্থির করে মূলতঃ সাজানো গোছানো আঙ্গিকে অশ্বডিম্ব বিতরনের কর্মটিকে দিলেন আরো এগিয়ে। তাদের ছায়া যে প্রত্যন্ত মফস্বলেও কি মারাত্মক ভাবে পরেছিল তার প্রমাণ একদা আসামের শিলচরের/হাইলাকান্দির ‘অতন্দ্র’। তাদের জীবন। তাদের 'রচনা'।
         যখন এইসব ভাবার বীজ ক্রমে অঙ্কুরিত হতে লাগলো – যখন সুনীল ইত্যাদির পাশাপাশি আলোক সরকার, যুগান্তরেরা এসে দাঁড়ালেন, আরেকটু পরের দিকে গৌতম বসু তখন থেকে, ক্রমে, আরম্ভ হলো আরেক নকল নবিশী। যে ভাবের, ভাবনার কোনো প্রয়োগ নেই যাপনে সেই ভাবনাসঞ্জাত যে ফর্ম তাকে নিয়ে ‘প্লাস্টিক-ফুল’ নির্মাণে লাগলেন আরেকদল। ছদ্ম আলোক, নকল গৌতমের ছড়াছড়িতে ভরে গেলো ‘প্যারালাল’ সাহিত্য। - মূলতঃ পদ্যে। গদ্যে ঐ সময় এসেছে বিদেশে পুরোনো হয়ে যাওয়া 'ম্যাজিক রিয়েলিজম'। ‘মেইন স্ট্রীম' এ তার উদাহরণ যদি হয় 'অষ্টম গর্ভ' , প্যারালালে 'মুন্সী' – 'খোয়াবনামা'। - না, ইলিয়াস যেমন সামলাতে পারেননি 'মুন্সী'কে – যেমন সামলেছেন মার্কেজ তাঁর বুয়েন্দিয়া দের – বাণী বসু ( বাণী বসু’ই ত?) সামলাতে পারেননি 'অষ্টম গর্ভ'কে। তিনি যেহেতু ইলিয়াস থেকে অনেক অনেক অনেক অক্ষম তাই ঐ অষ্টম গর্ভের গর্ভপাত 'খোয়াবনামা'র থেকে ঢের শোচনীয়।
৪।
  
             ফিরে যাই যেখান থেকে আরম্ভ করেছিলাম সেখানে। আসল কথাটি এই, যে, শিল্পের কাছ থেকে, সাহিত্যের কাছ থেকে কে ঠিক কি চাইছে। একদল পাঠক সকালে বাজার করতে গিয়ে যা যা অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয় তা’ই দেখতে চায় সাহিত্যে। - একদল লেখক তাদের জন্য লেখে। উদাহরন ভগীরথ মিশ্র। একদল চায় সাহিত্য পাঠ করে 'জ্ঞানী' হতে। একদল লেখক - – যে ইতিহাস বা দর্শন তারা নিজেরাই পারেনি পরিপাক করতে তা দিয়ে পাঠকদের জোগায় – ইতিহাসের, দর্শনের পাচন । যেমনটি  'তিন পুরুষ', 'শিকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে' ইত্যাদিতে একদা জুগিয়েছে সমরেশ বসু, পরে বাণী বসু 'পঞ্চম পুরুষ' মার্কা লেখায়। সুনীলও ওপথে হেঁটে দেখেছে তার 'সপ্তম অভিযান', 'ধূলিবসন' – ইত্যাদিতে। একদল পাঠকের চাই 'আঞ্চলিক বাস্তবতা'। তাদের জন্য 'গিয়েছিলাম' কে 'গেইস্‌লাম' আর 'খেয়েছিলাম' কে 'খাইস্‌লাম' লিখে চোলাই জোগায় মফস্বল। অথচ যেটা সকলে ভুলে গেছে তা হলো শিল্প-সাহিত্য বিষয়ে সেই প্রাথমিক সত্যটি যা ভিক্টর উগো’র ভাষায়ঃ ‘There is an impenetrable boundary between artistic reality and natural reality. It's folly to confuse them, as some rather backward partisans of  'Romanticisim' do.’ সুতরাং বিভূতিভূষণ, রবীন্দ্রগান হয়ে টলস্টয়, দস্তয়ভস্কিতে এসে আমি যে পথের পথিকত্ব্ব বা যে পাঠের পাঠকত্ব অর্জন করেছি সেই পথ যে দ্বীপে যায় তার ক্লাসিকের তালিকায় বিভূতি-তারাশঙ্করের পরে মাণিকের হাতে গোনা লেখা আর কমলকুমার ছাড়া অন্য কাকে আমি বয়ে নেবো? কীভাবে বয়ে নেবো?
        সবচেয়ে বড় কথা হলো কেন বয়েনেবো?

