“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৩

সৌরভ কুমার চলিহাঃএকটি গ্রহান্তর


।। সপ্তর্ষি বিশ্বাস।। 

(সৌরভ কুমার চলিহা অসমিয়া কথা সাহিত্যের অন্যতম স্তম্ভ। ১৮৩০শে দরং জেলার মঙ্গলদৈতে তাঁর জন্ম। বাবা কালীরাম মেধিও ছিলেন সুখ্যাত সাহিত্যিক এবং বৈয়াকরণিক। মায়ের নাম ছিল স্বর্ণলতা মেধি। অসমিয়া সাহিত্যে বিশ শতকের মাঝামাঝি 'বাঁহী', 'রামধেনু' সাময়িক পত্রের নামে এক একটি যুগ চিহ্নিত। বাংলা কল্লোল,কালিকলমের মতো। তাঁর প্রথম গল্প 'পাঞ্জাব সীমান্তের সহযাত্রী'। দ্বিতীয়টি 'কালমাক্স' বেরোয় বাঁহীতে। রামধেনুর আয়োজিত গল্প প্রতিযোগিতাতে 'অশান্ত ইলেক্ট্রন' প্রথম পুরস্কার লাভ করে। এবং তাঁকে আধুনিক অসমিয়া গল্পের দিকনির্ণায়কে পরিণত করে। 'অশান্ত ইলেক্ট্রন' নামে তাঁর প্রথম গল্প সংকলন বেরোয় ১৯৬২তে। সৌরভ চলিহা তাঁর ছদ্ম নাম। জীবিতাবস্থাতে অতি অল্প মানুষই তাঁকে মূল নামে জানতেন, সে ছিল সুরেন্দ্র নাথ মেধি। পেশাগত ভাবে তিনি ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী, অসম অভিযান্ত্রিক মহাবিদ্যালয় থেকে স্বেচ্ছা অবসর নেন, ১৯৮৮তে। তাঁর দুটি বিজ্ঞান গ্রন্থও আছে এই নামেঃচিন্তার বেগ কিমান এবং মহাকাশত প্ৰাণর সন্ধান ।
        
            মনে হয় না, এই অধ্যাপকটিই যে সৌরভ চলিহা, তাঁর সহকর্মীরাও জানতেন। সৌরভ চলিহাতে জীবিতাবস্থাতে দেখেছেনও অতি অল্প ব্যক্তি। কোথাও তাঁর ছবি ছাপানো হলেও হতো পেছন ফেরা। ১৯৭৪এ প্রকাশিত তাঁর 'গোলাম' সংকলনের জন্যে সাহিত্য একাদেমী পুরস্কার পেলেও তিনি সেটি নিতে যান নি, একাদেমী তাঁকে টাকাটা পোষ্ট করেছিল বটে। কিন্তু পদক বা মানপত্র কোনটাই পাঠায় নি। তিনিও পাবার জন্যে ব্যগ্র হননি। ২০১১র ২৫ জুন গুয়াহাটির এক হাসপাতালে এই অসামান্য লেখকের মৃত্য হয়। তাঁর জীবিতাবস্থাতেই তাঁর অনুরাগীরা গড়ে তুলেছিলেন "Saurav Kumar Chaliha Fan Society" প্রখ্যাত অসমিয়া চলচ্ছিত্র নির্মাতা এবং সমালোচক আলতাফ মজিদ এবং সহযোগীরা। তাঁদের উদ্যোগে তাঁর জীবনের অজানা তথ্যগুলো এখন সামনে আসছে। মজিদ কিছু তথ্যচিত্রও নির্মাণ করেছেন সৌরভ কুমার চালিহার জীবন ও কর্ম নিয়ে। তাঁর গল্প একাধিক ভারতীয় ভাষাতে ইতিমধ্যে অনুদিত হয়েছে। বাংলা ভাষাতে অন্যতম অনুবাদক দেবাশিস তরফদারের সম্মান জুটেছিল বিশেষ অতিথি হয়ে বক্তৃতা করবার যখন ফ্যান সোসাইটি সৌরভ চালিহার নামে ওয়েবসাইট খোলেন। সেই সাইটে পড়তে পাবেন তাঁর আরো অনেক গল্প, মূলে এবং অনুবাদে।)






সৌজন্য
একটি মাঠ। উপবৃত্তাকার। দুদিকে গোল পোষ্ট। মধ্যে সৈন্য সজ্জা। কে কোথায় দাঁড়াবে -  সেন্টার, ফরোয়ার্ড, স্টপার, গোল কিপার ... এক বিশেষ জ্যামিতিক নক্সা। বল গতিশীল হওয়ার আগে। বল যে মুহূর্তে গড়িয়ে গেলো অমনি বল নিয়ে কাড়াকাড়ি, হুড়োহুড়ির সঙ্গে সঙ্গে হাঁক ‘এগিয়ে যাও’, ‘পাশ্‌ করে দাও অমুককে ...’ ‘এই দাঁড়াও দাঁড়াও তুমি অমুকের সঙ্গে ডিফেন্সে...’  ... সাদা চোখেও ধরা পরে যে এই সব চীৎকারের সঙ্গে সঙ্গে মুহুর্মুহু পাল্টে যাচ্ছে ঐ জ্যামিতিক নক্সা। ঠিক। কিন্তু এই সৈন্যদের কেন এভাবে সাজানো হলো, একটা নক্সা ভেঙ্গে আরেক নক্সায় গিয়ে ঠিক কী লাভ হলো তা সহজে ধরা যায়না গোলটি বা একটি মারাত্মক গোল প্রেচেষ্টার আগে। ঠিক ধরা যায়না কখনোই তবে গোল হয়ে গেলে বা গোলের চেষ্টার পরে হয়তো আন্দাজ করা যায় কিছুটা। কিন্তু পুরোটা নয়। তবে একথা জানেন সকল দর্শকই, যে, এই সমস্ত সৈন্যসজ্জা, হাঁকাহাঁকি আর পরিকল্পিত ভাবে সৈন্যদের জ্যামিতিক নক্সা মুহুর্মুহু বদলের আড়ালে থেকে যায় অধিনায়কের একটিই উদ্দেশ্য –বিরুদ্ধ পক্ষের পোস্টের ভেতর বলটিকে ঢুকিয়ে দেওয়া। পাঠকের অনুভুতিকে বিপরীত পক্ষের গোলপোস্টের সঙ্গে তুলনা করলে প্রতিজন প্রকৃত শিল্পীই যে চেষ্টা নেন তা মনেহয় এই, যে, অন্তিমে পাঠকমানসকে উদ্দীপ্ত করতে এমন এক আলোকে যার ছটায় প্রকৃতপাঠকজন তাঁর আমূল অস্তিত্বকে দেখতে পাবেন এক নতুন আলোয় – ঐ দেখতে পাওয়ার পরের মুহুর্ত্ত থেকেই সেই আলো মিশে যাবে তাঁর মনোজ মশালের আলোর সঙ্গে – যা জ্বালিয়ে রেখে তাঁর পথচলা। ঐ আলোয় যা দেখবেন পাঠক সে সমস্ত কিছুই আগেও তিনি দেখেছেন বহুবার – তাঁর সেই পুরোনো আসবাব, নতুন পাজামা, দেওয়ালের স্যাঁতাপরা দাগ... তবু ঐ সমস্তকেই মনেহবে নতুন ঐ আলোকচ্ছটায়।   ঐভাবে পাঠকমর্মে ঐ দীপ্তি ছড়াতে গিয়ে তাঁর যে পরিকল্পনা তাও বদ্‌লে বদ্‌লে যাবে, অবশ্যই, বলটি মাঠে গড়িয়ে যাওয়ার পরেই। তবু পাঠক ঠিক টের পাবেননা গোলটি কখন হবে, কিভাবে হবে ...   

        এই কথাগুলি আবার মনে এলো দেবাশিস তরফদার অনুদিত সৌরভ কুমার চলিহার গল্পের সংকলন ‘বীণা কুটির’ মাস দুয়ের ব্যবধানে ফিরে পড়তে বসে।  কথাগুলি প্রথমে যাঁর লেখা পড়তে পড়তে মনে এসেছিল, তাঁর নাম জেম্‌স্‌ জয়েস্‌। তাঁর যে গ্রন্থ মনে এনেছিল কথাগুলিকে তার নাম ‘ডাব্‌লিনার্স’।  তবে এই মনে পড়ার আবডালে দুইটি গ্রন্থের ও দুইজন লেখকের মধ্যেও যে আবছা যোগাযোগ তা মূলতঃ তাঁদের  সফল পরিবেশ সৃষ্টিরি বাহাদুরিতে। রবীন্দ্রনাথের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ থেকে বিমল কর’ এর ‘জননী’ হয়ে, জয়েস্‌, সিমোনো, চেস্টারটন্‌ পেরিয়ে সৌরভ চলিহা এই সত্য ফিরে প্রমাণ করলেন। কিন্তু এতদ্‌ভিন্ন ডাব্‌লিনার্স যে স্থবিরতার কথা বলে সৌরভ চলিহা তার বিপরীত চক্রবালের দিকেই রাখেন অন্তিম ইঙ্গিত।
   
