শনিবার, ৩০ মার্চ, ২০১৩
বৃহস্পতিবার, ২৮ মার্চ, ২০১৩
বুধবার, ২৭ মার্চ, ২০১৩
রংচটা দিন হোক রঙিন
স্থান
Silchar, Assam, India
কথায় কথায়...
।।মিফতাহ উদ-দ্বীন।।
| (c)Picture:ছবি |
ছোটো খালার বিয়েতেই ঠিক হয় যে আমি সরকারি স্কুলে পড়বো। জলিল স্যার ই আব্বাকে পরামর্শটা দিলেন, আর আমি ভর্তি হয়ে গেলাম “গম্মেন্ট স্কুলে” ভালো নাম “করিমগঞ্জ সরকারি উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়”, ডাক নাম “গম্মেন্ট স্কুল” অবশ্য পরামর্শ দেয়ার সময় তিনি আমার “জলিল স্যার” ছিলেন না, আমার খালু ছিলেন। সে যাই হোক, যে জন্য এই লেখাটা তার বিষয় বস্তু কিন্তু বেশ পুরনো। আর ব্যাপারটা একটা ধুঁয়ার গুলার মত ঘুরপাক খাচ্ছে মগজে আজ কয়দিন। কাল এক মহাপুরুষের থেকে শুনেছিলাম লেখা নাকি এক বিরাট ডিসচার্জ। মগজ হালকা হয়, মন প্রসন্ন হয়,আর তাই লিখতে বসা। মগজ, মনের এই অবস্থান সুচক ধারনা আবশ্য আমার একান্ত নিজের।
এবার আসল কথায় আসি। ঘটনার শুরু সেই ক্লাস ফাইভ থেকেই। সবে মায়ের স্কুল পাশ করেছি এখন স্কুলে যাওয়ার নতুন সঙ্গী আব্বা। তিরিশ পয়তিরিশ মিনিটের রিক্সা যাত্রার ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন ক্লাসে ঢুকার অনুমতি নিতাম, ফার্স্ট পিরিয়ডের বয়স তখন দশ মিনিট। এমন ও হতো যে ফার্স্ট পিরিওড তাঁর প্রৌড়ের শেষ প্রান্তে, শেষ বেঞ্চের বাসিন্দাদের তোড়জোড় লেগে গেছে রাম নাম সত্য করতে আর আমি হাফাতে হাফাতে বইএ ভরা ট্রাঙ্ক নিয়ে ইংরাজিতে স্যারের অনুমতি প্রার্থনা করছি। এমন খুব কমই ঘটেছে যে ছ’শ ছাত্রের সাথে আমি ও বারান্দায় দাড়িয়ে ঠিক দশটা তিরিশে জনগন মন অধিনায়কের আগমনী গান দিয়ে একটা নতুন ক্লাসের জন্ম দিয়েছি আর হর্ষ উল্লাসে নিয়ে গেছি নিজের ক্লাসে। সব দোষ ছিল আমার আব্বার, তিনি সাইকেল কিনে দিতে ভয় পেতেন আর তাই আমাকে আসতে হতো রিক্সা করে উনার সাথেই। তো আমি বেচারা মফঃস্বলের ছেলে আর বাকিরা সবাই শহরের তাই কথা বলতে একটু অসুবিধা হতো। কথা বলতে বলতে হঠাৎ মুখ ফসকে যেই কোন সিলেটি শব্দ বেরুলো সঙ্গে সঙ্গেই মুখে কুলুপ এঁটে বসা ছাড়া আর কোন গত্যন্তর থাকতো না। বাক্যটা সম্পূর্ণ করার মানসিকতাটা ও চলে যেত। আমার অসুবিধেটা সিলেটি বা ছাপার ভাষায় ছিল না, ছিল ওদের কথ্য ভাষার প্রতি। আমি সেটা বুঝতাম না। সেটা না ছিল খাঁটি সিলেটি না ছিল শুদ্ধ বাংলা। বাংলা আর সিলেটির মিশ্রণে তৈরি সে এমন এক ভাষা যা আমার বলতে একদম ইচ্ছে হতো না। তাই কথা বলতে বলতে থেমে যেতাম। পরে অবশ্য অভ্যাস হয়ে গিয়ে ছিল। কিন্তু কোনদিনই আনন্দ পাইনি ওইগুলো বলতে। আমি কিছু নমুনা দিচ্ছি, যেমন ধরুন কেউ এসে বললো, “তোরার মতন আইজ আমরার ও উপবাস” বাক্যটা কতটা শুদ্ধ বাংলায় হয়েছে তা জানিনা তবে একটুকুও সিলেটি হয় নি। সিলেটি হলে এমন হতো, “তুমরার লাখান আইজ আমরার ও উপবাস”, “রোজা” হতে পারতো “উপবাসের” জায়গায়, কিন্তু সে না হয় বাদ দিলাম, যেহেতু শব্দটা আরবিক। “চল একটু জল (‘জ’ কে একটু হালকা ভাবে উচ্চারণ করুন) খাইয়া আই” কে তো এভাবে বলা যায় “চল থুড়া পানি (‘প’ কে একটু ‘ফ’ এর মত উচ্চারণ করুন) খাইয়া আই”, “সাইকেলর চাকা ইগু গর্তত ঢুকি গেসিল” না বলে “সাইকেলর সাক্কা ইগু গাতো হামাই গেসিল” বলা যেত অনায়াসেই। এরকম আরও হাজারটা উদাহরণ আছে যা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। কিন্তু শুধু ওই সিলেটি কে সিলেটির মত বলায় অনেক সময় তথাকথিত “বাংলেটি”রা (বাংলা এবং সিলেটির মিশ্রণ) খাঁটি সিলেটীদের “বাঙ্গাল” তকমা এঁটে দিত। যদিও আমাকে কেউ কোনদিন বলেনি, তবে ‘বাঙ্গাল’ শব্দটা শুনে একটা গালির মত মনে হতো। সবচেয়ে প্রধান ফারাক টা ছিল ‘জল’ আর ‘পানি’ তে, জল বলে অমুসলিম সিলেটিরা আর পানি বলে ‘বাঙ্গাল’রা। তো এরকম শব্দ আর কথার অন্তর্ঘাত নিয়ে আমার বেড়ে ওঠা। কলেজে ওঠার পর জানতে পারলাম যারা নাকি “উঠরা” তাঁদের ভাষা হচ্ছে এই “বাংলেটি”। ‘উঠরা’ শব্দ টা আমার কাছে নতুন ঠেকল, জিজ্ঞেস করলাম এটা আবার কি? শুনলাম যারা নাকি বাংলাদেশ থেকে উঠে এসেছে তাঁদের ভাষা হচ্ছে এটা। আর যারা এখানের ই ছিল তারা বলে খাঁটি সিলেটি। বাংলা নাটক সেই ছোটবেলা থেকে দেখতাম, শুনতাম। অনেক রকম বাংলা শুনেছি, কলকাতার বাংলা, ঢাকাইয়া বাংলা, চাঁটগাইয়া বাংলা, ময়মনসিংহের বাংলা, বরিশালের বাংলা, সিলেটের বাংলা। সবটাতেই একটা রস ছিল। কিন্তু সেই রস টা ভারতীয় সিলেটিদের কাছ থেকে পাইনি কখনও। জানিনা এই তফাতটার কারণ কী? কেন একই সিলেটি হয়ে মুসলিমরা পানি বলে আর অমুসলিমরা জল।
এখন মনে পড়ে সেসব দিনগুলি। কোথায় জল আর কোথায় পানি? একাধারে ইংরাজি, হিন্দি সব ঝেড়ে যাই একটু তাজা সব্জি কেনার জন্য আর ওপাশ থেকে অনর্গল তামিল ছুটে আসে তীক্ষ্ণ বাণের মত। আমার সব্জি কে ফালা ফালা করে কেটে ওখানেই “লাবড়া” বানিয়ে দেয়।
২৫ মার্চ, ২০১৩
মাদ্রাজ
একটি চোখ
।। শৈলেন দাস।।
আমি যেখানে দাঁড়িয়ে
ডানে রামকৃষ্ণ সারদা মা বাঁয়ে
মাঝখানে জগজ্জননী, আমার বাঁ দিকটায় একটু সামনে
দক্ষিণ দিকে মুখ।
ভক্তরা আসছে কাতারে
কেউ দাঁড়িয়ে কেউবা বসে
কেউ প্রণাম করছে হাঁটুগেড়ে।
একজন মহিলা ঘাড় নোয়াতে
নজরে পড়ল একটি চোখ।
যেন পবিত্র জোসনায়-
নির্মল আকাশে, চঞ্চল বাতাসে
বিলিয়ে অনুভূতির সুখ
নারকেল পাতার মৃদু ঝাপটায়
আড়ালে যায় চাঁদের মুখ।
আমি যেখানে দাঁড়িয়ে
ডানে রামকৃষ্ণ সারদা মা বাঁয়ে
