“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

শনিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০১২

কবি মাসুদ খানের কবিতার বই 'পাখিতীর্থদিনে'

            এই সময়ের বাংলা কবিতাবিশ্বের এক গুরুত্বপূর্ণ কবি কানাডার টরন্টো প্রবাসী বাংলাদেশের মানুষ মাসুদ খান। তাঁর কবিতার বইটির নাম 'পখিতীর্থদিনে'। বের করেছিল ঢাকার 'নদী' সেই ১৯৯৩তে। তার মানে বয়সে বইটি দুই দশকের 'বুড়ো'।   পেয়েছিলাম মাস কয়েক আগেই। সময় নিলাম পড়তে, ভাবতে এবং তাঁকে আরো ভালো করে জানতে। বইএর নামটি থেকেই আমাদের কথা শুরু করা যাক। আমরা কি নামটি ভুল লিখলাম? দু'টি বা তিনটি শব্দকে জুড়ে দিলাম কি? না, বরং এরকম শব্দনির্মাণে তাঁর আশ্চর্য ঝোঁক আছে। সবচাইতে দীর্ঘশব্দটি 'বালিচূর্ণস্বর্ণরেণুভস্মকার্বণকর্দমকণাকুলহরিনের' (ধুলিবিদ্যা) এরকম তৎসম শব্দবাহুল্যে ধ্বনি ঝংকার নির্মাণপ্রয়াস বাংলা সাহিত্যে নতুন নয়, বরং মধুকবির থেকে  এর শুরু, সুধীন দত্ত  এর গুরু। কিন্তু এই কৌশলকে যে পেছনে ফেলে আসতে হবে তারতো কোনো যুক্তি নেই, আমাদের সেরকম যুক্তিবোধকে প্রশ্নের সামনে দাঁড় করান মাসুদ। তেমনি দাঁড় করান আমাদের স্থান কালের ধারণাকে। তাঁর ইচ্ছে 'দিগদিগন্ত থেকে অখিল বুদ্ধিরাশি/এখন ধাবিত হোক ঐ দূতের মস্তিষ্ক অভিমুখে।"( পাখিতীর্থদিনে) তাঁর কুড়িগ্রামের মানুষ যখন "রাত গভীর হ’লে আমাদের এই প্রচলিত ভূপৃষ্ঠ থেকে/ঘুমন্ত কুড়িগ্রাম ধীরে ধীরে আলগা হয়ে যায়।/অগ্রাহ্য করে সকল মাধ্যাকর্ষণ।/তারপর তার ছোট রাজ্যপাট নিয়ে উড়ে উড়ে/চ’লে যায় দূর শূন্যলোকে।" তখন শুধু মনে পড়ে আমাদের রবীন্দ্রনাথের সেইসব গানের কলি, "মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল-মাঝে /আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে, ...॥" খণ্ড স্থানকাল বোধের বাইরে আমাদের উড়িয়ে নিয়ে আসেন মাসুদ শুরুতেই। তাঁর পরেই পড়তে বসতে হয়, তাঁর কবিতা। তিনি যখন প্রকৃতি কথা শুনান তখন তা কেবল 'কুড়িগ্রাম' কিম্বা 'বগুড়া' ( তাঁর জন্মভূমি) হয়ে থাকে না। যখন নদীর কথা বলেন, তখন তা আর থাকে না কেবল 'জলাঙ্গীর ঢেউ' কিম্বা 'ধানসিঁড়ি নদীটির তীরে'। বিচরণ করেন 'ট্র্যান্স-আকাশগাঙ্গেয় পথে' (প্রজাপতি) । পড়তে পড়তে বোঝাই যায় বিজ্ঞানে কবির অধ্যয়ন গভীর, সেই মতো ধ্যান তাঁর দর্শনে। 
           
            শুদ্ধ অক্ষরবৃত্তকে নিয়েও সাজিয়েছেন বেশ কিছু কবিতা কিন্তু অধিকাংশতেই তিনি শুধু শব্দ নয়, বাক্যকেও ভেঙ্গেছেন চুরেছেন সাজিয়েছেন তাঁর মতো, লিখেছেন গদ্যে। যেমন "শ্রবণ বধির ক’রে দিয়ে বয় মহাবৃত্তের হাওয়া/বস্তুর থেকে বিকশিত ফের বস্তুতে ফিরে যাওয়া!/শ্রবণ বধির ক’রে দিয়ে বয় মহাবৃত্তের হাওয়া/শ্রবণ বধির ক’রে দিয়ে বয় মহাবৃত্তের হাওয়া/শ্রবণ বধির ক’রে দিয়ে বয় … … … …/শ্রবণ বধির … … … … … … … … …/শ্রবণ … … …" ( সার্কারামা)। এ কবিতার শুরুটা কিন্তু এই, "আজ এক রুগ্ন অগ্নিকুণ্ডের কিনারে বসে আছি জবুথবু/চারদিকে চলমান সার্কারামা/ছবিগুলো খুব দ্রুত নাচতে নাচতে আসে আর যায়।" গদ্যে , পয়ারে নয় মোটেও।
             কিছুটা দুরারোহ ঠেকবে তাঁর কবিতা বিশ্বে পা রাখা, কিন্তু দুর্গম নয় একেবারেই। এমন সুন্দর স্তবক তথা পংক্তিমালা তার প্রমাণঃ"চন্দ্রের মন্থরা ছোট মেয়ে হাওয়া/অর্ধেক অধরা সে, অর্ধেক পাওয়া/অর্ধেক লুপ্ত সে ছিলো গতকাল/তার দিকে ছুটে গেছে সারাটা সকাল।" এটি 'ক্লাউন' কবিতার থেকে নেয়া। পাঠক দেখবেন এতে তিনি ছড়া আর পয়ারের  ছন্দকে নিয়ে কেমন কুশলি খেলা খেলেছেন।  এমন খেলা ছাড়া কবিতাটা জমতনা কিছুতেই। শুধুমাত্র ভুল পাঠকই উচ্চারণ করতে পারেন , "কেউ বলে, সে অলবড্ডে/হ্যাংলা বেশি। ভুল পদ্যে/মঞ্চে মাতে।..." (ঐ) আমাদের বিশ্বাস যত্ন নিয়ে যে পাঠক বইটা পড়ে যাবেন তিনি স্বয়ং কবিতা বিশ্বভ্রমণে সমৃদ্ধ যাত্রী হবেন। 
              তাঁর মানে এই নয় যে দু'দশক আগের শৈলীতে মাসুদ আটকে আছেন। এরপরেও তাঁর বই বেরিয়েছে, নদীকূলে করি বাস (একুশে, ২০০১); সরাইখানা ও হারানো মানুষ (একুশে, ২০০৬)।  তাঁর কিছু অতীব ভাবসমৃদ্ধ কিন্তু সহজবোধ্য সাম্প্রতিক কবিতাও আমাদের পড়বার সৌভাগ্য হয়েছে।যেমন 'ডাকাতি' কিম্বা 'সুশীল ও দুঃশীল'। পাঠক এখানে পড়তে পারেন। কিম্বা পড়তে পারেন ওখানেও।
              বস্তুত যে বইটি আপনাদের পড়তে দিচ্ছি, সেটি বেরুবার পর ব্রাত্য রাইসু এবং সাজ্জাদ শরিফের নেয়া একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারও আমাদের নজরে পড়েছে। যেটি, আমরা পাঠকদের অবশ্যই পড়ে নেবার অনুরোধ করব। সাক্ষাৎকার নেবার নামে ওমনটি জেরা আমরা খুবই কম পড়েছি। সেও হবে পাঠকের এক উপরি পাওনা। 
             বইটি পড়তে পাবেন নিচে। আপনার কম্পিউটারে নামিয়ে নিতে পারেন নাও নিতে পারেন, পড়তে পারেন পুরো পর্দা জুড়ে। নিচের বোতাম গুলো দেখুন। আপনার শুধু দরকার পড়তে পারে ফ্লাসপ্লেয়ারের। নামিয়ে নিন এখান থেকে।

