Sponsor

.“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ... তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!— সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!”~~ কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ~০~

Tuesday, November 8, 2016

রাজেন গোঁহাইর নিদান এবং...

।। দেবাশিস ভট্টাচার্য।।
Bangali Hindu 28মানুষ যূথবদ্ধ জীব। যূথবদ্ধতার ভিত্তিতে তার সম্প্রদায়গত পরিচয় গড়ে ওঠে। যূথবদ্ধতার ভিত্তিতে পরিচয়েরও কিছু নিরিখ থাকে। ভাষা, ধর্ম, রাষ্ট্র ইত্যাদি এক একটি নিরিখ। এই ভিত্তির সাপেক্ষে একেকজনের পরিচয় তৈরি হয়। পরিচয় গড়ে ওঠার ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় উৎপাদন ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট ভূমিকাও একটা নিরিখ বটে। এইভাবেই একটি মানুষের পরিচয় তৈরি হয়, সে অসমীয়া, বাঙালি কিংবা তামিল (ভাষার ভিত্তিতে), সে মুসলমান হিন্দু কিংবা খ্রিস্টান( ধর্ম যেখানে নিরিখ), সে ভারতীয় পাকিস্তানি বাংলাদেশি অথবা শ্রীলঙ্কান ইত্যাদি (রাষ্ট্রের ভিত্তিতে)। শেষোক্ত পরিচয়টি রাজনৈতিক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় জাতীয়তাবাদের বিকাশের সঙ্গে জড়িত।লক্ষণীয়, ভারতীয় পরিচয় গড়ে উঠেছে প্রথম থেকেই এর বহুত্ববাদী স্বভাবকে স্বীকার করে। ভারত মানে ‘এসো ব্রাহ্মণ শুচি করি মন ধরো হাত সবাকার’ অথবা ‘পাঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মারাঠা....’ ইত্যাদি। বৃহত্তর অসমীয়া জাতিসত্তার কথা যখন বলা হয়, তখনও কিন্তু একটা কনফেডারেল চিন্তাকে আশ্রয় করা হয়। ফলত কোচ রাজবংশী বাঙালি বড়ো কার্বি অসমীয়া রাভা মিসিং সবার স্বাতন্ত্র্যকে মান্যতা দিয়েই অসম নামক রাজ্যটির স্বার্থের প্রশ্নে একটা যূথবদ্ধতার প্রস্তাব হিসাবে বৃহত্তর অসমীয়া আইডেন্টিটিকে দ্যাখা চলে, তাই বৃহত্তর অসমীয়া মানে আরনাই+ ফুলাম গামোছা+ উত্তরীয় ইত্যাদি। এবার, যদি বৃহত্তর অসমীয়া পরিচয়ের অনিবার্য শর্ত হয় গামোছা---তখনই সঙ্গত কারণে প্রতিরোধ এর চিন্তা আসে। এই প্রতিরোধ এর স্বর স্পষ্ট হয় ক্ষুদ্রতর আইডেন্টিটির সন্ধানে। এর সঙ্গে মোকাবেলা করতে গিয়েই স্থানীয় সায়ত্বশাসনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, বিভিন্ন গোষ্ঠীনামের উন্নয়ন পরিষদ তৈরি করতে হয়। বৃহত্তর অসমীয়া জাতির প্রশ্নে টানা ও পোড়েন এভাবেই আমরা লক্ষ করি। সম্প্রতি নাগরিকত্ব বিলের বিতর্কে নতুন অভিমুখ দিয়েছেন ভাজপার দুই দায়িত্বশীল নেতা। তারা বলছেন, বাঙালি হিন্দুর নাগরিকত্ব সম্ভব যদি তারা অসমীয়া ভাষা গ্রহণ করে। পরিচয়ের নতুন নাম হল বাংলাভাষী অসমীয়া। বাংলাভাষী ভারতীয় পরিচয়টি গ্রাহ্য, কেননা রাষ্ট্রনাম পরিচয়ের একটি গ্রাহ্য নিরিখ। ভারতের সব নিবাসী, সে যে ভাষা ও ধর্মের মানুষ হোক, খেতে পাক বা অনাহারে থাকুক, সে ভারতীয়। ঐতিহাসিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় এই পরিচয়টি