“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

সোমবার, ৪ জানুয়ারি, ২০১৬

সুরমা গাঙর পানি - ভাটি পর্ব ১৭



(দেশভাগ এবং পরের দশকের কাছাড় সিলেটের প্রেক্ষাপটে রণবীর পুরকায়স্থের এই উপন্যাস ছেপে বের করেছে দিন হলো। ভালো লাগা এই  উপন্যাস পুরোটা টাইপ করে তুলে আমার প্রিয় কথা শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। আশা করছি আপনাদের সবার এটি পড়তে ভালো লাগবে। সম্পূর্ণ উপন্যাসের সংলাপ ভাগটি সিলেটিতে -সে সম্ভবত এই উপন্যাসের সবচাইতে আকর্ষণীয় দিক। আপনাদের পড়বার সুবিধে করে দিতে, ঈশানে এই উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে আসছে। আজ তার সপ্তদশ  অধ্যায় ---সুব্রতা মজুমদার।) 
সতেরো

   মা গেল বেঘোরে, বাপও গেল । অনাথ বৈতলের পিছুটান আর কিছুই রইল না বইয়াখাউরি গ্রামে । অস্থির সময় বৈতলকেও আরো দুরন্ত করে তোলে । বন্ধু লুলাকে প্রাণপণে কাছে পেতে চায় । গ্রাসাচ্ছাদন আর জীবিকা পরিবর্তনের লড়াইএ লুলাকেও খুঁজে পায় না বৈতল । বেজগিরিতে অবিশ্বাস ছাড়া কিছু নেই বলেছে বৈতলকে । এর থেকে এই কবিগানে সম্মান বেশি । গ্রাম সিলেটের মানুষের কাছে এখন আর সে লুলা বেজ নয় । জড়িবুটি রং করে বুজরুকির কারবার সে আর করে না । তার কবিগান শুনে গ্রামের মানুষ, হাটুরে মানুষ থমকে দাঁড়ায় হাসে কাঁদে এক আনা দিয়ে কিনে নিয়ে যায় চার পাতার বই । তার নামও পাল্টে নিয়েছে, এখন সে দিলবাহার বাঙাল । অবাক বৈতল বলে,
--- ইতা কিতা বে । তুই তো রুল আমিন শেখ । আক্‌তা ই দিলবাহার বাঙাল অই গেলে কেমনে ।
--- অই গেলাম আরি । জানছ নানি গপ, সবর অউ চিৎ অইয়া ঘুমানির শখ হয় । আমিও জাতো উঠছি । গত বছর আমি বেজ আছলাম, ইবার আমি শেখ, আগামী বছর আমি সৈয়দ অইমু । আমি বাঙাল অই গেছি । ইতা কুতুবর কাম । কইল কবির নাম সুন্দর সান্দর না অইলে মা’নে পড়তা নায়, কান্দতা নায় ।
--- তর কুতুবরে কইছ, আমার লাগিও একটা সুন্দর নাম দিত ।
--- এ, কুতুবে কিতা করত, আমিউ দিলাইমু নাম, নে তোর নাম অখন সুখবাহার । কিন্তু বাঙাল লাগানি লাগব ।
--- লাগাইমু । তুই আইও , তোর লাগি বাড়ির ছানি দিলাম, বেড়া লেপলাম । তর কিতা মতলব ক চাইন , আমার লগে থাকতে নায় নি ।
--- না বে কুতুবরে লইয়া কিতা করতাম । ইগুওনু আছে আমার লগে ।
--- তে কিতা অইছে ইগুরেও লইয়া আইও ।
--- না না । এর থাকি এক কাম কর । তুইও আইও পিয়াইনর পারো । আমি থাকমু কয়বরো, তুইন থাকবে শ্মশানো । ইলাখান লাগালাগি কয়বর শ্মশান সারা সিলেটো নাই । আইও থাকমুনে দুইজনে ।
--- কেমনে থাকমু । তরে শ্মশানো ঢুকতে দিব নি ।
--- তে তুই আইঅইছ কয়বরো আমরার ইতা মানামানি নাই ।
--- কইরে নি । আইতাম । না বে শ্মশান কয়বর ইতা আমার ভালা লাগে না । ডর লাগে মরার আগে মরতাম কেনে । একেবারে আইমু । তুই থাক তর কয়বর আর কবি লইয়া । মাঝে মাঝে আইছ ।
       নদীর গায়ে পাশাপাশি হলেও একটা প্রাকৃতিক বিভাজিকা আছে শ্মশান আর কবরের । সুরমার গায়ে শ্মশান আর পিয়াইনের গায়ে কবর । বইয়াখাউরি থেকে অনেক দূরে । কথার কথা বলেছে বৈতল, সে ভয় করে না কিছুর । শ্মশান কবরে কী ভয় । বরং এরকম জায়গা নিয়ে বৈতল অন্যকে ভয় দেখাতে পারে । আসলে বাড়িটার প্রতি একটা টান আছে বৈতলের । মাতৃস্মৃতি ছেড়ে আর নড়তে চায় না ।
       জেলা সিলেটের একমাত্র দুঃখ তার বন্যা । আর বন্যার সময় সুখের জায়গা হলো তার টিলাভুমি । বেশির ভাগ টিলাভূমিতেই এখন চা বাগান । সুনামগঞ্জ মহকুমায় চা বাগান নেই । সুনামগঞ্জের সুনাম তার জলের জন্য । তিন ভাগ জল একভাগ কিংবা তারও কম স্থল । জয়ন্তীয়া পাহাড় থেকে নদী এসে মিশেছে সুরমায় । পিয়াইন নদীর যখন তখন জলবমি হয় । উপত্যকা ভরিয়ে দেয় । সুরমার যেখানে পিয়াইন এসে মিশেছে, সেখানে প্রকৃতি আর ধর্মের এক অবাক সমন্বয় । পাশাপাশি দূরত্বের কবর আর শ্মশানঘাটের জমি অনেক উঁচু, টিলা না হলেও উচ্চভূমি । এই দুই অন্তিম গন্তব্যের মুখোমুখি এক সুউচ্চ পাহাড় । পাহাড়ের নাম মালীর ভিটা । কেউ কেউ বলে মোল্লার ভিটা । কত কথা  এই পাহাড় নিয়ে । রাজা গোবিন্দর আমলে এখানে মন্দির ছিল মা কালীর, সংক্ষিপ্ত হতে হতে মা কালী হয়েছেন মালী । পীরসাহেবের আগমনে ইসলাম ধর্মের প্রচারে মন্দির বন্ধ হয়ে যায় । মুসলমান অধীনে যায় অসাধারণ সৌন্দর্যময় এই উচ্চভূমি । মন্দির মসজিদ হয় বলে কথিত । আবার ফিরে পায় হিন্দুরা সম্প্রীতির হাত ধরে । মালী আর মোল্লা নিয়ে যতই মতভেদ থাকুক কেউ অধিকার যাচাই করে না । অধিষ্ঠাত্রী দেবী কালীকে জাগ্রত বলেই জানে অধিবাসীরা ।
     বৈতল বন্ধুত্বের টানে, জলের ঠেলায় আবার লুলার কাছাকাছি হয় । বইয়াখাউরি ফেরার তিনমাসের মধ্যে দ্বিতীয় বন্যায় ঘরছাড়াদের সঙ্গী হতে মন চায়নি বৈতলের । দেখার হাওরের পারে উত্তর টিলার মনসামন্দিরের দুর্গতরা আশ্রয় নেয় । কিন্তু বৈতলের এক গোঁ, মনসার সঙ্গে আড়ি । তাই কালীমাতার সঙ্গে মিত্রতা । মালীর ভিটার সঙ্গে এমনিতেও যাতায়াত আছে বৈতলের । অমাবস্যার রাতে ওখানেই থাকে । বিভোর হয়ে কাটিয়ে দেয় রাত । মন্দিরের সেবাইত গিরিবাবাকে গানের সুরে বিভোর করে গায়,
‘ বড় ধুম লেগেছে হৃদি কমলে
মজা দেখিছে আমার মন- পাগলে ।’
   বাবাজিও শুদ্ধচিত্তে বৈতলের এনে দেওয়া জবা ফুলের অর্চনা দেয় মাতৃচরণে । আর মধুর স্বরে গায় গান,
দ্যাখনা চেয়ে ন্যাংটা মেয়ে করতেছে কী কারখানা
হাস্য করে, আস্যে পোরে      মত্ত মাতঙ্গ সেনা ।
 আসব পানে মত্ত মন        রোষে আরক্ত নয়ন
রাত বাড়ালে যুবক শিষ্য বৈতলের দিকে ন্যাকড়াজড়ানো ছিলিমটিও বাড়িয়ে দেয় । বৈতলকে বলে,
--- গাও, গাইলে দিমু নাইলে দিতাম নায় ।
বৈতলও মিষ্টি হাসিতে ভরিয়ে দেয় মায়ের মুখ । গায়,
গাইঞ্জা চিরল চিরল পাত
গাইঞ্জা খাইয়া মত্ত হইয়া নাচে ভোলানাথ ।