       সৌরভ কুমার চলিহা’র ‘বীণা কুটির’ গ্রন্থের গল্পগুলি তাঁর চারটি গল্পগ্রন্থ থেকে বেছে নিয়েছেন দেবাশিস তরফদার। পর পর সাজিয়েছেন নিজের মতো করে। ফলে গল্প গুলির অনুক্রম পাঠক মর্মে যে ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে (যে পাঠকজনেরা অনুক্রমের ব্যঞ্জনায় বিশ্বাসী) তার কৃতিত্ব দেবাশিস তরফদারেরি পাওনা।
           ‘বীণা কুটির’ এ গল্প সংখ্যা মোট বারোটি। এক নিঝ্‌ঝুম নীল দুপুরের ছায়ায় ‘দুপুরবেলা’ নামের গল্পটি দিয়ে আরম্ভ এই গ্রন্থের। গ্রন্থের আরো অনেক গল্পের মতোই ‘দুপুরবেলা’ এই নামের পরিধিতে তথাকথিত অর্থে কোনো গল্প নেই আবার তা নয় অত্যাধুনিক নিরীক্ষামূলক উৎকট “গল্পহীনতা” বা “না-গল্প”ও । আছে একটি দুপুর। ফ্ল্যাটের আক্রমণে অধুনাবিলুপ্ত যে মধ্যবিত্ত পাড়া তারই  এক নির্জন দুপুর । বেশ কিছুদিন পরে দেখা হওয়া দুই মহিলার নিতান্ত আটপৌরে আলাপচারিতা যেন এই দুপুরের “প্লট” আর আবডালে ঘনিয়ে দুপুর যেন “সাব্‌ প্লট”। - যেন খেলার আরম্ভে। তারপরই বল গড়ায় মাঠে। বদ্‌লে যেতে থাকে সৈন্য সজ্জা, পরিকল্পনা। সব শেষে এসে টের পাওয়া যায় ঐ দুই মহিলার নিতান্ত আটপৌরে আলাপচারিতাই আসলে “সাব্‌ প্লট্‌”। মূল প্লট ঐ দুপুর। অলস, চিরন্তন দুপুর ...
     এই গল্পটি যেন পালন করে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে আলাপের ভূমিকা। যেন জানান দেয় এই লেখক কখনো খুব জোরে কিছু বলেননা। যা জোর করে বলার তা জোরের সঙ্গে বল্লেও জোরে বলা তাঁর বিষয় নয়। টের পাওয়া যায় এই লেখকের প্রতিটি বাক্য যতোদূর বলে তার চেয়েও বেশীর দিকে, দূরের দিকে যায় নির্দেশ করে।
         ঐ দূরে কে আছে, কী আছে? – ক্রমে টের পাওয়া যায় আছে এক গ্রহান্তর যা আমাদের পরিচিত এই পৃথিবীর মতো হলেও সেখানের প্রতিটি বাসিন্দা, রাস্তাঘাট, গাছপালা যাপন করে এমন এক জীবন যা কবিতার বিন্দুবতীর মতোই সত্য না হয়েও বেশী সত্য – ঠিক যেমন জয়েসের ডাব্‌লিনার্সের ‘ডাবলিন’ যা ডাব্‌লিন হয়েও যেন ডাবলিন নয় আবার ডাব্‌লিন না হয়েও ডাব্‌লিন । জীবনানন্দের ভাষা ধার করে বলতে হয়, ‘পৃথিবীর সব নদীর সব জলকে সড়িয়ে দিয়ে নতুন জল’এর কল্পনার মতো। তাই তাঁর গল্পগুলিকে আমি স্থাপন করতে পারিনা সরাসরি এই পৃথিবীতে, তাই আমাকে তাঁর গল্প গুলিকে নিয়ে পাড়ি দিতে হয় এক গ্রহান্তরে যেখানকার আকাশ, জল, বাতাস, মানুষ সমস্ত পৃথিবীর আকাশ, জল, বাতাস, মানুষদের মতো হলেও তা পৃথিবী নয় ...
             ‘ডাব্‌লিনার্স’ এর প্রথম গল্প ‘সিস্টার্স’ অন্তিমে যদিও ইঙ্গিত রেখে যায় বয়ঃসন্ধি মগ্ন বালকের যৌনতার থেকে আরম্ভ করে ‘পাপ’ শব্দটির খৃষ্টান সংজ্ঞার অন্তর্গত দ্বন্দ্ব অবধি তথাপি সদ্য মৃত বৃদ্ধের বাড়ির সান্ধ্য পরবেশ যেভাবে অঙ্কিত হয় তাতে পাঠক হিসেবে আমরাও যেন সশরীরে ঢুকে পড়ি সেখানে। কিন্তু ঢুকে পড়ার পরে আমাদের ভূমিকা কেবলি দর্শকের –যেনবা যে  বালক এই গল্পের দ্রষ্টা তারি মতন আমরা ঐ গৃহটিকে নয়, সমগ্র ডাব্‌লিন্‌’কেই দেখছি জানালা দিয়ে, সেই অর্থে লেখকের ‘ফার্ষ্ট হ্যান্ড এক্সপিরিয়েন্স্‌’ও যেন এক রকমের ভয়ূরিজম্‌। - প্রায় আবহ নির্মীত ‘বীণা কুটির’এ’ও। এখানেও আমরা দর্শক। অনেক ক্ষেত্রে এই লেখকের ‘ফার্ষ্ট হ্যান্ড এক্সপিরিয়েন্স্‌’ও যেন এক রকমের ভয়ূরিজম্‌ ...। হ্যাঁ, ‘বীণা কুটির’ এর প্রথম গল্প হিসেবে ‘দুপুরবেলা’কে বেছে নিয়ে অনুবাদক দেবাশিস তরফদারও যেন চান সংকলনটির চরিত্রের কথা আমাদের জানান দিতে। যেন বলতে চান, এইভাবেই একটি আবহ -এই গল্পে যা নিঝ্‌ঝুম দুপুরের, ধু ধু নীলের  - তা’ই ক্রমে তোমাকে গ্রাস করে নেবে, হে পাঠক, এই গল্পের অন্তিমেও যেমন তুমি এসে দাঁড়াবে সংখ্যাতীত পরিণতির ইঙ্গিতের মুখোমুখি, গোটা বইটি জুড়েই এমন ... তোমাকে বার বার ভাবতে হবে ‘বাসন্তিকা’ গল্পে কেন এতো রবীন্দ্রনাথ... ‘বারকারোল’ এ কেন ছোট্ট শহরের বাসিন্দা প্রনবের মর্মে এতো স্পেন ... ভাবতে হবে, তবে এগুলিকে প্রতীক না ভেবে, ‘অব্‌জেক্‌টিভ কোরিলেটিভ্‌’ না ভেবে অন্য কোনো ইঙ্গিত, বরং ‘প্রতিমা’ ভেবে এগিয়ে যাওয়াই শ্রেয়...
               ‘বারকারোল’ গল্পটির আবহও মধ্যবিত্ত পাড়া। সেই পাড়ায় সন্ধ্যা, রাত্রি। পাড়ার বিয়েবাড়িতে বেশী রাতে বর আসা। অন্ধকার বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেই শোভাযাত্রা দেখা পড়শী মহিলার... ঐ গল্পের মৃত বালিকা আইজনী, আইজনীর গল্পের খাতার সন্ধ্যার সঙ্গে প্রণবের সন্ধ্যা, প্রণবের মর্মে ইতালীয়ান বারকারোল সঙ্গীতের মতো বেজে চলা অন্তঃসলিলা সৃষ্টি পিপাসা সমস্ত মিলেই গল্পটি আমার প্রিয় হলেও যেখানে আমি সম্পূর্ন হারিয়ে যাই সেখানে বেশী রাতে, বাড়িতে প্রণবের মা একা, প্রণবের অপেক্ষায় ... ‘অনেক রাত অবধি সেদিন মায়ের ঘুম এল না, বারান্দায় বসে মা রাতের শব্দগুলি শুনলেন। রাস্তায় লোকজন কমে গেছে, বাড়ির সামনের লাইট-পোস্টটার বাল্ব থেকে অল্প আলো এসে পড়েছে বারান্দার এক কোনে, মাঝে মাঝে দেরী করে বাড়ি ফেরা দু-একজনের জুতোর শব্দ, কোথাও কুকুর ডাকছে মাঝে মাঝে, একেকটা একাকী মোটরগাড়ির ক্রমশ বিলীয়মান ধ্বনি। উপেনবাবুদের বাড়িতে কেউ রঙ্গরস করছে, অস্পষ্ট হাসির রোল...’  এই রাত্রি কি শুধু গৌহাটির? সেন্ট্‌ লুইস্‌ বা ক্যালিফোর্নিয়ার কোনো শহরতলীর রাত্রি কি এ নয়? এই গল্পে “আইজনী” মৃত। তবু “আইজনী”কে ঘিরেই আবর্তিত কাহিনীটি।
            ...হ্যাঁ, এখানেও জয়েসকে মনেপড়ে। মনেপড়ে বহুদিন পূর্বে মৃত এক যুবককে ঘিরে “দি ডেড্‌” গল্পের অন্তিম আবর্তন। কিন্তু, আগে যেমন বলেছি, জয়েসের “দি ডেড্‌” যদিও অন্তিমে জীবনের স্থবিরতার দিগন্ত যায় পার হয়ে তথাপি ছুঁয়ে যায় উচ্চবিত্ত জীবনের প্রতিটি “মৃত” অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, সেখানে চলিহা’র “বারবাকোল” থেকে যায় দূরের থেকে ভেসে আসা গানের মূর্চ্ছনার মতোই। অধরা।
            মনেপড়ে  সেই জয়েসের ‘ইউলিসিস্‌’ও যেখানে শব্দ, অর্থাৎ ধ্বনিকে ঘিরেই সেই বিপুলাকৃতি উপন্যাসের এগিয়ে যাওয়া। শব্দ আর ধ্বনির প্রতি সৌরভ কুমার চলিহা’র এই ‘অব্‌সেশন’ থেকেই ‘বেটোফেন’ আর ‘আওয়াজ’ গল্প দুটিতেও শব্দ আর ধ্বনি পালন করে এক বিশেষ ভূমিকা। বধির বিটোফেনের বাহিরের ধ্বনিকে হারানোর আপাত যন্ত্রণার গহনে একটি গল্পে সৌরভ চলিহা আমাদের শ্রবণকে ফিরিয়ে দেন সেই ভিতরের দিকে যে ভিতরের দোরে কান পেতেই একমাত্র শোনাযায় ‘গোপনবাসী’র প্রকৃত কান্না-হাসিকে। ঠিক পরের গল্পেও দেখি বিরক্তিকর ধ্বনির থেকে মুক্তি পাওয়ার বহিরংগ প্রয়াস বিকৃত করে প্রিয়, পরিচিত ধ্বনিগুলিকেও। তা টের পেয়েই গল্পের প্রোটাগোনিষ্ট যখন নিজ মর্মের দিকে তাকায় তখনি ছোটো ছোটো ঘণ্টায় সুরেলা সঙ্গীত দুলিয়ে ছুটেযায় সেই ঘোড়ার গাড়িটি যা আগেও তাদের জীবনের কিছু কিছু বাঁক পেরোনোর আবহ। এই ঘোড়ার গলার ঘন্টার ধ্বনিতেই ‘আওয়াজ’ গল্পে লাগে রূপকথিকার সেই মেজাজ যে মেজাজের ছায়া ‘ডক্টর জিভাগো’।
 “       আওয়াজ” গল্পের পাশাপাশি “আচ্ছন্ন” নামক গল্পটি নিয়ে বলতে চাই। বলতে চাই এই হেতু যে এখানেও রূপকথিকার বিরল পৃথিবী রচিত হয় কিন্তু সেই পৃথিবী “আওয়াজ” এর পৃথিবীর মতো নয়। সেই পৃথিবী জুড়ে  থাকে ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরের একটি মধ্যবিত্ত পাড়া, ইস্টিশান, ক্যান্টিন, রেডিও স্টেশান ... এ সমস্ত থাকলেও এরা যেন তেল রঙের ছবি। জল রঙের মতো করে এদের একের রঙ অপরের সঙ্গে মিলে যায়না আবার একে ছোঁয়া যায়না ভাষ্কর্যের মতো করে। এই পৃথিবীর একমাত্র বাসিন্দা শুধু ‘আচ্ছন্ন’ গল্পের গল্পকার-প্রোটাগোনিষ্ট নিজেই আর তাই সে ‘আচ্ছন্ন’ । সে আসছে হারাতে হারাতে। গল্পের শুরুতেই । সেই হারিয়ে যাওয়ার অনুষঙ্গে সে বলেঃ ‘ হাজারটা ঘটনা আমার মনে পড়ল, হাজারটা মুখভঙ্গি ও ভ্রূভঙ্গি আমার মনে পড়লো, হাজার সংলাপ, হাজার গল্পের খোরাক, ঘর ও বারান্দা, প্রভাত ও সন্ধ্যা, রৌদ্র ও বৃষ্টি, বিনিদ্র রজনী, সহস্র মিলন ও বিচ্ছেদের নাট্যের খোরাক –এবং এই সমস্ত কিছুকে বাদ দিয়ে আমি শুধু বলছি যে আজ সন্ধ্যায় আমার জীবন শূন্য হয়ে গেলো, আমার অন্তর বিদীর্ণ হয়ে গেলো, এবং আমি বুঝতে পারছি যে কেউ সে কথা বিশ্বাস করবে না। ... আমি আমার কলমটার দিকে তাকালাম, কতো চিঠি সে লিখেছে, কত মনের কথা, কত অনুভুতি,কত সুন্দরভাবে সূক্ষভাবে প্রকাশ করেছে ... কিন্তু তার পেছনে একটা প্রেরণা ছিল, পটভূমিতে  একটা চালিকা শক্তি ছিল...’  - আজ সেই চালিকা শক্তি, সেই প্রেমাস্পদা নেই। তাই এই কলমও যেন মনেহচ্ছে আর সক্ষম হবেনা প্রকাশ করতে কোনো ‘অনুভুতি’, ‘সুন্দরভাবে’, ‘সূক্ষভাবে’- আগের মতন। কিন্তু তার পরেই আমরা দেখি, যে, আরোও একবার সে গিয়ে বসেছে রেডিও স্টেশানের মাইক্রোফোনের কাছে অর্থাৎ তার কলম তার কথা শুনেছে, সক্ষম হয়েছে প্রকাশ করতে তার ‘অনুভুতি’, ‘সুন্দরভাবে’, ‘সূক্ষভাবে’- আগের মতন। অর্থাৎ যাওয়ার পথে যে গিয়েছে তারি পিছু পিছু এসেছে নূতন। সেই নূতনকে সে টের পাচ্ছেনা। তাই গল্পের শেষে সে যখন আবিষ্কার করে, যে, এইবার কলমটিও হারিয়েছে, তখন আবার সে অনুভব করছে ‘আমার অন্তর বিদীর্ণ হয়ে গেছে’... তথাপি কলমের পরিবর্তে তার হাতে উঠেছে পকেটে রাখা পেন্সিল। হ্যাঁ, এইবার এই পেন্সিল নেমে সেই হারানো কলমের শূন্যস্থান। সে আবার লিখবে। আবারো এসে বসবে, এইভাবেই, মাইক্রোফোনের সামনে। কিন্তু তার চেতন-মন যেহেতু এই হারানোতেই ‘আচ্ছন্ন’ তাই সে ছুঁতে পারছেনা বিশ্ব নিয়মের এই সূত্রটিকে... না’কি তা ছুঁয়েই সে “আচ্ছন্ন” হয়ে আছে?  এই নিস্পত্তির দায় পাঠকের হাতে ন্যস্ত করে চলিহা চলেযান অন্য গল্পে ...
        ‘বাসন্তিকা’ গল্পের প্রোটাগোনিষ্ট এক যুবক গবেষক যার ধারনা অন্য অনেক ভালো চাকরীর প্রলোভন ছেড়ে সে এই গবেষণায় জড়িয়ে পড়ার হেতু সে তার এই বাসস্থানটি -যেটি একটি মেস্‌ বাড়ির একটি ছোটো কোঠা, অন্ধকার, ভিড়ে গিজ গিজ, চীৎকার চেঁচামেচির পীঠস্থান –ছেড়ে যেতে চায়না। ছেড়ে যেতে চায়না তার হেতু, তার নিজের ধারনায়, এই মেসের উল্টো দিকের বাড়িটিতে, যা এরকমই -অন্ধকার, ভিড়ে গিজ গিজ, চীৎকার চেঁচামেচির আরেক পীঠস্থান – সেখানে বাস করা একটি মেয়ে। অথচ সেই মেয়ের সঙ্গে না আছে তার পরিচয়, না জানে মেয়েটির নাম। শুধু জানে মেয়েটি জীবন যুদ্ধে হয়রান। চাকরী করে। তারপর টিউশান। অসুস্থ মা কিংবা দিদিমাকে সামলায়, আছে ছোটো ছোটো ভাইবোন (?) ... এই মেয়েকে ঘিরেই তার বসন্তকল্পনা। পক্ষান্তরে জয়েসের এরাবি’র খুদে প্রোটাগোনিষ্ট’এর আবহ এইঃ ‘নর্থ রিচমন্ড রোড । এক নিঝুম কানা গলী। ক্রিস্টান ব্রাদার্স ইস্কুল যখন ছুটি হলে তখনি কয়েক মিনিটের জন্য জাগতো গলীটা। গলীর শেষে এক ফালি চৌকো জমি। একলা একা । তাতে এক দোতলা বাড়ি। পরিত্যক্ত।  বাদ বাকি বাড়ি গুলোর দৃষ্টি শীতল। চোখ বাদামী। নিজ নিজ আভিজাত্যের গল্প আগ্‌লে তারা তাকিয়ে থাকতো একে অন্যের মুখের দিকে। ( অনুবাদ বর্তমান লেখকের) সে’ও তাকিয়ে দেখতো পড়শী বালিকাকে। মর্মে তারো বসন্তের দূতী ঐ বালিকা।  - এই সামঞ্জস্য নিয়ে আরম্ভ হয়ে ‘এরাবি’র শেষে আমরা দেখি প্রেমিকমনের ‘ভেনিটি’র সংজ্ঞা যা ভেঙ্গে যায়, অবশেষে, এরাবি’র মেলা থেকে ‘কিছুনা কিছু তোমার জন্য আনবোই’ প্রেমিকের এই স্পর্ধিত উচ্চারণের পরাজয়ে আর ‘বাসন্তিকা’র শেষে আমরা দেখি  নিজের গবেষণার কাজে মন প্রাণ দিয়ে অতঃপর সফল হয়ে ( যে সফলতা, প্রোটাগোনিষ্ট জানে, বড় জোর কোনো জার্ণালের ফুটনোটে অমুক গবেষকের ‘দল’ বলে উল্লিখিত হওয়া ভিন্ন কিছুই নয়) সে ভুলেই যায় যে তার ঐ মেয়েটি কখন ঐ বাড়ি ছেড়ে চলেই গিয়েছে আর তখনি বসন্ত এসেছে তার মর্মে । এই যে ভালবাসা যা “সম্মুখ পানে চলিতে জানে”, “চালাতে জানে” তারি ইঙ্গিত হয়ে এই গল্পে বার বার রবীন্দ্রসঙ্গীতের আনাগোনা...
           সমস্ত বড় লেখকের মতোই সৌরভ চলিহার গল্পেরো অনেক স্তর। আমি বল্লাম শুধু একটি স্তরের কথা। বাকি স্তরগুলি পাঠকের নিজ পাঠের মূল্যে আবিষ্কৃত হওয়ার জন্য রেখে দিচ্ছি শুধু এই টুকু বলে যে ঐ মেস্‌বাড়ির লোডশেডিং এর সন্ধ্যাটি, আহা, যেন অনন্তের একটি খন্ড আর বাঁশরিয়া কানাইবাবু... মনেপড়ে বিমল কর’এর ‘জোনাকি’।
        সৌরভ চলিহার কিছু গল্প ঘটে   যায় গল্পের চরিত্রের অন্তর্জগতেও। যেনবা আয়নার ভিতরে আয়না, যেনবা ছোটবেলার জ্বরশয্যার পাশে সেই বার্লির শিশি যাতে আঁকা একটি শিশু, তার হাতে বার্লির শিশি, আবার ঐ ছবিটিতেও আঁকা একটি শিশু, তার হাতে বার্লির শিশি ... এমনি এক কাহিনী ‘ইরা’ যার আরম্ভেই ইরা’র সোনার আঙ্গটি হারিয়ে যাওয়ার খবর মোটা দেহ ও মোটা মাথা সম্পন্ন ইরা’র দাদা জানান দেয় নিজের এক বন্ধুকে। বন্ধুর কাছে তার দাবী যেহেতু বন্ধুও ইরা’কে দেখে নিজের বোনেরি মতন তাই ইরার চিঠির উত্তরে কী লেখা যায় তা ঐ বন্ধু যেন তাকে বলেদেয়। এইবার নির্মিত হতে থাকে ‘ইরা’। নির্মিত হতে থাকে ঐ ‘বন্ধু’র মর্মে। এই যে নির্মিত হওয়া, ইরা’র, এ যেন এক স্থূল, অনুভুতিহীন গ্রহের আকাশে নির্মাণ ‘প্রেম’ এই শব্দটির। পাঠক, এই ‘প্রেম’এর গল্পের অনুষঙ্গে আমার মনে আসে ডাব্‌লিনার্সের এক মারাত্মক অপ্রেমের গল্প যা আগাগোড়া নির্মীত প্রেমের গল্পেরি আদলে... পাঠক, দুটি গল্পই আপনাকে পড়ে দেখতে অনুরোধ করি...
         এই ‘বীণা কুটীর’এ’ই পেলাম আমার দ্বিতীয় প্রিয়তম প্রেমের গল্পটিও। এর নাম ‘ভ্রমণ বিরতি’। এখানে আমরা দেখলাম যে শহরের ভিড় আর অসুন্দরের আবহ প্রোটাগোনিষ্টের মর্মে কেবলি উদ্রেক করতো বিতৃষ্ণার, যে গল্পের আরম্ভের আবহ বুনুয়েলের ‘দ্যাট্‌ অব্‌স্‌কিওর অব্‌জেক্ট্‌ অব ডিজায়ার’ ছবির আরম্ভের আবহের মতোই একটি বিস্ফোরন দিয়ে, সেই শহরি, মাত্র দুদিনে, তার মনে মনে ভালবাসার মেয়েটির তাকে একবার বলেফেলা ‘লক্ষীটি’ শব্দে কিকরে হয়ে ওঠে সবুজ, করুণ ...
     ‘বীণা কুটীর’ এর প্রতিটি গল্প দাবী রাখে আলোচনার। ইচ্ছে হয় ‘ওরাও পাহাড় বেয়ে উঠলো’ গল্পটিকে সম্পূর্ণ উধৃত করে দিতে, বলতে “হারাল” গল্পটির কথা যেখানে প্রকৃত হারানোর সঙ্গে মর্মে চির সঞ্চিত হয়ে থাকার প্রক্রিয়াটি কাহিনীর এক মূল অক্ষ, তার কথা। সেই গল্পের আরম্ভ এভাবেঃ ‘মহম্মদ রফি বা মুকেশ, আজ আর ঠিক মনেপড়ে না। গানটির কথাগুলিও আজ আর মনে নেই, শুধু তার শুরুর বাজনাটা মাঝে মাঝে কখনো মনের মধ্যে গু্নগুন করে বেজে ওঠে অকস্মাৎ, অপ্রত্যাশিত, নানা জায়গায়’। -একেই কী বলে হারিয়ে যাওয়া, না কি, এ চিরন্তন হয়ে জেগে থাকা? মর্মে? জানিনা। প্রথম পাঠে, তার পরের দুই-তিন পাঠেও জানিনা। আরো অনেকবার পড়বো। ঠিক। তারপরেও জানবো কি’না জানিনা।


বীণা কুটিরঃ সৌরভ কুমার চলিহা
ভাষান্তরঃ দেবাশিস তরফদার
প্রথম প্রকাশঃ ২০১১

২৭ মার্চ্চ – ১২ অগাস্ট ২০১৩
বেঙ্গালোর


রবিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৩

কবির স্বদেশ

             ।। দেবাশিস তরফদার।।
           (লেখাটা বেরিয়েছিল, মিহির মজুমদার, সঞ্জয় চক্রবর্তী, অভিজিৎ লাহিড়ী সম্পাদিত গুয়াহাটির ‘মহাবাহু’কাগজের  বর্ষা , ১৪১৭ সংখ্যাতে। লেখাটিকে আমাদের ঈশান ভারতের লেখককুলের প্রাথমিক ইস্তাহার বলা যেতেই পারে। যদিও ইতিমধ্যে আরো অনেকেই এই নিয়ে লিখেছেন। আমাদের ঈশানের পুঞ্জমেঘের প্রয়াসেরও এই লেখাটি একটি দিগদর্শক বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। ভাল হতো আমাদের এই অন্যতম প্রিয় কবি গদ্য শিল্পী দেবাশিস তরফদার নিজেই যদি লেখাটি এখানে তুলতেন। কিন্তু তিনি একান্তে থাকতে ভালো বাসেন। আন্তর্জালে থাকলেও নিজের লেখা নিজে কিছুতেই পড়ান না। আমরা তাই নিজেরাই লেখাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভেবে খানিক শ্রম স্বীকার করে নিলাম। --সুশান্ত কর।)