প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের প্রক্রিয়ায় ও প্রয়োজনে গঠিত রাজ্যনামের ভিত্তিতে জাতিপরিচয় একটা এবস্ট্রাক্ট, আর আগ্রাসনবাদী প্রস্তাব। যে অসমীয়াভাষী মানুষটি মুম্বাইতে মাদুরাইতে কিংবা বরোদায় থাকেন, তার পরিচয় কি তাহলে হবে অসমীয়াভাষী মারাঠী, অসমীয়াভাষী তামিল কিংবা অসমীয়াভাষী গুজরাটি ? তাহলে রিয়াংভাষী ত্রিপুরী, রিয়াংভাষী মিজো, নেপালী অসমীয়া, নেপালী বাঙালি ইত্যাদি সোনার পাথরবাটিতে দেশ ছেয়ে যাবে। বৃহত্তর অসমীয়ার হিন্দুত্ববাদী মুখপাত্রদের কথা ঐতিহাসিকভাবেই অবিশ্বাস্য। যারা নিজ ভাষা বিসর্জন দিয়ে ইতিমধ্যে মাতৃভাষা হিসাবে কাগজেপত্রে অসমীয়াকে গ্রহণ করেছে, তাদেরকেই তো অসমের শত্রু বলে ঘোষণা করছেন এরা। তাহলে “বাংলাভাষী অসমীয়া”দেরও যে কাজ ফুরোলে পদাঘাত করবেন---এ তো জলের ন্যায় স্পষ্ট। আর বরাক উপত্যকা নামক মৃগয়াক্ষেত্র ? আজ কিছু অর্বাচীন এখানে যা এখনও অস্ফূট, তাকে সময়ের দাবি হিসাবে বলতে চাইছেন। বরাক উপত্যকাকে পৃথক করা উচিত বলে তারা নিদান দিচ্ছেন। এক “সমাজকর্মী” তো আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম অসম বিশ্ববিদ্যালয় নয় কেন সে প্রশ্ন তুললেন। আরে আগে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয় করুন তো । লোকজনকে খেপিয়ে তুলার আগে এটা সৎভাবে তো জানান যে প্রতিষ্ঠানের নাম আমজনতা তৈরি করেন না, ওটা বিধানসভায়, সংসদে তৈরি হয়, দস্তুরমতো আইনের অংশ হিসাবে। গোটা প্রস্তাবটি ঘোরতর সংকীর্ণ রাজনৈতিক দূরভিসন্ধির উচ্চারণ। একে আবেগ দিয়ে নয়, কুশপুতুল পুড়িয়ে নয়, গণতান্ত্রিক, এবং রাজনৈতিকভাবেই, যুক্তি ও তর্ক দিয়ে, সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের মতাদর্শের ভিতের উপর দাঁড়িয়ে মোকাবেলা করা কর্তব্য। অশান্তি সৃষ্টির ফাঁদে যেন পা না গলাই। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে শুভবুদ্ধি জাগরুক থাকুক সকল পক্ষের।মন্ত্রীমহোদয় কিংবা বিধায়ক মশায়ের অবাঞ্ছিত অসংবাদনশীল মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানাই। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী যিনি, তিনি কেন্দ্রীয় আইনসভায় এই বিষয়ে নীতিনির্ধারণের প্রস্তাব রাখুন তো। পঞ্জাবীভাষী বাঙালি, মাড়োবারীভাষী তামিল, এই আইডেন্টিটি গ্রাহ্য কি না, ছাপ্পান্ন ইঞ্চির নেতৃত্বেই ঠিক হোক। আর ১৯৬১র ভাষা আন্দোলনকে অসমীয়া- বাঙালি সম্পর্কের যাবতীয় সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু বলেন যিনি, তাকে বলতেই হয়, ইতিহাস পড়তে। কেননা হাওয়া থেকে ৬১র গণ-আন্দোলন গড়ে ওঠেনি, বহুভাষিক রাজ্যের মূল চরিত্রকে অস্বীকার করবার মানস প্রবণতার প্রতিক্রিয়াতেই অসম আজ এত টুকরো হয়েছে। নতুন করে এসব বিতর্ক না টেনে উন্নয়নের রাজনীতি করুন, দিল্লি- দিশপুরের শাসকদের কাছে অসমের জনগণের অনেক প্রত্যাশা।
Post a Comment

আরো পড়তে পারেন

Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...