“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

বুধবার, ২৯ মার্চ, ২০১৭

মা কেন চলে গেলে


               ।।  সুমন দাস ।।
সকালবেলা জল আনতে গিয়ে পুকুর পাড়ে পড়ে মায়ের কোমরের স্পাইনালকর্ড ভেঙে চলাফেরা বন্ধ। দুদিন হল ব্যাঙ্গালোরে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি ছেড়ে বাড়ি ফিরে এসেছে সুমিত। নিজের জমানো টাকা যা ছিল সেইগুলো দুই বোনের বিয়েতে শেষ হয়ে গেছে। বাবা মারা যাওয়ার পর মা ও দুই বোনের ভার পড়ে সুমিতের উপর। বড় দুই চাকুরিজীবী ভাই স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে শহরের ফ্লাটে থাকেন। পৈতৃক সম্পত্তি বলতে আধবিঘা জমি জুটেছিল সুমিতের ভাগে। মা ও বোনেদের দায়িত্ব নিতে দাদা অনীহা প্রকাশ করেন। বিবেকের তাড়নায় ওদেরকে নিজের কাছে সে রেখে দেয়।
          দুই বোনের বিয়েতে নিজের ভাগের পনের কাঠা জমিও বিক্রি করে দেয়। পাঁচ কাঠার মধ্যে বাঁশ বেত দিয়ে মোটামুটি মাকে নিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই বানায় সে। স্নাতক উত্তীর্ণ সুমিত সরকারি চাকুরি না পেয়ে ব্যাঙ্গালোরে গিয়েছিল মাস কয়েক আগে।জুটিয়ে নেয় সিকিউরিটি গার্ডের চাকুরি। মায়ের কথা খুব বেশী মনে পড়াতে বাড়ি ফিরে আসে। ফলে বর্তমানে হাত প্রায় শূন্য। হাতে বেশী টাকা না থাকলেও সুমিত মাকে ভর্তি করে সরকারি কোন হাসপাতালে নয় - শিলচরের নামী নার্সিংহোমে। পাঁচদিনেই খরচ এক'লক্ষ দশ হাজার টাকা। যদিও পকেটে তেমন টাকা ছিল না তাই পুকুর পাড়ের দুই কাঠা জায়গা পাশের বাড়ির কাকুর কাছে এক লক্ষ টাকায় বিক্রি করে দেয়। তা দিয়ে মায়ের অপারেশনের টাকা মিটায়। বর্তমানে ছোট্ট পুকুর ও কুঁড়ে ঘর নিয়ে সাকুল্যে তিন কাঠা জমি রয়েছে। বাবা বেঁচে থাকতে সুমিত ছিল সকলের নয়নের মণি। সামাজিক ও পরোপকারী, ক্রিকেট থেকে ফুটবল সব খেলাতেও ছিল নামডাক। কলেজ জীবনে বাবার কাছ থেকে টাকা আবদার করে নিয়ে কত বন্ধুর ফি সহ বই খাতা কিনে দিয়েছে তার কোন হিসেব নেই। এখন বন্ধুরাও খবর রাখে না।
          এদিকে কয়েকমাস কেটে গেলেও মায়ের অবস্থার তেমন কোন উন্নতি নেই, কোমর থেকে নিম্নাংশ পুরোপুরি অচল। পাড়ার লোকেরা বলছেন, ভেলোর কিংবা অ্যাপেলো হাসপাতালে ফিজিওথেরাপি করালে হয়ত ধীরে ধীরে হাঁটার ক্ষমতা ফিরে পেতে পারেন। 
             মাঝে মধ্যে বোনেরা দেখে গেলেও ভাইয়েরা একটি দিনের জন্য মাকে দেখতে আসেননি। কাজের চাপ বলে এড়িয়ে যাচ্ছেন। টাকা দিয়ে সাহায্য করা তো দুরের কথা।  কাম ছেড়ে মায়ের সেবায় ব্যস্ত সুমিত। শুধু ভাবতে থাকে কিভাবে মাকে সুস্থ করা যায়। শেষমেশ পরিকল্পনা করে বাকি থাকা তিন কাঠা জমি ঘর সহ বিক্রি করে দেবে। প্রয়োজনে ঘর ভাড়া করে মাকে নিয়ে থাকবে। ছোটবোন বলে আর চিকিৎসার দরকার কি যতদিন বাঁচবেন এভাবেই থাকুন। সুমিত রেগে বলে, তোদের কথায় চললে আমার হবে ; আমাকে আমার মতো ভাবতে হবে। যেমনি ভাবা তেমনই কাজ। পাশের বাড়ির কাকুর কাছে জমি বাড়ির বায়না করে চেন্নাই এর টিকিট কাটে সুমিত। সঠিক দিনে গুয়াহাটি থেকে ট্রেনে চাপে। এর আগে জমি-বাড়ি বিক্রির পুরো টাকা সমঝে নেয়। তার মনে আজ খুব আনন্দ। দিন কয়েকের মধ্যে মাকে সুস্থ করে নিয়ে আসবে। নাই বা থাকল ঘর-বাড়ি মা তো পাশে থাকবেন। নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছার পর সুমিত মায়ের জন্য খাবার আনতে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে সুমিতের মা হৃদ রোগে আক্রান্ত হয়ে ট্রেনের সিটে লুটিয়ে পড়েন। সুমিত ফিরে এসে দেখে সিটে পড়ে রয়েছে মায়ের নিথর দেহ। বাকরুদ্ধ হয়ে যায় সে। সম্বিত ফিরতেই হতভাগ্য সুমিতের একই প্রলাপ কি দোষ ছিল আমার?  মা কেন চলে গেলে?

