“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

বৃহস্পতিবার, ৬ জুন, ২০১৩

অনন্তশয্যা


শীর্ণ চাঁদের শরীর থেকে উপচে পড়া আলোর
কাছে তোমার মৃত্যু ভিক্ষা করি আমি।
বনকুমারী দেবীর কাছে
ভিক্ষে করি একটা আস্ত সবুজ পাহাড়।

যে পাহাড়ের শরীর তোমায়
দেবে এক অনন্তশয্যা ফুলের গোছা

এরপর নামহীন, গোত্রহীন এক পুরুষ
তোমার কাছে ভিক্ষে চাইবে, হারিয়ে যাওয়া
পাহাড়ী নদীর তীরে গড়ে ওঠা সভ্যতার ইতিহাস

এরপর!
নিস্পাপ এক হৃদয় জন্ম নেবে ত্রিপিটকের পাতায়,
যাকে তুমি আগলে রেখেছ এতকাল।

সবুজ বনভূমিতে অসূর্যস্পর্শা আম্রপালি
এবং তোমার অলিগলি...
অন্তশলীলা এক নদীর ইতিহাস,
হলুদ আর লাল অনন্তশয্যা, আজ এলোমেলো।

সোমবার, ৩ জুন, ২০১৩

প্রথম কদমফুল



                  # স্মৃতি পাল নাথ # 
(c) ছবিঃPicture















গান হই না কেন ?
গান হই না কেন ,প্রথম কদম ফুল ?
আমার চোখের ভেতর হরিণ,মনের ভেতর ময়ূর
শব্দের ভেতর যে শুনশান মাঠ, নদী, নৌকা,গাছপালা,পায়ে চলার পথ
দূর ছায়াপথ,শস্যক্ষেত্র,অরণ্য,প্রান্তর
আমার শব্দের ভেতর বাবুইপাখি,আমি খড়কুটো
ফসলের গন্ধে দিগ্বিদিক স্বজনেরা,আমার আলজিভে ঘা ।
মেঘ ও বিদ্যুতে ছেয়ে আছে দূর ছায়াপথ
মেঘেরা করে কানাকানি
একফোঁটা বৃষ্টির জল হাতে দাও আমায়।
জানো,স্বপ্ন দু’ঠোঁট উল্টে অভিমান করে
জীবন্ত শিলায় আমার রাস্তাগুলো যে বদলে দিয়েছে
আমার রাস্তাগুলো দিয়ে আমি হেঁটে যাই
গুপ্তশত্রুরা যেমন লুকিয়ে থাকে
কিছু জোছনা,কিছু রোদ সব সময়ই মানুষের সঙ্গে থাকে
নিজের মধ্যে থেকে বেরিয়ে যাবার রাস্তা ।
যে সংসার বেশ্যার গলি
ভেঙে দাও প্রথা
বরবউ,জঙ্গলে ভ্রূণ
ছিঃ। জানো, ছিঃ বলতে নেই ।
বৃষ্টি হইনা কেন ?
পৃথিবীর প্রথম আগুন এই বক্ষে
তোমার গান
ভিখিরিদের শীতের উত্তাপ হয় না কেন ?
গাছ দেখলেই চিনে নিতে পারি
আমার সূক্ষ্ম ফুলগুলি কাঁপে
কারও কারও সঙ্গে কথা বললে কেমন পাথর লাগে
আমার নাম না জানা ঝর্নারা ছটফট করে,অসংখ্য নদীর জন্ম হয়
আমি ডুমুরগাছ চিনি,ডুমুরফুল চিনি ।

(২০০৫)


রবিবার, ২ জুন, ২০১৩

রাইনের মারিয়া রিলকে : নবীন কবিকে লেখা চিঠি -১


ছায়া অনুবাদ: দেবব্রত আচার্য 

( রাইনের মারিয়া রিলকে চিঠিগুলো লিখেছিলেন ২৭ বছর বয়সে,  এক কবি যশোপ্রার্থী ১৯ বছরের বালককে। যা Letters to a Young Poet ( মূল জার্মান নাম : Briefe an einen jungen Dichter) নামে ছাপা হয়। নিচে প্রথম চিঠিটির ছায়া অনুবাদ। এক একে বাকিগুলো ও অনুবাদ করার ইচ্ছে রইল। )

 প্যারিস,
ফেব্রুয়ারী ১৭, ১৯০৩
 প্রীতিভাজনেষু, 

        তোমার চিঠি কিছুদিন আগেই পেয়েছি। আমার ওপর তোমার আস্থার জন্য ধন্যবাদ। আমি একটি কাজ করতে পারি তোমার জন্য । তোমার কবিতাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারি । সমালোচনা করার মতো যোগ্যতা আমার নেই। সমালোচনার পরিসরে শিল্পকর্মকে খুব কমই ধরা সম্ভব হয়। এতে সৃষ্টি হয় অহেতুক ভুল বোঝাবুঝির । সব কিছুর যেমন অবয়ব দেয়া সম্ভব হয়না না তেমনি ভাষায়ও প্রকাশ করা যায় না।  এমন অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে যা প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব। এই অনির্বচনীয় অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের মনোজগতের এমন একটি স্তরে ঘটে,  যেখানে কোন ভাষা এখনও প্রবেশ করতে পারেনি। শিল্পকর্মের ক্ষেত্রে সেটি আরো বেশি করে প্রযোজ্য। এই অভিজ্ঞতাগুলোর অস্তিত্ব বেঁচে থাকে শুধু মাত্র আমাদের স্বল্পমেয়াদী  জীবনের পরিসরে।

           উপরের এই সংক্ষিপ্ত কথাগুলো কে ভূমিকায় রেখে আমি কি বলতে পারি যে তোমার কবিতায় নিজস্ব কোন  রচনা শৈলি এখনো গড়ে ওঠেনি ।যদিও এতে একান্ত নিজস্ব, সুপ্ত একটা কিছুর নীরব যাত্রা শুরু রয়েছে বলে মনে হয় । তোমার শেষ কবিতা 'আমার আত্মা'য় এ ব্যাপারটি আরো স্পষ্ট করে চোখে পড়ে। সেখানে তোমার নিজস্ব কিছু উপলব্ধি শব্দ ও ছন্দ হয়ে উঠতে চাইছে মাত্র। তোমার 'লিওপার্ডীর প্রতি' কবিতায় বিশাল এক নির্জন  সত্তার প্রতি তোমার এক রকম সংযোগের প্রকাশ ঘটেছে । কবিতা গুলো নিজেরা তেমন কিছু হয়ে ওঠেনি। স্বাধীনভাবে এরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি আপন মহিমায় । এমন কি তোমার শেষ কবিতাটি বা 'লিওপার্ডীর প্রতি' ও নয়। তোমার চিঠিতে তুমি যে ত্রুটি গুলোর কথা উল্লেখ করেছ সেগুলো পড়ার সময় আমি নিজেও বুঝতে পেরেছি। কবিতার নামগুলো এই মুহূর্তে যদিও মনে করতে পারছি না । 

