“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১২

আমরা দুবোন

 দি, তুই-আমি দুবোন ,
হতে পারতাম দুটো জোনাকি!
আঁধার রাতে এক মুঠো আলো ছড়িয়ে দিতাম,
ওল বনের শেষ সীমানায়।
অথবা হতে পারতাম দুটো পাখি,
উড়ে যেতাম সুদূরের টানে। 
আমি যখন মেঘের আড়ালে লুকিয়ে পড়তাম ,
তুই খুঁজে বের করে নিতিস কড়া শাসনে ।
আমার ছোট্ট পাখায় রোদ লেগে যায় পাছে,
সেই ভয়ে ত্রস্ত তুই , বেঁধে নিতি আমায়,
তোর পালকের  স্নিগ্ধ ছায়ায়।
মধু লোভী আমরা দুবোন ,
যদি হতে পারতাম , দুটো মৌমাছি।
ফুলে-ফুলে গুন গুনিয়ে কেটে যেত দিন।
ভালোবাসার গানে তুই ভরিয়ে দিতিস আকাশ বাতাস,
ঠিক শৈশবের মতন, আমার গলায় স্পষ্ট হতো তোরই গানের সুর।
পাগলপারা হয়ে যদি  বয়ে যেতে পারতাম,
 হতে পারতাম কাল বৈশাখী ঝড়!
উড়িয়ে নিতাম পুরাতনের আবর্জনা। 
পৃথিবীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে বেজে উঠত,
নবীনের শঙ্খধ্বনি ।  
তখন ও তুই ধরে রাখতিস আমার হাত,
বলতিস, দূরে যাসনে ওরে দস্যি মেয়ে। 
চিরচঞ্চল আমরা দু বোন, যদি হতে পারতাম বৃষ্টি ,
ঝমঝমিয়ে নেচে উঠতাম টিনের ছাদে।
শেষে দুটো ধারার মতো মিলে মিশে বয়ে যেতাম,
মরুভুমির বুক চিরে, সবুজের বন্দনাগানে। 

বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১২

জীবন যখন একটাই!



