“...ঝড়ের মুকুট পরে ত্রিশূণ্যে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো ,স্বাধীন দেশের এক পরাধীন কবি,---তার পায়ের তলায় নেই মাটি হাতে কিছু প্রত্ন শষ্য, নাভিমূলে মহাবোধী অরণ্যের বীজ...তাকে একটু মাটি দাও, হে স্বদেশ, হে মানুষ, হে ন্যাস্ত –শাসন!—সামান্য মাটির ছোঁয়া পেলে তারও হাতে ধরা দিত অনন্ত সময়; হেমশষ্যের প্রাচীর ছুঁয়ে জ্বলে উঠত নভোনীল ফুলের মশাল!” ০কবি ঊর্ধ্বেন্দু দাশ ০

মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬

।। কুয়াশার ভেতর দিয়ে দেখা মাঠ।।


    ফটো: গুগল সৌজন্য 

    অগ্রহায়ণ মাসের ভোর। চারদিক কুয়াশায় ঢাকা। জানালার ওপাশে কিছুই স্পষ্ট নয়—না সামনের ফ্ল্যাটের নির্মাণ সাইটের আলো, না পেছনের খোলা মাঠ। সবকিছু যেন নিঃশব্দে মিলিয়ে গেছে সাদা ধোঁয়ার ভেতর। পাশের বাড়ির মোরগটিও ডাকেনি আজ। সূর্য উঠেছে কি না, তার কোনো চিহ্নই পায়নি রহিমা।

   ঘড়ির কাঁটা আর দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসা ফজরের আজান—এই দুটোর উপর ভরসা করেই নামাজ আদায় করে সে। নামাজ শেষে কোরআন পাঠ, তারপর আধঘণ্টা হাঁটা—এটাই তার প্রতিদিনের নিয়ম। কিন্তু আজ শরীরের চেয়েও মন বেশি অলস। কনকনে শীত আর ঘন কুয়াশা তাকে কম্বলের ভেতরেই আটকে রাখে।

    বিছানা থেকে কাঁচের জানালাটা দেখা যায়। এই জানালাই তার প্রকৃতির সঙ্গে নীরব সংলাপ। পর্দা সরিয়ে চারটি বালিশে মাথা উঁচু করে কম্বল জড়িয়ে শুয়ে পড়ে রহিমা। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বাইরের দিকে। কুয়াশায় ভেজা কাঁচের মতোই মনের ভেতর ঝাপসা স্মৃতিরা একে একে ভেসে ওঠে। শৈশব আর কৈশোর—সব যেন এই ভোরের আলো-আঁধারিতে মিলেমিশে যায়।

    কনকনে শীত। কুয়াশাচ্ছন্ন চারদিক। সবুজ-হলদেটে মাঠ। কাঁচা-পাকা ধানের মো মো গন্ধ। মেঠো পথ।

    ফজরের নামাজ শেষে মসজিদ থেকে ঘরে ফিরছেন পুরুষরা। আর রহিমা—তার বোন করিমা, চাচাতো বোন জাকিরা আর সাদিয়াকে নিয়ে—দল বেঁধে যায় মসজিদে। মসজিদের লাগোয়া বারান্দায় বসে ধর্মীয় শিক্ষা নেয় তারা। রহিমার বড় ভাই আবিদ বাবার সঙ্গে নামাজে গিয়ে ঘরে ফিরে আসে না। মসজিদে পড়াশোনা শেষ করে তবে বাড়ি ফিরে। 

    মেঠো পথের দু’ধারের ধানের পাতায় জমে থাকা কুয়াশার পানি ঠোঁটে লেপ্টে যায়। জাকিয়ার বড় বোন বলেছিল, এতে নাকি ঠোঁট ফাটে না। কাকভোরে কনকনে শীতে পড়ার প্রতি তাদের আগ্রহ দেখে ইমাম সাহেব সন্তুষ্ট হন। দেরিতে আসা ছাত্রছাত্রীদের নাম ধরে যখন বকুনি দেন উস্তাদ, তখন ওরা নিজেরাই ভেতরে ভেতরে একধরনের গর্ব অনুভব করে।

    ধীরে ধীরে কুয়াশা ঠেলে সূর্যের স্নিগ্ধ আলো পূব আকাশে উঁকি দেয়। মসজিদের সামনে পাতা-ঝরা আমগাছটার শুকনো ডালে দু-চারটি পাখি এসে বসে। দেয়াল ঘড়িতে আটটা বাজে। ছুটি হয়। ফেরার পথে পথের ধারের কুল গাছ থেকে ঢিল ছুড়ে কাঁচা টক কুল পেড়ে কাড়াকাড়ি করে খায় তারা—দাঁতে কামড়ে ধরা টক স্বাদে শীতের সকাল আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে।

    রহিমা ঘরে ফিরে কোরআন রেখে সোজা রান্নাঘরে ভাত খেতে যায়। তারপর পড়ার টেবিলে বসে স্কুলের বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে, পড়ে কিংবা অংক কষে। স্নান করে স্কুলের জন্য প্রস্তুতি নেয়। সকাল দশটায় শীতের মিষ্টি রোদ গায়ে মেখে হেঁটে হেঁটে স্কুলে যাওয়া। সঙ্গে তো করিমা, জাকিরা, সাদিয়া আছেই রাস্তায় আরও যোগ হয় মুনমনি, শেফালি, দুর্গা। সাড়ে দশটায় স্কুল শুরু হয়।

