“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

বুধবার, ১৯ জুন, ২০১৩

আমি ছুঁয়ে নেব তোমার হৃদয়


আমি ছুঁয়ে নেব তোমার হৃদয়...
পংক্তির পর পংক্তি সাজিয়ে
আমার অপ্রাপ্তির কথামালা
আন্তর্জালে ছড়িয়ে দেব
নীরব চিৎকার যেমন হয়।
পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে
পৌঁছে যাবে বেদনার ঢেউ
বৈদ্যুতিন সঙ্কেতে দ্রুত
তোমার চোখের মণি হয়ে
আমি ছুঁয়ে নেব তোমার হৃদয়।

সোমবার, ১০ জুন, ২০১৩

কবি রণজিৎ দাশের পরিচয়ে আজ আমাদেরও ‘আত্মপরিচয়’


(লেখাটি ১০ জুন, ২০১৩ তারিখে দৈনিক যুগশঙ্খে বেরিয়েছে)
হঠাৎই মানসপটে ভেসে উঠলো উত্তর-পূর্বের এক অন্যতম সুসন্তান প্রয়াত সুজিত চৌধুরীর করিমগঞ্জ শহরের চিত্তরঞ্জন লেনের  বাড়িতে বছর ছয়েক আগের এক ঘরোয়া আড্ডার ছবি । সেই আড্ডায় হঠাৎই সুজিতদা বলে উঠেছিলেন যে রণজিৎ দাশ তাঁর অন্যতম প্রিয় একজন কবি । সেই প্রসঙ্গে তিনি উষারঞ্জন ভট্টাচার্যকে (যিনি নিজেই সেদিন সুজিত চৌধুরীর বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন সঙ্গে ছিলেন সুলেখক মদনগোপাল গোস্বামী এবং গৌতম ভট্টাচার্য) একটা কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন যে রণজিৎ দাশের বহুপঠিত ও সমাদৃত ‘শ্মশান ছবি’ কবিতার সেই বিখ্যাত পঙক্তি—“মায়ের মুখাগ্নি করে সন্তানের অকৃতজ্ঞ হাত” মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আর কোন বিখ্যাত লেখকের কোন  পঙক্তি বা কাছাকাছি কিছু মনে পড়ে কিনা । কিছুক্ষণ পরে তিনি নিজেই বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অপরাজিত’-তে অপু যখন তার মায়ের মৃত্যু সংবাদ পায়, সেই মুহূর্তে তার প্রাথমিক মানসিক প্রতিক্রিয়া কী হয়েছিল লেখক তার যে বর্ণনা দিয়েছিলেন এবং তার পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যে রণজিৎ দাশের উপর্যুক্ত পঙক্তিটির মতো বা কাছাকাছি কিছু লেখা হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে তাঁর নিজের সন্দেহ প্রকাশ করে সুজিতদা বলেছিলেন “এরকম আর কোন পঙক্তি আগামীতে বহুদিনের মাঝে বাংলা সাহিত্যে লেখা হবে কিনা সে বিষয়ে তাঁর যথেষ্ট সন্দেহ আছে । সঙ্গে আরো একটি কথা তিনি বলেছিলেন—“বল দেখি উষা, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস-সমূহের মধ্যে রণজিতের সবচেয়ে প্রিয় উপন্যাস কোনটা ?” উপস্থিত যে ক’জন ছিলেন, তাঁরা ভাবছিলেন অনেক কিছুই, কিন্তু কেউই মুখ খুলছিলেন না । কিছুক্ষণ পরে সুজিতদা নিজেই তার জবাব দিলেন “আদর্শ হিন্দু হোটেল”। সবাই খুব চমকিত হয়েছিলেন এইটুকু মনে আছে । সঙ্গে আরো একটি কথা বলেছিলেন যে তাঁর মতে এই মুহূর্তে বাংলার শ্রেষ্ঠ কবি রণজিৎ দাশ । পরে কোলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘কবিসম্মেলন’ কবিতা পত্রিকায় কবি এবং কবিতা নিয়ে লেখা একটি ধারাবাহিকে দেখেছি লেখক লিখছেন যে “কবি রণজিৎ দাশ এই মুহূর্তে বাংলা কবিতার অহঙ্কার” ।          

    আমাদের অতি প্রিয় আরেকজন কবি আগরতলাবাসী প্রবুদ্ধসুন্দর করের কাছ থেকে ফোনে যখন খবর এলো যে কবি রণজিৎ দে'জ প্রকাশিত 'রণজিৎ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা'র জন্যে  'রবীন্দ্র পুরষ্কার -২০১৩' পাচ্ছেন, তখন আচমকা মনে হচ্ছিল যে সমস্ত জাগতিক ঝুট-ঝামেলা-কূট-কচালির হাত থেকে মুক্তি পেয়ে আমরা সবাই শুধুই যেন শুধুই রণজিৎ দাশের কবিতার বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছি আর সেই সঙ্গে মনে হচ্ছিল যে এতো শুধু কবি রণজিৎ দাশের সম্মান নয়, তাঁর সঙ্গে বরাক-ব্রহ্মপুত্র-গোমতীর সন্তানরাও এই সম্মানের সমান ভাগীদার ।     