জীবন যখন একটাই! ধুত্তেরি! এটা আবার একটা কথা হল? জীবন-টা যখন গিরগিটির, হাঁ, তার তো সেই একটাই জীবন, রঙ পাল্টানোর অধিকার থেকে সে নিজেকে বঞ্চিত করবে কেন? আবার যদি সেটা যখন কোনও বিষধরের জীবন, তাহলে ছোবল মারার জন্মগত অধিকার থেকে কে তাকে সরিয়ে আনবে? যতই পোষা হোক, দুধ-কলা খাওয়াক না কেন সাপুড়ে; যে তাকে পুলে-পুসে রাখছে – সে ব্যটাও তো ঐ এক্তিয়ারের বাইরে থাকছে না। এটাই তো নিয়ম। একটাই জীবন বলেই কি অর্থনীতির পাঠ নেওয়া মাস্টার মশাই-ও বিশ্বময় গ্রামের বাজারে নিজেকে ভোগ্য-পণ্য (Commodity) বানিয়ে  বাজার-জাত করবে? এটাও তো স্বাভাবিক?
         আসলে ইতর-প্রাণীদের দিয়ে শুরু করেছি বলে, তাদের নিয়েই পুরোটা লিখব, তেমনটা তো আর হয় না। ইতর-রা তো ইতর-ই। মানুষ হয়েও মনুষ্যেতর, ( বরং পড়ুন, 'মনুষ্য-ইতর')! ঐ সমস্ত নীচ বর্গের প্রাণীরা তো আর  মানবিক সংস্কার বা মূল্যবোধের ধার ধারে না!  মানুষ শ্রেষ্ঠ জীব!  তাদের কাছে এটা তো 'কেতাবি' শব্দ মাত্র!
       জীবন তো একটাই। যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ তো সেটাকে ধরে রাখতে হবেই। আর সেই তাগিদে রুটিরুজির সংগ্রামে নিজেকে সামিল করতে যে পেশাটা বেছে নিয়েছেন ভদ্রলোক, সেটা দুর্দান্ত! ফার্মাসি থেকে মেয়াদ ফুরানো ওষুধের ব্যবসা। ভয়ানক জীবিকা! রোজগারের মারাত্মক পন্থা! অন্যকে তিল তিল করে মৃত্যুর খাদে ঠেলে দিয়ে বেশ ভালই এগোচ্ছেন তিনি। একেবারে ডাহা বাস্তব।
       'মান' আর 'হুস', এ দুয়ের সাযুজ্যে বুঝি মানুষ! মান হচ্ছে তাঁর স্বাভিমান, স্বজাতভিমান, যে সংস্কার, যে শিক্ষা পারিবারিক এবং সামাজিক পূর্বজদের কাছ থেকে জীবনের প্রতিটি ক্ষণে ক্ষণে আহরন করেছে এবং করছে-ও, শিরদাঁড়া-টাকে সোজা রেখে জীবনের পথে চলার জন্য।
      শিরদাঁড়া-টাকে সোজা রাখার সংগ্রামে সামিল হয়েছেন যারা, তাদের সংখ্যা এদেশে ভুরি ভুরি। বিপরীত মেরুর বাসিন্দাদের সংখ্যাও তো আজকের জমানায় অপ্রতুল নয়। এই  প্রতুল-অপ্রতুল এর দ্বন্দ্বে, ভাল-মন্দের সংঘাতে, ন্যায়-অন্যায়ের দোলাচলে ভবিতব্যের পথিকেরা আজ দিশেহারা হওয়ার শামিল! ‘আদর্শ’ বলে যাঁকে ধরে রেখেছিল, তিনিই যে মনে হচ্ছে পথভ্রষ্ট!
        আবার মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে যে দেশটার জাতীয় জীবন, যে দেশটাতে  আত্মত্যাগ আর আত্মোৎসর্গের ছড়াছড়ি, তাঁর পুরোধা-রাও তো আজকাল কালো রঙটার সাথে আলিঙ্গনে মগ্ন। মসনদের আধিকারিকেরা তো সমস্ত জীবন আর শক্তি দিয়ে মূল্যবোধের আন্দোলনকে হাজার টুকরো করে দিতে যতটা তৎপর, ঠিক ততটাই নিস্প্রভ  কালো রঙের প্রলেপ টাকে মুছে দিতে!
             এটাও তো আবার সেই একমাত্র জীবন ধারী-দেরই মহিমা।
         আসলে কাজের পরিধিটা ছোট কিম্বা বড়, যে মাপেরই হোক না কেন, আখেরে সেটা করতে গিয়ে “তাতে আখেরে লাভ কি হবে?” এই ব্যক্তি কেন্দ্রিক একমাত্র জিজ্ঞাস্য বিষয়টাই যেখানে নির্ণায়কের ভুমিকা হয়ে দাঁড়ায়, তখন ব্যক্তি,  তথা সমাজের আদর্শ এবং নীতি বলে কি আর কিছু থাকতে পারে?
         'ছা-পো-ষা লো-ক' অর্থাৎ 'আম-জনতা' এই করতে করতে নিজের অজান্তে কবেই যে দেওয়ালে পিঠ  ঠেকে গেছে, সেটা আঁচ করতে পারেন নি...!
        মাথার ওপর যেমন অনন্ত আকাশ, পায়ের নিচেও তেমনি অন্য এক  অপার মহাশূন্য...!
       ছোঁ মেরে এক এক করে সবাইকে যে মহাসমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলার  'নীল-নক্সা'  তৈরি হয়েছে, রঙ বদলের প্রক্রিয়া দিয়ে তো অন্ততপক্ষে এ থেকে নিস্তার পাওয়া সম্ভব নয়?
         ব-র্ণ-চো-রা-রা কিছু আঁচ করতে পারছেন কি  ??     তাহলে......??

নোনা ইচ্ছে


গায়ে শ্যাওলা ধরেছে
ইচ্ছে হয় শীলাকে নিয়ে
হানিমুন যাই

ইচ্ছে করে জিরো গ্র্যাভিটিতে
একটা নতুন গ্রহ ছুঁড়ে দিই
নাম রাখি মৃত্তিকা
তোমার নামে।

এরপর যদি চলে খনিজ উল্লাস! অথবা সেন্ট্রাল ব্যুরো
অব ইনভেস্টিগেশানের রেইড
অথবা অকাল নির্বাচন!