              তুমি জানতে চেয়েছ কবিতাগুলো ভালো হয়েছে কিনা। আমাকে যেমনটি জিজ্ঞেস করেছ, তেমনি অন্যদেরও জিজ্ঞেস করেছ। পত্রিকায় পাঠিয়েছ কবিতাগুলো। অন্যের কবিতার সাথে তুলনা করেছ। সম্পাদকেরা তোমার কবিতা বাতিল করে দিয়েছে বলে কখনও মর্মাহত হয়েছ। এখন যখন তুমি আমার উপদেশ চাইছ তবে তোমাকে আমি একটি অনুরোধ করছি। এগুলো আর দয়া করে করনা । তুমি বাইরের দুনিয়ার দিকে তাকিয়ে আছো। এটি এক্ষুণি তোমায় এড়িয়ে চলা উচিত। এ ব্যাপারে অন্য কেউ  তোমাকে উপদেশ দিতে বা সাহায্য করতে পারবে না। কেউ না । শুধু মাত্র একটি কাজ করতে পারো। নিজের দিকে ফিরে তাকাও। যা তোমাকে বাধ্য করে লিখতে সেই কারণটি খুঁজে বের করো। খুঁজে দেখ এই কারণটি তোমার হৃদয়ের কত গভীরে শেকড় ছড়িয়েছে । নিজেকে জিজ্ঞেস করো যদি তোমার জন্য লেখালেখি নিষিদ্ধ করা হয় তবে তার জন্য প্রাণ দিতে পারবে কিনা। নিজেকে রাতের একান্ত  নির্জনতায় জিজ্ঞেস করো,  "আমাকে কি লিখতেই হবে?" নিজের গভীর সত্ত্বার  কাছে গিয়ে এর উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা করো। যদি এই ভাবগম্ভীর প্রশ্নের উওর আসে তীব্রতর চিৎকারে, "হ্যা, আমাকে লিখতেই হবে" - তাহলে নিজের জীবনকে এর জন্য তৈরি করো। জীবনের প্রতিটা মূহূর্তে  উৎসর্গ করো। নগণ্য থেকে নগণ্যতম সময়গুলোও সাক্ষী থাকুক তোমার তীব্র অন্তর্দহনের । তারপর প্রকৃতির খুব কাছে যাও। পৃথিবীর প্রথম মানুষের চোখ নিয়ে দেখ প্রকৃতিকে। বলার চেষ্টা করো , তুমি কী দেখছো, কী অনুভব করছো,  কী  ভালোবাসতে পারছো আর কীইবা হারাতে চলেছ ? 

        প্রেম বা অতি সাধারণ কোন বিষয়ে লিখতে চেষ্টা করো না। এটা খুব কঠিন কাজ । যে বিষয়গুলো নিয়ে ইতিমধ্যেই অনেক চমৎকার কাজ হয়ে গেছে, সেগুলো নিয়ে মৌলিক কিছু লিখতে গেলে প্রচণ্ড রকমের মুন্সিয়ানা চাই। যা আসতে পারে একমাত্র পরিণত হাতের ছোঁয়ায়। তাই এ বিষয়গুলো থেকে দূরে থেকো। লিখতে চেষ্টা করো তোমার দৈনন্দিন যাপিত জীবন। তোমার ছোট ছোট দুঃখ, ইচ্ছে, হঠাৎ  করে উড়ে আসা ভাবনা কিংবা সৌন্দর্য সম্পর্কে তোমার নিজস্ব বিশ্বাস। বিনয় ও আন্তরিকতার সাথে লিখে যাও।যখন লিখবে তখন চারপাশের রীতিনীতি, স্বপ্নে দেখা চিত্রকল্প ও স্মৃতির সাহায্য নাও। যদি তোমার যাপিত জীবনকে আপাত পক্ষে দরিদ্র বলে মনে হয় তবে তাকে দোষ দিও না। দোষ নিজেকে দাও। নিজেকে বলো কবি হওয়ার গৌরব সে তোমার নয় । কারণ স্রষ্টার কাছে ধনী দরিদ্র বলে কিছু হয় না । নিজেকে কখনও খুঁজে পাও যদি জেলখানার চার দেয়ালের মাঝে; যেখানে পৃথিবীর অন্য কোন শব্দের প্রবেশ নিষেধ; সেখানেও কি তোমার সাথে থাকবে না শৈশবের অমূল্য সেই সোনালি দিনগুলো? সমস্ত শক্তি দিয়ে সেখানে মনসংযোগ করো। চেষ্টা করো সময়ের অতলে হারিয়ে যাওয়া সেই অনুভূতিগুলোর অনুরণন আবার নুতন করে অনুভব করতে। তাতে তোমার ব্যক্তিত্ব হবে আরো প্রখর। তোমার নির্জনতার পরিধি বিস্তৃততর হয়ে নিজেই পরিণত হবে বিশাল এক জগতে । সে জগতের সন্ধ্যালোকে তুমি নিজেকে খুঁজে পাবে একা। অনেক দূর হতে চেনা অচেনা মানব-মানবীর কোলাহল তোমার কর্ণকুহরে এসে পৌঁছুবে । এই একান্ত নগ্ন নির্জন জগতে হারিয়ে যেতে যেতে যদি কাব্যলক্ষ্মী তোমাকে ধরা দেন তবে ভাববার প্রয়োজন পড়বে না, তা ভাল না মন্দ। তুমি তোমার কাব্যলক্ষ্মীকে তখন আর পত্রিকায় পাঠাবে না । কারণ এটি  তোমার সৃজন । তোমার জীবনেরই একটা অংশ। তোমারই কণ্ঠস্বর।

        শিল্পকর্ম তখনই শিল্পমানে উন্নিত হয় যখন তা  অন্তর্নিহিত তাগিদ থেকে সৃষ্টি হয় । এই তাগিদ দিয়েই শিল্পকে আলাদা করে চেনা যায় । সুতরাং, আমি তোমাকে অন্য কোন উপদেশ দিতে অক্ষম। শুধু বলতে পারি নিজেকে জানো। আরো গভীরে প্রবেশ করো। বোঝতে চেষ্টা করো তোমার জীবন যা থেকে উৎসারিত তার গভীরতা। তোমাকে লিখতে হবে কিনা, সে প্রশ্নের উত্তরও আছে সেখানেই। সে উওর যেভাবেই আসুক তা মেনে নাও। তাকে পরিবর্তন করতে যেও না। হয়ত তুমি আবিস্কার করলে একজন কবি হওয়াই তোমার নিয়তি। তা হলে সেই নিয়তিকে মেনে নিয়েই পথচলা শুরু হোক। তার ভার, বিশালতা সবই গ্রহন করো, ফলের আশা ছেড়ে। কবির কাছে তার নিজস্ব একটা আশ্চর্য ভুবন থাকা চাই। কবি তাঁর সৃষ্টির সব উপাদান এই ভুবন থেকেই খুঁজে নেবেন । সে ভুবনের প্রতি কবির থাকবে সমস্ত জীবন উৎসর্গিত।

           তোমার অন্তপুরের নির্জনতায় প্রবেশ করে হয়তো জানতে পারলে কবি হওয়া তোমার কর্ম নয় ( যদি এক জন না লিখে বাঁচতে পারে তবে তার লিখার প্রয়োজন নেই )।  তারপরও এই নিজেকে খোঁজার অর্থ মিথ্যে হবে না তোমার । জীবন সেখান থেকেই সঠিক পথ খুঁজে নিবে। আমি আশা করছি এই নুতন পথও  হবে আরো বিস্তৃত। আমার শুভ কামনা রইল। 

           আর কি বলতে পারি বলো? ছোট ছোট টুকরো ঘটনার রয়েছে অসীম গুরুত্ব  ।অবশেষে আর একটা পরামর্শ তোমাকে দিচ্ছি । এগিয়ে যাও নীরবে। খেয়াল রেখো এই এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সব থেকে ক্ষতিকারক হতে পারে তোমার  নিজস্ব সত্ত্বার বাইরে গিয়ে তোমার প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা।। তোমার একান্ত নির্জন অব্যক্ত  অনুভুতির অতলেই  লুকানো রয়েছে সে উত্তর। 

        আমাকে যে কবিতাগুলো পাঠিয়েছিলে, সেগুলো ফেরত পাঠালাম । আমাকে বিশ্বাস করে প্রশ্নগুলো করার জন্য আবারো তোমাকে ধন্যবাদ। আমি যথাসম্ভব চেষ্টা করেছি উত্তরগুলো সততার সাথে দেয়ার। আমার চেষ্টার মাত্রাটা হয়ত একজন অপরিচিত ব্যাক্তির থেকে তোমার প্রত্যাশাকে একটু ছাড়িয়েই গেছে ।