    গিরিবাবার শালগাছের মতো বিশাল দেহের উপর জটার পাহাড় দীর্ঘ দাড়ি আর কপালের রক্ততিলক দেখে বৈতল বোল দেয় ‘ হর হর মহাদেব’। বৈতল জানে এই মানুষটির সঙ্গে থাকলে সব দুর্যোগ কেটে যাবে । বিশালদেহী মানুষটার মিষ্টিভাষণেও আপ্লুত হয় বৈতল । ভাবে অভিভাবক এমনই হওয়া উচিত ।
     একদিকে প্লাবনের জল, অন্যদিকে গুজবের বন্যা । কত মানুষের কত কথা । শুনে শুনে বিরক্ত হয় বৈতল । এক পক্ষ ভীত , অন্য পক্ষ উল্লসিত । এছাড়াও একদল আছে যারা শান্তিসুখে থাকতে চায় মিলেমিশে । বৈতল খোঁজে মানুষ । মানুষের মতো মানুষ, যে নেতৃত্ব দিতে পারবে, দুর্বল মানুষকে বল দিতে পারবে । একজন শক্ত মানুষের আশ্রয় চাই । গিরিবাবা পারেন, একমাত্র নির্ভয় মানুষ এ তল্লাটে । নেশার ঘোর যখন জমে ওঠে বৈতলের তখন অমাবস্যা রাত্রির মধ্যযাম । তখন বৈতলের শুরু হয় কথোপকথন ! বাবাজির পায়ে হাত দিয়ে বলে,
--- আইচ্ছা বাবাজি ইতা ঠিক নি কথা ।
--- কী কথা বা ।
--- অউযে খেদাই দিব । ঘরবাড়ি নিব গি ।
--- শুনা কথাত বিশ্বাস করিও না । অইলে তো অইবউ, কিতা করবায়, গুলার পানি আটকাইতায় পারবায় নি ।
--- সিলেটও পাকিস্তানো যাইব গি । আমরার সুনামগঞ্জও ।
--- অ বা বৈতল । হিন্দুস্থান পাকিস্তান দিয়া আমরার কিতা কও । গরিবর হক্কল খানোউ কাম করি খাওন লাগব । তুমি তো ইলাখান মানুষ নায় ।
--- আমি চুকি না কুনুগুরে । কিন্তু একলগে যদি আইন তখন তো বেবস্তা রাখন লাগব ।
--- কিতা বেবস্তা ।
--- কয়েকটারে মারিয়া তো মরতাম ।
--- মারামারির কথা ভাবিও না । আমরা যেলাখান আছি মিলিমিশিয়া থাকমু । মার উপরে ভরসা রাখিও ।
--- আমার মা নাই ।
--- তে এইন কে ।
     বৈতল ঢুলু ঢুলু চোখে তাকিয়ে দেখে করালবদনির চোখে মিটিমিটি হাসি । হাসির অর্থ বোঝে বৈতল । কালো পাথরের মূর্তি থেকে উপহাসের জট খুলে ছুটে আসছে তার দিকে । বিদ্ধ করেছে । বলছে কাপুরুষ । বলছে অসমসাহসের বলিহারি । বইয়াখাউরির জলকে ভয় পেয়ে পালিয়ে এসেছে করালবদনীর কাছে । বাপের আর্ত চিৎকার, বড় হাওরের জলে হুড়মুড়িয়ে টঙ ভেঙে পড়া, রইদপুয়ানি গ্রামের ঘাটা খুলে বেরিয়ে আসা, সিলেটের সাদা মেয়ের কান ছিঁড়ে পালিয়ে যাওয়া, এসব কোন বাহাদুরি । বৈতল মিথ্যে অভিযোগ থেকে মুক্তি পেতে মরিয়া চিৎকার করে ওঠে । বলে,
--- মিছা কথা, সব মিছা কথা । তাই আমারে চাকর কইছে, বাপে পুত মানে না, আলদ দিয়া মারত চায়, আর কালা পুড়ি এগুরে বিয়া করিয়া আমি কিতা করতাম । পানি কম অউক আমি যাইমু গি আমার বাড়িত । বাড়ি ছাড়িয়া আমি লড়তাম নায় । পাকিস্তান উকিস্তান আমি চুকি না ।
    রাত বাড়ে জলও বাড়ে । মাতৃমূর্তিকে মনের কথা বলে নিরুদ্বেগ শুয়ে থাকে মন্দির গৃহের এক কোণে । ঘুম ভাঙে লুলার গালাগালিতে । অকথ্য চিৎকারে লুলা বৈতলের গায়ে লাথি মারে । বৈতল ওঠে । এত বড় সাহস তার । ভাল করে তাকায় ঘাতকের দিকে । চিনতে পারে না লুলাকে । এই কই তার প্রাণের বন্ধু রুল আমিন শেখ । দেখে লুলার থুতনিতে পেয়াজের জড়ের মতো কালো এক মুঠো দাড়ি । বৈতল ভাবে লুলা ঠাট্টা করেছে, আবার কোনো দুষ্ট পরিকল্পনা আছে, আবার বেরোবে কোথাও । বৈতলকে বলবে ‘চল’ । বৈতলও বেরিয়ে পড়বে । বৈতল তাই হাসি মুখে লুলার দাড়ি নেড়ে দেয় । বলে,
--- ইতা কিতাবে ,
‘এক বেটা যায় শ্বশুরবাড়ি
মাথা নাই তার পুন্দো দাড়ি ।’
--- তুই আক্‌তা দাড়ি রাখলে কিতা ।
--- দাড়ি রাখন লাগে । ইমানদার মুসলমান অইলে রাখন লাগে । তুইও রাখবে ।
--- আমার দাড়ি উঠে না ।
--- ইখানো থাকলে উঠানি লাগব ।
--- অই হালার হালা, তুই মন্দিরো ঢুকলে কেমনে ।
--- অখন মন্দির উন্দির কিচ্ছু নাই ।
--- কেনে ।
--- ইনো আমরার মজিদ আছিল, কাফির হকলে মন্দির বানাইছিল মোল্লার ভিটাত । আমরা আবার আজান দিমু ইনথনি ।
--- তুই নি দিবে আজান । বেজর বেটা অইতে মুয়াজ্জিন । কইতে পারবে নি আল্লা হো আকবর কথার অর্থ  কিতা ।
   লুলার কণ্ঠ নয় অন্য এক গমগমে গলার আওয়াজ শোনে বৈতল মন্দির চত্বরে ঘুমঘোরে,