Pakhitirthadiney

শুভ নববর্ষ


     আলাদা করে এই দিনটি নিয়ে কোন উচ্ছ্বাস আমার নেই। তবে হ্যা শুভকামনা তো করা যেতেই পারে, তাই আবারও শুভেচ্ছা সহ সবাইকে আমার শুভ নববর্ষের অনেক অনেক প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানালাম।
         জানি অনেকেই চোখ ট্যাঁরা করে তাকাচ্ছেন আমার দিকে! ভাবছেন এই হলো ইন্টেলেকচ্যুয়েল আঁতেলদের সমস্যা। কারণে অকারণে সেন্টিমেন্টাল হয়ে পড়ে। কি তাই তো! আসলে পাশের বাড়ি থেকে কচি পাঁঠার মাংসের গন্ধ ভেসে আসছে। আমার নিমন্ত্রণ নেই। তাই একটু সেন্টু সেন্টু গন্ধ! উমন'টাও আমার পাশে বসে আছে মাটিতে। ও বেশ অস্বস্তিতে রয়েছে। মনটা ভালো নেই, এবার চালের গুড়োর নাড়ু হয়নি। মহাজন চাল দেয়নি।
       বলেছি, বিকেলে মেলায় নিয়ে যাবো। তাই সেই লোভে মাংসের গন্ধ কে আপাতত পাত্তা দিচ্ছে না। ওর বাবা বেড়িয়েছে শেষ বাজারে পাঁঠার, খাসির ভুঁড়ি গুলি কিনে আনতে। কচি বাশের ভেতর ঢুকিয়ে ভর্তা হবে পাঁঠার নাড়িভুঁড়ির। আমি ওকে না করেছি আজ খাবি না তুই।
       কালই ওর বাবাকে দারুণ ধমকে গেছে চৌধুরী। সারা বছর চৌধুরীর মাঠে খেটেও তার তিন হাজার টাকার ঋণ শোধ হয়নি। শেষে বলে গেছে আজ এসে টাকা না পেলে পোষা শুয়োরটা নিয়ে যাবে। রূপবতীকে বলে গেছে বাংলা মাল এক নম্বরটা গরম গরম তৈরি রাখতে। ডান ঘাড় নেড়েছে রূপবতী। তখনই কোলের'টা মুখ দিতে গেল বুকে। বুকের কাপড় আলগা হতেই চৌধুরী আরও একশ টাকা পুষিয়ে নিল। বলে গেছে আসার সময় একটা লাল বেলাউজ নিয়ে আসবে। ভেতরেরটা আনবে নাকি সেটাও জিজ্ঞেস করতে ভুলেনি চৌধুরী।
          দিবাকর গত ক'বছর বাড়ি ফিরতে পারেনি। ছুটি পায়নি। বিদ্যুৎকে প্যারিসের কোন মায়া আর ধরে রাখতে পারছে না। আজ সকালেও বলছিল মায়ের কথা। নন্দিনী রান্না করছে ইলিশ সেদ্ধ। আর ভাবছে ইস একবার যদি রাজা এসে খেতে চাইত! মনামী শুনেছি বেশ ব্যাস্ত আজকাল। পিছন ফিরে তাকানোর সময় নেই।
       ইন্দ্রটা আজও রাতের কবিতা লিখে চলেছে। নায়মা'র মনটা সক্কাল থেকেই খারাপ। কিচ্ছু ভালো লাগছে না। আর রোখা যাবেনা বিয়েটা আসছে বছর। রাজীবের রঙের দোকানে প্রচুর বাকী হয়ে গেছে। একটা ছবিও বিক্রি হয়নি। রঙ ফুরিয়েছে সব। রাকিব আজও অপেক্ষা করবে তার প্রিয়তমার জন্য দুপুর রোদ্দুরেই লাল টি শার্ট পরে।
      ব্রেকিং নিউজের জন্য আজও ছুটি পায়নি গৌতম। মায়ের শাড়ি দুটো জমেছে। একটা পুজোর আর একটা পয়লা বৈশাখের। দেয়া হবে কিনা কোনদিন কে জানে! রিয়া জানেনা কোনদিন আর কাউকে ভালবাসতে পারবে কিনা! তানিয়া আজও ভাবে বোনটা কেন চলে গেল দুদিনের জ্বরে! এতো অভিমান!
অর্পিতা আজও শেষের কবিতা পরে, প্রতিদিন সক্কাল বেলায় ভাবে এই বুঝি এলো অমিত...। আমি জানিনা এরপরেও কিভাবে ভালো থাকার চেষ্টা করবো মিষ্টি মিষ্টি হাসি মুখ করে!
     ইতিহাসের খিলানগুলি দেখে মনে পড়ে গেলো, কোনদিনই মানুষ ভালো থাকতে পারেনি এই দিনগুলিতে। ইতিহাস বলে, রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্য মোঘল সম্রাট আকবরের যুগে প্রবর্তন হয়েছিল বাংলা সালের। বর্ষশুরুর সে দিনটিই এখন বাঙালির প্রাণের উৎসব।বাদশাহ আকবরের নবরত্ন সভার আমির ফতেহ- উল- সিরাজি বাদশাহি খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য ফসলি সালের শুরু করেছিলেন হিজরি চান্দ্রবর্ষকে সৌরবর্ষের মতো মিলিয়ে নিয়ে। তিনিই হিজরিকে বাংলা সালের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করেছিলেন ও পয়লা বৈশাখ থেকে বাংলা নববর্ষ গণনা শুরু করেছিলেন। আর বৈশাখ নামটি নেওয়া হয়েছিলো নক্ষত্র ‘বিশাখা’র নাম থেকে।
          পয়লা বৈশাখে আকবর মিলিত হতেন প্রজাদের সঙ্গে। চারদিকে বিতরণ হতো মিষ্টি। সঙ্গে চলতো খাজনা আদায়। এরপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমলে বর্ষবরণ উৎসব চলে আসে জমিদার বাড়ির আঙিনায়। খাজনা আদায়ের মতো একটি রসহীন বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় গান বাজনা, মেলা আর হালখাতার অনুষ্ঠান।
         আজও খাজনা আদায় করতে আসবে চৌধুরী ফুলবতীর বাড়ি। তবে ফুলবতী আপাতত সব ভুলে ব্যাস্ত সকাল থেকে কালী গরুর দুধ ওগলাতে বিশাল লোহার কড়াইয়ে কাঠের চুলোয়। এতে নাকি সংসারের শ্রীবৃদ্ধি হয়। উমনটা কখন যে পালাল আমার পাশ থেকে চুপটি করে! ও পালালেই একটা দুর্ঘটনা ঘটে নিশ্চিত।
         যাই এবার আমিও, নন্দিনীর কোন খোঁজ পাই কিনা দেখি একবার আমার পাহাড়ে!