তোমার একান্ত, 
রাইনের মারিয়া রিলকে

শনিবার, ২৫ মে, ২০১৩

আত্মপরিচয়

  ( আজ কাজি নজরুল ইসলামের জন্মদিনে কলকাতার নজরুল মঞ্চে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে  কাছাড়ের জাতক কবি রনজিৎ দাশের হাতে 'রবীন্দ্র পুরষ্কার -২০১৩'তুলে দেবেন সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দে'জ প্রকাশিত 'রনজিৎ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা'র জন্যে এই পুরষ্কার পাচ্ছেন কবি। কবির পরিচয় কবি ছাড়া আর কে ভালো দিতে পারে। সম্প্রতি প্রকাশিত গুয়াহাটির কাগজ নাইন্থ কলামের 'দেশভাগ-দেশত্যাগ--প্রসঙ্গ উত্তর পূর্ব ভারত' তথা ১০ম সংখ্যাতে প্রকাশিত তাঁরই লেখা কবিতাতে তাই কবিকে আমাদের অভিনন্দন ---গৌতম ভট্টাচার্য  )
 
 
 
 
 
 
 
 
 
একটি ভাটিয়ালি গান থেকে আমার জন্ম

বহু যুগ আগে, পদ্মা নদীর বুকে, আমার এক পূর্বপুরুষ--
এক কৈবর্ত পুরুষ--এক বলিষ্ঠ ও উদাসীন ইলিশ-শিকারী মাঝি
শেষ রাতে, টিপ টিপ বৃষ্টির ভিতরে,
প্রবল ঘুর্ণিময় নদীজলে শক্ত হাতে বৈঠা টেনে টেনে
একটি ভাটিয়ালি গান গেয়েছিলেন--

সেই গান থেকে আমার জন্ম
আমার পিতৃ-পিতামহের
মাতৃ-মাতামহের জন্ম

আমার মায়ের মুখে শুনেছি সেই ভাটিয়ালি গান
আমার বাবার চোখে দেখেছি ভাটি-র নৌকা ভাসমান

এখনও বর্ষার রাতে, অঝোর বৃষ্টির মধ্যে, ঘন অন্ধকারে
আমাদের ফ্ল্যাট-বাড়ির সদর দরজায়
একটা ছই-তোলা ইলিশ-শিকারী নৌকো এসে দাঁড়ায়
আমি ঘুমের ভিতরে জেগে উঠে
সেই নৌকার কাছে দৌড়ে নেমে যাই
আমি সেই নৌকোর গাব-মাখা গায়ে
বালকের মতো হাত বোলাই
সেই নৌকোয় বসে থাকা আমার ঠাকুরদাকে
আমি পৌঁছে দিই ঠাকুরমার হাতে সাজা এক ছিলিম তামাক
তারপর আমি নৌকোয় উঠে,
ঠাকুরদাকে পিঠে নিয়ে আমাকে খুঁজতে-আসা
উত্তাল পদ্মা নদীর
কলকাতা-ডোবানো ঘুর্ণিজলে
বৈঠা টেনে, সারা রাত, ভাটিয়ালি গাই
 
 

শুক্রবার, ২৪ মে, ২০১৩

শৈশব

 
(c)Picture:ছবি
 
 
 
 
।। দেবব্রত আচার্য।।
হাঁটি হাঁটি পা পা করছে যে শৈশব
তার কানে কানে বলেছি গতকাল

আমাদের কোন মানচিত্র নেই,
আমাদের কোন পতাকা নেই,
আমাদের কোন নেতা নেই,
ছায়াপথের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রটি
আমাদের কেউ নয়। 
তাকে আরও বলেছি,
আমাদের গোয়াল ভরা গরু ছিল,
ছিল দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ,
ছিল সোনালী অতীত।

খুঁজে দেখো ধামাইলের সুরে,
রাধা রমনের মন মুনিয়ায়।
গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের বিস্তীর্ণতায়
খুঁজে দেখো,
আমাদের হারিয়ে যাওয়া পদচিহ্ন,

যদি ইচ্ছে হয়।


১৯শে জুলাই, ২০১১
বেঙ্গালোর, কর্ণাটক

বৃহস্পতিবার, ২৩ মে, ২০১৩

অন্দরমহল


তোমার অন্দরমহলে আজ বৃষ্টি

সুগন্ধি চন্দন কাঠের বাক্সে বন্দী
তোমার কিশোরী দুপুর

যৌবন আজ নীলাম
নীমকাঠের সিঁদুর কৌটয়

জানালার রেলিং ধরে ঝুলে থাকা
মানিপ্ল্যান্টের পাতা সব রুগ্ন।

কাঠের উনানে সেদ্ধ হচ্ছে বুনো আলু
আরেকটা হিরোশিমার প্রস্ততি

পৃথিবীটা আজ পোড়া আলুর মতো নরম আর কালো।

#
তবুও বৃষ্টি ঝড়বে, বীনুনি বাঁধবে যত্ন করে ইউকেলিপ্টাস।
শরীরময় সুগন্ধি ছড়াবে যত্নে,গোধূলি বিকেলের
একফালি সোনালী রোদ্দুর স্নান শেষে তোমার কপালে,

আজ তুমি চরিত্রহীনা
একশ বছর পর মৃত ফলকে
খোঁদাই করা এপিক

বৃষ্টিতে স্নাত স্বর্গীয়া শ্রীমতী জুইরানীর শ্বেত পাথর

##
বৃষ্টি আসবেই, তুমি ভিজবেই, রাত নামবেই
সকাল হবেই, ভালোবাসবেই,
চোখ ভিজবেই, তুমি হাসবেই, ভালোবাসবেই।

বুধবার, ২২ মে, ২০১৩

‘আন্তর্জালে বাংলা ভাষা-সাহিত্য চর্চার পথ এবং পদ্ধতি’ নিয়ে ব্যতিক্রমী কর্মশালা শিলচরে

        
   