                কবি রণজিৎ দাশের রবীন্দ্র পুরস্কার প্রাপ্তিতে গত ৩১ মে, শুক্রবার সন্ধ্যায় বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি সমাজ, গুয়াহাটি  আয়োজিত এক বৈঠকে আনন্দ প্রকাশ করে বিভিন্ন আলোচক কবিকে অভিনন্দন করেন । বৈঠকটিতে সভাপতিত্ব করেন বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি সমাজ-এর কার্যকরী সভাপতি গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় ।  

              ২০০৬ সনের ডিসেম্বর মাসের শেষে দ্বিতীয় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলনের কালে প্রধান অতিথিরূপে উত্তর-পূর্বের গৌরব কবি রণজিৎ দাশ সস্ত্রীক গুয়াহাটিতে এসেছিলেন । আগের থেকে যোগাযোগ থাকলেও তখন থেকেই এখানকার কবি-সাহিত্যিক-পাঠককূলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দৃঢ়তর হয়ে ওঠে । রণজিতের গৌরবে স্বাভাবিকভাবেই সকলে উদ্দীপ্ত । 

               অভিনন্দন সভা শুরু হয় রণজিৎ দাশের  কয়েকটি কবিতা আবৃত্তির মধ্য দিয়ে । গৌতম ভট্টাচার্য অতি সম্প্রতি প্রকাশিত গুয়াহাটির কাগজ নাইনথ কলামের ১০ম সংখ্যা 'দেশভাগ-দেশত্যাগ--প্রসঙ্গ উত্তর পূর্ব ভারত'-এ প্রকাশিত কবি রণজিৎ দাশের কবিতা ‘আত্মপরিচয়’ আবৃত্তি করেন । এছাড়াও ‘ক্ষত’, ‘শ্মশান ছবি’, ‘বাবুই ঘাসের ন্যূনতম দাম’, ‘পূর্বজ বন্দনা’ এবং ‘এক উন্মাদিনীর কথা’ শীর্ষক একটি গদ্য-কবিতা আবৃত্তি করে শোনান ।     

              কবি রণজিৎ দাশ ও তাঁর কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে উষারঞ্জন ভট্টাচার্য গত শারদ সংখ্যা ‘ব্যতিক্রম’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁরই লেখা ‘সূরি-সমাচার’ নামক নিবন্ধের অংশ বিশেষ পাঠ করে মেধাবী কবি রণজিৎ দাশের অধ্যয়ন ও সূক্ষ্ম জিজ্ঞাসার একটি অনবদ্য পরিচয় তুলে ধরেন । এক যথার্থ আধুনিকতা-মনস্ক কবি রণজিৎ দাশের রবীন্দ্র অধ্যয়নের বিস্তার ও গভীরতার দিকটি উষারঞ্জনের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে । তিনি বলেন, কবি  রণজিতের এই সম্মান প্রাপ্তি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উদীয়মান সাহিত্যিকদের প্রবলভাবে উদবোধিত করবে । মহানগরের মহাশান্তির সঙ্গে আমাদের মতো প্রান্তবাসীদের এক প্রচ্ছন্ন লড়াই হয়তো বা লেগেই আছে । আজকে আমরা সবাই সেক্ষেত্রে রণজিৎ হয়েছি ।     

                এবার কবি সঞ্জয় চক্রবর্তী আস্তে আস্তে আলোচনায় ডুকে পড়লেন রণজিৎ দাশের বেশ কয়েকটি কবিতা পাঠের মধ্য দিয়ে । এরপর সেইসব কবিতাগুলিকে কেন্দ্র করে তাঁর বিস্তারিত বক্তব্য ডালপালা মেলে দেয় । তাঁর মতে, বিষয় নির্বাচন থেকে শুরু করে প্রকাশভঙ্গিতে রণজিৎ যে অসামান্য কাব্যরীতি আয়ত্ত করেছেন, সে বোধহয় শুধু তাঁর ক্ষেত্রেই সম্ভব । কাব্যসুরের বিচিত্র এই গায়ন-পদ্ধতির তুলকালাম রোমান্টিক অভিধার জন্যই বোধহয় আজ তিনি কবিদেরও কবি আবার একই সঙ্গে জনসাধারণেরও কবি । যে কথাগুলোর সঙ্গে আমরা বাল্যকাল থকেই অভিন্নভাবে জড়িত, সেই কথাগুলোকে পুনরাবিষ্কার করে তিনি এমন এক উচ্চারণ দিয়েছেন, যা শুধু তিনিই দিতে পারেন । ‘বিনাপ্রেমে নাহি দিব সূচ্যগ্র শরীর’ অথবা ‘সংসার সুখের হয় রমণের গুণে’—কোথাও একটু কেঁপে যাওয়া নেই, একেবারে সুসংবদ্ধ সত্য এবং দৃঢ় উচ্চারণ । একেবারে বুকে লাগা শব্দশর । একই সঙ্গে রণজিৎ দাশ আবার সাংঘাতিক রোম্যান্টিক কবি । তাঁর ভাবজগতে সুন্দর এসেছে অন্যতর সুন্দর হয়ে । কবিতায় একাধারে তিনি সৎ এবং সাহসী । অনেকসময় আমরা সত্যকে দৃঢ়ভাবে উচ্চারণ করতে গিয়ে সোজা কথাকে কাব্যিক সুষমা ও ব্যঞ্জনা দিয়ে অযথা আড়াল করবার চেষ্টা করি, কিন্তু রণজিৎ দাশ তাঁর নিজের কাব্যজগৎকে এর বিপরীতে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করান অথচ এই উচ্চারণ একই সঙ্গে ভীষণ কাব্যময় এবং দ্যুতিময় । এই প্রখর অন্তর্দৃষ্টি ও ভাবজগতের দিকে তাকিয়ে থাকলে বিস্মিত হতে হয় । অনেক মনখারাপের রাতে রণজিৎ দাশের কবিতা তাই আমাদের কাছে এক দুর্মর আনন্দময় উড়ান হয়ে ওঠে।

