“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

রবিবার, ৮ মে, ২০১৬

একা বিনোদিনী












চিরশ্রী দেবনাথ
......................
বিহারী, মহেন্দ্র কাহাকেও আশেপাশে
দেখিতে পাইলাম না, তাহারা কেহই আমার নয়

আমি একা বিনোদিনী

সকালখানি দুইহাজার ষোল,
প্রায় একশত ষোল বছর আগেকার বালি মেয়ে এই শ্রী
ল্যাপটপ থেকে বেরোতে থাকে শুধু  নিখাদ মধ্যরাত
বিষাদের মধু আমার শরীরে ফুটিয়ে দেয়
রোজকার অবাধ ঘাসবন
চারপাশে অশরীরী আমৃত্যু রবি
কতবার প্ল্যানচেটে ডেকেছি তোমায়
ধূপের ধোঁয়া, ফুলসাজপাতা খোলা সঞ্চয়িতা
কিশোরী মধ্যাহ্নের রবি বিলাস
পেন্সিলের সরু আঁচড়ে অস্পষ্ট হয়ে যে নাম
লিখিয়ে যেতো আঙুল
শিউরে ভাবি এ কি সত্যিই আমার রবি
সব মুহূর্তে আমি শুধুই  বিনোদিনী
বিরহস্বাদ কিছুতেই মেটে না
প্রেম আমার বিলাসী শবগল্প, অহল্যা সময় ....
কালো পাথুরে  মেয়ে
ওপর দিয়ে গড়িয়ে যায় তোমার শুষ্ক খোয়াই
গহন কুসুম কুঞ্জ মাঝে প্রবল পদাবলী হয়ে কেবলই
আমার জেগে থাকা,
এতো সব অপূর্ণ হয়ে ভরে ওঠা রক্তের আনাচকানাচে
তীব্র ভাবে তাকিয়ে থাকা এক জোড়া সমুদ্র..
শীর্ণ খসখসে আঙুলে আঁকতে থাকি ঝাউবন
মাঝে মাঝে কেউ যেন বলে যেতে থাকে
টপোলজির জটিল সূত্র প্রমাণ, মেলাতে চাই না আর ...
সাদা নোটবুকে তারা  এঁকে দিয়ে যাক
অ্যামিবা বিভাজন, দুফোঁটা হাসনুহেনার বাতায়ন  
আচ্ছন্ন ঘুমে অলিন্দ জুড়ে হাঁটতে থাকে
 ফ্যাকাসে বিনোদিনী  
ঠোঁট কামড়ে থাকা কালবৈশাখীর গয়না মেয়ে ..
নাভি আর হৃদয়ের মাঝে যে জন্ম বেঁচে আছে
আমার সব স্নান সেখানেই ......
এ ঘোরের  মতো সুখ আর নাই রবিকবি .....



বাংলা লতিফার ঝঙ্কার — ছয়

দূর দিগন্তে দ্রোহকালের অগ্নিশিখায়
তোর লাল উড়নার রঙ মিশে যায়, 
ও লো সাকি ক্রান্তিকালের দুন্দুভি বাজে 
ধ্বংসের কোলে সৃষ্টি নাচে, তোর দীঘল বেণী
দোলে দোলে নাচছে যেন বিষধরী কালনাগিনী, 
আয় লো সাকি দে সিরাজী মাতাল হবো দু'জনে।

© সুনীতি দেবনাথ

চেন্নাই,
২৪ এপ্রিল, ২০১৬

শুক্রবার, ৬ মে, ২০১৬

ষষ্ঠপদীর ঝঙ্কার — দুই

© সুনীতি দেবনাথ

বসরাই গোলাব ঝরায় সোহাগ পাপড়ির
শবনমী ঝালর সারারাত তোর ঐ ওষ্ঠপুটে,
সাকি তোর অধরসুধার সুপ্ত মিঠাস জাগায় প্রাণে
দ্রোহের আগুন রাত্রি শেষের এই প্রহরে,
জেগে ওঠো ও মুসাফির, ছাড়তে হবে এ ঠিকানা,
তোর মিহিন সুরে কান্না-বিবশ হলাম রে দিওয়ানা!