কথাটা বস্তাপচা শোনাতে পারে, তবু এক কথা না বলে পারি না যে সত্য এবং সুন্দর—দুটোই আমাদের চাই। আমদের জীবনে দুটি তৃষ্ণাই আছে।
       সত্যের ক্ষেত্রে চরাচর এবং অনাদি অনন্তকাল। সত্যের আঞ্চলিকতা বা আধুনিকতা হয় না। কিন্তু সুন্দরের সত্যটি দেশকালে বাঁধা। বৈচিত্রই তার অস্তিত্বের শর্ত। তাই, আমাদের সাংস্কৃতিক সত্তা, শত প্রভাব মেনে নিয়েও একটি দেশকে আশ্রয় করেই বেড়ে ওঠে।
    নিজের সাংস্কৃতিক সত্তা নিয়ে যখন ভাবি, দেখতে পাই তার উপাদান একাধিক। বাঙালি? অবশ্যই। বিশেষ অর্থে , হিন্দুও। কিন্তু আরো একটি বড় উপাদান আমি  অস্বীকার করতে পারি না—আমি উত্তর পূর্বের সন্তান। আমার মধ্যে এমন কিছু রয়েছে, যা আমাকে শুধু শিলচরের বাঙালি বা যোরহাটের অসমীয়ার সঙ্গে নয়, একজন খাসি, মিজো, মিতেই বা নাগার সঙ্গেও আত্মীয়তার বন্ধনে বাঁধতে চায়।
        সেই জিনিসটা কী? উত্তরপূর্ব ভারত বহু বর্ণ, এখানে কত যে ভাষা, হিন্দু মুসলমান খ্রিস্টান তিনটি ধর্মেরই লোক প্রচুর, সাংস্কৃতিক বৈচিত্রে এর তুলনা পৃথিবীর খুব কম ভূখণ্ডেই আছে। কোন্ সে সূত্র, যাতে এই নানা রঙের মণিগুলি মালাবদ্ধ হয়ে আছে?
          এর উত্তর, আমার বিশ্বাস , ভূগোলে নিহিত। ঘন শ্যামল ভূমি, মাঝে মাঝেই পাহাড়, দীর্ঘ বর্ষা, তীক্ষন শীত, জীবনের মন্থর ছন্দ, রঙিন বনভূমি এবং মুখর এক নৈঃশব্দ। ঠিক এরকমটি আর কোথাও নেই। অতল খাদের গা ঘেঁষে মন্থর সর্পিল গতিতে উঠে যাওয়া বাস, পাহাড় ও অরণ্যের মধ্য দিয়ে ধীর ছন্দে চলা রেলগাড়ি, বাসস্টপে চায়ের উনুনের পাশে নীরব ও হাস্যমুখ উলের টুপি পরা ছেলে, অদূরে বাঁশগাছ, কখনো বা সুপুরি গাছে শোভিত লাল টিনের চালের ‘আসাম টাইপ’ বাড়ি, রোদে মেলে দেওয়া উজ্জ্বল রঙিন চাদর, কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে বা মেঘমেদুর দুপুরে টিনের চালের হোটেলে সাদা জুঁইফুলের মতো আতপ চালের ভাত, পথের পাশে ঝরনা বা ‘ছড়া’, সিঁড়ি নেমে গেছে পাতালে, সেখানে লাল টিনের ছাদ, কোথাও বা বাঁক ফিরতেই দু’পাশে চায়ের বাগান, কোথাও বা লাল চাদর পরা দুটি যুবতী তুচ্ছ কথায় ফেটে পড়ছে হাসিতে। আর ক্ষণে ক্ষণেই ফিরে আসছে নৈঃশব্দ্য। তারপর আবার সুপারিগাছ। আবার কলাগাছ। লাল নরম মাটির পাহাড়, ধান ক্ষেত। কোথাও পাথর গড়িয়ে পড়ে রাস্তা  বন্ধ। আর বিকেল হতেই সন্ধ্যা নেমে এল।
            এই ছবিগুলি কোথায়? হারাঙ্গাজাও না আমবাসা-তে? কাকচিং-এর পথে, নাকি নংপো-র পথে? একি শিলচরের রাঙিরখাড়ির সন্ধ্যা, নাকি ইমফলে থোয়থং-এর সন্ধ্যা? চেরাপুঞ্জির বৃষ্টি, না হাফলঙের? বলা যাবে না। সব মিলে মিশে গেছে। এ একটা ভূগোল।
          ধর্মীয়, ভাষিক বা সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের কথা আমরা শুনতে পাই, ভৌগলিক জাতীয়তাবাদ কি হয় না? জানি না। কিন্তু আমি যখন উত্তরপূর্ব ভারতকে একটি সত্তা হিসেবে দেখি, একটি সত্যি হিসেবে দেখি, এবং নিজেকে তার অংশ হিসেবে ভেবে আনন্দিত হই, তখন হয়তো এই ভৌগলিক অনন্যতা অবচেতনে কাজ করে।
           আমরা , এই ভূখণ্ডের বাঙালিরা, বাঙালি হয়েও যেন অন্য একটি জাতি, যেমন আমেরিকানরা ইংরাজিভাষী এবং ইংরেজ সংস্কৃতির হয়েও ইংরেজ নয়। এর প্রধান কারণ ভূগোল।
           এবং, অবশ্যই, নতুন ইতিহাস। আমাদেরও , যারা সাতবোনের মহাদেশে থাকি, বা বড় হয়েছি, আমাদেরও একটা নতুন ইতিহাস আছে। তার রঙটি বহুবর্ণতার। হ্যাঁ, এই মহাদেশে অনেক সংঘাত, দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস আছে। কিন্তু সব ছাপিয়ে যা বড় হয়ে ওঠে, তা এই রঙের অসীমতা। ঠিক যেন এই ভূখণ্ডেরই কোন বনভূমির মতো।
         গত ডিসেম্বরের এক সকালে গুয়াহাটি হ’তে ডিফু ডিমাপুর হয়ে যোরহাটগামী একটি ট্রেনের কামরাতে বসেছিলাম। সহসা অনুভব করলাম, চারপাশে বিচিত্র স্বর, দেখতে পেলাম বিচিত্র মুখচ্ছবি, কেউ বা অসমীয়া, কেউ বাঙালি, কেউ মিকির, কেউ মিসিং, কেউ মিজো, কেউ নাগা ( কোন্ নাগা? আংগামী, আও, সেমা, টাংখুল?) । কেউ বা হয়তো মাড়! কোন খ্রিস্টান মেয়ে বড়দিনের ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছে, তার পাশে বোরখা পরা মহিলা। লালকালো চাদর পরা লালটুকটুকে নাগা মহিলার পাশে ঘনকৃষ্ণ চা-বাগান-জনগোষ্ঠীর মহিলা। একটা অনির্বচনীয় আবেগে  ভরে উঠল আমার মন। একটা মহাদেশকে যেন দেখতে পেলাম।
         এই ছবিটা উত্তরপূর্ব ভারতের অন্য কোন জায়াগায় হয়তো দেখতে পেতাম, হয়তো একটি বাসে। অন্য কোনো ট্রেনে। একটি যাত্রীবাহী ভাড়াটে জীপে। কোন এক ইস্টিশনের ভাতের হোটেলে। এই বাসগুলি, ট্রেনের কামরাগুলি, ইস্টিশনগুলি যেন এই বর্ণময় মহাদেশের ক্যালেণ্ডার। যেমন বড় বড় বিমানবন্দরগুলি আধুনিক বিশ্বের ক্যালেণ্ডার।
         এই অতীব নীল আকাশ, এই অতীব উজ্জ্বল রৌদ্র, এই হিম বাতাস, এই চরাচরবিপ্লাবিনী বৃষ্টি, এই নিঃশব্দ অরণ্য, নানা রঙের ফুলের মতো নানা রঙের মানুষ, তাদের সৃষ্টিকে এই বৌগলিক সত্য প্রভাবিত করে কি? আমার অন্তঃসাক্ষ্য বলে যে তা সত্য, যদিও এই প্রভাবের প্রকাশ সাংবাদিকের প্রকাশ নয়।
        আমার বিশ্বাস , আমরা কলকাতা বা তার উপগ্রহের বাঙালিদের চেয়ে স্বভাবত আলাদা। আমরা যেন আরেকটু খোলামেলা, আরেকটু সুখী, আরেকটু ইন্দ্রিয়প্রবণ। এর প্রকাশ কি কোথাও ঘটছে না?
অনেক সময় নানা ছোট কাগজের অনামী লেখক লেখিকার ‘কাঁচা’ লেখাতে এই স্বভাবের প্রকাশ দেখেছি। দেখে, আক্ষেপ হয়েছে মনে , ওই গুণগুলি হারিয়ে ফেলার জন্যে। কিন্তু সব কি হারায়? এই আলো-হাওয়া-রৌদ্র কোথাও কি সূক্ষ্মভাবে মিশে নেই? কে জানে!
           আমাদের বিশিষ্ট প্রকৃতির প্রকাশ হয়তো সব সময় আমাদের লেখায় ঘটেনি। তার দুটো সম্ভাব্য কারণ—অতিরিক্ত পাঠ , এবং অতিরিক্ত কলিকাতা মুখিনতা। এ ছাড়া, এ যুগের ‘উন্নয়নকামী’ দেশগুলির মধ্যে সতত একটি উদ্বেগ কাজ করে। একে চলতি বাংলাতে বলা যেতে পারে—‘লেটেস্ট’ হ’তে চাওয়া, এবং ‘উহাদের মতো হতে চাওয়া। এই উদ্বেগ থেকে দেখেছি কারো মুক্তি নেই, আমাদের এই প্রিয় মহাদেশের কোন জাতিরই নেই।
           বাংলার সভ্যতা এক সময় বৃহৎ ভারত এবং বৃহৎ বিশ্ব থেকে পুষ্টির উপাদান আহরণ করেছিল, একই সঙ্গে নিজের লোক সংস্কৃতি থেকে রস শোষন সে করেছে। গত কয়েক দশক থেকে তার আহরণের ক্ষেত্র অত্যন্ত সংকীর্ণ হয়ে এসছে। তার আত্মপরিচয় এখন কলকাতা+ ইয়োরোপ+ দুই আমেরিকা। কলকাতা এবং ইয়োরোপের মাঝখানে আর কিছু নেই, একটি বন্দর নেই।
          উত্তর পূর্বের বাঙালি কি একই ভুল করবে? আমাদের রস আহরণের একটি ক্ষেত্রে –এই সাত বহিনীর মহাদেশের দিকে আরো মনোযোগ, আরো দরদ দিয়ে কি আমরা তাকাব না?     
       
           ইংরাজি ভাষাটা আমরা মোটামুটি জানি, আর অসমীয়া ভাষা একটু আগ্রহ করলেই জানতে পারি, এবং এই দুটি ভাষার সাহায্যে উত্তরপূর্ব ভারতের বহুবর্ণ সংস্কৃতির স্বাদ আমরা পেতে পারি। যদি শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের সৃষ্ট অনুপম আধ্যাত্ম-সামাজিক সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হই, যদি জ্যোতিপ্রসাদের মধুময় সংগীতের স্পর্শ পাই, বীরেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্যের এপিক উপন্যাস পড়ার সুযোগ পাই, খাসিয়া কবি সো সো থামের কবিতায় সাবেকি চিনা কবিতার স্বাদ পাই, নাগা লেখিকা টেমসুলা আও-র গল্প ‘সোয়াবা’ পড়ে দ্রবীভূত হউ, মণিপুরের অভিরাম শ্যাম শর্মার ‘ইমাগী নিংথেম’ ছবিটি দেখে বাক্যহারা হই, তবে আমরা যে ধনে ধনী হব, তার কণামাত্র ল্যাটিন আমেরিকা নিয়ে কচলালে আমরা পাব না।
         তখন দেখতে পাবো, শুধু মাতৃভাষা নয়, মাতৃভূমিও ‘পূর্ণ মণিজালে’। স্বভাষার উত্তরাধিকার এবং স্বদেশের সম্পদ—এই দুটো মেলাতে পারলে হয়তো আমরা নবজন্ম লাভ করব। তখন আমাদের সাহিত্যকে আলাদা করে চেনা যাবে, যেমন আমেরিকান কবিদের—রবার্ট ফ্রস্ট, এডউইন আর্লিংটন, রবিনসন, এডনা সেণ্ট ভিনসেন্ট মিলে,এমিলি ডিকিনসনদের আমরা ইংরেজ কবিদের থেকে আলাদা করে চিনতে পারি।
এবং তখনই আমরা বাংলা সাহিত্যকে নতুন রস যোগাতে পারব।

শুক্রবার, ১১ অক্টোবর, ২০১৩

তুমি আমার অনেক কিছুই,আমি তোমার কেউনা

(c)ছবি
১

আমার প্রিয় শহরটায় নাট্যচর্চা সবকালেরই ক্লাসিক্যাল পর্যায়ের। মনে আছে,বাবাকে ছোটবেলায় একটা নাটকে রাক্ষস হতে দেখেছিলাম। নাটক চলাকালীন রাজা বাবার কান কেটে দিয়েছিল বলে অডিয়েন্সের চেয়ার থেকে চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিলাম। নাটক সেরে বাবা ফিরে আসার পর বুঝতে পেরেছিলাম, নাটকে আসলে সবকিছুই মিথ্যে মিথ্যে হয়, তখন থেকেই বোধ হয় সত্যি সত্যি কি হয় তা জানবার ইচ্ছেগুলো সুযোগ পেয়ে গেছিল তীব্র হয়ে ওঠার। যাই হোক, বাবা জেঠুদের কেউই শেষপর্যন্ত সেই ক্লাসিক দলতন্ত্রে আর বিশ্বাস রাখতে পারেননি।
            যারা ইদানিং বিশ্বাস রাখছেন, কিশোর বয়স থেকে ওরাই আমার হিরো। তাদের সাথে অনেকবারই নাটক করার সুযোগ হয়েছিল। তাদের চিনেছি,মননের অনেক জটিলতা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এমনই একটা নাটকের রিহারসেলের সময় হথাৎ ঝিলমিলকে দেখেছিলাম। প্রথমদিন তাকে দেখে একটু বিরক্তিবোধ হয়েছিল। কেননা রিহারসেল রুমের সামনে প্রায় দু’ঘণ্টা অনবরত ফোনে কথা বলতে দেখেছিলাম ওকে। ডিজিটাল বিপ্লবের প্রভাব সমৃদ্ধ এই প্রতিরূপটাকে আমি হোস্টেল জীবন থেকেই সহ্য করতে পারিনি। নিজেও চেষ্টা করেছিলাম কয়েকবার, একপ্রকারের খামখেয়ালী আচ্ছন্নতাভরা যাপনের প্রতিফলন ছাড়া কিছুই পাইনি তাতে।
          নাটক ঘনিয়ে আসছিল ,আমাদের রিহার্সেল হচ্ছিল না। কেউ ডিরেক্টারের কর্তব্য, কেউ পজেটিভিটির সঙ্গায় যখন আগ্রহ সহকারে ডিবেট তৈরি করে চলেছিল ঝিলমিল তখন গেয়ে চলেছিল একের পর এক গান। মেয়েটা ক্লান্তিহীন, যেমন কথা বলাতে ঠিক তেমনি গানেও। মনে মনে ভেবেছিলাম, ঝিলমিল যেখানে থাকবে সেখানে আর আলাদা করে রেডিও মির্চির কোন প্রয়োজন নেই,ঝিলমিল কে বলেও ছিলাম সে কথা। নাটক শেখা আর নাটক করবার তীব্র ইচ্ছেগুলোর ফাকে আমার কান ঠিক পড়ে থাকত ঝিলমিল এর গানের কাছে। এমনই একদিন ওকে গাইতে শুনলাম একটা তীব্র অবসাদের গান
              “এ পেয়ার তু নে কেয়া কিয়া............এক হি পল মে আচানক দি হে সারি খুশিয়া......লি হে সারি খুশিয়া”
জানতে ইচ্ছে হল। ঝিলমিলকে,কাছে গিয়ে বসলাম। প্রশ্ন আর কথার কোটরের ফাঁকে লক্ষ্য করতে থাকলাম ঝিলমিলের চোখের নিচের কালশিটে দাগ। গল্পের পরে গল্প যুগিয়ে প্রেমহীনতাকে ভুলে যাবার কৌশল।
              নাটকে ওকে আমার ভীষণ জোরে বকতে হয়েছিল মিথ্যে মিথ্যে। কিন্তু নাটক মঞ্চস্থ হবার পরে বাড়ি ফিরে এসে বুকের মধ্যে ভীষণ একটা কষ্ট অনুভব করছিলাম।সেই কষ্টটা যে কিসের ছিল তা আজও অজানা। সেই কষ্টটা নিয়ে আমি কোন কবিতা লিখতে পারিনি।
         পৃথিবী ঘুরতে থাকছিল তার নিজস্ব লয়ে.. কী করে কি জানি ওর সাথে বন্ধুত্ব হয়েগেছিল। আবার সেই কথা আর গানের কোটরের ফাঁকে ফাঁকে ঝিলমিল বলে ফেলছিল তার পুরনো প্রেমের কথা।পাঁচ বছর প্রেম করেছিল ঝিলমিল!তারপর হঠাৎ সেই সম্পর্কটা কেন ভেঙে গেল সেই প্রশ্ন আমি ওকে করিনি।
              এখন আমি ঝিলমিলের বাড়িতে বেড়াতে এসেছি। ঝিলমিল কে বলেছি এক কাপ চা খাওয়াতে।চায়ের চুমুকের ফাঁকে ফাঁকে শুনতে পাচ্ছি ঝিলমিল বলে আবার বলে ফেলছে না বলতে পারা কথাগুলি। অভিযোগগুলি ক্রমশ ফেলে দিচ্ছে পুরনো প্রেমিকটার ঘাড়ে।
           ‘-জানো ও না কোনদিন আমার সাথে জীবন নিয়ে কোন কথা বলেনি।শুধু মা,বাবা প্রফেশন এসব। এভাবে হয়?’ চুপচাপ চা খেয়ে একা বাইকে করে বাড়ি ফিরে আসার সময় বা হাতে চুল ঠিক করতে করতে ফাকা রাস্তায় ঠিক নাটকের মত করে চিৎকার করে নিজেই নিজেকে একটা সংলাপ বলে উঠলাম -
                ‘’শুভ, তুই পড়াশোনাটা ঠিক করে করলিনা কেন রে?’’