               কবিতার সঙ্গে আমাদের আরেক বন্ধু রজতকান্তি দাশের সম্পর্ক বেশ কিছুদিন ধরেই অত্যন্ত ক্ষীণ, তাই সসঙ্কোচে আলোচনায়  ঢুকে গিয়ে বলেন যে রণজিৎ দাশের কবিতারাজির সঙ্গে  যদিও তাঁর যথেষ্ট পরিচয় ঘটেনি কিন্তু তাঁর সঙ্গে কবির একান্ত আলাপচারিতার সুযোগ ঘটেছিল ২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসের একেবারে শেষের দিকে । কবির সস্ত্রীক শিলং ভ্রমণের সঙ্গী হয়েছিলেন রজতকান্তি । রজত তাঁর নিজের লেখা একটি বিজ্ঞান-বিষয় বই কবিকে এর দুদিন আগে পড়তে দিয়েছিলেন । রজতের আশা ছিলনা যে তিনি বইটি মনযোগ দিয়ে পড়বেন । আর যদিওবা পড়েন তবে হয়তো কোলকাতা গিয়ে উল্টেপাল্টে দেখবেন, এবং যেহেতু বইটির বিষয়বস্তু কবিতার আশেপাশের নয় তাই বইটির স্থান হবে অযত্নে-অবহেলায় ঘরের কোন এক কোণে । কিন্তু বিস্মিত রজত আবিষ্কার করেন যে রণজিৎ দাশ এরই মধ্যে খুঁটিয়ে শুধু বইটি পড়েই ক্ষান্ত হননি, সেই যাত্রায় বইটির বিষয়বস্তু এবং লেখনশৈলী নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন । সেই সঙ্গে বিজ্ঞান-বিষয়ক প্রবন্ধ কীভাবে লিখতে হয় সেই বিষয়ে কিছু উপদেশও দিয়েছিলেন, রজতকান্তির স্বীকারোক্তিতে পরবর্তীকালে সেই উপদেশরাজি লেখালেখির ক্ষেত্রে রজতকান্তির খুব কাজে এসেছিলো । কথায় কথায় কবি রজতকে তাঁর নিজের অত্যন্ত একটি প্রিয় বই সুব্রমনিয়ম চন্দ্রশেখরের লেখা ‘Truth and Beauty, Aesthetics and Motivations in Science’  পড়তে বলেছিলেন । রজতকান্তির হিসাবে কবি রণজিৎ দাশ এই ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যথার্থ উত্তরসূরি কারণ রবীন্দ্র-মানসও বিজ্ঞান ভাবনা থেকে মুক্ত ছিলনা কখনও । সেই হিসাবে কবি রণজিৎ দাশও সেই পথেরই পথিক, কবি হিসাবে যে পথের পথিকৃৎ ছিলেন কবীন্দ্র রবীন্দ্র স্বয়ং ।          

               এরই মাঝে মাঝে আলোচনায় ঢুকে পড়ছিলেন কখনো নিশুতি মজুমদার, কখনো বা  গীতেশ দাস । কোন এক ফাঁকে প্রসূণ বর্মণের মুচকি হাসিও আলোচনায় অন্য মাত্রা নিয়ে আসছিলো আবার কখনও জয়ন্তলাল দাশগুপ্ত তাঁর মুখ বাড়িয়ে দিচ্ছেলেন আর এভাবেই বৈঠক জমে গিয়েছিলো । বৈঠকে স্থির হয় সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সৌমেন ভারতীয়া কবি রণজিৎ দাশকে সংস্থায় উপস্থিত লেখকদের তরফ থেকে একটি অভিনন্দন পত্র প্রেরণ করবেন ।    

               তুমুল বৈঠকী আড্ডার শেষে এবার বাড়ি ফেরার পালা । সবারই মনে গুঞ্জরণ তুলছিলো কবি রণজিৎ দাশের কবিতার কোন না কোন পঙক্তি । মনে পড়ে যাচ্ছিলো কবির সম্পর্কে কিছু পড়া এবং অনেক শোনার টুকরো টুকরো কথা, বিশেষ করে শিলচরের অতন্দ্র গোষ্ঠীর কথা, একদা তাঁর কৈশোরে যে গোষ্ঠীর কনিষ্ঠতম সদস্য ছিলেন আজকের কবি রণজিৎ দাশ । সঙ্গে অগ্রজ, বন্ধু এবং এবং পথপ্রদর্শক-অভিভাবক হিসাবে পেয়েছিলেন বরাক উপত্যকার আর এক স্বনামধন্য শক্তিমান কবি প্রয়াত শক্তিপদ ব্রহ্মচারীকে । সেই টুকরো কথাগুলোকে কুড়িয়ে মালা গাঁথতে গাঁথতে হঠাৎই একসময় নিজেকে আবিষ্কার করি নিজের বাড়ির কলিং বেলে হাত রেখে  দাঁড়িয়ে রয়েছি ।      