শুক্রবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১২

সৌম্য দাসগুপ্তের কবিতার বই ‘আলো, আলোতর, আলোতম’


পরথমে বন্দনা করি মায়ের চরণ।
আল্লারসুলের নামে নিলাম শরণ।।

ইণ্টারনেটে আড্ডা হৈল মৌনমুখর।
তর্ক উঠেছে এলা রাজনীতির উপর।।

আন্তর্জালে গুণীজনে জানাই সালাম।
কেহ বাবা দক্ষিণধারী কেহ বাবা বাম।।

কেহ রাজধানী থাকে কেহ বা বংগাল।
কেহ সাহেব-বিবি কেহ নিজ ইন্দ্রজাল।।

তত্বজ্ঞানী কেহ, কেহ মাটির উপর।
কেহ ঊর্ধগামী দেখো কেমন সুন্দর।।

সর্বমনোহর কথা মহাকাশ হৈয়া।
যুক্তি করে দেখো দুঃখসুখজাগানিয়া।।

ভবজন্মে তর্ক কৈরা কে জিতেছে কবে।
অধমের নিবেদনো ধুলি ভস্ম হবে।।

এই কথা বলিয়া সৌম্যপালাগান ধরে।
এপিসোড কি অ্যানেকডোট যুক্তি পেশ করে ।।

             এভাবেই শুরু হয়েছে সৌম্য দাসগুপ্তের কবিতা ‘নিউজগ্রুপের পালাগান’। ২০১১র কলকাতা বইমেলাতে প্রকাশিত তাঁর বই ‘আলো, আলোতর, আলোতম’র ৪০তম কবিতা। ৪টি সর্গের দীর্ঘ  কবিতা। ওভাবে কেউ কবিতা লেখে!  আন্তর্জালের যুগে  ‘পালাগান’! পালাগান আর কবিতা এক হলো! এই ‘আধুনিক’ প্রশ্ন যারা করতে শুরু করবেন তাঁরা কবিতাটা পড়ে গেলেই দেখবেন শেষে এসে নিজেরাই প্রশ্ন করছেন, আগের প্রশ্নটা কি ছিল  সংগত?  এ আমরা নিশ্চিত বলতে পারি। পালাগানে গল্প থাকবে। এই কবিতাতেও আছে। আছে ‘ছোট শিশু আতিয়ার’ এবং আতিয়ারদের গল্প। পড়তে পড়তে আমারতো বহুদিন আগে পড়ে না-পছন্দ গল্প ‘আদাব’কে মনে পড়ছিল। (অন্য পাঠকে অন্য কিছু মনে পড়তে আপত্তি নেই)  আর ভাবছিলাম, কত হেলাফেলার গল্পই না আমাদের ‘আখ্যান’ নির্মাণ করে গেছে দশকের পর দশক। সৌম্যের গল্পের স্থান-কাল এগুলোনা সরল কিম্বা সমান্তরাল রেখা ধরে। বোধকরি, যেটুকু তুলে দিলাম, তাতে পাঠক এও ধরে ফেলেছেন যে তাঁর ভাষাও এগোয়না সরলরেখায়! কোনো ভাষার ‘মানে’ একে ধরা যাবে না।  ধরা যাবে শুধু কবিতার মানে। কবিতার টানে। যেখানে যেমন দরকার পড়েছে, শব্দ তুলে নিয়েছেন। কোনো রকম পক্ষপাত কিম্বা অস্পৃশ্যতাতে হননি পথভ্রান্ত! ছন্দেও তিনি সেরকমই বৈচিত্রময়। পয়ারে যেমন, গদ্যেও তেমনি স্বচ্ছন্দ!
               পড়তে পড়তে ভাবছিলাম, বইটার ওমন নাম কেনো? উত্তরে ভেবেছি, অনেক কিছুই। শুরুর ভাবনাটা ঐ আলোরই মতো। আলো এগোয় সরলরেখায়। এটা দেখা যায়। কিন্তু সেই আলো আসলে কিনা যুগপৎ অসংখ্য কণা আর তরঙ্গের সমাহার। এই বইএর কবিতাগুলো পড়তে গিয়েও কথাটা মনে রাখতে হবে। এই ইঙ্গিত দিয়েই শুরুর দুই চরণের কবিতা ‘প্রেল্যুডে’ তিনি লিখেই দিয়েছেন, “ছুটছে নদী ছুটছে ঘোড়া আলোর পিছে পিছে/আকাশ জুড়ে হঠাৎ শ্যামা সন্ধ্যা জাগরিছে।” এর মাঝে কোনো দুর্ঘটনার চমক নেই, আছে বৈপরীত্যের মুগ্ধতা! শুরুতেই একটা প্রত্যয়ের সংবাদ। নতুবা কি আর কেউ লেখে ‘সন্ধ্যা জাগরিছে”!   ‘চিঠি’ কিম্বা ‘তিমির ও নেটওয়ার্কপ্রণালী’র মতো কবিতা    সাহায্য করবে সে আলোর সন্ধানে আর গভীরে যেতে। “তথ্যের অধিক যাহা, সি এন এন যে কথা বলে না/ সে জ্ঞান অর্জন করতে বলয়ের বহির্বিশ্বে এসে/ মৃততারাটির লুপ্ত প্রসন্নতারেখাগুলি চেনো...” ‘বলয়ের বহির্বিশ্বে’ পা ফেলে যাত্রা শুরুতো করেন কবি কিম্বা বিজ্ঞানী। মৃত তারাটির ‘আলোতম’ প্রসন্নতারেখাগুলো চেনার কাজটি কবির। এই সব পংক্তি আমাদের প্রসন্ন করে বলেই সৌম্যের বইটি পড়াবার লোভ সামলানো গেল না।
                 বইটি সৌম্যের থেকে আদায় করেছিলাম আজ বহুদিন হলো। পড়লাম বেশ ক’বার। ভাবতে সময় নিলাম। বহু ভাবনাই খেলে গেল। শেষে মনে হলো আমাদের ভাবনা ভার দিয়ে  আক্রান্ত করা কেন? আগ্রহ বাড়িয়ে দিতে যেটুকু বলার সেটুকু বলে বাকিটা  কবিতার উপরেই চাপানো থাক। আশা করছি, আপনাদের ভালো লাগবে।
              শুধু সৌম্য সম্পর্কে দুই এক কথা না বললেই নয়। এই কবির সঙ্গে প্রথম আলাপ ‘অগ্রবীজ’ কাগজের পাতায়। কাগজটি আমরা কাঠের নৌকোতে তুলে রেখেছি। এর তিনি শেষ সংখ্যার সম্পাদক। সেখানে তাঁর কোনো লেখা পড়বার সুযোগ বিশেষ হয় নি, কিন্তু সম্পাদনার পরিকল্পনা আমাদের মুগ্ধ করেছিল। ‘প্রবাসে দৈবের বশে’ থাকেন বলেই বোধহয় বাংলা ভাষা সাহিত্যের ‘কলকাতা’ কেন্দ্রিকতার যন্ত্রণা তিনি হাড়ে হাড়ে আঁচ করেন। তাই আরো কোথায় কেন্দ্র আছে, কেমন আকার, কেমন প্রকার তার— সন্ধানে নেমেছিল অগ্রবীজের সেই সংখ্যা। সেখানে ফরহাদ মজহরের একটি মূল্যবান সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন তিনি। সেটিও বাংলা ভাষা , সাহিত্য এবং সমাজের  এক অন্যস্বরের সঙ্গে আমাদের আলাপ করিয়ে দেয় বলেই দলিল বিশেষ।  তারপর তাঁর সঙ্গে আমাদের আলাপ হয় সরাসরি। এবং পড়া হয় বেশ কিছু কবিতা আরো। যাতে করে, এই সুন্দর বইখানা পড়তে পাওয়া।
         কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের স্নাতকোত্তর সৌম্য পেশায় এখন ক্যালিফোর্নিয়ার পিটার ড্রাকার স্কুল অব মেনেজমেন্টের অধ্যাপক। নেশায় কবিতা লেখেন , অনুবাদ করেন, নিজের চিন্তা গদ্যেও নামিয়ে রাখেন। এ অব্দি চারটি কবিতার বই বেরিয়েছে। ৪৯টি কবিতা নিয়ে বর্তমান বইটি ২০১১তে  প্রকাশ করেছে কলকাতার ‘হাওয়া কল’। তার আগে ১৯৯৫তে ‘রাজার জামা পরা মায়াবী সাতদিন’, ২০০০এ ‘কবিতা, ডালাস’, ২০০৪এ ‘মহাপৃথিবীর ওয়েবসাইট। এছাড়াও সুব্রত অগাষ্টিন গোমেজ এবং অঙ্কুর সাহার সঙ্গে ২০১০এ অষ্ট্রেলীয় কবিতা অনুবাদ করে ছেপেছেন, ‘ কাবিতা ডাউন আণ্ডার।’
             বইটি পড়তে পাবেন নিচে। আপনার কম্পিউটারে নামিয়ে নিতে পারেন নাও নিতে পারেন, পড়তে পারেন পুরো পর্দা জুড়ে। নিচের বোতাম গুলো দেখুন। আপনার শুধু দরকার পড়তে পারে ফ্লাসপ্লেয়ারের। নামিয়ে নিন এখান থেকে।
Alo Alotaro Alotamo

