“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২০

ফুটে উঠবার কথা

 

স্কুলে ২০১৭র জানুয়ারিতে
তই বা বয়েস হবে
, এই সপ্তদশ ছেড়ে অষ্টাদশী হতে চলেছে ও! এবং দুনিয়ার বহু অল্প বয়েসী  প্রতিভাদের মতই আবার ও প্রমাণ করলো যে শিল্পীর চেতনার উত্তরণ ঘটার কোনো বায়োলজিক্যাল সীমানা হয় না, হয় না বয়েস, পারিপার্শ্বিকতা ও সমাজের বিশেষ ভূমিকা । উল্লেখিত সূচকগুলি শুধু মাত্র দশ বারো শতাংশ প্রভাব ফেলে সাধারণ এক ব্যক্তির ওপর, যা কিনা তাঁকে সাধারণ ব্যক্তি থেকে সচেতন শিল্পীতে উন্নীত হতে একটুও বাধা দেয় না।   

৮ মার্চ, ২০২০ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বর্ণালি শিশু কল্যাণ সংস্থা, তিনসুকিয়ার আমন্ত্রণে গিয়ে সংস্থার ৩৮ তম প্রতিষ্ঠা দিনে পৌষালি গাইল চিৎকার কর মেয়ে’ , এই সুবিখ্যাত গানটি ! তো আমিও বলছিলাম পৌষালি করের কথা । উজান অসমের একেবারে প্রান্তীয় শহর তিনসুকিয়াতে বিগত কয়েক বছর ধরে সাহিত্য শিল্প সঙ্গীত এসব চর্চার একটি নিয়মিত বহমানতা এসেছে , যদিও একে স্রোত বা উচ্ছ্বাস বলা চলে না সে অর্থে ! এর কারণ অবশ্যই বহুমুখী । বাণিজ্য প্রধান সমাজ, প্রকৃত অর্থে অল্প-সংখ্যক সচেতন ব্যক্তি, রাজনৈতিক উদাসীনতা, নিজস্ব ভাষাশিক্ষার দুর্বল পরিকাঠামো, সাম্প্রদায়িক সমস্যা ইত্যাদি এই শহরকে মাখামাখি ভাবে জড়িয়ে রেখেছে । তো এই অবস্থায় গান বাজনা তো হয়, কবিতা লেখাও যায়, নাটক মঞ্চস্থ হয় , আবৃত্তি আওড়ানোও চলে ; যতক্ষণ না সেই গান মানুষের অন্তরমহলে সুচের মতো আঘাত হানে, যতক্ষণ না সেই কবিতা পড়ে অনেকের ভ্রূ কুঁচকে আসে দেশদ্রোহিতার সন্দেহে, যতক্ষণ সেই নাটক সমাজ ব্যবস্থার নগ্ন রূপকে মঞ্চে আছড়ে ফেলে অনেকের বিরাগভাজন না হয়, যতক্ষণ না সেই আবৃত্তি কানের অলিগলিতে গলিত সীসার মতো ঢেলে দিতে থাকে সত্য ও সংগ্রামের শাশ্বত বাণী ! পৌষালি কর শহর তিনসুকিয়ায় এক ব্যতিক্রমী শিল্পীর মতো মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে ! ওর গানে, আবৃত্তিতে , আঁকায় ছড়িয়ে রয়েছে সেই বহুমুখী শিল্প প্রতিভা যা মানুষকে ভাবায়, নতুনকে আলিঙ্গন করে নেবার শিক্ষা দেয় ! যুগ পাল্টাচ্ছে দ্রুত । সেই সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে সাহিত্য সংস্কৃতি সঙ্গীত এসবের আঙ্গিক । এসেছে নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষা ! এবং সমস্যাটা ঠিক এখানেই ! পুরাতন অনেকেই একে সাদরে, সদরে নিতে পারেননি বা পারছেন না ! ফলে দুখঃজনকভাবে তারা ছিটকে যাচ্ছেন আধুনিক পরিমণ্ডল থেকে।

         একটা উদাহরণ দি । গায়কের কাজ কি? গান গেয়ে পয়সা উপার্জন করা , না সেই সঙ্গে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা রেখে জনসচেতনতা বাড়ানোতে সঙ্গীতকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা ? এই দুটো দিক একসঙ্গে থাকলেই তাঁকে প্রকৃত শিল্পী বলা চলে। সেজন্যই জোন বেজ, বব ডিলান, হ্যারি বেলাফন্ট, ভূপেন হাজরিকা, কবির সুমনরা আন্তর্জাতিক স্তরে শিল্পীর সম্মান ও স্বীকৃতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পেয়েছেন অসংখ্য জনতার মরমী হৃদয় আসনটি , যেখানে তাঁদের অবস্থান চিরকালীন হয়ে থাকবে ।

ঠিক তেমনি বহু আবৃত্তিকার ঠাণ্ডা নরম প্রেম পিরিতির ও প্রকৃতি বর্ণনার কুসুম কোমল পথে গলার সুধা ঢেলে পুরো ক্যারিয়ার যাপন করেছেন, শোনাননি সবহারাদের, দুর্গতদের ও শোষিতদের আর্তি তার আবৃত্তিতে ! তো এরাও শিল্পী , তবে ইতর ভাষায় আলুভাতে মার্কা !

২০শে মে, ২০১৮ শিলচর রেলস্টেশনে
খুব ছোটবেলা থেকে আমি পৌষালির গড়ে উঠা দেখেছি ! আর সকলের মতো ২৫শে বৈশাখে রবীন্দ্র কবিতা আবৃত্তি ও গানের প্রতিযোগীদের মতই শুরু হয়েছিল ওর পথ চলা ! কিন্তু আপন ছন্দে সুরে সেই পথের মোড় ফিরে গেছে এক নিজস্ব শৈলীতে ! শহর তিনসুকিয়াতে বাংলা ফোক, ভাটিয়ালি, লোকসঙ্গীত, বাউলের ধারার যে অসংখ্য শাখা প্রশাখা আছে , আছে গায়েন ভঙ্গি, এসব কিন্তু পৌষালি এই সবুজ বয়েসেই দেখাতে শুরু করেছে ! সেই সঙ্গে অসংখ্য স্বর প্রক্ষেপণ বিধি, বিভিন্ন  ধারার লোকগান , বাংলাদেশ , ত্রিপুরা ও উত্তর পুবের বাংলা গানের যে সরস ও সমৃদ্ধ ধারাটি রয়েছে, যাকে দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এতদাঞ্চলের লোকেরা কলকাতাকেন্দ্রিকতার মায়াপাশে ভুলে রয়েছিলেন নিতান্তই অজ্ঞতার পরবশে, সেসব পৌষালির গানের সুরে প্রায়ই উঠে আসছে অধুনা সময়ে ! হ্যাঁ, শহরের অনেকের সঙ্গে কথাবার্তা বলে দায়িত্ব নিয়েই বললাম এ কথা ! যেসব বিষয় ও শিল্পীকে পৌষালি নির্বাচন করছে ওর গানের পরিবেশনায় তাঁদের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন শহরবাসী , এই প্রথম ! হ্যাঁ , ঠিক শুনলেন , এই প্রথম ! কই আগে তো তিনসুকিয়ার মঞ্চে অনুসূয়া অনাদিলের গান গাইতেন না সাধারণ শিল্পীরা, গাইতেন না হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে, কবি আলফাজকে কি কেউ পৌষালির আগে এই শহরে আবৃত্তি করেছে ?