মাঝখানে জগজ্জননী, আমার বাঁ দিকটায় একটু সামনে
দক্ষিণ দিকে মুখ।
ভক্তরা আসছে কাতারে
কেউ দাঁড়িয়ে কেউবা বসে
কেউ প্রণাম করছে হাঁটুগেড়ে।
একজন মহিলা ঘাড় নোয়াতে
নজরে পড়ল একটি চোখ।
যেন পবিত্র জোসনায়-
নির্মল আকাশে, চঞ্চল বাতাসে
বিলিয়ে অনুভূতির সুখ
নারকেল পাতার মৃদু ঝাপটায়
আড়ালে যায় চাঁদের মুখ।
স্থান
Silchar, Assam, India
বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ, ২০১৩
আমি নাকি ভিনদেশি
।।শৈলেন দাস।।
আমি বেড়ে উঠেছি বরাকের কোলে
জন্ম নিয়ে দেখেছি যে আলো
তা প্রতিফলিত হয়ে এসেছে
এই বরাকেরই মাটি, ঘাস, জলে।
বুক ভরে টেনে নিয়ে যে শীতল বাতাস
সচল রেখেছি আমার হৃদযন্ত্র
বছরের পর বছর ধরে
তার নিবিড় প্রবাহ বয়ে চলেছে
এই বারাকেরই আনাচে-কানাচে হয়ে।
তবুও রাজনীতির কুশীলবরা
আমার মাতৃভাষার প্রসঙ্গ টেনে
আমার নামের পাশে বসিয়ে দেয় “ডি”
সন্দেহ করে আমি নাকি ভিনদেশি!
তাই আমাকে তাড়া করে দিটেনশন ক্যাম্প
বা নোম্যানস ল্যাণ্ডে পাঠিয়ে দেওয়ার ভয়।
স্ব-ঘোষিত, স্ব-স্বীকৃত ভূমিপুত্রদের
এই অসাংবিধানিক কারসাজি
আমার আত্মমর্যাদায় আঘাত করে
আমার মানবাধিকার ক্ষুণ্ণ হয়
স্ত্রী-পুত্র পরিজন নিয়ে আমাকে
প্রতিদিন ভীত, সন্ত্রস্ত থাকতে হয়।
আজ অসহায় আমি
অসহায় আমার জাতিসত্ত্বা
আর আমার স্বাধীনতা
প্রহসন ছাড়া কিছুই নয়।
স্থান
Silchar, Assam, India
বুধবার, ২০ মার্চ, ২০১৩
ঝিল
।। শৈলেন দাস
।।
| (c) Picture:ছবি |
আজকের দিনটা বিজুর কাছে স্পেশাল্। ঘুম থেকে উঠেই শেভিং করে, স্নান সেরে বার বার ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের মুখটা দেখছে আর মনে করছে বড়দার কথাটা- তোকে কিন্তু দেখতে বুম্বাদার মত লাগছে। বুম্বাদা কে?-জানতে চাইল বিজু। আরে বুম্বাদা মানে প্রসেনজিৎ, বাঙালির শেষ নায়ক--বড়দার উত্তর। হাসি পেল বিজুর, তাড়াতাড়ি শার্ট-পেন্ট পড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। মনে মনে ভাবল বড়দাকে জানিয়ে গেলে কেমন হয় যে সে আজ ঝিলমিলদের বাড়িতে যাচ্ছে এবং সম্ভবত আজই নিজের মনের কথাটি ঝিলকে বলবে।
বড়দা মানে সুবোধ দাস হিন্দুত্ব বাদী রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী। আগামীতে পঞ্চায়েত নির্বাচনে দলকে জেতানোর দায়িত্ব সম্ভবত তার কাঁদেই পড়বে। সেদিন ঝিল বিজুদের বাড়িতে আসার পর কত গল্প করল। অথচ ঝিল যাওয়ার পর হঠাৎ বলে উঠলেন, ঝিল বোধহয় মুসলমান! বিজুর প্রতিক্রিয়া--- কী বলছ বড়দা! ঝিল ওরফে ঝিলমিল নাথ একজন হিন্দু। দেখিস সামনেই কিন্তু নির্বাচন।
বড়দাকে একটু চিন্তিত দেখাল সেদিন।