বৃহস্পতিবার, ১২ এপ্রিল, ২০১২

তিতলি

তিতলি,কোথায় আছো?সমুদ্রের বিস্তৃতি আছে, শুধু গিলে খায়। যেয়ো না ওর কাছে।নদীর আর্সেনিক জনিত রোগ। পেটে পাথর জমতে পারে।পৃথিবীর কাছে থেকো। এখানে সবুজ আছে, আছে নীল মুনিয়া।
পাহাড় শুধু ক্ষয় রোগীর মতো। নিজেকে নিঃস্ব করেও তোমায় আশ্রয় দেবে জানি। 

বৃষ্টি আছে, তোমার কৈশোর আছে। একটা নীল আকাশ আছে অন্তহীন। জলরঙে তুমি দেখতে পাবে তোমার প্রথম যৌবনের সব রঙ গুলি আবার নতুন করে, আমার হাত কাগজে।আমি জানি তোমার লাল রঙ খুব প্রিয়। তোমার ঠোটের রঙ লাল, তুমি লজ্জা পেলে লাল হয়ে যাও।

 প্রথম কৈশোরে, প্রথম চিনেছিলে তোমার প্রথম রক্তপাত। তোমার আজীবনের এই রঙকে। অসম্ভব ভয়ে ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল শরীর। ভাগ্যিস সেদিনও তুমি পড়েছিলে লাল ফুল ফুল জামা। মুখ গুঁজেছিলে মায়ের হলুদ মাখা শাড়িতে। দুই নারী শরীরের একই স্রোত ঝর্ণা হয়ে ঝরে পড়ে পৃথিবীর সমাধিতে।

প্রথম কোন বর্ষায় ভিজতে ভিজতে নিজেকেই নিজে একদিন ভালবেসে ফেললে। জলের শরীর তোমায় আদর করলো নরম করে। সেদিন নিজের দু'বুকের গভীরে বৃষ্টি ধারা গুলি আটকে গিয়েছিল মুহূর্তের জন্য। তোমার নিঃশ্বাস গরম হয়ে উঠেছিল। অহংকারী হয়ে উঠেছিল খুব! সেই প্রথম নিজেকে আবিষ্কার করেছিলে তুমি, তিতলি।

এই পৃথিবীর যাবতীয় রূপ মন্ত্রগুপ্তির মতো রপ্ত করেছিলে সেই বৃষ্টি ভেজা দিন থেকেই।তোমার শরীরী ভাষায় উচ্চারিত হয়েছিল পাহাড় ঝরে পড়ার নীরবতা। আজও ডুব দিই তোমার গভীরতায়। ঠাই পাই কোথায় বল!

আকাশের কাছে বৃষ্টি চেয়েছি আমি, এই কাঠফাটা রোদ্দুরে। আকাশের সেই ক্ষমতা কোথায়! পৃথিবীর আছে। তোমার কাছে আছে। এসো, নেমে এসো এই পৃথিবীতে।

সমুদ্রের কাছে যেওনা, নদীর কাছেও না।

পাহাড়ের কাছে এসো। বুকে পেতে দেবে আশ্রয় তোমায়। তিতলি, এবার তোমার শুধু ঝরে পড়ার সময়।
কাল রাতে প্রচন্ড ঝড়ে আমার শনের ছাউনি উড়ে গেছে। কী লাভ? তুমি তো আসবে না জানি।তাই আজ থেকে খোলা আকাশেই খুঁজবো তোমায়। আকাশের সব পথ খোলা রেখে, প্রতীক্ষা করবো রাত জেগে।

তোমার ঘর আছে, ছাদ আছে, দরজা নিয়ে গেছে অবাধ্য কালবৈশাখীর ঝড়ো বাতাস।শুনেছি কাল রাতের ঝড়ে জয়চন্দ্র এসে চিৎকার করে ডেকে গেছে তোমায়। তুমি সাড়া দাওনি। আশ্রয় দাওনি। সমস্ত দরজা বন্ধ করে রেখেছিলে!

আজ সক্কালে দেখলাম, কাল রাতের উদ্দাম ঝড়ে আমার  ঘরের দেওয়াল আবার নতুন করে লাল।  তিতলির হাতের ছাপ আমার ঘরের মাটির দেয়ালে। সবুজ শন গাছেরা ফালি ফালি করে কেটেছে তোমার হাত, ঠোট, পায়ের পাতা, নরম সোনালী নখ।

না জলের কলসি গলায় বেধে আত্মহত্যা করেনি তিতলি। বৃষ্টি ভিজে ধুয়ে নিয়েছে নাভিমূল। লাল মাটির প্রলেপ দিয়েছে বুকে।

রিলিফ ক্যাম্পের মানুষগুলি আজ সকালেও এসেছিল তিতলির তছনছ হয়ে যাওয়া বাগানকে আবার নতুন করে সাজিয়ে দেবে বলে। তাদের সামনে নিজের বুকের কাপড় আজ নিজেই খুলে দিয়েছে তিতলি।
সূর্যালোকে ঐ বুকের ঔদ্ধত্য দেখে পালিয়েছে মানুষগুলি।

পৃথিবীটা শুধু তিতলি'দেরই বারবার রক্তাক্ত করে, ঘরে বাইরে, বিছানায়, বাগানে, নদীর ধারে অথবা রিলিফ ক্যাম্পে! আর তিতলি'রা আমাদের রক্তাক্ত করে রাখে আজীবন প্রকাশ্যে।

কালো হাতগুলি আজ চালডাল দিচ্ছে মুফতে। আমিও দাঁড়িয়ে লাইনে। তিতলি'র আজ খিদে নেই। কিন্তু কিছু তো খেতে দিতে হবে তাকে। কিছু চাল আর ডাল হাত পেতে নিতেই হবে এদের কাছ থেকে। এরপর দুজন মিলে খাবো। 

দেখে নিয়ো তিতলি, একফোঁটা জল তোমার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে আজ তছনছ করে দেবে আকাশের এই রৌদ্রজ্জল অহংকে। পৃথিবী আজ কথা বলবে না।তোমার বাগানে আজ সবুজ ফুল।