          ‘ মাতৃভাষার ঋণ, মাতৃঋণ’ আন্তর্জাল ব্লগের উদ্যোগে এক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে শিলচরে ২৩ এপ্রিল ২০১৩ খ্রিঃ ।তিনসুকিয়া মহাবিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক তথা বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক এবং ব্লগার সুশান্ত করের পরিচালনায় শিলচরের হিরণপ্রভা দেব শিশুমন্দির স্কুলে অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতিতে ।সারাদিন ব্যাপী এই কর্মশালায় ছাত্রছাত্রী , বিদ্যালয়ের শিক্ষক- শিক্ষিকা সহ অন্যান্যদের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মত ।
সুশান্ত করের পরিচালনায় এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যায় কর্মশালাকে ।
              প্রধান অতিথি সুশান্ত কর বলেন ,   গেল শতকের শেষ দশকে বিশ্বায়নের শুরুর সঙ্গে সঙ্গে এমন এক প্রচার হলো চারদিকে যে এখন তথ্য প্রযুক্তির যুগ, সেই প্রযুক্তি ইংরেজি ছাড়া ভাষা জানে না। তাই সবাইকে ইংরেজি লিখতে পড়তে এবং শিখতে হবে। সেই থেকে বাংলা মাধ্যমের স্কুলগুলোর শুরু হলো দুর্দিন। দু’দিন বাংলার মতো ভারতীয় ভাষা-সাহিত্য গুলোর আগেও ছিল, এবারে তা আরো প্রবল হলো। অবস্থা এতোটাই জটিল যে মাতৃভাষা মাধ্যমের স্কুলগুলোর অস্তিত্ব বিপন্ন হতে চলেছে দেখে সরকারি স্কুল বাঁচাতেও সরকার ইংরেজি মাধ্যম চালু করবার কথা ভাবছেন, কিন্তু ভাষা-সংস্কৃতির বিপন্নতা নিয়ে কেউ চিন্তিত নন। যে ভাষা আসলেই ধরে রাখে আমাদের সন্মিলিত স্মৃতি তথা ঐতিহ্য-ইতিহাসকে। যার বিপন্নতা মানেই আমাদের সঙ্গে সেই ঐতিহ্যের সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ। আসলে বিশ্বায়ন এই নতুন কুসংস্কার ছড়াতে পেরেছে তার অনেক কারণ নিশ্চয় আছে। তার মধ্যে একটি, অবশ্যই আমাদের যথাপ্রাপ্ত জগৎকে মেনে নেবার প্রবণতা। নইলে সত্য হলো, তথ্যপ্রযুক্তি মাতৃভাষাকে আজ দুনিয়া জুড়েই
মুক্ত করেছে বই  বিপন্ন করে নি। আমরা জানি না বা জানতে চাই না বলেই বলে বেড়াই, ‘আজকাল কম্পিউটার যুগ, ইংরেজী ভাষার’ যুগ। অথচ, সত্য হলো আমাদের পাশের দেশে শাহাবাগে যে জনজাগরণ দেখা দিয়েছে সেটি আয়োজন করেছেন তারাই যারা বাংলা ভাষাতে আন্তর্জালে লেখেন কবিতা , গল্প, নিবন্ধ। দেন আড্ডা। তারাই এখন সে দেশের রাজনীতি পাল্টাতে পথে নেমেছেন। তাদের কথা দুনিয়ার কেউ বাংলার বাইরে ইংরেজিতে খোঁজলে পাবেন না তেমন। আমদের শহরেও শাহাবাগের সমর্থনে সমাবেশ হয়েছে, কিন্তু বাংলা ভাষাতে লিখে যারা ব্লগার্স--- তাদের আসল পরিচয় নিয়েও কোন কৌতুহল দেখিনি। বাস্তব হলো, আজকাল শুধু বাংলা নয়, দুনিয়ার যে কোন ভাষাতেই কম্পিঊটারে মোবাইলে বার্তালাপ করা যায়। আমাদের প্রতিবেশি দেশগুলোতেতো বটেই, আমাদের দেশেও প্রতিবেশি প্রায় সমস্ত ভাষাই এতে অভ্যস্ত, মায় অসমিয়াও। শুধু ১৯শে মে’র  উপত্যকা বরাক কিম্বা শহর শিলচর –এই নিয়ে আশ্চর্যরকম নীরব।আন্তর্জালে কী ভাবে বাংলা পড়তে বা লিখতে হয় জানে না । তাই তাদের এই ব্যতিক্রমী  প্রয়াস যা বরাক উপত্যকায় প্রথম – - তা অত্যন্ত প্রশংসনীয় বলে মত ব্যক্ত করেন অধ্যাপক কর ।  
           শিশুমন্দির স্কুলের অধ্যক্ষা জয়শ্রী কর এই ব্যতিক্রমী প্রয়াসকে সাধুবাদ জানিয়ে ভবিষ্যতে তাদের স্কুলেও আন্তর্জালে বাংলা লেখার চর্চা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে করাবেন বলে তার সমাপ্তি ভাষণে আভাস দিয়েছেন ।


মঙ্গলবার, ২১ মে, ২০১৩

আমি তব মালঞ্চের হব মালাকর


(তিনসুকিয়াতে রবিরাগিনীর রবীন্দ্রজন্মজয়ন্তী হয়ে গেল আজ, ২০মে, ২০১৩তে। অত্যন্ত ছিমছাম পরিপাটি। অনুষ্ঠান সাজানো, পরিবেশনও যে একটা শিল্প এই তারা দেখিয়ে দিলেন। সেখানে গিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করিয়ে কিছু বলতে হয়েছিল। লিখে নিয়ে গেছিলাম। সেটিই এখানে রইল।)  
       