এই তো বিগত দীপাবলির সন্ধ্যায় হিজুগুড়িতে পৌষালি গাইল কী ঘর বানাইমু আমিএই হাছনের গান ! সে জানে আর আমি জানিএই লালনের গানটিও ! আয়োজক ছিল প্রগতি গোষ্ঠী !


  
২০১৭র জানুয়ারিতে স্কুলে
    পৌষালির কণ্ঠে গতবছর শুনেছিলাম  সুনীল মাহাতোর কথাতে কুড়মালি ঝুমুর  পিন্দারে পলাশের বনএর মতো চা বাগানের অনিন্দ্য সঙ্গীতটি ! গুয়াহাটি পাণ্ডু রেস্ট ক্যাম্পর অনুষ্ঠানে যেমন জনপ্রিয় ভূপেনদার কহুয়া বনগাইল ঠিক সেই সঙ্গে ২১ জুন , ২০১৮ বিশ্বসঙ্গীত দিবসকে কেন্দ্র করে শিলচরের বাংলা গানের দল দলছুটউদযাপন করা নিজেদের দশ বছর পূর্তি উৎসবে শিলচর রাজীব ভবনে’ ‘প্রজন্মের এককঅনুষ্ঠানে পৌষালি গাইলো আমি সুন্দর হবো’, ফারজানা ওয়াহিদ সায়ানের মাটির সাথে দোস্তি’, লালনগীতি সে কি আমার কবার কথার সঙ্গে চাটগাঁইয়া গান মধু হই হই বিষইত্যাদি !  প্রচলিত চাটগাঁইয়া গান রাধারমণ দত্তর  ভ্রমর কইও গিয়া’, অমর পালের কালারে কইরো গো মানাএর সঙ্গে কিছু রবীন্দ্রনাথের গানও ।

২১শে ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে পৌষালিকে আবৃত্তি করতে শুনি  অসম ও উত্তর পূর্বের বাংলা ও বাঙালির সবহারানোদের কথা তুলে ধরা কবি শিলচরের শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর বিখ্যাত কবিতা উদ্বাস্তুর ডায়েরি’, অথবা ডিব্রুগড়ের কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাসের কবিতা ।

তিনসুকিয়াতে এসব গান বেশির ভাগ শিল্পীরা গান না, আবৃত্তিকারেরা করেন না । সুতরাং বোম্বাইয়া আমের মতো হিন্দি গান ছাড়া যে আমাদের শেকড়ের বাংলা গান আছে , আছে বিশ্বজনীন শ্রেণিহীন শোষিতদের কান্না, বাস্তুহারার মাটির প্রেমের গান, এসবের সঙ্গে এই ছোট শহরের শ্রোতা পরিচিত হচ্ছিলেন না, থেকে যাচ্ছিলেন  ব্রাত্য । এই কাঁচা বয়েসে পৌষালি সেই দায়িত্বটুকু পালন করে প্রকৃত শিল্পী সচেতনতার পরিচয় দিচ্ছে । প্রসঙ্গত উল্লেখ করি ইংরেজি মাধ্যমেই কিন্তু পড়াশুনা পৌষালির । সুতরাং যেমন বলেছিলাম শুরুতে, প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে কিন্তু তা প্রকৃত শিল্পীর গতিকে প্রতিহত করে না ।  

যারা পৌষালিকে চেনেন না , শোনেন নি তাঁদের জন্য আন্তর্জালে সক্রিয় মেয়েটির সূত্র নিচে দিয়ে ওর ইউট্যুব, ব্লগ ইত্যাদিতে যাবার পথ বাতলে রাখলাম। ঘুরে আসুন, ভালো লাগবে !

সকল শহরবাসীর পক্ষ থেকে এই নাগরিক শিল্পীর নিজের, ওর অভিভাবকের, শিক্ষকদের শুভ কামনা জানাই । এগিয়ে চলো মেয়ে !                                                    

 

https://www.youtube.com/c/MusicalDiariesPoushali

https://poushalikar.blogspot.com 

https://www.facebook.com/poushali.kar.75

 

 পৌষালির ভিডিওগুচ্ছ ০১


পৌষালির ভিডিও গুচ্ছ ০২

বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২০

সব ভুল কি সমতুল!

 
 ।। সিক্তা বিশ্বাস ।।


 
















ভুলেই তো গেছি প্রায়! ম্রিয়মান স্মৃতিপট দর্শায়! 
সে কবে কোন যুগে ছিল, হুজুগেপানা  হৃদয় বিনিময়! 
কেমন আবছা মনে পড়ে-----
অফিসের সময়টা সুন্দর এডজাস্ট করতে
ঠিক আমার কলেজের সময় ধরে!
অবাক হয়ে ভাবতাম , 
ভালোবাসা কতো কি শেখায়! 
যত্ন করে সব খবর রাখা....
ক'টায় ক্লাস... ক'টায় কলেজ যাওয়া... ক'টায় আবার ফেরা...
তখনতো স্বপ্নেও ভাবিনি এও ভুলে যাবো!

ভুলেই তো গেছি সব! 
সেই একসাথে নাটক, সিনেমা দেখার পালা! 
ক'দিন আগে থেকেই কবে যাবো! 
কবে যাবো! জল্পনাতে কান  ঝালাপালা!
কতো না বলা কথা চোখাচোখিতে বলা...
এইতো প্রেমের আসল শিল্পকলা.... 
দূর থেকে দেখে এক ঝলকেই  কেমন বুক ধড়ফড়.... 
যেন দু'জনে দু'জনকে অহরহ বলছে , 
চিনি ওগো চিনি...জানি ওগো জানি... মানি ওগো মানি...
এত্তো সবও ভুলেই গেছি ! 
কালের দাপটে! সজোরে চাপটে ! 
দু'টি পথ দু'টি দিকে গেছে বেঁকে! 
কেমন না ভাবা বিরহের ছবি এঁকে!
সত্যি! এত্তো বছরে একবারওতো পড়েনি মনে ! 
কোথা ছিল সেদিনের সেই সে টান! সেই আকর্ষণ! 
একে অন্যের অন্তপ্রাণ! প্রাণের দোসর !
সময়ের সাথে জীবন ও কর্তব্যের দাবিতে 
সব ছিল কেমন তলিয়ে যাওয়া অঘটা! বিস্মৃত!
আজ হঠাৎ কোনও এক বন্ধুর পাতায় 
অজান্তে চোখ পড়ে যায় তোমার লেখায়! 
ছোট্ট একটি মন্তব্য! কি তার ইন্দ্রজাল! 
ম্যাজিকের মতো সুস্পষ্ট হয়ে যায় বিস্মৃত স্মৃতিপট! 
কেমন দিন ক্ষণ সহ মনে পড়ে যায় স---ব চটপট!
ফিরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে সেই মুছে যাওয়া দিনগুলোতে.... 
ইচ্ছে করছে জুড়ে দিতে সেই ছিঁড়ে যাওয়া দোতারার তারগুলো....
যদি আবার বেজে ওঠে..... 
ছেয়ে যায় সুরে সুরে ...... 
ঠেলে দেয় বাস্তবের সব বেড়াজাল!
কই এবারে তো ভুলতে ইচ্ছে হচ্ছে না! 
সযতনে পুষে রাখতে ইচ্ছে হচ্ছে অন্তরের মণিকোঠায়...
ভাবছি শুধু কি করে সব ভুলেই ছিলাম! 
একি ভোলা যায়! নাকি নতুন স্বাদের খেলার নেশায় ,
 কিংবা বাঁচার তাগিদে অথবা মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টায়!!
                    *****************