গৌতম ভট্টাচার্য

০৬ জুন ২০১৩

সাগরকন্যা


এক সাগর কন্যার সাথে আজ দেখা। নীল চোখ। লালচে গাল আর সবুজ শাড়ী। নাম তার রাই।

আমি আমার বাসর ঘরে তাকে দেখেছি। আমার প্রথম কৈশোরে তাকে আঁকড়ে ধরেছি বহুবার ভয় পেয়ে।

আমি যৌবনে তার কাছে একটা সকাল চেয়েছি। সারারাতের ক্লান্তি শেষে বাঁশের বেড়া দিয়ে উঁকি মারা সূর্যালোক থেকে তাকে বাঁচাতে কম্বল মুড়ি দিয়েছি তার এলোমেলো সুডৌল পায়ের হলদে রঙে।

'নাইন ও ক্লক' ফুলের কাছে বলেছি আজ তুমি প্রস্ফুটিত হবে না। ওর ঘুম ভেঙ্গে যাবে।
আমি লজ্জাবতি লতাদের বিছিয়ে রেখেছি ওর আসা যাওয়ার পথে। কাঁটা ফুঁটুক, রক্তাক্ত হোক তার পায়ের পাতা, তবু জানবো কোন পথে সে চলেছে রাত্তির শেষে সমুদ্র ফেনায় নিজেকে আহত করতে।
এক পালহীন নৌকোর সাথে সঙ্গম করেছি। একটাই কারন ছিল, তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া সেই মাঝ সমুদ্রে।

এরপর জগন্নাথ মন্দিরে এসে ধ্বজা উড়িয়ে অনভস্ত পায়ে নেমে আসবো সূর্য মন্দিরের সবচেয়ে উঁচু চূড়া থেকে পুরীর সমুদ্রে। জন্ম সুত্রে আমি শূদ্র নই। আমি ব্রাহ্মণ ও নই। আমি নাম গোত্রহীন এক অকাল সন্তান।

১৯শে শ্রাবনের মাসে বৃষ্টি ছিল বলে আমি আকাশ দেখতে পারিনি। সূর্যের রাগ আমি বুঝিনি।
সমুদ্রকন্যার কাছে তবুও আমি শেষ রাত্তির।

এক সাগর কন্যার সাথে আজ আমার দেখা। যে চেয়েছিল, আজ আমার মৃত্যু হোক, সে আমায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সমুদ্র সৈকতে। এরপর সিক্ত বসন ছাড়িয়ে, সারারাত সংগ্রহ করবে আমার সফেদ রক্ত।
যা সংরক্ষিত হবে কোন গবেষণাগারে।
এরপর সে মা হবে। এবং ফিরে আসবে পৃথিবীতে অথবা আমার পাহাড়ে।

একটা নতুন ছোট পাহাড়ে অকারনেই পড়বে চাঁদের আলো শেষ রাত্তিরের।

খেলা



যে তোকে ভয় পায়,
সে আমি নই।
তাই তো দামিনীর চপলতা হয়ে জেগে উঠি বারবার,
তোরই বুকের গভীরে।
ভয় মানে যদি হয় রুদ্রের জটাজাল,
কুলুকুলু গঙ্গা হয়ে বয়ে চলি,
সাগরের টানে।
অথবা চাঁদের মতন ঝলসে উঠি ,
আঁধারের দিনগুনা শেষে।
আসলে তোর আমার এই খেলা চিরদিনের,
জন্ম জন্মান্তরের,
তবু জয় আমারই ,
কারণ আমি বেঁচে থাকি,
এই খেলাকে আঁকড়ে ধরে ।

রবিবার, ৯ জুন, ২০১৩

রাইনের মারিয়া রিলকে : নবীন কবিকে লেখা চিঠি - ২

ছায়া অনুবাদঃ দেবব্রত আচার্য

© ছবি

ভিয়ারগিয়ো, 
পিসার নিকটে ( ইতালি )
এপ্রিল ৫, ১৯০৩
  

   তোমার ২৪শে ফেব্রুয়ারি লিখা চিঠির উত্তর আজই দেয়া সম্ভব হচ্ছে । অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্বের জন্য ক্ষমা প্রার্থী । বেশ কিছুদিন থেকে শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপে কাবু হয়ে পড়েছি ।বলা যায় কার্যত আমাকে অচল করে দিয়েছে । শেষ পর্যন্ত দক্ষিণের সমুদ্র তটে হাওয়া বদলে এসে চেষ্টায় আছি শরীরটাকে একটু সুস্থ করার। আগেও এখানে একবার এসেছিলাম এমনি শরীর খারাপ নিয়ে। সেরেও উঠেছিলাম সে বার ।  এই অসুস্থতা হেতু ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও  বড় করে চিঠি লিখা সম্ভব হবে না। লেখাটা এই মুহূর্তে বেশ কষ্টকর কাজ আমার জন্য।

      তোমার প্রতিটি চিঠি যেমনি আমাকে আমোদিত করে, তেমনি আমার উওর গুলো পড়তে পড়তে তুমিও নিশ্চয় হারিয়ে যাও । হয়ত বা তোমাকে কখন কখন সেগুলো নিরাশ করে। সত্যি বলতে কি জীবনের সবচেয়ে সুগভীর বিষয়গুলোতে আমরা সবাই ভীষণ রকমের একা। অনেক কিছু ঘটে যাওয়ার পর, অনেক পথ হেঁটে , সহস্র নক্ষত্র ঘটনার সাক্ষী হয়ে তবেই একজন মানুষ পারে অন্য এক মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দিতে। সাহায্য করতে।

তোমাকে আজ  দুটি জিনিস বলতে চাই:

 এক.