     একজন সাহিত্যের ছাত্রকে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বলতে বলবার মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু নেই, আমাদের তিনি প্রথম পাঠ। কিন্তু আমাকে ডেকে এনে আপনারা খানিক বিপদেই ফেলেছেন, কেন সেটি পরে বলছি। কিন্তু বলবার অতিরিক্ত যে গুরুদায়িত্বটি সম্পন্ন করবার দায়িত্ব পালন করালেন তা আমাকে রীতিমত লজ্জাতে ফেলে দিয়েছে। এই প্রদীপ জ্বালিয়ে শুভারম্ভের জন্যে আমি একেবারেই অর্বাচীন। একাজ তাঁকেই মানায় যার জীবনের অর্জন ফুরিয়েছে এবারে শুধু আলো হস্তান্তর করবার পালা। আমি নিজেই এখনো আঁধারে পথ খুঁজি। ছাত্র যেদিকটিতে বসে সেদিকে বসতে ভালোবাসি। পেটের দায়ে কলেজে গিয়ে বসি আর কি--- উল্টোদিকে। বিশেষ করে রবীন্দ্রসঙ্গীতের মতো এক বিষয়ে আমি তো শ্রোতা মাত্র। কোনদিন না গান শিখেছি, না জেনেছি তার শাস্ত্র।
            আপনারা অবশ্য, আমাকে স্বাধীনতা দিয়েছেন আমি যা ইচ্ছে তাই বলতে পারি। সেখানে বিপদ ভীষণ। এই ভদ্রলোক জীবনে এতো বেশি কিছু নিয়ে কথা লিখে গেছেন যে , আমাদের মতো সাধারণ মানুষ তার সবটা পড়বার , জানবার এবং  শোনবার ধর্য রাখতে পারে না। এই যেমন ধরুন তাঁকে বলা হয়, আধুনিক ভারতের প্রথম ভাষাবিজ্ঞানী। স্বয়ং সুনীতি চট্টোপাধ্যায় লিখে গেছেন। বাংলাভাষাতে ণত্ববিধি, ষত্ববিধিকে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করে প্রচুর কথা লিখে গেছেন । তার পরেও। কিন্তু সেই সব বিধিকথা কি আর আজকের এই সাঙ্গীতিক সন্ধ্যাতে কেউ শুনতে চাইবেন?  ফলে আমাকে ভাবতেই হয়েছে আপনাদের কিসে ধৈর্য থাকতে পারে। তার উপর আমি চিরদিন দুষ্ট ছাত্র। শেষ বেঞ্চে বসা ছাত্রের মতো। মাস্টার মশাই যা বলবেন, আমার কাজ তার উলটো করা। আমাকে তাই সামনের আসনে মানায় না, কথাটা আমি জানি। আপনারা আমাকে শুধু সামনে এনে বসান নি, দিক পালটে বসিয়েছেন। কী ভেবে জানি না,  সে আপনাদের সৌজন্য। তাই শুরুতেই ‘রবি রাগিনী’র সবাইকে আমার অন্তর থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
             তো, আমি কী করে বলবার বিষয় ঠিক করেছি সেই নিয়ে বলি। রবীন্দ্রনাথ খুব উল্টোপাল্টা কথা বলতেন, আপনারা খেয়াল করেছেন? তাঁর একটা গান আছে না? ‘আমার পরান যাহা চায়, তুমি তাই, তুমি তাই গো’ আমরা হলে এর পরে কী লিখতাম? ‘এবারে তুমি যেন আর বলো না যাই যাই গো।’  তিনি লিখলেন, “যদি    আর-কারে ভালোবাস,  যদি  আর ফিরে নাহি আস,
    তবে   তুমি যাহা চাও তাই যেন পাও,   আমি যত দুখ পাই গো” হলো কি না উলটো কথা? সে যাক, আমারও তেমনি উলটো কথা বলা অভ্যেস। তাঁর থেকেই শিখেছি। কেউ যদি ব্যথা পান, নিজগুণে ক্ষমা করে দেবেন। এই যে আমার ‘পরান যাহা চায় তুমি তাই গো।’ এর অর্থটা কী? তুমি ঠিক সেরকমই আমি যেমনটি এদ্দিন ধরে বিয়ে করব বলে খুঁজছিলাম। আচ্ছা, এরকম হতে পারে না, যে এর অর্থ এই যে তুমি ঠিক সেরকমই আমি তোমাকে যেমনটি ভাবি। আসল তুমি আমাকে বিয়ে করো কি না করো, আমার তাতে কিচ্ছু যায় আসে না!
আচ্ছা, ধাঁধাটা রেখে আরো সহজ করে বলি। তাঁর একটি কবিতা আছে না? শ্যামলীতে আছে,
                 “আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ ,/ চুনি উঠল রাঙা হয়ে ।/ আমি চোখ মেললুম আকাশে ,/                          জ্বলে উঠল আলো/  পুবে পশ্চিমে ।/ গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম ‘সুন্দর' ,/ সুন্দর হল সে ।/                      তুমি বলবে , এ যে তত্ত্বকথা ,/ এ কবির বাণী নয় ।/  আমি বলব , এ সত্য ,/ তাই এ কাব্য ।” তো আমাদের চোখচেতনা  যদি বলে পান্না তো পান্নাই , আর নইলে দুনিয়ার সব কিছুই কান্না কেবলই কান্না । এই নিয়ে বিজ্ঞানী আইনষ্টাইনের সঙ্গে তার একটি বিতর্ক জগত বিখ্যাত হয়ে আছে। আইনষ্টাইন বলছিলেন, কেন, আমাদের চেতনা নিরপেক্ষ ভাবে কি বস্তুর উপস্থিতি থাকতে পারে না? রবীন্দ্রনাথ বলছিলেন, থাকলেই কী আর না থাকলেই  কী? মার্ক্সবাদের মতো বস্তুবাদী দর্শনও মনে করে মানুষের চেতনবিশ্বে অনুপস্থিতিতে বস্তুবিশ্বের অস্তিত্বের কোন অর্থ নেই। প্রতিটি মানুষ যেমন তার স্থানে কালে একটা বস্তুকে দেখে , প্রতিটি সমাজও তেমনি দেখে। বা বলতে পারেন প্রতিটি সমাজেরও আছে দেখার স্থান-কাল। সমাজেরও আবার বিচিত্র সব অংশ আছে। তার সবার স্থান কাল এক নয়। এসবে আমি যাচ্ছি না, আমি শুধু বলছি যে আমি যখন মানুষ বলছি, তখন জরুরি নয় যে সে ব্যক্তি মানুষ, সমষ্টিমানুষও হতে পারে। তিনসুকিয়াকে সবুজনগরী বলা হবে কিনা, সেটি ইতিহাসের এক নির্দিষ্ট কালে এই শহরের একাংশ মানুষ স্থির করছে। আর তাতে বড় বেশি দু’টো পক্ষ থাকতে পারে। এক দল যারা সেটি বলছেন, আর দল যারা সেটি বলতে চাইছেন না। আরো একটি দল থাকতেই পারেন, যারা এই বিতর্কের কথা জানেন না, কিন্তু জানলে এই আখ্যান তৈরির প্রক্রিয়াতে প্রবেশ করে যাবেন। আমি ‘জানলে’ শব্দটি ভেবে চিন্তে ব্যবহার করেছি। আপনারা যদি আমার বক্তব্য শুনে ভেবে বসেন এই অধ্যাপকটি বেশ জানেন, ইনি বেশ জ্ঞানী মানুষ—আমি বড় লজ্জাতে পড়ে যাব। কারণ, জানাতে আমাদের যাত্রা শুরুও হয় না, শেষও হয় না, শুরু হয় একটা বোধের জগত থেকে, বিশ্বাসের জগত থেকে শেষ হয় আরেক উন্নততর বিশ্বাসের জগতে উত্তরিত হয়ে। এই বোধের জগতটি গুরুত্বপূর্ণ। জ্ঞান যদি সবটা হতো তবে দুনিয়াতে প্রচুর জ্ঞানী লোক আছেন,তারা জগতটাকে এদ্দিনে বেশ সুন্দর বাসযোগ্য ভুমি হয়ে উঠতে পারত। তা যে হয় না, বরং জ্ঞানী লোকের হাতেই দুনিয়াতে নাগিনিরা চারিদিকে ফেলিতেছে নিঃশ্বাস দেখি  তার কারণ, সেই জ্ঞানীর স্থান আর কাল—যেখানে তার বিশ্বাস লালিত হয়। আমি তাই আপনাদের কিছু জানাতে যাবো না, আমার এক বিশ্বাসের জগত আছে , সেখানে যদি আপনাদের ঢু মারবার আগ্রহ বাড়াতে পারি, তবেই আমার আজকের সন্ধ্যা সার্থক। 
               তো এবারে আমি যখন তাঁকে নিয়ে বলতে যাবো, তখন আমাকে মাথাতে রাখতে হয়েছে আপনারা কী শুনতে চাইবেন। একটা মোহতে পেয়ে বসল, যাতে আপনাদের চেতনাতে আমার বক্তব্য হয় সহজ এবং সরস পান্না। তাই গান নিয়েই পড়লাম। আমি কিন্তু গানের গ জানি না। লাভ হলো, এই প্রথম গান নিয়ে তিনি কী লিখেছিলেন তার কিছু কিছু পড়ে নিলাম। শিখলাম, জানলাম। তার জন্যে আপনাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা। তো, আগেই বলেছি আমি কিছু জানাতে যাবো না, যা শিখেছি তা শেখাতেও যাবো না। আমার একজন চেনা রবীন্দ্রনাথ আছেন, যিনি ছেলেবেলাতেই ‘এবার ফিরাও মোরে’ কবিতাতে সমস্ত  কবিদের ডেকে  লিখেছিলেন, স্বর্গ হতে নিয়ে এসো বিশ্বাসের ছবি। 
         গান নিয়ে তাঁর যে দুই একটি লেখা পড়লাম, আমি খুঁজলাম আমার সেই চেনা রবিবাবুকে পাচ্ছি কিনা। রবি বাবু বলাতে আপনারা কিছু মনে করেন নিতো? ভদ্রলোককে আমরা প্রায় ‘হিন্দুর ঠাকুরদেবতা’ করে তুলেছি। মুসলমানের কিচ্ছু না। সেদিন, পাশেই এক শহরে মেয়েকে নিয়ে গেছিলাম, রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীর প্রতিযোগিতাতে। তো বেশ কিছু প্রতিযোগী মাঝপথে ভুলে যাচ্ছিল কবিতা। তো এক রাশভারি বৃদ্ধ বিচারক, সেখানকারই লোক--- বারে বারে এই সব প্রতিযোগীদের ধমকে দিচ্ছিলেন। দুই একজনতো প্রায় কেঁদেই ফেলছিল। কিন্তু রাশভারি সেই বিচারক মহোদয়ের তখন অন্য চিন্তা-- এতে বুঝি রবিঠাকুরের অবমাননা হয়। শুনে আমার মনে হচ্ছিল, ধুত্তুরি ছাই! এই সব রবি ভক্তদের কথা মনে রেখেই সুনীল গাঙ্গুলী লিখেছিলেন, “তিন জোড়া লাথির ঘায়ে রবীন্দ্ররচনাবলী লুটোয় পাপোশে” মার্কিন দেশে গিয়ে ওদের ধনগর্বের মত্ততা দেখে যে রবীন্দ্রনাথ প্রবল যন্ত্রণায় আর  বিদ্বেষে শিশু ভোলানাথদের ডেকে বলেছিলেন, ‘খেলেনা ভাঙার খেলা দে আমারে বলি’ সেই তাঁর বুঝি অপমান হয় তাঁর কবিতা ভুলে গেলে। শিশু ভোলানাথের কবিতাগুলো স্মরণ করুন দেখি, কী সব দুষ্টুমী করতে শিখিয়েছেন জন্মদাত্রী মায়ের সঙ্গে। আর তিনি বুঝি করবেন গোসা, তাঁর সঙ্গে দুষ্টুমী করলে! এমন ঠাকুর দেবতা যান জানান্নমে।
               তো আমি যখন গান নিয়ে পড়লাম, দেখি এই তো আমার ইয়ার দোস্ত রবীন্দ্রনাথ। এখানেও তাঁর দুষ্টুমী। খেলেনা ভাঙ্গার খেলা বলে বলে যাচ্ছেন। আচ্ছা, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বলতে গেলে একটা কথা বলে ফেলি, লোকে বলেন যে রবীন্দ্রনাথের কোন কথাতে ভরসা করতে নেই, তিনি আজ একটা কথা লিখেছেন তো কাল ঠিক তার উলটো কথা লিখেছেন। আমি তাঁকে পুরো পড়িনি, কিন্তু আমার আগ্রহ আছে দর্শনে, সমাজতত্বে, সাহিত্য তত্বে, রাজনীতিতে। আমি তাঁর সেই লেখাগুলোকে নিবিড় পাঠে জেনেছি, হ্যা, ভদ্রলোক কাল যদি জেনেছেন আজ কিছু ভুল বলেছিলেন, তবে সেটি স্বীকার করে নিয়ে নিজের অবস্থান পালটে দিতেন। এটা হতো ধারাবাহিক, ক্রমোন্নতির পথে। তাছাড়া প্রসঙ্গ এবং স্থান-কাল বলেও একটা কথা আছে। এরই জন্যে যারা জ্ঞানগর্বী তাঁরা বলেন রবীন্দ্রনাথ বড় স্ববিরোধপূর্ণ। কিন্তু যদি আপনি তাঁকে ধারাবাহিক পড়েন,দেখবেন ‘সামঞ্জস্য’ শব্দটি হচ্ছে সেই শব্দ যাকে দিয়ে গোটা রবীন্দ্রনাথকে বোঝে ফেলা যায়। শব্দটি তিনি বহুবার বহুভাবে ব্যবহারও করেছেন। দুনিয়াময় অসামঞ্জস্যের ভিড়ে খানিক সামঞ্জস্য পেলেই তাঁর মন গেয়ে উঠে, “আমি   তোমারে পেয়েছি হৃদয়মাঝে,   আর কিছু নাহি চাই গো” এই যেমন ধরুন গোলাপ ফুল নিয়ে কীসব কথা বলছেন তিনি, “গোলাপ-ফুলে আমরা আনন্দ পাই। বর্ণে গন্ধে রূপে রেখায় এই ফুলে আমরা একের সুষমা দেখি। এর মধ্যে আমাদের আত্মারূপী এক আপন আত্মীয়তা স্বীকার করে, তখন এর আর-কোনো মূল্যের দরকার হয় না। অন্তরের এক বাহিরের একের মধ্যে আপনাকে পায় বলে এরই নাম দিই আনন্দরূপ। গোলাপের মধ্যে সুনিহিত সুবিহিত সুষমাযুক্ত যে-ঐক্য নিখিলের অন্তরের মধ্যেও সেই ঐক্য। সমস্তের সংগীতের সঙ্গে এই গোলাপের সুরটুকুর মিল আছে; নিখিল এই ফুলের সুষমাটিকে আপন বলে গ্রহণ করেছে।”(তথ্য ও সত্য;সাহিত্যের পথে) বুঝতেই পারছেন এ শুধু গোলাপ নিয়ে বলবার কথা নয়, সমস্ত শিল্পরূপ মায় গান নিয়েও তাঁর বলবার কথা এইটেই।
              এই এককে ছেড়ে আপনি যতই কারিকুরি গলাবাজি করুননা কেন, সবটাই অসার। নিরর্থক। তিনসুকিয়া শহরে আমি দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক পরিবেশকে পাশে থেকে দেখছি, আর সেই ‘একের’ সন্ধানে কারা ফিরছেন চোখ রাখছি, কিছু মনে করবেননা, আমি বড় বেশি উৎসাহীত হতে পারি নি। তাই শেষ বেঞ্চে বসে থাকি। হতে পারে আমার দেখার বাইরে জগত আছে, কিন্তু যা দেখেছি তা এই-- এখানে গায়ক আছেন, আঁকিয়ে আছেন, লিখিয়ে আছেন, নাচিয়ে আছেন এমন কি সাহিত্যের মাষ্টারও আছেন, কিন্তু সেই একের সাধক নেই খুব একটা। আমি তাই আমার মাষ্টারদের ক্লাসে বেয়াড়া ছাত্র, লাষ্ট বেঞ্চের দুষ্ট ।তাঁর একটি গান আছে এরকম, আপনারা শুনে থাকবেন,
                    ভালো মানুষ নই রে মোরা ভালো মানুষ নই–
                    গুণের মধ্যে ওই আমাদের, গুণের মধ্যে ওই॥
                 দেশে দেশে নিন্দে রটে,          পদে পদে বিপদ ঘটে–
                       পুঁথির কথা কই নে মোরা, উল্‌‍টো কথা কই॥
                        জন্ম মোদের ত্র্যহস্পর্শে, সকল অনাসৃষ্টি।
                        ছুটি নিলেন বৃহস্পতি, রইল শনির দৃষ্টি।
                অযাত্রাতে নৌকো ভাসা,    রাখি নে, ভাই, ফলের আশা–
                       আমাদের আর নাই যে গতি ভেসেই চলা বই॥