         আজ, কোনো গহন বনের নির্জনতায় হয়তোবা লেখা হচ্ছে আরো একটি ক্লাসিক, আরো একটি 'পথের পাঁচালী' কিংবা 'দৃষ্টিপ্রদীপ' – কিন্তু তা আমার জন্য নয়। তা আমার সন্ততির জন্য। হ্যাঁ তেমন কিছু যে লেখা হবে আবার, কোনো দিন, তারো আশ্বাস পাই টলস্টয়ের দেওয়া উদাহরণে, যুক্তিতেঃ

Art is a spiritual organ of human life which cannot be destroyed, and therefore, notwithstanding all the efforts made by people of the upper classes to conceal the religious ideal by which humanity lives, that ideal is more and more clearly recognised by man, and even in our perverted society is more and more often partially expressed by science and by art. During the present century works of the higher kind of religious art, permeated by a truly Christian spirit, have appeared more and more frequently both in literature and in painting, as also works of the universal art of common life accessible to all.
So that even art knows the true ideal of our times and tends towards it. On the one hand, the best works of art of our time transmit religious feelings urging towards the union and the brotherhood of man (such are the works of Dickens, Hugo, Dostoevski; and, in painting, of Millet, Bastien Le-page, Jules Breton, Lhermitte, and others) ; on the other hand, they strive towards the transmission, not of feelings which are natural to people of the upper classes only, but of such feelings as may unite everyone without exception. There are as yet few such works, but the need of them is already acknowledged. In recent times we also meet more and more frequently with attempts at publications, pictures, concerts, and theatres, for the people. All this is still very far from accomplishing what should be done, but already the direction in which good art instinctively presses forward to regain the path natural to it can be discerned.

           অতএব ‘রাত কত হল’ এ প্রশ্নের উত্তর যদিও আজো মিলছেনা তবু একদিন মিলবে তেমন ভাবতে ক্ষতি কি? হোক্‌না সে আমার মৃত্যুর পরে, আমার সন্ততির জন্য ...।।

সোমবার, ৪ নভেম্বর, ২০১৩

মুজফফরনগরের সংঘাত - একটি ভিন্ন দৃষ্টকোণ

 ( লেখাটি ৩ নভেম্বর, ২০১৩ সংখ্যা সাময়িক প্রসঙ্গে বেরিয়েছে)
  