রবিবার, ৭ জুন, ২০২০

দেশান্তরে পরিবেশ



(পরিবেশ মনস্ক সাংবাদিক প্রয়াত  পীযুষ কান্তি দাস-এর প্রতি উৎসর্গীকৃত)


প্রয়াত  পীযুষ কান্তি দাস
কোন অনুষ্ঠানে সঞ্চালক যে ভুমিকাটুকু পালন করেন, এই উত্তর সম্পাদকীয় লিখতে গিয়ে আমাকে তাই করতে হচ্ছে যেহেতু অন্যদের মতামত এবং বার্তা নিয়েই  আজকের এই লিখাটা। সে রকম একটা অনুষ্ঠান বাস্তবে যদি করা হতো, সেখানে সঞ্চালক হিসেবে নিজের মত প্রকাশের অবকাশ খুব কমই থাকতোতাই নিজস্ব মতামত দেওয়া থেকে বিরত থাকতেই হচ্ছে।
সঞ্চালনা এবং ভাষান্তরঃ
পার্থঙ্কর চৌধুরী
 অধ্যাপক, বাস্তু ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগ,
আসাম বিশ্ববিদ্যালয়, শিলচর,
মুঠোফোন ∶ ৯৪৩৫০৭৮২৯৬
  
শঙ্খচিল দেখছিলাম, আর ভাবছিলাম সিনেমার নামটা নিয়ে। পাখিগুলোতো ভূগোলের জ্ঞান থাকে না! ভৌগলিক সীমানার ধার ধারে না আপনার আমার পরিবেশটাও ঠিক তাই দেশ এবং বিদেশের যে যেখানেই রয়েছেন, ঠিক ওই ছোট্ট মেয়েটার স্বাস্থ্যের মতো পরিবেশ নিয়ে যে উদ্বেক সেটাও কিন্তু ভৌগোলিক সীমারেখাতে সীমাবদ্ধ নেই এই প্রেক্ষিতেই আজকের এই দিনটি নিয়ে, দেশের ভুখন্ডের বাইরে থাকা বেশ কিছু বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে কথা বলেছিলাম জানতে চেয়েছি, দিনটি নিয়ে তাদের কি ভাবনা চিন্তা, যেসব দেশে তাঁরা রয়েছেন, সেসব জায়গার পরিবেশের খুনসুটি, এবং এ দিনটির জন্য কোনও বিশেষ বার্তা যাদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তাদের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কর্মরত কিম্বা অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, আবার নতুন প্রজন্মের অনেকেই গবেষনায় রত কারোও সাথে পরিচয় হয়তঃ বা কোন সেমিনার-সিম্পসিয়াতে, কিম্বা শুধুই  ইমেল মারফৎ

রমেশ বুনোরতন থাইল্যান্ডের মহীডল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ষাটোর্ধ বয়স ফুরফুরে মেজাজ  চেহারা না দেখে কথা বললে মনে হবে উঠতি যুবক কথায় কথায় বললেন, ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতি বছরই এই ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসটি পালন করে আসছেন জাতিসংঘের গৃহীত এই বিশ্ব পরিবেশ দিবসটা পরিবেশ সুরক্ষার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণের প্রধান বাহন হিসেবে কাজ করছে বলে জানালেনপ্রতি বছর, এক একটি আলাদা আলাদা থিম নিয়ে দিনটা পালিত হয়। ২০২০, এ বছরের থিমটি হ'ল ‘জীব বৈচিত্র্য উদযাপন’ (Celebrate Biodiversity) কথা প্রসঙ্গে অধাপক বুনোরতন বললেন, প্রায় চার দশক ধরে তিনি সংরক্ষণের প্র্যাকটিশনার। কিন্তু তারও অনেক বেশি সময় ধরে তিনি এই প্রচলিত সংরক্ষণের মান সম্পর্কে সচেতন। প্রত্যেকটি দিনই উনার কাছে এক একটি পরিবেশ দিবস, এবং প্রতিদিনই  তিনি তা উদযাপন করেন
দুঃখ করে বুনোরতন বললেন, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, বিশেষতঃ, গত দুই দশকে, পরিবেশের গুনগত অবক্ষয় দেখলে, ‘হৃদয় শিউরে উঠে’! সত্যিই তো! পরিবেশের দুর্বল ও ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা মূলত আমাদের জন্যই। এটা খুব বেদনাদায়কহ্যাঁ, এটা সত্যি যে জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের পরিবেশকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে। তবুও, ভালো করে দেখতে গেলে সেটা আবার সেই মানুষের জন্যই, যারা জলবায়ু পরিবর্তনের গতিটাকে আরও ত্বরান্বিত করছে। প্রচণ্ড ক্ষমতাশীল এবং দোর্দণ্ডপ্রতাপ এই মানুষের জন্যই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট হওয়া পরিবেশের দ্রুত পরিবর্তনগুলি প্রশমিত করার যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, সেই স্থিতিস্থাপকতা বিকাশের সুযোগ (Opportunity to develop resilience) খুব কমই হচ্ছে! পরিবেশের প্রত্যক্ষ উপকারভোগী হওয়া সত্ত্বেও যতই উপার্জন এবং জীবিকা নির্বাহের দিকে ধাবিত হচ্ছে মানবকুল, ততই পরিবেশের স্বাস্থ্যকর অর্থাৎ সুফলদায়ী দিকটাকে আরও খারাপ করে তোলা হচ্ছে এতসবের পরও অন্ধদৃষ্টিকে মুলধন করে পরিবেশের ধ্বংসের দিকে আমাদের যে যাত্রা, সেটা থেকে পিছ পা হতে আমরা যেন নারাজ।  পৃথিবীতে সম্ভবত মানুষই একমাত্র প্রজাতি, যারা এই ধরনের আত্মঘাতী আচরণ করছে !