--- ঈশ্বর করুণাময় । অখন উঠো রেবা, দেখ চউখ মেলিয়া চাইর দিকে । সব বাড়িঘর ডুবি গেছে । কবর আর শ্মশানও ডুবি যাইব মনোলয় বিকালর আগেউ । কিচ্ছু করণ লাগব রেবা ।
    কী করে বৈতল । সকালের স্বপ্ন যদি সত্যি হয় । তার বন্ধু যদি পাল্টে যায় । পাল্টাবে কেন, লুলার মন একেবারে সাদা , চেরাপুঞ্জি চুনের মতো । বৈতলের মতো কুকড়ি নয় । প্যাঁচ পয়জার নেই, একটু অভিমানী । বৈতলের কিল চড় লাথি না খেলে ঠিক হয় না । আসলে পাঁচ বছরের ব্যবধানে, অদর্শনের দূরত্বে লুলার যে নতুন পৃথিবী গড়ে উঠেছে তা মানতে পারছে না বৈতল । তাই সবসময় উল্টো পাল্টা ভাবছে, স্বপ্ন দেখছে । গিরিবাবার কথার সূত্র ধরে তাই লাফিয়ে ওঠে বৈতল । বলে,
--- লুলা অগুরে  লইয়া আই আগে ।
--- কই আনতায় ।
--- কেনে, মন্দিরো । মন্দির টিল্লা ছাড়া মাটি নাই কুনুখানো ।
--- আনতায় । মাইনষে যদি কিচ্ছু কইন । দেখো তুমি যেতা বুঝো । শ্মশানো একলা পুড়ি এগু থাকে । আইত কও, সব আউকা, যেতা অইব দেখা যাইব নে । বিপদ থাকি রক্ষা অউক আগে ।
     লুলা একা জলভূমিতে যেতে চায় না, বৈতল কুতুব সহ সব আবাসিককে আমন্ত্রণ জানিয়েছে । লুলা বলে,
--- তোর বাবাজি এইন বড় ভালা নানি বে । দেখলে কিন্তু ডর লাগে ।
--- আইবে নি ক ।
--- আইমু আইমু, পানি কয়বরর উপরে উঠলেউ যাইমু । হিন্দুর ধর্ম নষ্ট করণ লাগব নানি ।
   প্রলয় কাকে বলে জানে না বৈতল, তবে সে বুঝতে পেরেছে প্রকৃতি এবার ক্রুদ্ধ হয়েছে । সৃষ্টিনাশ হওয়ার কথা বলেন বয়স্কজনেরা, জল যে – হারে বাড়ছে তাতে আর পায়ের তলার মাটি থাকবে না । সন্ধ্যার আঁধার ঘন হয়ে এসেছে দুপুরেই । চোখের দেখায় বেশিদূর দেখা যায় না । বড়জোর কয়েক পাড়া। কয়েক পায়ের দূরত্ব দৃশ্যমান । অনেক দূরের একটা আভাস শুধু চোখের সামনে । বন্যার জলের ধূসর, আর মাঝে মাঝে গাছগাছালির সবুজথোকা । আকাশে কালো মেঘের লড়াই থামছেই না, ঝমঝমানি বেশি করে শুরু হতেই বৈতল মন্দিরের ভিতরেও দেখে বন্যার প্রকোপ । পীড়িত মানুষ উঠে আসছে একজন দুজন করে । অসহায় জলবন্দী মানুষ এখনও ধর্মে জড়িয়ে আছে । সবাই মা কালীর ভক্ত । কুপি লন্ঠনের আলোয় মা কালীর সামনে বসে জল্পনা করে সম্ভাব্যের । টিলার নিরাপদ আশ্রয় পেয়ে অস্থির সময়ের ভাবনায় কাতর হয় । কেউ বলে ওরা যদি দল বেঁধে ওঠে আসে । একা কতজন অসহায় মানুষকে আক্রমণ করলে কী হবে । কেউ বলে, জবাব হবে । কেউ বলে নিচে কবরের ভিতর লাল ফকিরের মাজারে ওরা জড়ো হয়েছে । আলোর বিন্দু দেখা যাচ্ছে  ঐ নিচে । কেউ একজন দেখে এসে সত্যতা নির্ধারণ করে । ভীত মানুষকে বরাভয় দিয়ে গিরিবাবা বসেন পূজায় । বাবাজির মুখে এক উজ্জ্বল আলো, কালো মায়ের মুখে তাকিয়ে যেন কাতরে কিছু বলতে চান । পাশে বসা বৈতলকে ডেকে বলেন,
--- চিলিম সাজাইছ নিবা । চিলিম সাজাইয়া গাও, ‘সমরে নাচেরে শ্যামা শিব সীমন্তিনী’ । 
     নৈবেদ্যের ভক্তিতে চিলিম সাজিয়ে ন্যাতায় জড়িয়ে জোড় করে বৈতল বাবাজির হাতে দেয় । অচিরেই ফেরত পায় বৈতল । এক চিলিমে যেমন তেমন হতেই বৈতল বোল দিয়ে ওঠে ‘বোম বোম বম্বালে’ । কুড়ি কণ্ঠের প্রতিধ্বনিও ওঠে ।
   আল্লা হো আকবরের জিগিরও ওঠে কোথাও । এবার তাহলে সম্ভাবনা সত্যি হয়ে ওঠে । ‘হায় হায়, গেল গেল’ করে ওঠে সমবেত শরণার্থী ।  গিরিবাবার মুখেও এবার আতঙ্কের ছাপ । এ কই সত্যি জিকির নাকি সুরমা পিয়াইনের সম্মিলিত আক্রোশধ্বনি । বাবাজি বৈতলকে ডেকে বলেন,
--- তেউ । কিতা অইব বা বৈতল বাবাজি ।
--- কিতা আর অইব । এমনে ছাড়ি দিমু নি ।
--- ইতা কিতা কও, কত মানুষ তারার । সব গাউউতো তারার । এক কাম করণ লাগব, মন্দিরর পিছে দি গিয়া সুরমাত ঝাপ দেওন লাগব ।
   বৈতল মন্দিরের পিছনে যায় । জলের শব্দ শুনতে পায় । বলে,
--- ডরানির কিচ্ছু নাই । এমনে মরতাম নায়, মারিয়া মরমু । এক একটারে মারমু আর পিয়াইনো ফালাইমু সুরমাত ফালাইমু, সোজা স্বর্গত যাইব, বেহেস্ত উয়েস্ত পাইত নায় । আপনার রামদা বার করইন বাবাজি । 