সংঘাতের বৈশিষ্ট্য
আমাদের নিজ রাজ্য আসামের পশ্চিম প্রান্তে জনগোষ্ঠীগত অশান্তি লেগেই আছে। সেখানে দৃষ্টি নিবদ্ধ না করে উত্তর প্রদেশের পশ্চিম প্রান্তের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে মনোনিবেশ করা নিয়ে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করতে পারেন। তাই মুজফফরনগরের ঘটনাপ্রবাহের যথাযথ গুরুত্ব বোঝানোর জন্য এর একটা ব্যাখ্যা শুরুতেই দেওয়া জরুরি। উত্তর প্রদেশের পশ্চিম প্রান্তের মুজাফফরনগর সহ অন্যান্য জেলা ‘সুগার বেল্ট’ বা চিনিকলের শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিগণিত, শুধুমাত্র মুজফফরনগর জেলাতেই ১১টি চিনিকল রয়েছে। অন্যদিকে নিম্ন আসাম হিসেবে পরিচিত আসামের পশ্চিমাঞ্চল অনুন্নত কৃষিপ্রধান অঞ্চল। সামন্তীয় এবং অর্ধ-জনজাতীয় পরিচিতির সম্পর্কে আবদ্ধ গোষ্ঠীগত চেতনার প্রাধান্যকে ব্যবহার করে সংকীর্ণ স্বার্থের যে সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করা সম্ভব, শিল্পাঞ্চলের সামাজিক সম্পর্কে সেই ফাটল সৃষ্টি করা সহজ নয় বলেই চালু ধারণা রয়েছে। অথচ সেখানেই এমন এক বড় মাপের সংঘাত হল যে প্রায় ৫০ জন নিহত ও প্রায় ৫০ হাজার লোককে গৃহহীন হয়ে ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিতে হল। নিহত ও গৃহহীন লোকেদের প্রায় সবাই যে মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত তা সরকারি-বেসরকারি সব সূত্রের ভাষ্য থেকেই স্পষ্ট। মিরাট, ভাগলপুর, ভিওয়ান্দি ইত্যাদি অঞ্চলের মুসলিম বিরোধী দাঙ্গার সাথে এই দাঙ্গার কিছু চরিত্রগত পার্থক্য রয়েছে। কারণ উল্লিখিত অঞ্চলগুলিতে যে বিশেষ পারিবারিক ও ক্ষুদ্র শিল্প ধীরে ধীরে প্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্য দিয়ে কারখানায় বিকশিত হচ্ছিল সেগুলিতে মালিক ও শ্রমিক উভয়ই ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত। অন্যদিকে মুজফফরনগর ও পার্শ্ববর্তী জেলায় মুসলিমরা মূলত দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক। সাধারণত কোনো জনগোষ্ঠীর উপর আক্রমণের পেছনে নির্দ্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে অবদমিত করে রাখা একটি সচেতন বা অচেতন উদ্দেশ্য হিসেবে ক্রিয়াশীল থাকে। ভিন্ন আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় নিম্ন আসামের অ-বড়ো জনগোষ্ঠীরাও এধরনেরই আক্রমণের সম্মুখীন হচ্ছেন। প্রতিটি জনগোষ্ঠীগত সংঘাতের আলাদা আলাদা স্থানিক বৈশিষ্ট্য ও কারণ থাকে, কিন্তু সবগুলিই ঘটে এক বিশেষ সময়ের সামগ্রিক আর্থ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবে। স্থানিক না সামগ্রিক কারণ কোনটা প্রাধান্যকারী অবস্থায় রয়েছে তা আমাদের বাস্তব পরিস্থিতির বাস্তব ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে আবিষ্কার করতে হয়। মুজফফরনগরের সংঘর্ষের ঘটনায় মুসলিম শ্রমজীবী মানুষকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করে নেওয়ার পেছনে বিশ্বায়ন তথা আশির দশক থেকে চালু নয়া-উদারবাদী অর্থনীতি যে বিত্তপুঁজি নিয়ন্ত্রিত বাজারশক্তির দৈত্যকে বোতল থেকে বের করে এনেছে তার প্রভাব প্রধান্যকারী ভূমিকায় রয়েছে। এই নতুন দিকটি যা এই দাঙ্গার মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হয়েছে তার একটা ব্যাখ্যা তুলে ধরার জন্যই এই নিবন্ধের অবতারণা।