বড়দাকে আর জানানো হলনা। সাত সকালেই পার্টির কাজে কোথাও বেরিয়ে পড়েছেন, বিজু তাই ধীরে ধীরে খেয়া পার হয়ে ইণ্ডিয়াক্লাব পয়েন্ট থেকে রিক্সায় চড়ে রওয়ানা দিল ঝিলদের বাড়ির উদ্দেশ্যে। জেল রোডের আপ্ টা নামলেই অম্বিকাপট্টির মুখে একটি ছোট্ট দোতলায় ঝিল ও তার বাবা-মা থাকেন। রিক্সা থেকে নেমে বিজু দেখল, যে বাড়িটার ব্যালকনি থেকে ঝিল তার জন্য অপেক্ষা করছে। সেটি বেশ মনোরম, সামনে ফুলেরবাগান, ব্যালকনিতে টবে টবে বিভিন্ন জাতের ফুল, দেওয়াল বেয়ে উঠেছে একটি পাতা বাহার। গেইট খুলে বারান্দায় উঠতেই বিজুকে স্বাগত জানাতে এল ঝিল। সাথে বেশ সুন্দরী এক মহিলা। পরনে খুব দামী একখান তাঁতের শাড়ি, হাতে মাত্র একটি করে সোনার বালা, কানে ছোট টপ। লক্ষ্যণীয় হল, কপালে সিঁদুর নেই।
ঝিল বলল,--- বিজু ইনি হলেন আমার মা, বাবা বাড়িতে নেই। বেরিয়েছেন কোথাও অফিসের কাজে।
সেদিন বিজু ঝিলের বেড রুম থেকে একে একে বাড়ির প্রতিটি ঘর দেখল। নিজের নতুন কম্পুটারে ঝিল কিভাবে ফেসবুকের মাধ্যমে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয় তাও শিখল। তারপর অনেক্ষণ গল্প হল ঝিলের মায়ের সাথে। বিজু খুব মন দিয়ে শুনছিল ঝিলের মায়ের কথা, তার ছোট বেলা নাকি কেটেছে বিজুদেরই গ্রামে। বিজুর বড়দাকেও তিনি চেনেন ভালোভাবেই। তবে এখন আর কোন খবরই রাখেন না সেখানের। তার মা-বাবা নাকি চলে গেছেন অন্য গ্রামে ইত্যাদি ইত্যাদি। মাঝে মাঝে ঝিলের মায়ের পরিবেশন করা মুখরোচক খাবার খেয়ে বিজু খেয়ালই করেনি বেলা কখন গড়িয়েছে এগারটায়। এমন সময় মোবাইলে বড়দার মেসেজ,--- বারটায় বাড়িতে থাকিস্, যুবমোর্চার মিটিং আছে তোকে দায়িত্ব দেওয়া হবে। এদিকে ঝিলের মা বললেন,-- আজ প্রথম এসেছো বাড়িতে তাই খেয়ে যেতে হবে। বিজু তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল, আরেক দিন এসে খাব, বলেই ঝিলকে দেখাল বড়দার মেসেজ। ঝিল মাকে বুঝিয়ে বলে নীচে নেমে এল বিজুকে বিদায় জানাতে।
বিজু বলল,- তোমাকে কিছু বলার ছিল ঝিল এবং তা আজকেই বলল বলে ঠিক করে এসেছি। ঝিল বলল, তার আগে আমাকে কিছু জানাতে হবে তোমাকে আমার মায়ের সম্পর্কে। বিজু বলল, কী? তারপর ঝিল যা বলল তা শুনে বিজুর মাথায় শুধু বড়দার কথাগুলিই ঘুরপাক খাচ্ছিল- দেখিস সামনেই কিন্তু নির্বাচন.......... ঝিল বোধহয় ........। ঝিলকে বলল, আজ আসি আবার দেখা হবে।
বারান্দায় অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল ঝিল। গ্লানি না অভিমান জাগল মনে বুঝা গেলনা। চেয়ে থকল দূর পথে যেখানে ক্রমশঃ ছোট হয়ে যাচ্ছে বিজুর অস্তিত্ব। জানতে চায়নি সে, তার মনের কথা বললনা কেন বিজু।
স্থান
Silchar, Assam, India
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)