     আয়রনী : একজন সৃষ্টিশীল মানুষের জন্য এটি ক্ষতিকর হতে পারে । তোমার সৃষ্টি সত্তা কে কখনো এর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে দিও না। বিশেষ করে যখন ভালো কিছু লিখতে পারছো না; তখন আয়রনীর আশ্রয় নিতে যেওনা । অন্যদিকে যখন তুমি পুরো মাত্রায় সৃজনশীল , তখনই এটিকে ব্যাবহার করতে পারো বাচনভঙ্গি হিসেবে। যদি বিশুদ্ধতার সাথে একে ব্যবহার করা যায় তবে আয়রনীও বিশুদ্ধ হয়ে ওঠে। এতে লজ্জার কিছু নেই। যদি এর ক্রমবর্ধমান ব্যবহার তোমাকে চিন্তিত করে তুলে তবে অন্য কোন মহৎ কিংবা সিরিয়াস বিষয়ে মনোনিবেশ করো। যাতে নূতন এই বিষয়ের সামনে আয়রনীকে নিতান্তই ছোট আর অসহায় মনে হয়। বস্তুর গভীরে গিয়ে খোঁজো । তারপর ও যদি তোমার লেখায় আয়রনী থেকে যায় তা হলে ধরে নিতে হবে তোমার জীবন কে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি এর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অন্যসব মহৎ ও সিরিয়াস বিষয় নিয়ে কাজ করতে করতে হয়ত এটা থেকে মুক্ত হয়ে যাবে ( যদি এটি  সাময়িক ভাবে এসে থাকে ) । আর যদি এটি তোমার ব্যক্তি স্বতন্ত্রতার  সাথে একীভূত হয়ে থাকে তবে এটি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে ।  শিল্প-সৃষ্টির নূতন এক হাতিয়ার হিসেবে যুক্ত হবে তোমার ঝুলিতে। 


দুই.

      চারপাশের হাজারো বইয়ের ভীড়ে, কটা বই আছে যাদের ছাড়া আমার চলে না । তার মধ্যে দুটি বই আমার সাথে সব সময়ই থাকে। যেখানেই যাই না কেন, বই দুটি আমার সঙ্গে যায়। এর একটি হল বাইবেল আর  অন্যটি ডেনিশ কবি জেন্স পিটার জ্যাকবসনের লিখা। তুমি উনার  লেখা পড়েছ ? জ্যাকবসনের  লেখাগুলো খুব সহজেই তুমি সংগ্রহ করে নিতে পারবে ।  রিক্লেমস ইউনিভার্সাল লাইব্রেরি তার বেশ কটি বইয়ের সাবলীল অনুবাদ করে প্রকাশ করেছে । তার 'ছয়টি ছোটগল্প' এবং ‘নিলস লিহনি’ নামক উপন্যাসটি সংগ্রহ করে নাও । গল্পগ্রন্থের  প্রথম গল্প ‘ম্যাগনেস’ থেকে পড়া শুরু কর। গল্পটা পড়তে পড়তে তুমি হারিয়ে যাবে আশ্চর্য এক পৃথিবীতে। আনন্দময়ী এই  পৃথিবীর প্রাচুর্য আর বিশালতা তোমাকে ছুঁয়ে যাবে বার বার। কিছু সময় নিয়ে বইগুলো পড়।  যা কিছু শেখার বা আহরণ করার করে নাও। সব থেকে বড় কথা তুমি বইগুলো পড়ে আনন্দ পাবে।  তোমার জীবন যে পথেই যাক না কেন অনাগত দিনগুলোতে এই  নির্মল আনন্দ তোমার কাছে ফিরে ফিরে আসবে শতগুণে । বার  বার । এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত । এই পাঠ পরিক্রমা তোমার হাজারো  দুঃখ-বেদনা, আনন্দ-বিষাদের,  এই সব দিনরাত্রির থেকে অনেক বেশী তাৎপর্যপূর্ণ  ।

     যদি আমাকে জিজ্ঞেস করা হয় আমি এই অনন্ত নিঃসঙ্গ নির্মাণের দীক্ষা পেয়েছি কোথায় ? উত্তরে আমি দুটি মাত্র নাম বলব, একজন এই কবি জ্যাকবসন আর অন্যজন অগাস্টি র‌্যদাঁ, সেই অনন্য ভাস্কর, সমসাময়িক শিল্পীদের মাঝে যিনি প্রবাদ প্রতিম।

তোমার  এই পথচলা  সফল হোক।
                                                                    
তোমারই,                                                         
রাইনের মারিয়া রিলকে