          'আবেদন' বলে একটি কবিতা আছে, সেখানে ভৃত্যে রানিতে কথা হচ্ছে,
“ভৃত্য ।     জয় হোক মহারানী । রাজরাজেশ্বরী ,
              দীন ভৃত্যে করো দয়া ।
রানী ।                    সভা ভঙ্গ করি
          সকলেই গেল চলি যথাযোগ্য কাজে
          আমার সেবকবৃন্দ বিশ্বরাজ্যমাঝে ,
          মোর আজ্ঞা মোর মান লয়ে শীর্ষদেশে
          জয়শঙ্খ সগর্বে বাজায়ে । সভাশেষে
           তুমি এলে নিশান্তের শশাঙ্ক-সমান
           ভক্ত ভৃত্য মোর । কী প্রার্থনা ?
ভৃত্য ।                           মোর স্থান
           সর্বশেষে , আমি তব সর্বাধম দাস
           মহোত্তমে । একে একে পরিতৃপ্ত-আশ
           সবাই আনন্দে যবে ঘরে ফিরে যায়
           সেইক্ষণে আমি আসি নির্জন সভায় ,
           একাকী আসীনা তব চরণতলের
           প্রান্তে বসে ভিক্ষা মাগি শুধু সকলের
           সর্ব-অবশেষটুকু ।
রানী ।                    অবোধ ভিক্ষুক ,
           অসময়ে কী তোরে মিলিবে ।
ভৃত্য ।                            হাসিমুখ
          দেখে চলে যাব । আছে দেবী , আরো আছে —
          নানা কর্ম নানা পদ নিল তোর কাছে
          নানা জনে ; এক কর্ম কেহ চাহে নাই ,
          ভৃত্য- ' পরে দয়া করে দেহো মোরে তাই —
         আমি তব মালঞ্চের হব মালাকর।”     