২

বাড়ি ফেরার একটু আগে বাইকে বসে বসে আরো ভাবছিলাম।
-ঝিলমিল যে প্রথাগত মেয়েদের মত নয় সেটা ও নিজেও জানেনা,ওর রোগা শরীর আর ঘুম ঘুম কথাগুলোর মধ্যে যে একটা অনাবিল শান্তি খুঁজতে চায় সরলতা ওর বাড়ির গাছের ছায়াগুলো বোধ হয় সেটা খুব ভালো করে বুঝতে পারে।
-ফোনে ও আমাকে অনেকবার নীল রঙের কথা বলেছে,বলেছে শীতে পাতিয়ালা আর নীল জ্যাকেট পরতে।
 নীল আমার সবচাইতে পছন্দের রঙ,শব্দটাও।স্বপ্নের ঠিক পরেই নীল লিখলে শব্দটা ‘স্বপ্ননীল’ হয়ে যায়।স্বপ্ন আর নীলের কি নিবিড় সেই বন্ধুত্ব!!
-আহা!
-পাতিয়ালা প্রথম দেখেছিলাম কোলকাতা কিডস্ট্রীটে একজন চাইনিজ পর্যটকের পায়ে।সেদিন থেকেই চোখে লেগে ছিল।
-কিন্তু ঝিলমিলকে তো আগে এসব কিছুই বলিনি।
-কি করে জানল ও?
ওর বা হাত থেকে একটা চুড়ি খুলে চোখ আর চশমার ফাঁকে বসিয়ে একদিন মোবাইলে
একটা ছবি তুলেছিলাম। ম্যাগ্নিফাইন গ্লাসের মত লাগছিল চুড়ি আর চশমাটাকে একসাথে।
ফিকফিক করে হাসছিল ও,আর আমি বড় করে দেখছিলাম ওর প্রাণবন্ততার বিপন্ন ছটফট!
বাড়িতে ঢুকলাম,গ্যরাজে বাইকটাকে সাইডস্ট্যান্ড করিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম স্ট্যান্ডটার দিকেই।মনে হল,ছোট্ট স্ট্যান্ডটা যেন একশপঞ্চাশ কেজি ভার সামলাতে সামলাতে
ডিপ্লোম্যাটিক একটা মন্তব্য করতে চাইছে...
-“তুই আমাকে তোয়াক্কা না করলেও,আমি তোকে তোয়াক্কা করি!”

৩

গতকাল দুপুরে ঝিলমিল-কে একটা মেসেজ করেছিলাম।বলেছিলাম সন্ধ্যায় নাটক দেখতে যাবার কথা।কোন উত্তর দেয়নি তাই সন্ধ্যায় একবার ফোন করেও জানতে চেয়েছিলাম ও যাবে কিনা।
-আমি টিউশন পরাচ্ছি,তুমি দেখে এসে আমাকে জানিও,কেমন হয়েছে।
জানিনা ঝিলমিল কী ভবেছে প্রশ্নটা করায়।আমি শুধু ওর কাছে উৎসর্গ করতে চাইছিলাম আমার প্রিয় বন্ধুদের রঙিন দৃষ্টিময়তা...
          যে নাটকটা হবে সেটা ছোটবেলায় আমিও অভিনয় করেছিলাম।মনে পড়ে,নাটক করবার জন্য ক্লাস-ওয়ার্ক খাতার পাতা ছিড়ে ছাতার ডগায় মুড়ে বিপ্লবী মিছিলের কথা,ফলস্বরূপ প্রথমবারের মত দেয়াল চরিত্রে অভিনয় করবার চান্স।
          এখনও নিজেকে সেই দেয়ালের মতই মনে হয়।ইচ্ছের শিশুগুলির সামনে আজও যেন একটা দেয়াল বানিয়ে রাখি,কী জানি তারা সাজানো কোন বাগান নষ্ট করে দেয়...রাতে ঘুমোবার আগে আরেকটা মেসেজ করলাম ঝিলমিল-কে
-Great work by Kushal & Abir.In the next youth festival we will do something together.

ঘুমের মধ্যে আবছায়া রকমের একটা স্বপ্নে দেখতে পেলাম সাদাকালো রঙের জামা পরা ঝিলমিল-কে একটা বিদঘুটে রাক্ষস জড়িয়ে ধরতে চাইছে,প্রাণপণে আটকানোর চেষ্টা করছি আমি,শেষটা দেখেতে পেলাম না।অর্থহীন রয়ে গেল স্বপ্নটা...

          আজ সারাদিন ওর সবকটা নম্বরে ডায়েল করেই চলেছি।বারবার বিজি টোন দেখাচ্ছে!
দুপুরে একটু ঘুমিয়ে নেব বলে মন স্থির করে ফেললাম কেননা রাতে ঘুম ভালো হয়নি, স্বপ্ন দেখলে নিরেট ঘুম হয়না ...

৪

সক্রেটিস হাসতে হাসতে বিষ খেয়েছিলেন ঝিলমিল।
তার বন্ধু বান্ধবরা অনেক চেষ্টা করেছিলেন সময় বুঝে তাকে নিরুদ্দেশ করে দেবার।
তিনি ব্যাক্তিগতভাবে সামগ্রিক সিদ্ধান্ত এড়াতে চাননি!
তুমি প্রেমের বিনিময়ে বাঁধনছাড়া হতে চাও আজ! বাঁধনছাড়া হতে গেলে যে প্রথমেই চাই বাঁধনের দীর্ঘ অভ্যাস সেটা তোমার জানা নেই?
আমার ও জানা ছিলনা!
তবু ও তোমার মুগ্ধতাকে আমি শব্দরূপ দিয়েছি, ঠিক অস্ত্র যেমন ধাতুরূপে দ্বন্দ্ব খোঁজে সারাদিন শুধু একটা গোলাপের জন্য, সেভাবে...
জানো?
চাঁদের কাছে পৃথিবী খুব অসাড়,একটা নীল দানবের মত!আরেকটু ভেবে দেখ...
গ্রহ,উপগ্রহ,জন্মান্তর ওরা কেউ কিন্তু আসলে কোন কাজ করেনা!!
শুধু গোল গোল ঘোরে আর নিজেদের প্রতিসরন শূন্য করে দেয়!
তুমি দ্বিমত পোষণ করতে পারনা কেননা তোমার কাছে বিজ্ঞান অর্থহীন হতে পারেনা...

এমা!একি ঝিলমিল? তুমি চুপ করে আছ কেন? তর্ক কর...
তুমিতো পাঠচক্র,আশ্রম কোনটাই বাদ দাও না!
কোনদিন শোননি শ্রীকৃষ্ণের সেই উপদেশ বাক্য?
“তর্ক জীবনের আধার। তর্ক ছাড়া বিশ্বাস অটুট হয় না।“
না জেনে না শুনেই জলের গভীরতা মাপতে দু’পা ডুবিয়ে ফেলেছ?
সাতার জানো?
কি বললে? জাননা!!!
তারপরেও তোমার দৃঢ় বিশ্বাস যে তুমি ডুববে না!!!
স্ট্রেঞ্জ!!!

এসব কথা আমি আর ধরে রাখতে পারছিলাম না, বাগবিতণ্ডা, ঝগড়া আমার খুব একটা পছন্দের নয় তাই তোমাকে এভাবে বোঝাচ্ছি।
এ কী! কান বন্ধ করে আছ কেন?শুনবেনা???
শুরুতে বললেনা কেন যে তুমি এসব কিচ্ছু শুনতে চাওনা!!!
আচ্ছা তুমি কি চাও বলত A,B,C,D সবাই! সবাই তোমার প্রেমে পড়ে যাক?
আর তুমি আফিমের নেশায় মত্ত থেকে থেকে জুড়ে দাও কবিতাকাহিনি?
পারবেনা!!
কেননা এভাবে হয়না !!!!
আর কয়েকদিনের মধ্যেই আমি নিরুদ্দেশ হয়ে যাব।বিষ খুঁজতে চলে যাব সমুদ্রের নিচে।
তখন তুমি নিজে দেখে নিও অমৃতের শেষ প্রতিরূপ!
ব্রহ্মাণ্ড গ্রাস করার তার অভিনব পদ্ধতি!
এখন তোমার এসব কিচ্ছুই বিশ্বাস হবেনা। না হোক!
অন্ধকারে, রাস্তায় ফেলে রাখা সামান্য একটা দড়িকেও সাপ বলে মনে করে মানুষ।সময় যখন মানুষটাকে দড়িটার অনুমান সুচক দূরত্বে নিয়ে যায় তখন সে ঠিক বুঝতে পারে সব!!
আজ সক্রেটিসের জীবনী পড়তে পড়তে মাইগ্রেনের ব্যাথায় কপালের শিরাগুলি দবদব করছিল ঝিলমিল,জানি এখনও ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের আরও অনেক কঠিনভাবে জীবনকে যাপন করতে হয়, তবুও অনেক বকে ফেললাম!
কিছু মনে করোনা, আসলে আমি বকিনি,আমার ব্যাথাগুলো বকেছে তোমাকে...

আমাকে এখন ও স্যাবিকাসের মত ফ্লেমেঙ্কো শিখতে হবে ঝিলমিল, অনেক অনেক...
টিচার পাচ্ছিনা!!
নিজে নিজে আর কত শেখা যায় বল?
সক্রেটিসের একটা কোট তোমাকে মেসেজ করছি,বেশি হীনমন্যতায় ভুগলে মেসেজটা খুলে পড়ে নিও, ডিলিট করোনা প্লীজ...
“আমি জানি
আমি জানিনা
ওরা জানেনা
ওরা জানেনা...” ভালো থেকো...

৫

        ঝিলমিল তোমাকে আমার এঅঅঅঅঅ টা ভালো লাগে...
তোমার ঠোট চাপা বাঁকানো হাসিটাকে আমি কতবার ছড়িয়ে দিয়েছি কুয়াশায়...
শিশির হয়ে ওরা আবার আমার চোখের পাতায় জমে গেছে আর শীতল করে দিয়েছে আমার অপরাগ গুলিকে।
কাঁদব ঝিলমিল? তোমার আঙুলে মাথা রেখে?
      বাবা বলতেন হাতের আঙুল দেখেই নাকি বোঝা যায় মন...আমি তোমার আঙুল খুব স্পষ্ট করে দেখেছি...ভীষণ স্পর্শ লেগেছে জানো?
আমাকে বেহালা বাজানো শেখাবে? তুমি শেখালে আমি একটুও অন্যমনস্ক হবনা দেখো...
শিখতে শিখতে অনেক রাত হয়ে গেলে ঘুম পাড়িয়ে দেবেনা?
তোমাকে দেয়া একটা কথাও আমি রাখতে পারিনি... শাস্তি দিওনা প্লীজ...
আমি তোমাকে আর বকবনা...আর চাইবনা রাজা হতে...

এ কী! ঝিলমিল, তুমি হাসতে হাসতে কাঁদছ? তোমার কাছে গেলেই আমার সব বিস্মৃতিগুলি বিলীন হয়ে যায়,আমাকে একা একা খেলতে দেখলেই তুমি যখন দৌড়ে এসে বলে ওঠ...
“আমি আছিত”
খুব খুশি হয় মনের আর ঠিক তক্ষুনি আমি পাইপাই করে ভালো মানুষগুলোকে খুজে বার করতে শুরু করি আর বাতাসার মত ভালবাসা লুটাই...

আমার সব রঙ তোমার দেয়া উপহারের অনুমাংশ মাত্র...তুমি জাননা যে,তুমি রূপসার মত জড়িয়ে গেছ আমার রক্তে...আজ যখন কথায় কথা না বাড়িয়ে হঠাৎ বলে ফেললে ভালবাসার কাছে চাওয়াটা তোমার অনেক কম...তোমাকে বিশ্বাস করতে আমি বাধ্য হলাম...
তারপর থেকে...
আমি ক্রমশ শান্ত হয়ে যাচ্ছি... আমার সমস্ত ক্ষোভগুলি মিহিন বালুকনা হয়ে মিশে যাচ্ছে মরুঝড়ে...
তোমাকে প্রথমবার বলেছিলাম ভালবাসাবাসির কথা...তুমি হঠাৎ বলেছিলে কিচ্ছু না দেবার আশ্বাস... আমি ভয় পেয়েছিলাম... কিন্তু তুমি তাও জাননা ঝিলমিল... তুমি যা দিয়েছ টা আমার চাওয়া থেকে অনেক অনেক অনেএএএক বেশি...

তাই তোমাকে বারবার বলি তোমাকে আমার এঅঅঅঅঅ টা ভালো লাগে... তোমাকে সামনে পেলে আর যেতে দেবনা কোথাও... কোনদিন...

তারপর...
তোমাকে একটা সমূদ্র দেব...আর তোমার পিপাসার জন্য... বৃষ্টির ঝাঁক......

৬

শুধু...তিন চার দিনকে কোটেশনে রেখে আনন্দ করাটাকে আমি কোনদিন ও সহ্য করতে পারিনি ঝিলমিল...
তখন শুধু এই ভেবে ভাল লাগে যে কোন না কোন ছুতোয় হলেও তো হাসছে সবাই...গান গাইছে...রাত কে রাত বলে ভাবছে না...
এই চারদিন চোখে মুখে একটা অদ্ভুৎ রকমের অভিমান রেখে আমি সাজগোঁজ করি,একা হাঁটতে থাকি আমার বাড়ির পাশের বাধটায়...
বাধের পাশের নদীটা মায়ানীল হয়ে সারাদিন আমাকে প্রশ্ন করে...
-‘পুজো দেখতে যাবিনা?’
আমি বলি
-নাহ!!!
নদী আবার প্রশ্ন করে
-‘কেন?’
আমি রেগেমেগে উত্তর দিই
-‘ইচ্ছেটা আমার! জীবনটা আমার! তোর এত মাথাব্যাথা কেন?’
আমি এবারও সেম টু সেম রিপিট করব ঝিলমিল !কেননা তুমি আমার কাছে থাকবেনা...
মম হমম...বলতে হবেনা...
জানি......
মনে মনে সবসময় তুমি আমার কাছে থাক...কিন্তু বাস্তবে বাস্তবে,বছরের একটা দুটো অথবা তিনটে বিকেলে আমি তোমাকে চাইতেই পারি...আর ঠিক তখনও যদি সেই নামকরা ক্রিয়েটার
তার কোডিং চেঞ্জ করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে,
আমিও আমার মন ভালো করার চেষ্টা করব না!

ফোনে এসব কথা শুনতে শুনতে ঝিলমিল যে কখন একটা নির্জন রেস্তোরায় ঢুকে এক প্যাক ব্লাডিম্যারি অর্ডার করে ফেলেছিল সেটা কেউ দেখেনি... কোন কথা বলছিল না ও...একটা হালকা লাল ডিম স্পটলাইটের নীচে বসে বসে ব্লাডিম্যরিতে চুমুক দেবার সময় অবসাদগ্রস্ত
স্টিউয়ার্ড রা জ্বলজ্বল করতে দেখতে পাচ্ছিল ঝিলমিলের কাজল কে...