তিতলি, এভাবে পৃথিবীর সব কিছু কি আজও তোমার খুব ভালো লাগে? ইচ্ছে করে ঘরের দরজা বন্ধ করে বিছানাকে দিতে তোমার কান্না! দেখো, এমন একটি পৃথিবী দেব যেখানে তুমি ভালবাসতে পারবে শুধু তোমাকেই। এসো ভাত খেয়ে নিই। এসো...।

এরপর ছাউনিটা দিতেই হবে। আকাশের অবস্থা ভালো নয় তিতলি। আজ তুমি আমার কাছেই থেকে যেও।



শুক্রবার, ৬ এপ্রিল, ২০১২

শিক্ষার অধিকার : আশা ও আশঙ্কা

                            (লেখাটা বেরিয়েছে ৫ এপ্রিল, ২০১২ তারিখের 'যুগশঙ্খ'-এ)
শিক্ষা নিয়ে গোটা দেশে বেশ একটা সোরগোল শুরু হয়েছে ইদানিং। এর রাজনৈতিক শুরুটা ২০০৯ সালে, ‘শিক্ষার অধিকার’ সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের মাধ্যমে। যে প্রশ্নটা প্রথমেই মাথাচাড়া দেয় তা হচ্ছে স্বাধীনতা লাভের বাষট্টি বছর পর হঠাৎ এই বোধোদয় কীসের দৌলতে? যা লক্ষণীয় তা হল আইনটি এমন এক সময়ে প্রণীত যখন শিক্ষার বেসরকারীকরণ নিয়ে অসন্তোষ ক্রমশ  তীব্রতর হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপট মনে রাখলে আমাদের সংশয়ের কারণ সহজে বোঝা যাবে।  পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের এই দেশে আইনের কমতি নেই, নিত্য নতুন আইন প্রণয়নেরও খামতি নেই। প্রণীত আইনের প্রয়োগের তুলনায় অপপ্রয়োগের দৃষ্টান্তই অধিক। আর টি আই কিংবা এনরেগা-র অভিজ্ঞতা কতটা আশাব্যঞ্জক তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এমতাবস্থায় শিক্ষা বিষয়ক আইনের ওপর আস্থা, আশা-ভরসা সাধারণ মানুষের থাকা উচিত কি অনুচিত তা নিয়েই বিতর্ক চলতে পারে। আমরা আপাতত বিতর্কের পথ পরিহার করে বরং একটু অন্যদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে আগ্রহী।
আইনটি প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য কী? উদ্দেশ্য, ৬ থেকে ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের নিখরচায় বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রদান। উক্ত আইনে এই অধিকার দেওয়া হয়েছে ওই বয়সের শিশুদের, অন্তত কাগজে কলমে। অবশ্যই সুসংবাদ। অন্তত পক্ষে দেরিতে হলেও এ কথা স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে যে এতদিন ধরে উক্ত অধিকার যে কারণেই হোক অস্বীকৃত হয়েছে। কিন্তু আইনি স্বীকৃতি মিললেও বেশ কিছু সমস্যাও রয়েছে। ছ’বছরের নীচের শিশুদের ‘প্রি-স্কুল’ শিক্ষার বিষয়ে কোন উল্লেখ নেই এতে, ১৪ বছরের পর  ‘ড্রপ আউট’ রোধ করা সম্পর্কেও কোন উচ্চবাচ নেই। সব চেয়ে বড় কথা, শিশুরা তো এই ‘আইনি অধিকার’ দাবি করার কিংবা আদায়ের জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের অবস্থায় নেই। গ্রামগঞ্জের প্রান্তিকায়িত অভিভাবকরাও শিক্ষার অভাবে সে দাবিটা করতে সক্ষম হবেন বলেও মনে হয় না। যদি বা কেউ করেনও, তাতেও ফললাভ কতদূর হবে তা অনিশ্চিত। বাকি রইল সামাজিক সংগঠনের ভূমিকা। এটা বলা বাহুল্য যে, দু একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে এযাবৎ সামাজিক সংগঠনগুলোর সেরকম সদর্থক ভূমিকা নজরে পড়েনি।  
তাছাড়া আরো একটা বড় সমস্যাও আছে। কেউ যদি প্রাপ্য মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় তাহলে তার জন্য কে বা কারা দায়ী হবে, কিংবা জবাবদিহি করবে কে? ধরা যাক, আঠারো বা কুড়ি বছর বয়সে কেউ বুঝল যে শিক্ষার অধিকার থেকে সে বঞ্চিত হয়েছে এবং তার জন্য সে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আইন ভঙ্গের অভিযোগ আনল। তখন কি হবে! প্রতিবিধান কী? সে ক্ষতি পূরণ হবে কীভাবে? হওয়া সম্ভব? এরকম অনেক প্রশ্নের উত্তর আমাদের অবশ্যই খুঁজতে হবে। কেননা, আইনের অন্ধদৃষ্টি সেদিকে মোটেও নজর দেয়নি। অতঃপর রাষ্ট্র হয়ত চাপে পড়ে এরকম বঞ্চিতদের আশ্বস্ত করতে বি পি এল মার্কা অন্য কোন ‘স্কিম’ ঘোষনা করে ‘সহৃদয়তার’ পরিচয় দেবে। বাস্তবে নিটফল কী দাঁড়াবে সে তো সবার জানা। বি পি এল কিংবা অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যা নিয়ে অগণন  গণিতজ্ঞের প্রতিবেদনে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’টা তো আর কারো বুঝতে বাকি নেই। ঠকে ঠকে নাস্তানাবুদ এদেশের মানুষের ঈশ্বরবিশ্বাসের মত করুণ বিশ্বাসও অবশিষ্ট নেই আর।    
আরো একটা মারাত্মক ব্যাপারও ঘটতে পারে। সেটাই সবচেয়ে আশঙ্কার কথা। এমনও হতে পারে যে দেখা  গেল সব দোষ পিতামাতা কিংবা অভিভাবকের ঘাড়েই চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা শুরু হল (মার্কিন মুলুকে যেমন হয়)। যুক্তি? তার কি আর অভাব হবে! আদালতে দাঁড়িয়ে সরকার পক্ষের কৌঁসুলি হয়ত এই বলে সাফাই দেবেন যে, বিদ্যালয় ছিল, বিনা পয়সায় পড়বার সুযোগও ছিল,  কিন্তু অভিভাবকরা যদি সুযোগ গ্রহণ করতে ইচ্ছুক না হন তাহলে সরকারের কি বা দোষ? যুক্তি অকাট্য, সন্দেহ নেই। আদালত যদি সায় দেয় তো জজ সাহেবকেও দোষ দেওয়া যাবে না। শেষ রাতে ওস্তাদের মার যে এভাবেই আসবে না তা হলফ করে বলা মুশকিল। কেন তা বলছি। এদেশে কৃষকদের  আত্মহত্যা নিয়ে এরকম খেলাই চলছে প্রতিদিন। আসলে ঢুঁস খেয়ে খেয়েও আমাদের পুরো হুঁস হয়নি এখনো।