চেন্নাই,
১৯ এপ্রিল, ২০১৬

॥ আরশি ॥

- নীলদীপ চক্রবর্তী
রুক্ষ দেয়ালে এক ধূর্ত আরশি মুখে
প্রতিফলিত যত বাস্তব মুখগুলো
ঘোর সন্তোষে ফিরে ফিরে যায় তারা

আরশি কারচুপি করে, মুচকি হাসে ।
আপাত নিরীহ, বোকা সুচতুর সবাইকে
আরশি ফিরিয়ে দেয় ।
গোপন অতি সঙ্গীন অথবা রঙিন বৃত্তিগুলো
ঢাকা পড়ে যায় সযত্ন মুন্সিয়ানায় ।
সুরে মুর্ছনার মতো সুযোগ সৃষ্টি করে
এলোমেলো অঙ্গ গুলো পরিপাটি রূপ ধরে
চোখের অতল গহনে নামে কাচের উল্টো চোখ
আরশি নগরে বসবাসের কেউ নাগরিকত্ব পায় !
ভাগ্যি অতি হৃদয় টুকু অধরা থেকে গেছে
ভাবনা গুলো খেলছে মুখে এক্কা দোক্কা খেলা
গ্রীষ্মে শীতে রাতের আলোয়, দিনের অন্ধকারে
আরশি ফেরায় , ভাবলেশহীন ফ্যাকাশে মুখোশ যত ...

বৃহস্পতিবার, ৫ মে, ২০১৬

গুচ্ছ কবিতা






 


















 ।। চিরশ্রী দেবনাথ।। 
( ১লা মে, ২০১৬তে দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত)


মিশ্রগুচ্ছ
..............
এক
গুলঞ্চ বেলা
.....................
ভীষণ গভীর রাতে
মধ্যবিত্ত শহরের খোলা ছাদগুলোতে
জমা হয় শহরের সব বিশ্রী মেয়ের প্রেম
তারা রঙ মাখে, চুল বাঁধে, চুলে দেয় গুলঞ্চ ফুল
সেইসব প্রেমেরা গুছিয়ে বসে ফিসফিস করে
শহর জেগে গেলেই আবার তারা
ঢুকে যায় ঘুপচি মেয়ের গহ্বরে
প্রতিরাতে  এভাবে তারা বুড়ো হয়
তারপর এক গরীব দুপুরে
মেয়েরা  তাদের প্রেম বেঁচে দেয়
সমাপ্তি সঙ্গীত গায় একটি মেয়ে
বাকি মেয়েরা দেখে দিনে দিনে
শেষ হয়ে আসছে গুলঞ্চ ফুলের ঝোপ.....

দুই
মাংসাশী সুর
....................
মাংস কাটার দোকানের কাছে বসে আছে
এক পরিযায়ী বেহালাবাদক
ছাল উঠছে, রক্ত ঝরছে টুপটাপ
বেহালায় জ্যোৎস্না সুর,চোখ বন্ধ
পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে মাংস কাটার গান
ছাল উঠছে, রক্ত ঝরছে টুপটাপ
বসন্তের পশুরা সার সার গান শুনছে
ঝরে ঝরে পড়ছে লোম, পোকা
সোনালি চামড়ায় ভেসে যাচ্ছে মাংস
সোনালি ছাল জমছে আর জমছে
বেহালার সুরে এবার শুধু
  ঘুমিয়ে পড়ার গান, ঝরা লোমের গান.....