ঘটনার সূত্রপাত ও জনগোষ্ঠীগত ঐক্য
        ঘটনার সূত্রপাত ঘটে ভিন সম্প্রদায়ের এক মেয়েকে কুরুচিপূর্ণ যৌন-মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। ২০১৪-এর নির্বাচনকে সামনে রেখে জনগোষ্ঠীগত সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগাতে এই ঘটনাকে একটি পরিপূর্ণ সাম্প্রদায়িক সংঘাতে রূপান্তরের জন্য রঙ-বেরঙের রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে কেউ কেউ নীরবে অপেক্ষা করতে থাকে, আবার অনেকে তাতে সরাসরি ইন্ধন যোগায়। অথচ দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী চরণ সিং-এর মৃত্যুকাল অর্থাৎ ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তাঁর নেতৃত্বে জাঠ ও মুসলিমদের এক ঐক্য গড়ে উঠেছিল। নির্বাচনী দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঐক্য উভয় সম্প্রদায়ের জন্যই লাভদায়ক ছিল। ইউপি’র পশিমাঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৩৩% এবং ফলে চৌধুরী চরণ সিং-এর নেতৃত্বে এই ঐক্যে জাঠদের রাজনৈতিক প্রতিপত্তি যেমনি অনেকগুণ বেড়েছিল, ঠিক তেমনি এই ঐক্যের জেরেই ২০১২-এর বিধানসভা নির্বাচনে ২৬ জন মুসলিম প্রার্থী জয়লাভ করেছিল। ২০০৬-এর সাচার কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী নির্মাণ শিল্পে, কারখানা ও বাণিজ্যে শ্রমিক হিসেবে মুসলিমদের অংশীদারি কৃষিক্ষেত্র থেকে অনেক বেশি। ফল বাগান ও ফলের ব্যবসায় অ-শ্রমিক মুসলিমদের একাধিপত্য রয়েছে। অন্যদিকে অবিসি জাঠ সম্প্রদায় মূলত জমির মালিক ও আখ চাষি। মুজফফরনগরের ঘটনা মুসলিম-জাঠ ঐক্যেই শুধু ফাটল ধরায় নি, মেহনতি মানুষের এক নতুন ঐক্যের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দিয়েছে।

শ্রমজীবীদের ঐক্য ও জনগোষ্ঠীগত দূরত্ব
          বিগত দিনগুলিতে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং বিভিন্ন নতুন সার্ভিস ও কনস্ট্রাকশন সেক্টরে দক্ষ  ও অদক্ষ শ্রমিকের নিয়োগের ফলে মুসলিম শ্রমিকদের শ্রেণিগত ক্ষমতা খানিকটা বৃদ্ধি ঘটে। অন্যদিকে চিনি উৎপাদনের কারখানায় দেখা দেওয়া মন্দার শিকার হয় জাঠ চাষিরা। চিনিকল মালিকদের থেকে প্রায় ৩০০০ কোটি টাকা চাষীদের প্রাপ্য। এই অর্থ অনাদায়ে জাঠ জমিমালিক ও চাষিদের বাস্তব অবস্থার অবনতি ঘটে। আর্থ-সামাজিক অবস্থার তুলনামূলক বিচারে জাঠদের অবস্থান মুসলিমদের চেয়ে অনেক উন্নত হলেও, বিগত বছরগুলিতে উভয় সম্প্রদায়ের আর্থিক স্বচ্ছলতার বিপরীতমুখী গতি জাঠদের মধ্যে এক মনোবিকারের জন্ম দেয়। দুই সম্প্রদায়ের আর্থিক অবস্থানের ফারাক কমে আসার বাস্তব প্রেক্ষিতে পুরোনো নির্বাচনী ঐক্যকে শ্রমজীবী মানুষের ঐক্যের এক নতুন মাত্রা দেওয়া যেত। কিন্তু প্রগতিশীল শক্তির অনুপস্থিতিতে বিষয়ীগত এই বাস্তবতাকে প্রগতিশীল আন্দোলনের দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না, বরঞ্চ মনস্তাত্ত্বিক চাপের পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে পুরোনো ঐক্যকে ভেঙে দিতে সমর্থ হল প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি।