বন্ধ হয়ে যেতে পারে নির্গমনের রাস্তা

মহেঞ্জোদারোর সভ্যতায় কাস্তেটা ছিল ভোঁতা

তার চেয়ে ভালো লাল চা, পার্টি অফিসে বসে
চলুক বিসমিল্লা খান কিংবা বীরবিক্রমের বাঁশী

আমার সাদা কালোর সুচিত্রা সেন আজ ঘরবন্দী
ঢের ভালো খুকুমণির গলা সাধা সকালটাই।

সোমবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১২

রূপসার বুকে কাঁপন


প্রেম আপাতত নিহত, তা বলার কোন কারন নেই। হাত থেকে দস্তানাটা খুলে ফেলে দাও, দেখবে চুমু খেয়ে গেছে কোন বাবুই পাখি।
আজকাল তোমার বুকের রঙ পাল্টে গেছে। তাই মনের রঙেও নতুন রঙ লেগেছে জানি। সেই রঙে কোন নিহত প্রেমের কাব্য লেখা হয়তো সম্ভব নয়, তাই ভাবলাম ভালোই আছো। পিঙ্গল কোন ফুলের কাছেই লিখলাম তোমার কথা।
জানি হাজার নীলাভ চোখ হয়তো এখুনি বাষ্পরুদ্ধ হয়ে উঠবে প্রেমে অথবা অপ্রেমে।
যেদিন আমি থাকবো না সেদিন তুমি অনেকদূরে, মনে পড়া ছাড়া আর কোন পথ হয়তো থাকবে না। তবে সেটা আজকের চেয়েও বেশি কষ্টকর। তোমার কথা।
কবেই বা ছিলে!
আজকাল বাম চোখটা খুব লাফাচ্ছে জানো! সবাই বলে পুরুষের বাম শরীর কাঁপলেই বিপদ। আমি জানি আমার বাম দিকটাই বেশী প্রিয় তোমার। আর তোমার বাম হৃদয় আমারই ছিল। মনে আছে কথা দিয়েছিলে কোনদিন কাউকে স্পর্শ করতে দেবেনা সেই বুকে।
বাবুই পাখি এসে দেখে গেল তো চুপটি করে! তখন তুমি স্নানে ছিলে।
একটা ঝাঁঝালো রক চলছিল। নিওন আলো সম্পর্কিত। তাই টের পাওনি বাবুই পাখির আসা যাওয়া।
আজ একটা নারকেল ভেঙ্গেছি। কিছু তিল ভেজেছি লোহার কড়াইয়ে। হাত অম্বল খাবো বলে। বড্ড গরম আজকাল। শীতল হওয়ার খাদ্য। তোমার প্রিয় কালো তিল। তিল গুলি ভাজতে ভাজতে কাঠের উনানে মনে হয়েছিল, সেগুলি লাল হয়ে যাচ্ছে। পাল্টে যাচ্ছে বর্ণ। ঠিক তোমার বিশেষ কোন মুহূর্তের মতোই।
লোহার কড়াইয়ে, আগুনের আঁচে আমার প্রিয় শরীর, তোমার নিষিদ্ধ তিল। যাকে স্পর্শ করার আমার কোন অধিকার ছিল না কোনদিন, আজও নেই। তাই পাল্টে দিলাম সেই রঙ। এখন নিজের হাতে ছুঁয়ে দ্যাখো, আমারই মতো পুড়ছে সে। আর থাকতে চাইছে না তোমার শরীরে লেপ্টে।
দস্তানাটা খোল। এরপর আমার সামনে এসে দাঁড়াও। শেষবার তোমাকে জানান দেই, আমিও ভালো নেই। তুমিও না।
চলো ঘুড়ির মাঞ্জা বানাই। কাল বিশ্বকর্মা পূজা। গত বছর এই দিনটাতে তোমার ঘুড়ি কেটে দিয়েছিলাম আমি। এই ছাদ থেকেও স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলাম তোমার কষ্ট। তোমার আকাশ হওয়ার স্বপ্ন এক সেকেন্ডে ভোকাট্টা হতে দেখে পাল্টে যায় তোমার চোখ। তারই জেদ, আমাদের প্রেম। আজ সব ভোকাট্টা।
চলো আরেকটা ঘুড়ি উড়িয়ে দেই, কথা দিলাম আর কাটবো না। সেই সুতোয় গেঁথে দেবো বকুল ফুল। সুতো টানলেই পেয়ে যাবে আমার দখল। চেয়ে দেখো হলুদ, নীল প্রজাপতিরা উড়ে বেড়াচ্ছে তোমার আকাশে। ছুঁয়ে দেখো একবার।
ওরা সেজেছে আজ তোমারই জন্যে। হঠাৎ বৃষ্টির কোন সংকেত নেই আপাতত। তাই ভিজবে না তুমি কোনদিন।
অন্যথায় দরজাটা খুলে দাও, বাবুই পাখিকে অধিকার দাও আরেকবার চুমু খাওয়ার, বাতাস কে পাঠাই এবেলায় তোমার মনের হদিস পেতে। শেষ বেলায় না হয় আমি যাবো।
সন্ন্যাসী বসন্ত। কিছুতেই হেলে যায়না অবরুদ্ধ দ্বার।
নির্মল শরৎ শান্ত ধীর স্থির। জোনাকিরা কাশ বনে ঘুরে বেড়ায় একাকি নিঃসঙ্গ। নগরীর নটী চলেছে রূপসার পাশ দিয়ে। ভেসে আসে নুপুরের ঝমঝম শব্দ। আমার নেশা রূপসার বুকে, ছলাৎ ছলাৎ লাফায় বুকের ভেতর গঙ্গোত্রীর জল। তুমি দেবী কাঠুরিয়ার।
আমার ভয় হয় জানো...।