বাড়ি ফিরে বাদামী সোফায় মাথা রেখে ঝিলমিল ভাবতে থাকছিল নিষ্পাপ আকাশের কথা...
তখন সেই আকাশে ...
আমি লিখছিলাম...
আরেকটা অভিমান...
“দুঃখ শুধু দুঃখ এসে মোক্ষের পাশে বসে
বসে বসে সে যে ...অনায়াসে ...কঠিন অঙ্ক কষে...
সোজা পথ বেঁকে যাওয়া দেখে দেখে কালো পীচের দুঃখ বাড়ে
কলঙ্ক আর চাঁদ মিশে মেখে শহরটা ঘুম কাড়ে...........................”

৮

সারাদিন ঝিলমিল কে তন্ন তন্ন করে খুঁজছিলাম
থানায় প্রতিবাদ করার সময় টেবিলে এত জোরে থাপ্পড় বসালাম যে একটা কাচ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
হাতের আঙুলের নিচের একটা জায়গা কেটে ফালাফালা হয়ে গেল…
সঙ্গে ইমন ছিল…আমার রক্ত,তুলো আর ওর আঙুলের চাপেও বন্ধ হলনা
ইমন ডাক্তার
রক্তের সাথে ওর লেনাদেনা হয় রোজ, তবুও এমনভাবে হাত ব্যান্ডেজ করে দিল যেন হাতটা তার নিজের।
আজকাল ইমন নামে ওকে কেউ ডাকেনা… ইমন যখন গান লেখে আর নিজের লেখা গান গায়… খুব সহজ মনে হয় ওকে আমার… অথচ ইদানিং যুগের মেয়েদের ব্যাখ্যায় সে নাকি খুব জটিল…
আমি যখন সরলতার কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করি…… ইমন বলে
-‘আর কতবার প্রেম করবি বোকা?’
রাতে আড্ডা শেষ হলে কেন যে ও আমাকে রোজ রেস্টুরেন্ট এ নিয়ে গিয়ে চিকেন রেজালা খাওয়ায় সেটা অনেকবার জানার চেষ্টা করেছি তার কাছে…
কোনদিন বলেনি
‘ঝিলমিল কে আর বোধ হয় খুঁজে পাবনা’
এই কথাটা নাড়িয়ে দিচ্ছিল হৃদয়ের চাপা যন্ত্রণাগুলোকে
ইমনকে জোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বাইকে চেপে বসে কাটা হাতের দুটো আঙুল দিয়ে এক্সিলেটার বাড়িয়ে মুহূর্তে অনেকদুর চলে যেতে থাকলাম…
প্রায় কুড়ি কিলোমিটার পেরিয়ে এসছি...আরো অনেক যাব অনেক
বারবার মনে হচ্ছে আলবার্ট আইনস্টাইনের কথা,থিওরি অফ রিলেটিভিটির কথা...
ঝিলমিলের সাথে কোন কোন শহর, কোন কোন মানুষ রিলেটিভ...হঠাৎ মনে হল রবীন্দ্রনাথ আইনস্টাইেনর খুব ভালো বন্ধু ছিলেন…
আরে নাহ!
ঝিলমিল তো এ বছর রবীন্দ্রজয়ন্তীতে চিরনতুনের কথা বলেছিল!
সারা পৃথিবী খুঁজতে হবে ওকে?!!
এসব ভাবতে ভাবতে দেখি ব্যান্ডেজ ভিজে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে হাত থেকে…ব্যাথায় শিনশিন করছে
শরীরের ডানদিক…
বাইকের তেল শেষ!
বাইক থেকে নেমে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে ডাকতে থাকলাম ঝিলমিল কে
আকাশে চাঁদ নির্বিকার!
আমার চাওয়া পাওয়া নিয়ে চাঁদের কোন মাথাব্যাথা নেই… চাঁদের গলায় অলঙ্কার আর সাজাতে ইচ্ছা হচ্ছেনা।
শুধু ঝিলমিলের কথা মনে পড়ছে অমলিন……

৯

ঝিলমিল দেখতে অনেকটা সরু রাস্তার মত ছিল, যেখানে অপ্রয়োজনীয় কোন আস্তরণ ছিলনা। শক্ত মন থেকে যাকে কেউ এড়িয়ে যেতে পারতনা।
অনেক তরুণ বুকে জায়গা করেছিল তাই ও...
অনেক ছোটবেলা থেকেই ভালবাসা ছাড়া আমি আর কিছুই বুঝি না।
ঝিলমিল কে শুধু ভালবাসার কথাই বুঝিয়েছিলাম।
ও কি ভুল বুঝেছিল?
এখন আমি এত মায়া কি করে কাটাই?
ওত ওর ফোনটাও আমার কাছে ফেলে গেছে...সবাই ফোন করছে...
বলনা মা
কি জবাব দেব সবাইকে
প্রত্যেকটা মুহূর্ত শঙ্খনিবিড় করে দিয়ে এভাবেই কি চলে যায় সবাই?
তোমাদের কারুর কাছেই তো উত্তর নেই এসবের...
তবু তোমরা আড়চোখে অহংকার আঁক রোজ......

মঙ্গলবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৩

বরাক উপত্যকায় কৈবর্ত সমাজের সামগ্রিক উত্তরণ ঘটবে কখন?


(c)ছবি
কৈবর্ত একটি সংঘবদ্ধ জাতি। ওদের সামাজিক পরিকাঠামো খুবই দৃঢ় এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ। ওরা যেখানেই যায় অন্যদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে নিজেরা দলবদ্ধভাবে বাস করে। চারিত্রিক দিক দিয়ে তাদের সততা এবং সারল্য প্রশ্নাতীত। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এইসব গুণাবলী থাকা একটি সমাজের গুরুত্ব বা মর্যাদা দল মত নির্বিশেষে সবার কাছে অপরিসীম হওয়ার কথা। সেই অনুযায়ী এই সমাজের সার্বিক উন্নয়ণ হওয়া ছিল বাঞ্চনীয়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভাব প্রতিপত্তি যথেষ্ট থাকার কথা এই সমাজের। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
             সময়ের দাবি মত যেখানে সবাই একসাথে মিলেমিশে বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের প্রতিফলন ঘটানোর কথা সেখানে কেবল মাত্র কৈবর্তদের একক সমাজ হিসাবে সংঘবদ্ধ অবস্থান অন্যান্য সমাজের কাছে কিছুটা ঈর্ষা এবং অনেকটাই অগ্রহণযোগ্য ব্যাপার স্যাপার। তাছাড়া সামাজিক সংকটের মূহূর্তে কৈবর্ত সমাজ যেভাবে একজোট হয়ে যায় তাতে অনেকেই পরাজিত হয়ে এই সমাজের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করে এবং কলে-কৌশলে এদের দৃঢ় সামাজিক পরিকাঠামোটাকেই ধ্বংস করতে চায়। তাই অতি গোপনে বঞ্চনার সুনিপুণ রুপরেখা তৈরি করে চাতুর্যের সাথে তা কার্যকর করা হয়। সহজ সরল কৈবর্ত সমাজ সে সব কদাচিৎ টের পায়! তাছাড়া দীর্ঘদিন এক জায়গায় একসাথে বসবাস করার ফলে তাদের নিজেদের মধ্যেও খেয়া-খেয়ি, রেষারেষির একটা চোরাস্রোত সব সময় প্রবাহমান থাকে ফলস্বরূপ মাঝেমাঝে তারা ‘নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ’ করে, সমাজের বৃহত্তর স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেয় এবং ঐক্যের বাঁধন খান খান হয়ে যায়।
            ইতিহাসের পাতা খুললেই আমরা দেখতে পাই সুচতুর শাসকশ্রেণী অতি সন্তর্পনে কৈবর্ত জাতির দৃঢ়, মজবুত মেরুদণ্ডকে ধীরে ধীরে দুর্বলকরে দিতে তাদের বঞ্চিত করেছে শিক্ষার আলো থেকে, সংস্কার করেনি তাদের বাসভূমির যোগাযোগ ব্যবস্থার বরং দিনে দিনে কৈবর্ত জাতির জীবন ধারণের মানকে নরক সদৃশ করে তুলতে গ্রহণ করেছে যাবতীয় কর্মসূচীর। সুশিক্ষিত মেধাবী এবং সুযোগ্য কৈবর্তদের উঠে আসার পথকে দুর্গম করে তোলা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তো এক লাফে বহুদূর এগিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে গোড়াতেই নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে কৈবর্ত সমাজের তরুণ প্রতিভা। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দি পেরিয়েও ‘সেই ট্রেডিশন সমানে চলেছে’।    কৈবর্ত জাতিকৈবর্ত জাতি কখন বুঝবে এইকথা??
            বর্তমান দিনে বরাক উপত্যকার কৈবর্ত সমাজ অধ্যুষিত এলাকাগুলি যেমন- কাঠিগড়া, চাতলা, বক্রিহাওর, শনবিল, পুটিছড়া, মালিনীবিল, তপোবননগর, রংপুর, তাপাং, কালিবাড়িচর প্রভৃতিকে শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে রাখা হয়েছে অমানবিকভাবে। অধিকাংশ এলাকাতেই নেই প্রাথমিক বিদ্যালয়। কোন কোন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে দু-একটি বিদ্যালয় থাকলেও সে সবের হাল হকিকত খোঁজ করার মানসিকতা নেই কোন সরকারি কর্মকর্তার। কোন অজ্ঞাত কারণে এই এলাকাগুলিতে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়নি অথচ সমগ্র আসামে শিক্ষাক্ষেত্রে চলছে আমূল সংস্কার। স্বাস্থ্য এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে এমনভাবে পঙ্গু করে রাখা হয়েছে যে সাধারণ রোগে ভোগলেও সদর হাসপাতালে পৌঁছতে পৌঁছতে এই এলাকাগুলির মানুষকে ‘যমের দোয়ার’ দেখতে হয়। সহজেই অনুমেয় কী হয় রোগির যখন মূমূর্ষূ অবস্থা। তাছাড়া ভঙ্গুর যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অপ্রতুল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম কৈবর্ত সমাজ বঞ্চিত হয়ে আছে উচ্চশিক্ষা লাভ থেকে ফলস্বরূপ সরকারি চাকুরিয়ানের সংখ্যা অতি নগণ্য এই সমাজে। তাই বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প বা সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত কৈবর্ত সমাজ। সমগ্র দেশে যখন গ্রামীণ বৈদ্যুতিকরণ প্রকল্প শুরু হয়েছে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে তখন কৈবর্ত সমাজ অধ্যূষিত বরাকের অঞ্চলগুলি সুর্যাস্তের সাথে সাথে টুপ করে অন্ধকারে ডুবে যায় । টিনের কৌঠায় মহার্ঘ্য কেরোসিন তেল ভরে ছেঁড়া কাপড়ের সলতে পাঁকিয়ে বর্তিকা বানিয়ে কৈবর্ত মায়েরা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যত ক্ষীণ উজ্জ্বলতর করার প্রয়াস করে করে ক্লান্ত হয়ে যায়। বিশুদ্ধ পানীয় জল এই এলাকাগুলিতে সরবরাহ করা হয় ‘আকাল বৃষ্টি’র ন্যায়। কৈবর্ত জাতি কখন বুঝবে এইকথা?
             শিক্ষার মাধ্যমে কৈবর্ত সমাজের সমষ্টিগত মুক্তির পথ প্রায় বন্ধ, কারণ কৈবর্ত সমাজ অধ্যূষিত এলাকাগুলির স্কুলগুলিকে অকেজো করে দেওয়া হয়েছে কোন অদৃষ্ট হাতের ইশারায়। কৈবর্ত সমাজের যারা ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষা লাভ করে অগ্রসর হয়েছে তারা সমাজের পাশে না দাঁড়িয়ে আত্মগোপন করেছে একান্তভাবেই বাঁচার তাগিদে অথবা শাসকশ্রেণী কর্তৃক কৈবর্ত সমাজকে দাবিয়ে রাখার গোপন অভিসন্ধি বুঝতে পেরে ওরা সরে গেছে বৃহত্তর সমাজ ছেড়ে আপন সন্তান-সন্ততির মঙ্গল কামনায়। অতএব কৈবর্ত সমাজের সামগ্রিক উত্তোরণের জন্য একমাত্র রাজনৈতিক পথটাই খোলা। গণতন্ত্রে গুণের চেয়ে সংখ্যাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। বরাক উপত্যকার দুটি লোকসভা সমষ্টিতে কৈবর্ত সমাজের ভোটার সংখ্যা নেহাত কম নয়। করিমগঞ্জে তো কী-ফ্যাক্টর। তাছাড়া শিলচর, আলগাপুর, কাঠিগড়া, রাতাবাড়ি প্রমুখ বিধানসভা সমষ্টিগুলির প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ে কৈবর্ত ভোটারদের একটাপ্রভাব থেকেই যায়। দলব্ধভাবে বসবাস করার মত যদি সম্মিলিতভাবে কেবল মাত্র একটি রাজনৈতিক দলকে সমর্থন দিয়ে সেই দলের আস্থা অর্জন করা যায় তাহলে মন থেকে না চাইলেও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণে হলেও কোন কোন নেতা বা নেত্রী প্রতিনিয়ত ব্রতী হবে কৈবর্ত সমাজের সার্বিক মঙ্গল কামনায়। প্রচলিত ধ্যান-ধারণা বদলে উন্নয়ণের স্বার্থে সুযোগ্য ব্যক্তিত্বের পাশে একজোট হয়ে দাঁড়ালে কৈবর্ত জাতির নরকযন্ত্রণা ভোগ কিছু লাঘব হওয়ারই কথা। তবে এক্ষেত্রে কৈবর্ত সমাজকে পা ফেলতে হবে সতর্কতার সাথে, কারো একনিষ্ট সমর্থক হলেও যেন ক্রীড়নক না হয় গোটা সমাজ। সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনা করে চলতে হবে, একপেশে সঠিক সিদ্ধান্ত সব সময় মঙ্গলজনক নাও হতে পারে।

রবিবার, ৬ অক্টোবর, ২০১৩

হীরুদার লাঙল এবং জমি-জিরেতের কথা...



(লেখাটি প্যাপিরাস ই-পত্রিকার , ২০১৩র শারদ সংখ্যা এবং তিনসুকিয়ার ছোট কাগজ 'উজানে' প্রকাশ পেয়েছে। --সুশান্ত  কর)
                     “তুই আমার মাটি কেটে চলে যাওয়া অবাধ লাঙল,
                      নেহাই চিকন লোহার ফাল”
এ সেই খ্যাতনামা কবির কবিতা যিনি লিখেছিলেন,
                  “মৃত্যুও তো এক শিল্প
                  জীবনের কঠিন পাথরে কাটা নির্লোভ ভাস্কর্য”