চিনি উৎপাদন ও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের কৃষির বাণিজ্যিকিকরণ
           ১৮২০ সালে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী ভারতে প্রথম চিনি উৎপাদন চালু করে। বেনারসের হলুদ চিনি ইংল্যাণ্ডের কারখানায় পরিশোধিত করে কোম্পানী বাজারজাত করত। কিন্তু ১৮৪৬ সালের ব্রিটিশ শুল্ক নীতির বলি হয়ে ব্রিটিশ কারখনার রসদ হিসেবে ভারতীয় চিনি প্রতিযোগিতায় টিঁকে থাকতে পারে না এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ‘চিনির ভাণ্ড’ হয়ে ওঠার ভারতীয় স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। বিশ শতিকার দ্বিতীয়ার্ধে রপ্তানীনির্ভর চিনিশিল্প আবার বিকশিত হতে আরম্ভ করে। উত্তরপ্রদেশের পূর্বাংশে চিনি উৎপাদনের জন্য আখ চাষ জমিদার ও বণিক শ্রেণির অধীনে চাষীদের দূরবস্থার বৃদ্ধি ঘটায় ও সামন্তীয় শ্রেণি সম্পর্কের ঐতিহ্যকে শক্তিশালী করে, কিন্তু নতুন বাজার ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে পশ্চিমাঞ্চলের অবিসি জাঠ জমি-মালিক তথা চাষীরা প্রভূত উন্নতি সাধন করে। জাত-বর্ণে বিভাজিত ভারতীয় সমাজে জমির মালিকানা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা উচ্চবর্ণ হিন্দুদের করায়ত্ত থাকলেও তারা নিজেরা জমির চাষ করে না, অন্যদিকে অবিসি জমির মালিকরা নিজেরাই সরাসরি চাষাবাদের সাথে যুক্ত। ফলে বাণিজ্যিক আখ চাষের মাধ্যমে পশ্চিম উত্তর প্রদেশে শ্রেণি সম্পর্কের অনেকখানি পরিবর্তন ঘটায়। ১৮৭০ সালের মধ্যেই চামার বাঁধা-শ্রমিকরা নিজেদের দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে তাদের নিজেদের গ্রামে বা বাইরে কার খামারে কাজ করবে তা তারা নিজেরা নির্ধারণ করার ক্ষমতা অর্জন করে। ১৮৮২ সালের এক রিপোর্ট অনুযায়ী চামার সম্প্রদায়ের শ্রমিকরা পূর্ণ হাজিরা দাবি করতে শুরু করে। কৃষি কাঠামোর এই পরিবর্তনই আরও বিকশিত হয়ে মণ্ডল ও দলিত রাজনীতির ভিত্তি তৈরি করে এবং কৃষির এই শিল্পায়ন মুসলিম-জাঠ ঐক্যেরও ভিত্তি হিসেবে এতাবৎ কাজ করে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় বাধ সাধে এই শতকের আশির দশক থেকে চালু নতুন আর্থিক নীতি ও তথাকথিত বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া।