গোটা দেশে দেনার দায়ে কৃষকের আত্মহত্যা নিয়ে হৈ চৈ তো কম হল না। এ হেন লজ্জাকর ঘটনা চাপা দিতে গিয়ে সরকারের অবস্থা অনেকটা ‘আঁচলে মুখ ঢাকতে গিয়ে গা উদোম’ হওয়ার যোগাড়। যারা আত্মহত্যা করেছে তারা যে সত্যি সত্যি কৃষক সেটা সাব্যস্ত করার জন্য নাকি স্ব-নামে জমি থাকাটা আইনের চোখে অতীব জরুরি। ফলে ঘটনা দাঁড়িয়েছে এমন যে বাপ-ঠাকুর্দার নামে থাকা জমিতে যারা চাষবাস করেছে আইনের চোখে তারা কৃষকই নয়। তাদের আত্মহত্যাও অতএব, আর যা হোক কৃষকের আত্মহত্যা নয় কিছুতেই। সত্য লোপাট আর কাকে বলে! এক ঢিলে দুই পাখি শিকারের এর চেয়ে উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত আর হয় না। কৃষকের আত্মহত্যাও গায়েব, সাথে আর্থিক ক্ষতিপূরণও হাপিস। এই হচ্ছে আইন রক্ষার, পরিকল্পনা রূপায়নের বাস্তব চিত্র। রক্ষকের মুখোসের আড়ালে নির্লজ্জ ভক্ষকের মুখ সর্বত্র বিদ্যমান। এ হেন রাষ্ট্রব্যবস্থা দেশের নিরীহ ও দরিদ্র জনসাধারণকে যা-ই  দেয় বা দিতে পারে তার ধরণটা আসলে ‘উড়ো খৈ গোবিন্দায় নমঃ’ গোত্রের। মুখোসটা বজায় রাখতে গিয়ে নেহাত উপায়ান্তর না হলে সেটুকুও হয়ত জুটত না। ঘর-পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখেই ডরায়। তাই আশঙ্কা, শিক্ষার অধিকার সংক্রান্ত আইনও শেষ পর্যন্ত না উলটো ফল প্রসব করে বসে। রত্নাকর ‘মরা’ জপতে জপতে ‘রাম’ উচ্চারণ শিখে বাল্মীকি হয়েছিলেন, আর এযুগে ‘রাম’-নাম জপের মহড়া অবশেষে বাল্মীকিকেও না রত্নাকর বানিয়ে ছাড়ে সেটাই ভয়ের !

আশঙ্কা যে অমূলক নয় এটা বোধকরি সকলেই মানবেন। তবুও কোন এক মধ্যবর্তী আলে দাঁড়াবার আশা নিয়েই আমাদের বাঁচতে হবে। কাজটা বিরাট সন্দেহ নেই, অত্যন্ত দুরূহও নিশ্চয়। তবে  সদিচ্ছা থাকলে অসাধ্যও নয়। তার জন্য যথার্থ পরিকল্পনা দরকার। আসলে আমরা ‘কী করি’ আর ‘কী করতে চাই’ তাতেই বিরাট তারতম্য ঘটে যায়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান হাল কি দেখা যাক। এদেশের ২৫% মানুষ নিরক্ষর। পঞ্চম শ্রেণিতে পৌঁছে ৪২% শিশু স্কুল ছেড়ে দেয় - অর্থাৎ, ড্রপ আউট। যে কোন শ্রেণিতে স্কুল-ছুটের হার কমেও ১০%। গড়ে ২৫% শিক্ষক যে কোন সময় স্কুলে গরহাজির থাকেন। ৭৫% হাজির থাকলেও মাত্র ৪৭% সক্রিয় ভাবে শিক্ষা প্রদানে রত দেখা যায়। এর পেছনে নানা কারণ আছে। আপাতত সে প্রসঙ্গে যাচ্ছি না, আমরা কেবল মাত্র বাস্তব চিত্রটি তুলে ধরার চেষ্টা করছি ।  এছাড়া স্কুলের সংখ্যা ও উপযুক্ত পরিকাঠামো, শিক্ষকের ঘাটতি (পরিমাণ ও গুণগত) ইত্যাদি বিষয় তো রয়েছেই। বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে দেখা গেছে যে, সরকরি স্কুলের শিক্ষার গুণগত মান নিম্ন। সরকার শিক্ষার  আইনি অধিকার দিয়েছে সত্য, কিন্তু সে শিক্ষার মান কী হবে তার উল্লেখ নেই। শিক্ষা মানে তো তেমন কিছু যার দৌলতে সামাজিক গুণগত পরিবর্তন  দৃষ্টিগোচর হবে। অর্থাৎ, শিক্ষার গুণগত মান বজায় রাখতেই হবে। শুধু তাই নয়, শহর ও গ্রামাঞ্চলে  একই মানের শিক্ষার সুযোগ চাই। নতুবা সামাজিক সাম্যের বিপরীতে অসাম্য বৃদ্ধি পাবে।   
 তাই কেবল স্কুলঘর নির্মাণই সব নয়, প্রয়োজন উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত যথেষ্ট সংখ্যক শিক্ষকের (ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ৩০:১ হওয়া বাঞ্ছনীয়)। চাই বিজ্ঞানসম্মত পাঠ্যক্রম ও শিক্ষা-পদ্ধতি, মূল্যায়নের আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত পন্থা। স্কুলের ভারি ব্যাগের পাশাপাশি সবুজ খেলার মাঠ,  এবং আরো, আরো অনেক কিছু। অবশ্যই প্রয়োজন বিরাট ধনরাশিরও। কিন্তু আইনকে বাস্তবে  প্রয়োগের প্রশ্নে সরকারি তরফে এযাবৎ অর্থের জোগান (যদিও তা প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত নয়) ধরা ছাড়া আর কোন পদক্ষেপ গ্রহণের আগ্রহ আছে বলে মনে হচ্ছে না। বরং খানিকটা দায়মোচনের প্রবণতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বেসরকারি বিদ্যালয়ে গরিবদের জন্য ২৫% আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে আইনে। সুবন্দোবস্ত নিশ্চয়! কিন্তু এর থেকে এটাও স্পষ্ট যে প্রয়োজনানুসারে যথেষ্ট সংখ্যক সরকারি স্কুল স্থাপনের প্রশ্নে বর্তমান সরকার বাহাদুরও নিঃসন্দিগ্ধ নয়। তাই প্রাইভেট-পাব্লিক পার্টনারশিপের মোহনীয় দাওয়াই। লোহার বাসরে কাল কেউটের প্রবেশের ছিদ্রপথ নয় তো? গ্রামীণ স্বাস্থ্য অভিযানে যে ‘মহৎ কেলেঙ্কারি’ গুলো ঘটেছে তার থেকে শিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজন কি ছিল না!
পরিহাসপ্রিয় আমজনতার একটা অংশের কাছে ‘সর্বশিক্ষা’ যে ‘সর্বনাশা শিক্ষা’য় পর্যবসিত তার খবর জানে না দিল্লির জনপথ! এই পরিহাসের আড়ালের ‘নিষ্ঠুরতা’টুকু উপলব্ধি করতে না পারার একটাই অর্থ, আর তা হল, আমজনতার আস্থালাভের প্রশ্নে চূড়ান্ত অনীহা। আইন-আদালত নয় কেবল, গোটা ব্যবস্থার উপরই বীতশ্রদ্ধ এদেশের সাধারণ মানুষ। কোনও প্রকল্প পরিকল্পনার কাছেই মানুষ আসলে কিছু প্রত্যাশা করে না আর। খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের সুনিশ্চয়তাহীন মানুষের কাছে ‘শিক্ষার অধিকার’ কি বস্তু - খায় না মাথায় দেয়! আমাদের মাতৃ এবং শিশু মৃত্যুর হার আফ্রিকার নিতান্ত গরিব দেশের মানুষকেও লজ্জা দেয়। পাঁচ বছরের কম বয়সের শিশুদের অর্ধেকের বেশি যেখানে অপুষ্টির শিকার সেখানে ছ’ বছরে যারা স্কুলে ভর্তি হবে তাদের অর্ধেকই থাকবে অপরিণত। শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে এরা স্বাভাবিক কারণেই পিছিয়ে পড়তে বাধ্য। অথচ এসব দিকে কারো নজর দেবার ফুরসত নেই। শিক্ষার বিষয়টা যে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, অন্য অনেক কিছুর সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জোড়া সামাজিক বিষয় তা বোঝা দরকার। মায়ের স্বাস্থ্যের সঙ্গে নবজাতকের স্বাস্থ্য ও মানসিক বিকাশ জড়িত, কাজেই শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে গেলে সেদিকে নজর দিতে হবে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা তাই এক বন্ধনীভুক্ত হওয়া আবশ্যক। অন্যথায় লেজ-মুড়ো আলাদা হয়ে যেতে বাধ্য। স্বাস্থ্যের মত  শিক্ষাও যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং সার্বিক উন্নয়নের অনিবার্য পূর্বশর্ত সেটা যত শীঘ্র উপলব্ধি করবে রাষ্ট্র এবং প্রকৃত অর্থে সে  অধিকারের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করবে ততই মঙ্গল। রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির পরিবর্তে শিক্ষার আলো প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দেবার দায়বদ্ধতা যদি স্বীকার করে নেয় কোন দল বা সরকার তাহলে আইন থাকা-না থাকায় আসে যায় না কিছু, এটাই মূল কথা। 
          