বৃহস্পতিবার, ৬ জুন, ২০১৩

অনন্তশয্যা


শীর্ণ চাঁদের শরীর থেকে উপচে পড়া আলোর
কাছে তোমার মৃত্যু ভিক্ষা করি আমি।
বনকুমারী দেবীর কাছে
ভিক্ষে করি একটা আস্ত সবুজ পাহাড়।

যে পাহাড়ের শরীর তোমায়
দেবে এক অনন্তশয্যা ফুলের গোছা

এরপর নামহীন, গোত্রহীন এক পুরুষ
তোমার কাছে ভিক্ষে চাইবে, হারিয়ে যাওয়া
পাহাড়ী নদীর তীরে গড়ে ওঠা সভ্যতার ইতিহাস

এরপর!
নিস্পাপ এক হৃদয় জন্ম নেবে ত্রিপিটকের পাতায়,
যাকে তুমি আগলে রেখেছ এতকাল।

সবুজ বনভূমিতে অসূর্যস্পর্শা আম্রপালি
এবং তোমার অলিগলি...
অন্তশলীলা এক নদীর ইতিহাস,
হলুদ আর লাল অনন্তশয্যা, আজ এলোমেলো।

সোমবার, ৩ জুন, ২০১৩

প্রথম কদমফুল



                  # স্মৃতি পাল নাথ # 
(c) ছবিঃPicture















গান হই না কেন ?
গান হই না কেন ,প্রথম কদম ফুল ?
আমার চোখের ভেতর হরিণ,মনের ভেতর ময়ূর
শব্দের ভেতর যে শুনশান মাঠ, নদী, নৌকা,গাছপালা,পায়ে চলার পথ
দূর ছায়াপথ,শস্যক্ষেত্র,অরণ্য,প্রান্তর
আমার শব্দের ভেতর বাবুইপাখি,আমি খড়কুটো
ফসলের গন্ধে দিগ্বিদিক স্বজনেরা,আমার আলজিভে ঘা ।
মেঘ ও বিদ্যুতে ছেয়ে আছে দূর ছায়াপথ
মেঘেরা করে কানাকানি
একফোঁটা বৃষ্টির জল হাতে দাও আমায়।
জানো,স্বপ্ন দু’ঠোঁট উল্টে অভিমান করে
জীবন্ত শিলায় আমার রাস্তাগুলো যে বদলে দিয়েছে
আমার রাস্তাগুলো দিয়ে আমি হেঁটে যাই
গুপ্তশত্রুরা যেমন লুকিয়ে থাকে
কিছু জোছনা,কিছু রোদ সব সময়ই মানুষের সঙ্গে থাকে
নিজের মধ্যে থেকে বেরিয়ে যাবার রাস্তা ।
যে সংসার বেশ্যার গলি
ভেঙে দাও প্রথা
বরবউ,জঙ্গলে ভ্রূণ
ছিঃ। জানো, ছিঃ বলতে নেই ।
বৃষ্টি হইনা কেন ?
পৃথিবীর প্রথম আগুন এই বক্ষে
তোমার গান
ভিখিরিদের শীতের উত্তাপ হয় না কেন ?
গাছ দেখলেই চিনে নিতে পারি
আমার সূক্ষ্ম ফুলগুলি কাঁপে
কারও কারও সঙ্গে কথা বললে কেমন পাথর লাগে
আমার নাম না জানা ঝর্নারা ছটফট করে,অসংখ্য নদীর জন্ম হয়
আমি ডুমুরগাছ চিনি,ডুমুরফুল চিনি ।

(২০০৫)


রবিবার, ২ জুন, ২০১৩

রাইনের মারিয়া রিলকে : নবীন কবিকে লেখা চিঠি -১


ছায়া অনুবাদ: দেবব্রত আচার্য 

( রাইনের মারিয়া রিলকে চিঠিগুলো লিখেছিলেন ২৭ বছর বয়সে,  এক কবি যশোপ্রার্থী ১৯ বছরের বালককে। যা Letters to a Young Poet ( মূল জার্মান নাম : Briefe an einen jungen Dichter) নামে ছাপা হয়। নিচে প্রথম চিঠিটির ছায়া অনুবাদ। এক একে বাকিগুলো ও অনুবাদ করার ইচ্ছে রইল। )

 প্যারিস,
ফেব্রুয়ারী ১৭, ১৯০৩
 প্রীতিভাজনেষু, 

        তোমার চিঠি কিছুদিন আগেই পেয়েছি। আমার ওপর তোমার আস্থার জন্য ধন্যবাদ। আমি একটি কাজ করতে পারি তোমার জন্য । তোমার কবিতাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারি । সমালোচনা করার মতো যোগ্যতা আমার নেই। সমালোচনার পরিসরে শিল্পকর্মকে খুব কমই ধরা সম্ভব হয়। এতে সৃষ্টি হয় অহেতুক ভুল বোঝাবুঝির । সব কিছুর যেমন অবয়ব দেয়া সম্ভব হয়না না তেমনি ভাষায়ও প্রকাশ করা যায় না।  এমন অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে যা প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব। এই অনির্বচনীয় অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের মনোজগতের এমন একটি স্তরে ঘটে,  যেখানে কোন ভাষা এখনও প্রবেশ করতে পারেনি। শিল্পকর্মের ক্ষেত্রে সেটি আরো বেশি করে প্রযোজ্য। এই অভিজ্ঞতাগুলোর অস্তিত্ব বেঁচে থাকে শুধু মাত্র আমাদের স্বল্পমেয়াদী  জীবনের পরিসরে।