চলবে

 < ভাটি পর্ব ১৬পড়ুন                                                    ভাটি পর্ব ১৮ পড়ুন > 

সুরমা গাঙর পানি-- ভাটি পর্ব ১৬

ষোল

 (দেশভাগ এবং পরের দশকের কাছাড় সিলেটের প্রেক্ষাপটে রণবীর পুরকায়স্থের এই উপন্যাস ছেপে বের করেছে দিন হলো। ভালো লাগা এই  উপন্যাস পুরোটা টাইপ করে তুলে আমার প্রিয় কথা শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। আশা করছি আপনাদের সবার এটি পড়তে ভালো লাগবে। সম্পূর্ণ উপন্যাসের সংলাপ ভাগটি সিলেটিতে -সে সম্ভবত এই উপন্যাসের সবচাইতে আকর্ষণীয় দিক। আপনাদের পড়বার সুবিধে করে দিতে, ঈশানে এই উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে আসছে। আজ তার ষোড়শ  অধ্যায় ---সুব্রতা মজুমদার।)
   
    দোটানার মনকে আবার ফেরাতে বৈতল জৈন্তিয়ার পাহাড়ের দিকে আকুল দৃষ্টিতে তাকায় । এক মুহূর্তেই যেন পণ্ডিত পয়গম্বর হয়ে যায় বৈতল । গুরুর কথামতো অদৃশ্য নদীর উদ্দেশে প্রণাম জানায় । নদীকে মা বলে ডাকেন গুরু সৃষ্টিধর । গুরুকেও প্রণাম করে বৈতল । দোটানা ছেড়ে আবার পেছন ফেরে বৈতল । এবার ফেরা বইয়াখাউরি ।
       বৈতল একা লড়তে চায় । সৃষ্টিধর সূত্রধর ভবিষ্যৎ পড়তে জানেন । গুরু জানেন বৈতল তাকে ছেড়ে যাবে একদিন । তাই বলেন ,
--- বুঝলায় নি বাবা, তখন অতো ইস্কুল উস্কুল আছিল না, কিন্তু শিক্ষা আছিল । সবরেউ মা বাপে পাঠাইতা শিক্ষার লাগি । মহাভারতো দেখবায় সবেউ তিন চাইর পাঁচ বছরর লাগি যাইতাগি পরিবার ছাড়িয়া । তখন তারার শিক্ষা অইত, উচ্চ – শিক্ষা, বিয়াও অইত এক দুইটা । মহাবীর অইয়া ফিরতা । তুমিও যাইবায় গি । মায়া বাড়াইরায় আর কিতা ।
      বৈতলের লড়াকু মনের ভিতর যে কত কথার ফুটকড়াই । এক দুই তিন করে গুনলে আর গুনতি শেষ হয় না । তাও গুণে দেখে বৈতল । এক, মায়ার বাঁধন বড় আঁট হয়ে জড়িয়ে ধরেছে তাকে, না ছাড়ালে ভেড়া হয়ে হয়ে থাকতে হবে সারাজীবন এই দিঘীর পারের অন্তঃপাতি রইদপুয়ানি গ্রামে । দুই, চামেলির সঙ্গে শুকনো সম্পর্ক আছে তার । স্থায়ী সম্পর্ক তৈরি করতেও মন চায় না । চায়নার মন ভাল, শরীর ভাল, কিন্তু গায়ের বর্ণ কালো, দূরে চলে গেলেই এক আকর্ষণ পিছু টানে । কালো পাখি ফিঙ্গের কাছে ফিরে যেতে মন চায় । কিন্তু কিছুতেই যে কিশোরকালের এক ডাকাতি কথা ভুলতে পারে না । পেশকারের মেয়ে বুড়ির মাকড়ি ছেঁড়া কানের স্পর্শে এখনও সে রোমাঞ্চিত হয়, অপরাধী হয়ে আছে যে । বুড়ির ‘আওয়া’ দুধের বর্ণ এখনও ভুলতে পারে না বৈতল, চায়নার পাখি রঙে জীবন চলবে না । তাই পলায়ন । তিন, আগডুম বাগডুম না বকলে বৈতলের দিন কাটে না । রইদপুয়ানির চায়নার সঙ্গে তো মনমন একাকীর কথা বলা । লুলাকে যেমন, গালাগালি বকাবকি মারপিট করে নির্ভার রাখা যায় মন । বৈতল জানে পঞ্চখণ্ড রইদপুয়ানিতে লুলা কোনদিন আসবে না । বৈতল নিশ্চিত এবার পাবেই পাবে বন্ধুকে বইয়াখাউরিতে । চার, মা তো চলেই গেল ধেইধেই করে বৈতলকে একা ফেলে । মা ছাড়া জীবন যখন কাটাতেই হবে তখন মায়ের স্মৃতি নিয়েই বাঁচবে বৈতল । বইয়াখাউরি বাড়িতে যে মায়ের গন্ধে ভুর ভুর করে । মা তো মাই, শরীরের মা নেই তো কী হয়েছে, বৈতল তার সুখের কথাই মাকে শোনাবে, দুঃখের কথা বলে দুজনেই মন খারাপ করবে । দুয়ার এঁটে ঘরের ভিতর মায়ের বাতাসকে বৈতল বেরতেই দেবে না । আর পাঁচ, দিঘীর পারেও বৈতলের কাজ ফুরিয়েছে । যে- কাজের জন্য এসেছিল সেই শিক্ষাও নিষ্ফলা হয়েছে । মনসা পুঁথি আর সে গাইবে কেন । বৈতলের মা তো আই মনসার একনিষ্ঠ ভক্ত ছিল, তবে কেন বিষহরির অনুচরই বিষ ঢেলে দিয়ে গেল গৌরাঙ্গী মায়ের দেহে । মায়ের যে এত কষ্ট জীবনে, মা একবারও মর যাওয়ার কথা বলেনি , বাঁচতে চেয়েছে মা, ছেলেকেও শিখিয়েছে লড়াই করে বেঁচে থাকার  শিক্ষা । তবে কেন, বৈতল যতক্ষণ না জবাব পাচ্ছে সে আর শ্রাবণের আনন্দে উদ্বেল হবে না । ঢলানি জিয়ানির উত্তেজনায় নেচে উঠবে না তার প্রাণ ।