রাখঢাক না করেই অধ্যাপক বললেন, যদি আমি আমার মতো করে বলি, তবে বলবো, এভাবে বছর বছর পরিবেশের জন্য ঘটা করে এই ফিফথ জুন উদযাপনের প্রয়োজন নেই। আমি চাই, প্রতিটি দিন, এমনকি প্রতিটি মুহূর্ত নিবেদিত হোক পরিবেশের জন্য। এছাড়া, আমি চাই না দিনটি নিয়ে কোন সেলিব্রেশন হোকযদিও পরিবেশ দিবসের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে পরিবেশ সুরক্ষার জন্য সচেতনতা  গড়ে তোলা যাতে করে পরিবেশ রক্ষার জন্য একশন প্ল্যানগুলা আরো বেশী কার্যকরী করা সম্ভব হয়, কিন্তু বাস্তবটা ঠিক তার বিপরীত। বাস্তবে আমরা দেখছি, পরিবেশ রক্ষার এই গুঁড় তত্ত্বটুকু উদযাপনকারীরা অনুধাবন করতে পারছেন না! পরিবেশ রক্ষার ‘তত্ত্ব-বার্তা’-গুলি  সত্যি সত্যিই উদযাপনকারীদের কানের ভেতর গিয়ে পৌঁছে না। বেশীর ভাগ দেশের লোকেরাই এটাকে ‘ক্রিসমাস’ বা ‘দিওয়ালি’-র মতো উদযাপন করেনসে রকম না করে, এই দিনটা আমাদের অন্তর্দর্শন এবং দৃঢ়় পদক্ষেপের দিন হওয়া উচিত। আমি সেই দিনটার স্বপ্ন দেখছি যেদিন পরিবেশের হানিকারক কাজগুলোকে প্রকৃত অর্থে অপরাধ, মানে আরও জোরালো ভাষায় বলতে গেলে, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সমান কাঠগড়ায় বিচার করা হবে এক বুক নিরাশার মধ্যেও  আশা করছি, এ বছরের পরিবেশ দিবসে শেষ পর্যন্ত সম্বিত ফিরবে এবং লোকেরা বুঝতে সক্ষম হবে যে  পরিবেশের অবনতির সাথে সাথে তাদের আরও বেশী করে হারানো ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। দরিদ্র ও প্রান্তিক বর্গের লোকেরা সাধারণতঃ প্রথম ধাক্কায়  এটা টের পায়। আর শক্তিশালী ধনীরা ? তাদেরও এ থেকে পরিত্রান নেইশুধু সময়ের ব্যাপার। অত্যাধুনিক হাজারো প্রযুক্তি সত্ত্বেও, আমরা এখনও আমরা জীববৈচিত্রের উপর নির্ভরশীল। জীববৈচিত্র্য সমস্ত জৈবিক সিস্টেম এবং প্রক্রিয়াগুলির একটি মৌলিক উপাদান।  জীবিকা এবং জীবন উপভোগের জন্য জীব বৈচিত্র্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই পথে না হেটে, এই মানুষ নামের প্রজাতিটা যা করছে, তা তো নিজেরাই নিজেদের কফিন বানিয়ে রাখার সামিল!

    নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুকেশ কুমার চালিশে। মাস ছয়েক হল, অবসর নিয়েছেন। কথায় কথায় বললেন, পৃথিবীর মোট স্থলভাগের শতকরা মাত্র ০.১ থাকলেও উনাদের দেশে বেশ কিছু আকর্ষণীয় জীববৈচিত্র্য রয়েছেহিমালয় অঞ্চলের চারটি হটস্পটগুলির মধ্যে সেদেশ জীববৈচিত্রের  একটি হটস্পটের অংশ। ছয়টি জীব সংমন্ডল নেপালে রয়েছে। নেপালের মোট অঞ্চলের প্রায় ২৫% এলাকা জুড়ে সুরক্ষিত বনাঞ্চল রয়েছে, এর মধ্যে ৯টি জাতীয় উদ্যান, ৩টি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণাগার, ৫টি সংরক্ষণ অঞ্চল, ১টি হান্টিং রিজার্ভ রয়েছে এবং সেগুলোর প্রত্যেকটাকে ঘিরে বিশাল জায়গা জুড়ে বাফার অঞ্চল রয়েছে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সম্পর্কিত সেদেশে স্থানীয় লোকেদের মধ্যে কিছু প্রচলিত রীতি বংশ পরম্পরায় চলে আসছে এবং সংরক্ষন সম্পর্কে তাদের জ্ঞান অন্য জায়গার আরো দশজন লোকের তুলনায় বরং ভালই জানা। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে অনেক পরে, অর্থাৎ ১৯৭০ সাল থেকে সরকারি পর্যায়ে সেদেশে সংরক্ষণের কাজ হাতে নেওয়া হয়জীববৈচিত্র্য নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তাদের দেশ সক্রিয়ভাবে যোগদান করে চুক্তি সাক্ষর করেছে এবং জীববৈচিত্র্যের বিভিন্ন দিক নিয়েও নিরন্তর গবেষণা করে যাচ্ছে। হিমালয়ের পাদদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে দেশটি রয়েছেপ্রয়োজনমতো বৃষ্টিপাতের ফলে সেখানে প্রচুর অরণ্য রয়েছে এবং সেগুলোতে বন্য প্রাণীদের অবাধ বিচরন চোখে পড়ে এদের মুক্ত চলাফেরার মধ্য দিয়ে উনার যে উপলব্ধি, তা পরিবেশের সুস্বাস্থ্যের ইঙ্গিত দেয় এবং বিশেষ করে এই লকডাউনের সময় বিভিন্ন দূষণকারী এজেন্টকে হ্রাস করার সহায়ক বলে মনে হয়। তাই, পরিবেশ দিবসে উনার এটাই প্রত্যাশা যে  গোটা বিশ্বের লোকেদের জন্য জীববৈচিত্র্যে যেন বজায় থাকে, পাশাপাশি পরিমণ্ডলটাকেও যেন স্বাস্থ্যকর ও দূষণ মুক্ত রাখা যায়৫ জুন দিনটি সম্মিলিত প্রচেষ্টার দিন এবং জীববৈচিত্র্য, মানব এবং সামগ্রিকভাবে আমাদের সৌরজগতের এই একমাত্র জীবন্ত গ্রহকে বাঁচানোর জন্য অনুশীলন শুরু এবং বজায় রাখার অঙ্গীকার করার দিন। 