ইচ্ছে

মাকে দিতে পারো একমুঠো আকাশ ?
একটা রক্তিম বিকেল?
পায়ে পায়ে বসন্তেরা ছুটে চলেছে,
নামহীন ঠিকানায়।
হারানো ডাইরির পুড়ে যাওয়া গন্ধে,
দম আটকে গেছে সেই কবে।
তবু একবুক দমকা হাওয়া মাঝে মাঝে,
ইচ্ছে নামের খেয়াতরী ভাসিয়ে দেয়,
মন কালিন্দীর ভরাট জলে।
ঝিঙ্গে ফুলের হাল্কা রঙে ,
স্পষ্ট হয় স্মৃতির ছায়াপথ।
আজন্ম লালিত সাধ,
উঁকি দেয়, শুকতারার রাতজাগা চোখে।

বেঁচে আছি তো?


মার ইচ্ছেরা আজকাল
ইচ্ছে হারিয়ে ফেলছে ক্রমশ
সুখ নেই, শোকও নেই কাছাকাছি

আমি চলতে চলতে পিছিয়ে পড়ি
আমার আগন্তুক স্বপ্নেরা বাসা বাঁধে অন্য ঘরে
ধু ধু ফাঁকা মাঠ যেন হাতছানি দেয়
ভবিষ্যতের কোথাও
আমার আকাশে কালো মেঘ সারি সারি
অসাড় শরীর বয়ে নিয়ে যায় সময়
লক্ষ্যহীন পথের পথে
আমি মাঝে মাঝে অজান্তে
চিমটি কাটি শরীরে
বেঁচে আছি তো?
বেঁচে আছি তো? নাকি আমারো মৃত্যু হয়েছে
আরো অনেকের মত
নিজের জন্য বেঁচে বেঁচে

১৭/০৯/১২ সময় রাত ১২-১৫    (c) Picture:ছবি

শুক্রবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১২

মাটি, লবণ ও কবিতা


(আমার বন্ধু, কবি, সাংবাদিক আপন মাহমুদ কে... আপাতত তার দেশের নাম আমি জানিনা।প্রয়াত কথাটাও তাই লিখলাম না। কারন আপন'দের মৃত্যু হয়না কোনদিন। আমি বিশ্বাস করি প্রতিটি মৃত্যু প্রতিদিন নতুন জন্মের ইন্ধন দেয়। মাটি বাঁচতে দেয়, বসতি গড়তে দেয়, খাদ্য দেয় তাই মাটির ভুবনে মৃত্যু শব্দের কোন অস্তিত্ব নেই। তাই এই মাটি, আমি, আমরা যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন আপন বেঁচে থাকবে। বন্ধুদের অভিযোগ করতে নেই, তাই অভিযোগ করলাম না শুধু জানতে চাইছি কেমন আছো তুমি...)




 নুন মাটির দেশে শুধু অন্ধকার। একা বড্ড ভয় লাগে আমার।

আমার ডেস্কে ডেটলাইন, বলপেনে বিষয় মৃত্যু
আর তুমি ভালবাসা। সাদা কাগজ

শরীর আমার হিম ঠান্ডা, কোন বিদ্রোহ করার শক্তি আপাতত আমার নেই।
তাহলে হয়তো মৃত্যু সভ্যতার একটা নিখুঁত কপি শেষবার তোমায় দিয়ে যেতে পারতাম বন্ধু।

একটু একটু করে মিশে যাচ্ছে আমার শরীর মাটির সাথে
যেভাবে মিশে গিয়েছিলাম
তোমার শরীরে
একবার
শেষবার
বহুবার।