           উপরের এই সংক্ষিপ্ত কথাগুলো কে ভূমিকায় রেখে আমি কি বলতে পারি যে তোমার কবিতায় নিজস্ব কোন  রচনা শৈলি এখনো গড়ে ওঠেনি ।যদিও এতে একান্ত নিজস্ব, সুপ্ত একটা কিছুর নীরব যাত্রা শুরু রয়েছে বলে মনে হয় । তোমার শেষ কবিতা 'আমার আত্মা'য় এ ব্যাপারটি আরো স্পষ্ট করে চোখে পড়ে। সেখানে তোমার নিজস্ব কিছু উপলব্ধি শব্দ ও ছন্দ হয়ে উঠতে চাইছে মাত্র। তোমার 'লিওপার্ডীর প্রতি' কবিতায় বিশাল এক নির্জন  সত্তার প্রতি তোমার এক রকম সংযোগের প্রকাশ ঘটেছে । কবিতা গুলো নিজেরা তেমন কিছু হয়ে ওঠেনি। স্বাধীনভাবে এরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি আপন মহিমায় । এমন কি তোমার শেষ কবিতাটি বা 'লিওপার্ডীর প্রতি' ও নয়। তোমার চিঠিতে তুমি যে ত্রুটি গুলোর কথা উল্লেখ করেছ সেগুলো পড়ার সময় আমি নিজেও বুঝতে পেরেছি। কবিতার নামগুলো এই মুহূর্তে যদিও মনে করতে পারছি না । 

              তুমি জানতে চেয়েছ কবিতাগুলো ভালো হয়েছে কিনা। আমাকে যেমনটি জিজ্ঞেস করেছ, তেমনি অন্যদেরও জিজ্ঞেস করেছ। পত্রিকায় পাঠিয়েছ কবিতাগুলো। অন্যের কবিতার সাথে তুলনা করেছ। সম্পাদকেরা তোমার কবিতা বাতিল করে দিয়েছে বলে কখনও মর্মাহত হয়েছ। এখন যখন তুমি আমার উপদেশ চাইছ তবে তোমাকে আমি একটি অনুরোধ করছি। এগুলো আর দয়া করে করনা । তুমি বাইরের দুনিয়ার দিকে তাকিয়ে আছো। এটি এক্ষুণি তোমায় এড়িয়ে চলা উচিত। এ ব্যাপারে অন্য কেউ  তোমাকে উপদেশ দিতে বা সাহায্য করতে পারবে না। কেউ না । শুধু মাত্র একটি কাজ করতে পারো। নিজের দিকে ফিরে তাকাও। যা তোমাকে বাধ্য করে লিখতে সেই কারণটি খুঁজে বের করো। খুঁজে দেখ এই কারণটি তোমার হৃদয়ের কত গভীরে শেকড় ছড়িয়েছে । নিজেকে জিজ্ঞেস করো যদি তোমার জন্য লেখালেখি নিষিদ্ধ করা হয় তবে তার জন্য প্রাণ দিতে পারবে কিনা। নিজেকে রাতের একান্ত  নির্জনতায় জিজ্ঞেস করো,  "আমাকে কি লিখতেই হবে?" নিজের গভীর সত্ত্বার  কাছে গিয়ে এর উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা করো। যদি এই ভাবগম্ভীর প্রশ্নের উওর আসে তীব্রতর চিৎকারে, "হ্যা, আমাকে লিখতেই হবে" - তাহলে নিজের জীবনকে এর জন্য তৈরি করো। জীবনের প্রতিটা মূহূর্তে  উৎসর্গ করো। নগণ্য থেকে নগণ্যতম সময়গুলোও সাক্ষী থাকুক তোমার তীব্র অন্তর্দহনের । তারপর প্রকৃতির খুব কাছে যাও। পৃথিবীর প্রথম মানুষের চোখ নিয়ে দেখ প্রকৃতিকে। বলার চেষ্টা করো , তুমি কী দেখছো, কী অনুভব করছো,  কী  ভালোবাসতে পারছো আর কীইবা হারাতে চলেছ ? 