দীর্ঘ এই কবিতার একেবারে শেষে ভৃত্যের প্রার্থনা মঞ্জুর হচ্ছেঃ

            ভৃত্য , আবেদন তব
          করিনু গ্রহণ । আছে মোর বহু মন্ত্রী ,
          বহু সৈন্য , বহু সেনাপতি — বহু যন্ত্রী
          কর্মযন্ত্রে রত — তুই থাক্‌ চিরদিন
          স্বেচ্ছাবন্দী দাস , খ্যাতিহীন , কর্মহীন ।
         রাজসভা-বহিঃপ্রান্তে রবে তোর ঘর —
          তুই মোর মালঞ্চের হবি মালাকর ।

      আমরা কি রাজি আছি, প্রচারের আর প্রতিষ্ঠার আর প্রতাপের বাইরে গিয়ে এমন ভৃত্য হতে? এমন মালাকর হতে? আপনারা সঙ্গত প্রশ্ন করতে পারেন আমাদের শিল্পীদের প্রচার কই, প্রতিষ্ঠা কই আর প্রতাপই বা আমি দেখছি কোথায়? বাংলা ভাষাতে কিছু করলে আর কলকাতার লোক না হলে কেউ দেখতে আসে ? আসে না। তাই আমরা কলকাতার অনুগমন করি। কলকাতা করে বিলেতের। আমাদের শতাব্দী পুরোনো দীর্ঘ আশা, ঠিকঠাক ওদের মতো হতে পারলেই হওয়া হলো, আমাদের মতো হলে লোকে হাসবে। যাই হই আমাদের মতোন হতে নেই, সবই ওদের মতো হওয়া চাই। অথচ, একের সাধনার মূল কথাই হলো, হয়ে উঠা, ব্যক্তির হয়ে উঠা, সমাজের হয়ে উঠা, সৃষ্টির হয়ে ওঠা, স্রষ্টার হয়ে উঠা। কার মতো? কারো না! এই অরূপরতন একের মতো। এই একের  মধ্যে আমাদের আত্মারূপী এক আপন আত্মীয়তা স্বীকার করে, তখন এর আর-কোনো মূল্যের দরকার হয় না। কিন্তু আমরা হয়ে উঠতে চাই পশ্চিমের মতো, প্রতাপের মতো, প্রচারের মতো, প্রতিষ্ঠার মতো। মনে রাখবেন আমাদের এই প্রতাপের কেন্দ্রগুলো সবই পশ্চিমে। সে হোক কলকাতা, মুম্বাই, প্যারিস কিম্বা হলিউড। পশ্চিমে সূর্য অস্ত যায়। আমাদের প্রদেশে রোজ দিনের প্রথম সূর্য উঠে, তবু আমরা নতুন দিনের স্বপ্ন দেখতে পারি না। আমাদের দিকে যদি আমরাই না তাকাই তবে লোকে তাকাবে কেন? এই যে-- ‘কারো মতো হওয়া’-- এই নিয়ে রবীন্দ্রনাথ একবার ‘সংগীত ও ভাব’ নিয়ে লিখতে গিয়ে বড় ভালো কথা লিখেছিলেন,
         “এক ব্যক্তির নিকট হইতে একটি চিঠি পাইয়াছিলাম; স্বাক্ষরিত নাম কিছুতেই পড়িয়া উঠিতে পারি নাই, অথচ সে চিঠির উত্তর দিতে হইবে। কী করি, সে যেরূপে তাহার নামটি লিখিয়াছিল অতি ধীরে ধীরে আমি অবিকল সেইরূপ নকল করিয়া দিলাম। যদি নামটি বুঝিতে পারিতাম, তবে সেই নামটি লিখিতাম অথচ নিজের হস্তাক্ষরে লিখিতাম। অবিকল নকল দেখিলেই বুঝা যায় যে, অনুকরণকারী অনুকৃত পদার্থের ভাব আয়ত্ত করিতে পারেন নাই। মনে করুন আমি সাহেব হইতে চাই, অথচ আমি সাহেবদিগের ভাব কিছুমাত্র জানি না, তখন আমি কী করি? না, অ্যান্ড্রু-নামক একটি বিশেষ সাহেবকে লক্ষ্য রাখিয়া অবিকল তাহার মতো কোর্তা ও পাজামা ব্যবহার করি, তাহার কোর্তার যে দুই জায়গায় ছেঁড়া আছে যত্নপূর্বক আমার কোর্তার ঠিক সেই দুই জায়গায় ছিঁড়ি, ও তাহার নাকে যে স্থানে তিনটি তিল আছে আমার নাকের ঠিক সেইখানে কালি দিয়া তিনটি তিল চিত্রিত করি। ওই একই কারণ হইতে, যাহাদের স্বাভাবিক ভদ্রতা নাই তাহারা ভদ্র হইতে ইচ্ছা করিলে আনুষ্ঠানিক ভদ্রতার কিছু বাড়াবাড়ি করিয়া থাকে। আমাদের সংগীতশাস্ত্র নাকি মৃত শাস্ত্র, সে শাস্ত্রের ভাবটা আমরা নাকি আয়ত্ত করিতে পারি না, এইজন্য রাগরাগিণী বাদী ও বিসম্বাদী সুরের ব্যাকরণ লইয়াই মহা কোলাহল করিয়া থাকি। যে ভাষার ব্যাকরণ সম্পূর্ণ হইয়াছে, সে ভাষার পরলোকপ্রাপ্তি হইয়াছে। ব্যাকরণ ভাষাকে বাঁচাইতে পারে না, তা প্রাচীন ইজিপ্ট্‌বাসীদের ন্যায় ভাষার একটা ‘মমী’ তৈরি করে মাত্র। যে সাহিত্যে অলংকারশাস্ত্রের রাজত্ব, সে সাহিত্যে কবিতাকে গঙ্গাযাত্রা করা হইয়াছে। অলংকারশাস্ত্রের পিঞ্জর হইতে মুক্ত হওয়াতে সম্প্রতি কবিতার কণ্ঠ বাংলার আকাশে উঠিয়াছে; আমার ইচ্ছা যে, কবিতার সহচর সংগীতকেও শাস্ত্রের লৌহকারা হইতে মুক্ত করিয়া উভয়ের মধ্যে বিবাহ দেওয়া হউক।"

          রবীন্দ্রনাথ রাগরাগিনীর অলঙ্কার শাস্ত্রের কারা থেকে সঙ্গীতকে মুক্ত করবার কথা বলছিলেন। দেখলেন কিনা, শিশু ভোলানাথের সেই ‘খেলেনা ভাঙার’ কথা। অথচ, আমরা জানি তাঁরই বিশ্বভারতী কী সব আজব কারাগার তৈরি করে তাঁর সৃষ্টিকে বন্দি করে রেখেছিল দীর্ঘদিন। আজকাল সে কারা ভেঙ্গেছে ভালোই হয়েছে, এখন হচ্ছে ‘পাগলা হাওয়ার বাদল-দিনে/     পাগল আমার মন জেগে ওঠে’ আপনারা শুনছেন। তাতে বহু কারারক্ষী এবং এদেশে ওদেশে তাদের সহকর্মীরা রেগে কাঁই। কিন্তু তাদের খেলেনার দিন শেষ, খেলেনা ভেঙ্গে গেছে। যা হবার তা হবে রবীন্দ্রনাথই যে লিখেছেন, “যা     না চাইবার তাই আজি চাই গো,/   যা     না পাইবার তাই কোথা পাই গো।/  পাব না, পাবনা,    মরি   অসম্ভবের পায়ে মাথা কুটে।”