অবাধ বাণিজ্য নীতি ও সুগার ইণ্ডাস্ট্রি
        স্বাধীনতা-উত্তর পর্যায়ে চিনির উৎপাদনের সামগ্রিক বৃদ্ধি ঘটতে থাকে। পরিকল্পনা পর্যায়ে চিনিকলের সংখ্যা ও চিনির উৎপাদনের পরিমাণ ১৯৫১-৫৬ সালে ১৩৮ ও ১৯.৩৪ লাখ টন থেকে বেড়ে ২০০৩-০৪ সালে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৪৬১ ও ১৭০ লাখ টন। নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী আইন, ১৯৫৫ অনুসারে চিনি উৎপাদন নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে। কিন্তু বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার উদার আর্থিক নীতির অঙ্গ হিসেবে ১৯৯৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ভারত সরকার চিনি শিল্পকে লাইসেন্স-মুক্ত করে দেওয়ার প্রক্রিয়া জারি করে। রপ্তানীর উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। কিন্তু রপ্তানী বাস্তবে ২০০১-০২ সালে ১৩৬০ মেট্রিক টন থেকে ২০০৪-০৫ সালে কমে দাঁড়ায় মাত্র ২০ মেট্রিক টন এবং বিশ্ব বাণিজ্যিক লবির চাপে এই একই পর্যায়ে আমদানী ৪৩৮ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১৮০০ মেট্রিক টনে। এবছরের জানুয়ারী পর্যন্ত ৬.২৬ মেট্রিক টন আমদানী হয়েছে এবং আরও ১.৯ লাখ মেট্রিক টন বন্দরে আসার অপেক্ষায় রয়েছে। ভারতবর্ষের সব অঞ্চলের চিনি উৎপাদকদের মালিক-সংস্থা আমদানী শুল্ক বৃদ্ধি করে চিনি আমদানী কমিয়ে আনার জন্য চাপ দিয়ে চলেছে। সরকার লেভি-সেলের মাধ্যমে রেশনে কম দামে চিনি দেওয়ার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ চিনি দেশীয় চিনি উৎপাদকদের থেকে সংগ্রহ করে বাকী চিনি খোলা বাজারে বিক্রয় করার সুবিধা করে দিতে আমদানী কমিয়ে আনতে পারত। কিন্তু ২০০১ সালের মধ্যেই ভারত সরকার বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা নির্দেশিত কৃষি নীতিতে সম্পূর্ণ যুক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে অবাধ বাণিজ্য নীতি থেকে সরে আসতে পারছে না। রঙ্গরাজন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরও শিথিল করার তোড়জোড় চলছে। এই কমিটির রেভিন্যু শেয়ারিং ফর্মুলা চাষীদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ তাতে কৃষিপণ্যের বাজারদর আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রিত যোগান-চাহিদার উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এই নীতি আসলে পরিচালিত হচ্ছে কারগিল, জামিকভ, উইলমার, মিত্রাপল ইত্যাদি বহুজাতিক বাণিজ্য সংস্থাকে ভারতীয় চিনি বাণিজ্যে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে।

প্রতিক্রিয়াশীল প্রত্যাঘাত
          বিশ্বায়নের অঙ্গ হিসেবে নতুন বাণিজ্য নীতির ফলে চিনি শিল্পে দেখা দেওয়া সংকটের অজুহাতে উত্তরপ্রদেশের আখ চাষিদের প্রদেয় ৩০০০ কোটি বকেয়া দিচ্ছে না মিলমালিকরা। ২০১১-১২ সালের ১৮,২০০ কোটি টাকার তুলনায় ২০১২-১৩ সালে ২২,৪৬২ কোটি টাকার আখ কিনেছে উত্তরপ্রদেশের মিলমালিকরা। ইতিমধ্যে ৮ টি মিলের মালিকরা ২০১৩-১৪ সালে মিল না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মুসলিম শ্রমজীবী মানুষের ব্যাপক উচ্ছেদের ফলে তাদের মধ্যে যে ভীতির সঞ্চার হয়েছে তাতে যদি তারা ত্রাণ শিবির থেকে অতি-সত্বর নিজ গ্রামে ফেরত যেতে না চায় তাহলে তা মিল-মালিকদের কাছে কার্যত আশীর্বাদ হিসেবেই বিবেচিত হবে, কারণ এক্ষেত্রে গোদামের চিনির স্টক খালি করার জন্য মিল বন্ধ রাখতে বিশেষ বেগ পেতে হবে না। আর যদি এই উদ্বাস্তুরা নিজ গ্রামে ফিরেও আসে, তাহলেও ন্যায্য মজুরি প্রদানের জন্য একজোট হওয়ার সাহস পাবে না। অন্যদিকে শ্রমজীবী মানুষের অনৈক্যের জন্য ছোট ও মাঝারি জাঠ চাষিরাও আখের ন্যায্য মূল্যের জন্য লড়ার বস্তুগত ও মানসিক সাহস সঞ্চয় করতে পারবে না। এমতাবস্থায় বৃহৎ জমি মালিকরা নতুন পুঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে বাণিজ্যিক চাষের চেয়ে ‘অ্যাবসল্যুট গ্রাউন্ড রেন্ট’ বা জমির খাজনার মাধ্যমে সুনিশ্চিত আয়ের জন্য সামন্তীয় সম্পর্কের দিকে পশ্চাদগমন করাকেই শ্রেয় মনে করবে এবং এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই খাপ-পঞ্চায়েতের মত পশ্চাদগামী শক্তিগুলো পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠার এক যোগসূত্র পাওয়া যায়। বৃহৎ বহুজাতিক বাণিজ্যিক বেপারি ও খাজনা বা সুদি ও ফাটকা লগ্নিকারী বৃহৎ পুঁজির জন্য এই পরিস্থিতিই সবচাইতে লাভজনক। আখচাষ, চিনি উৎপাদন ও বাণিজ্যে এই প্রতিক্রিয়াশীল পশ্চাদগামী শক্তির এই নতুন সমীকরণ গড়ে উঠার জন্যই প্রয়োজন ছিল মুসলিম শ্রমিক ও জাঠ আখচাষিদের ঐক্য ভেঙে দেওয়া, যাতে অত্যন্ত কম মজুরিতে শ্রমিক খাটিয়ে আখচাষ ও চিনিকলের উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে দেওয়া যায়। শ্রমজীবী মানুষের প্রগতিশীল ঐক্য বিরোধী এই শক্তিই মুজফফরনগরের সাম্প্রদায়িক সংঘাতের মুল চালিকাশক্তি, যে সংঘাত পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানিকভাবে চালিকাশক্তির এই সফলতা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাই হচ্ছে আজকের গণতন্ত্রের প্রধান বিপদ। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তারাই এই পশ্চাদগামী শক্তির সুযোগ্য বাহক হবে যারা উদারবাদী আর্থিক নীতিকে জোরেসোরে এগিয়ে নিতে চাইবে এবং শ্রমজীবী মানুষের ক্ষমতা বৃদ্ধির উপযোগী আর্থ-সামাজিক সুরক্ষার নীতি একে একে বাতিল করতে উদ্যত হবে।