   
           

বৃহস্পতিবার, ৫ এপ্রিল, ২০১২

নোনাডাঙ্গা ও কতিপয় বায়সেরা















নোনাডাঙ্গায় বাতাসের আগে আগুন ছোটে
ইলেকট্রিকের অস্তিত্বহীন তারগুলো একলা
এখানে ওখানে ঘাড় উল্টে পড়ে জল বিন মাছ
সরসর শব্দে বাতাস একা একা হাঁটে  হ্যাংলা
ডাঙ্গায় ,খবর চুপিসাড়ে জানান দিয়ে যায়
আজ রাতে বিলাই বিলাইয়ের মাংসে থাবা ,
ঘাড় ও মটকে দিতে পারে ,সচেতন বায়সেরা
আয়েশে বসে  মাংস চিবায়,তারহীন বার্তালাপে
জালিয়াতি কথোপকথন জারি,আত্মতৃপ্তির
চোঁয়া ঢেকুরে আগ্রাসী স্নান,অতঃপর তিলমাত্র
আঘাত চিহ্ন বহির্ভুত পরিব্যপ্ত পাখির চোখ
দু পেগ বিপ্লবে আস্থা রেখে কলিযুগ শানায় ,
সংজ্ঞা সব কিছুরই বদলেছে'ধর্মের'ও'জিরাফের'ও ।

মঙ্গলবার, ৩ এপ্রিল, ২০১২

বাংলা দেশের হৃদয় হতে এলো উপহারঃ মেঘ অদিতির 'জল ডুমুরের ঘুম'

          আমার মতো দূর দিগন্তবাসির কপালে ওমন উপহার কালেভদ্রে মেলে। হঠাৎ কোনো ঘুড়ি ভোকাট্টা হলে উড়ে এসে জুড়ে বসে। ঢাকার 'মেঘ অদিতি' আমার পুরোনো বন্ধু। একটা ঘুড়ি ইচ্ছে করেই সে আমার দিকে ওড়ালো। কলকাতা হয়ে ওর প্রথম প্রকাশিত কবিতার বই ' জল ডুমুরের ঘুম' দিনকতক আগে আমার কাছে এসে পৌঁছুলো। ঢাকা থেকে ডাক খরচ প্রচুর, আমি অতোটা আশা করিনি। তবু সে পাঠালো যে তার জন্যে আমার মুগ্ধতা প্রকাশের কোনো ভাষা নেই। তার উপর আমি কবিও নই! বইটি ওর প্রয়াত বাবাকে উৎসর্গ করেছে। সেই বাবার প্রেরণা ও প্রশ্রয়ে ছেলেবেলা থেকেই সাহিত্যের ও    সুপাঠিকা । বাংলা সাহিত্যের গলিঘুঁজি ও চষে বেড়িয়েছে আশৈশব ওর বাবার আঙুল ধরে, আর এখন বেড়াচ্ছে একা । কিন্তু লিখত না। সম্ভত আঁকত। ঠিক আঁকতও না, যারা ওকে জানেন তাঁরা জানেন যে ফটোশপে ও যাদু দেখায়। ফটোশপে কবিতা লেখে। শব্দে আঁকেনি এতোদিন। যদি ভুল না বলি, আর বন্ধুকে বলা কথাগুলো সত্য হয়, তবে ওর এই কবিতার বইএর ছবিগুলো আঁকার বয়স এক দু'বছরের বেশি নয়। হ্যাঁ, ও ছবিই আঁকে। জিজ্ঞেস করে লাভ নেই, তোমার ঐ কথাটার অর্থ কীগো? সে অবশ্যি কোনো ভালো কবিতাতেই জিজ্ঞেস করা উচিত নয়। সেই অর্থ যখন ধরা দিয়ে দেয় এবং সমস্ত বিসঙ্গতি সহ-- তখনই বোধহয় আমরা বলে উঠি, এটা কী হলো? আমার মনে হয় না, মেঘ অদিতির ( নিশ্চয়ই ওর আসল নাম নয়) কবিতা পড়ে কেউ প্রশ্ন করতেও চাইবেন , এটা কী হলো? এর মানে কী? জিজ্ঞেস করতে নেই। স্রেফ দেখে যেতে হয়, যেমন দেখে আমরা ব্রহ্মপুত্রের বুকে গুনি ঢেউ, কিম্বা  চোখ ধরে গেঁথে দিই  বালিহাঁসের পালকে  পশ্চিমা সূর্যের গুড়ো । 
       মেঘের কবিতাগুলো দেখে যেতে হয়। সেই 'কফিহাউসের আড্ডা'র দিনগুলো থেকে ওর সঙ্গে আলাপ। দেখেছি, ওর ছবি দেখে যেতে হয়। ফেসবুকের জনপ্রিয়তার দিন গুলো থেকে পড়ে যাচ্ছি ওর কবিতা, দেখেছি ওর কবিতা দেখে যেতে হয়! ওখানে 'যেন খুব করে কেউ রঙ গুলে আকাশকে স্নান করিয়েছে' কিম্বা, উঠোনে আজ জলজ্যোৎস্নার গায়ে নকশীচাদর' --ওমন সব ছবি। কিম্বা ভাবতে বসতে হয়, যখন সে লেখে, " নির্ঘুম ঘাসের সাথে, সন্ন্যাসী তারার সাথে আমার কোনো পার্থক্য নেই আজ।" কিম্বা 'সন্ধেবাতি দেবার হিড়িক ঘরে ঘরে অথচ স্ট্রীট লাইটগুলো মুখতোম্বা করে আছে।" নিজেরই লজ্জা লাগবে, কত সব চেনা ছবি, আমরা ফিরেও তাকাইনি, ওর কবিতা তাকাতে শেখাবে মাত্র। 
   আমার বলবার উদ্দেশ্য এই নয়, যে কীসব আশ্চর্য পংক্তি সে লিখে গেছে। পংক্তি কী করে লিখে যায় লোকে জানি না, লিখে যায় গোটা এক কবিতা। রামধনু হতে পারে সম্পূর্ণ  নীল আকাশের  গায়ে চিরল চিরল মেঘের খেলা আর সূর্যের কোনো প্রশ্রয় ছাড়া? পুরোটা নিয়েই ছবি। আমি ওর টুকরোগুলো তুলে ধরবার কারণ আর কিছু নয়, ওর থেকে পুরোগুলো পড়ে ফেলবার আগ্রহ যদি জাগাতে পারি । এর মানে এই নয় যে সে আঁকে শুধু শিশুদের বসে আঁকো প্রতিযোগিতার জন্যে 'সুন্দর' সব ছবি, লেখে কবিতা। 
      কোথাও যেন সেই সব 'সুন্দর'কেই খোঁজে ফেরে সে। আগেই বলেছি, বুঝে নিতে গেলে গোল বাঁধবে। শুধু অনুভব করতে হয় মেঘের কবিতা। এভাবে গল্প বলতে বলতেও   তো সে আঁকে এমন ছবিও," অরণ্য বালিকা, সেদিন বাড়ি ফিরে কি দেখেছি জানো?/ ম্যাজিকের মতো আমাদের বাড়িটাই হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। শূন্যে একটা উঠোন, সেখানে পড়ে আছে দোলা, আমার একটি মাত্র বোন যার সর্বাঙ্গ ঝলসে গিয়ে কুঁকড়ে গিয়ে এই এই টুকুনি... এক খাবলা দোলা হয়ে গেছে।"   ও হ্যাঁ,  কবিতাগুলোতো সবই গদ্যে লেখা, পড়তে পড়তে এই ভ্রমেও পড়তে হয় এগুলো কি কবিতা না গল্প? ভ্রমটাকে দেখলাম লেখিকার প্রশ্রয়ে   প্রকাশক টিকিয়েও রেখেছেন ভেতর প্রচ্ছদে এই লিখে, "  প্রচলিত কবিতা ও গল্পের বাইরে এই বই।" সেসব দুষ্টুমি ফাঁস করে দিয়ে আমি বলি, একটিও গল্প নেই গোটা বইতে।  সেরকমই আরো অনেক খেলা আছে, বইটির পরতে পরতে। পড়তে পড়তে মনে হয় যেন এক স্বপ্নের পুরিতে নিয়ে এলেন  লেখিকা, একটু পরেই দেখবেন সেখানে স্বপ্নগুলোর এখন দুঃস্বপ্নের সাথে লড়াই ভীষণ। নাহয় পঁয়ত্রিশটি কবিতার মধ্যে যে কবিতাটির নামে বই, সেটি পুরোটা পড়াই যাকঃ
জল ডুমুরের ঘুম