হাঙ্গেরির জেন্ট ইস্তভান বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যপ্রাণী সংরক্ষন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত গবেষিকা, শ্রেয়া। বাঙালি মেয়ে। বেশ কবছর থেকে সে দেশে থাকলেও, জন্মসুত্রে ভারতীয়।  বলল, ভারত সম্পর্কে ভেবে আমার মনে প্রথম যে শব্দটি আসে তা হ'ল 'বৈচিত্র্য'; প্রাকৃতিক এবং নৃতাত্ত্বিক দুটোই দেশজুড়ে সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক দৃশ্য, প্রজাতি এবং বাস্তুতন্ত্রের বৈচিত্রতা পাশাপাশি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বৈচিত্র্য দেশটাকে বিশ্বের অন্যান্য অংশ থেকে আলাদা করে তোলে।
পরিবেশ উদযাপনের এই দিনটিতে, চারপাশের যে প্রাকৃতিক ঘটনা ঘটছে তার ধারাবাহিকতা এবং এদের সম্ভাব্য মোকাবিলা নিয়ে সবার জন্য একটি সুস্পষ্ট চিন্তাভাবনা এবং রূপরেখা তৈরি করা খুবই জরুরিঅতিমারি, ভূমিকম্প, দাবানল, সুপার ঘূর্ণিঝড়ের মতো একের পর এক বিশ্বব্যাপী মহামারীর আকস্মিক প্রাদুর্ভাব সব কিছুই যেন এ বছর হচ্ছে। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পিছনে থাকা অদৃশ্য বাস্তব টাকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত আমরা সত্যই প্রকৃতির করুনায় রয়েছি তা যেন বার বারই মনে হচ্ছে।
করোনা আক্রান্ত ভারতের বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে আমাদের জনগণ ও সরকার পরিস্থিতি মোকাবেলায় কঠোর সময়ের মুখোমুখি হচ্ছেনবিভিন্ন পেশার লোকেরা যদি এই সমস্যাগুলির সমাধানের জন্য একত্র হয়ে সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করেন, তবে সম্ভবত একটি উপায় বেরোতে করতে পারেবন্যজীবন সংরক্ষণের শিক্ষার্থী হওয়ায়, আমার দৃষ্টিকোণ থেকে, বাস্তুসংস্থান এবং বন্য প্রজাতির উদ্ভিদ এবং প্রাণীজগতের গুরুত্ব সম্পর্কে সারা দেশে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে সচেতনতা যথেষ্ট অবদান রাখতে পারেএকইসাথে গবেষণা  এবং বৈজ্ঞানিক অধ্যয়নকেও  গুরুত্ব দিতে হবে। আমি দৃঢ়়ভাবে বিশ্বাস করি যে পরিবেশের স্বার্থে এই পরিবেশ দিবসে আমাদের সকলকে এগিয়ে আসা উচিত এবং সুস্থ সমাজ, আদর্শ পরিবেশ শিক্ষা এবং একটি সচেতন জাতি হিসাবে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা উচিত।

সিঙ্গাপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এন্ডি আংগ জানালেন, আসুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবসটি উদযাপন করার সাথে সাথে  আমরা আমাদের চারপাশের সুন্দর প্রকৃতির প্রশংসা করার জন্য কিছুটা সময় ব্যয় করি এবং আমাদের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় একসাথে কাজ করি।

বাংলাদেশ, ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যপ্রাণী গবেষক, হাসান আল-রাজি জানালেন অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এ দিনটি খুবই উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে উদযাপন করা হবে বিশেষ করে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পরিবেশ নিয়ে গবেষণা করে এ ধরনের সংগঠনগুলো এই দিনটিকে পালন করতে বিশেষ উৎসাহী। বাংলাদেশ সরকারের বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এই দিনটিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতি বছর উদযাপন করে থাকেপরিবেশের প্রয়োজনীয়তা পরিবেশ সংরক্ষণ এর তাৎপর্য এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আমাদের করণীয় বিষয়গুলোকে সকলের সামনে তুলে ধরাই এই দিনটির উদ্দেশ্য। প্রতি বৎসর ঢাকার আগারগাঁওয়ের বন ভবনে এই দিনটি উদযাপিত হয়। দিনটিকে কেন্দ্র করে রেলি, সেমিনার, আলোচনা সভা ইত্যাদি  আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই আয়োজনে অংশগ্রহণ করে।
এ বছরের পরিবেশ দিবসের বিষয়টা পুরোপুরি ভিন্ন।  পরিবেশ দিবস উদযাপনের ঠিক এই মুহূর্তে পুরো পৃথিবী এমন একটা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে জনসমাগম পুরোপুরি বিপদজনক। করোনাভাইরাস  এর প্রাদুর্ভাবের ফলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। তাই এবছর হয়তো বা আগের বছরগুলোর মত পরিবেশ দিবস উদযাপন করা সম্ভব হবে না। তবে এটাও সত্য যে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এর জন্য দিনটির উদযাপন থেমে থাকবে না।  বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই উদযাপন হবে প্রযুক্তির ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করে ঘরে বসেই উদযাপন করা হবে পরিবেশ দিবস। এই কদিন আগে (অর্থাৎ ২২শে মে) বিশ্ব জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের দিনটিও ঠিক এভাবেই পালিত হয়েছে।
করোনাভাইরাস এবছর আমাদেরকে বুঝিয়ে দিল যে পৃথিবীতে মানব সভ্যতা টিকে থাকার জন্য পরিবেশের প্রতি যত্নশীল হওয়া কতটুকু প্রয়োজন। এই  ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এর জন্য অনেক জায়গাতেই পরিবেশ তার নিজের অবস্থায় ফিরে আসছে বলে অনেকে নামি-দামি লোকেরাই মন্তব্য করছেনতবে আমার মনে হচ্ছে, করোনা কালীন সময়েও কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা পরিবেশ দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।  নিজেদের সুরক্ষার জন্য আমরা মাস্ক ব্যবহার করছি, হ্যান্ড গ্লোবসও ব্যবহার করছিব্যবহারশেষে সেগুলো ছুড়ে ফেলে দিচ্ছি এখানে ওখানে যত্র তত্র। এইদিকটাতে  বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই নিয়ম মানা হচ্ছে না। কোন কোন দেশে নীতি নির্দেশিকা থাকলেও, সেভাবে সেটা দেখভাল করা হচ্ছে না।  এতে করে পরিবেশ, বিশেষ করে জলজ পরিবেশ হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। তাই বলছিলাম, এই পরিবেশ দিবসে বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে আমাদের পরিবেশের প্রতি আরও যত্নশীল হতে হবে, পরিবেশের ভারসাম্য যাতে নষ্ট না হয় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।