  
দ্বিতীয়টি বহুবার শুনেছেন অসমের মানুষ যারা কবিতা পড়েন তাঁরাও। যারা পড়েন না তাঁরাও। কেননা তাঁর কবিতা দেয়ালে দেয়ালে লেখা হয়েছে বহুবার বহুভাবে। অবশ্যই অসমিয়া ভাষাতে। তিনি হীরেন ভট্টাচার্য। কিছুতেই ভাববেন না কবিতা দু’টো আমরা অনুবাদ করলাম বলে। প্রথমটি কবির নিজের লেখা, আর দ্বিতীয়টি রমানাথ ভট্টাচার্যের অনুবাদ। রমানাথ ভট্টাচার্য অসমের সেই প্রবাদপ্রতীম শিক্ষক-গবেষক পদ্মনাথ ভট্টাচার্য বিদ্যাবিনোদের ভাইপোর দিকের পৌত্র, অসমের বাংলাভাষার অন্যতম প্রধান কবি । ১৯৯২তে ‘আধুনিক অসমীয়া কবিতা’ নামে একটি অনুবাদ সংকলন বের করেছিলেন। বিশ শতকের শেষার্দ্ধের সমস্ত অসমিয়া কবিদের বাংলা ভাষার পাঠকদের সঙ্গে বোধকরি এক সুপরিকল্পিত উপায়ে প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ইনি । এর আগেও এঁরা অপরিচিত ছিলেন তা নয়। নিশ্চয়ই ছিলেন। কিন্তু বিচ্ছিন্ন ভাবে। এমন একত্র উপস্থাপন এর আগে হয়েছিল বলে আমরা জানি না। সেই সংকলনে হীরেন ভট্টাচার্যেরও একাধিক বিখ্যাত কবিতা ঠাঁই পেয়েছিল । তার মধ্যে ‘জোনাকি মনে’র এই কবিতাও ছিল। রমানাথ এখন মুম্বাই প্রবাসী । সেখানে তাঁর  স্থাপিত রমানাথ ভট্টাচাৰ্য ফাউণ্ডেশন ২০০১তে হীরেন ভট্টাচার্যের জীবৎকালেই ‘পদ্মনাথ বিদ্যাবিনোদ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কারে’ তাঁকে সম্মানিত করেছিল। সেই সংকলনে রমানাথ বেশ কিছু কথা লিখেছিলেন কবির সম্পর্কে। তারমধ্যে এই কথাটি আসলেই হীরেন ভট্টাচার্যের কবিতার পরিচয় সার, “ তাঁর কবিতা সঙ্গীত ধর্মী, চিত্রপ্রধান; গদ্যভঙ্গীমায় তিনি কথা বলেন, সুন্দর চিত্রকল্প তিনি ব্যবহার করেন।” যে পরিভাষাগুলো ব্যবহার করে এই বাক্য লেখা সেগুলো ইউরোকেন্দ্রিক আধুনিকতার যুগে খুব চলত। বাংলা কবিতা আলোচনাতে এই সব পরিভাষা এখন স্কুলবই ছাড়া আর তেমন বিশেষ কোথাও চলে না। বিশেষ করে ‘চিত্রকল্প’ শব্দটি—ইউরোপের ইমেজিস্ট কাব্য আন্দোলন থেকে আমদানি। বুঝে না বুঝে এককালে সমালোচকেরা খুব ব্যবহার করতেন। অথচ  যদিও সমার্থক নয় ‘চিত্রকাব্য’, কথাটি ভারতীয় অলঙ্কার শাস্ত্রে অপরিচিত ছিলনা কোনদিনই। সে যাক, দেখা যাবে সত্যি এই ছবি আর গানের প্রতি এক আশ্চর্য আকর্ষণ আছে হীরেন ভট্টাচার্যের। উপরের দ্বিতীয় কবিতাতে সে ইঙ্গিত স্পষ্টই আছে। তার একটি অসমিয়া কবিতাতে আছে,
             “কবিতা এটা আরম্ভ করা টান।
             পোনপটীয়াকৈ একোয়েই উজু বাটেরে
            মোর কলমলৈ নাহে।
          সুরে মোক আগতেই ধরা দিয়ে।...” ( র’দত তিরেবিরাই)
 
প্যাপিরাসে চলে আসুন
কবিতাটির শুরুতেই একটি অতিবাক্য আছে তৃতীয় বন্ধনীতে-- [মই এতিয়াও গান শুনি ৰৈ যাওঁ।] গান তিনি গুনগুনাতেন। গান লিখতেনও। অসমীয়াতে বেশ কিছু গানের সংকলন আছে, আকাশবাণীতে শিল্পীরা সেই ১৯৬৯ থেকেই তাঁর গান গেয়ে আসছেন। বাংলাতে তাঁর তৃতীয় বইটি গানের। একুশটি গান, আশা করেছেন কেউ সুর দেবেন আর গাইবেন। নাম ‘বৃষ্টি পড়ে অঝোরে’। এই বইয়ের প্রতিটি গানের ( আমাদের মতে কবিতাই) সঙ্গে রবীন বর এঁকে দিয়েছেন আশ্চর্য সব  জল রঙের সাদাকালো ছবি—এতেই বোঝা যায় ছবির প্রতি যে তাঁর প্রবল আকর্ষণ। । তিনি নিজেই রঙে রেখাতে আঁকতে পারতেন। জানেন তিনি আঁকা। হয়তো বিনয়বশত নিজে সেটি করেন নি। কিন্তু করেছেন শব্দের সেই একই কাজ শব্দের পরে শব্দ জুড়ে । এই যেমন শেষ কবিতাটিঃ
              গান সেধেছি
             জলে বাতাসে, পাল গুটিয়ে, হাল থামিয়ে
             সারাটা দিন, সারাটা রাত।
             বুকে কান্না, মুখে হাসি---
             থামেনা আমার হাতের মুঠোর কাঁচা বাঁশের বাঁশি
             বুকের ভেতর দিচ্ছে দোলা, শব্দমালার জমি-জিরেত
            আসুক ঝড়-বৃষ্টি—
           বুক চিতিয়ে আড়ে বহরে দিচ্ছি পাড়ি
           আড়া-খাঁড়া একরোখা নদী
           ঝমঝম যেন চলে দেমাকে রাতের রেলগাড়ি।
           নৌকা আমার এগুই-পিছোই
           গান সেধেছি বুক নিংড়ে
           সুর বেঁধেছি আঁচা-আঁচি কথার একবজ্ঞা একাবলি।
           গান যে আমার গাঁ –গঞ্জের এগারো ভাটির ভাটিয়ালি...।
বহু অসমিয়া –বাঙালি কবিকে নিশ্চয়ই মনে পড়বে এই কবিতা পড়ে। কিন্তু এমন ছবি আঁকাটি তাদের কবিতার সাধারণ ধর্ম নয়। তারচেয়েও বড় কথা এগুলো ঠিক স্থিরচিত্র নয়। যখন রবীন বরের আঁকা স্থির ছবিটি দেখছিলাম, তখনই মনে হলো এই কবিতার গতিময়তাকে স্থির ছবিতে ধরা কঠিন। যদিও ভালো স্থির ছবিমাত্রেরই একটি গতি আছে, সে দ্রষ্টা মনকে দুলিয়ে ছাড়ে ‘রাতের রেলগাড়ি’র মতো। অতএব রবীন বরের ছবিতেও আছে, কিন্তু এগুলো বলে অন্য কথা। নিয়ে যায় অন্যদিকে। এগুলো বাড়তি প্রাপ্তি। কবিতার পাশে অলঙ্করণ হিসেবেও মন্দ নয়, কিন্তু কবিতাকে ধরিয়ে দেয় না বড়ো। বা সম্প্রসারিতও করে না। এই কবিতাটির সঙ্গেই যে ছবি আছে, মনে হয় যেন ঝড়ে বিধ্বস্ত জাগাজ ঘাটার ছবি সে। বাঁশি যদি বা বাজেও তবে সে বিপদ সংকেত। অথচ কবিতাতে ঝড়ের কথা থাকলেও ভাবটি বিপরীত। আর যেটি লিখছিলাম, এর সবটাকে ধরা কঠিন স্থির ছবিতে। সেটি চলচ্চিত্রে সম্ভব। পাশাপাশি দু’টো ছবি ‘বুক চিতিয়ে আড়ে বহরে দিচ্ছি পাড়ি’ কেমন সে পাড়ি? না, ‘ঝমঝম যেন চলে দেমাকে রাতের রেলগাড়ি’ এসব উপমা-উৎপ্রেক্ষা অন্য কবিদের কবিতাতেও দুর্লভ তেমনও নয়। কিন্তু সে আস্ত কবিতাজুড়ে নয়, এই যেমন হীরেন গোঁহাঞির একটি কবিতার টুকরোতেই বোঝা যাবে , উৎপ্রেক্ষা আছে, কিন্তু ছবি নেই,
        “ হঠাৎ অচেনা লাগে ঘুর্ণিজলের ধ্বনিঃ ভালো খাওয়া হয়েছে দাসের বিয়েতে
        আবার সাহা কিনেছে কি মাটি সস্তায়
        তোষামোদের
       কতনা নতুন অজুহাত!” (উত্তর রবীন্দ্র; আধুনিক অসমীয়া কবিতা; পৃঃ৮৮) ।
 
হীরেন ভট্টাচার্যের কবিতা এই দাস-সাহাদের উল্লেখ না করেই নিজের কথা ব্যক্ত করে। এক দু’টি কবিতাজুড়ে ছবি আঁকার প্রয়াস হয়তো অনেকের কবিতাতেই মিলবেও কিন্তু তাঁর সমগ্র কাব্যদুনিয়াটিই এই। প্রথম জীবনে তিনি একটি কাগজ করতেন ‘চিত্রবন’ নামে, পরে এই নামে একটি ছাপাখানাও চালিয়েছিলেন নিজের বাড়িতেই।

             আর কবিতার সেই ছবির বিষয়ের সন্ধানে নাগরিক কবি হয়েও গ্রামে গঞ্জে ঘুরে বেড়াতেন খুব। বৃদ্ধ বয়সেও মৃত্যুর আগে অব্দি এই স্বভাব ছিল তাঁর অটুট। লোকে তাই তাঁকে ‘হীরুদা’ বললে চেনে বেশি, মূল নামে অচেনা ঠেকে অনেক সময়---এমন কপাল আর কোন কবির হয়েছে বলে জানি না। তাঁর এই ‘মোর দেশ’ কবিতাতে ঠিকই লিখেছিলেন তিনি,
            “ দেশে-দেশে মোর বন্ধু আছে। এনে বহু দেশর অরঙে-দরঙে
              মই ঘুরিছো। বহু বন্ধুর সতে হাতে হাতে হাত ধরি ফুরিছোঁ
             কেতিয়াবা সাগর পারত, কেতিয়াবা খেজুর তলত, নতুবা
             পাহারতলিত খন্তেক জিরাইছোঁ। বন্ধুর সতে প্রাণ খুলি প্রাণর
          কথা পাতিছোঁ। তার পিছত আকৌ আরম্ভ করিছোঁ নতুন যাত্রা।” (পৃঃ১৭; হীরেন ভট্টাচার্যর কবিতা) বাংলাতে তিনি লিখেছেন,
           “ আমার ছেলেবেলার খেলা আমার সঙ্গ ছাড়েনি
          ভরা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আরেকবার জলের তল ছুঁয়ে আসতে চায়...” ( ১৩ নং কবিতা, জোনাকি 
    
পংক্তিমালা, শিকড় থেকে পাতা অব্দি, পৃঃ৫৭) , তো এই নদী, জল, নৌকা, দোতারা, আকাশ, প্রজাপতি, মেঘ, রৌদ্র, শরৎ , শ্রাবণ, ঘাস, গাছ, পাখি, ধান, লাঙল এগুলো ছাড়া তাঁর কবিতাই নেই। সম্ভবত তাই, তাঁর কবিতার পাঠক তাঁকে ‘সুগন্ধী পখিলা’র কবি নামে চেনে, চেনে ‘প্রেম’ কিম্বা ‘রোদালী’র কবি বলে। ১৯৬৮-তে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কবিতা বইয়ের নাম ‘রৌদ্ৰ কামনা’ আর ১৯৭২এ প্রকাশিত দ্বিতীয় বইটির নাম ‘মোর দেশ মোর প্ৰেমর কবিতা’। ‘সুগন্ধী পখিলা’ নামে সবচাইতে খ্যাতনামা বইটি আসলে চতুর্থ প্রকাশনা। বেরিয়েছিল ১৯৮১তে। বাকি বইগুলোর নাম দেখুন, বিভিন্ন দিনর কবিতা (১৯৭৪),শইচর পথার মানুহ (১৯৯১), ভালপোয়ার বোকা-মাটি (১৯৯৫), ভালপোয়ার দিকচৌ বাটেরে (২০০০)। সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন,বাংলা বই এর নামগুলো ‘জোনাকি মন ও অন্যান্য’, ‘শস্যের মাঠ মানুষ’। আমাদের এখনো সে দুটো পড়বার সুযোগ ঘটেনি, অনুমান করতে পারি সেখানে ২০০১সনের আগেকার লেখা অসমিয়া কবিতার বাংলা রূপান্তর রয়েছে। আমরা যে শেষ দুটো বই তুলে নিয়েছি, তার একটির কথাতো লিখলামই, অন্যটি কবিতার বই। বলেছেন,নিজের কবিতার নিজে অনুবাদ করেছেন। কবি যখন করেন, তখন কি আর অনুবাদ থাকে? আমরা এই প্রশ্নের মীমাংসা করব পরে। কাজটি তিনি করেছিলেন আগেই, কিন্তু প্রকাশ করেছেন গানের বইটির পরে ২০১১তে। নাম ‘শিকড় থেকে পাতা অব্দি। গানের বইটির বিষয় সেই বৃষ্টিই। বাঁশের ঝাড়ে, গাঁ –গঞ্জে, নদীর পাড়ে, কচি ঘাসে ‘গান যে আমার গাঁ –গঞ্জের এগারো ভাটির ভাটিয়ালি...।’ সেদিক থেকে বৈচিত্র আছে কবিতা বইটির। আমরা সেটিকে বরং খানিক নিবিড় পাঠে বুঝে নেবার চেষ্টা করব। কিন্তু যেহেতু কবি মানুষটিকে বুঝে নিতে হবে, তাই অন্যান্য অসমিয়া কবিতার আশ্রয়ও কিছু নিতে হবে। ২০০১এ অসম উপত্যকা পুরস্কার নিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, “কবিতার বাহিরে কবির আন চিনাকি নাই। কবির জীবন-পঞ্জী পাঠকর বাবে অর্থহীন।” কথাটি মিথ্যে নয়। আমরাও তাই করব, কবিতা দিয়েই বুঝে নেব তাঁকে। কিন্তু সমালোচকের কাজ চলেনা, জীবনকে একেবারে না ছুঁলে।

            
১৯৩২এ যোরহাটে জন্মেছিলেন তিনি । ফলে চল্লিশের দশকে হেমাঙ্গ বিশ্বাস, জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা, বিষ্ণু রাভাদের নেতৃত্বে ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের যে ডামাডোল শুরু হয়, তিনি তার থেকে দূরে ছিলেন না মোটেও। এদের দেখেছেন, শুনেছেন, এক সঙ্গে কাজও করেছেন। ষাটের দশকে প্রগতিশীল লেখক সঙ্ঘের অসম শাখার তিনি উপসভাপতিও হয়েছিলেন। তার মানে তখনকার বহু কবি সাহিত্যিক শিল্পীর মতো শিল্পী জীবনের শুরুতেই তিনি সাম্যবাদী আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। পরে যদিও তিনিও এই সঙ্ঘগুলোর সংস্পর্শ তখনকার অন্য অনেকের মতো ছেড়েছিলেন, নাগরিক প্রতিষ্ঠানের অলিতে গলিতে তাঁকে দেখা যায় নি তেমন। গেলেও সে হাঁসের জলে সাঁতার কাটার মতোন, তাঁর “অন্তর্জলি কান্নার জলে/ সাঁতার কাটছে এক ঝাঁক বুনো হাঁস/ তাদের ডানায়-পাখায় ঝলমলে রোদ। স্মৃতি নাড়া দিলে ঝরে পড়ে তরতাজা শব্দ--” (বৃষ্টি পড়ে অঝোরে; পৃঃ২১) তাঁর বিপরীত রাজনৈতিক বিশ্বাসের লোকেরা , বিশেষ করে উগ্র-জাতীয়তাবাদীরা অনেকেই তাঁর কবিতাতে দেয়াল লিখেছে, পোষ্টার সেঁটেছে। সেগুলোও তিনি ভালো নজরে নেন নি , কোনদিন। নাগরিক জীবনের কালো ধোঁয়ার কথা লিখেছেন তাঁর কবিতায়, কিন্তু সে শুরুর দিকে যেমন কিছু কবিতাতে মেলে, জীবন যত এগিয়েছে মেলেনা আর। এই যেমন ১৯৬১তে লেখা ‘নাগরিক’ কবিতাতে তাঁর উচ্চারণ ,
                “ কলঘরর ক’লা ধোঁয়াই
               এদিন আকাশত বিজুলি জ্বলাব,
               রাস্তার কাষর এইজাক ল’রাই
              জীবনর বাটে-বাটে ফুল ফুলাব,
              ব্যাধিগ্রস্ত এই নগরে এদিন
             আকাশলৈ মুর তুলি ক’বঃ বতাহ ইমান কোমল।” (পৃঃ ১৬) সেই বহল আকাশ, কোমল বাতাসে তাঁর আজন্ম মোহ। ‘আহিনের লেণ্ডস্কেপ’ কবিতাতে ( ১৯৬৫)
               ‘শেষ হৈ গ’ল
             লুব্ধ আকাশর হিংস্র উৎসব...’
 এর কয়েক পংক্তি পরে যখন লেখেন
            ‘র’দালির ভাঁজে ভাঁজে
             অপার বিস্ময়।
            আবেগত ভাগি পরে
           শব্দের তন্ময়।’ (পৃঃ ২৮ ঐ) –তখন স্পষ্ট বোঝা যায়, এই কবিতা কেবল আশ্বিনের কবিতা নয়, আরো বেশি কিছু। আর তাঁর প্রতিটি শব্দের উৎসভূমির ইঙ্গিততো বটেই। ‘মোর এই শব্দবোর’ কবিতাতে তিনি আরো স্পষ্ট করে লিখছেন
        “...মোর কোন নিজস্ব আবিষ্কার নাই,
        মোর ভিতরত এটা যেন খেতিয়ক, মই শব্দবোর জিভাত দি চাঁও,
        কার কি সোয়াদ, হাতর তলুয়াত লৈ চাও,
        কিমান তপত,
        মই জানো শব্দ মানুহর মহৎ সৃষ্টির তেজঃদীপ্ত সন্তান,
        মই সাধারণ কবি,
        কান্ধ সলনি করি বৈ অনা মোর এই শব্দবোরত
     