   মিরতিঙ্গার মাটিতে একবার গিয়ে মায়ের শরীরগন্ধ নিয়ে আসবে বৈতল । পাহাড়ের পাটপাথরে মায়ের সঙ্গে বসে আসবে, হারিয়ে যাওয়া প্রজাকুলকে বলে আসবে, বৈতল আছে যেমন ছিল । জেনে আসবে কে করেছে মুখাগ্নি । বৈতল নেই, লুলা তো ছিল মায়ের পাশে । ঝড়ফুঁকে যখন বাঁচাতে পারেনি মুখাগ্নি তো করতে পারত । মা ওকে সন্তানস্নেহে ভালবেসেছে । বলেছে,
--- আমার দুই পুত রাম রহিম ।
        সাপে কাটা মড়া তো কেউ শ্মশানে নেয় না । জলে ভাসায় । তার মাকে কি তবে জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে । কলাগাছের ভেলায় দুলে দুলে ভাটি বেয়ে মা কি তবে স্বর্গে পৌঁছে গেছে । পথে, নদীর ঘাটে, জঙ্গলে কি বাঘরূপী নেতার সঙ্গে দেখা হয়েছে, ধনামনা জুয়াড়ি ধনপতি কিংবা গোধার দেখা কি পেয়েছে মা । বৈতল অনেক রাতের স্বপ্নেই মাকে দেখেছে বিষহরি আইর সঙ্গে । হাসি মুখে  উঠে এসেছে মা ভেলা থেকে । রইদপুয়ানি বিয়ানিবাজার  যাওয়ার পরই অলৌকিকে বিশ্বাস হারিয়ে যায় । করাতি গুরু আর জল্লারপার সিলেটর অনন্ত সাধু তার সুখের স্বপ্ন সব ভেঙে চুরমার করে দেন । বলেন,
--- অলৌকিক কিচ্ছু নাইরেবা । দুনিয়াত যা দেখরায় অতাউ হাচা এর বাইরে কিছু নাই ।
--- তে যে আপনে মনসামঙ্গল গাইন নাচইন । 
--- অয় কইছ ঠিক অউ । অলৌকিক নাই এর লাগি মানুষ নাই নি । মানুষরে  খুশি করন লাগব । ধর্মকর্ম করে মাইনষে, করিয়া যদি শান্তি পায়, কাড়ি লাইতাম নি  । এর থাকি ভালা কিচ্ছু থাকলে কইলামনে ধর্ম করিও না । কামলা হকলে, হালুচা হকলে কিতা করত কও, একটু যদি খুশি হয় শ্রাবণীর সময়, অউক না । আর ই পাচালিত দেখছ নি মজার মজার সব মানুষ আর তারার গপ । স্বর্গে যাওয়ার রাস্তা নদী দিয়া, ভুরা বাইয়া যায় গণ্ডকী যায় দক্ষিণ সাগর । লৌকিকের মাঝে অলৌকিক দেখা কুনু দোষর নি । অউযে সকালে উঠিয়া নমাজ পড়ইন মুসলমানে, এর থাকি ভালা কিছু দিতায় পারবায় নি ঘুম ভাঙানির মন্ত্র ।
   আর একজন আছেন অনন্ত সাধু, তার কথা আরো সোজা । বলেন,
--- মাইনষর খালি ক্ষুধা, পেট ভরলেউ অইল । এর লাগিউ ইনকিলাব জিন্দাবাদ ।
     একজনের সরাসরি শিষ্য সে, আর একজনের একলব্য ! গুরু সৃষ্টিধরের সিলেটের বন্ধু । দুজনেই নতুন করে ভেঙেচুরে গড়তে চেয়েছেন বৈতলকে । অলৌকিকের প্রতি অভিমানে বৈতল দুজনকেই ছেড়ে দেয় ।
     বইয়াখাউরিতেও চমৎকার অপেক্ষা করে থাকে বৈতলের জন্য । বৈতল মাকে ফিরে পায় না কিন্তু লুলাকে পায় । সেই লুলা, ধলা ফক্‌ফকা মনের অভিমানী বন্ধু বৈতলের । রুল আমিন বেজ , ধর্মকর্মে মতিহীন লুলার ঠিকানা এখন এনায়েতপুর কবরখানায় । সবুজ শুঁয়াপোকার রোঁয়ার মতো দাড়ি ছিল ছেড়ে যাওয়ার সময় । এখন তাকে চেনার উপায় নেই, থুতনির নীচে এক খাবলা সাজানো দাড়ি, মাথায় সাদা টুপি । বৈতল না লুলা কে যে কাকে প্রথম দেখে চিনতে পারে সে-বিতর্কে না গিয়ে লুলাই শুরু করে গালাগালি পর্ব । বলে
--- শুওরর জনা । হালার হালা । ভুলি গেচছ, নানি ।
  উল্টো অভিমানের তর্কে জড়ায় না বৈতল । বলে,
--- আমি ভাবছি তুই আমরার বাড়িত আচছ । বাপে কুনু খেদাই দিব নি ।
--- তোর বাপ, মৌসা ইগু পাগল । আমারে ইবারও খেদাই দিছে । কয় বাঙালরে বাড়িত থাকতে দিত নায় ।
--- এর লাগি তুই দাড়ি আর তকি লাগাইয়া বাঙাল অই গেলে নি ।
--- না বে । ইতা ভেক ধরন লাগে । পেটর লাগি । পরে কইমু নে ।
--- পরে কিতা কইতে অখনঅউ ক । ইতা কয়বরো উয়বরো থাকন লাগত নায় । আমার লগে থাকবে তুই । তুই কিতা করছ, সাপ ধরছ নি ।
--- ইতা ছাড়ি দিছি । অখন আমি চুঙা ফুকাই ।
       লুলা বৈতলের বাড়িতেই থাকতে এসেছিল । বাপের তারা খেয়ে চলে যায় পিয়াইন নদীর পারে এনায়েতপুর । কবরের ভিতর এক ফকিরের মাজার । মুসাফির থাকার মোকামও আছে একটা । কয়েকজন মিলে একসঙ্গে থাকে । বৈতল লুলার ভেকের কথা জানতে চায় । বলে,
--- কছ না বে কিতা করছ ।
--- কিতা আবার । কবিগান করি । গাউয়ে গাউয়ে ঘুরি আর প্যার মোহব্বতর গান যোগার করি ।
--- কিলাখান ক চাইন । হিন্দু ছুকরি আর বাঙাল পুয়া, না হিন্দু পুয়া বাঙাল পুড়ি ।
--- দূর বেটা । বাজারো বাজারো ঘুরিয়া চাইর পাতার কবি বেচি দুই পয়সা দিয়া । হিন্দু বাঙাল মিলাইলে মাইনষে কল্লা লামাই লিবা । অখন আর হিদিন নাই । আমি কই, কুতুবে লেখি দেয়, ছাপাই আনে যেগুয়ে তারেও দেই ।