সম্ভাবনা-র শনবিল



।। পার্থঙ্কর চৌধুরী ।।

এশিয়া মহাদেশের অন্যতম বৃহত্তম বিল, শনবিল বরাকবাসীর অনেকের কাছেই এ তথ্য অজানা যেমনটা অজানা বাওয়া বিলবা বরাক নদীর বুকে থাকাখৈরাকপা-ইরেলনামের ক্ষুদ্রতম নদী দ্বীপ দীপর-বিলবা মণিপুরের  ‘লোকতাক’-এর নাম যেভাবে মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায়, তাদের বিপরীতে বাওয়া বিল’-এর নাম কজন জানেন? বরাক উপত্যকার কোথায় রয়েছে বলতে পারবেন? পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম নদী-দ্বীপ সবাই জানেন, উমানন্দ তার চাইতেও ক্ষুদ্র নদী-দ্বীপ যে এই বরাকের বুকেই রয়েছে, সেটা কি কোনদিন প্রচারের আলো  পেয়েছে?
আমাজন অরন্যের দাবানল নিঃসন্দেহে অনভিপ্রেত কিন্তু এ নিয়ে তাবড় তাবড় বিজ্ঞ-জনের হোয়াটস-এপ আর মুখবই-এ আক্ষেপ আর দুঃখের বহিরপ্রকাশের মধ্যে পরিবেশ সংরক্ষনের প্রতি আন্তরিকতা কতটুকু রয়েছে, সেটা যথারীতি গবেষণা  না করে বলা অসম্ভব কথাগুলো প্রাসঙ্গিক এই কারনেই যে, অনাদরে আর অবহেলায় উজাড় হয়ে যেতে বসা উপত্যকার বনজ সম্পদের প্রতি আমাদের সংবেদনশীলতা অনেক টা মৎস্যের মায়ের পুত্রশোকের মতই !
চারপাশের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি বিশাল প্রতিশ্রুতি সম্পন্ন অনেক মানবিক প্রতিভাই প্রায়শঃই দেখা যায় বিকাশের অভাবে অন্ধকারের গেঁড়াকলে পড়ে থিতিয়ে যেতে ! উত্তর পূর্বের অনান্য জলভুমির মত শনবিল ঐ ভাবে প্রচারের আলোয় আসে নি! রামকৃষ্ণনগর হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষক হিসেবে চাকরি করার সুবাদে বর্তমানের আসাম বিস্ববিদ্যালয়ের জীব-বিজ্ঞানের অধ্যাপক ডঃ দেবাশিস কর প্রায় চার দশক আগে শনবিলের মাছ ও মৎস্যজীবীদের জীবন ও জীবিকা নিয়ে গবেষণা করে পি এইচ ডি ডিগ্রী পেয়েছিলেন, গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রামকৃষ্ণনগরে বসতবাড়ি থাকার সুবাদে ঐ বিভাগেরই অপর এক শিক্ষক, অধ্যাপক মানবেন্দ্র দত্ত চৌধুরী শনবিল এলাকার সর্বাঙ্গীণ উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট চেষ্টাচরিত্র করেছিলেন যদিও, তৎকালীন সরকারের ঔদাসিন্যতায় সে প্রচেষ্টা দু দশক ধরে ফাইল চাপাই থেকে গেছে !
সিংলা নদী শনবিলবাসীদের কাছে আশীর্বাদ এবং অভিশাপ, দুটোই এই নদী বৃষ্টির মরশুমে  গোটা মিজোরামের পাহাড়ি এলাকা থেকে জল এই সিংলা নদীর অববাহিকা দিয়ে এসে পড়ে শনবিলকে স্ফীত করে তোলে বিশাল পরিমান এই জলরাশির বেরিয়ে যাওয়ার একটাই পথ, কচুয়া নামক সরু একটা নদী, যার জল শোষে নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত ফলে ফি বছর বর্ষাকালে শনবিল ফুলে ফেঁপে ওঠে ভ্রমনপিপাসুদের আগমনের জন্য তাই বর্ষাকালটাই মোক্ষম সময় মে থেকে জুলাই-আগস্ট মাস
এ বছর গ্রীষ্মের এক দুপরে (৩রা আগস্ট, ২০১৯) বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, জৈব-প্রযুক্তি এবং জীবাণু-বিজ্ঞান বিভাগের প্রায় শখানেক শিক্ষক-গবেষক- ছাত্রছাত্রী মিলেল্যাব-টু-ল্যান্ডঅর্থাৎ সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দাদের হাল-হকিকত  অনুধাবন করার উদ্দেশ্যে একদিনের সফরে হাজির হয়েছিলাম স্থানিয়দের সঙ্গে কথা বলে তাদের রোজনামচার দুঃখের পাঁচালী শুনে সত্যি সত্যিই করুণ অনুভুতি জেগে উঠে দশকের পর দশক ধরে শনবিলবাসীরা যে স্বপ্নের ফেরিওয়ালার অপেক্ষায়, সেই ফেরিওয়ালার দেখা আজ অবধি মেলে নি! ইতিমধ্যে যদিও একদিকে ইতিহাসের অনেক পালাবদল হয়েছে আর হচ্ছে, আর ওদিকে, বছরের পর বছর  গোটা মিজোরাম থেকে ধেয়ে আসা পলিমাটি দিয়ে শনবিলের বুক দ্রুত ভরাট হচ্ছে!
এবারের সফরে গিয়ে একটা খবর পেয়ে মনটা বিষণ্ণ হয়ে  উঠল শীতের মরশুমে  সাময়িককালের  জন্য প্রচুর রকমের পরিযায়ী পাখি এই শনবিলে এসে কাটায় একাংশ দুষ্ট চক্র বিশাল জাল পেতে এই পাখিদের শিকার করে উদ্দেশ্য একটাই, ‘বুশ-মিট আশপাশের স্থায়ী বাসিন্দা এবং বরাক উপত্যকার কমিশনার তথা বিখ্যাত সংরক্ষণবিদ ডঃ আনোয়ার উদ্দিন চৌধুরীর কাছ থেকে জানা গেল, বেশ কয়েক বার এদের বিরুদ্ধে তিনি পদক্ষেপ নিয়েছেন, কিন্তু আড়ালে আবডালে প্রতি বছরই ঐ দুষ্ট চক্র তা করে আসছে
বিস্তর এলাকা নিয়ে শনবিল-রাতাবিল এলাকা নগেন্দ্রনগর, গোপিকানগর, অর্জুননগর, ভৈরবনগর, বসন্তপুর, শান্তিপুর, শ্রীরামপুর, বাংলাটিল্লা, শৈল নগর, বাগান টিল্লা, ফাকুয়া ছাড়াও আশে পাশের অনেক গ্রাম রয়েছে এই শনবিল এলাকা ঘিরে  দীর্ঘদিন থেকে এলাকায় বাস করে আসছেন যদিও  কিন্তু এলাকার বাসিন্দাদের অধিকাংশদেরই বাস সরকারি জমির উপর ভোটার তালিকায় নাম থাকলেও নিজেদের নামে দাগ-পাট্টা অধিকাংশেরই নেই যে কোনও মুহূর্তে সরকারি উচ্ছেদের শিকার হওয়ার আশঙ্কাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না! গোটা এলাকায় বসবাসকারীদের অধিকাংশই কৈবর্ত মৎস্যজীবী শনবিলবাসীদের জীবিকা দুরকমের, এবং তা মরশুম নির্ভর বর্ষা আসার আগে আগে বোরো ধানের চাষ, এবং বর্ষার পরপরই মাছ ধরা অনেক বছর এরকমও হয়, ক্ষেত ভর্তি পাকা সোনালি ধান, যাওয়ায় কথা ছিল, কৃষকের গোলায়, সিংলা নদীর বদান্যতায় পড়ে থাকে বিশ বাঁও জলের তলায়! স্থানিয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এ বছর বৃষ্টি কম হওয়ার দরুন মাছ কম মেলছে   অন্যান্য বছর এ মরশুমে শনবিলের মাছ স্থানীয় বাজারে বিপুল চাহিদার যোগান দেয়, কিন্তু এ বছর তা হচ্ছে না ওদের একজন বললেন, যেভাবে কাঠফাটা রোদ ঝরছে, তাতে আশঙ্কা করছেন যে কার্ত্তিক মাসের আগেই গোটা বিলটা শুকিয়ে খাঁ খাঁ হয়ে যাবে 
মোকাম কালীবাড়ি শনবিলের মাঝে থাকা বেশ পুরনো যৌথ-ধর্মস্থান দুটি ধর্মাবলম্বী লোকেদের সহাবস্থানে গড়ে ওঠা অপূর্ব প্রতীকী পীঠস্থান বছর কয়েক আগে করিমগঞ্জ জেলাশাসকের উদ্যোগে বেশ সুন্দর একটি অতিথিশালা নির্মিত হয়েছে ছোট খাট ভ্রমন পিপাসুর যে কোনও দলের অনায়াসে দু-চার নিশি যাপনের সুবন্দোবস্ত সেখানে করা রয়েছে  তবে সাথে করে খাবার এবং আনুসঙ্গিক সামগ্রী নিয়ে যাওয়াটা আবশ্যক
সংরক্ষনবিদরা প্রচুর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন যদিও, কিন্তু সরকারি প্রত্যাহবান এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত এবং অতি শিগগিরই আবশ্যক প্রতি বছর শনবিল থেকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ রাজস্ব পাচ্ছেন কোটি কোটি টাকা সুপরিকল্পিত সরকারি পদক্ষেপে এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন একদিকে যেমন সম্ভব, অন্যদিকে শনবিলের পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনাটাকে সার্থক রূপ দেওয়া হলে, সরকারের রাজস্ব যে হাজার গুন বৃদ্ধি পাবে, সেটা হলফ করে বলা যায় সেদিনটার সফরের বিকেলে উপেক্ষিত শনবিলের সূর্যাস্ত ক্যামেরাবন্দি করতে গিয়ে মনে হল সে যেন  উপেক্ষিত!  কেমন যেন এক বিষণ্ণতার প্রতীক বহন করছে !  
সামুহিক প্রচেষ্টায় এই বিষণ্ণতাকে প্রকৃতির বিরল এবং সুন্দরতম রূপের রুপান্তরিকরন প্রক্রিয়া সরকারি পদক্ষেপে অতি সত্বরই হয়ে উঠতে পারে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এমনটা ভাবা কি নিছক অমুলক?  