    রহিমাদের জমিতে চাষাবাদ করেন সুরুজ চাচা আর তাঁর দলবল। জমি তৈরি থেকে ধানের চারা রোপণ—সবকিছু তাঁরাই সামলান। রহিমার বাবা রাজনীতিতে ব্যস্ত; টানা দশ বছর ধরে গাঁও পঞ্চায়েতের সভাপতি। তিন ভাই-বোন কৃষিকাজের প্রতিটি ধাপ গভীর আগ্রহে লক্ষ করে। কাঁচা হলুদাভ চারাগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গাঢ় সবুজ হয়ে মাঠ ভরে দেয়। শীষ বেরোলে মাঠটা ছবির মতো সুন্দর হয়ে ওঠে। পাকা ধানের সোনালি রঙ আর মো মো গন্ধ—চারপাশের দৃশ্যটাই বদলে দেয়। করিমা রঙ-তুলিতে এই দৃশ্য ধরে রাখে। 

    সুরুজ চাচারা কাঁচি দিয়ে ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে ধান কাটেন। ছোট ছোট মুঠি বাঁধেন। ছোট ছোট মুঠি একলগে করে বড় মুঠি বাঁধেন। ‘হুজা’ দিয়ে ধানের বড় বড় মুঠি তুলে কাঁধে নিয়ে নেচে নেচে গ্রামের দিকে যান। উঠোনের এক কোণে জমা হয় ‘ফারা’। সুযোগ পেলেই ওরা সেই ফারায় উঠে নাচে।

    ধান মাড়াইয়ের সময় গরুর হালের পেছনে ঘোরে রহিমা। হাতে পাতলা বাঁশের লাঠি।
—“রহিমা মার! ডান্ডা মার!”
—“চাচা, মারলে তো গরু কষ্ট পাবে।”

করিমা চেঁচিয়ে ওঠে,
—“বুবু মারিস না! ওদেরও তো কষ্ট হয়!”

সুরুজ চাচা হাসেন,
—“আইজ আর আমার মাড়া দেওয়া অইত নায়।”

ঠিক তখনই মা লাঠি হাতে বেরিয়ে আসেন,
—“দাঁড়াও ক্ষেতুয়ালনি হখল! পড়াশোনা নাই?”

   দুই লাফে পড়ার টেবিলে গিয়ে বসে রহিমা। পিছে পিছে করিমাও পড়তে বসে। মা বকুনি দিতে দিতে রান্নাঘরে ফিরে যান। আবিদের সামনে মেট্রিক পরিক্ষা তাই সে দিন রাত এক করে পড়াশোনা করছে।

    ধান থেকে খের আলাদা করা রহিমার খুব প্রিয়। ‘উকৈট’ দিয়ে খের সরানো, ঝাড়ু দিয়ে বাছাই - এসব যদি সুরুয চাচা সব সময় তাকে করতে দিতেন! তার খেরের পাহাড়ে গড়াগড়ি। সন্ধ্যায় পা ধোয়ার পর চুলকানি আর জ্বালা। মা বকতে বকতে সরিষার তেল মাখিয়ে দেন। খের দিয়ে তৈরি হয় ‘ফেইন’—সারা বছরের জন্য সংরক্ষণ।

    হঠাৎ মোবাইলের নোটিফিকেশন শব্দে বর্তমান ফিরে আসে। সকাল আটটা বেজে গেছে। ছেলের স্কুলে শীতের ছুটি, স্বামীর কলেজও বন্ধ। তারা গ্রামে গেছে। রহিমা যেতে পারেনি—অফিস খোলা। আজ রবিবার। ঘরে সে একা।

    হোয়াটসঅ্যাপে ছেলের পাঠানো একটি ভিডিও।সে কিছু তথ্য সংগ্রহ করে ও কিছু নিজে প্রত্যক্ষ করে রীল বানিয়েছে—ট্র্যাক্টর দিয়ে জমি চাষ, চারা রোপণ, শষ্য শ্যামল মাঠ, সোনালি ধান। তারপর মেশিনের ক্যাঁচ-ক্যাঁচ শব্দে ধান মাড়াই। আগের মত গরু নেই। পাখি নেই। মানুষগুলো পাশে দাঁড়িয়ে শুধু তাকিয়ে আছে। দূরে মাঠে কয়েকটি গরু শব্দ দূষণের ফলে অস্থিরতা অনুভব করছে।

ভিডিও শেষ হয়।

   রহিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলেকে লিখে পাঠায়—
“কোথায় সেই কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর, পাখির কলতান, মুক্ত বাতাস? মানুষ আর পশুর মধ্যে যে আত্মিক সম্পর্ক ছিল—সবই কি আজ শব্দ আর ধোঁয়ার ভেতর হারিয়ে গেল?”

জানালার বাইরে কুয়াশা তখনও ঘন। মাঠ দেখা যায় না।
শুধু নিস্তব্ধতা।


1 টি মন্তব্য:

নামহীন বলেছেন...

This story recalls our childhood.