তিন
মনখারাপের রিংটোন
...............................
কোন এক ভূমিকম্পের নবীনভঙ্গুর
পর্বতমালায় একটি কুটির আমাদের
সামনে বহতা রাস্তা
প্রহরে প্রহরে কেঁপে ওঠে মাটি
বদলে যায় রাস্তা, দৃশ্য, বারান্দার চেয়ার
শুধু একটি ঝর্ণা পুরনো, 'মনখারাপের '
এতো এতো বার মাটি কেঁপে ওঠে
ঝরনাটি  তবু ঝরতেই থাকে .....
তার একটিই শুধু রিং টোন ....

চার
মহাবলীপুরম্
.....................
সপ্তম শতাব্দীর তীরে ভেসে আসা একটু সমুদ্রক্ষণ
পল্লবসাম্রাজ্যের হীরকদুপুরে
অগোছালো একটু বিংশ মানবী
পাথর চিনেছে সবই
ধাতব নূপুর, সুগন্ধ পুষ্পবাস
পায়ের ছাপে কড়কড়ে বালিপতন
সুনামির ঝড়ো শ্বাস
আর
.........এই তো সেই পালিয়ে যেতে থাকা মেয়েটি....
পাঁচ
কাঞ্চীপুরম্
..................
এতো রুক্ষ তুমি আগেও ছিলে
এখনো তোমাকে ছুঁয়ে আছে আগুন বালিচ্ছায়া
অর্জুন রথের সব যুদ্ধ খেলা, বর্শা আঘাত
একটুও রক্ত দেয়নি আমায়
কোমরবন্ধনীতে শুধু চুবিয়ে গেছে ধীর ক্ষয়
কোন প্রাকসন্ধ্যায়, মনে করো সন্ধ্যার ফিরে আসা
চন্দ্রগ্রহণে দিয়ে যাওয়া ঝিনুক পোশাক, মুক্তোগ্রাস .....

ছয়
ভেলোর ফোর্ট
.......................
বসন্তের শেষ  চারণভূমিতে
অদক্ষ কালিদাসের শ্লোকসন্ধ্যা
দুর্গের প্রাকার থেকে
বিজয়নগর সাম্রাজ্যের ঘুমন্ত রাত
ঘাস ঘাস সঙ্গিন চরণে হেঁটে গেলাম গ্রানাইট শরীর
পাথরের গরম শ্বাস, পরিখার জল
ভিনদেশী রোদ তিনটি হাতে মেলেছে জলপাখনা
সমুদ্রহাওয়ায় কুমকুম শুকিয়ে শুকিয়ে অশরীরী
এক দেবদাসী বন্ধু পাপ করেছিল
তার গচ্ছিত এই পদ্মপাপ
আমারি কাছে আছে সযতনে
ঘুরে ঘুরে এসেছি ফিরে
এক  ভুল তরবারির কাছে
স্তব্ধ হয়ে আছে ঝনঝন
ঝরাবো তাকে হাজার সন্ধ্যা পরে
ভিনদেশী মেয়ের অবাধ্য লালিত শাসিত অক্ষরে ...


সোমবার, ২ মে, ২০১৬

চন্দ্রাহত




প্রবল ঝড় জলের পর
চাঁদ উঠেছিল তার
অনিচ্ছুক আলো ছড়িয়ে-
ছেঁড়া স্বপ্নের মত  
বিচ্ছিন্ন মেঘখন্ড
নিজস্ব আকাশজুড়ে
লিখেছিল আমন্রণলিপি
নিতান্ত দুরাশায়৷
কোথাও তো জ্বলেনি আগুন
পতঙ্গ প্রতীক্ষায়,
তবু অনিবার আসা - যাওয়া
তবুও পৌন:পুনিকতা
অনাদিকালের বৃক্ষমূল হয়ে
ছুঁয়েছিল লক্ষ্য তার-
অবাক চাঁদের ধারায়
ঢেলেছিল সবুজ আলো কতবার,
শিকড় ও মাটির ফাঁকে
গাঢ়তর জমে থাকে
চন্দ্রাহত বেদনা অপার----


 ( দৈনিক "প্রতিবাদী কলম' , ত্রিপুরা , ১ মে।২০১৬)