ক্ষমতায়ন ও নতুন বিকল্প
          বিশ্বায়নের উদারবাদী অর্থনীতি ও শ্রমজীবী মানুষেরর টানাপোড়েনের মধ্যেই কিছু কিছু পদক্ষেপ শ্রমজীবী মানুষের প্রশ্বাস নেওয়ার খোলা জায়গা তৈরি করে দিচ্ছে। এনরেগা, খাদ্য সুরক্ষা, বীমা প্রকল্প ইত্যাদি এধরনেরই যৎসামান্য কিছু স্বস্তির জায়গা। এই প্রকল্পগুলি যদি বাস্তবে রূপায়ণ হয়ে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রকৃত হিতাধিকারীদের মধ্যে পৌঁছে এবং রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশনের মত বিভিন্ন কমিশনের সুপারিশগুলি কার্যকরী করে জনগোষ্ঠীগত বঞ্চনার খানিকটা অবসান করা হয় তাহলে উদার-আর্থিক নীতির প্রবক্তাদের ক্ষোভিত করলেও শ্রমজীবী মানুষরা কিছুটা বস্তুগত ও মানসিক শক্তি সঞ্চয় করবে। রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতির করাল থাবা গোটা পরিস্থিতিকে যেভাবে গ্রাস করছে তাতে বর্তমান জনগোষ্ঠীগত নেতৃত্বকে দিয়ে এই কাজটুকুও হবে কিনা তা সন্দেহের আবর্তে।

         কিন্তু আমাদের একথা মনে রাখতে হবে যে এই উপরোক্ত পদক্ষেপগুলো রূপায়ণ হলেও শক্তির ভারসাম্য থেকে যাবে প্রতিক্রিয়াশীলদের পক্ষে। রাষ্ট্র, রাজনীতি ও আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে নতুন গণতান্ত্রিক ভারসাম্য গড়ে তুলতে আমাদের যেতে হবে এমন এক নতুন অনুশীলনের মধ্য দিয়ে যা নতুন তত্ত্বায়নের সূত্রপাত ঘটায়, উল্টোদিকে আমাদের যেতে হবে এমন এক নতুন তত্ত্বের মধ্য দিয়ে যা নতুন অনুশীলনের জন্ম দেয় যেখানে গোটা শ্রমজীবী শ্রেণি নীতি নির্ধারণের বিতর্কে অংশ নিতে শুরু করে এবং তা এক স্বীকৃত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পরিগ্রহ করে।   