অধ্যাপক,
বাস্তু  পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগআসাম বিশ্ববিদ্যালয়শিলচর। 
মুঠোফোন - ৯৪৩৫০৭৮২৯৬

বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২০

শৃঙ্খলিত এক কবি

॥ অর্পিতা আচার্য ॥

৯৪০ সালের ৩রা নভেম্বর অন্ধ্রপ্রদেশের ওয়ারাঙ্গাল জেলায় তিনি জন্ম নেন । একটি ছোট্ট গ্রাম পেণ্ডিওয়ালায়। তেলেগু সাহিত্যের প্রখ্যাত সমালোচক , কবি সাংবাদিক ও নাগরিক অধিকার কর্মী ভারভারা রাও। ১৯৫৭ সাল থেকে কবিতা লিখছেন । প্রথম কবিতার বই ১৯৬৮ সালে প্রকাশ হয়, নাম 'চালি নেগালু ' (ক্যাম্প ফায়ার) । অর্ধ শতক ধরে লিখে গেছেন কবিতা । শেষ বই 'বীজ ভূমি' বেরোয় ২০১৪ সালে। তেলেগু ভাষার প্রখ্যাত পত্রিকা 'স্রুজন'এর প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক তিনি। দীর্ঘ দিন ধরে কারান্তরীণ এই কবি গত ২৯শে মে অসুস্থ হয়ে অচেতন হয়ে পড়লে তাকে মুম্বাইয়ের জে জে হসপিটালে স্থানান্তরিত করা হয় । গত পয়লা জুন একটু সুস্থ হয়ে উঠলে এই অশীতিপর কবিকে পুনরায় নবি মুম্বাইয়ের তালোজা সেন্ট্রাল জেলে পাঠানো হয় । কোভিড নাইনটিন এর এই প্রকোপের সময় তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবার ,বারবারই আবেদন জানাচ্ছেন মুক্তির । বিষয়টি আদালত বিবেচ্য।


(C)Image-ছবি
আজ এই লেখায় তাঁর কবিতা নিয়ে সামান্য আলোচনা করতে চাই । কবিতা সবই তেলেগু ভাষায় লেখা । মূল তেলেগু থেকে ইংরেজিতে ভাষান্তর করেছেন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন লেখক। 
কে. বালাগোপাল অনূদিত 'The Butcher ' কবিতাটির বক্তব্য এক কসাইয়ের । প্রতিদিন মাংস কেটে ও রক্ত স্পর্শ করেও যার হৃদয় আন্দোলিত হয় নি, রাষ্ট্র যন্ত্রের অত্যাচারে এক তরুণের একতাল মাংসপিণ্ডে পরিণত হওয়া দেহকে দেখে তার হৃদয় সংকুচিত হয়ে উঠেছিল ঘৃণায় ।






'আমার এই হাত দিয়ে রোজ পশু হত্যা করি
রক্ত আমার হৃদয়কে স্পর্শ করেনি কোনদিন 
কিন্তু সেই দিন রক্ত রাজপথে গড়িয়ে পড়ে নি
পড়েছিল আমার হৃদপিণ্ডে 
তুমি কি ধুয়ে দেবে সেই রক্ত'


বারবার রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন তিনি । বিপ্লব , আন্দোলন আর প্রতিবাদের আগুনে বারে বারে জ্বলে উঠেছে তাঁর কবিতা । পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন অগ্নিস্রাবী।


"পুলিশের হাতে ধরা বন্দুকগুলো জনগণকে রক্ষার জন্য নয়
বরং তাদের ধরে নিয়ে গুলি করবার জন্যে
অন্ধের সাদা ছড়ি 
পুলিশকে লাঠি চার্জের ফন্দি আঁটতে শেখায়
শেখায় না তাদের পথ দেখাবার রাস্তা "