মানুহর নিদারুণ অভিজ্ঞতা, বুরঞ্জীর নিঠুর আঁচোর।.” এর সঙ্গে মিলিয়ে পড়ুন আমাদের আগে উদ্ধৃত গানের পংক্তি “বুকের ভেতর দিচ্ছে দোলা, শব্দমালার জমি-জিরেত” –তার সঙ্গে মেলান একেবারে শুরুর দু’লাইনের কবিতাটি। একটি সংযোগ সূত্র মিলবে যেগুলো নিতান্তই কবি হীরেন ভট্টচার্যকে চেনায় আর কাউকে নয়। ‘খেতিয়ক’ শব্দটির নানান মানে হতেই পারে। এক, তিনি মাটির খুব কাছাকাছি গ্রামীণ জীবনের কবি। কিন্তু এহ বাহ্য। এখানে তিনি সঙ্গে করে এও জানিয়ে দিচ্ছেন ‘মই সাধারণ কবি’ এই সবিনয় উচ্চারণের পরেও, চাষার মতোই কী অসাধারণ যত্নে তিনি শব্দগুলোকে তুলে আনেন। আর যখন কাঁধে ফসল নিয়ে ফেরেন, তখন চাষার ফসল নিয়ে ফেরার কথা যেমন মনে পড়ে, গোটা বর্ষা ঝড় জল তুফানের সঙ্গে তার অন্যন্য সংগ্রামের কথাও মনে পড়ে। একই সঙ্গে মনে পড়ে অসমিয়া কবিতার উত্তরাধিকার তাঁর নিজের কাঁধে আসা অব্দি কত ‘বুরঞ্জীর নিঠুর আঁচোর’ সেই কবিতাগুলোকে সইতে হয়েছে , অথবা তাঁর কোন একক কবিতার পেছনে আছে শব্দ নিয়ে কাটাকুটি যন্ত্রণার কত গোপন ইতিবৃত্ত। এই যে , যা লেখা হলো, তার বাইরে পাঠক মনে নানা অর্থের দোলা দিয়ে যাওয়া ---এই ব্যাপারটি আমাদের কবিরা জানতেন। ক্যামেরা যেমন ছবি তোলে, এমন বিশদবিবরণ সহ (ডিটেলিং) ‘চিত্রকাব্য’ তাঁরা ধর্মসাহিত্যের যুগেও খুব একটা লিখতেন না। মীরা যখন গান করেন ‘মেরেতো গিরিধারি গোপাল দোসরা না কোই’—তখনো এটা সত্য। কিম্বা চর্যার এই কবিতাটাই দেখুন,
             “...ছুটন্ত সেই হরিণের আর যায় না দেখা খুর–
    ভুসুকুর এই তত্ত্ব মূঢ়ের বুঝতে অনেক দূর।” ( অনুবাদঃ সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ)-- একটা তত্ত্ব আছে কবিতাটিতে, আমরা সবাই জানি সে বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু যারা সে তত্ত্ব বুঝতে যাবে তাদের মূঢ় বলে দূরে ঠেলে দিচ্ছেন কবি ভুসুকু। আমাদের মতে ভালোই করেছেন , তাতে কবিতার স্বাদ নিতে আমাদের সুবিধেই হয়েছে। বিশেষ করে হরিণের সেই না দেখা খুরের কথাটার ব্যঞ্জনা অনুভব করবার চেষ্টা করুন— অতুলনীয়! অথচ আমরা যে ছেলেবেলা পড়েছিলাম,
           “আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে?
           কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে”—এগুলো বরং আমাদের কাব্য পরম্পরাতে বিলেতি দান। বিশেষ করে টেনিসন-ব্রাউনিঙ-ম্যাথু আর্নল্ড শাসিত ভিক্টোরীয় যুগের ইংরেজি কবিতার । কবিতা হিসেবে আহামরি কিছু নয়। এগুলো নতুন যুগের নীতি কথা। কথা হিসেবে ভালো, কিন্তু কবিতা হিসেবে মোটেও নয়। যারা লিখেছিলেন, পশ্চিমা শিক্ষার ফলে তাঁরাও তারা বিশ্বাস করতেন , আমাদের সমস্ত প্রাচীন সাহিত্য ধর্মীয় নীতিকথাতে পরিপূর্ণ, এখন কবিতাকে দেশীয় জাতীয়তাবোধের কথাতে পরিপূর্ণ হতে হবে। আদর্শ নাগরিক গড়ে তুলতে হবে, পাঠককে চরিত্রবান করে তুলবার দায় কবিকে নিতে হবে। অথচ, এটা ঘটনা ছিল যে যেগুলোকে আমাদের ধর্মীয় নীতিকথার বালাই বলে মনে করা হতো সেগুলোর অনেকটিতেই পরস্ত্রী লুলোপ শিব ঠাকুরকে বৌ পার্বতীর মারের চোটে অনেক সময় কাপড় ছেড়েও পালাতে হতো। তারমানে ইচ্ছে করলে, আপনি ‘নারীবাদ’ও সেখানে পেতে পারেন। কিন্তু সে কথা গুরুত্ব্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো সেগুলো সাহিত্য রসে এবং গুণে পরিপূর্ণ ছিল। বরং নজরুল যখন শ্যামাসঙ্গীত লিখলেন, সেগুলোতে অনেক নীতিকথা ছিল। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতাতেও সেই পরম্পরারই ছাপ মিলবে। তাঁকে ‘বিদ্রোহী’ কবি আখ্যা দেয়ার মধ্যেও কিন্তু এই কবিতা বহির্ভূত ভাবনাটিই ঠাই পেয়েছিল। ঠিক তেমনি তখন বাংলাতে অনেক ‘দুঃখবাদী’, ‘দেহবাদী’ ইত্যাদি কবিও দেখা দিয়েছিলেন। অথচ, এই অভিধাগুলো আসলেই এইসব কবিদের ছেটে ছোটো করেছিল। তাদের পরিচয়ের সবটা এতে ধরা পড়ত না। ব্যাপারটি অসমিয়া কবিতাতেও মিলবে। কেননা, বাংলা কবিতার পরম্পরার সঙ্গে তাঁরা পরিচিত ছিলেন খুব । আর না থাকলেও পশ্চিমী চিন্তার প্রভাবটিতো আছেই। কবিতার সেই একই ভাবনাস্রোত বহু ‘বামপন্থী-প্রগতিশীল’ কবিকেও কবি হতে দেয় নি। তাঁরা নিজেরা দেশ ,সমাজ নিয়ে যেমন যেমন ভেবেছেন, আশা করেছেন তাদের পাঠকও ঠিকঠাক তেমন তেমন ভাববেন—এবং তাঁদের চেতনার উত্তরণ হবে। রাবীন্দ্রিক পরিভাষা ধরে বলতে পারি, রূপের তথ্যটাকেই সব ভেবে নিতেন, ‘অরূপে’র সত্য অব্দি পৌঁছুতেন না। হীরেন ভট্টাচার্য সেই আবহাওয়াতেই শুরু করেছিলেন। সুতরাং তাঁর মধ্যে সেরকম ভাবনা ছিল না নয়, কিন্তু কেমন বেরিয়ে এসছিলেন, তার নজির ‘সাংকেতিক ধ্বনি’ কবিতাটি,
                “চহরীয়া বাহবার কী মূল্য গাঁয়ে –ভূঁয়ে যদি নোতোলে গির্জনি?
                নিপুণ কবির স্বাক্ষরবাহী কবিতা যেতিয়া
                 নষ্ট শস্যর মনোজ্ঞ বিজ্ঞাপন,
                নিষ্ঠাবান বিব্রত হোয়াটো স্বাভাবিক,
                মোর শরীরর তন্নতন্নত বিয়োগ গ্লানি,
                নিয়তি মই নেমানো, আতংকিত তেজ মোর
                একো- একো রাতি সমুদ্রর দরে গর্জি উঠে, ধ্যানকেন্দ্রী মুহূর্তর
                ক’ত সেই সাংকেতিক ধ্বনি?” (পৃঃ১০২, হীরেন ভট্টাচার্যর কবিতা)

   
যে ভাবনাবৃত্তের কথা বলছিলাম তার বাইরে গিয়ে সেই পশ্চিমেও বিশ শতকের শুরুতে শুরু হয়েছিল ‘সিম্বলিস্ট’, ‘ইমেজিস্ট’ , ইত্যাদি কাব্য আন্দোলন—আমাদের কবিরা আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাংলা কবিতাতে রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারটি আলাদা। তিনি দেশীয় কবিতার পরম্পরাকে খুব ভালো জানতেন, বুঝতেন। ফলে বিদেশী পরম্পরার সঙ্গে পরিচিত হলেও সেই ঝড়ে স্বয়ং উড়ে যান নি। কিন্তু অন্য অনেকে গেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের বেশি বয়সে যারা নিজেদের আধুনিক বলে ঘোষণা করছিলেন তারা তো বটেই। তাদের থেকে সরে দাঁড়ালেন আবার জীবনানন্দ। সম্ভবত তাই জীবনানন্দকে এসে লিখতে হয়েছিল, “সকলেই কবি নয় কেউ কেউ কবি” । রবীন্দ্রনাথের ‘মানুষমাত্রেই শিল্পী’ কথাটির বিপরীত উচ্চারণ-- এই কথাটি অবশ্যি বাংলা তথা ভারতীয় পরম্পরাতে এক বিপরীত আভিজাত্যবোধের জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু কবিতার স্বরূপ নিয়ে ভাবতে সবাইকে বাধ্যও করেছে। আমরা যেগুলোকে কবিতা বলে চিনি, অধিকাংশই আসলে ‘নষ্ট শস্যর মনোজ্ঞ বিজ্ঞাপন’— এই সত্যটি অনেকেই উপলব্ধি করতে শুরু করেন। কবি জীবনানন্দের এবং তাঁর সমকালীনদের সঙ্গে অসমিয়া কবিদের পরিচয় ঘটেছিল অচিরেই। সুতরাং হীরেন ভট্টাচার্য অপরিচিত ছিলেন এমন নয়। অনেক সমালোচক লিখেও দিতে পারেন তাঁর কবিতা পড়ে যে তিনি ‘ইমেজিস্ট বা সিম্বলিস্ট বা পরাবাস্তববাদী’ কাব্য আন্দোলনে প্রভাবিত হয়েছিলেন। আমরা সেরকম বলতে চাইনা। তিনি আড্ডা দিতে ভালোবাসলেও বক্তৃতাতে খুব কম কথা বলতেন, এবং আমরা যেগুলো পড়েছি সেগুলোতে এই সব পশ্চিমা ‘আধুনিক কবিতা’র পরিভাষা খুব পাইনি। মনে হয়, গ্রামে গঞ্জে ঘুরে বিহু সহ আমজনতার কাব্য পরম্পরার সঙ্গে তাঁর যে পরিচয় ঘটেছিল তাতে তিনি সেই সব পোষাকী পরিভাষার দরকারও বিশেষ বোধ করেন নি। সম্ভবত তাই তাঁর সুবিখ্যাত উচ্চারণ,
             “ গুণগুণনিতে
             কঁপে গছর ছাঁ, পাতর আগর র’দ
             একেটা ফুটতে
             মোর বুকুত উবুরি খায়
             অবোধ দিন
            এতিয়াও যার পোষাকী নাম দিয়া হোয়া নাই!
           ...কবিতা মূলত স্বাধীন, স্মৃতি তার সুগন্ধি পখিলা!” ২০০১এ অসম উপত্যকা সাহিত্য পুরস্কার নিতে গিয়ে তিনি বলছেনও, “ সকলো সৃষ্টির উৎস হৈছে লোকজীবন। লোক-জীবনর অভিজ্ঞতাই কবিতাক প্রাণবন্ত করে। ঐতিহ্য আমার কেবল অতীততেই নহয়। বর্তমানরো আধার।ঐতিহ্যর রূপ আরু রূপান্তরেই হৈছে কবিতার আধার...” ১৯৮৬তে অসম সাহিত্য সভার ৫২তম অধিবেশনে কবি সম্মেলনের সভাপতির ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি যখন বলছেন, “কবিতার শব্দ কেবল শব্দই নহয়, ই ধ্বনিও।” তখন সোজা আমাদের মনে পড়ে পুরোনো ভারতীয় অলঙ্কার শাস্ত্রের ধ্বনিবাদের কথা। তিনি আরো বলছেন, “কবিকণ্ঠর এটা শব্দ যেতিয়া প্রতিধ্বনি হৈ আমার কাষলৈ উভতি আহে সি জানো সেই পুরণি অবয়বেই ? শব্দর এই বাঢ়ি অহা কারণেই হৈছে কবির নিপুণতার চিনাকি। কিন্তু শব্দই জানো কবিতা? শব্দর অর্থই জানো কবিতা? শব্দর আভিধানিক অর্থই যদি কবিতার অভ্যন্তর প্রবেশর সঁচার-কাঠি হ’লহেঁতেন, তেনেহ’লে আজির কবিতার দুরুহতার বহু অভিযোগর অবকাশ নেথাকিলহেঁতেন। কবিয়ে জীবন পাত করে তেনে শব্দ সন্ধানত যার আবাহনী ক্রিয়াই আনি দিব পারে নতুন মাত্রা। ‘
           কবিতা জীবনর অন্য বিষয় কুশল, অন্য প্রত্যাশা
           শব্দ সংঘ ভাঙি তিরবির বন তুলসীর
       উজারি লুকুয়া সুগন্ধি দীঘল উপত্যকা।’” এর পরেই তিনি লিখছেন মোক্ষম কথাগুলো যা একজন নীতিবাগীশ থেকে কবিকে আলাদা করে, “ ...রোমাণ্টিক যুগতো কবিক কোয়া হৈছিল দ্রষ্টা-শিক্ষক। কবিতা আছিল কবির বাণী। সময় সলনি হোয়ার সতে কবি সম্পর্কে অভিধাও সলনি হৈছে। কবিও আন দহজনর দরে দোষে-গুণে মানুহ। আবেগ অনুভূতি একমাত্র কবিরেই আছে এই কথা জানো ন-দি ক’ব পারি? কবির আটাইতকৈ ডাঙর গুনটো হৈছে নিজর সৃজনশীল, মননশীল বিচিত্র ভাবনার বাহন স্বরূপে শব্দ ব্যবহার করার ক্ষমতা। এই প্রখর শব্দবোধেই কবিক আন মানুহর পরা পৃথক করিছে। কবিতা কবির শ্রাব্য কল্পনা। পাঠেই কবিতার জীবন। শব্দর শিল্প কবিতা ছপার আখরতেও আবদ্ধ নহয়। ই যে কণ্ঠরো শিল্প!...কবির পাঠে বর্ণক উন্মোচন করে শব্দলৈ, শব্দক ধ্বনিলৈ, আরু ধ্বনির অনুরণনে কবিতাক লৈ যায় জীবনর বোধি-মূললৈ।” বোঝা যাচ্ছে তিনি যদিও ধ্বনি বলতে শব্দের কানের শোনার দিককে বোঝাচ্ছেন, আসলে শব্দের আভিধানিক অর্থকে ছাড়িয়ে গিয়ে যে নতুন মাত্রা, নতুন ব্যাঞ্জনার্থের দিকে ইঙ্গিত করে কবিতা –তিনি সেদিকেও আমাদের বোধকে নিয়ে যেতে চাইছিলেন। অর্থাৎ অনুরণনটি শুধু শব্দ ধ্বনির নয়, অর্থেরও হয়ে থাকে। সেজন্যেই একটি কবিতাতে তিনি লিখেছিলেন,
           “...শব্দও কবিতার কাষলৈ আহোঁতে
          খুলি থৈ আহে
          তার পোছাকী কাপোর” ( সাহিত্য উৎসবর তিনিদিন; হীরেন ভট্টাচার্যর কবিতা; পৃঃ১৭১) ‘ধ্বনি’ বলতে সেই অর্থের অনুরণনকেই বোঝাতেন আমাদের প্রাচীন সাহিত্যশাস্ত্রীরা। তাঁরা বলতেন, ‘কাব্যস্যাত্মা ধ্বনি’ । ধ্বনিই কাব্যের আত্মা। এই ধ্বনি আছে বলেই এই কথাও সত্য, ‘পাঠেই কবিতার জীবন।’ ছবি সম্পর্কে এই রবীন্দ্রোক্তি সত্য ‘চোখের ছবিতে মন আপনার ছবি জুড়িয়া দেয় তবেই সে ছবি মানুষের কাছে সম্পূর্ণ হইয়া ওঠে ।’ (ছবির অঙ্গ, পরিচয়, রবীন্দ্ররচনাবলী) এবং গান সম্পর্কে সত্য তাঁর এই উচ্চারণ, “একাকী গায়কের নহে তো গান, মিলিতে হবে দুই জনে —/গাহিবে একজন খুলিয়া গলা , আরেক জন গাবে মনে” (গানভঙ্গ,কাহিনী, রবীন্দ্ররচনাবলী)