         এই হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। কে বললেন, যে তিনি আলখেল্লা পরা রাশভারি গুরুদেবটি।  যে আলখেল্লাটি বুড়ো রবীন্দ্রনাথের ছবিতে দেখি সেও যে কেন বাউল ফকিরের মতো দেখায়, বামুন ঠাকুরের মতোও নয়,সাহেবদের মতোও নয় ---এই সব প্রশ্নও আমরা করব না।  কিন্তু মুস্কিল হলো,  আরেকটি কারা হচ্ছে। সে হলো সেই পশ্চিমী কারা, প্রতাপের কারা, বাজারের কারা। সেতো চিরদিনই ছিল। আর সেই বাজার যদিও বা তার স্থানে কালে জিনিসটা কোনোভাবে ভালো রকম গড়েও তোলে আমাদের বাস্তবতাতো ভিন্ন, আমরা আগে সুচিত্রা মিত্রের পেছনে ছুটতাম, জর্জবিশ্বাসের পেছনে ছুটতাম, এখন ছুটি  নচিকেতার। এখন, আমরা যদি সত্যি আমাদের নিজেদের মতো ভদ্রলোক হয়ে উঠবার যোগ্য নই বলে নিজেকে মনেই করি, তবে এই হবে, “যাহাদের স্বাভাবিক ভদ্রতা নাই তাহারা ভদ্র হইতে ইচ্ছা করিলে আনুষ্ঠানিক ভদ্রতার কিছু বাড়াবাড়ি করিয়া থাকে।” আমরা বাড়াবাড়ি করে ফেলব, আর চেনাজনকে ডেকে বলব, তুমি কি জানো , যে আমিও রবিঠাকুরের গান গাই। শেষ পর্যন্ত যে এগুলো আমরই গান, আমাদেরই গান  হয়ে উঠতে হবে এই বোধই আমার নেই। পাছে রবিঠাকুর পাপ দেন, সেই ভয়ে কথাটা ভাবতেও সাহস করব না। সেদিন, রবীন্দ্র জয়ন্তীদিনে আমার মেয়ে এবং তার বন্ধুরা তিনসুকিয়ার এক টিভি চ্যানেলে রবীন্দ্র কবিতা বলল। সঙ্গে তবলা বাজল, এবং পায়ের নিচে কবিতাকে পিসে মেরে ফেলল। তবলা আগে বাজল, কবিতা তার পেছনে ছুটল, রবীন্দ্রনাথ হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন সবহারাদের নিচে নিঃস্ব।আপনারা শুনে থাকবেন সেই অনুষ্ঠান , আমার ভালো লাগে নি। নজির দিয়ে বললে ভালো বোঝা যায়, তাই বললাম, নইলে কারো নিন্দে করা আমার ইচ্ছে নেই। আমার শিশু কন্যারতো নয়ই।
          মনে হচ্ছে আমার বলবার কথা বলে ফেলেছি এর বেশি বললে আপনাদের ধৈর্যের প্রতি সুবিচার করা হবে না। শুধু ঐ শুরুতে যে একটি গানের কথা বলেছিলাম,  ‘‘আমার পরান যাহা চায়,’ এটা এই হবে না হবে, “আমারো পরানো যাহা চায়”। আপনারা কী গান করেন জানি না, আমি কিন্তু বহু জায়গাতে দ্বিতীয়টি কেবল শুনিই নি, লেখাও দেখেছি। রবীন্দ্ররচনাবলীতে কিন্তু প্রথমটি আছে। এটি মায়ার খেলা গীতিনাট্যের দ্বিতীয় দৃশ্যের গান। শান্তা গাইছে। দ্বিতীয়টির মানে কী দাঁড়ালো? অন্য অনেকে তোমাকে চায়, সঙ্গে আমিও চাই আরকি, তাও কেবল আমার প্রাণ চায় না, সেই প্রাণের সঙ্গে আর যা যা আছে এই যেমন আমার চুল, নাক, মুখ ঠোঁট সবাই মিলে তোমাকে চাইছে । এবারে বলো তুমি যাও কই? রসিকতাটা আমার নয়, এক পশ্চিমা মানে কলকাতার লেখকের। আমাদের এই অহৈতুকী ও-কার তথা কলকাত্তাই ঘটি উচ্চারণ প্রীতি আছে না! আমরা এই নিয়ে নাজেহাল করে দিই শিল্পীকে অথচ কিছুতেই যেন আসে না সঠিক উচ্চারণ! আসবে কী করে! আমার রক্তে মাংসে হুগলী-ভাগিরথীর জল নেই, আছে পদ্মা-মেঘনা-লুইতের পানি। কোথাও আমাদের মতো করতে পারি কিনা, ভাবা যেতে পারে। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন গান শাস্ত্রের জিনিস নয় ভাবের জিনিস, যেমন আমি বললাম আমার বলাটা জ্ঞানের জিনিস নয় বিশ্বাসের জিনিস। এই দেখুন তিনি লিখছেন,
“আমাদের সংগীত যখন জীবন্ত ছিল, তখন ভাবের প্রতি যেরূপ মনোযোগ দেওয়া হইত সেরূপ মনোযোগ আর কোনো দেশের সংগীতে দেওয়া হয় কি না সন্দেহ। আমাদের দেশে যখন বিভিন্ন ঋতু ও বিভিন্ন সময়ের ভাবের সহিত মিলাইয়া বিভিন্ন রাগরাগিণী রচনা করা হইত, যখন আমাদের রাগরাগিণীর বিভিন্ন ভাবব্যঞ্জক চিত্র পর্যন্ত ছিল, তখন স্পষ্টই বুঝা যাইতেছে যে, আমাদের দেশে রাগরাগিণী ভাবের সেবাতেই নিযুক্ত ছিল। সে দিন গিয়াছে। কিন্তু আবার কি আসিবে না!”( সংগীত;সংগীত ও ভাব) 
           আমারও সেই প্রশ্ন, আবার কি আসবে না, ফ্যাসনকে ফেলে ভাবকে সেবা করবার দিন? ভাবের কথাতেই দেখুন দেশ কালের কথাটি আছে, তাদের চিনতে হবে জানতে হবে। আমরা যখন রবীন্দ্রনাথ নিয়ে কিছু বলি, কিছু লিখি বা আমরা যখন সাধারণ বক্তৃতা করি বা কবিতা লিখি তখনও আমাদের ধারণা, হয় আমাদের ভাষা হতে হবে তৎসম শব্দবহুল সাধু প্রায়, আর নইলে কলকাত্তাই ঘটি। কলকাত্তাই ঘটি কেন? না ঐটাই বুঝি রবিঠাকুরের ইচ্ছে।   নইলে বুঝি-- গোটা বিশ্বের যে মিষ্টি ভাষা বাংলা, রবীন্দ্রনাথের ভাষা বাংলা ---তাকে অপমান করা হয়। তো রবিঠাকুরের এমন পংক্তি আপনারা পড়েন নি? “স্বপনে তার বয়সখানা/ বেবাক গেল ভুলে”  । এই যে ‘বেবাক’ --একটি বিশুদ্ধ ঢাকাই শব্দ। আমাদের যে ভাষাটিকে শুধু শুধু সংস্কৃতের সন্তান ভেবে এককালে খুব তৎসম শব্দ বহুল করে তোলে নাম দিয়েছিলাম ‘সাধুবাংলা’ তারও বাপ- ঠাকুরদা আর  যেই হোক মায়ের  নাম কিন্তু  নয় সংস্কৃত। কী সে জানেন? ঢাকাইয়া, বিক্রমপুরিয়া, সিলেটি, বরিশাইল্যা। তো এতো লজ্জা কিসের!  সে ভাষারই কোন বামনাই ছিল না,  আর থাকতে বুঝি হবে রবিঠাকুরের  ! রবিঠাকুর বাংলাভাষার বামনাই ছাড়িয়েছিলেন,  আমরা যত তাড়াতাড়ি শিল্পের অঙ্গনে সেই বামনাই কিম্বা সাহেবিয়ানা ছাড়তে পারি, তত বুক সটান করে নিজের মাথা তোলে দাঁড়াতে পারি, এই টুকু আমার বলবার কথা। ধন্যবাদ!