--- তেও তো তুই কররে । আমি পানির বেঙ আছলাম, আবার পানিত পড়মু ।
       জল বৈতলকে অনেক শিক্ষা দিয়েছে । জলে জন্ম জলকে ভয় করে না বৈতল । ব্যাঙ এ মুতলে বন্যা হয়, বিল হাওর টইটুম্বর হয়, ভাসিয়ে নেয় সব কিছু, কই মাছের মতো কানে হেঁটে ফিরেও আসে একদিন । যেমনকে তেমন হয় । জলের কোনও ক্ষতিও হয় না । কিন্তু ঘরবাড়ি মানুষের বসত নষ্ট হয় সাময়িক । জলের ভয়েই কই বাপ হাওরের পারে টঙ বানিয়েছে স্বার্থপরের মতো । দুই গাছের মাঝখানে এক মাচান । ওখানেই থাকে সর্বক্ষণ । কেন, কোন উদ্দেশ্যে কে জানে, বাড়িঘর ভেঙে পড়েছে, শন বাঁশ খুলে গেছে, আকাশ দেখা যায় । মেরামতির খরচ খরচা বাঁচাতে কি । বাপ বলে,
--- কে ইতা দেখিয়া রাখত, লেপাপুছা করত । তুইও আইয়া থাক টঙর উপরে । বিয়া করিয়া যাইছ গিয়া ।
--- আমি বিয়া উয়া করতাম নায় । করিয়া তুমার মতো অইতাম নি ।
--- কেনে, আমি কিতা  করছি ।
--- ইতা বাদ দেও, কও লুলারে থাকতে দিলায় না কেনে ।
--- কেনে দিতাম বাঙাল ইগুরে । আমার বাড়ি !
--- তুমার বাড়ি কিতা, আমারও বাড়ি ! হিগু থাকব !
--- ঢুকাইলাছ না, ইতায় অখন সব হিন্দুর বাড়ি নের গি ভুলাই ভালাই । সব বুলে বাঙালর অই যাইব ।
--- লুলা ইলাখান নায় । মাইনষে কর তুমি পাগল অই গেছ । তুমারে আমি চিনি । তুমি যে সেয়ানা ।
--- কিতা চিনছ । পাগল না অইলে কেউ টঙো থাকে নানি!
--- ইতা ঢঙ তুমার । আমি জানি ।
--- জানছ তে জানছ । অখন ক তোর কিতা হিসাব কিতাব । কইয়া যে গেলেউ গেলে ।
     তার মানে, বাপের মনেও উচাটন । জানতে চায়  হিসাব । হিসাবের কথায় বাপ উত্তেজিত হয় । যেন বেঁচে থাকার নতুন উদ্যম খুঁজে পায় বৈতলের হিসেব – কথায় । বৈতল কোন জবাব দেয় না । জঙ্গলে যায় লুলাকে নিয়ে । বরগা কাটে, খুঁটি পুঁতে সুন্দিজালির বেত দিয়ে নতুন করে বাঁধে তিন কোণা মাড়লই । নতুন পুরনো শন মিশিয়ে দেয় ছানি । মুলিবাঁশের খাপ কেটে বেড়া দেয় ঘরের বাইরে । ঘাটালাগায় বাইরে, দরজা লাগায় ঘরে ।
     টিলার উপর চান্দকপালিকে দেখে বৈতলের চোখ ছলছল করে । গরুর বাচ্চাটি বড় আদরের ছিল মার ।বাচ্চার মা সারাদিন শরীর চাটত চান্দকপালির । মা টিলার উপর নিয়ে যেত বাচ্চাটিকে, ডিগরা দিয়ে আসত । বাপের তো কোনও কাজ নেই শুধু হাওরে যাওয়া, মাছ মারা, শুটকি দেওয়া । এখন আর ডিগরা দেওয়ার কেউ নেই, চরে খাচ্চে একা একা । বৈতল হাম্বা ডেকে ফিরিয়ে আনে বাড়িতে । বাপ দেখে বলে,
--- এইন অখন আমরার নায়, ছাড়ি দে । টিল্লার উপরে দিগম্বররে বেচি দিছি । কে দেখত ।
   মা নেই, চৈ চৈ ডাক ও নেই বাড়িতে । সন্ধ্যে হওয়ার কত প্রস্তুতি । হাঁসের ঘর ভাল করে বন্ধ না করলে শেয়াল নিয়ে যাবে । পাটনি বাড়িতে এখন হাঁস নেই, জাল নেই, পলো নেই, কিচ্ছু নেই । মায়ের সংসারে কত পোষ্য । চালের নিচে পায়রার খোপ । পায়রার ডিম কে  ডিম বলে না মা, বলে পাথর । না হলে যে ভোলা হয়ে যায় । ভোলা মানে নষ্ট । পাথর ফোটে বাচ্চা বেরোলে চোখে চোখে রাখে। কাক আর দুষ্ট বিড়ালের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখে। পনেরো দিনের পায়রার ঝোল রাঁধে মা গোলমরিচ দিয়ে, বাপেরও খুব পছন্দ। ছাগল পালে মা, ছাগলের পরুষ বাচ্চা নধর হলেই বলি দেওয়া হয় রামদা দিয়ে। বাপ কেটে ছাড়িয়ে কিত্তা পাতায় ভাগ করে রেখে দেয়। চাঁদাওয়ালা গ্রামবাসী এসে নিয়ে যায় মচা। চান্দার পয়সার ভাগ পায় মাও। নারকেলের মালায় পয়সা জমিয়ে রাখে মা। মাড়লইএ ঝোলানো থাকে শীতের কাঁথা, তার উপর দড়িতে লাগিয়ে রাখে আধখানা নারকেল মালা। ইঁদুর যাতে না নামে। সেই নারকেল বাটিতে থাকে মার ঝনঝনানো তহবিল। আর বৈতল উঠিয়ে নেয় যখন তখন। মা জানে সব, কোনোদিন কিছু বলে নি। হেমন্তের সময় টাকার দরকার পড়ে, হাওরের জল শুকিয়ে জায়,বসে বসে খাওয়া। বাপ বলে,
--- বেটির কাছ থাকি একটা টাকা আন চাইন।
মা কোথায় পাবে টাকা। সব তো উধাও। মা বলে,
--- আমি কই পাইতাম টেকা।