         এবারে আমাদের মনে হচ্ছে আমরা হীরেন ভট্টাচার্যের বাংলা কবিতার যেগুলো আমাদের হাতে আছে সেগুলো বুঝবার কিছু সূত্র হাতে পেয়ে গেলাম। আমরা এই কবিতাটি দিয়েই শুরু করি।
                “ মাথা নত করে ছুঁয়ে এসো মানুষ-মাটি
                  স্পর্শ করো প্রতিজন সৎ কবির কবিতা, অকুতোভয় ভালোবাসা
                  গ্রহণ করো মানুষ সম্পর্কীয় সুগভীর পাঠ, মাতৃভাষার দীপ্ত বর্ণমালা
                 পরিণত ভালোবাসার গানে ভরিয়ে দে শব্দ প্রতিমার ঘর
          প্রদক্ষিণ করো মানুষ মাটি।” (প্রদক্ষিণ করো মানুষ মাটি, শেকড় থেকে পাতা অব্দি, পৃঃ৮৭) একেবারেই সহজ কথা, সহজ বক্তব্য। বামপন্থী প্রগতিশীলেরা যেমন ভাবতেন, সেই কথাগুলোই আছে। তারপরেও দেখুন তিনি কেমন নামঘর বা মন্দির পরিক্রমা করা ভক্তদলের একটা ছবি এঁকে ফেলছেন। ছবি যে ‘ধ্বনি’টি তোলে তার গুনে কেউ ভাবতেই পারেন, বোধকরি চেনা ‘ভকতে’র ‘ভক্তি’কে প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে। আর দল ভাবতেই পারেন , কবির ভক্তির বিষয়কে পালটে দিয়েছে এই কবিতা। সঙ্গে জানিয়ে দিয়েছে কবিতা নির্মাণের ব্যাকরণ। একেই বলে লোক উৎস থেকে পাওয়া ঐতিহ্যের নবনির্মাণ। এমন আরো আছে, গাছের বড়ো হয়ে উঠা আর পাখির কলকাকলি শুনুন,
               “ শিকড়টা আড়ালে আড়ালে অনেক দূর গিয়ে পৌঁছোল। পাথুরে মাটিও
               সহজে পেরিয়ে গেল। কিংবদন্তির দরজায় কড়ানাড়া দিয়ে এখন আমার বুকে
               ছটফটিয়ে আছে স্মৃতি।আমার গায়ে গা রেখে মেলে দিয়েছে ঝিমোনো ডানা।
               নদী- দহ আন্দোলিত প্রকৃতি শব্দমালার কোনো নির্জন বিছানায় হারানো শব্দ খুঁজে
               আড়াআড়ি শুয়ে আছে আমার ভিতরে বয়ে চলা ভাষার দ্রাঘিমা;
                ভালোবাসার দেশ-দেশান্তর...” (কবিতার অভিঘাত, পৃঃ৪৩)

তেমনি আছে,

           “... আমি কাগজ-কলম হাতে নিয়ে বসলাম, যদি একটিও কুড়োতে পারি;
           মানুষের বুকে এতো ঢেউ, এতো সর্বজনীন মানুষের বুক---
          শব্দবান মাটির দিকে চেয়ে আমি মাথা নিচু করে রইলাম। ( মানুষের বুকের ঢেউ; অংশ; পৃঃ ৪৫) এই শব্দবান মাটির দিকে তাকানোর কথাই আরেকটি কবিতাতে আছে এরকম,
         “ আমি এক দৃষ্টে ভাষার শেকড়টায় তাকিয়ে ছিলাম। কেউ আমাকে
        সুঠাম গাছটা আঙুল তুলে দেখালো।” (ভাষাবন্ধন, পৃঃ৬৭) স্মরণ করুন বইটির নাম ‘শেকড় থেকে পাতা’। একটা কবিতার আরম্ভ কেমন করে হয়?
        “ একটা দীর্ঘ কবিতার আবেগময় আরম্ভ যেন--
         আমার রক্তে সজীব হয়ে উঠেছে একটা শুকনো মাঠ--
        তার চারদিকে গজিয়ে উঠছে নলখাগরার চারা
        আমি তোর কোলে মাথা রেখে স্বপ্ন দেখছি
        আমার উঠনটার চিকন ছায়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে
        কোনো আমলকী বনের
        একজোড়া চিতল হরিণ
        আর হাসি-খুশি রোদের সরষেখেতটাতে
        গুনগুনিয়ে আছে আঁঠালো একঝাঁক জিরোনো মৌ। ...( একটা দীর্ঘ কবিতার আরম্ভ; পৃঃ ৩১) কখনো বা সেই কবিতা লেখা হয়েও উঠে না,
         “ আমার শরীর জুড়ে ব্যাকুলতা, গাছগাছালির সবুজ
         বীজের চারা জন্যে রাখা ধানমুঠো হাতেই ভিজে উঠেছে
        ছিটিয়ে দিলেই শেকড় ধরবে
        মাঠে নতুন জল আসার শব্দ শুনছি , ঢল ভেঙ্গে আসছে
        জল ভেঙ্গে আসছে শস্যমুখর দিন
        আমার রক্তে কান্নাজলের আলতো গন্ধ
        হেলে পড়েছে ধানের চারা...( ঢল ভেঙে আসছে, পৃঃ ৪০) এবারে এই কবিতাকে ইচ্ছে করলেই যে কেউ কবি, কবিতার সঙ্গে অসম্পর্কিত করে পড়তে পারেন। কেউ এতে ফী-বছরের বানের যন্ত্রণার সন্ধানও করতে পারেন, বা অন্যকিছু। আমরা আসলে তাঁর কবি সত্ত্বার স্বরূপ ধরতে গিয়ে এভাবে পড়ছি। সঙ্গে যে কথাটি অবশ্যই বলে দিতে চাই, কবিতা তার লেখাতে অবশ্যই কখনো ধান, কখনো সরষে, কখনো বা অগুল্ম বৃক্ষ, কখনো বাঁশঝাড়, আর বুকের ভেতরেই তিনি লালন করেন সেইসব ফসলের জমি-জিরেত , অথবা যেমন দাবি করেন বাস্তব জমিজিরেত থেকেই সংগ্রহ করেন ‘শব্দমালা’ যেখানে ‘স্মৃতি’ হয়ে বেড়ায় কখনো সুগন্ধি পখিলা, কখনো বা গুনগুন করে মৌ, কখনো আলোর শিশির ছড়ায় জোনাকিরা। এরা যেমন বীজ ছড়ায়, ফসল ফলায়, সবুজ করে মাটি। ‘মাটির মাতৃভাষা সবুজ’ একটি কবিতার প্রথম সারি (মাটির মাতৃভাষা, পৃঃ ৭৬)। কবি নিজেকে অধিকাংশ সময়ে ‘খেতিয়ক’ বা চাষা বলে কল্পনা করছেন, সে বলুন বা নাই বলুন বোঝাই যায়, কখনোবা ইচ্ছে করেন লাঙল হয়ে উঠবার। একেবারে শুরুতে উদ্ধৃত কবিতার মর্ম কথাটিতো এই। একটি কবিতার নামেই তো ইচ্ছে জানালেন, ‘আমাকে লাঙলের ফলা করে গড়ে নে’ (পৃঃ৩৪) এমনকি শিল্পী প্রতিমা পাণ্ডে বড়ুয়াকে নিয়ে যখন লিখছেন, কী লিখছেন?
               “ তুই গান গুটিয়ে চলে গেলি”
গান নয়তো যেন ধান! এরপরে লিখছেন,
              “ তোর দোতারাখানা সেভাবেই
                অগোছালো হয়ে পড়ে আছে
                উঠোনটাতে”
দোতারা নয়তো যেন লাঙল।
              “ছেঁড়া তার দুটো দুধারা চোখের জল”
 আশ্চর্য সুন্দর পংক্তি। কিন্তু এখানে থামলে চলবে কেন! শেষ পংক্তিটি,
              “ উজিয়ে বয়ে চলেছে মাটির সুরে” ।

স্মরণ করুন , রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরি’ কবিতাটি। মনে পড়বেই। কিন্তু কিছুতেই দুটো কবিতা এক নয়। প্রতিমা পাণ্ডের গান এখনো বাজে, সেই গান পড়ে থাকা দোতারার চোখের জল। তাও আবার ‘উজিয়ে’ চলেছে! তার মনে সে চলেছে আরেক নতুন সৃষ্টিমুখের দিকে। বাঙালি আঁকিয়ে সুশীল সাহা ঘোড়া আঁকবার জন্যে বিখ্যাত। চিত্রশিল্পী তিনি । কিন্তু যা বলবার বলেন এই ‘ঘোড়া’তেই । যারা বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদে হিরণ মিত্রের আঁকা দেখেছেন ভালো করে , জানেন কীভাবে তাঁকে চেনা যায়। বক্ররেখার বিচিত্র গতির ভেতরে বা বাইরে কোথাও একটা অমসৃণ চতুর্ভুজ থাকবেই। কবি হীরেন ভট্টাচার্যকে চিনতে গেলে আপনি ধান –লাঙল-জমিজিরেতের কথা পাবেনই পাবেন। এরপরে সে আপনার ইচ্ছে আপনি এসবের কীই বা অর্থ করবেন। কিন্তু কোন এক বা দু’টি শব্দের অর্থ করে নেবার আগে আমাদের অনুরোধ থাকবে, সমগ্র কবিতাটি যে ছবি রচনা করে সেটি একবার দেখে নিতে। ভুল করলে কিন্তু পথ হারিয়ে ফেলবার সমূহ সম্ভাবনা।

            সেই ছবি রচনাতে তিনি প্রায় ভুল করেনই না। ছবির যে সৌষম্যের জোরে রবীন্দ্রকথিত ‘রূপের মধ্যে অরূপে’র প্রকাশ ঘটে, যাকে আমরা আগে ‘ধ্বনি’ বলেছি, সেই সৌষম্যগুণটি তাঁর আয়ত্বে বলেই তাঁর ‘জোনাকি পংক্তিমালা’র খুদে কবিতাগুলোও পাঠক পেয়েছে বিশাল। অসম উপত্যকা পুরস্কার নিতে গিয়ে তিনি হিন্দি কবি অরুণ কমলের একটি আশ্চর্য পংক্তি উদ্ধার করেছিলেন, ‘সারা লোহা উন লোগোঁকা, অপনি কেবল ধার’ । কথাটা একই --‘ধার’ আর ‘সুষমা’। একটি কবিতাতে তিনি কেন যে লিখেছেন, ‘মোর অক্ষরবৃত্ত চাকত গঢ়া শব্দ-গাঁঠনি’ ( শব্দরূপ; হীরেন ভট্টাচার্যর কবিতা, পৃঃ২৩৪) –এ আমাদের কাছে এক প্রশ্ন। ‘অক্ষরবৃত্ত’ একটি ছন্দের নাম। তিনি সেই ছন্দে লেখেননি, এখানে শব্দটির অন্য মানে। লিখেছেন তিনি গদ্যে, কবিতাতেই তার স্বাক্ষর আছে, “ক’তো গদ্যর উজ্জ্বলতা নাই/ বর ফিকা হৈ গৈছে মোর কবিতা।” ( বীজ; ঐ; পৃঃ১৮৮) এমনকি আমরা যে বাংলা গানের বইটির কথা লিখলাম এবং একটি গান তুলেও দিলাম, সেখানেও দেখুন পনেরোটি পংক্তির মধ্যে অন্ত্যমিল আছে শুধু তিনজোড়া। সবগুলোই এরকম। ফলে যিনি শিল্পী নন, গানের মাস্টর মাত্র—তিনি সাহসই করবেন না এইসব গানে সুর বসাতে। হ্যা, কিছু কিছু জায়গাতে অসমিয়া শব্দগঠন থেকে গেছে বাংলাতে । এই যেমন ‘গর্জেথাকা শ্রাবণের আকাশখানা’ ( শ্রাবণের খেতজমিতে একদিন), বা ‘পাতল জিভে নুনের মহার্ঘ স্বাদ দিয়েছিস’ ( ধান যখন গা-ভারী হয়), ‘পাতল মেঘের আড়ালে ঢু মেরেছে চাঁদ’ (অন্য এক গান) ‘স্পর্শ করো প্রতিজন সৎ কবির কবিতা’ ( প্রদক্ষিণ করো মানুষ-মাটি) । এই নিয়ে তিনি সচেতন ছিলেন। ভূমিকাতে ‘অনুবাদে মাতৃভাষার গন্ধ খানিকটা লেগে থাকতে পারে’ লিখে মার্জনাও চেয়ে রেখেছেন, যদিও অরুণ সেন সেই কবিতাগুলো দেখেও দিয়েছেন। দুই- একটি কবিতাতেতো এমন ভুল এক নতুন মানেই এনে দিয়েছে ।যেমন আমাদের উদ্ধৃত গানটিতে, ‘নৌকা আমার এগুই-পিছোই” । ক্রিয়াপদ দু’টিতে অসমিয়া প্রথম পুরুষে জায়গাতে বাংলাতে জুড়ে গেছে উত্তমপুরুষের বিভক্তি। হওয়া উচিত ছিল—এগোয়, পিছোয়।  কিম্বা  ‘ভাষাই শুশ্রূষা করে মানুষের মন’ বাংলাতে কর্তৃকারকের ‘ভাষা’ এখানে শূন্য বিভক্তি  হবার কথা, অসমিয়াতেও ‘এ’ বা ‘ই’ বিভক্তি যুক্ত হয়। কিন্তু এখানে ই যুক্ত হয়ে বাংলাতে নিশ্চিতির অর্থ এনে দিয়েছে। তার মানে ভাষা ছাড়া আর কেউ করেনা মানুষের মনের শুশ্রূষা।  আমাদের যাদের অমলেন্দু গুহ, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, ঊর্ধ্বেন্দু দাশ, রবীন্দ্র সরকার  হয়ে হালের সঞ্জয় চক্রবর্তী, অভিজিৎ চক্রবর্তীদের কবিতা পড়বার অভ্যেস আছে আমরা জানি এখানকার বাংলাতে এমন অনেক শব্দ বা বাক্যগঠনরীতি আমরা মেনে নিয়েছি। ভাষাকে এমন গ্রহণ সমৃদ্ধ করে, যে ভাষা করতে পারে না সে দুর্বল। তবে কিনা, যেকোন ভাষার শক্তিশালী কবিরা এই গ্রহণ বর্জনের কাজটি করেন সচেতনভাবে, ভাষার ধর্ম জেনে এবং মেনে।  দুর্বলেরা করেন অচেতনভাবে— সংশয় দেখা দেয়  তিনি ধর্মটিকে চেনেন কি না। হীরেন ভট্টাচার্য বাঙালি কবি নন, তিনি দুর্বল কবিও নন---তাঁর ক্ষেত্রে এই সূত্র খাটবে না। বস্তুত ধর্তব্যের মধ্যে নেবার বিষয়ই নয় তাঁর এই ব্যাকরণের ত্রুটি। আমরা চোখ উপর দিয়ে নিয়ে চলে যেতে পারি। যা পাওয়া গেল তার তুলনাতে এগুলো নিতান্তই তুচ্ছ। বরং আমাদের বিস্মিত করেছে একজন অসমিয়া কবি বাংলা কবিতা লিখতে বসে, ফলবানের সঙ্গে মিল রেখে  ‘শব্দবান’ বলে একটি নতুন শব্দ সত্যি তৈরি করে জুড়ে দিলেন বাংলা ভাষাতে! পংক্তিটি পড়ে এসছি আমরা,  ‘শব্দবান মাটির দিকে চেয়ে আমি মাথা নিচু করে রইলাম।’ এর আগে আমরা যদি  শব্দটি পেয়েছি, তবে ‘বন্যা’র সঙ্গে তুলনাতে রূপক হিসেবে। অথবা পেয়েছি তীর অর্থে শব্দবাণ। এ আমাদের অবাক না করে পারে না।

             আমরা যে বাংলা কবিতা-বইকে ধরিয়ে দিলাম, সেটি তিনি  লিখেছেন  জীবনের একেবারে শেষ ভাগে ২০০১ থেকে ১০ এই দশ বছরে। দুই একটি বাদে সবগুলো কবিতারই মূল অসমিয়া রূপ রয়েছে ‘হীরেন ভট্টাচার্যের কবিতাঃ ১৯৫৭-২০১০’ সংগ্রহে।    ‘বৃষ্টি পড়ে অঝোরের’র একুশটি গান সে বইতে পাইনি। এগুলো স্বাধীন রচনা। নিচে কোন সন তারিখের উল্লেখ করেন নি, তবে ভূমিকাতে জানিয়েছেন এগুলো অনুবাদগুলো সারবার  পরে লেখা।  আমরা আশা করব কোন সুরশিল্পী  সুর দেবেন আর দেখতে পাবো কোনদিন এই গানগুলো  “ উজিয়ে বয়ে চলেছে মাটির সুরে” ।