আজ যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়নে পুলিশী নির্যাতনে সারা পৃথিবীতেই অসংখ্য মানুষ আহত বিধ্বস্ত , তখন এসব কবিতা বারবার প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে । সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকায় ঘটে যাওয়া পুলিশি নির্যাতনের ভয়ঙ্কর চিত্র ভাইরাল হয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে গেছে । ভারভারা রাওয়ের কবিতার ঘৃণিত চিৎকার যেন সত্য হয়ে উঠেছে অসহায় মানুষের নির্যাতনের বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর হয়ে ।


আসলে কবিতা ভারভারার কাছে আত্মপরিচয় স্থাপনের সোপান নয়, কবিতা তাঁর কাছে অস্ত্র । গণ আন্দোলনের হাতিয়ার । কবিতা তাঁর কাছে রোম্যান্টিকতার মোহময় গন্ধপুষ্প নয় , পচে যাওয়া সমাজকে ফালফালা করে দেওয়া ক্ষুর । তাঁর নেতৃত্বে তৈরি হয়েছিল বিপ্লবী লেখক সংগঠন 'বিপ্লব রচয়িতলা সংঘম' আর কবিদের সংগঠন 'থিরুগুবাতু কাভুলু' । আবার একই সঙ্গে তথাকথিত বিপ্লবী কবিদের মতো অন্দর মহলের সুখ শয্যায় বসে জ্বালাময়ী কবিতার ভাষণে আবদ্ধ থাকা এ কবির স্বভাব ছিলো না । সারা অন্ধ্র প্রদেশের আনাচে কানাচে নিজের আদর্শকে রূপায়নের জন্য পরিভ্রমণ করেছেন তিনি । মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আদর্শে কবিতা লিখেছেন,


'মানুষের মৃত্যু আমাকে বিচলিত করে
হয়তো বলবে সে তো অমর হল
তারা হয়ে ফুটবে 
তবু মানুষের মৃত্যুর অর্থ তো মনুষ্যত্বেরও দুর্দশা'


তথাকথিত ছদ্ম বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে তীব্র পরিহাস ছুঁড়ে দিয়েছেন তিনি তাঁর 'মেধা ' কবিতায় । বিপ্লবের নামে যারা ঠাণ্ডা ঘরে বসে ' সৃষ্টিশীল ভাবে রূপক মিছিল ' সাজায় , যারা 'ধনীদের বিয়েশাদিওয়ালা বাড়িগুলিতে' জেলখানায় কাটায়, যারা সাংবাদিক বৈঠকে জেল ভরার ডাক দেয় অথচ প্রকৃত শোষিতদের ছিটকে দেয় পূতিগন্ধময় নরকে, তাঁদের বিদ্রূপ করে তিনি লিখেছেন,


' আমরা জন্মাই
মৃত্যুতে বিলীন হয়ে যাই
দারিদ্রে, দারিদ্রের কারণে 
তুমি অবতীর্ণ হও
ধর্মের সংকটে
কাজ শেষ হলে 
ত্যাগ কর অপ্রয়োজনীয় অবতার 
তুমি তো সেই সূত্রধার
তুমি ভাগ্যবান 
তুমি মেধার আকর '




জেলে বসে অনুবাদ করেছেন কেনিয়ার সাহিত্যিক নগুগি ওয়াথিংগোর লেখা 'উপন্যাস ডেভিল অন দ্য ক্রস ' ও ' জেল ডায়েরি ডিটেইনড ' । নিজের কারাবাস জীবনের 'রোজনামচা ক্যাপটিভ ইমাজিনেশান'(সহচরলু) লিখেছেন জেলে বসেই ।
জীবনের দীর্ঘ সময়ই তো তাঁর অতিবাহিত হয়েছে জেলে। কিন্তু এর মধ্যেও কখনো চির খায়নি আত্মবিশ্বাসে । নিজস্ব আদর্শে অবিচল কবি সবসময়ই স্বপ্ন দেখে গেছেন আগত সকালের । ক্ষুধা দগ্ধ অসভ্য দেশ পেরিয়ে কোন একদিন থৈ থৈ সকালে উপনীত হবে পৃথিবী, এই স্বপ্ন থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি তাকে তাঁর বাস্তব জীবনের সংগ্রাম । তাই লিখেছেন:


'যে দীর্ঘ সেতু পার হয়ে 
তুমি হেটে চলেছো
আসলে তা একটা বাঁকা তলোয়ার
শুরুটা যার এই ক্ষুধা দগ্ধ অসভ্য দেশ
শেষটা যত দূরই হোক 
ওই নির্ভার থৈ থৈ সকালের দিকে'


(শুধু সামনে পিছনে কিছু নেই, অনুবাদ: সুজিত দাশ)


তাঁর কবিতার মান কবিতা উত্তীর্ণতাকে ছুঁতে পেরেছে কিনা, এ নিয়ে প্রশ্ন যে ছিলো না বা নেই তা নয় । আসলে কাব্য নির্মিতির ছক বাঁধা পথে হাঁটেননি তিনি । কবিতাকে সব সময়ই দেখেছেন এক হাতিয়ার হিসাবে , সংগ্রামের হাতিয়ার, যুদ্ধের শস্ত্র । নির্মেদ ধারালো অস্ত্রের মতো সে সব কবিতা তথাকথিত অর্থে কবিতা না হয়ে ভাষ্য হয়ে উঠেছে মাঝে মাঝেই । এখানেই তাঁর কবিতার উত্তরণও । নিছক কাব্যের বাইরে এসব কবিতা হয়ে উঠেছে আক্রমণের ধারালো তির, বিদ্রূপের উচ্চ হাস্য বা অগ্নি স্ফুলিঙ্গ ।
কবি বিভাস রায়চৌধুরী তার কবিতায় ভারভারা রাওকে নিয়ে লিখেছেন :


' ভার ভারা , আপনার কবিতা পড়েছি 
কবিতা কোথায়? দূর!
রাজনীতি করেছেন শুধু !
জঙ্গলে জঙ্গলে অস্ত্রে 'হ্যাঁ' বলা কি ঠিক?
কবি নন , কবি নন ...সাচ্চা দেশদ্রোহী...


এক কথায় কবির অধিক!'


তাই, এককথায় তিনি ' কবির অধিক ' । তাঁর কবিতা তাই কবিতার কিছু বেশি , এক চারণ কবির গান , যে কবি শ্বাস ফেলছেন জনতার মাঝখানে । তাঁর কবিতার অনুবাদ করেছেন কবি শঙ্খ ঘোষ । এই অনুবাদের অংশ বিশেষ দিয়ে শেষ করব এই লেখা :


'গান যখন হয়ে ওঠে যুদ্ধেরই শস্ত্র 
কবিকে তখন ভয় পায় ওরা
কয়েদ করে তাকে , আর 
গর্দানে আরো শক্তি করে জড়িয়ে দেয় দাস 
কিন্তু তারই মধ্যে কবি তার সুর নিয়ে 
শ্বাস ফেলছেন জনতার মাঝখানে' 


আরো বেশি দেরি হওয়ার আগে - এ গান ছড়িয়ে পড়ুক পৃথিবীর জেগে থাকা মানবতার যাত্রাপথে ।