        প্রেম বা অতি সাধারণ কোন বিষয়ে লিখতে চেষ্টা করো না। এটা খুব কঠিন কাজ । যে বিষয়গুলো নিয়ে ইতিমধ্যেই অনেক চমৎকার কাজ হয়ে গেছে, সেগুলো নিয়ে মৌলিক কিছু লিখতে গেলে প্রচণ্ড রকমের মুন্সিয়ানা চাই। যা আসতে পারে একমাত্র পরিণত হাতের ছোঁয়ায়। তাই এ বিষয়গুলো থেকে দূরে থেকো। লিখতে চেষ্টা করো তোমার দৈনন্দিন যাপিত জীবন। তোমার ছোট ছোট দুঃখ, ইচ্ছে, হঠাৎ  করে উড়ে আসা ভাবনা কিংবা সৌন্দর্য সম্পর্কে তোমার নিজস্ব বিশ্বাস। বিনয় ও আন্তরিকতার সাথে লিখে যাও।যখন লিখবে তখন চারপাশের রীতিনীতি, স্বপ্নে দেখা চিত্রকল্প ও স্মৃতির সাহায্য নাও। যদি তোমার যাপিত জীবনকে আপাত পক্ষে দরিদ্র বলে মনে হয় তবে তাকে দোষ দিও না। দোষ নিজেকে দাও। নিজেকে বলো কবি হওয়ার গৌরব সে তোমার নয় । কারণ স্রষ্টার কাছে ধনী দরিদ্র বলে কিছু হয় না । নিজেকে কখনও খুঁজে পাও যদি জেলখানার চার দেয়ালের মাঝে; যেখানে পৃথিবীর অন্য কোন শব্দের প্রবেশ নিষেধ; সেখানেও কি তোমার সাথে থাকবে না শৈশবের অমূল্য সেই সোনালি দিনগুলো? সমস্ত শক্তি দিয়ে সেখানে মনসংযোগ করো। চেষ্টা করো সময়ের অতলে হারিয়ে যাওয়া সেই অনুভূতিগুলোর অনুরণন আবার নুতন করে অনুভব করতে। তাতে তোমার ব্যক্তিত্ব হবে আরো প্রখর। তোমার নির্জনতার পরিধি বিস্তৃততর হয়ে নিজেই পরিণত হবে বিশাল এক জগতে । সে জগতের সন্ধ্যালোকে তুমি নিজেকে খুঁজে পাবে একা। অনেক দূর হতে চেনা অচেনা মানব-মানবীর কোলাহল তোমার কর্ণকুহরে এসে পৌঁছুবে । এই একান্ত নগ্ন নির্জন জগতে হারিয়ে যেতে যেতে যদি কাব্যলক্ষ্মী তোমাকে ধরা দেন তবে ভাববার প্রয়োজন পড়বে না, তা ভাল না মন্দ। তুমি তোমার কাব্যলক্ষ্মীকে তখন আর পত্রিকায় পাঠাবে না । কারণ এটি  তোমার সৃজন । তোমার জীবনেরই একটা অংশ। তোমারই কণ্ঠস্বর।

        শিল্পকর্ম তখনই শিল্পমানে উন্নিত হয় যখন তা  অন্তর্নিহিত তাগিদ থেকে সৃষ্টি হয় । এই তাগিদ দিয়েই শিল্পকে আলাদা করে চেনা যায় । সুতরাং, আমি তোমাকে অন্য কোন উপদেশ দিতে অক্ষম। শুধু বলতে পারি নিজেকে জানো। আরো গভীরে প্রবেশ করো। বোঝতে চেষ্টা করো তোমার জীবন যা থেকে উৎসারিত তার গভীরতা। তোমাকে লিখতে হবে কিনা, সে প্রশ্নের উত্তরও আছে সেখানেই। সে উওর যেভাবেই আসুক তা মেনে নাও। তাকে পরিবর্তন করতে যেও না। হয়ত তুমি আবিস্কার করলে একজন কবি হওয়াই তোমার নিয়তি। তা হলে সেই নিয়তিকে মেনে নিয়েই পথচলা শুরু হোক। তার ভার, বিশালতা সবই গ্রহন করো, ফলের আশা ছেড়ে। কবির কাছে তার নিজস্ব একটা আশ্চর্য ভুবন থাকা চাই। কবি তাঁর সৃষ্টির সব উপাদান এই ভুবন থেকেই খুঁজে নেবেন । সে ভুবনের প্রতি কবির থাকবে সমস্ত জীবন উৎসর্গিত।

           তোমার অন্তপুরের নির্জনতায় প্রবেশ করে হয়তো জানতে পারলে কবি হওয়া তোমার কর্ম নয় ( যদি এক জন না লিখে বাঁচতে পারে তবে তার লিখার প্রয়োজন নেই )।  তারপরও এই নিজেকে খোঁজার অর্থ মিথ্যে হবে না তোমার । জীবন সেখান থেকেই সঠিক পথ খুঁজে নিবে। আমি আশা করছি এই নুতন পথও  হবে আরো বিস্তৃত। আমার শুভ কামনা রইল। 

           আর কি বলতে পারি বলো? ছোট ছোট টুকরো ঘটনার রয়েছে অসীম গুরুত্ব  ।অবশেষে আর একটা পরামর্শ তোমাকে দিচ্ছি । এগিয়ে যাও নীরবে। খেয়াল রেখো এই এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সব থেকে ক্ষতিকারক হতে পারে তোমার  নিজস্ব সত্ত্বার বাইরে গিয়ে তোমার প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা।। তোমার একান্ত নির্জন অব্যক্ত  অনুভুতির অতলেই  লুকানো রয়েছে সে উত্তর। 

        আমাকে যে কবিতাগুলো পাঠিয়েছিলে, সেগুলো ফেরত পাঠালাম । আমাকে বিশ্বাস করে প্রশ্নগুলো করার জন্য আবারো তোমাকে ধন্যবাদ। আমি যথাসম্ভব চেষ্টা করেছি উত্তরগুলো সততার সাথে দেয়ার। আমার চেষ্টার মাত্রাটা হয়ত একজন অপরিচিত ব্যাক্তির থেকে তোমার প্রত্যাশাকে একটু ছাড়িয়েই গেছে ।

তোমার একান্ত, 
রাইনের মারিয়া রিলকে