আমার মৃত্যু, তুমি, কবর
মাটি, লবণ, কবিতার বই
খিদে, স্বপ্ন এবং মাতৃগর্ভ
সব বেঁচে আছে।


তুমিও বেঁচে আছো
পৃথিবী বেঁচে আছে
বেঁচে আছি বন্ধু জীবাশ্ম হয়ে

আমার নিহত কোষ থেকেই আবার জন্ম নেবে
কোন শিশু, কোন নতুন কবিতা বা প্রিয় বকুল বাগান।

                        (c) Picture:ছবি

শনিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১২

সুলেমানপুরের আয়েশা খাতুন




    সুলেমানপুরের আয়েশা খাতুন, কিংবা আয়েশা খাতুনের সুলেমানপুর, দুটোই আমার কাছে অচেনা। কিন্তু কেন জানি এক নিবিড় টান অনুভব করি সুলেমানপুরের প্রতি আর ওইখানটার আয়েশা খাতুনের প্রতি। মাঝে মাঝে এমন লাগে যে ওই সুলেমানপুর আমার চিরচেনা একটা জায়গা আর আয়েশা খাতুন আমার রক্তের কেউ। এবার বলি নামটা জানি কিভাবে। হরফ প্রকাশনি আর আনন্দ পাবলিশার্সের বই সেই ছোটবেলা থেকেই দেখছি ঘর ভর্তি। ইসলামিক বই ছাড়া ও কিছু গল্প, ভ্রমন কাহিনি, আত্মজীবনী ধরনের প্রায় সবই ছিল হরফ প্রকাশনির আর দেশ, আনন্দমেলা, মিস না যাওয়া আনন্দমেলার পুজো সংখ্যা সহ বাকি পই পত্তর প্রায় ওই আনন্দ পাবলিশার্সের ছিল। আমার সীমিত বাল্য কৈশোরের মিশ্র নজরে ওই দুই পাবলিশার্সের ই ছিল এক চেটিয়া আধিপত্য আমাদের ঘরে। এছাড়া আরও কিছু সমগ্র মনে পড়ে গীতি বিতানের সম্পূর্ণ ভল্যুমের সাথে। সুকান্ত, শরৎ, হেমন্ত, সুভাষ সমগ্রের সাথে ওদের কবিতার বই, উপন্যাস ও ছিল যাদের পাবলিশার্স কে ছিল ঠিক মনে নেই। নবকল্লোল, কাকলি সহ আরও কিছু মোটা সাইজের ম্যাগাজিন ছিল যাদের দেখলে মনে হতো চল্লিশ ঊর্ধ্ব অভিনেত্রি, অতিরিক্ত মেদে নেতিয়ে পড়া শরীরে আগের সেই তেজ নেই তাই বাধ্য হয়ে শেলফের নিম্ন সারি থেকে দেখছে উত্তরসূরি আনন্দমেলার যৌবনোদ্দিপ্ত দাপট। আমার কিন্তু বেশ মায়া লাগতো ওদের প্রতি, তাই প্রায় ই ছুটির দিনে ওদের একটু সেবা যত্ন করতাম। এই যেমন ধুলো ঝেড়ে আবার ঠিকঠাক রাখা, ভেতরের ছোটো ছোটো বই পোকাদের পিষে মারা, আর ওদের তৈরি অসংখ্য বেক স্লেশ আর ফরওয়ার্ড স্লেশের মত য-ফলা গুলো দেখে দেখে একটু হারিয়ে যাওয়া। আরেকটা বিষয়ে ওই ম্যাগাজিন গুলোর প্রতি আমার একটা ভাব ছিল, সে হচ্ছে আশির দশকের বিজ্ঞাপনের স্টাইল টা দেখা, সুন্দর দু’লাইনের একটা ছড়া দিয়ে বিজ্ঞাপন গুলো থাকতো। যাইহোক, কথায় কথায় অনেক চলা, আসল কথাই হয়নি বলা।  সুলেমানপুরের আয়েশা খাতুন।