অভিসার


।। অধিষ্ঠিতা শর্মা।।
















রাতের বালিশজুড়ে জেগে থাকে এক মায়া
শুধু আমায় হাত ধরে নিয়ে যাবার জন্যে
কোনো এক অতল স্তব্ধতায়।
অশরীরীকে নিয়ে মেতে উঠি শরীরী খেলায়
রতিক্রীড়ার মত্ত প্রহরে আলিঙ্গনপাশে
ঘর্মাক্ত প্রতি বিন্দুতে পুনর্জন্ম হয় আমার।
রক্তকণিকায় মিশে গিয়ে চিরচেতনায় জেগে থাকে
নৈশব্দ্যের যাত্রাপথে পরমপাওয়া প্রার্থিত শান্তায়ন।

মঙ্গলবার, ২৮ মার্চ, ২০১৭

ফেসবুকীয়



........©চিরশ্রী দেবনাথ













ভারতের বুকে আজ জ্বলছে আলো, রঙিন প্রতিবাদ
এ আর নতুন কী, কী এমন অঙ্গক্ষত, কি এমন রক্তচাপ।
দেশ এই, ভরে ওঠা ধানের ক্ষেত, ইক্ষু সমারোহ
তার পাশে একটি রোগ, ক্রমাগত
স্বাধীনতার আগেও ছিল,  এখনো সে  অক্ষত।
পুড়ছে কৃষক, কন্নড় কিংবা বাঙালি,
নামছে রাত, আত্মঘাতী, এই তো হরিয়ালী।
ধর্ম হলো,
বাঁশির সুর,  পোয়াতি গাভি, শিশির ভেজা ঘাসের জমি
সাত সকালে পান্তাবাসি কিংবা রুটি,
কারখানাতে যাব বলে বউয়ের গালে ভোরের  আদর
একপ্রহরের একটু বিশ্বাস, নীরব মন্ত্র, খোলা আজান, নির্বিকার।
তোমার হাতে আছে  কলম কিংবা দামি অস্ত্র
তাই দিয়ে নজর ঘোরাও... থাক সবাই ব্যস্ত
একটুখানি লেলিয়ে দাও, লাগুক দাঙ্গা, পুড়ুক ঘরবাড়ি
নাহয় মুখ ঢাকলে নারী, হাতের শঙ্খে এ কোন সুনামি?
মুছলো খানিক মেহেন্দি রঙ, হাত ছাড়লো হাতের ছোঁয়া,
খানিক আগেই ছিল বসন্ত, দেশ আমার এমনি বোকা।
আস্তে আস্তে,  দেশটি আমার, যাচ্ছে নাকি সেইদিকে,
নাম তার কর্পোরেট, বিলের পর বিল সংসদে।
একটি ব্যবসা নিজের আমার,
হয়তো তোমার একটু ক্ষেত সোনার মতো,
বিশ্বায়ন নিচ্ছে তুলে ছোঁ মেরে,
এই সেই বাজপাখি, চোখ পেতেছে থার্ড ওয়ার্ল্ডে।
আমরা জানি তুচ্ছ বিষয়,
হর হর মহাদেও, আল্লাহ আকবর
উৎস পেলেই চলকে উঠি,  মার মার, কাট কাট,
সে ছিল বন্ধু আমার।
নিভে আসে সন্ধ্যা, ছেলেমেয়ের পড়া, গানের রেওয়াজ
আসছে ধেয়ে কালো মশাল, রাস্তা গলি শুনশান।
কাপের লাল চা, খেলছে এখন  রক্তহোলি,
মৃত শাবকের পাখায় ঢাকা , এ কোন অচেনা  গোধূলি।
এখন একটিই রাজনীতি...প্রতিরক্ষা এবং উদারনীতি,
আমিও তাই বিশ্বাস করি, শ্লোগানের গলায় ঢালছি জল।
 
জোনাক ভেজা মাঠগুলোতে নামছে পণ্য হাজার হাজার,
মেধার স্রোত,  নীল আটলাণ্টিক , আসছি মা,  মাত্র  কয়েকদিন।
দেয়াল জোড়া চোরা  ঘুলঘুলি,  সাজানো সংঘাত, দেশনেতা একটু কান্না শেখো, প্রতিবাদে দিও না হাত।

রবিবার, ২৬ মার্চ, ২০১৭

স্রোতস্বিনী

।। মধুমিতা নাথ ।।














নদীর সঙ্গে মিল খুঁজেছো কখনো ---
তোমার প্রয়োজন মেটাতে দুঃখ ঢেউ নেই কোনো
ভালোবেসে জল ছুঁয়ে দেখো , পায়ের পাতা ডুবিয়ে
খেলো খুশিখুশি নিক্বণে
তোমার জন্য একটা সভ্যতা গড়ে দিতে পারি
মেসোপটেমিয়ান ...

তোমার প্রেমহীন প্রয়োজনেও হাসতে থাকি
নৌকোর পাটাতনে ছলাৎ যেমন ,
তোমার জ্ঞানী উদাসীনতায় নিশ্চুপ হাহাকার ওঠে
শেষরাতের জোয়ারে
তোমার দুর্বিনীত ভাবাবেগে ছুঁড়ে দেওয়া
আবর্জনা বুকে স্বচ্ছতোয়া গতি থমকায় প্রতিটি বাঁকে

দেখতে থাকো ...
সব কাজ সেরে , তোমার অবজ্ঞায় , তোমার উন্মাদনায় ,
তোমার জন্য তোমারই অজান্তে
হয়ে উঠতেও পারি এক মহামারী ---

এর নাম প্রকৃতির প্রতিশোধ।।





           ---------------//------------