শুক্রবার, ১ নভেম্বর, ২০১৩

গীতিকবিতা

 ।। শৈলেন দাস।।
(পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত গীতিকার হওয়ার স্বপ্ন ছিল দুচোখ জুড়ে।এগুলি সব কলেজ জীবনের লেখা)
















১.
চুপিসারে কেউ দেখবে আমায়
এই মনে জাগে আশা
অভিসারে কেউ ডাকবে আমায়
এই মনে জাগে আশা।
চোখের কাজলে আমার বুকে
নিজের ছবি সে দেবে এঁকে।।

চুপিসারে কেউ দেখবে আমায়
এই মনে জাগে আশা।।

খোলা জানালাতে নিরালায় বসে
নিজের অজান্তে সে দেবে হেসে
বুঝবেনা কখন যে সন্তর্পনে
হারিয়ে যাবে ভাল লাগার দেশে
অবসরে কেউ ভাববে আমায়
এই মনে জাগে আশা।
চুপিসারে কেউ দেখবে আমায়
এই মনে জাগে আশা।।

একাকী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
দেখবে নিজেকে সে দুচোখ ভরে
'দেখছে কেউ' ভেবে সে লজ্জা পেয়ে
দুহাতে নেবে মুখ আড়াল করে
অভিলাষে কেউ খুঁজবে আমায়
এই মনে জাগে আশা।
চুপিসারে কেউ দেখবে আমায়
এই মনে জাগে আশা।।

২.
তোমার কালো কালো নয়নে
কাজলের টান টান
ঘায়েল করেছে আমাকে
পাইনা ভরসা বলি যে কেমনে
ভালবাসি তোমাকে।

ভুলতে পারিনা কখনো আমি
অধরে চাপানো হাসি
আঁচলে তোমার মুখ ঢাকানো
মেঘে যেন লুকানো শশী।
এমন স্মৃতি হয়ে যদি আস মনে
দায় যে বুঝানো মনকে
পাইনা ভরসা বলি যে কেমনে
ভালবাসি তোমাকে।

কেমন পিপাসা জাগিল মনে
মিটেও যা মিটেনা
তুমি যে ক্ষণিকের বিজুলি চমকানো
বুঝেও মন তা বুঝেনা।
চলে যেওনা প্রিয়তমা ছেড়ে আমাকে
ব্যথা দিয়ে হৃদয়কে
কখনো কি আমি করেছি অভিমান
কেন পাইনি তোমাকে?

৩.
তুমি আমার গান আমি তোমার কবি
লিখতে বসলে ভাসে চোখে তোমার ছবি
যতদিন পারি লিখে যাব আমি
আমার গানে থাকবে সুর তোমারি।
তুমি আমার গান আমি তোমার কবি।।

লিখব কী, ভেবেই পাইনা আমি
তাই তো, তোমার পায়েল নিয়ে লিখি
কাজল-কাল নয়ন কল্পনা করি
চুড়ির শব্দে বাস্তবে ফিরি
জ্ঞান ফিরিয়ে দেয় তোমার বিন্দি।।
তুমি আমার গান আমি তোমার কবি
লিখতে বসলে ভাসে চোখে তোমার ছবি।।

আর আময় পাগল করনা তুমি
এইবার তোমাকে পেতে চাই আমি
একটু ভালবাসায় আমি বুঝবনা
তোমার কোন কথাই আমি শুনবনা
মিষ্টি হেসে হেসে আর করনা দুষ্টুমি।।
তুমি আমার গান আমি তোমার কবি
লিখতে বসলে ভাসে চোখে তোমার ছবি।।