বৈতলের জমিদারি তার মা। বৈতল তার মায়ের সত্যবাদী পুত্র, মাকে বলে দিয়েছে তার অপকর্ম কথা ! মা এত দুঃখেও হেসেছে। ছেলের মাথায় হাত দিয়ে বলে,
--- জানি। তর লাগিউ রাখছি।
    মায়ের থেকে দূরে গেলেই বৈতল নষ্ট হয়ে যায়। শয়তানি বাড়ে। কত কিছু করে একা একা। কেউ যখন তাকে কিছু দেয় না তখন চুরি করে বৈতল। লুলাকেও পেয়ে যায় সঙ্গী। শেখার মধ্যে শেখে পুঁথি পড়া, চামর হাতে নাচ, ‘নাচে সুন্দ্রি, রঙ্গে ভুলিলা দেব ত্রিপুরারি।’ ওঝার কাছ থেকে অন্য কত গান শেখে বৈতল। ওঝা শেখান, ‘ ডিঙা বাওরে কাণ্ডারী’ । কে কান্ডারী কিছুই জানে না। শুধু জানে ডিঙা ভাসে জলে। আর তার মাকেও ভাসিয়ে দিয়েছে ডিঙায়। কাণ্ডারী কি কেউ আছে যে ফিরিয়ে দেবে তার মাকে। তুফান উঠতে দেখেছে বৈতল বারবার। তার নৌকোয়ই কেন বারবার জানে না। যুবতী শরীরের তুফান দেখেছে চায়না সুন্দরীর বুকের প্রদীপে। ভয় পেয়েছে, পালিয়ে এসেছে তার জলের জীবনে! তার প্রতিক্ষায়। যেখানে সে প্রতিপালিত হয়েছে। যা তার জন্মগত। জল দিয়ে জীবন বাঁচে, জল তাকে বাঁচায়। একটু গভীর হলে হলও,তখন সে মহাবীর। জল বৈতলকে বাঁচতে শেখায়। জলকে প্রতিপক্ষ করে শুরু হয় বৈতলের নতুন লড়াই।
      এত যে সাজগোজে তার মায়ের বাড়ি আবার গড়ে তোলে বৈতল, সেও তো চলে যায় জলের তলায়। বন্যার জল চৌকাঠ পেরোতেই বিক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে মন। বাপের বেটা বৈতলের শরীর খলখলিয়ে ওঠে এক অজানা শত্রুর বিরুদ্ধে! বাপ তার লড়তে ভুলে গেছে। জলকে ভয় করছে বাপ। তাই টঙ বানিয়েছে হাওরের পারে। জলেও থাকবে আবার জলের দূরত্বে থাকবে। হাওর বাঁওড় বিল সবখানে যখন সসাগর জল, তখন বাপ টঙ থেকে ডাকে বৈতলকে,
--- উঠি যা, উঠি যা রে! উঠিয়া আইয়া কর তোর হিসাব কিতাব।
   যে-বাপ নির্দেশ দিয়েছে শুধু, পালিত হওয়ার জন্য । সেই বাপ এখন অনুনয় করেছে । ভয়কাতুরে বাপ শূন্যে বসে জলের প্রকোপ থেকে বাঁচতে চাইছে । বৈতলের বাপ হাড় হিম-করা কণ্ঠস্বর বলেছে ‘হেই বৈতল, পানিত লাম’ সেই বাপের কণ্ঠে এখন জড়তা । হিসাব কিতাব শেষ করে কি তবে মুক্ত হতে চাইছে । বৈতল তার মুক্তিদাতা । বোঝাপড়ার গুপ্তধন নিয়ে বসে আছে বৈতল ।
          জল ডিঙিয়ে বৈতল বাপের খাঁচায় ওঠে । তিন দিকে বাঁশের বেড়া দেওয়া জলঘর । বাপের পাশে বসে বৈতল, অনেকদিন পর কাছাকাছি পিতাপুত্র । বাপের সঙ্গে বসে বৈতলের মনে পড়ে কত কথা । সে-রাতেও ছিল দুর্যোগ । বাপ তার খলুই এ আলদের বাচ্চাকে ঢুকিয়ে দিয়েছিল । পরদিন গল্প বলেছিল ছয়ত্রিশ বাংলার বন্যার । এমনি এক গাছের উপর বসেছিল তিন দিন তার বাপ । বাপের পাশে ছিল এক আলদ । ভীতু ভয়ঙ্কর । শ্বাসনালী টিপে মেরেছিল তাকে বাপ । বেইমানি করেছিল বাপের সঙ্গে । অনেকদিন পর বৈতলের ঘ্রাণ নেয় বাপ । বলে,
--- আমারে ঠেলাইরে কেনে, পড়ি যাইমু নু !
--- সরিয়া বও । পড়লে কিতা অইব, পানিত অউত্ত পড়বায় । তুমি অইলায় পানি ডাকাইত । আবার উঠবায় । তুমি বুলে বিয়া করতায় আবার ।
--- তোরে কে কইল ।
--- ইতা কওন লাগে নি । তুমি যখন লুলারে থাকতে দিছ না তখনঅউ বুঝছি । মাইনষে যখন তুমারে পাগল কইছে তখন অউ বুঝছি । আমার মার চান্দকপালি যখন দিগম্বর বুড়ারে দিছ তখন অউ বুঝছি ।
--- কিতা বুঝছস ।
--- বুড়ার কালা পুড়িরে বিয়া করতায় ।
--- অউ নি তোর হিসাব ।
--- না, তুমার হিসাব । অখন কও কে বেইমান, তুমি কুন ইমানদার, আমার মার লগে ই বেইমানি কেনে করতায় ।
--- তুই আইচছ, অখন ইতা ভুলি গেছি ।
--- তুমি কিচ্ছু ভুলো না বুড়া ।
--- অখন ভুলন লাগব । জানছ নি সব জমি নু নিবো গিয়া ।
--- কে নিত ।
--- কেনে লীগে । আমরার আর ক কিতা নিত । তেভাগা হকলে লড়রা হালুচার লাগি । আমরার তো পানি, পানির কিতা ভাগ । আমরা কেউর নায়, কুন পক্‌খতঅউ নাই ! তেভাগা নাই লীগ নাই । লীগে কয় সব জমিন মুসলমান চাষীর অইব । অউক আমরার পানি তো আমারর অউ থাকব ।