পরিযায়ী পাখিদের পায়ে বেঁধেছি বৃত্ত। মহাদেশ পেরিয়ে যেতেই তারা সংখ্যায় বাড়ে। পরবর্তী কোনো এক মধ্যাহ্ন মিলিয়ে যাবার আগে আগে বরফ ভেঙে উপত্যকার কাছে ওরা ফিরে আসে। নেমে আসে আবার দিগন্তে। আমাদের অন্যমনস্কতার মধ্যে ঢুকে পড়ে এক-একটি বৃত্ত। আগুন নিভে যাওয়া বুনোগন্ধ তখনও জেগে। আমাদের রাতগুলো বহুবর্ণা আলোর নীচে ঘুরপাক খায়। বৃত্তে বৃত্তে বাড়ে উপনিবেশের ছায়া। আমাদের খিদে মরে যায়, তৃষ্ণা হয় না অথচ শরীর অতিকায় হয়ে ওঠে । শহরের রাস্তাগুলো যখন যে যার মত নিরাপত্তা খোঁজে তখন আমাদের ঘোর কাটে। আমারা জেনে যাই এক অন্ধজীবনের কথা। আমারা জানি তীরন্দাজের বোধের মরণ হয়ে গেছে। তবু ঝরে পড়ার আগমুহূর্তে আমাদের গায়ে এসে পরা রোদের মুখ মায়া মাখা, গাছের চিরল পাতার গায়ে থাকে সম্ব্রমমাখা দুরন্ত সবুজ আদর আর আমাদের কাছে এসে দাঁড়ায় মৃত্যুদূত।

আমরা ধ্রুবতারার সাথে পূর্বজন্মে ফিরে যেতে চাই।

লোকাল ট্রেনের মত ধীরগতি হয়ে পড়া আমাদের চোখ তখন কেউ বেঁধে দিয়ে বলেঃ
ঘুমাও জলডুমুর। 


রবিবার, ১ এপ্রিল, ২০১২

গুয়াহাটিতে উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় বাংলা লিটিল ম্যাগাজিন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৭ এবং ৮ এপ্রিল, ২০১২

( ছবিগুলোতে দু'বার ক্লিক করলেই 
 এরা দেখবার মতো বড় হয়ে যাবে)

প্রিয় সতীর্থ,
    আমাদের অভিবাদন গ্রহণ করুন!আনন্দের সঙ্গে জানাই আগামী ৭ ও ৮ এপ্রিল, ২০১২ বাংলা সাহিত্য ও সমাজ ,গুয়াহাটির পক্ষ থেকে উত্তর -পূর্বাঞ্চলীয় বাংলা লিটিল ম্যাগাজিন সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছে, এই সমারোহ গুয়াহাটি শহরে অনুষ্ঠিত হবে।
    সম্মেলনে আপনাদের অকুণ্ঠ সহযোগিতা কামনা করি। আপনি আপনাদের পত্রিকা সহ এতে অংশগ্রহণ করবেন বলে আশা রাখি সম্মেলনে অংশ গ্রহণের জন্যে নিয়মাবলী ডাকে পাঠানো হয়েছে। আপনাদের সম্মতি পত্র আমাদের ফিরতি ডাকে পাঠালে বাধিত হব। আমাদের ঠিকানাঃ উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় বাংলা লিটিল ম্যাগাজিন সম্মেলন, গুয়াহাটি,২০১২ ; গিয়াহাটি ডেয়ারীর পেছনে; প্রথম তল এম এল নেহরু রোড;পান বাজার গুয়াহাটি-১
 বিনত
পার্থ ঘোষ এবং প্রসূন বর্মণ
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক,
উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় বাংলা লিটিল ম্যাগাজিন সম্মেলন,গুয়াহাটি,২০১২

যোগাযোগঃ
সভাপতিঃ             উষারঞ্জন ভট্টাচার্য, ৯৪৩৫৫-৪০৮১৩;
কার্যকরী সভাপতিঃ  গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়, ৯৪৩৫০-১০৬৩২;
সহ-সভাপতিঃ        সৌমেন ভারতীয়া, ৯৪৩৫০-১০৬৩২;
যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদকঃ পার্থ ঘোষ,৯৪৩৫১-১৪২০৬;
                       এবং প্রসূন বর্মণ,৯৮৬৪০-৭১০৬৭;
মুখ্য-সমন্বয়কারীঃ সঞ্জয় চক্রবর্তী, ৯৮৬৪২-৬৩৩৭০।

                               ~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

সংবাদ সংযোজনঃ এই সম্মেলনে দুটো জাতীয় আলোচনা চক্রও অনুষ্ঠিত হচ্ছে পূর্বোত্তরের বাংলা সাহিত্য এবং লিটিল ম্যাগাজিন নিয়ে। অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন কবি জয় গোস্বামী, নবারুণ ভট্টাচার্য এবং লিটিল ম্যাগাজিন লাইব্রেরী ও গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সন্দীপ দত্ত। ৭ এপ্রিল সন্ধ্যে বেলা অনুষ্ঠিত হবে জয় গোস্বামীর সঙ্গে এক অন্তরঙ্গ আলাপের অনুষ্ঠানও।