              সে একটা বই এর নাম ছিল। আব্দুল আজিজ আল-আমানের। একটা গ্রাম্য মাঠ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে একটা মেয়ে। যদ্দুর মনে পড়ে বইয়ের প্রচ্ছদ টা ছিল এরকমই একটা ছবির। আমার আজ অব্ধি বইটা পড়া হয় নি, অনেকবার দেখেছি শেলফে বিভিন্ন বই খুঁজতে গিয়ে, কিন্তু কেন জানি পড়া হয়ে ওঠেনি এখনও। প্রবাস জীবনে যতবারই আমার ঘরের পড়ার ঘর টা নিয়ে ভেবেছি, শেলফের কোন বই কোথায় ছিল নিয়ে ভাবনায় ডুব মেরেছি, ততবারই ওই বইটার কথা মনে পড়েছে আর প্রতিবারই বলতাম এবার ঘরে গেলে বইটা নিয়ে আসব সঙ্গে করে। আর ওই ভাবনা-চিন্তা আর না আনার বিড়ম্বনায় কবে যে আমার মনে নিজস্ব এক সুলেমানপুর জন্ম নিয়েছে সে কথা টের ই পাই নি। আর তাই প্রায় ই সুলেমানপুর নিয়ে ভাবলেই চোখে ভেসে ওঠে সুলেমানপুরের ভোর, বৃষ্টি স্নাত শান্ত সাদা রঙ এর দুপুর, পড়ন্ত বিকেলের হেলান দেয়া রোদ আর ঝিঁঝিঁ পোকায় ডাকা সুলেমানপুরের রাত।

              আগের রাতের ঝড় তুফানের আছড় লাগা গ্রামের চুন দেয়া মসজিদের পুরনো দেয়াল, গাছের ডাল ভেঙ্গে পড়া পথের পাশের গর্ত থেকে নাক ডাকানো বেঙের কোরাস আর কিছু বয়স্ক নিয়ে নামাজ শেষে ইমাম সাহেবের পুব আকাশে একমনে তাকানো কে সাক্ষী রেখে ধীরে ধীরে সূর্য যেন চলে এসেছে লক্ষ মাইল অতিক্রম করে এদের কাছে, পাখি গুলো যেন আবার জেগে উঠেছে এক নতুন আনন্দে, লাঙল হাল নিয়ে আবার চাষিরা মাঠে। সুলেমানপুরের সে এক নতুন স্নিগ্ধ ভোর।

               বেলা বাড়তেই আবার ও মেঘলার ঘোর, কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে যায় সুলেমানপুরের আকাশ। একধরনের ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে যাওয়া শেষ সকালে কোত্থেকে যেন একদল ছেলের দল জুটে যায়, ছোটো ছোটো গর্ত গুলোয় বাঁধ দিয়ে শুরু হয় জল সেঁচা, আর মাছ ধরার সময় প্রায় সবারই  রঙ এক হয়ে যাওয়া দলের একজন হয়ে উঠে রীতিমত হিরো। মাগুর, শিং আর কই মাছ ধরার তাঁর অকপট কৌশলে পাড়ে বসা পান মুখো ইঁচড়ে পাকা যুবাদের মুখে ফুটে বিশেষণের ফুলঝুরি।

              এক পশলা বৃষ্টিতে সুলেমানপুরের দুপুর আবার ও সবুজ হয়ে উঠে। ভেজা মাটি আর রৌদ্রের গন্ধে ম ম করছে গ্রামের মেঠো পথ। সদ্যোজাত বাছুরের উদ্দেশ্যহীন দৌড়ের পেছনে পেছনে ক্লান্ত শিশু মুচকি হেসে মুখ লুকোয় যখন দেখে তাকে কেউ লক্ষ্য করছে।

             সুলেমানপুর নিয়ে এরকম আরও কত কিছু মনে আসে প্রায়ই। কখনও ডুব দেই আবার কখন ও ভাবি এবার না হয় বইটা পড়েই ফেলব ঘরে গেলে। আমি আবার ও ঘরে গেলাম, দিন কাটালাম অলসের মত, কাজের কাজ কিছুই হল না, সোমবারে স্কুলে যাওয়ার মত মুখ করে আবার ও ফিরে এলাম। ভাবি থাক আমার সুলেমানপুর না পড়া, থাকুন আয়েশা খাতুন যেভাবে আছেন সে ভাবেই। আমি আমার প্রবাস জীবনে মাঝে মাঝেই ঘুরে আসব সুলেমানপুর। মুচকি হেসে আবার ও বুঝাব সুলামানপুরের কথা কৌতূহলী বউকে। আর কোন কিছুই বুঝে উঠতে না পারা বউয়ের প্রশ্ন বোধক মুখ কে এক পাশে রেখে আবার ও মেতে উঠবো সুলেমানপুরে।

১ সেপ্টেম্বর, ২০১২ (c) Picture: ছবি