        বাপের উল্টোপাল্টা বকবকানিতে বিরক্ত হয় বৈতল । আগুনের মতো ছড়াচ্ছে গুজব চারদিকে । তবে গুজবের ভয়, লীগের ভয়, হিন্দু মহাসভার ভয়, তেভাগার আশ্বাস কিছুতেই কিছু যায় আসে না বাপের । বাপের ভয় বৈতলকে । এই রাতের আঁধারে বৈতল কেন উঠে এসেছে টঙে । এমন দুর্যোগের রাতে বৃদ্ধ পিতা ভরসা খোঁজে যুবক সন্তানের কাছে । ঘোর অন্ধকারে আলোর আশ্বাস খুঁজে পায় পুত্রের শরীর স্পর্শে । বৈতল যত বাপের কাছাকাছি হয়, বাপ ততই সন্ত্রস্ত হয় । বৈতল বাপের ভুল ভাঙাতে প্রতিবাদ করে । বলে,
--- মিছা কথা । হিন্দুহকল কিতা অউ পচা পানিত ভাইয়া আইছইন নি । ইতা হুদা মাত ! পানির মালিকও আমরা নায় । ইতা অউ নিশি পাল আর হুরমত আলির মতো বড়লোকর । যারা হাওর ধরইন, বিল ধরইন । আর আমরা মরি । তেভাগা আমরার চাই, পানির ফসলর তিনভাগ আমরার ।
     রইদপুয়ানি গ্রাম থেকে বিয়ানিবাজার এসে চুঙাওয়ালা অনন্ত সাধুর লেকচার শুনেছে বৈতল । গরীব মানুষ হিন্দুস্থান পাকিস্তান বোঝে না । তাদের পেট ভরলে তো অন্য চিন্তা । কিছু চালাক মানুষ গরিবকে বিভ্রান্ত করেছে, বলেছে তিনভাগ নয় মুসলমান পুরো ফসলের ভাগ পাবে পাকিস্তান হলে । লোভের কাছে যুক্তিবুদ্ধি খাটে না, নারায়ে তকবির হয় । তবু অনন্ত সাধু আর সৃষ্টিধর ওঝার মতো মানুষরা বুঝিয়ে যাচ্ছেন, ধাপ্পার রাজনীতিতে যে সরকার চলতে পারে না বুঝিয়ে যাচ্ছেন গ্রামের পর গ্রামে চুঙা নিয়ে । বেঁটেখাটো অনন্ত সাধু এখন কৃষককে এক নতুন জিগির শিখিয়েছেন ইনকিলাব জিন্দাবাদ । বৈতলও খোলা মাঠে দমভোর জিগির দেয় । বাপকে বলে,
--- সিলেটো ইতারে বিটলাইয়া কয়, টাউনক্লাব জিন্দাবাজার ।
--- তুই গেচছ নি সিলেটো ।
--- না । আমি গাউআলা পুয়া টাউনো গিয়া কিতা করতাম ।
ছেলের চ্যাংটা চ্যাংটা লেকচারে এমনিতে বাপের ভয় বদলে যায় রাগে । বলে,
--- তরে ইতা কে শিখাইল ।
--- কে আবার শিখাইত । নিজরতা মাইনষর নিজর অউ বুঝন লাগব ।
--- তুই কইচছ হিসাব করতে আমার লগে । অউ নি তর হিসাব ।
--- অয় ইতাও হিসাব ! হক বুঝিয়া নেওয়া ।
--- তর আর হক কিতা । পাটনির পুয়ার আছেউ কিতা, যাইতউ কিতা । এক তেনা ।
--- হক্কলতাউ আছে । বড়লুকে জানইন নি কার অউগদা খাইন । ধান চাউল তরিতরকারি মাছ আমরা না দিলে ফুটানি কই যাইব পেশকারর পুড়ির ।
--- পেশকারর পুড়ি কিগুরে ।
--- ইতা এক মাতর মাত কইলাম । পুড়ির নাম হুনলে তুমার অখনও ফালায় ।
--- মুখ সামলাইয়া কথা কইছ বৈতল ।
--- কেনে কিতা করবায় তুমি ।
--- কিতা আর করমু ক । আইচ্ছা হুন, কে জিতব ক চাইন । লিগ না তোর চুঙা আলা ।
      বয়স বাড়লেও ভোটের রাজনীতি বোঝে না বৈতল । অনন্ত সাধু তো বলেছেন তারা ভোটে লড়তে চান না, জমির আন্দোলনে কৃষকের সঙ্গে থাকতে চান । তাই বৈতল ব্যাক্তিগত উত্তরই দেয় বাপকে । বলে,
--- ফালাড কমঅউক । তখন বুঝা যাইব । অখন তো সব সমান । আলদর দাতোও বিষ নাই, তোমারও গাত তেল নাই ।
বাপ ফুঁসে ওঠে । বলে,
--- কিতা কইলে, আমার গাত তেল নাই ।
--- নাই । বুড়া অই গেছ । আর চেষ্টা করলে আলদদি মারাইতায় পারতায় নায় । আমি ভুলছি না কিচ্ছু । আমারও জন্ম ছয়ত্রিশ ইংরাজির গুলাত ।
--- তুই তোর মার মতো কতা কইচ না বৈতল । হিদিন পারছি না, আইজ মারি লাইমু তোরে । জানছ তো কথাত আছে, মায় বানায় ভূত, বাপে বানায় পুত । তুই ভূত অইচছ । আমার পুত অইলে ইলাখান অইলে নানে ।
বৈতলও রাগে অথর্ব বাপের উপর, বলে,
--- মার না বেটা মার । আমার মারে মারচছ, অখন আমারে মার ।
টঙ ভেঙে মরেছিল বৈতলের বাপ সে-রাতে ।



চলবে

 < ভাটি পর্ব ১৫ পড়ুন                                                    ভাটি পর্ব ১৭ পড়ুন >

রবিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০১৬

কবির সঙ্গে মুখোমুখি


।। নীলদীপ চক্রবর্তী।।


















কখনো নীরবতাই শ্রেয় । শুদ্ধ । পরিপূর্ণ ।
প্রিয় কবির মুখোমুখি শরীর ।
বাইরে ঝমঝমে বৃষ্টির আবেশ । তবু আড়ষ্টতা ।

কবি কে বলা যায়, ‘আপনার কবিতা খুব ভালবাসি’
কারণ এর পর আর তৃতীয় সংলাপ থাকে না ।

তারচেয়ে ভাল অন্ধকারময় ব্যথায় কবির
প্রথম সংকলনের শেষ কবিতা পড়া ।
সেখানে নীরবতা মুখর হয় । কী অবলীলায়
একে একে খুলে যেতে থাকে দীর্ণতার পরত ।

আমি আর কবি একসাথে অবগাহন করি

অনন্ত চিদাকাশে । শুদ্ধতায় । পরিপূর্ণতায় ।